Page 1 of 3

বৈশাখে ঘর ও আপনি...

 

এসেছে বৈশাখ। এসেছে বাংলা নতুন বছর। প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলা নতুন বছরটিকে সাদরে বরণ করে বাঙালিদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল সাজ সাজ রব। একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই দেখা যায় শহর ও নগরে এই আসন্ন বৈশাখের আগমনী বারতার দোলা লেগেছিল যেন চারদিকেই। বিপণি বিতানগুলো সেজে উঠেছিল বৈশাখী সাজে। বৈশাখী আয়োজনে ব্যস্ত ছিল নৃত্য-গীত শিল্পীরা, কলা-কুশলী ও চিত্রকররা। বাংলাদেশি খাবার মুড়ি-মুড়কি, গজা-কদমার কারিগর ও বিক্রেতাদের মধ্যেও শুরু হয়েছিল বিশেষ কর্মতৎপরতা। বৈশাখ বা বৈশাখী মেলা উপলক্ষে শিশুদের জন্য কাঠ, শোলা, মাটি কিংবা বেতের নানান খেলনা তৈরিতে কারিগরদের মধ্যেও ছিল বৈশাখী ব্যস্ততা।

বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছর পালন নিয়ে চারদিকে আয়োজনের যেন শেষ নেই। তবে ওই আয়োজনের সিংহভাগই বুঝি অসম্পূর্ণ থেকে যেতো যদি বাংলার রমণীকুল বৈশাখী আয়োজনে না সাজতো। তাই ওই বিশেষ দিনটি ঘিরে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র- সবার ঘরেই চলেছে সাধ্যমতো আয়োজন। একটা সময় পর্যন্ত শুধু লাল পাড়-সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ, খোঁপা বা বেণীতে দোলানো বেলিফুলের মালা, হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি আর আলতা রাঙানো পা- এসবই ছিল বৈশাখের সাজ। এগুলো বাদ দিয়ে আজও বর্ষবরণের সাজ পূর্ণতা পায় না! তবে যুগের পরিবর্তনে বাঙালির সাজে শুধু ওই লাল-সাদা কনসেপ্ট ছেড়ে উঠে এসেছে কমলা, হলুদ, বেগুনি, সবুজসহ নানান বর্ণালি রঙের বাহার। আর নকশায় দেশি বাদ্যযন্ত্র আর ব্যবহার্য জিনিসের জায়গায় ধীরে ধীরে উঠে এসেছে বাংলার প্রকৃতি আর নানান কারুকার্যময় আলপনার ছবি। তো দেখা যাক কীভাবে সেজেছে বাঙালি বৈশাখী সাজে-

প্রথমেই আসি শাড়ি প্রসঙ্গে। বৈশাখে শাড়ি নির্বাচনে ম্যাটারিয়াল হিসেবে কটন বা সুতি এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বৈশাখ যেহেতু প্রচ- গরমের মাস সেহেতু এই তীব্র গরমে সুতি বা তাঁতের শাড়িই সবচেয়ে বেশি উপযোগী। খাদি কাপড় একটু মোটা হলেও বৈশাখে খাদি শাড়িও থাকে কারো কারো পছন্দের তালিকায়। সুতি জামদানিরও প্রচলন রয়েছে। তবে সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠান বা বিশেষ জাঁকজমকপূর্ণ বৈশাখী অনুষ্ঠানে সিল্ক, মসলিন, টিস্যু বা গরদ কিংবা জমকালো জামদানি ও অন্যান্য ম্যাটারিয়ালেরও প্রচলন দেখা যায়। আগে সুতি শাড়ির পাশাপাশি গরদের কাপড়ও সমানভাবে ব্যবহার হতো। এবারেও কেউ কেউ বৈশাখে বেছে নিয়েছে সনাতনী গরদ। রঙের ক্ষেত্রে সম্প্রতি সাদা ও লালের পাশাপাশি কমলা, বেগুনি, হলুদ, সবুজ, নীলসহ নানান নকশাদার শাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছে। বৈশাখের শাড়িতে বাড়তি সংযোজন হিসেবে ঝুনঝুনি, টারসেল, আয়না, পুঁতি, কাঁচ বা ছোট ছোট স্টোনও কেউ কেউ ব্যবহার করেছেন। শাড়ি ছাড়াও সালোয়ার-কামিজ যারা পরেছেন তারাও ম্যাটারিয়াল হিসেবে সুতিই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর রঙের ক্ষেত্রে বেছে বেছে নিয়েছে রঙ-বেরঙের বৈচিত্র্য।


যাহোক, এবারে আসি শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজের ডিজাইন বা নকশার ব্যাপারে। বৈশাখী সাজে ব্লাউজের ডিজাইনে থাকে গ্রামীণ আবহ। ঘটিহাতা, গলায় কুচি, লেস ফিতায় ব্লাউজ, প্রিন্ট বা চেক কাপড়ের ব্লাউজ অনায়াসে মানিয়ে যায় বৈশাখী শাড়ির সাজে।
যাহোক, ফুটপাথ থেকে শুরু করে যে কোনো প্রসাধনীর দোকানে পাওয়া যায় নানান টিপ। কাজেই নিজের পছন্দ ও চাহিদামতো টিপ চাইলেই সংগ্রহ করা কঠিন কিছু নয়। এছাড়া কুমকুম দিয়েও নিজের মনের মতো নকশা করে টিপ এঁকে নেয়া যায়। এক পাতা সাধারণ টিপ ১০ থেকে শুরু করে গুণ, মান ও নকশাভেদে ৫০, ১০০ বা ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম হতে পারে। শাড়ি আর চুড়ি যেন একে অন্যের পরিপূরক। শাড়ির সঙ্গে হাতে রিনিঝিনি কাচের চুড়ি না থাকলে তো সাজে পূর্ণতা আসে না! বৈশাখে লাল-সাদা চুড়ি ছাড়াও রঙ-বেরঙের চুড়ি পরতে দেখা গেছে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বা কনট্রাস্ট করে। কামিজের সঙ্গেও একইভাবে পরা যায় এক মুঠো রিনিক-ঝিনিক রেশমি চুড়ি। কাঁচের চুড়ি ছাড়াও অন্যান্য ম্যাটারিয়ালের চুড়িও বেশ মানিয়ে যায় বৈশাখের সাজের সঙ্গে। রেশমি চুড়ি ৫০ টাকা ডজন এবং জরি বা চুমকি বসানো কাচের চুড়ি ৫০ থেকে ৬০ টাকা ডজন। স্টিলের চুড়ির সেট ৬০ টাকা থেকে শুরু। অক্সিডাইজ ও ব্রোঞ্জের চুড়ি জোড়ার দাম শুরু ৮০ থেকে। মাটির চুড়ি জোড়া ৩০ এবং কাঠের চুড়ি জোড়া ২০ থেকে ৪০ টাকা। কাঁচাফুলের মালা বৈশাখী সাজে খোঁপা বা বেণীতে দোলানো ফুল বা ফুলের মালা যেন এক চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রতীক। তীব্র গরমে বৈশাখী সাজে আরামদায়ক আর স্নিগ্ধ অনুভূতি আনতে খোঁপা বা বেণীতে একগুচ্ছ সাদা বেলি বা রজনীগন্ধার তুলনা হয় না। এছাড়া বাজারে পাওয়া গোলাপ, জারবেরা ফুলেও সাজিয়ে নেয়া যায় চুলের সাজটি। কাঁচাফুলের মালার দাম ফুলভেদে হয়ে থাকে ভিন্ন।

গ্রামের মেয়েদের আলতা রাঙা পা তো নিত্যদিনের প্রসাধনী। বাঙালি সাজে ওই সাজটি শহর বা নগরেও ওই বিশেষ দিনে আনা যায় বাঙালিয়ানার বৈশিষ্ট্য হিসেবে। প্রসাধনীর দোকানগুলোয় আলতা পাওয়া যায় ১০০ থেকে ২৫০ টাকায়।
পায়ের সাজে আরেকটি অলঙ্কার নূপুর বা মল। মেহেদী দিয়ে নকশা রাঙানো হাতও বাঙালিয়ানার সাজেই পড়ে। কাজেই অনেকে দু’হাত রাঙিয়ে নিয়েছেন বিশেষ দিনটিতে। এছাড়া মাটি, পুঁতি, কাঠ, বাঁশ, বেত বা নারিকেলের মালার তৈরি দুল, মালাও এই বৈশাখের সাজে মানিয়ে যায় দারুণ। এই গেল বৈশাখী সাজের গল্পগুলো। তবে শুধু নিজে সাজলেই তো চলবে না। বৈশাখী সাজে গৃহসজ্জার ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে। লাল, সাদা, নীল, হলুদ, সবুজ বা কমলায় রঙিন করে তোলা যায় গৃহকোণ এই বিশেষ দিনটিতে। গৃহসজ্জার ক্ষেত্রে যে ঘরটি প্রথমেই প্রাধান্য পায় সেটি হচ্ছে বসার ঘর। কারণ অতিথি এলে এই ঘরেই তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। তাই এই ঘরটি সাজিয়েছেন আকর্ষণীয় ও রঙিন করে।


বাংলা নববর্ষ যেহেতু বাঙালির উৎসব সেহেতু গৃহসজ্জায় বাঙালিয়ানা ছাপ রাখতে হয়। মাটির শোপিস, মাটির পুতুল, টেপা পুতুল, ঘণ্টা, মাটির চাইম, প্রদীপ, নকশিকাঁথা, হাতপাখা, আলপনা- এসব দেশীয় উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি বৈশাখী গৃহসজ্জা। বসার আয়োজনে ভিন্নতা আসে। শীতলপাটি, নকশিকাঁথা ও রঙিন কুশন সাজিয়ে বসার আয়োজন করা যেতে পারে। ঘরের কোণে সবুজ গাছ, পটারি বা টেরিরিয়াম সাজিয়ে দেয়া যায়। দেয়ালে ঝোলানো হয় কাগজ, কাঠ, বাঁশ, বেত, মাটির নানান মুখোশ। একটি মাটির পাত্রে পানি নিয়ে পছন্দমতো ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে এতে জ্বালিয়ে দেয়া হয় রঙ-বেরঙের ফ্লোটিং মোমবাতি। এছাড়া ব্যবহার করা হয় নানান ল্যাম্পশেড। আলপনা ও প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্ণাঙ্গ করে তোলা হয় বৈশাখী সাজের বসার ঘর।
খাবার ঘরে খাবার টেবিলটি ঢেকে দেয়া হয় তাঁতের ব্লক প্রিন্ট বা হ্যান্ড পেইন্টের টেবিল কভারে। নতুনত্ব হিসেবে আদিবাসীদের রঙিন থামি (লুঙ্গি) দিয়ে টেবিল কভার বানানো যেতে পারে। টেবিল রানারটি শীতলপাটি, বাঁশ অথবা নকশিকাঁথার তৈরি হতে পারে। আদিবাসীদের তৈরি রেশমি সুতার বর্ণিল চকচকে ওড়নাও রানার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। রানারের ওপর মাটির মোমদানি বা মাটির ফুলদানি ফুলসহ সাজিয়ে দেয়া যেতে পারে। খাবার টেবিলে তৈজসপত্রে মাটি ও কাঠের ব্যবহার আনা হয়। কাঠ, মাটি বা বেতের তৈরি বাসন-কোসনে বিকালে পরিবেশন করা যায় খৈ, মুড়ি, বাতাসা, নিমকিসহ দেশীয় মুখরোচক খাবার। রঙ-বেরঙের খাদি বা সুতি কাপড়ের পর্দার ব্যবহারও ঘরটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। ঘরের দেয়ালগুলো বাঁশের ওয়াল ডেকোরেশন বা মাটির টেরাকোটা দিয়ে সাজানো হয়। শোবার ঘরের বিছানায় বিছিয়ে দেয়া হয় উজ্জ্বল রঙের বেডশিট। বিছানার চাদরের সঙ্গে মিলিয়ে পর্দার রঙেও আনা যেতে পারে বর্ণিল নকশার ব্যবহার। বিছানার ওপর বিছিয়ে দেয়া যায় শীতলপাটি। এছাড়া ফেলে রাখা যায় একটা নকশি হাতপাখা। অন্যদিকে মেঝেতে রঙিন শতরঞ্জি বিছিয়ে ঘরটি আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। শতরঞ্জির পরিবর্তে মাদুরও বিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। দেয়ালে ঝোলানো যায় কারুকার্যম-িত আয়না বা রঙিন পেইন্টিংস।

বৈশাখে রঙিন হয়ে উঠুক গৃহকোণসহ প্রত্যেকের অন্তর ও চারদিক। বৈশাখের ওই আনন্দে বিরাজিত হোক সব সত্য ও সুন্দর!

 

 

আয়োজন : শুভ

ছবি : কানন মাহমদুল

মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন

মডেল : অর্পিতা জাহারাত

লেখা : শায়মা হক

বৈশাখী বসনে অতীত-বর্তমান

 

বৈশাখ শব্দটি ঝড়োহাওয়ার মতো মন মাতানো। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মন, দেহ ও পোশাকে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। নববর্ষ বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা তুলে ধরে। তাই মন, প্রাণ ও পোশাকে আমরা সব সময়ই বাঙালি। অতীতের বৈশাখী পোশাক যেমন বাংলার সংস্কৃতি বহন করছে তেমনি বর্তমানের বর্ণিল ও উজ্জ্বল বৈশাখী পোশাকেও রয়েছে পরিপূর্ণ সংস্কৃতির ছাপ।

ষাটের দশকে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উৎসব পালনের শুরু থেকেই মূলত পোশাকের প্রবর্তন হয়। সেখানে মেয়েরা সাদা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে গান গায়। শান্তির রঙ সাদা আর নতুন দিনের সূর্যের প্রতীক লাল রঙ। আর দুইয়ের সংমিশ্রণে লালপেড়ে সাদা শাড়ি। উৎসবের পোশাক হিসেবে লাল-সাদা ধরে নিলেও নতুন শাড়ি বা নতুন পোশাকই মুখ্য ছিল সব সময়। নতুন পোশাক পরাই ছিল অন্যতম আনন্দের উৎস। মেয়েরা পরতো মোটা পাড়ওয়ালা সাধারণ সুতির শাড়ি বা ঠাসা বুননের তাঁতের শাড়ি বাগরদের শাড়ি। সালোয়ার-কামিজও ছিল ছিটকাপড়ে তৈরি অতি সাধারণ। রঙের তেমন বৈচিত্র্য ছিল না বললেই চলে। মেয়েরা ফুলের তৈরি গহনায় নিজেকে সাজাতো। পায়ে পরতো আলতা। ছিল ঘটিহাতা ব্লাউজের চল। একটু উঁচুতে কপালে টিপ আর বল খোঁপা ছিল তখনকার শৌখিন রমণীর সাজ। ছেলেদের পোশাক ছিল ধুতি, লুঙ্গি, পায়জামা আর পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি ছিল অতি সাধারণ সোজা-সাপটা ডিজাইন। শিশুদের পোশাকও ছিল খুব সাদাসিধা।


সময়ের পালাবদলে পোশাকের ভাবনাতেও আসে পরিবর্তন। অধুনা ওই পরিবর্তনই আজ ফ্যাশন। রঙে এসেছে বৈচিত্র্য। যুক্ত হয়েছে আনন্দের সব রঙ ও হরেক নক্শা। এবার বৈশাখী ফ্যাশনের তুঙ্গে ছিল রঙধনুর রঙে রাঙানো পোশাক। পুরো শাড়িতে রঙধনুর রঙ অথবা সাদা শাড়ির ওপর রঙধনুর ছোঁয়া। লাল-সাদা রঙ তো রয়েছেই, কিছু নতুন রঙও প্রাধান্য পেয়েছে বিগত বছরগুলোয়। যেমনÑ কমলা, হলুদ, সবুজ, সোনালি, বাসন্তী ও নীল রঙ। অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল টেইলর মাস্টারদের ব্যস্ততা, বুটিক হাউসে নকশার সেলাই, ব্লক-বাটিকের কাজ, ডিজাইনারদের কাছে সিরিয়াল দেয়া। হয়েছে উপচে পড়া ভিড় ফ্যাশন হাউসগুলোয়। এবারও চুটিয়ে ব্যবসা করেছে কাপড় ব্যবসায়ী ও ফ্যাশন
হাউসগুলো। টপ ডিজাইনারের পোশাক এখন ফ্যাশনেবল প্রত্যেক ছেলে-মেয়ের স্বপ্ন। পহেলা বৈশাখ বর্ণিল হয়ে ওঠার দিন। তাই অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এ-দোকান, ও-দোকান ঘোরাঘুরি। নিজের ও পরিবারের জন্য সাধ্যমত সকলে বেছে নিয়েছে ফ্যাশনেবল পোশাকটি। সাধারণ সাজেও বাঙালি হয়ে উঠেছিল দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। একরঙা সুতির শাড়িতে চিকন পাড়, কপালে বড় টিপ বৈশাখের জন্য একটি আকর্ষণীয় সাজ। বাঙালি স্টাইলে শাড়ি পরলেও বেশ

মানায়। কেউ আবার পছন্দ করেন জামদানি, সিল্ক ও গরদ। গরমের কারণে অনেকে সালোয়ার-কামিজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে উৎসবটি একেবারেই দেশীয় সংস্কৃতির। ফলে মেয়েদের জন্য শাড়ি আর ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবিই হবে ট্রাডিশনাল।
বৈশাখের সাজের জন্য মাটির গহনাই উত্তম। মাটির মালা হতে হবে লম্বা। আবার কাঠ, রুপা, মুক্তা বা সুবাসিত ফুলের গহনাও ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী ফ্যাশনের অন্তর্গত। বাহারি ফুলের মৌসুম এখন। তাই ফুলের গহনায় মনের মত করে সেজেছে মেয়েরা। শাড়ির পাড়ের সঙ্গে মানানসই রঙের গার্নেট বা কুন্দনের গহনাও বেশ জনপ্রিয়। হাতভর্তি চুড়ি না থাকলে বাঙালি নারীর সাজ থেকে যায় অপূর্ণ। গহনা না পরলেও হাতভর্তি রেশমি কাচের চুড়ি সাজে আনে পূর্ণতা। মাটি বা কাঠের চুড়িও বেশ জনপ্রিয়। শাড়ির রঙের সঙ্গে ম্যাচ করা টিপ, পায়ে আলতা আর মানানসই নূপুর ঝলমলিয়ে দেয় উচ্ছল তরুণীর সাজ। এমন একদল তরুণীকে দূর থেকে মনে হয় যেন একঝাঁক পরী।

মেয়েদের পছন্দের তালিকায় এখন দেখা যাচ্ছে বুকে ও হাতে রঙবেরঙের লেস দিয়ে কাজ করা এন্ডিকটন কামিজ, লং টপসের সঙ্গে ফুল কটন খাদি কামিজ, সাদা জর্জেট কাপড়ে লাল পাড় অথবা লাল জর্জেট কাপড়ে গোল্ডেন পাড়ের আনারকলি। স্কিন প্রিন্টের ওপরে সুতার কাজ অথবা কালারফুল সেডের দোপাট্টা।শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং চুড়ি, জুতা ও ব্যাগ এখন আর কোনো বাহুল্যতা নয়, সাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। হরেক রঙের কাপড়, চামড়া, জুটের তৈরি ব্যাগ ও ছোট বটুয়া বা ক্লাচ পার্স বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কবিতা আবৃত্তি, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা আবৃত্তিতে চোখে ভেসে ওঠে জামদানি শাড়ি, বেলোয়ারি চুড়ি অথবা পাথরসেটের গহনা। এছাড়া কপালে বড় টিপ, পায়ে আলতা ও নূপুর এবং হাতে মেহেদির আলপনা, চুলে বেলি ফুলের মালা। তাই অনুষ্ঠানের শিল্পীরা ওই ধরনের সাজটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ইদানীং স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, ভাই-ভাই, বোন-বোন, ভাই-বোন অথবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ম্যাচিং পোশাক পরার ধুম পড়েছে বেশ। ম্যাচিংটি হয় একই রঙের অথবা কন্ট্রাস্টে।

ভাবনাটি ফ্যাশন সচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। চেয়ে চেয়ে দেখার মতোই এক দৃশ্য যেন! বিগত বছরগুলোয় ছেলেদের পাঞ্জাবির সঙ্গে যোগ হয়েছে উত্তরীয়। পাঞ্জাবির রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উজ্জ্বল রঙের উত্তরীয় বৈশাখের আমেজে বেশ মানিয়ে যায়। তরুণরা হাতে ঘড়ি অথবা পাঞ্জাবির রঙের বালা পছন্দ করছেন। ছেলেরা পছন্দ করছে পাতলা খাদি কাপড়ের ওপর বিভিন্ন রকমের প্যাচওয়ার্ক, কাঁথা ফোড়ের কাজ, বুকের প্লেটে ঘন লুপ বোতামের ডিজাইন, হাতে প্যাচওয়ার্ক কাজের পট্টি দিয়ে দৃষ্টিনন্দন নকশা। ছোটদের পোশাক মা-বোনরাই নির্বাচন করে থাকেন। তবে ছোটদের পছন্দতেও এখন অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ছোটদের জন্যও আলাদাভাবে তৈরি হচ্ছে বৈশাখী পোশাক। অথচ ওই ভাবনা অতীতে ছিলই না।
বাঙলা নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। নতুন বছরটিকে বরণ করা বহু বছর ধরে এ দেশের সংস্কৃতিতে চলে আসছে। বর্ণিল পোশাক, পরিবর্তনশীল পোশাক এই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতির ঐতিহ্য বজায় রেখেই চলে পোশাকের বিবর্তন। সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ ‘বৈশাখী ভাতার ব্যবস্থা’। এ কারণে পোশাক নির্বাচনে এখন আর কার্পণ্য নয়। তাই, ছোট-বড় সবাই নতুন পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে সজীব করে তুলেছে নববর্ষের আনন্দ। ১৪২৫ সনের নতুন সূর্যালোক পুরনো বছরের অন্ধকার সরিয়ে নতুন আলোয় ভরে তুলুক নতুন বছরÑ এই প্রত্যাশা করি।

 

মডেল : জেনিন, অবনী, শাকিব, সাফা
সান, লিন্ডা, হিমেল, মিষ্টি ও আদি
ছবি : স্বাক্ষর জামান
মেকওভার : পুতুল ওয়াংশা ও সুমন রাহাত
পোশাক : আর রাফিউ. রাকিব খান
লেখা : ফারজানা মুল্ক তটিনী

 

মঙ্গল শোভাযাত্রা
বাঙালির একটুকরো স্বপ্ন

জোসী চৌধুরী

 

পুবের আকাশে বিশাখা নক্ষত্রের উদয়ের সঙ্গে নিসর্গে আসে নবপ্রেরণা, চৈতালী ফসল বিক্রির ধুম পড়ে যায় গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে। জমির খাজনা, মহাজনী ঋণ, মুদি দোকানের দেনা পরিশোধ করে কৃষক পান মুক্তির আনন্দ। বৈশাখ মাসেই শুরু হয় বণিকদের হালখাতা উৎসব, দেনা-পাওনার হিসাব। অন্য এক ভাবনায় বাঙালির হালখাতা উৎসব মানেই মিঠাই-ম-া আর জিলাপি, অমৃত্তি, রসগোল্লা আর ফুলকো লুচির সমাহার। বৈশাখী উৎসব শুধু বাঙালির উৎসব নয়- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাংমা, তঞ্চঙ্গা, গারো,  সাঁওতালসহ সবার কাছেই প্রিয় উৎসব। সবাই নিজস্ব ঐতিহ্য ধারণ করে যোগ দেন মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে। বাংলাদেশের পাহাড়ে পাহাড়ে বৈশাখ ঘিরে শুরু হয় ‘বিষু’ পর্ব। ২৯ চৈত্র রাত থেকে বৈশাখের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত ওই উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে মহাধুমধামে খাওয়া হয় চিড়া-মুড়ি-দই। চাকমাদের কাছে এ পর্বের নাম ‘বিজু’, অসম বা অহোমিয়াদের কাছে ‘বিহু’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘বৈসু’, বোমরাদের কাছে ‘কুমঠার’, খুমিদের কাছে ‘সাংক্রাইন’, রাখাইনদের কাছে ‘সাংগ্রাইন’ ও তঞ্চঙ্গাদের কাছে ‘বিষু’।


নববর্ষ উৎযাপিত হয় পৃথিবীর দেশে দেশে। নববর্ষ নিয়ে সংস্কার বা কুসংস্কারেরও অভাব নেই। ইংল্যান্ডবাসী মনে করেন, বছরের প্রথম দিন যে মানুষের সঙ্গে দেখা হবে তার মাথার চুল যদি লাল হয়, তিনি যদি অসুন্দর নারী হন তাহলে ওই বছরটি হবে অবশ্যই দুর্ভাগ্যের। কালো চুলের অধিকারী কোনো মানুষ কিংবা রুটি, টাকা অথবা হাতে লবণ নিয়ে আসা কারো সঙ্গে প্রথম দেখা হলে বুঝতে হবে তার জন্য বছরটি হবে আনন্দঘন। ইংল্যান্ডের ছেলেমেয়েরা নববর্ষে কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রতিবেশীদের বাড়িতে গান গাইতে গাইতে যায়। প্রতিবেশীরা তাদের হাতে আপেল, মুখে মিষ্টি, পকেটে ভরে দেয় পাউন্ডের চকচকে মুদ্রা। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, ইংল্যান্ডের অনেক মেয়ে ভোরের প্রথম প্রহরে ডিমের সাদা অংশ ছেড়ে দেয় পানিতে সুপাত্রের সঙ্গে বিয়ে হবে বলে। লন্ডনবাসী ট্রাফালগার স্কয়ার অথবা পিকাডেলি সার্কাস-এ সমবেত হয়ে বিগবেন-এর ঘণ্টাধ্বনি শোনেন, স্বাগত জানান নববর্ষের, প্রার্থনা করেন গ্রেট বৃটেনের সমৃদ্ধির জন্য। সমুদ্র ও নদী বন্দরে নোঙর করা জাহাজে বাজতে থাকে নববর্ষের আগমনী বার্তা।


জাপানিজরা জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন নববর্ষ হিসেবে উদযাপন করেন। শহরের সব দোকান, অফিস-আদালত বন্ধ করে তারা পরিবারের সবাইকে নিয়ে উদযাপন করেন জাপানিজ লোকসংস্কৃতির আমেজে। দড়ি দিয়ে খড়কুটো বেঁেধ ঘরের সামনে তারা ঝুলিয়ে দেন ভূত-প্রেত ও শয়তানের গৃহে প্রবেশ বন্ধ হবে বলে। নববর্ষটিকে জাপানিজরা বলেন ‘উশাগাটুসু’। সিন্টো ধর্মের মানুষ বছরের প্রথম দিন প্রার্থনা করে সুখ ও সৌভাগ্যের প্রত্যাশায়। কোরিয়ানরা নতুন বছরটিকে বলে ‘সোল-নাল’। নতুন কাপড় পরে শিশুরা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে আশীর্বাদের প্রত্যাশায়। তারা ‘টুক্কক’ নামক সুপ খায় চালের পিঠা দিয়ে। তাদের বিশ্বাস, সুপ খেলে বয়স বাড়ে। অনেক কোরিয়ান বয়সের হিসাব করেন নববর্ষ ধরে, জন্মের হিসাবে নয়।


আমেরিকায় আতশবাজি ও নাচ-গানের মধ্যে নিউ ইয়র্ক-এর টাইম স্কয়ারে নববর্ষের প্রতি স্বাগত জানায় উৎফুল্ল মানুষ। গাড়িতে হর্ন বাজানো হয় এবং সমুদ্র বন্দরে জাহাজের সাইরেন বাজানো হয় নাবিকদের যাত্রা শুরু হবে বলে। দক্ষিণ আমেরিকায় মধ্যরাতে নববর্ষের প্রথম প্রহরে বাড়ির জানালা দিয়ে ঘরের নোংরা পানি ছুড়ে মারা হয় যেন গত বছরের সব অশুভ শক্তি বহিষ্কার হয়ে যায়। পর্তুগিজরা রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২টি আঙুর খান আগামী ১২ মাস যেন খেয়ে-পরে সুখে-শান্তিতে কাটে। বলিভিয়ায় বাড়ির আঙিনায় কাঠের পুতুল সাজিয়ে রাখা হয় যেন বছরটি ভালোভাবে কাটে। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে নববর্ষে একে অন্যের গায়ে পানি ছুড়ে দেয়া হয়। ওই পানিতে ভিজে যাওয়ার অর্থ আত্মশুদ্ধির অভিযান। চীনের মানুষ নববর্ষে ড্রাগন ও সিংহের প্রতীক নিয়ে নাচ-গান করে। ড্রাগন হচ্ছে দীর্ঘায়ু ও সিংহ বীরত্বের প্রতীক।


কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে নববর্ষ পালিত হয় বাংলা নববর্ষের কাছাকাছি সময়। বাংলাদেশে নববর্ষ ঘিরে দুটি অনুষ্ঠান পালিত হয়- চৈত্র সংক্রান্তিতে ভূত-প্রেত ও অপদেবতা তাড়ানোর সংস্কৃতি এবং নববর্ষ উদযাপন। বাংলাদেশে আরো দুটি উৎসব পালিত হয়। তা হলো মহরমের তাজিয়া মিছিল ও জন্মাষ্টমীর মিছিল। দুটি মিছিলই প্রধানত ধর্মীয় অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। বৈশাখের শোভাযাত্রা অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন সংস্কৃতির অঙ্গ।
বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা এমন বিরল একটি সাংস্কৃতিক মিছিল যার নয়ানাভিরাম রূপ, মিছিলকারীদের পোশাক, চিত্রকলার উৎকর্ষ, চারুকলার রচনাশৈলী পুরো বিশ্বে অনন্য। বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষবরণ শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার রূপান্তরের স্বপ্ন দেখার কারিগর ও আমার অগ্রজতুল্য মাহবুব জামাল শামিম। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল, কেন বর্ষবরণ মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা যশোর থেকে এবং তা ঢাকা থেকে কেন নয়?
উত্তরে মাহবুব জামাল শামিম বলেন, ‘‘চারুশিল্পের চর্চা ও আন্দোলন চিরকাল রাজধানীকেন্দ্রিক কেন থাকবে? আমাদের প্রজন্ম আকাক্সক্ষা করেছিল দেশজুড়ে শিল্প চর্চার প্রসার ঘটবে- জেলায় জেলায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

এরই সূচনা হিসেবে প্রতীকীভাবে জেলা শহর যশোরে ‘চারুপীঠ’ নামে শিল্পের চর্চা, গবেষণা ও সমাজিকায়ন প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আমরা অনুভব করেছিলাম শিশুরাই শিল্পের বীজ বপনের উত্তম ক্ষেত্র। তাই চারুপীঠের প্রথম কর্মসূচি হলো বিশাল কলেবরে শিশুদের আঁকা-গড়ার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ওই বিদ্যালয়ের প্রাণবন্ত শিশুদের নিয়ে আনন্দময় মঙ্গল শোভাযাত্রা উদ্ভাবন, স্বাধীন বাঙালির জীবনে নতুনভাবে শিল্প ও ঐতিহ্য চর্চার পথ সূচিত হলো। ঢাকার বাইরে থেকেও যে কোনো শিল্প আন্দোলনের উদ্যোগ নেয়া যায় এবং সেটি সারা দেশে গ্রহণযোগ্য হয় তা প্রমাণিত হয়ে যায়। মঙ্গল
শোভাযাত্রা আজ জাতীয় উৎসবে পরিণত এবং আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত হয়েছে।”
বর্ষবরণ মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির জীবনে শিল্প চর্চা আর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সার্থক উৎসব উদ্ভাবন- কোন অনুভূতি আপনাকে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
উত্তরে শামিম বলেন, ‘ আমাদের বাঙালি জীবন আচরণে আঁকা, গড়া, নৃত্য, গীত, বাদ্য, আনন্দ, ঐতিহ্য উৎসব ফিরিয়ে আনার পথ কী হতে পারে তা নিয়ে আমরা ভাবনায় ছিলাম। তখনকার সমাজ শিল্পবিবর্জিত, ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত অচলায়তন। কেউ নাচতে জানে না, প্রাণখুলে গাইতে পারে না, মনের মতো সাজতে পারে না, গুণহীন জড়তায় বন্দিদশা। স্বাধীন বাংলাদেশের সবাই যেন রাজা হতে পারে এমন উৎসব চেয়েছিলাম। উৎসব ঘিরে শিল্পীকুলের বিশাল সৃষ্টিশীল ব্যস্ততা সৃষ্টি করে হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার এক মহাউৎসব চেয়েছিলাম। চিরকালের চেনা ছবি, মঞ্চে কয়েকজন নৃত্য, গীত করেছে আর বাকি সবাই ¯্রােতা দর্শক.... তা আর নয়। আমাদের এ নতুন উৎসবে সবাই রাজা-রানি, রাজকুমার-রাজকুমারী, নায়ক-নায়িকা, ফুল-পাখি, প্রাণী-পতঙ্গ, সরীসৃপ, যা ইচ্ছা তা-ই, সবাই অভিনেতা। অপরূপ সাজে কৌতুক উল্লাসে নাচবে, গাইবে, উপস্থাপন করবে নানান দৃশ্যপট। ঢাক-ঢোল-সানাইয়ের সুর তালে আপ্লুত হয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা, শিশু তারুণ্য ফিরে পেয়ে জেগে উঠবে, নেচে উঠবে। এ উৎসব যাপিত জীবনে সব শিল্পের চর্চা প্রতিষ্ঠা করবে। ঐতিহ্যের সব রঙ-রূপ ধারণ করবে। জড়তামুক্ত, গুণী, রসিক প্রাণখোলা রঙিন উপভোগ্য বাঙালি জীবনের অভিযাত্রা বর্ষবরণ শোভাযাত্রা। এমন সব অনুভূতি থেকে ১৯৮৫ সালে যশোরের সব সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে চারুপীঠ ওই সামাজিক মহাউৎসব রীতির জন্ম দিয়েছিল। মুকুট-মুখোশ, লোকশিল্পের নানান মোটিফের ওই উৎসব রীতি প্রতি বছর উন্নতি সাধনের মাধ্যমে পরে ১৪০০ ও ১৪০১ বঙ্গাব্দ বরণ উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা সফলতার চূড়ান্ত মাত্রা পেয়েছিল।’

১৯৮৯-৯০ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিলগ্নে আপনার উদ্যোমী দিনগুলো দেখার মতো ছিল। এ সম্পর্কে বলুন ‘হ্যাঁ, উৎসব দেশময় ছড়িয়ে দেয়ার মিশন নিয়েই এসেছিলাম রঙ-রূপের উৎসবের আগুন জেলে দিতে।’ আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ১৯৯০ সালে ময়মনসিংহ ও বরিশালেও মঙ্গল শোভাযাত্রা সংগঠিত হয়েছিল। তা কীভাবে, ‘চেয়েছিলাম চারুকলার শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ অঞ্চলে ওই উৎসবের আলো ছড়িয়ে দিক। আমিও ১৯৮৯-৯০ সালে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রার মোড়ল ছিলাম না। ঢাকা চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা সংগঠিত করে দিয়েই যশোরে নিজের অঞ্চলে পঞ্চম ও ষষ্ঠতম শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ফিরে গিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত বাঙালি উৎসবের দুর্গ হিসেবে যশোরেই গড়ে তোলার ধারাবাহিক সাধনা অব্যাহত রেখেছি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে কারা ভূমিকা নিয়েছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তরে  শামিম জানান, ‘তরুণ ঘোষ, শিশির ভট্টাচার্য, নিসার হোসেন, হীরণ¥য় চন্দ, ফজলুল করিম কাঞ্চন বাঙালি মুখোশের ধরন ও বাঙালি নকশা সচেতনতা গড়ে দিয়েছিলেন। সাইদুল হক জুইস পেপার ফোল্ডিং মুখোশে যুক্ত করে মঙ্গল শোভাযাত্রায় আধুনিক ও আশ্চর্য সুন্দর মাত্রা তৈরি করেছিলেন। পরে মাহবুবুর রহমান যোগ দিয়েছিলেন।’


প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলায় জেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রার কিছুটা ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
শামিম জানান, ‘হ্যাঁ। তা না হলে একঘেয়ে হয়ে যায়, শিল্প থাকে না। নড়াইলে শিল্পী এসএম সুলতানের বজরা নৌকাটির সঙ্গে শত শত নৌকা নকশা পরিকল্পনা করে চিত্রার বুকে পানিপথে মঙ্গল শোভাযাত্রার রেওয়াজ যদি হয় তাহলে কেমন হবে বুঝে নেন? জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে চলমান থিয়েটার, নৃত্য ও লোকফর্মের নানান পারফর্মিং সহযোগে বিচিত্র ভাবনা নিয়ে শোভাযাত্রা করার সুযোগ রয়েছে। ওই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মকা- চোখে পড়ার মতো। সব অঞ্চলেরই একটু আলাদা মেজাজে হওয়ার সুবিধা তো থাকেই।’হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা মাস গ্রেগরীয় পঞ্জিকার এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে গনণা করা হতো। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– ও ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পালিত হতো। নববর্ষ তখন আর্তব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুষ্ঠুতা প্রণয়নের জন্য মোগল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কারের আদেশ দেন। ওই সময় বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে কার্যকর হয় ১৫৫৬ খৃস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে স¤্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময়। প্রথমে নাম দেয়া হয় ফসলি সন, পরে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ।

জেমস কেমেরন

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্ক

 

টাইটানিক মানেই একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া নয়, নয় জ্যাক আর রোজের প্রেম কাহিনী। বিশাল টাইটানিক সম্পর্কে আমাদের যেটুকু ধারণা এর সিকি ভাগই জন্ম দিয়েছে জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরনের সিনেমা।
তার জীবনের গল্পটিও অনেকটা চিত্রনাট্যের মতোই। জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৬ আগস্ট কানাডার অন্টারিও-তে। তার ছোটবেলা কেটেছে কানাডার ছোট্ট একটি শহরে। শহরের তীর ঘেঁষে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি নদী। সেখানে রোজ খেলতেন তিনি। নায়াগ্রা জলপ্রপাত ছিল মাত্র চার বা পাঁচ মাইল দূরে। তাই পানির সঙ্গে তার একটা ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল যা কাজেও বার বার উঠে এসেছে। জেমস ক্যামেরনের মা ছিলেন গৃহিণী আর বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। মায়ের সঙ্গে দেখে আসা জাদুঘরের বিভিন্ন স্মারকের অবয়ব- সেটি হোক না পুরনো কোনো যোদ্ধার হেলমেট কিংবা মিসরীয় কোনো মমি। এসব কিছু ক্যামেরনকে আবিষ্ট করে রাখত। আবার প্রকৌশল চর্চাতেও আকর্ষণ ছিল প্রচ-। হতে পারে বাবার সম্মান ও পছন্দ ধরে রাখার জন্য এটি একটি চেষ্টা ছিল জেমস ক্যামেরনের পরিবার ১৯৭১ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসে তখন তার বয়স ১৭ বছর। সেখানে তিনি ফুলারটন কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে ভর্তি হন। একাদশ গ্রেডের সময় তার জীবনের জন্য

গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ম্যাকেঞ্জি ঠিক করলেন স্কুলে একটা থিয়েটার বানাবেন। স্কুলে রেসলিং, ফুটবল, বাস্কেটবলের আয়োজন থাকলেও থিয়েটার ছিল না। ক্যামেরন ওই থেকেই কাজ শুরু করলেন। পুরোটাই ছিল একটি চ্যালেঞ্জ এবং সফলও হয়েছেন। সেটি সম্ভব করেছিলেন ম্যাকেঞ্জি। এটিই তার অভিনব একটি বৈশিষ্ট্য। এ জন্যই জীবনের সঠিক সময় এমন কিছু ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য যারা জীবন বদলে দেবেন, ভাবনাটি এগিয়ে নিয়ে যাবেন। ছাত্র হিসেবে তিনি ভালোই ছিলেন। তার ছিল জানার প্রতি তীব্র আকর্ষণ। কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পড়াশোনা হয়নি যে কাউকে টপকে ভালো করতে হবে! তিনি জানতে ও শিখতে চাইতেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত- সবকিছু। কিন্তু সেখানে বেশিদিন টিকতে পারলেন না। এক বছর যেতে না যেতেই ড্রপ আউট হয়ে গেলেন কলেজ থেকে।


এরপর জেমস ক্যামেরন ট্রাক ড্রাইভারের কাজ ও লেখালেখি করতেন। ওই সময়টাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সায়েন্স ফিকশন পড়েছেন যা বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝের রেখাটি ধীরে ধীরে অস্পষ্ট করে তুলেছে তাকে। বই আর লেখকদের অভিনব জগৎ তাকে অদ্ভুতভাবে টানতো। আর্থার ক্লার্ক, জন ভগট, হারলান এলিসন, ল্যারি নিভেনদের মাধ্যমে তিনি প্রভাবিত হয়ে যান আস্তে আস্তে। জেমস ক্যামেরনকে সবার থেকে আলাদা বানিয়ে দেয় চারপাশের পরিবেশ ও নিজের অভিনব ক্ষমতা। জীবনের ১০টি বছর এমনভাবে কাটিয়েছেন যেখানে তাকে শুনতে হয়েছে অনেক কটাক্ষ কথা। এরপরের ২৫ বছর তার চেষ্টা ছিল শুধু নিজেকে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করা। সফলতা সেখানে সামান্যই এসেছে। যতো পরিশ্রম করবে ততোই ভাগ্য তোমার সহায় হবে। দীর্ঘ পথের অর্জনে ‘সুযোগ’ বড় কোনো কিছু নয়। কিন্তু একটি মাত্র সুযোগ সবকিছু বদলে দিতে পারে। ২৫-২৬ বছর বয়সে ঠিক করলেন ছবি বানানো নিয়ে অগ্রসর হবেন। নিজেকে ভাবতে লাগলেন ছবি বানানোর কারিগর হিসেবে, পরিচালক হিসেবে নয়। এরপর ১৯৭৭ সালে একটি ঘটনা ক্যামেরনের জীবন পুরোপুরি পাল্টে দিল। যে ছবিগুলোর তেমন কোনো বাধাধরা প্যাটার্ন নেই সেগুলোই তার পছন্দের তালিকায় এসে হাজির হয়। তিনি দেখলেন, নিয়ম-কানুন তার জন্য ঠিক কাজ করে না। যেখানে অনেক হাঙ্গামা থাকবে, শব্দ থাকবে, অস্থিতিশীলতা থাকবে, পরিপূর্ণ কিছু নয়- সেখানেই তো নিজেকে উপস্থাপনের সুযোগ মেলে। যদি সবকিছু আগে থেকেই প্রস্তুত কিংবা টিপটপ হয়ে থাকে তাহলে জাদুকরী কোনো কিছু উপহার দেয়ার জন্য দরজাটা খোলা যায় না।

পরিচালকের মন থেকে মোহনীয় জাদুর স্পর্শটি প্রতিফলিত হয় না। এটি আসে অভিনয় কুশলীর আত্মার মধ্য থেকে। তিনি আন্দোলিত হয়েছেন ‘উডস্টক’, ‘দি গ্র্যাজুয়েট’, ‘বান অ্যান্ড ক্লাইড’, ‘দি গডফাদার’, ‘স্টার ওয়ারস’ প্রভৃতি ছায়াছবি থেকে। এসব চলচ্চিত্র দেখে বুঝতে পারলেন শিল্প ও বিজ্ঞান কতোটা কাছাকাছি থাকতে পারে! এরপর ট্রাক ড্রাইভারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন চলচ্চিত্রের দিকে। ক্যামেরন দুই বন্ধুকে নিয়ে ১০ মিনিটের একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘জেনোজেনেসিস’ (ঢবহড়মবহবংরং)-এর স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললেন। কিন্তু শুট করার মতো যথেষ্ট টাকা তাদের হাতে নেই। শেষ পর্যন্ত বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে চাঁদা তুলে ৩৩ মিলিমিটার ক্যামেরা, লেন্স, ফিল্ম স্টক ও স্টুডিও ভাড়া করে ফেললেন। তারা ক্যামেরাটি পুরোটা খুলে এর বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখলেন এটা বোঝার জন্য যে, ফিল্ম ক্যামেরা কীভাবে কাজ করে।


ছবি বানানোর কথা শুনে ক্যামেরনের পরিবার কখনোই তেমন সন্তুষ্ট হয়নি। বাবা নারাজ ছিলেন। তিনি আসলে ক্যামেরনের ব্যর্থ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। যেই মুহূর্তে ক্যামেরুন জানাবেন যে, ‘আমার আসলে প্রকৌশলী’ হওয়াই উচিত ছিল। মা অবশ্য অনেক আগে থেকে এ ধরনের সৃষ্টিশীল শিল্পের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তাই আশ্চার্য এক গতি ছিল সেখানে যা তাকে দীর্ঘ সময়েও ওই পথ চলতে সাহায্য করেছিল। অবশ্য তা দেখতে পাওয়া ছিল দুষ্কর।
জেমস ক্যামেরন ছিলেন জেনোজেনেসিস-এর পরিচালক, লেখক, প্রযোজক ও প্রডাকশন ডিজাইনার। এরপর ‘রক অ্যান্ড রোল হাই স্কুল’ চলচ্চিত্রে কাজ করেন প্রডাকশন সহকারী হিসেবে। কিন্তু ওই কাজের জন্য তিনি কোনো স্বীকৃতি পাননি। তবুও থেমে না গিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর কায়দা-কানুন নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। রজার কোরম্যান স্টুডিওতে একটি ক্ষুদ্র আকৃতির মডেল বানানোর কাজ শুরু করেন সে সময়। এরপর ১৯৮১ ও ১৯৮২ সাল- এই দু’বছরে চারটি চলচ্চিত্রে আর্ট ডিজাইনার, প্রডাকশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন।


জেমস ক্যামেরনের পরিচালিত চলচ্চিত্র ৭টি। পিরানহা মুভির সিক্যুয়াল ‘পিরানহা ২’-তে কাজ করার জন্য ইটালির রোমে যান। সেখানে ফুড পয়জনিংয়ের কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় একদিন রাতে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেন। তা হলো ভবিষ্যৎ থেকে একটি রোবট পাঠানো হয়েছে তাকে খুন করার জন্য। ওই স্বপ্ন থেকেই তিনি তার ‘দ্য টারমিনেটর’ চলচ্চিত্রের আইডিয়া পান। বলা যায়, এখান থেকেই তার উত্থান শুরু। টাইটানিকের আয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয় অ্যাভাটার। ১৪টির মধ্যে ১১টি ক্যাটাগরিতেই একাডেমি পুরস্কার বা অস্কার জিতে নেয় সিনেমাটি। জেমস ক্যামেরন পান সেরা পরিচালকের পুরস্কার। টাইটানিক সিনেমার জ্যাকের মতোই ক্যামেরন অস্কারের মঞ্চে উঠে বলেছিলেন, I am the king of the World!
অ্যাভাটারের ওই জনপ্রিয়তার কারণে ২০১০ সালে হলিউডের সবচেয়ে বেশি আয় করা পরিচালকদের মধ্যে এক নম্বরে চলে আসেন জেমস ক্যামেরন। তার সম্পর্কে সমালোচকদের প্রধান যে অভিযোগ তা হলো, তার লেখা স্ক্রিপ্টগুলোর কাহিনীর গভীরতা কম। তবে যে ধরনের সিনেমা তিনি তৈরি করেন সেখানে কাহিনীর গভীরতা থাকা হয়তো অতো আবশ্যকও নয়। কিন্তু পরিচালক হিসেবে তার সমালোচক খুব বেশি নেই। অভিনয় শিল্পীদের কাছ থেকে ষোলো আনা কাজ আদায় করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। এই কারণে তার সঙ্গে কাজ করা অনেকের কাছেই দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি শুটিং শুরু হওয়ার আগে সবার মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখতে বলেন যাতে তা কাজে বিঘœ ঘটাতে না পারে। সিনেমাটি বাস্তবসম্মত করার জন্য জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা বোধ করেননি তিনি। নিজের কাজে ডুবে থাকার কারণে পরিবারকেও সময় দিতে পারেননি বেশি একটা।

ফলে সংসারও ভেঙে গেছে তার। তাও একবার নয়, পাঁচবার! তবুও তিনি থেমে নেই। নাসার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জেমস ক্যামেরন। লাল গ্রহ মঙ্গলের গায়ে এখন এলিয়েন গ্রহের তকমা নেই। মঙ্গলই হবে আমাদের আগামীর গ্রহ। সাধারণ মানুষ যারা মহাকাশের গোপন রহস্য বোঝে না তারাও আজ মঙ্গলে মানুষের প্রতিনিধি দেখে খুশি হয়। কল্পনা এখন তাদের চোখের সামনে বাস্তবতা! মানুষ স্বপ্ন দেখতো আকাশ ছোঁয়ার। ওইসব ক্ষুদ্র মানুষের স্বপ্ন এখন মহাকাশে বসবাস।
ক্যামেরন ৬২ বছর বয়সেও যেভাবে এগিয়ে চলেছেন এতে মনে হয়, ওই স্বপ্নের বাস্তবতা অসম্ভব কিছু নয়। হলিউডে আরো অনেক দিন চলবে তার রাজত্ব- এটি নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়।

দ্য বেস্ট বন্ড : রজার মুর

ঋভু অনিকেত

 

চলচ্চিত্রে অভিনয় করে যেমন মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন তেমনি ব্যক্তি বা সামাজিক জীবনেও মানুষকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি আর কেউ নন- জেমস বন্ড খ্যাত রজার মুর। যুক্তরাজ্যের স্টকওয়েল-এ ১৯২৭ সালের ১৪ অক্টোবর রজার মুরের জন্ম। তার পিতা জর্জ আলফ্রেড মুর পুলিশ অফিসার ছিলেন। ভারতের কলকাতায় এক ব্রিটিশ পরিবারে তার মা লিলিয়ান জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কারণে রজার মুরকে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করতে হয়েছে। তিনি একটি অ্যানিমেশন স্টুডিওতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু কাজে ভুল করায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পুলিশে চাকরির সুবাদে একটি ডাকাতির কেইস তদন্ত করতে গিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক ডেসমন্ড হার্স্ট-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার বাবা আলফ্রেড-এর। তার বাবার অনুরোধে হার্স্ট ‘সিজার অ্যান্ড ক্লিওপাট্রা’ মুভিতে রজার মুরকে ছোটো একটি এক্সট্রা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন। সেটি ছিল ১৯৪৫ সাল।

ডেসমন্ড হার্স্টের উৎসাহে ও আর্থিক সহায়তায় রয়েল একাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্টে ভর্তি হন রজার মুর। সেখানেই পরিচয় ঘটে পরবর্তীকালে তার সঙ্গে জেমস বন্ড মুভিতেসহ অভিনেত্রী হিসেবে মিস হানি পেনির চরিত্রে অভিনয় করা লুইস ম্যাক্সওয়েল-এর সঙ্গে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনীর সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন তিনি। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদ পর্যন্ত পদোন্নতি লাভ করেছিলেন রজার মুর। শুরুতে ‘পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স’ (১৯৪৫), ‘সিজার অ্যান্ড ক্লিওপাট্রা’ (১৯৪৫), ‘পিকাডেলি ইনি সডেন্ট’ (১৯৪৬)-এর মতো চলচ্চিত্রে তিনি কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে প্রিন্ট মিডিয়ায় মডেল হিসেবেও কাজ করেছেন কিছুদিন। ১৯৪৯ সালের ২৭ মার্চে ‘দি গভর্নেস’-এর মাধ্যমে তার টেলিভিশনে অভিনয় জীবন শুরু হয়।


আত্মবিশ্বাসী ও আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী রজার মুর ১৯৫৩ সালের দিকে আমেরিকায় পাড়ি দেন। সেখানে টেলিভিশনে অভিনয় জীবন শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে ‘দি লাস্ট টাইম আই সি প্যারিস’ চলচ্চিত্রে একটা ক্ষুদ্র চরিত্রে অভিনয় করার জন্য বিশ্ব বিখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেট্্েরা গোল্ডিন মেয়ারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। টেলিভিশন সিরিজ ‘দি সেইন্ট’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সারা বিশ্বে রজার মুরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু হয়ে টেলিভিশন সিরিজ
দি সেইন্ট’-এর ১১৮টি অ্যাপিসোড প্রচারিত হয়। এর জোয়ার আমাদের দেশেও লেগেছিল। এটি সত্তরের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনও প্রচার করে। ছবিটি তখনকার তরুণদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর ‘পারসুয়েডার্স’ (১৯৭১) সিরিজটিও বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচারিত হতো। আমরা এসব সিরিজ দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। এভাবে তিনি বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হন। এছাড়া ‘আইভান হো’ (১৯৫৮), ‘দ্য আলাস্কান’ (১৯৫৯) টিভি সিরিয়ালে অভিনয় করেন তিনি।
রজার মুর দীর্ঘদিন ধরে টেলিভিশন সিরিজ ‘দি সেইন্ট’-এ অভিনয় করার কারণে চলচ্চিত্র থেকে দূরে ছিলেন। তাছাড়া ‘দ্য সেইন্ট’-এর প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও ব্যস্ত ছিলেন তিনি। জেমস বন্ড চরিত্রে অভিনয়কারী আরেক বিখ্যাত অভিনেতা শ্যন কনেরি। ‘বন্ড’ হিসেবে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে এসে ঘোষণা দিলেন, বন্ড চরিত্রে আর অভিনয় করবেন না। এরপরও ১৯৭১ সালে বন্ড সিরিজ ‘ডায়মন্ডস আর ফরএভার’ মুভিতে অভিনয় করেন শ্যন কনেরি। রজার মুরকে এ সময় জেমস বন্ড সিরিজের ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ মুভিতে অভিনয় করার প্রস্তাব দেয়া হয়। ১৯৭৩ সালে ওই মুভি মুক্তি পায়। রজার মুর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘এই মুভিতে অভিনয় করার জন্য আমাকে চুল ছোট করতে হয়েছে, ওজন কমাতে হয়েছে।’


শ্যন কনেরি অভিনীত শেষ মুভি ‘ডায়মন্ডস আর ফরএভার’-এর জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে যায় ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’। এরপর রজার মুরকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মাঝখানে ‘শার্লক হোমস ইন নিউ ইয়র্ক’ (১৯৭৬) মুভিতে তিনি অভিনয় করেন। আর তিনিই একমাত্র অভিনেতা যিনি ‘জেমস বন্ড’ ও ‘শার্লক হোমস’- দুটি বিখ্যাত গোয়েন্দা বা থ্রিলার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৪ সালে নির্মিত হয় রজার মুর অভিনীত ‘জেমস বন্ড’-এর দ্বিতীয় মুভি ‘দি ম্যান উইথ গোল্ডেন গান’। এটি ব্যবসা সফল হলেও ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’কে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। এরপরের মুভি ‘দ্য স্পাই হু লাভড মি’ (১৯৭৭) বক্সঅফিসে সুপার-ডুপার হিট হয়। বন্ড চরিত্রে তার চতুর্থ মুভি ‘মুনরেকার’। এটিও ব্যবসা সফল হয়। ১৯৮১ সালে ‘ফর ইওর আইজ অনলি’ মুভি যখন মুক্তি পায় তখন তার বয়স ৫৪ ছাড়িয়ে গেছে। নতুনদের জন্য বন্ড চরিত্র ছেড়ে দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। তখন জেমস ব্রুলিন-কে ডাকা হলেও সুযোগ পাননি। তাই ১৯৮৩ সালে রজার মুরকে ‘অক্টোপুসি’ মুভিতে অভিনয় করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে ‘এ ভিউ টু কিল’ মুভিতে অভিনয়ের মাধ্যমে বন্ড চরিত্র থেকে তিনি বিদায় নেন। তিনিই একমাত্র অভিনেতা যিনি ১২ বছর ধরে টানা বন্ড চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই সময় তিনি সাতটি বন্ড মুভিতে অভিনয় করেন যা ছিল শ্যন কনেরির সমান।


রজার মুরই ছিলেন সবচেয়ে বেশি বয়সে বন্ড চরিত্রে অভিনয়কারী একমাত্র ব্যক্তি। ৪৫ বছর বয়সে ’লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ দিয়ে শুরু। ১৯৮৫ সালে যখন বন্ড চরিত্র থেকে অবসর নেন তখন তার বয়স ছিল ৫৮ বছর। জেমস বন্ড চরিত্র থেকে অবসর গ্রহণ করার বিষয়ে রজার মুরই বলেছেন, ‘বন্ডের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য ৫৭ বছর খুব বেশি বয়স। আমার বিপরীতে যারা নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছেন, তাদের অনেকেই আমার মেয়ের বয়সী। তাদের সঙ্গে রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করা বেমানান।’
‘জেমস বন্ড’ মুভিতে অভিনয় করার পাশাপাশি রজার মুর অন্য চলচ্চিত্রেও অভিনয় চালিয়ে গেছেন। ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ মুভির পর পরই উইলবার স্মিথের উপন্যাস অবলম্বনে ও পিটার হান্টের পরিচালনায় ’গোল্ড’ (১৯৭৪) মুভিতে অভিনয় করেন। এটি প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই মুভির পারিশ্রমিক ছাড়াও তাকে এর লভ্যাংশ থেকে অতিরিক্ত দুই লাখ ডলার সম্মানী প্রদান করা হয়। সাফল্য যেমন আছে তেমনি ব্যর্থতাও আছে। ১৯৭৫ সালে একটি কমেডি মুভি ‘দ্যাট লাকি টাচ’-এ অভিনয় করেন রজার মুর। তা ছিল সুপার ফ্লপ।


রজার মুরের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প : ১৯৪৬ সালে রজার মুরের বয়স যখন ১৮ বছর তখন তার চেয়ে ৬ বছর বেশি বয়সের ডর্ন ভন স্টেইন-কে বিয়ে করেন। জেমস বন্ড চরিত্রে বাঘা বাঘা ভিলেনকে কুপোকাৎ করা রজার মুরকে ওই ভদ্রমহিলা মারধর করতেন। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে গায়িকা ডরোথি স্কয়ার্স-কে বিয়ে করেন রজার মুর। তিনিও রজার মুরের চেয়ে ১২ বছরের বড় ছিলেন। ১৯৫৩ সালে রজার মুর ও স্টেইনের বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। রজার মুর এ সময় স্কয়ার্সসহ নিউ ইয়র্ক পাড়ি জমান। কিন্তু বয়সের ব্যবধান আর উঠতি এক অভিনেত্রী ডরোথি প্রভিন-এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায় তাদের দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরে। তারা আবার ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসেন। অন্যদিকে ইটালির অভিনেত্রী লুইসা ম্যাটিওলি-এর সঙ্গে রজার মুরের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানতে পেরে একদিন রজার মুরের মাথায় গিটার দিয়ে আঘাত করে গিটার ভেঙে ফেলেন স্কয়ার্স। ওই ম্যাটিওলি-ই পরে রজার মুরের তৃতীয় স্ত্রী হন। রজার মুরের বিচ্ছেদের ক্ষোভে স্কয়ার্স মামলা পর্যন্ত করেন। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ম্যাটিওলি ও রজার মুর লিভ টুগেদার করেন। রজার মুরকে ওই বছর ডিভোর্স দিতে সম্মত হন স্কয়ার্স। একই বছরের এপ্রিলে ম্যাটিওলি ও রজারের বিয়ে হয়।


ম্যাটিওলি-র ঘরেই রজার মুরের তিন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তারা হলেন মেয়ে ডেবোরা এবং বড় ছেলে জিওফ্রি ও ছোট ছেলে ক্রিস্টিয়ান। ডেবোরাও জেমস বন্ড মুভি ‘ডাই এনাদার ডে’ (২০০২)-তে অভিনয় করেছিলেন। ওই মুভিতে বন্ড চরিত্রে ছিলেন পিয়ার্স ব্রুসনান। জিওফ্রিও তার বাবার সঙ্গে ‘শার্লক হোমস ইন নিউ ইয়র্ক’ মুভিতে অভিনয় করেছিলেন। আর ক্রিস্টিয়ান চলচ্চিত্র প্রযোজক। সুইডিশ বংশোদ্ভূত ক্রিস্টিনা কিকি থলস্ট্রাপ-এর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ১৯৯৩ সালে ম্যাটিওলি ও রজার মুরের ছাড়াছাড়ি হয়। তার ছেলেমেয়েরা ওই বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেনি। তারা দীর্ঘদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিল। ২০০০ সালে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ম্যাটিওলি বিয়ে বিচ্ছেদে সম্মত হন। ২০০২ সালে থলস্ট্রাপের সঙ্গে রজার মুরের বিয়ে হয়। তার ভাষায়- ‘থলস্ট্রাপ আন্তরিক, মমতাময়ী, শান্ত প্রকৃতির নারী ছিল। সে আমার আগের স্ত্রীদের চেয়ে ভিন্ন। থলস্ট্রাপই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সঙ্গেই ছিলো’।


রজার মুরকে ইউনিসেফ-এর শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ১৯৯১ সালে। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে তিনি আফ্রিকার শিশুদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করায় উদ্যোগী হন।
রজার মুরকে ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘কমান্ডার অফ দি অর্ডার অফ ব্রিটিশ এম্পায়ার’ ও ২০০৩ সালে ‘নাইট কমান্ডার অফ ব্রিটিশ এম্পায়ার’ উপাধি দেয় এবং জার্মান সরকার ২০০৫ সালে ‘ফেডারেল ক্রস অফ মেরিট’ প্রদান করে। ২০০৭ সালে যখন তার ৮০ বছর বয়সে ‘হলিউড ওয়াক অফ ফেম’ নির্বাচিত হন। এছাড়া অনেক পুরস্কার ও উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ মুভির ওপর ভিত্তি করে রজার মুরের আত্মকথা ‘রজার মুর অ্যাজ জেমস বন্ড : রজার মুরস অন অ্যাকাউন্ট অফ ফিল্মিং লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। ওই বইয়ের মুখবন্ধ লেখেন আরেক বিখ্যাত বন্ড ও রজার মুরের বন্ধু শ্যন কনেরি। রজার মুরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মাই ওয়ার্ড ইজ মাই বন্ড’ ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়। জেমস বন্ডের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তার স্মৃতিকথা ও ছবি নিয়ে ‘বন্ড অন বন্ড’ প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এ বই বিক্রির অর্থ ইউনিসেফে প্রদান করেছিলেন তিনি।


রজার মুর ছোটবেলা থেকে নানান অসুখে ভুগেছেন। ৫ বছর বয়সে নিউমোনিয়া হয়ে মরণাপন্ন হয়েছিলেন। তার কিডনি থেকে পাথর অপসারণ ও হার্টে পেসমেকার লাগানো হয়েছিল। তার প্রস্টেট ক্যানসারও ছিল। শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১৭ সালে ২৩ মে এই মহান অভিনেতা ৮৯ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। রজার মুর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি অন্য বন্ডদের মতো খুনি চরিত্রের নই, মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য হাসি-আনন্দে অভিনয় করে গিয়েছি।’ সত্যি তা-ই। তিনি অভিনয় জীবনে ও এর বাইরে মানুষকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টাই করে গেছেন নিরন্তর।

ঘোরের ভেতর ঘোরে

La La Land

তিয়াষ ইসতিয়াক

 

হলিউডের প্রবল বাস্তববাদী সমালোচক-দর্শক কিংবা উচ্চ হাই টেক সাই-ফাই বা কড়া অ্যাকশনে সমৃদ্ধ সিজিআইয়ে ধোয়া ঝাঁ চকচকে মুভির ভিড়ে মিউজিক্যাল ড্রামা চলচ্চিত্র আজ মৃতপ্রায়। অথচ ওই অনভ্যস্ত চোখগুলোকে সঙ্গীত নির্ভর গল্পের মাধ্যমে ড্যামিয়েন শ্যাজেল পলকহীনভাবে আটকে রাখতে পেরেছেন ‘লা লা ল্যান্ড’ মুভি দিয়ে! পঞ্চাশ-ষাটের দশকের আমেজ কী রাজকীয়ভাবেই না ফিরিয়ে এনেছেন তরুণ ওই স্বপ্নালু গল্পকার ও পরিচালক!
দুটি সরু তারের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকা দু’জনের অনিন্দ্য গল্প বলে চলে ওই মুভি। অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রেস্তোরাঁর এক ওয়েট্রেস মিয়া ডোলান। একের পর এক অডিশন দিয়েই যাচ্ছে। সবটিতেই ব্যর্থতা তার সঙ্গী।
আরেকজন সেবাস্টিয়ান ওয়াইল্ডার। জ্যাজ গানের ভক্ত গরিব পিয়ানিস্ট সে। স্বপ্ন দেখে একদিন তার নিজস্ব একটি জ্যাজের ক্লাব থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে বসিয়ে রাখে ক্রিসমাস ক্যারোলের হালকা পার্টিতে সস্তা গোছের গানের সঙ্গে পিয়ানো বাজানোয়। ক্রমেই দুটি তার স্পর্শ করে। দুটি মানুষের মধ্যে ছোঁয়া আদান-প্রদান হয়ে যায়। কতো গল্প, গান, সুর, কল্পনায় হাঁটা, স্বপ্নে বিভোর হওয়া দু’জনায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতার চোখ রাঙানিতে সুরে ছেদ আসে। ভাটা পড়ে কল্পনায় এবং স্বপ্ন ভাঙে রূঢ় জাগরণে। তারপর? এরপর আছে মুদ্রার অপর পাশটার গল্প। চোখের সামনে নদীর মতো বয়ে যাবে সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক সিকোয়েন্সে ঠাসা ফিনিশিং! কান্না পাবে খুব। গলার মধ্যে কী যেন একটি দলা পাকিয়ে থাকবে বেশ কিছুক্ষণ!

 


২০১৬ সালের সেরা সিনেমার সংক্ষিপ্ততম তালিকায় থাকা ‘লা লা ল্যান্ড’-এর রচয়িতা ও পরিচালককে নিয়ে কিছু বলা যাক। ড্যামিয়েন শ্যাজেল। বয়স মাত্র ৩২ বছর। এ বয়সেই ক্যামেরার পেছনে চমৎকার দুটি চোখ আর সৃষ্টিশীল এক মগজ নিয়ে দেখিয়েছেন মুনশিয়ানা। পড়াশোনা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। তা প্রথম প্রেম ছিল সিনেমা বানানো। কিন্তু সব সময় চাইতেন মিউজিশিয়ান হতে। মিউজিক, বিশেষত জ্যাজ মিউজিক যে বড্ড টানে তাকে তা তার মুভি হুইপ্ল্যাশ আর লা লা ল্যান্ড দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। প্রিন্সটন হাই স্কুলে পড়াকালীন জ্যাজ ড্রামার হওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন খুব। ওই সংগ্রামের অসাধারণ গল্পই সেলুলয়েডের ফিতায় আমাদের বলেছেন হুইপ্লাশ মুভির মাধ্যমে। তবে শুরুটা অনেক আগে।
ছাত্র থাকা অবস্থায় সহপাঠী ও বন্ধু জাস্টিন হারউইটজ-কে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘গাই অ্যান্ড ম্যাডেলিন অন অ্যা পার্ক বেঞ্চ’। সেটি অবশ্য বানিয়েছিলেন নিজের থিসিস প্রজেক্টের অংশ হিসেবে। এটিরও বিষয়বস্তু ছিল জ্যাজ মিউজিক। লা লা ল্যান্ডের জন্মটাও ২০১০ সালে হার্ভার্ডের ডরমেটরির ছোট্ট এক কোণে প্রিয় বন্ধু জাস্টিন হারউইটজকে নিয়েই। মাত্র ২৫ বছর বয়সে যে গল্প লিখে ফেলেছিলেন, কস্মিনকালেও কী ভেবেছিলেন ওই গল্প একদিন মানুষের চোখে চোখে ভেসে বেড়াবে!
লা লা ল্যান্ডের পথচলাটিও মিয়া আর সেবাস্টিয়ানের মতো কণ্টকাকীর্ণ। এমন একটি মিউজিক্যাল ‘সেকেলে’ ধাঁচের গল্পটি অর্থায়ন করার জন্য কোনো প্রযোজক বা স্টুডিও খুঁজে পাননি হলিউডে সদ্য পা রাখা শ্যাজেল। বুঝে গিয়েছিলেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে হলে পায়ের নিচে লাগবে শক্ত মাটি। ২০১৪ সালে বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসেন ‘হুইপ্ল্যাশ’। একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে এবার তিনি খুঁজে পান শক্তপোক্ত জমিন। এরপর আর বেগ পেতে হয়নি খুব। লা লা ল্যান্ড প্রজেক্টের জন্য এগিয়ে আসে বিখ্যাত সামিট এন্টারটেইনমেন্ট। বাকিটা ইতিহাস!

লা লা ল্যান্ডে আমাদের মুগ্ধ করে সেবাস্টিয়ান চরিত্রে রায়ান গসলিং। জাত অভিনেতা তিনি। ওই মুভির জন্য শিখলেন নাচ আর গান। টানা ২ মাস ৬ ঘণ্টা করে প্র্যাকটিস করে বশে আনলেন পিয়ানোটাও। মুভিতে পিয়ানোর প্রতিটি শট তার করা। কোনো বডি ডাবল হয়নি, দেয়া হয়নি বাড়তি ইফেক্ট। পর্দায় শ্রুতিমধুর গানগুলোও তারই গলার। ‘সিটি অফ স্টারস’ গানটি তো অস্কার, গোল্ডেন গ্লোবসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে সেরা অরিজিনাল গান হিসেবে। একই সঙ্গে দুর্দান্ত অভিনয় তো আছেই। এতো ডেডিকেশন, পারফেকশন- দেখে মনেই হয় না রায়ান ক্যারিয়ারের মাত্র মাঝামাঝি আছেন।


আরেকজন হলেন এমা স্টোন। হলিউড তার ভবিষ্যৎ দেখছে এমার হাতেই। সদ্য ২৯ বছরে পা দেয়া অসম্ভব শক্তিশালী আর মেধাবী এই অভিনেত্রী নিজেকে পুরোপুরি ঢেলে দিয়েছেন ওই মুভিতে। ২০১৪ সালের মুভি ‘বার্ডম্যান’-এর জন্য প্রায় সব কয়টি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তখন। তবে শিকে ছেঁড়েনি ভাগ্যে। এবার লা লা ল্যান্ড দিয়ে সব উসুল করে নিয়েছেন। অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, ব্রিটিশ একাডেমি, অস্ট্রেলিয়ান একাডেমিসহ বেশকিছু সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার হাতে নিয়েছেন ওই আমেরিকান সুন্দরী। আগের সব সুঅভিনয় এবার এই মুভি দিয়ে ভেঙে-চুরে দিয়ে দাঁড়িয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়। মিয়া চরিত্রে আর কাউকে আসলে ভাবাই যায় না! রায়ান-এমা জুটির তৃতীয় মুভি হলো লা লা ল্যান্ড। ‘ক্রেইজি, স্টুপিড লাভ’ ও ‘গ্যাংস্টার স্কোয়াড’-এর পর এবার মহাসফল ওই মিষ্টি জুটি। একে অন্যকে চূড়ান্ত সাপোর্ট দিয়ে সুন্দর এক গল্পের মুভিটিকে প্রাণ দিয়েছেন দু’জন। অথচ ওই মুভির জন্য পরিচালক শ্যাজেলের প্রথম পছন্দ ছিল মাইলস টাইলার ও এমা ওয়াটসন!


ওই মুভিতে আরো ছিলেন জনপ্রিয় গায়ক জন লিজেন্ড সেবাস্টিয়ানের বন্ধু কিথ চরিত্রে। ছোট্ট একটি চরিত্রে ছিলেন হুইপ্ল্যাশের ওই ক্ষেপা মিউজিক টিচার জে কে সাইমন্স। লা লা ল্যান্ডের প্লট হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটিকে। এটি মুভির নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে। লস অ্যাঞ্জেলেস (খ. অ.) হাজার গল্পের এক শহর। এ শহরে আছে বৈচিত্র্য। আছে ট্রাফিক, আঁকা-বাঁকা হাইওয়ে, ঋতুর পরিবর্তন, ফুল-পাখি-আকাশ। আছে বিচিত্র সব মানুষ ও তাদের কা-কারখানা। আর আছে রঙ, শত-সহস্র রঙ! শ্যাজেলের মুখেই শুনি- ‘আমার কেবলই মনে হয় ওই শহরটিতে কাব্যিক কিছু একটা আছে যে শহর তৈরি হয়েছে মানুষজনের অবাস্তব সব স্বপ্ন দিয়ে এবং তারা তাদের সর্বস্ব বাজি রাখে স্বপ্নটি মুঠোয় পুরার জন্য।’ তাই বুঝি ওই মুভিতে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটিকে দেখানো হয়েছে ‘শতরূপে শতবার’!


‘মিউজিক্যাল ড্রাম’ জনরার মুভি। তাই এখানে আছে প্রচুর গান ও নাচ। পরিচালকের প্রেরণা ছিল হলিউডের বেশকিছু নিখাদ ক্ল্যাসিক সিনেমা। যেমন- ‘দি আমব্রেলাস অফ চেয়ারবার্গ’, দি ইয়াং গার্ল অফ রকফোর্ট’ কিংবা ‘ব্রডওয়ে মেলোডি ১৯৪০’, ‘সিঙ্গিং ইন দি রেইন’ বা ‘দি ব্যাড ওয়াগন’। বাস্তববাদী নাক উঁচু সমালোচকরাও মুগ্ধ হবেন চমৎকার শ্রুতিমধুর সব গানে। প্রতিটি গান কানে বাজবে অনেকক্ষণ। বিশেষ করে ‘সিটি অফ স্টারস’ কিংবা ‘অ্যানাদার ডে অফ দি সান’-এর সুর ও কথাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ওই মুভিতে গানে গানে প্রচুর গল্প বলা হয়েছে, কথা-বার্তা হয়েছে ছন্দে ছন্দে। তা মুগ্ধতা জাগায়।


দ্বৈত ও দলীয় নাচগুলো ছিল দৃষ্টিনন্দন। সিনেমার শুরুই হয়েছে এক চমৎকার ডান্স সিকোয়েন্স দিয়ে যাতে ছিল ১০০ জনেরও বেশি নৃত্যশিল্পী এবং এর শুট হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসের মহাসড়কে। মুভিতে মিয়া-সেবাস্টিয়ানের চমৎকার সব নাচের দৃশ্য দেখে মুখে একটি শব্দই আসে- ‘বাহ!’ ছয় মিনিটের প্রিয়াম কারের দৃশ্যটি করতে দুই দিন লেগেছিল। কারণ দৃশ্যটি ধারণ করতে হয়েছে দিনের ম্যাজিক আওয়ার মোমেন্ট বা সূর্যাস্তের সোনালি ঘণ্টার সময়। পুরো মুভিতে আরেকটি জিনিস পাওয়া যাবে। তা হলো রঙ। মন ভালো করে দেয়া রঙের ছড়াছড়ি! নাচ-গান-রঙের সঙ্গে সঙ্গে মুভিটিতে পাওয়া যবে কিছু চূড়ান্ত বাস্তবতার কথা। দেখা যাবে স্বপ্নের খুব কাছেই পড়ে থাকা স্বপ্নভঙ্গের মৃতদেহ। পর্দা থেকে চোখ সরানো যায় না ওই মুভির কালার কম্বিনেশন দেখে। সেটের ডিজাইনে আছে ক্ল্যাসিক মঞ্চের ছোঁয়া। আছে ছবির মতো সব ড্রিম সিকুয়েন্স। শ্যাজেলের পুরনো সেই বন্ধু জাস্টিন হারউইটজের অসম্ভব সুন্দর কম্পোজিশন ও লাইনাস স্যান্ডগ্রিনের চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি চোখ আটকে দেবে পর্দায়। একই সঙ্গে আছে এডিটিংয়ের জাদু। খুব অর্গানাইজড ও ফাস্ট পেস এডিটিং, সাবলীল সিকোয়েন্স চেঞ্জ মুগ্ধতা জাগায় প্রতি মুহূর্তে। ‘লা লা ল্যান্ড’ মুভিটি ৮৯তম অস্কারে ১৪টি নমিনেশন পেয়ে নাম লিখিয়েছে ‘টাইটানিক’ ও ‘অল অ্যাবাউট ইভ’-এর পাশে এবং বগলদাবা করেছে ৬টি পুরস্কার। এছাড়া ৭৪তম গোল্ডেন গ্লোবে রেকর্ড সৃষ্টি করে ঘরে নিয়েছে ৭টি পুরস্কার এবং বাফটায় পেয়েছে ১১টি নমিনেশন। এর ৫টিই জিতে নিয়েছে মুভিটি।


মধুরতম গল্প আর রূঢ় বাস্তবতার মিশেল ওই অনবদ্য মুভির ‘ওগউন’ রেটিং ৮.১/১০। রোটেন টমাটোস (জড়ঃঃবহ ঞড়সধঃড়বং) দিয়েছে ৯২ শতাংশ ফ্রেশ (ঋৎবংয)। ৩০ মিলিয়ন ডলারে তৈরি লা লা ল্যান্ড মুভিটি তুলে নিয়েছে ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া জিতে নিয়েছে কোটি কোটি হৃদয়!

একজন

রফিকুল আলম

 

শৈশব
আমার ছোটবেলা খুব সাদামাটাভাবে কেটেছে। আমি পরিবারে তৃতীয় ছেলে আর চতুর্থ সন্তান। মায়ের কাছে শুনেছি, কোনোদিনই তাকে বিরক্ত করিনি। খেলাধুলা খুব একটা করতাম না। একটাই পাগলামি ছিল, গ্রামোফোনের গা ঘেঁষে বসে গান শোনা। তবে কিশোর বয়সে একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে একটি দুঃর্ঘটনায় আমার ডান কাঁধের কলারবোন ভেঙে যায়। এরপর আর খেলার মাঠে যাইনি। হ্যাঁ, কলেজে ওঠার পর ক্রিকেট খেলেছিলাম। রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজ টিমের ব্যাটসম্যান হিসেবে সর্বোচ্চ রানও করেছিলাম। কিন্তু আমার গুরু প-িত হরিপদ দাশের নির্দেশে খেলা ছেড়ে দিয়েছিলাম।

কখন কবে থেকে গানের চর্চা শুরু
এই প্রশ্নের উত্তর কখনোই দিতে পারি না। কারণ আমার মনে পড়ে না গানের প্রতি আমার আগ্রহ কখন থেকে শুরু হয়। বাড়িতে গানের পরিবেশ থাকায় বোধহয় এ রকম হয়েছিল। বাড়িতে রেডিও এবং গ্রামোফোনÑ দুটিই ছিল। কিন্তু গ্রামোফোন ছিল আমার সব চেয়ে প্রিয়। তবে এটা ঠিক, আমার বড় ভাই সারোয়ার জাহান অত্যন্ত গুণী শিল্পী হওয়ায় প্রথাগত শিক্ষা বা চর্চাটি খুব সহজেই পেয়েছিলাম। রাজশাহী শহর পঞ্চাশ-ষাটের দশকে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির জন্য একটি ঈর্ষণীয় জায়গা ছিল। অনেক সঙ্গীতপ্রেমী ও প-িত ছিলেন। তাদের প্রভাবে একটি বিষয় আমাকে সচেতন করেছিল যে, যতো ভালো গান গাই না কেন, তা একটি শিক্ষার বিষয়। অনেক বড় একটি শাস্ত্র। এরপর একটি বড় সুযোগ এলো। রাজশাহী রেডিওর ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য বললেন তখনকার
ছাত্রনেতা আকরাম হোসেন। নির্ভয়ে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘যায় নিয়ে যায় আমার নিয়ে যায়’ গানটি গেয়ে বেশ নাম হলো। মেজভাই সারোয়ার জাহান গম্ভীর হয়ে বললেন, রেওয়াজ ছাড়া শিল্পী হওয়া যায় না। এরপরই শুরু হলো চর্চা আর সাধনা।

যুদ্ধ করার স্মৃতি
স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি অল্প কথায় বলা যাবে না। তবু বলছি, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অংশে যখন পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী বোমা ফেললো ও বহু নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ মারা গেল তখন এক মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিই (আমরা সবাই) যুদ্ধ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে ধরে নিলাম সীমান্তের ওপরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ হয়ে বালুঘাটে প্রশিক্ষণের জন্য যখন যাই তখন রাজশাহীর নেতৃস্থানীয় কয়েকজন তথা এমএ জলিল, গোলাম আরিফ টিপুরা বললেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তোমাদের প্রয়োজন, কলকাতায় যোগাযোগ করো। জুলাইয়ের মাঝামাঝি বালিগঞ্জে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর স্টুডিওতে যাই। সেখানে বড় বড় সঙ্গীতজ্ঞ আমাকে গান গাওয়ার সুযোগ দিলেন। আমার প্রযোজনায় ছয়টি গান রেকর্ড হয়। তা হলো ‘যায় যদি যাক প্রাণ’, ‘সাত কোটি আজ প্রহরী প্রদীপ’ ইত্যাদি। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান এই বেতার কেন্দ্রে অংশ নিই।

এখানে এসেই বুঝেছিলাম যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়েই হয় না। সুর, সঙ্গীত ও কণ্ঠ দিয়েও মুক্তিযুদ্ধ অনেক এগিয়ে নেওয়া যায়।

সংসার এবং একজন রফিকুল ইসলাম
আমি খুব সুখী মানুষ। আমার একটি ছেলে ফারশীদ আলম। কোনো মেয়ে নেই। স্ত্রী আবিদা সুলতানা। তিনিও একজন প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিল্পী। ছেলেও গানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ‘চ্যানেলে ৭১’-এ চাকরি ছাড়া তার কাজিন আলীফের সঙ্গে গান বিষয়ে খুব আধুনিক উপস্থাপনায় একটি অনুষ্ঠান ‘মিউজিক বাজ’ (গটঝওঈ ইটতত) প্রচার করে। দু’জনই হোস্টিং করে। আমার সারা সংসারেই গান ও সুর ছড়িয়ে থাকে। সম্প্রতি আমার পুত্রবধূ ‘লামিয়া’ এসেছে। সে অবশ্য গান করে না। তবে সঙ্গীত অনুরাগী।

শিল্পী রফিকুল আলমের অর্জন
সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আমার পুরস্কারের ঝুলি খুবই ছোট। আশির দশকে ‘দি সেইলার’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘গাঙচিল’ ছায়াছবিতে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পাই। ওই সময় জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার ‘বাচসাস’ পুরস্কার পাই। বাংলাদেশ সরকারের দেয়া যুব মন্ত্রণালয়ের শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছি। বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর নামে জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার পেয়েছি। ইংল্যান্ডের কার্ডিফের মেয়রের দেয়া একটি সম্মাননাও পেয়েছি।

দাম্পত্যে শিল্পী সত্তা
স্বামী-স্ত্রী এক মঞ্চে গান করলেই জুটি শিল্পী বা সঙ্গীত জুটি হয় না। দু’জনই আলাদা পরিচয় নিয়ে উঠে এসেছি, শিল্পী-দম্পতি হিসেবে নয়। আর দু’জন একসঙ্গে গান করলে কোনো অসুবিধা হয় বলে মনে করি না। কারণ তার জনপ্রিয়তা নিজের যোগ্যতার কারণেই। আর আমার স্বীকৃতি নিজের কোয়ালিটির কারণেই। একসঙ্গে গান গাওয়ার সুবিধাটিই বরং বেশি। ভুল-ভ্রান্তি দু’জনই আলাপের মাধ্যমে সুধরানো যায়। এতে লাভও হয়।

পরিকল্পনা
সঙ্গীত নিয়ে কখনো পরিকল্পনা করে চলিনি। যখন যে রকম চাহিদা বা পরিবর্তন হয়েছে এর সঙ্গে নিজেকে আপডেট করে নিয়েছি। তবে ইচ্ছা আছে কিছু অপ্রচলিত গান নিয়ে কাজ করার। আর কিছু হারিয়ে যাওয়ার মতো গান নতুন আঙ্গিকে গেয়ে রেকর্ড করবো ভাবছি। একটি বড় আকারের ডেমনেস্ট্রেটিভ কনসার্টও করতে চাই।

প্রত্যাশা
প্রত্যাশা তো অনেক। তবে প্রত্যাশা ও উপদেশ একই ভাষায় বলতে চাই। সঙ্গীত হচ্ছে অনেক বড় শাস্ত্র। চর্চা ও অধ্যাবসায় ছাড়া কারোরই এ কাজে আসা উচিত নয়।
চাই বাংলাদেশের সঙ্গীতের একটি আর্ন্তজাতিক পরিচিতি আসুকÑ বাংলাদেশের সঙ্গীতকে সেভাবেই দেখতে চাই এবং তা সম্ভব। বিশেষত আমাদের লোকগান বা লোকজ সুর, পৃথিবীর অন্যান্য গান যেমনÑ হিসপ্যানিক, আফ্রো-আমেরিকান, ক্যারিবিয়ানদের গান আমাদের সঙ্গীত থেকে উপরে নয়। তারা যে আন্তর্জাতিকতা পাচ্ছে এর কারণ অন্য। আমাদের গানের দুর্বলতা নয়। বিদেশে যখন আমাদের প্রবাসীরা অর্থনৈতিকভাবে আরো সবল হবেন তখন আমাদের সঙ্গীত কর্মীরা ভালো কাজ করতে পারবেন। আর সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে তারা পরিচিত হবেন।
গান নিয়ে আমার অনেক আশা। গানের চর্চা আরো বাড়লে বিপথগামী অনেক ছেলেমেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে এবং আসছেও। শুধু সরকার নয়Ñ এর জন্য সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আর অবদান তো মাপা যায় না! তবু গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমার কিছু উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পর এসেছি তাদের বহুমুখী ও শক্ত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে। এক সময় মানুষ ভারতীয়, পাকিস্তানি ও পাশ্চাত্যের গান ছাড়া আমাদের কারো গানই শুনতে চাইতো না। পশ্চিমবঙ্গ শিল্পীর গান ছাড়া ‘আর কোনো গান গানই নয়’Ñ এ রকম মনোভাব ছিল তাদের। সেটি কাটিয়ে উঠতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে আমাকে। বেশকিছু মৌলিক আধুনিক গান স্থায়ীভাবে জনপ্রিয় রয়েছে। এ কারণেই অন্তত ‘গুণী শিল্পী’র খেতাবটি পেয়েছি। আমার অনেক গান দিয়েই আমাকে চিহ্নিত করা যায় যে, এটি রফিকুল আলমের গায়কী বা স্টাইল। এতে আমাদের গানের একঘেয়েমি কেটে গেছে। এই পরিবর্তনগুলোয় আমার ভূমিকা অনেক। এরপর অসংখ্য জনসেবামূলক গানও করেছি। ফলে সমাজের কিছু না কিছু উপকার হয়েছে। শুধু ‘পিতার একজন সন্তান’ বলে পরিচিত হয়ে থাকতে চাই না। নিজের সক্রিয়তা আমার গানের মধ্যে আছে। সঙ্গীত একটি অনেক বড় অস্ত্র যা সমাজ থেকে কলুষতা দূর করতে পারে।

যে চলচ্চিত্র জীবনের কথা বলে: আলফ্রেড হিচকক

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্কু

 



টান টান উত্তেজনা, রহস্য, ভয় ও উদ্বেগের চলচ্চিত্র মানে আলফ্রেড হিচকক। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় একটি ধারার প্রবর্তক তিনি। উদ্বেগ, ভয়, কল্পনা অথবা সহানুভূতি ফ্রেমবন্দি করে চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেন বিশ্ব সিনেমার এই অভিভাবক। ‘সাইকো’, ‘দ্য বার্ড’ কিংবা ‘রেবেকা’র মতো অসংখ্য সিনেমার জনক তিনি। এখনো তার দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বের অনেক পরিচালক।
ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক স্যার আলফ্রেড যোসেফ হিচকক ১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনের এক রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভক্তিনিষ্ঠ ক্যাথলিক তিনি। তরকারি ও হাঁস-মুরগি বিক্রেতা উইলিয়াম হিচকক ও এমা জেন হোয়েলানের ছেলে আলফ্রেড হিচকক ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই উইলিয়াম ও  ছোট ভাই এলেন হিচককের সঙ্গে তিনি লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে লেইটন স্টোনে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা খুব নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের মধ্যে কেটেছে তার। তিনি মোটা ছিলেন বলে কেউ তার সঙ্গে খেলতে আসতো না। আর অল্প বয়সে এ রকম অদ্ভুত পরিস্থিতিই পরবর্তীকালে সৃষ্টি করেছে তার সিনেমাজুড়ে আতঙ্ক ও সাসপেন্স। বড় হয়ে তিনি হলেন মাস্টার অব সাসপেন্স ও রহস্যের জাদুকর। দর্শককে নিয়ে পিয়ানোর মতো খেলতে ভালোবাসতেন সাইকোলজিকাল থ্রিলারধর্মী ছবির এই নির্মাতা। চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনিই প্রথম থ্রিলার কিংবা ভৌতিক ছবির সফল ও আধুনিক রূপকার। আজও তার মুভিগুলো দর্শক, সমালোচকদের চিন্তার খোরাক জোগায়।

১৯২০ সালের দিকে এসে আলফ্রেড হিচকক আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের প্রতি। তিনি লন্ডনে ফিল্ম প্রডাক্টশনে কাজ করা শুরু করেন। ‘প্যারামাউন্ট পিকাচার-এর লন্ডন শাখায় টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর ‘ইসলিংটন স্টুডিও’তে কাজ করেন। টাইটেল কার্ড ডিজাইনারের কাজ করতে করতে
চিত্রপরিচালক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯২২ সালে। এ বছর ‘নাম্বার থার্টিন’ চলচ্চিত্রে হাত দেন তিনি। কিন্তু তার জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ১৯২৫ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’। এ চলচ্চিত্রটি ছিল ব্রিটিশ-জার্মান প্রডাক্টশনের। এটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর তাকে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। তিনি বিভিন্ন প্রডাক্টশনের ব্যানারে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যেতে থাকেন। আর চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তার নান্দনিকতা। সেই ষাটের দশকে এই মানুষ এমন সব অসাধারণ ছবি নির্মাণ করলেন, প্রযুক্তির এই যুগে তিনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই নাড়িয়ে দিতেন গোটা বিশ্ব!

১৯২৭ সালে মুক্তি পায় হিচককের চলচ্চিত্র ‘দ্য লডজার’। একই বছরের ডিসেম্বরে হিচকক বিয়ে করেন আলমা রিভিলিকে। হিচকক ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯২৯ সালে তার ‘ব্ল্যাকমেইল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ব্রিটেনে সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৮ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘দ্য লেডি ভেনিশেস’ ও ১৯৩৯ সালে ‘জ্যামাইকা ইন’। ১৯৪০ সালে হিচকক নির্মাণ করেন ‘রেবেকা’। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘রেবেকা’ সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল। তার করা এটিই একমাত্র চলচ্চিত্র যা সেরা চলচিত্রের পুরস্কার লাভ করে। ১৯৪২ সালে ‘সাবটিউর’ মুক্তির পর হলিউডে পরিচালক হিসেবে তার একটা শক্ত অবস্থান হয়। ১৯৪৩ সালে ‘শ্যাডো অফ ডাউট’টি তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। ১৯৪৪ সালে তার আরেকটি আলোচিত ছবি মুক্তি পায় ‘লাইফ বোট’। এতে দেখানো হয় কীভাবে একটি নৌকার আরোহীরা বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ১৯৫৫ সালে প্রচারিত ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্ট’-এর মাধ্যমেই তার পরিচিতি মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এটি ছিল মূলত একটি টিভি শো। সিরিজটি ১৯৫৫ থেকে শুরু হয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত টিভিতে চলাকালে ১৯৫৬ সালে তিনি নাগরিকত্ব পান যুক্তরাষ্ট্রের।

হিচকক ১৯৬০ সালে বিখ্যাত মনোজাগতিক বিকৃতি বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র ‘সাইকো’ নির্মাণ করেন যা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘দ্য মোমেন্ট অফ সাইকো’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করা হয় এটি। গোসলখানার ৪৫ সেকেন্ডের ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দর্শককে চিরকাল আতঙ্কিত করবে। হিচককের মুভির শেষে টুইস্ট অবশ্যম্ভাবী। ভীতি, ফ্যান্টাসি, হিউমার ও বুদ্ধিদীপ্ততাÑ এই চারের কম্বিনেশনে প্লটগুলো মূলত মার্ডার, অপরাধ, ভায়োলেন্সের ওপর নির্মিত। তিনি গোল্ডেন গ্লোব, সিনেমা জাম্পো অ্যাওয়ার্ড, লরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, ডিরেক্টরস গিল্ড অফ আমেরিকা অ্যাওয়ার্ড, আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যাওয়ার্ড, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড-এর মতো পুরস্কার পেয়েছেন। তবে সেরা পরিচালক হিসেবে কখনোই একাডেমি পুরস্কার পাননি।

১৯৬৮ সাল। হিচককের ক্যারিয়ার তখন পড়তির দিকে। তার সিনেমাগুলোও ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। তখন তার নামের প্রতি সুবিচার করতেই শুরু করলেন ক্যালাইডোস্কপ সিনেমার কাজ। খুন, ধর্ষণ, পেশিশক্তি, সিরিয়াল কিলিংয়ে ভরপুর এক থ্রিলার। ‘দ্য বার্ডস’-এ যে রকম তেমনি এটিতেও নতুন কিছু ফিল্ম টেকনিক প্রয়োগের পরিকল্পনা আঁটলেন। চিন্তা ছিল প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, স্ট্যান্ডের বদলে ক্যামেরা হাতে নিয়ে শুট করা এবং পয়েন্ট অফ ভিউ অ্যাঙ্গেলে শুট করার মতো ভাবনাগুলো। প্রি-প্রডাকশনে প্রচ- পরিশ্রম করার পরও শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। টাকার অভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেকের ফুটেজ নিয়ে অসমাপ্ত পড়ে রইলো ক্যালাইডোস্কপ। এর কিছু অংশ অবশ্য তিনি পরে ‘ফ্রেঞ্জিতে’ (১৯৭২) ব্যবহার করেন।

১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হিচকক পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের সঙ্গে ‘দ্য শর্ট নাইট’ নিয়ে কাজ করেন যা তার মৃত্যুর পর স্ক্রিনপ্লে হয়। তার অনেক চলচ্চিত্রেই নিজের একমাত্র মেয়ে প্যাট্রেসিয়া হিচকককে দেখা যায়। ‘এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি’ ম্যাগাজিনে বিশ্বের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে তার চলচ্চিত্র ‘সাইকো’, ‘ভারটিগো’, ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’, ‘নটোরিয়াস’ স্থান পেয়েছে।
১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আলফ্রেড হিচকক আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ‘লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পান।
১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল আমেরিকার ক্যার্লিফোনিয়ায় হিচকক ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর কাছ থেকে ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। স্যার আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্র, নির্মাণকৌশল পরবর্তীকালে অনেক বিখ্যাত পরিচালককে পথ দেখিয়েছে। চলচ্চিত্র যে কতো বড় একটা শিল্প হতে পারে, মানুষের কাছে এর মাধ্যমে কতোটা গভীরে পৌঁছানো যায় তা তিনি করে দেখিয়েছেন। তাই চলচ্চিত্রে সাসপেন্স, থ্রিলিংয়ের জগৎ সৃষ্টিকারী এ চলচ্চিত্রের বিস্ময়কর নির্মাতা আলফ্রেড হিচকক আজও চলচ্চিত্র দর্শক-নির্মাতাদের কাছে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন।

 


ছবি : ইন্টারনেট

অনন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান

শিরিন সুলতানা

 



দায়িত্বটা নিজেই নিয়েছিলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। জন্মের তিন বছেরের মাথায় যার মা এবং ১২ বছরে বাবা মারা যায় তাকে তো এতোটুকু দৃঢ় হতেই হয়। মা ফ্রিডেল এডলর বার্গম্যান কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি, ছোট্ট শিশুটির মনে কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি। তবে বাবা জ্যাস্টাস স্যামুয়েল বার্গম্যান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আগলে রেখেছিলেন মেয়েকে। ফটোগ্রাফির দোকান ছিল তার। মেয়ের প্রতিভা কিছুটা হলেও টের পেয়েছিলেন। তাই ছোট্ট শিশুর কিছু মোশন চিত্র রেকর্ড করেছিলেন তিনি। স্কুলের পাট চুকানোর পর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী হওয়ার।


যাকে নিয়ে এতো কথা তিনি হলেন প্রতিথযশা লাস্যময়ী অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যান। বলা হয়ে থাকে হলিউডকে দেয়া সে এক মহাশঙ্খ সুইডিশ উপহার। ১৯১৫ সালের ২৯ আগস্ট স্টোকহোমে জন্ম নেয়া এই তুখড় অভিনেত্রী মা-বাবা মারা যাওয়ার পর চাচার কাছেই মানুষ হয়েছিলেন। কৈশরেই তিনি বিভিন্ন ছবির এক্সট্রা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে গ্র্যাজুয়েট শেষ করার পর স্টকহোমের রিয়াল ড্রামাটিক থিয়েটার স্কুলে স্কলারশিপ পান। এ সময় তার মঞ্চে অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রে প্রথম পদার্পণ করে ‘মুন্কব্রোগ্রেভেন’ সুইডিশ ছবিটির মাধ্যমে। খুব একটা নামডাক না হলেও অভিনেত্রী হিসেবে একটা জায়গা তৈরি হয় তার।


১৯৩৬ সালে ইনগ্রিডের জীবনের মোড় ঘুরে যায় গুস্তাফ মোলান্ডারের ‘ইন্টারমেজো’ ছবিতে অভিনয় করে। দারুণ ব্যবসা সফল ছবিটি সাড়া ফেলে সুইডেনে। বিখ্যাত হন ছবির সঙ্গে ইনগ্রিডও। মুগ্ধতায় আবেশিত হয় হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক ডেভিড সেলজনিকও। ছবিটি হলিউডে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দেন সেলজনিক। এই একটি ছবি করেই সুইডেনে ফেরার কথা ছিল ইনগ্রিডের। সেখানে তার ডেন্টিস্ট স্বামী ডা. পিটার লিন্ডস্ট্রোম ও কন্যা পিয়াকে রেখে এসেছিলেন। এদিকে হলিউড ভার্সন ‘ইন্টারমেজো : দ্য লাভ স্টোরি’ (১৯৩৯) বক্স অফিস হিট হয়। তারকাখ্যাতি ও হলিউডে থিতু হওয়ার হাতছানি ইনগ্রিডকে মোহাচ্ছন্ন্ করে ফেলে। সেলজনিকের অনুরোধে হলিউডে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জহুরি চোখ ভুল করেনি। প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার সেলজনিক সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন ইনগ্রিডকে। ওই সাত বছরে তিনি মাত্র দুটি ছবিই নির্মাণ করেছিলেন ইনগ্রিডকে নিয়ে। ‘গান উইথ দ্য উইন্ড’ (১৯৩৯) ও ‘রেবেকা’ (১৯৪০) ছবি দুটিই একাডেমি পুরস্কার পায়। ধীরে ধীরে ইনগ্রিডের লস্যময়ী নারীসুলভ, প্রেয়সীর ইমেজের ছোট্ট চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হয় সমগ্র হলিউডে তথা আমেরিকায়।

১৯৪২ সালে নির্মিত হয় কালজয়ী চলচিত্র ‘ক্যাসাব্লাংকা’। ইনগ্রিডের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন হামফ্রে বোগার্ট। হলিউড চলচ্চিত্রে এই ছবিকে মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ছবিতে বোগার্টের সঙ্গে ওই অন্তরঙ্গতা, চুম্বন দৃশ্য, চাহনি, গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস সন্তর্পণে লুকানোÑ সবকিছুই যেন দর্শকের মন ও মগজে ঠাঁই করে নেয় অবলীলায়। দর্শক বুঁদ হয়ে আটকে যায় বার্গম্যানের সাবলীল অভিনয়ের ফাঁদে। এলসা নামের সারল্যমাখা রমণীর ওই চরিত্রকে ইনগ্রিডের অভিনিত শ্রেষ্ঠ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিয়মানুবর্তিতাÑ সবকিছুর সমন্বয়ই তাকে শিখরে পৌঁছানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ওই সময় অন্য অভিনেত্রীরা যখন মেকআপের ভারে, পোশাকের চাকচিক্যে ন্যুব্জ হয়ে থাকতেন তখন ইনগ্রিড প্রায় মেকআপহীন সাধারণ পোশাকের মহিমায় হয়েছে উদ্ভাসিত। সম্পূর্ণ বিপরীতধারা থেকেই তিনি জয় করেছেন হাজারো দর্শকের হৃদয়। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দারুণ খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি।


১৯৪৩ সালে একটি মাত্রই ছবি করেন বার্গম্যান। আর্নেস্ট হোমিংওয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ ছবির মারিয়া চরিত্রটি প্রায় লুফে নেন তিনি। চরিত্রের ক্ষুধা তখন তাকে পেয়ে বসে। ইনগ্রিডের চিরচেনা রূপ থেকে বেরিয়ে এসেও ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুলের মারিয়া দারুণ আবেদনময়ী হিসেবে ধরা দেয়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। ওই বছর খালি হাতে ফিরলেও পরের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কারটি চলে আসে তার ঝুলিতে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ইনগ্রিড বার্গম্যান আমেরিকার সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী দুই বছরে আলফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ ও ‘নটরিয়াস’ ছবি দুটিতে অনবদ্য অভিনয় করেন তিনি। ফলে সাফল্যের মুকুটে হতে থাকে নতুন নতুন পালকের সাবলীল সংযোজন।


প্রত্যেক শিল্পীর কিছু স্বপ্নের চরিত্র থাকে। ‘জায়ান অফ আর্ক’ ছবির জোয়ান চরিত্রটি তেমনই ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ ছিল ইনগ্রিডের। দরিদ্র ফরাসি জোয়ান (পরে সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে) চরিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কাঠখড় পুরিয়েছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পায় চরিত্রটি। ইনগ্রিডের পালে তখন নতুন হাওয়ায় তর তর করে এগিয়ে চলছে সাফল্যের তরী। হঠাৎই যেন জমাট মেঘের ষড়যন্ত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে ইটালিতে পাড়ি জমান ‘স্টমবলি’ ছবির শুটিংয়ের জন্য। পরিচালক রবার্তো রসেলিনের কাজে আগে থেকেই মুগ্ধ ছিল তিনি। জীবনটা যেন ওলট-পালট হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তার। না হলে সাফল্যের চরম শিখরে বসে, স্বামী-সন্তান তুচ্ছ করে প্রেমেই বা পড়বেন কেন রসেলিনের। তুমুল ওই প্রেমের পরিণতিতে সন্তানসম্ভাবা হয়ে পড়েন তিনি। এ খবর চাউর হতে সময় লাগে না। পুরো আমেরিকা হতবাক হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে জানার পর। হলিউডপাড়া থেকে সিনেট পর্যন্ত তুমুল ঝড় বয়ে যায়। যাকে সাক্ষাৎ দেবীর আসনে বসিয়েছে বিশ্ববাসী, যে রমণী নারীত্বে মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন নিজেকে তার এমন অধঃপতন (!) দর্শক মেনে নিতে পারে না কিছুতেই। সবাই বয়কট করেন ইনগ্রিডকে। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে ‘স্ট্রমবলি’ (১৯৫০)।


এমনতর প্রক্রিয়ায় ইনগ্রিড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে জোয়ান অফ আর্ক হিসেবে, সন্ন্যাসী হিসেবে দেখে। আমি তা নই। আমি শুধু একজন নারী, একজন মানুষই।’ এতো ঘটনায় ইটালিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিনি। পরবর্তী সাত বছর এখানেই কাটিয়ে দেন রোসেলিনের সঙ্গে। এ সময় তাদের এক পুত্র ও যমজ কন্যা সন্তানের জš§ হয়। সাত বছর পর যেন ফিনিক্সের মতোই উঠে দাঁড়ান ইনগ্রিড। ১৯৫৬ সালে আবারও সদর্পে হাজির হন হলিউডে ‘অ্যানাস্টাশিয়া’ ছবির টাইটেল চরিত্রে অভিনয় করে। পুরো ছবিটি চিত্রায়িত হয় ইংল্যান্ডে। ততো দিনে রবার্তোকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল স্তিমিত হয়েছে। অভিমানে মুখ ফেরানো দর্শক আবার ভালোবাসার আলিঙ্গনে বাঁধে ইনগ্রিডকে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার ধরা দেয়। তার জীবনে দীর্ঘ সাত বছরের অভিশাপ যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ছবিটি। ষাট থেকে সত্তরের দশক তিনি অক্লান্ত কাজ করে যান। পেছনের ভুল সুধরে নিতেই এ অবিরাম চলা। ১৯৭৪ সালে আবারও ওই প্রাপ্তি। ‘মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ ছবিতে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার ঘরে তোলেন। শেষ বয়সে সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক যোগ হয় ‘অটাম সানাটা’ দিয়ে।
১৯৭৪ সালে ধরা পড়ে তার ব্রেস্ট ক্যানসার। কর্কট কামড়কে উপেক্ষা করেই টিভি সিরিজ ‘অ্যা ওম্যান কল্ড গোল্ড’ শেষ করে ইনগ্রিড। অবশ্য ছবির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। জীবন নদীর ওপার থেকে তিনি কি শুনতে পেয়েছিলেন, অ্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলো?


ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছরের মাথায় ঠিক তার জন্মদিনেই ১৯৮২ সালে ৮৭ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান ইনগ্রিড। বরফরাজ্যে জন্ম নেয়া রাজস্বী ওই নারী আজন্মের ঠাঁই করে নিয়েছেন লাখো দর্শকের হƒদয়ে।

ছবি : ইন্টরনেট

হোয়াইট বেলুন

তিয়াষ ইসতিয়াক

 



বহু বছর ধরে ইরানের সিনেমা বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়ের নাম! একদমই সাদামাটা কিছু গল্প যে কী করে হৃদয়ের অলিন্দে ছড়িয়ে যাবে, এক চিলতে কিছু অনুভূতি আশ্চর্য রকম ক্ষিপ্রতায় মগজের কোষে কোষে কখন যে জায়গা করে নেবে তা টেরই পাওয়া যায় না! ইরানের সিনেমাগুলোয় এই এক বৈশিষ্ট্য- দেখার সময় আপনার মনে হবে যেন পাশের বাসায় ঘটে যাওয়া গল্পটা কিংবা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা দেখছেন।
পরিচালক রিলে ভাসিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে এক আশ্চর্য চেনা জগতে যেখানে সময় স্থির! জীবনটা যে কী আশ্চর্য সহজ কিন্তু রঙিন হয়ে ধরা দেয় তা কল্পনাই করা মুশকিল!
এমনই এক সিনেমার কথা বলবো আজ। এর পার্সিয়ান নাম ইধফশড়হধশব ঝবভরফ এবং ইংরেজিতে তা হয় ঞযব ডযরঃব ইধষষড়ড়হ (সফেদ বেলুন)। এটি ১৯৯৫ সালের ড্রামা সিনেমা। ইরানের অন্য দশটি ছবির মতো এটিও এক অতি সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী। ইরানে নববর্ষের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি তখন। মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়ে পরিবারের ছোট্ট মেয়ে রাজিয়ার চোখ আটকে যায় এক সুন্দর গোল্ড ফিশের ওপর। এরপর থেকে মায়ের কান ঝালাপালা করে দিতে থাকে ওই ১০০ তোমান (ইরানের মুদ্রা) দামের গোল্ড ফিশটির জন্য! কিন্তু মা অনড়। দারুণ হিসাবি সংসারে একটা শৌখিন মাছের জন্য ১০০ তোমান খরচ করা বড্ড বোকামি। তাছাড়া বাড়িতে কয়েকটা গোল্ড ফিশ তো আছেই। কিন্তু বাজারের গোল্ড ফিশগুলো বেশ নধরকান্তি। রাজিয়ার ভাষায় নতুন বৌয়ের মতোই সুন্দর!


অবশেষে নানান প্রলোভন দেখিয়ে ভাইকে দিয়ে মাকে রাজি করাতে পারে ছোট্ট মেয়েটি! মা ৫০০ তোমান দিয়ে বলে ৪০০ তোমান যেন ঠিক ঠিক ফিরিয়ে আনে। রাজিয়া যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়! তখনই ছুট লাগায় পছন্দের মাছটি কিনতে। পথে বেশকিছু উটকো ঝামেলা পোহানোর পর ওই কাক্সিক্ষত দোকানে পৌঁছায় সে। কিন্তু আরেক সমস্যা বাধায় দোকানি। সে এখন মাছটির জন্য দাবি করে বসেছে বাড়তি দাম। ঠিক যেন উৎসবের সময় আমাদের দেশের দোকানিদের মতো! কঠিন বাস্তবতার ওপর ভীষণ মন খারাপ করে রাজিয়া নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলো, ওই মহামূল্যবান ৫০০ তোমানের নোটটি উধাও!
এখন ছোট্ট মেয়েটি কী করবে! শখের মাছটা কি কেনা হবে না? বাড়ি গিয়ে মাকেই বা কী বলবে? এই ভরাবাজারে একটা নোট কীভাবে খুঁজে পাবে ছোট মানুষ রাজিয়া?

কী আছে এই সিনেমায়? হলিউডের সিনেমার মতো ঘাগু হাতে করা ক্যামেরার তাজ্জব করে দেয়া কারিকুরি নেই, সিজিআই আর স্পেশাল ইফেক্টের দুর্ধর্ষ কাজ নেই, নেই বলিউডের গ্ল্যামারের চাকচিক্য কিংবা চমকদার কৃত্রিম আবেদন। নামি-দামি কোনো অভিনেতাও নেই। আছে কয়েকটা লং, ক্লোজ ও কিছু মাস্টার শর্টের কাজ। তাহলে এই সিনেমা কেন দেখতে হবে? ওই সিনেমায় আসলে আছে জীবন। আছে আশ্চর্য প্রাণবন্ত অভিনয়! ছোট্ট রাজিয়ার ভূমিকায় আইদা মোহাম্মদখানি-র অভিনয় দেখার জন্যই ওই সিনেমা দশবার দেখা যায়! ওই সময় আইদা-র বয়স ছিল মোটে সাত বছর! সাত বছরের একটি ছোট মেয়ে কীভাবে এতো অসাধারণ অভিনয় করেছে তা ভেবে কূল পাবেন না নিশ্চিত। মিষ্টি একটা চেহারা এবং অমন নিষ্পাপ একটা চাহনি দিয়ে মন জয় করবেই আপনার! আর এক্সপ্রেশন? দশে একশ’! অনেক বড়
অভিনেতার সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে সে।

ঠোঁট উল্টে অভিমানি একটা ভঙ্গি করে মায়ের কাছে কীভাবে যে টাকা চায়! টাকা হারিয়ে ফেলার পর তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দৃশ্যগুলায় দর্শকের চোখে বাষ্প জমায়। বড্ড মায়া লাগে। ইচ্ছা হয় রাজিয়াকে মমতায় জড়িয়ে ধরে চোখ-মুছে আদর করে ১০০টি গোল্ড ফিশ কিনে দিতে! টাকাটা হাতে পাওয়ার পর দুনিয়ার সব মায়া নিয়ে এতো চমৎকার একটা হাসি দেয় যে, তা দেখার পর চোখে আরেকবার পানি আসে। এটি অভিনয় নয় যেন অন্য কিছু! কী এক্সপ্রেশন, কী ডায়ালগ থ্রোয়িং! কাঁপিয়ে দেয় ভেতরটা। এর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে হয়তো নিয়ে যাবে ওই ছোট্টবেলার অভিমান মিশ্রিত সব আবদারের সরল দিনগুলোয়। আরেকবার অনুভূত হবে শৈশবের পাওয়া, না পাওয়ার বেদনা। এখানেই তো সিনেমার সার্থকতা।


ইরানের মুভি মায়েস্ত্রো ও সদ্য প্রয়াত আব্বাস কিয়ারোস্তামি অনবদ্য কাহিনীতে তারই অনুসারী ইরানের নয়া স্রোতের জনপ্রিয় পরিচালক জাফর পানাহির
পরিচালনায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘সফেদ বেলুন’। আর পহেলা সিনেমাতেই বাজিমাত! এটি বাগিয়ে নিয়েছে বেশ কয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং নমিনেশন পেয়েছে কয়টিতে। এর মধ্যে আছে ১৯৯৫ সালের কান ফেস্টিভালের সম্মানিত ক্যামেরা ডি’ওর অর্থাৎ গোল্ডেন ক্যামেরা পুরস্কার। আরো পেয়েছে টোকিও আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড, সাও পাওলো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরি পুরস্কার, কানাডার সাডবারি সিনেফেস্ট-এ সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমা ইত্যাদি। তাছাড়া অস্কার পর্যন্ত গড়িয়েছিল এটি। দি গার্ডিয়ান পত্রিকা ওই সিনেমাটিকে সেরা ৫০ ফ্যামিলি মুভির লিস্টে রেখেছে।

দেরি না করে বসে পড়–ন ‘সফেদ বেলুন’ নিয়ে এবং দেখুন আপনার অনুভূতি নিয়ে কেমন খেলা করে সিনেমাটি!

আবিদা সুলতানা

 

 


আবিদা সুলতানার বেড়ে ওঠা একটি স্বনামধন্য সংস্কৃতিমনা পরিবারে। আর এ জন্যই শৈশব থেকেই তার সখ্য গান, নাটক, নাচসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে। ছোটবেলায় গানের চেয়েও নাচের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল তার। রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছেন তিনি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব তার গায়কীতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীত- এ দুটির ওপর আবিদা তালিম নিলেও আধুনিক গানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তখন থেকেই তিনি ওই দুই মাধ্যমে নিয়মিত গান পরিবেশন করে আসছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম প্লেব্যাক করেন। এ পর্যন্ত ৪৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
আবিদা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়েন এবং ১৯৭৫ সালে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ‘সহজ’কে এই গুণী শিল্পী জানিয়েছেন তার আদ্যোপান্ত

সঙ্গীতের শুরু
কবে থেকে গান করেন এমন প্রশ্ন আমাকে কেউ করলে অবশ্যই বলি, মায়ের পেটে থাকতে গান গাই। এর পেছনে বড় ইতিহাস আছে। আমার গানে বাবা, মামা, খালা, নানি, চাচা অর্থাৎ আমার পরিবারের অবদান অনেক। আমার নানিবাড়িতে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, বছরের প্রথম দিন- সব সময় একটা না একটা অনুষ্ঠান থাকতো। আমার অনেক খালাতো ভাইবোন ছিল। সবাইকেই নাচ, গান, নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি- সবকিছুই করতে হতো। এভাবেই আমাদের বেড়ে ওঠা। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গানে আসা। নাচটি অবশ্য আমার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু মা চাইতেন আমি গান করি। তাছাড়া আমাদের বাড়িটি ছিল সাংস্কৃতিক পরিম-লে মোড়ানো। আমার বাবা গান ও অভিনয় করতেন। রম্যরচনা ভালো লিখতেন, ছড়ার অনেক বই প্রকাশ হয়েছে তার। আমার মা ছোটগল্প লিখতেন। ওই সময়ে তিনি ‘বেগম’ পত্রিকায় অনেক লেখালেখি করতেন। বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে মা-বাবাকে দেখতাম এক সঙ্গে গান গাইতে। না হলে কবিতা আবৃত্তি করতেন। ছোটবেলা থেকেই আমাদের রক্তের সঙ্গে মিলেমিশে আছে সাংস্কৃতিক নানান উপাদান। মা-বাবা ও বোনদের প্রভাব আছে বলেই আমি আবিদা সুলতানা এ পর্যায়ে এসেছি। তাদের উৎসাহ না পেলে শিল্পের এক্ষেত্রে কখনোই আসতে পারতাম না। আবৃত্তি করেছি। বাবার চাকরি সূত্রে আমাদের উত্তরবঙ্গে থাকা হতো। শিল্পী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে সব সময়ই সঙ্গীত আর শিল্প চর্চা দেখে দেখে বড় হয়েছি।

আমার শিক্ষক
রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব আমার গানেও পড়ে।

জন্মস্থান
বাড়ি মানিকগঞ্জ। এখানে সেভাবে যাওয়াই হয়নি। ছোটবেলায় বাবা চলে গিয়েছিলেন জলপাইগুড়িতে। মা ছিলেন কলকাতায়। পরে ঢাকায় এসে ওনাদের বিয়ে হয়।

পরিবার
আমাদের পরিবারের সবাই গানের সঙ্গে জড়িত। রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী- সবকিছুতে আমাদের অংশগ্রহণ করতে হতো ছেলেবেলায়। আমার গানের অনুপ্রেরণা আমার মা। আমার চাচা শিক্ষাবিদ আব্দুর রশীদ বেহালা বাজাতেন। মা ভালো লিখতেন এবং খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। সঙ্গীতে আমার মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। রফিকুল আলম আমাকে বোঝেন। আমাকে গান বিষয়ে নানানভাবে সহযোগিতা করেন। তার মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবি।

বিয়ে
১৯৭৪ সালে শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়ি। ১৯৭৫ সালে আমাদের বিয়ে হয়। এক পুত্র রয়েছে আমাদের। রফিকুল আলম খুব কেয়ারিং ও হেলপিং। তবে ওনাকে অ্যাবসেন্স মাইন্ডেড প্রফেসর বলা যায়।

শিল্পী দম্পতির সুবিধা-অসুবিধা
অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। একই প্রফেশন দু’জন থাকলে অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। ওনার ও আমার কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না প্রফেশনের বিষয়ে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা
আমার আসলে গান নিয়ে কোনো প্ল্যান নেই। তবে উপভোগ করি।

মিউজিকের বাইরে নিজের ইচ্ছা
এতিম শিশুদের নিয়ে কিছু করা মিউজিকের বাইরে আমার ইচ্ছা। আর উপস্থাপনার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করি।

ভূপেন হাজারিকার গান
যখন মাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি তখন ১৯৭৪ সালের কথা। বাসায় এলেন আলমগীর কবির ভাই ও ‘চিত্রালী’র সম্পাদক পারভেজ ভাই। ওনাদের সঙ্গে তখনই প্রথম পরিচয়। সীমানা পেরিয়ে ছবিতে ‘বিমূর্ত এই রাত্রে আমার’ গানটি আমার সঙ্গীত জীবনের মাইলফলক। এতো বছর ধরে গানটির জনপ্রিয়তা এতোটুকু কমেনি। এটিই আমার প্রাপ্তি।

বিভিন্ন ভাষায় গান
ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন পিটিভি ছিল। আমরা ৪৫ জন ছিলাম যাদের দিয়ে মোট ২০টি ভাষায় গান করানো হয়েছিল। আমি তখন চায়নিজ ও জার্মান ভাষায় গেয়েছিলাম। এটি এক নেশা, বিভিন্ন ভাষায় গানের নেশা। ডিপ্লোম্যাটদের গান শোনানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওমানে ক’দিন আগে গান করে এলাম। এ পর্যন্ত ৩৫টি ভাষায় গান করেছি।

সন্তান
আমার এক ছেলে ফারশিদ আলম। সে বোহেমিয়ান ব্যান্ডে আছে। এছাড়া একটি চ্যানেলেও আছে।

সংসার
পৃথিবীর যেখানেই থাকি, সংসার খুব মিস করি। আমি সংসারে খুব বেশি ইনভলব আর সংসারের প্রতি সবসময় টান অনুভব করি। বিভিন্ন রকম রান্না করতে ভালোবাসি। আমার বাসায় কোনো পার্টি থাকলে চেষ্টা করি নিজে রান্না করতে। আমার ছোট একটি বারান্দা আছে। সেখানে বেশকিছু গাছ আছে। অবসরে সেগুলো পরিচর্যা করি। আর টিভির ভালো অনুষ্ঠানগুলো দেখার চেষ্টা করি।

সঙ্গীতের স্বীকৃতি ও পুরস্কার
আমার ঘরে প্রচুর অ্যাওয়ার্ড আছে দেশ-বিদেশের। তবে মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্যটাই সবচেয়ে বড়। যদিও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাইনি তবুও পুরস্কার পেয়েছি প্রচুর।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা
একবার ইটালির রোম থেকে দূরে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি পটারির দোকানে ঢুকেছিলাম। ইটালি যাওয়ার ৭ দিন আগে স্বপ্নে দেখেছিলাম ওই দোকানটি। হুবহু ওই দোকান। আমি হতবাক, যাওয়ার সাত দিন আগে দেখা স্বপ্নটি সত্যি হতে দেখা উল্লেখযোগ্য বৈকি!

গান আর সংসার- এই আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকা। এ দুটির যে কোনো একটি ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না।



ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

লিভিং ড্রাগন

শিরিন সুলতানা

 

 

বয়স তখন তার ১২ বছর। একদিন রাস্তার কিছু বখাটে ছেলে মারধর করে তাকে। এরপর শরীরের ঘা শুকালেও মনে থেকে যায় অনন্ত দহন। মূলত এই ঘটনাই পাল্টে দেয় ছেলেটির জীবন। প্রতিশোধ স্পৃহা অথবা আত্মরক্ষা যে কারনেই হোক না কেনো ছেলেটি নিজেকে তৈরী করতে থাকে অপ্রতিরোধ্য লৌহ মানব হিসেবে। মার্শাল আর্টসের দীক্ষায় নিজেকে সুরক্ষার সাথে সাথে শত্রু ঘায়েল করার নানা কৌশল নিয়ে আসে ছেলেটি তার নখদর্পনে। বলছিলাম কিংবদন্তি ব্রুস লির কথা, মার্শাল আর্টসকে যিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে।

১৯৪০ সালের নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখে জন্ম হওয়া এই অপ্রতিরোধ্য মার্শাল আর্টিস্টের পুরো নাম ‘ব্রুস ইয়ুন ফান লি’। জন্ম মার্কিন মুল্লুকের সান ফ্রান্সেসকোতে হলেও শরীরে ছিল পুরোটাই চিনা রক্ত। লি হোই চুয়েন এবং গ্রেস হো দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে লি ছিলেন চতুর্থ। তার জন্মের সময়টায় চাইনিজ ক্যালেন্ডারে ড্রাগনকাল চলছিল যা কি না শক্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। হংকংয়ের চায়নিজ অপেরা স্টার বাবার অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই তিনি শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম অভিনয় করেন মাত্র ৩ মাস বয়সে, ‘দ্য গোল্ডেন গেট গার্ল’ (১৯৪১) ছবিতে।

১২ বছর বয়সে মার খাবার পর মন প্রাণ ঢেলে মার্শাল আর্টের তালিম নিতে শুরু করেন ব্রুস। শিক্ষাগুরু হিসেবে পান ইপম্যানকে। একটানা পাঁচ বছর দীক্ষা নেবার পর লি নিজেস্ব কিছু কলাকৌশল ও দর্শন যোগ করেন কুংফুর সাথে। নাম দেন- জিৎ কুনে দো (The way of the intercepting fist) অস্বাভাবিক ক্ষীপ্রতা তখন তার শিরায় শিরায়। শুন্যে ছুড়ে দেওয়া চাউলের দানা চ্যাপিষ্টিক দিয়ে ধরে ফেলা কিংবা টেবিল টেনিসে নান চাকু দিয়ে খেলে একসাথে দুই প্রতি পক্ষকে নাকানি চুবানি খাওয়ানো ছিলো তার আমুদে খেলা।


একবার এক প্রতিযোগিতায় ১১ সেকেন্ডেই ধরাশায়ী করে প্রতিপক্ষকে। শুধু কি মারামারি? নাচেও দারুন দক্ষ ছিলেন তিনি। হংকংয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘চা চা নৃত্যে’ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে সবাইকে চমকে দেন লি। লিকলিকে পেশীবহুল পেটানো শরীরের মানুষটার মেজাজটাও ছিল বেশ কড়া। এজন্য হংকং পুলিশের সাথে ঝামেলাও পোহাতে হয় তাকে কয়েকবার। সেগুলো অবশ্য কিশোরোত্তীর্ণ বয়সের কথা। বাবা মা তাই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রে। বয়স তখন ১৯ বছর। সদ্য যুবক লি সেখানে চায়না টাউনে এক আত্মীয়ের রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সিয়ালটলে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে ভর্তি হন দর্শন শাস্ত্রে। জীবনে আসে নতুন বাঁক। সখ্যতা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লিন্ডা এমেরির সাথে। পরবর্তীতে প্রেম ও সাতপাঁকে বাঁধা। সিয়াটলেই ব্রুস তার প্রথম কুংফু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে টিভিতে টুকটাক কাজও করতে থাকেন। সেই সুবাদে নাম ডাক হতে শুরু করলে হলিউডের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হন লি। হলিউডের ছবিগুলোতে ষ্ট্যানম্যান ও পাশর্^ চরিত্রের কাজ করে আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেও, সেভাবে কারো নজরে আসছিলেন না তিনি। এরপর লি তার পরিবার নিয়ে চলে আসেন হংকংয়ে। ঘরে তখন তার ফুটফুটে দুই সন্তান। ছেলে ব্রান্ডন লি এবং মেয়ে শ্যানোন লি। হংকংএ সময় বেশ কয়েকটি ছবি হয় তাকে নিয়ে। ‘দা বিগ বস’(১৯৭১), ‘ফিস্ট অফ ফিউরি’(১৯৭২) ও দ্য ওয়ে অফ দা ড্রাগন(১৯৭২) তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শেষোল্লিখিত ছবির রাইটার ডিরেক্টর হিসেবে দুটোতেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছিলেন লি। তার নিজের প্রডাকশন হাউজ কনকর্ড পিকচার্স থেকেই রিলিজ হয় ছবিটি।

ব্রুস লি তখন রীতিমত ষ্টার। হলিউডের ঢিসুম ঢিসুম মারামারিকে একহাত দেখিয়ে মার্শাল আর্টসের জয়জয়কার সারাবিশে^। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ যে ছবি লি’কে হলিউডে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছে তার কাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারী মাসে, হংকংয়ে। শুটিং শেষ হয় মাস ছয়েকের মধ্যেই। সারা বিশ্ব যখন কাপঁছে ব্রুসলি জ্বরে, তখনই ঘটলো সে অপয়া ঘটনা। কয়েকদিন ধরেই মাথায় সেই পুরনো যন্ত্রনা কাতর করছিলো তাকে, সাথে পিঠের ব্যাথা। ডাক্তার অনেক আগেই সনাক্ত করেছিল সেরিব্রাল এডিমা। ব্রেনের একটা অংশে ফ্লুইড জমা হচ্ছিল। অসহ্য ব্যাথাকে পরাভূত করতে ব্যাথা নাশক এ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন লি। পরের সকাল আর দেখা হয় না তার। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ ছবি মুক্তির ছয়দিন আগেই পাড়ি জমান তিনি না ফেরার দেশে। ১৯৭৩ এর ২০জুলাই, সারা পৃথিবী যেনো থমকে যায় কয়েক মুহুর্ত এ সংবাদে। অপাজেয় লি’র এরকম মৃত্যু কেউ যেন মেনে নিতে পারছিলেন না।

শুরু হয় চারদিকে গুঞ্জন। কেউ বলে চায়নিজ মাফিয়া চক্র, কেউ বলে হংকংয়ের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির প্রভাবশালীদের হাত আছে এই মৃত্যুর পিছনে। কেউ বলে তার বান্ধবী বিষ ক্রিয়ায় মেরেছে তাকে। ঘটনা যাইহোক মাত্র ৩২ বছর বয়সেই জীবনের ইতি টানতে হয় মার্শাল আর্টসের মহারাজাকে। তার দর্শন, তার কবিতা, তার লেখনি, সবকিছুই অন্তরালে থেকে গেছে। মানুষ বুঁদ হয়ে শুধুই দেখেছে তার অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ কৌশল। মৃত্যুর পর লি’র তিনটি ছবি মুক্তি পায়, ‘এন্টার দা ড্রাগন’, গেম অব ডেথ ও সার্কল অব আয়রন’। মার্শাল আর্টিষ্ট, প্রশিক্ষক, ছবি নির্মাতা, মানবহিতৈষী, দার্শনিক, অভিনেতা, একের মধ্যে এ যেন অনেক গুনের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধন। এ এক অনন্য কিংবদন্তি ব্রুস লি।

 

মুনলাইট

ফুয়াদ বিন নাসের

 

ব্যারি জেনকিন্স তার ‘মুনলাইট’ ছবিটিকে খুব সহজেই তিনটি পৃথক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমানের প্রিক্যুয়াল-সিক্যুয়াল ও রুপালি পর্দার ব্যবসায়িক সাফল্যের যুগে হয়তো সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ব্যারি যশ-খ্যাতি বা অর্থ-বিত্তের হাতছানিতে সাড়া দেয়ার মানুষ নন। ‘মেডিসিন ফর মেলানকলি’ চলচ্চিত্রেই তার ওই দর্শনের অনেকটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। মুনলাইট ছবিটি তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘লিটল’, ‘কাইরন’ ও ‘ব্ল্যাক’। তিনটি নামই ছবির মূল চরিত্রের নাম। একই মানুষের ভিন্ন তিনটি বয়সের তিনটি রূপ মায়ামির রৌদ্রস্নাত পটভূমিতে আঁকার চেষ্টা করেছেন পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স। মাদকাসক্তি, একাকিত্ব,
সমকামিতার মতো প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিচালক খেলা করেছেন মূল চরিত্র কেন্দ্র করে।


মুনলাইট চলচ্চিত্রটির প্রথম পর্ব ‘লিটল’ আবর্তিত হয় মায়ামির এক বস্তি অঞ্চলে যেখানে দেখা, আমাদের মূল চরিত্র কাইরন ব্ল্যাকের শৈশব। সহপাঠীদের কাছে তাড়া খাওয়া, মায়ের অবহেলা ও বাবার অভাবে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ছেলেটি বাবার ছায়া খোঁজে এলাকার পান্ডা হুয়ানের কাছে। হুয়ানও এই অদ্ভুত ও চুপচাপ ওই শিশুকে পছন্দ করে ফেলে এবং নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তাকে হুয়ানের কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না লিটলের মাদকাসক্ত মা। কিন্তু স্নেহের লোভে লিটল বার বার ওই হুয়ানের চৌকাঠেই ফিরে যায়। হুয়ান এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু লিটলের মায়ের অবহেলা থেকে তাকে রক্ষা করতে না পেরে অসহায় বোধ করে। লিটলের জন্য সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন চায় হুয়ান। আবার মুদ্রার অন্য পিঠে হুয়ানের মাদকের চালানই অন্ধকার নামিয়ে আনে লিটলের


পরিবারে। ওই চক্র চলতেই থাকে।
এরপর দেখতে পাই কৈশোরের কাইরনকে। লিটলের বয়স খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু তার একাকিত্ব কাটেনি। সে অনুভব করে, তাকে পছন্দ করে এ রকম কেউ থাকতেই পারে না। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়েও তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। এলাকা ও স্কুলে সহপাঠীদের অত্যাচার এবং অপমানের শিকার কাইরন মুখ ফুটে তার আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে না। তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী কেভিনের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে তা নিয়েও সে সন্ত্রস্ত থাকে। তার আশপাশের জগতে সে দেখে মানুষের নরপশুসুলভ আচরণ ও হিংস্রতা। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শেষ আশাটুকুও ছেড়ে দেয় কাইরন।
মুনলাইট-এর শেষ পর্বে দেখি যুবক কাইরন ব্ল্যাককে। এখানেই পরিচালক ব্যারি তার সর্বোচ্চ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুই পর্বের সব ইতিহাস, হতাশা, আবেগ এক হয়ে পূর্ণতা লাভ করে সেলুলয়েডের অন্তিমভাগে। ব্যারি জেনকিন্স কোনো নীতিকথা প্রচার করার চেষ্টা করেননি, কোনো উপদেশ দেয়ার প্রয়াসও দেখাননি। মুনলাইটের এই শেষ অংকে বোঝা যায়, ছোট এক ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী- কোনো পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের সমর্থন, সমাজের সাহায্য ছাড়াই। এ রকম অনেক লিটল, কাইরন ও ব্ল্যাকই অশ্রুর মতো সবার অগোচরেই মায়ামির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বার বার তাকে ফিরে আসতে দেখি সব বাধা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অপমান ডিঙিয়ে। তিন বছর বয়সের কাইরন ব্ল্যাককে রূপায়িত করেছেন এলেক্স হিবার্ট, অ্যাশটন স্যান্ডার্স ও ট্রেভান্তে রোডস। পরিচালক জেনকিন্স এখানে তিন অভিনেতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেননি, বরং তিনজন তিনটি চরিত্রই রূপায়ণ করেছেন। চমৎকার সংলাপ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির কারণে কাইরন ব্ল্যাকের বেড়ে ওঠা আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রুপালি পর্দায়। মায়ামির ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল বালুকাবেলায় শত
হাসিমুখের ভিড়েও যে বিষণ্ণতার বীজ লুকিয়ে থাকে সেটিই পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। সেরা ছবির পুরস্কার মুনলাইটেরই প্রাপ্য।

মহাকালের রথের ঘোড়া : সমরেশ বসু

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

 

তারাশঙ্কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আবার সুনীল, শীর্ষেন্দুদের যুগ। এ দু’যুগের মাঝে সমরেশ বসু ছিলেন সেতু হিসেবে। তাঁর জীবন যাপন, ছেলেমানুষি আচরণ অনেকটাই ছিল ফরাসিদের মতো। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল আর অপূর্ব একটা ট্রেড মার্ক হাসি। ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত রাজনগর গ্রামে পৈতৃক বাস্তুভিটায় ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্ম নেন সমরেশ বসু। বাবা ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। কাগজের ম- দিয়ে মূর্তি তৈরী করতেন। বাড়ির পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সমরেশের আদলটা একটু আলাদা। পাঠ্য বই পড়ায় মন নেই তাঁর। বাঁধাধরা শিক্ষার বাইরের জীবন যাপনই তাঁকে বেশি টানে। তবু তাঁকে পাঠানো হলো গিরিশ মাস্টারের পাঠশালায়। পরে গে-ারিয়া গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়লেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা তাঁকে পাঠালেন নৈহাটির রেল কোয়ার্টার্সে দাদা মন্মথ’র কাছে। দাদা ১৯৩৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নৈহাটির মহেন্দ্র স্কুলে তাঁকে ভর্তি করালেন অষ্টম শ্রেণিতে। স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিয়ে, নাটক অভিনয়, খেলাধুলা, শরীর চর্চা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সেসময় কিছু লেখালেখিও শুরু করেন হাতে লেখা পত্রিকা বীনায়।


দেবশংকর বন্দোপাধ্যায় ছিলেন তখন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু। বন্ধুর বাসায় যাওয়া আসার সুবাদে প্রেমে পড়ে সমরেশ বন্ধুভগ্নি গৌরীর সাথে। ‘সমরেশ’ নামটি গৌরীরই দেয়া। তাঁরা যখন পালিয়ে বিয়ে করে সমরেশ তখন ১৮ গৌরী ২১। এই বিয়ে দুই পরিবারের কেউই মেনে নিলেন না। ফলে নৈহাটি থেকে চার মাইল দূরে আতপুরের পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে ২ টাকায় ঘর ভাড়া নিলেন। আতপুরে সমরেশের জীবন এক বড় বাঁক নেয়। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। জগদ্দল আতপুরের শ্রমিকপাড়া ও জীবিকার জন্য লড়াই নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার দিন যাপনের থেকে বহুলাংশেই আলাদা। এক পোলট্রি ফার্মের সঙ্গে কমিশনের শর্তে ডিম, মুরগি, সবজি বিক্রি করে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলেন। সপ্তাহে ৩-৪ দিন খাওয়া জোটে, বাকি দিন অভুক্ত অবস্থায় কাটে।

বিয়ের পর শুরু হয় জীবনের আসল যুদ্ধ সপ্তাহে তিন চার দিন খাবার জোটে তো বাকি দিনগুলোতে অভূক্ত থাকতে হয়। চরম দারিদ্রতায় সাহিত্য চর্চা ছাড়েননি তিনি। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এর ড্রইং অফিসে ট্রেজারের চাকরি পেলেন সমরেশ। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ৬ বছর এখানেই কাজ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। প্রথম সন্তান বড় মেয়ে বুলবুলের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় সন্তান বড় ছেলে দেবকুমারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। তৃতীয় সন্তান মেজছেলে নবকুমারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর। চতুর্থ সন্তান ছোট মেয়ে মৌসুমীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর। এর পাশাপাশি বারাকপুরে জুটফ্রন্টে পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন। সমরেশ আর গৌরী পার্টি সদস্যপদ লাভ করলেন। সংগঠনের কাজের ফাঁকে ‘উদয়ন’ পত্রিকায় আঁকা ও লেখা শুরু করলেন। উদয়ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম ছোটগল্প ‘শের সর্দার’ প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। উদয়ন পত্রিকা তো আছেই, সবচেয়ে বড় ঘটনা ১৯৪৬ সালে শারদীয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘আদাব’ গল্প প্রকাশের সময়। উদয়ন পত্রিকার জন্য আদাব গল্পটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু গৌর জোর করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় গল্প পাঠিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে ওই অর্থে সমরেশের প্রবেশ এ গল্পের মধ্য দিয়েই। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে সমরেশ ও তাঁর পরিবারকে আবারও দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হয়। একই বছর চৌদ্দই ডিসেম্বর সমরেশ গ্রেফতার হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে এক বছর কারাবাস করেন। তিনি বন্দি থাকায় সংসার অচল। মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বিপর্যস্ত গৌরী দেবী। তিনি বন্দি সমরেশের পরিবারের জন্য দেড়শ’ টাকা মাসোয়ারার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। কারমুক্ত হয়ে সমরেশ নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন নিঃসঙ্গ ও বেকার মানুষ হিসেবে। এখান থেকেই তাঁর লেখার সংকল্প জেগে ওঠে। লিখেই জীবন বাঁচাতে মনেপ্রাণে তিনি প্রস্তুত হতে থাকলেন। চারটি নাম নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমরেশ পদচারণা করেছেন- সমরেশ বসু, কালকূট, অশোক ঠাকুর ও ভ্রমর।

বাল্যকালে সমরেশের দারুণ ইচ্ছা ছিল আর্টিস্ট হওয়ার। তাই ছাত্র জীবনে কয়েক বন্ধু মিলে হাতে লেখা কয়েকটা ম্যাগাজিনে গল্প, বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি ছাপাতেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অলঙ্করণও করতেন। তারপর কৈশোর থেকে যৌবন। ওই সময় সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক এলো। বিভিন্ন গল্প, প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন। তাঁকে ছবি আঁকা থেকে
লেখালেখির জগতে নিয়ে আসেন ‘সত্য মাস্টার’। এদিক থেকে বলা যেতে পারে, ‘সত্য মাস্টার’ এর সঙ্গে সমরেশের সাক্ষাৎ বাংলা সাহিত্যেরই এক মাইলফলক। এর মধ্যেই সমরেশের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’ প্রকাশ পায়। তিনি এর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এ চাকরিকালে। তা রূপ পেয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকাকালে। ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাস বিক্রি করে শোধ করলেন এক বছরের বাড়ি ভাড়া। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিটি রোড়েব ধারে’। এরপর ‘শ্রীমতী কাফে’। প্রথম গল্প সংকলন ‘মরশুমের একদিন’।

সমরেশের প্রথম লেখা উপন্যাস ‘নয়নপুরের মাটি’। ‘উত্তরঙ্গ’-এর বহু আগে (১৯৪৬ সালে) ওই বই লেখা। সাহিত্য আসরের দরজার চৌকাঠটা তখন দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলেন তিনি। বছরখানেক ধরে উপন্যাসটির অংশ ‘পরিচয়’ মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। নানান কারণে তা মাঝপথেই থেমে যায়। অনেক দিন পর আবার তা বই আকারে প্রকাশিত হয়।  সমরেশ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ‘সাতকড়ি মাসী’ আর ‘জয়নাল’সহ বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন ‘তরণি’ পত্রিকায়। গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পার্টির বিরাগভাজন হন। পার্টির সঙ্গে ক্রমেই তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তলানিতে এসে ঠেকে। তাকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে ‘গঙ্গা’ উপন্যাস।

১৯৫৮ সালে সমরেশ সাহিত্যে ‘আনন্দ’ পুরষ্কার পেলেন। উদ্দ্যম গতিতে এগিয়ে চলে লেখলেখির কাজ। এরই মাঝে সমরেশ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ছোট শ্যালিকা ধরিত্রীর সাথে। সমরেশ তখন চার সন্তানের পিতা। কল্যাণীতে স্ত্রী গৌরী বসু ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভরা সংসার। ওই সময়ই ছোট শ্যালিকার সঙ্গে শরীর ও মনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গৌরী ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে আর ধরিত্রী ওরফে টুনি সবচেয়ে ছোট, প্রায় সমরেশের মেয়ের বয়সীই। লোকলজ্জার কথা ভাবলে, হয়তো সব দায় ঝেড়ে ফেলে তিনি বেরিয়ে আসতেই পারতেন। কিন্তু ওই পথে হাঁটেননি। ভারতীয় প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু পরকীয়ার জেরে শ্যালিকাকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৪ই মার্চ এবং দুই বোনকে নিয়ে একসঙ্গে সংসার করেছিলেন। এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গৌরী তথা সমরেশের স্ত্রী, ধরিত্রীর দিদি। সমরেশের দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি দিলেন। বুক ফেটে গেলেও মেনে নিলেন নিজের বোনের সঙ্গে স্বামীর বিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের সময় সবার মত সমরেশও আন্দোলিত হয়ে ছিলেন। তখন বাংলা সাহিত্যে রাজা বাদশা ছিল না, তিনিই ছিলেন যুবরাজ। সমরেশ বসুর মত ব্যাক্তিরা বাউ-েলে বলেই জীবনকে দেখতে পেরেছিলেন নানা বৈচিত্র্যে, তুলে আনতে পেরেছিলেন পানাপুকুর, কখনও জমিদার বাড়ির খিলান থেকে কখনও বা ট্রাক ড্রাইভারের ডেরা থেকে জীবনাবর্তন।
জীবনের বৈচিত্র্যতা খুঁজে ফেরার মাঝেই ১৯৮৮ সালের ১২ই মার্চ নিজের জীবনরে পরিসমাপ্তি ঘটে। ৪০ বছরের কিছু সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। হয়তো ভবঘুরে হয়েই যদি আরো কিছুকাল আনাগোনা করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতো।

 

পেইনটিং অমিত রায়

এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন...

ফরিদা পারভীন

 

আমার জন্ম নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার শাঐল গ্রামে ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বাবা মৃত ডা. দেলোয়ার হোসেন ও মা মৃত রউফা বেগম। বাবা সরকারি চিকিৎসা পেশায় থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলাশহরে আমাদের থাকতে হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমার একটা টান ছিল। মা-বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদর-যত্ন বেশি পেতাম। আমার আবদার তারা রাখতেন। আমাদের বাসা তখন মাগুরায়। পাশের বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল। আমিও বাবার কাছে হারমোনিয়াম চাইলাম। কিন্তু দিই-দিচ্ছি করে গড়িমসি করতে লাগলেন। অবশ্য ভেতরে ভেতরে চাইতেন তার একমাত্র সন্তান গানের সঙ্গে জড়িত হোক। তিনিও গান পছন্দ করতেন। এক পর্যায়ে বাড়িতে মিস্ত্রি ডেকে এনে হারমোনিয়াম বানিয়ে দিলেন। আর যার কাছে আমার হাতেখড়ি তিনি হচ্ছেন মাগুরার কমল চক্রবর্তী। তার মাধ্যমেই আমার শুরু গানের পথচলা। 


আজ পর্যন্ত কত গান গেয়েছি এর হিসাব রাখিনি। তাছাড়া সংখ্যা দিয়ে তো শিল্পীর মান বিচার করা যায় না! যেমন- বলা যেতে পারে, অনেক গান আছে। তবে শুনতে একটি গানও ভালো লাগে না। ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের ভাষায়- কুকুর অনেকগুলো ছানা প্রসব করে। কিন্তু সিংহের শাবক বেশি হয় না। যে কয়টা গান আজ পর্যন্ত গেয়েছি এর সংখ্যা বেশি না হলেও মানুষের মনে গেঁথে আছে। ভালোবাসা দিয়ে শ্রোতার হৃদয়ের কাছে অবস্থান করে নিয়েছে। সঙ্গীত যেহেতু গুরুমুখী বিদ্যা সেহেতু বেশ কয়েকজন ওস্তাদের কাছে আমার তালিম নেয়া হয়। ওস্তাদ ইব্রাহিম খাঁ, ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, ওস্তাদ ওসমান গণী, ওস্তাদ মোতালেব বিশ্বাসসহ প্রায় সবাই আমাকে ধ্রুপদী (ক্ল্যাসিকাল) গান শেখাতেন। নজরুল সঙ্গীতের গুরু হলেন ওস্তাদ আব্দুল কাদের ও ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী।

কিন্তু স্বাধীনতার পর আমার লালন সাঁইজির গানের গুরু হচ্ছেন মোকসেদ আলী সাঁই। তার কাছে সাঁইজির গানের শিক্ষা নিই। অনেকটা অনিচ্ছাকৃত ছিল এই তালিম। লালন সাঁইজির জীবদ্দশায় তার অনুসারীদের নিয়ে দোল পূর্ণিমায় মহাসমাবেশ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ দেশে স্বাধীনতার পর ওই অনুষ্ঠানে গান করার জন্য আমার গুরু মোকসেদ আলী সাঁই অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেটিও সাঁইজির একটি গান যা শিখে শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করি। ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ গানটি তখন এতো জনপ্রিয়তা পেল যে, সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিলাম সাঁইজির গানই গাইবো। তখন যে অনুভূতি আমার হয়েছিল সেটি বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু এখন পর্যন্ত উপলব্ধির মধ্যেই আছে। আর তখন থেকেই লালনকে লালন করে চলেছি।


আগেই বলেছি, লালন সাঁইজির গানে আমার কোনো ভালোবাসা ছিল না। আল্লাহর অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। তা হলো, এখনো যেখানেই অনুষ্ঠান করি না কেন, সর্বত্রই দেশপ্রেমের গান দিয়েই শুরু করি এবং সঙ্গতকারণেই লালন সাঁইজির গান দিয়ে শেষ করি। কারণ মায়ের কাছে একাধিক সন্তান যেমন স্নেহে আবদ্ধ থাকে ঠিক তেমনি আমার কাছে দেশাত্মবোধক গান আর লালন ফকিরের গান সমানভাবে সন্তানের মতো। আবু জাফর সম্পর্কে আমার কিছু কথা বলবো। তিনি অনেক বড় মাপের গীতিকার ও সুরকার। যেসব গান লিখেছেন, সব কালজয়ী। যদিও তার গানের সংখ্যা খুব বেশি নয় তবুও বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ যতদিন থাকবে পৃথিবীজুড়ে ততদিন তাদের কাছে আবু জাফরের দেশপ্রেম ও প্রেম পর্যায়ের গানগুলো কখনোই বিস্মৃত হবে না।


অনেক গীতিকারের গান গাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কবি নাসির আহমেদ, সাবির আহমেদ, কবি জাহিদুল হক, যামিনী কুমার দেবনাথ অন্যতম। আমি চার সন্তানের জননী। সবার বড় হচ্ছে মেয়ে জিহান ফারিয়া মিরপুর বাংলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক, বড় ছেলে ইমাম নিমেরি উপল সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র অফিসার, মেজছেলে ইমাম নাহিল অস্ট্রেলিয়ান এমবাসির কর্মকর্তা ও ছোট ছেলে ইমাম জাফর নোমানী উত্তরা ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।


সংগীতের কথা আমি সব সময়ই বলবো। কারণ সংগীত নিয়েই আমার সব জল্পনাকল্পনা। তবে সংগীতের ক্ষেত্রে বলতে হয়, বিশুদ্ধ সংগীত হলো গুরুমুখী বিদ্যা। এর সঙ্গে নিষ্ঠা, সততা তো লাগবেই, অধ্যবসায়ও জরুরি। এ জন্য গুরুর চরণ ধরে পড়ে থাকতে হয়। কোনো মানুষ- সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। মানুষ শুধু চেষ্টা করে যেতে পারে মাত্র। গানের মধ্যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। অপ্রাপ্তি বলে কিছুই নেই। যা আছে, সবই প্রাপ্তি। আর তা হলো ১৯৮৭ সালে ‘একুশে পদক’, ১৯৯৩ সালে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (অন্ধপ্রেম), ২০০৮ সালে এশিয়ার নোবেলখ্যাত জাপানের ‘ফুকুওয়াক কালচারাল অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তি। এছাড়া দেশ-বিদেশের অসংখ্য পদক-সম্মাননা আমার প্রাপ্তির ভা-ারটি ভরে তুলেছে। ২০১০ সালে বাংলা
একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হই।


সঙ্গীত নিয়েই আমার যত ভাবনা। এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন। তাই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছি। এখানে বেশ কয়টি প্রজেক্ট চালু আছে। সেগুলো হলো অচিন পাখি, বাঁশি, অন্যান্য যন্ত্র (একুস্টিক), গবেষণা, স্বরলিপির কাজ, স্টাফ নোটেশন, আঁকাআঁকি ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে ওই ফাউন্ডেশনে লালনের দর্শন নিয়ে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আছি। এ প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এখন শিকারি হিসেবে অনেক চ্যানেল অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। কাজটি প্রথমত ভালো। কিন্তু পরে ওই ধারা টিকে থাকছে না। এর কারণ হচ্ছে অল্পতেই অর্থ হস্তগত করা, ভালোভাবে না শিখেই নাম করার প্রবণতা। এ জন্য দায়ী করবো তাদের মা-বাবাকে। এ কথা এ কারণেই বলছি, অনেক ছেলেমেয়ে একেবারে অর্থহীনভাবে বেড়ে ওঠে। অথচ ওই পরিমাণ জ্ঞান তারা রাখে না। বলা যায়, কেউ কেউ শুধু অর্থের মোহে পড়ে রেওয়াজ করাই ছেড়ে দেয়। সঙ্গীত যে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রতিষ্ঠা পায় এ নিয়ম-নীতি ওইসব বাবা-মা তাদের সন্তানদের শেখান না। আর সন্তানরা তো চিরকালই অবুঝ! সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়। তা হলো, সঙ্গীত আধ্যাত্মিকতার বিষয়। এটি এতো সহজে ধরা যায় না। অনেক অধ্যবসায় ও অনুশীলন দিয়েই অর্জন করা যায় সুর। আমি বলবো, আগামী প্রজন্মের যারা গান করবে তাদের বেশি করে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রতিদিন রেওয়াজ করতে হবে। সর্বোপরি সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। তবেই গান হয়ে উঠবে প্রকৃত গান।

গোফ গপ্পো

 

সেই প্রস্তর যুগে পাথরের ক্ষুর দিয়ে মানুষের ক্ষৌরি করার প্রচলন শুরু হয়। সম্ভবত তখনই মানুষের মধ্যে গোঁফ নিয়ে ফ্যাশন করার ধারণার গোড়াপত্তন ঘটে। অবশ্য খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে প্রথম গোঁফ রাখার খোঁজ মিলেছে। গোঁফ হলো পুরুষের নাকের নিচে এক চিলতে রোমশরেখা। তা কারো সরু, কারো মোটা, কারো গাঢ়, কারো আবার পাতলা। অথচ ওই এক চিলতে জিনিসই নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাট পার্থক্য গড়ে দেয়ার এক মোক্ষম ‘অস্ত্র’! একই সঙ্গে আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও অস্ত্র।
গ্রিক Mustak শব্দ থেকে গোঁফের ইংরেজি Moustache শব্দের উৎপত্তি। Mustak অর্থ উপরের ঠোঁট। পুরুষের মুখে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত চুল গজায়। এর মধ্যে গোঁফে থাকে ৬০০টির মতো। গোঁফ গজানো বা কম-বেশি হওয়ার পেছনে যে হরমোনটি ‘দায়ী’ এর নাম টেস্টোস্টেরন। এই গোঁফ মহাশয় আবার বড্ড আলসে। প্রতিদিন গড়ে মোটে ০.০০১৪ ইঞ্চি করে বাড়ে। আর বছরে বাড়ে ৫-৬ ইঞ্চি করে।


আদিকাল থেকেই গোঁফ মানুষের বড় এক আলোচনার বিষয়বস্তু। জনপ্রিয় ছড়াকার সুকুমার রায় তার ‘গোঁফ চুরি’ ছড়ায় তো ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেনÑ

‘গোঁফকে বলে তোমার আমার, গোঁফ কি কারো কেনা?
গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ‘গোঁফ এবং ডিম’ প্রবন্ধে গোঁফের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গোঁফ নিয়ে বাংলায় প্রবাদ-প্রবচনের শেষ নেই। গোঁফ খেজুরে, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল, গোঁফে তা দেয়া, শিকারি বিড়াল গোঁফে চেনা যায় ইত্যাদি প্রবাদ দৈনন্দিন ঘুরে বেড়ায় আমাদের মুখে। তবে শুধু শিকারি বিড়ালই নয়, গোঁফ দিয়ে চেনা যায় অসংখ্য জনপ্রিয় মানুষকেও। তাদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আশ্চর্য একজোড়া গোঁফ!
যাদের আইকনিক ট্রেডমার্ক গোঁফ তাদের তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে উপরের দিকে থাকবেন স্যার চার্লি চ্যাপলিন ও অ্যাডলফ হিটলার। দু’জনই প্রায় একই রকম অদ্ভুতুড়ে গোঁফধারী ছিলেন। কিন্তু একজন পুরো পৃথিবীতে দিয়েছেন হাসির খোরাক, অন্যজন দিয়েছেন কান্নার উপলক্ষ। জনগণের দৃষ্টি আলাদাভাবে আকর্ষণের জন্য হিটলারের দুর্দান্ত উপায় ছিল তার ওই অদ্ভুত গোঁফের ফ্যাশন। ১৯২৩ সালে নাজি প্রেস সেক্রেটারি ড. সেজুইক অবশ্য হিটলারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন একটি স্বাভাবিক গোঁফের ছাঁট লাগাতে। হিটলার উত্তর
দিয়েছিলেন এভাবেÑ ‘আমার গোঁফ নিয়ে একদম ভাবতে হবে না। যদিও এটি এখনো ফ্যাশন হয়নি তবুও এক সময় ঠিকই ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াবে!’
গোঁফ থেকে বিচ্ছুরিত আত্মবিশ্বাস!!
রাজা-বাদশাহরা প্রচুর সময় নষ্ট করতেন ওই গোঁফের পেছনে। এছাড়া প্রচুর অর্থও নাকি ঢালতেন। বড় ও বাহারি গোঁফ ছিল শৌর্যের প্রতীক। মোগল বাদশাহদের ছিল শৌখিন গোঁফ। সম্রাট আকবরের গোঁফ ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। তাছাড়া সুন্দর গোঁফ ছিল টিপু সুলতান, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলারও।
বিখ্যাত গুঁফোদের মধ্যে আরো আছেন সালভাদর ডালি, জোসেফ স্টালিন, চে গুয়েভারা প্রমুখ।

 

______________________

লেখা : তিয়াষ ইসতিয়াক
মডেল : নীল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

পারফিউম...

 

সুগন্ধি ব্যবহারের প্রচলন সুপ্রাচীনকাল থেকে। মানুষ এক সময় বিভিন্ন সুগন্ধি ফুল আর লতা-পাতার নির্যাস সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করত। প্রাচীনকাল থেকে সুগন্ধি উদ্ভাবনের ইতিহাস খুঁজলে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার এক কেমিস্ট ‘টাপুট্টি’র নাম পাওয়া যায়। তাকে সর্বপ্রথম সুগন্ধি তৈরিকারক হিসেবে ধরা হয়। এরপর সভ্যতা থেকে সভ্যতার হাত ধরে এগিয়েই চলছে সুগন্ধির জয়যাত্রা।
সুগন্ধি এমন একটা অনুষঙ্গ যা মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িত। মন খুশিতে ভরিয়ে দিতে পারে একটি ভালো সুগন্ধি। তা এনে দিতে পারে স্নিগ্ধ একটি অনুভব।
আধুনিককালে সুগন্ধির ঊন্মেষস্থল হিসেবে একচ্ছত্র অধিপতি ধরা হয় ইউরোপের ফ্রান্সকে। ওই দেশে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি তৈরি হয়ে থাকে। সুগন্ধি উদ্ভাবন ফ্রান্সের শিল্পসত্তার বিকাশ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জড়িত। বিশ্বের নামি-দামি সুগন্ধি প্রস্তুতকারকরা ফ্রান্সের অধিবাসী। ২০০৬ সালে টমটাইকার পরিচালিত ‘পারফিউম : দি স্টোরি অফ অ্যা ম্যার্ডারার’ মুভিটি দেখেনি এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। এ মুভিটিতে আমরা খুঁজে পাই পাগলপ্রায় ঠা-া মাথার এক খুনির সুগন্ধি
উদ্ভাবনের শিহরিত পথচলা।


এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, একটা সময় ছিল যখন সুগন্ধির ব্যবহার শুধু সমাজের অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সুগন্ধি ছিল শুধু বিলাসিতার অঙ্গ। এর পেছনে কারণও ছিল। আগে সুগন্ধি তৈরির নির্যাস ও কাঁচামাল ছিল দুর্লভ এবং অনেক দামি। এর মানে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখন কৃত্রিম উপায়েই এসব কাঁচামাল ও নির্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সুগন্ধি তৈরি ও এর ব্যবহার এখন অনেকটাই সহজলভ্য। তাই সুগন্ধির ব্যবহার এখন শুধু বিলাসিতার অংশ নয়, বরং সব বয়সের মানুষের কাছে ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত নিত্যনতুন সুগন্ধি তৈরির ফর্মুলা ও উপকরণ সুগন্ধি ব্যবহারের আবেদনটি বাড়িয়ে তুলেছে সবার মধ্যে।
আমাদের দেশের আবহাওয়া নাতিশীতাষ্ণ হলেও গরমের প্রভাব বেশি। গরমে ঘাম হবেÑ এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সুগন্ধি শুধু যে ঘামের দুর্গন্ধ এড়াতেই কাজ করে তা নয়, বরং এর পরশে আমরা হয়ে উঠতে পারি আরো সতেজ ও প্রাণবন্ত।
এ দেশে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে বিকশিত হয়েছে সুগন্ধির বাণিজ্য। এর আগে এ দেশের বিশ্বখ্যাত সব ব্র্যান্ডের ভালো ভালো সুগন্ধি তেমন সহজলভ্য ছিল না। অনেকেই তাদের প্রিয় সুগন্ধিগুলো বিদেশ থেকে কিনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন আমাদের দেশেই নারী-পুরুষের জন্য আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি।
পুরুষের প্রিয় কিছু সুগন্ধির মধ্যে আছে লাকস্ত রেড, হুগো বস, বারবেরি, আজারো, আরমানি ইত্যাদি। অন্যদিকে নারীদের জন্য আছে গুচি, বুশেরন, স্যানেল, ডলসি গাবানা, এস্কাডা ইত্যাদি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি পাওয়া যায় ‘পারফিউম ওয়ার্ল্ড’-এর
আউটলেটগুলোয়।

 

_____________________
লেখা : সোনাম চৌধুরী
মডেল : রিবা হাসান
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কিউট ইন কুর্তি

 

ফ্যাশন পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর এই পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের পোশাক। তবে ফ্যাশনের কথা আসলেই একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে মেয়েদের পোশাকের কথা। নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাকের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার চেষ্টায় ছুটছে সবাই শপিংমলগুলোতে, কিনছে মনের মতো প্রিয় পোশাক। সব শ্রেণীর মেয়েদের কাছেই সালোয়ার কামিজ বেশ জনপ্রিয়। নারীরা সেলোয়ার কামিজে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। উপরি পাওনা হিসেবে জাকজমকপূর্ণ সালোয়ার কামিজে একটি নারী হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। শুধু উৎসবেই নয় যে কোন অনুষ্ঠানে সালোয়ার কামিজ পরে নিজেকে অতুলনীয় করে তোলা যায়। সুতরাং নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চলুন বেঁছে নিই পছন্দের সালোয়ার কামিজ। বর্তমান ট্রেন্ড-এ সেলোয়র কামিজের ডিজাইন নিয়ে আমাদের কথা হয়েছিল ‘ক্ষনিকা’র স্বত্ত্বাধিকারী ডিজাইনার মারিয়ান ফয়সালের সাথে।

মেরুন সিল্ক
সিল্কের এই কুর্তিতে রয়েছে একটু বড় চড়ষশধ উড়ঃ এর প্রিন্ট। বল গুলোর উপরে করা স্টোন ওয়ার্ক পোশাকটিতে এনেছে পার্টি আমেজ। ভিন্নতা আনতে কালো ছাড়াও এর সাথে গোল্ডেন কালারের দোপাট্টা ও স্যাটিনের পালাজ্জো ভাল লাগবে।

হলুদ
নজর কাড়া হলুদ এই কুর্তি আপনাকে অফিস কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় করবে স্বপ্রতিভ। ফুলস্লিভ হাতা, কর্ড পাইপিং আর ব্যান্ড কলারের সমন্বয়ে লিনেন এই কুর্তির নিচের অংশের বাম পার্শ্বে রয়েছে সাদা এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন অফ হোয়াইট বা সাদা রঙের সেলোয়ার।

 

 

লাল
লাল মানেই মন ভাল করে দেওয়া উজ্জ্বলতা তা সে হোক ‘লাল গোলাপ’ অথবা লাল জামা। ইউনির্ভাসিটি কিংবা অফিস ও সান্ধ্যকালীন আড্ডায় যে কোন ঈড়সঢ়ষবীরড়হ-এর মেয়েকে মানিয়ে যাবে। কাফতান গলা, ফোর কোয়ার্টার হাতার চড়ষশধ উড়ঃ এর লিনেন এই কুর্তিতে রয়েছে ব্ল্যাক এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন গাঢ় নীল বা সাদা পালাজ্জো।

সাদা
যেকোন দাওয়াতের অনুষ্ঠানে সাদা এই কুর্তি আপনার লুক-এ এনে দেবে জৌলুস। কাফতান গলা, লেস আর বাটনের কম্বিনেশনে এই কুর্তিটির গর্জিয়াস উপস্থাপন। সাথে পরতে পারেন বেইজ কালার পালাজ্জো ও দোপাট্টা।

বেগুনী
মেঘলা দিনের একঘেঁয়েমি ও উঁষষহবংং কাটাতে উজ্জ্বল বেগুনী এই কুর্তিটি পড়ে নিমিষেই নিজেকে চনমনে ও আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। মডেলের পরনে যে কুর্তিটি রয়েছে তা লিনেন কাপড়ের উপর ঈড়ৎফ পাইপিং দিয়ে করা। ইধহফ কলার আর ফুলস্লিভ হাতায় এই কুর্তির প্রধান আকর্ষন গাঢ় বেগুনীর উপর হালকা বেগুনী রঙের এমব্রয়ডারি যা অফিসে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় আপনার উপস্থিতি উজ্জ্বল করবে। কুর্তির সাথে পরতে পারেন বেগুনী অথবা সাদা রঙের শেডেড দোপাট্টা ও সালোয়ার।

ফ্লোরাল প্রিন্ট
ফ্লোরাল প্রিন্টেড এই কুর্তিতে লেস বসিয়ে আনা হয়েছে গর্জিয়াস লুক। যা সহজেই বিভিন্ন গেট টুগেদারে পরে যেতে পারেন। সাথে পরতে পারেন ডেনিম অথবা টাইটস্।

 

____________________________________

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত
মডেল : মহতী তাপসী ও সায়মা রুসা
পোশাক : ক্ষনিকা
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
সহজ স্টুডিও
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

 

Page 1 of 3

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…