Page 1 of 2

যে চলচ্চিত্র জীবনের কথা বলে: আলফ্রেড হিচকক

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্কু

 



টান টান উত্তেজনা, রহস্য, ভয় ও উদ্বেগের চলচ্চিত্র মানে আলফ্রেড হিচকক। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় একটি ধারার প্রবর্তক তিনি। উদ্বেগ, ভয়, কল্পনা অথবা সহানুভূতি ফ্রেমবন্দি করে চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেন বিশ্ব সিনেমার এই অভিভাবক। ‘সাইকো’, ‘দ্য বার্ড’ কিংবা ‘রেবেকা’র মতো অসংখ্য সিনেমার জনক তিনি। এখনো তার দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বের অনেক পরিচালক।
ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক স্যার আলফ্রেড যোসেফ হিচকক ১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনের এক রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভক্তিনিষ্ঠ ক্যাথলিক তিনি। তরকারি ও হাঁস-মুরগি বিক্রেতা উইলিয়াম হিচকক ও এমা জেন হোয়েলানের ছেলে আলফ্রেড হিচকক ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই উইলিয়াম ও  ছোট ভাই এলেন হিচককের সঙ্গে তিনি লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে লেইটন স্টোনে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা খুব নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের মধ্যে কেটেছে তার। তিনি মোটা ছিলেন বলে কেউ তার সঙ্গে খেলতে আসতো না। আর অল্প বয়সে এ রকম অদ্ভুত পরিস্থিতিই পরবর্তীকালে সৃষ্টি করেছে তার সিনেমাজুড়ে আতঙ্ক ও সাসপেন্স। বড় হয়ে তিনি হলেন মাস্টার অব সাসপেন্স ও রহস্যের জাদুকর। দর্শককে নিয়ে পিয়ানোর মতো খেলতে ভালোবাসতেন সাইকোলজিকাল থ্রিলারধর্মী ছবির এই নির্মাতা। চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনিই প্রথম থ্রিলার কিংবা ভৌতিক ছবির সফল ও আধুনিক রূপকার। আজও তার মুভিগুলো দর্শক, সমালোচকদের চিন্তার খোরাক জোগায়।

১৯২০ সালের দিকে এসে আলফ্রেড হিচকক আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের প্রতি। তিনি লন্ডনে ফিল্ম প্রডাক্টশনে কাজ করা শুরু করেন। ‘প্যারামাউন্ট পিকাচার-এর লন্ডন শাখায় টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর ‘ইসলিংটন স্টুডিও’তে কাজ করেন। টাইটেল কার্ড ডিজাইনারের কাজ করতে করতে
চিত্রপরিচালক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯২২ সালে। এ বছর ‘নাম্বার থার্টিন’ চলচ্চিত্রে হাত দেন তিনি। কিন্তু তার জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ১৯২৫ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’। এ চলচ্চিত্রটি ছিল ব্রিটিশ-জার্মান প্রডাক্টশনের। এটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর তাকে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। তিনি বিভিন্ন প্রডাক্টশনের ব্যানারে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যেতে থাকেন। আর চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তার নান্দনিকতা। সেই ষাটের দশকে এই মানুষ এমন সব অসাধারণ ছবি নির্মাণ করলেন, প্রযুক্তির এই যুগে তিনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই নাড়িয়ে দিতেন গোটা বিশ্ব!

১৯২৭ সালে মুক্তি পায় হিচককের চলচ্চিত্র ‘দ্য লডজার’। একই বছরের ডিসেম্বরে হিচকক বিয়ে করেন আলমা রিভিলিকে। হিচকক ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯২৯ সালে তার ‘ব্ল্যাকমেইল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ব্রিটেনে সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৮ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘দ্য লেডি ভেনিশেস’ ও ১৯৩৯ সালে ‘জ্যামাইকা ইন’। ১৯৪০ সালে হিচকক নির্মাণ করেন ‘রেবেকা’। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘রেবেকা’ সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল। তার করা এটিই একমাত্র চলচ্চিত্র যা সেরা চলচিত্রের পুরস্কার লাভ করে। ১৯৪২ সালে ‘সাবটিউর’ মুক্তির পর হলিউডে পরিচালক হিসেবে তার একটা শক্ত অবস্থান হয়। ১৯৪৩ সালে ‘শ্যাডো অফ ডাউট’টি তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। ১৯৪৪ সালে তার আরেকটি আলোচিত ছবি মুক্তি পায় ‘লাইফ বোট’। এতে দেখানো হয় কীভাবে একটি নৌকার আরোহীরা বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ১৯৫৫ সালে প্রচারিত ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্ট’-এর মাধ্যমেই তার পরিচিতি মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এটি ছিল মূলত একটি টিভি শো। সিরিজটি ১৯৫৫ থেকে শুরু হয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত টিভিতে চলাকালে ১৯৫৬ সালে তিনি নাগরিকত্ব পান যুক্তরাষ্ট্রের।

হিচকক ১৯৬০ সালে বিখ্যাত মনোজাগতিক বিকৃতি বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র ‘সাইকো’ নির্মাণ করেন যা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘দ্য মোমেন্ট অফ সাইকো’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করা হয় এটি। গোসলখানার ৪৫ সেকেন্ডের ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দর্শককে চিরকাল আতঙ্কিত করবে। হিচককের মুভির শেষে টুইস্ট অবশ্যম্ভাবী। ভীতি, ফ্যান্টাসি, হিউমার ও বুদ্ধিদীপ্ততাÑ এই চারের কম্বিনেশনে প্লটগুলো মূলত মার্ডার, অপরাধ, ভায়োলেন্সের ওপর নির্মিত। তিনি গোল্ডেন গ্লোব, সিনেমা জাম্পো অ্যাওয়ার্ড, লরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, ডিরেক্টরস গিল্ড অফ আমেরিকা অ্যাওয়ার্ড, আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যাওয়ার্ড, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড-এর মতো পুরস্কার পেয়েছেন। তবে সেরা পরিচালক হিসেবে কখনোই একাডেমি পুরস্কার পাননি।

১৯৬৮ সাল। হিচককের ক্যারিয়ার তখন পড়তির দিকে। তার সিনেমাগুলোও ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। তখন তার নামের প্রতি সুবিচার করতেই শুরু করলেন ক্যালাইডোস্কপ সিনেমার কাজ। খুন, ধর্ষণ, পেশিশক্তি, সিরিয়াল কিলিংয়ে ভরপুর এক থ্রিলার। ‘দ্য বার্ডস’-এ যে রকম তেমনি এটিতেও নতুন কিছু ফিল্ম টেকনিক প্রয়োগের পরিকল্পনা আঁটলেন। চিন্তা ছিল প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, স্ট্যান্ডের বদলে ক্যামেরা হাতে নিয়ে শুট করা এবং পয়েন্ট অফ ভিউ অ্যাঙ্গেলে শুট করার মতো ভাবনাগুলো। প্রি-প্রডাকশনে প্রচ- পরিশ্রম করার পরও শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। টাকার অভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেকের ফুটেজ নিয়ে অসমাপ্ত পড়ে রইলো ক্যালাইডোস্কপ। এর কিছু অংশ অবশ্য তিনি পরে ‘ফ্রেঞ্জিতে’ (১৯৭২) ব্যবহার করেন।

১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হিচকক পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের সঙ্গে ‘দ্য শর্ট নাইট’ নিয়ে কাজ করেন যা তার মৃত্যুর পর স্ক্রিনপ্লে হয়। তার অনেক চলচ্চিত্রেই নিজের একমাত্র মেয়ে প্যাট্রেসিয়া হিচকককে দেখা যায়। ‘এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি’ ম্যাগাজিনে বিশ্বের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে তার চলচ্চিত্র ‘সাইকো’, ‘ভারটিগো’, ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’, ‘নটোরিয়াস’ স্থান পেয়েছে।
১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আলফ্রেড হিচকক আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ‘লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পান।
১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল আমেরিকার ক্যার্লিফোনিয়ায় হিচকক ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর কাছ থেকে ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। স্যার আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্র, নির্মাণকৌশল পরবর্তীকালে অনেক বিখ্যাত পরিচালককে পথ দেখিয়েছে। চলচ্চিত্র যে কতো বড় একটা শিল্প হতে পারে, মানুষের কাছে এর মাধ্যমে কতোটা গভীরে পৌঁছানো যায় তা তিনি করে দেখিয়েছেন। তাই চলচ্চিত্রে সাসপেন্স, থ্রিলিংয়ের জগৎ সৃষ্টিকারী এ চলচ্চিত্রের বিস্ময়কর নির্মাতা আলফ্রেড হিচকক আজও চলচ্চিত্র দর্শক-নির্মাতাদের কাছে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন।

 


ছবি : ইন্টারনেট

অনন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান

শিরিন সুলতানা

 



দায়িত্বটা নিজেই নিয়েছিলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। জন্মের তিন বছেরের মাথায় যার মা এবং ১২ বছরে বাবা মারা যায় তাকে তো এতোটুকু দৃঢ় হতেই হয়। মা ফ্রিডেল এডলর বার্গম্যান কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি, ছোট্ট শিশুটির মনে কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি। তবে বাবা জ্যাস্টাস স্যামুয়েল বার্গম্যান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আগলে রেখেছিলেন মেয়েকে। ফটোগ্রাফির দোকান ছিল তার। মেয়ের প্রতিভা কিছুটা হলেও টের পেয়েছিলেন। তাই ছোট্ট শিশুর কিছু মোশন চিত্র রেকর্ড করেছিলেন তিনি। স্কুলের পাট চুকানোর পর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী হওয়ার।


যাকে নিয়ে এতো কথা তিনি হলেন প্রতিথযশা লাস্যময়ী অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যান। বলা হয়ে থাকে হলিউডকে দেয়া সে এক মহাশঙ্খ সুইডিশ উপহার। ১৯১৫ সালের ২৯ আগস্ট স্টোকহোমে জন্ম নেয়া এই তুখড় অভিনেত্রী মা-বাবা মারা যাওয়ার পর চাচার কাছেই মানুষ হয়েছিলেন। কৈশরেই তিনি বিভিন্ন ছবির এক্সট্রা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে গ্র্যাজুয়েট শেষ করার পর স্টকহোমের রিয়াল ড্রামাটিক থিয়েটার স্কুলে স্কলারশিপ পান। এ সময় তার মঞ্চে অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রে প্রথম পদার্পণ করে ‘মুন্কব্রোগ্রেভেন’ সুইডিশ ছবিটির মাধ্যমে। খুব একটা নামডাক না হলেও অভিনেত্রী হিসেবে একটা জায়গা তৈরি হয় তার।


১৯৩৬ সালে ইনগ্রিডের জীবনের মোড় ঘুরে যায় গুস্তাফ মোলান্ডারের ‘ইন্টারমেজো’ ছবিতে অভিনয় করে। দারুণ ব্যবসা সফল ছবিটি সাড়া ফেলে সুইডেনে। বিখ্যাত হন ছবির সঙ্গে ইনগ্রিডও। মুগ্ধতায় আবেশিত হয় হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক ডেভিড সেলজনিকও। ছবিটি হলিউডে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দেন সেলজনিক। এই একটি ছবি করেই সুইডেনে ফেরার কথা ছিল ইনগ্রিডের। সেখানে তার ডেন্টিস্ট স্বামী ডা. পিটার লিন্ডস্ট্রোম ও কন্যা পিয়াকে রেখে এসেছিলেন। এদিকে হলিউড ভার্সন ‘ইন্টারমেজো : দ্য লাভ স্টোরি’ (১৯৩৯) বক্স অফিস হিট হয়। তারকাখ্যাতি ও হলিউডে থিতু হওয়ার হাতছানি ইনগ্রিডকে মোহাচ্ছন্ন্ করে ফেলে। সেলজনিকের অনুরোধে হলিউডে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জহুরি চোখ ভুল করেনি। প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার সেলজনিক সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন ইনগ্রিডকে। ওই সাত বছরে তিনি মাত্র দুটি ছবিই নির্মাণ করেছিলেন ইনগ্রিডকে নিয়ে। ‘গান উইথ দ্য উইন্ড’ (১৯৩৯) ও ‘রেবেকা’ (১৯৪০) ছবি দুটিই একাডেমি পুরস্কার পায়। ধীরে ধীরে ইনগ্রিডের লস্যময়ী নারীসুলভ, প্রেয়সীর ইমেজের ছোট্ট চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হয় সমগ্র হলিউডে তথা আমেরিকায়।

১৯৪২ সালে নির্মিত হয় কালজয়ী চলচিত্র ‘ক্যাসাব্লাংকা’। ইনগ্রিডের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন হামফ্রে বোগার্ট। হলিউড চলচ্চিত্রে এই ছবিকে মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ছবিতে বোগার্টের সঙ্গে ওই অন্তরঙ্গতা, চুম্বন দৃশ্য, চাহনি, গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস সন্তর্পণে লুকানোÑ সবকিছুই যেন দর্শকের মন ও মগজে ঠাঁই করে নেয় অবলীলায়। দর্শক বুঁদ হয়ে আটকে যায় বার্গম্যানের সাবলীল অভিনয়ের ফাঁদে। এলসা নামের সারল্যমাখা রমণীর ওই চরিত্রকে ইনগ্রিডের অভিনিত শ্রেষ্ঠ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিয়মানুবর্তিতাÑ সবকিছুর সমন্বয়ই তাকে শিখরে পৌঁছানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ওই সময় অন্য অভিনেত্রীরা যখন মেকআপের ভারে, পোশাকের চাকচিক্যে ন্যুব্জ হয়ে থাকতেন তখন ইনগ্রিড প্রায় মেকআপহীন সাধারণ পোশাকের মহিমায় হয়েছে উদ্ভাসিত। সম্পূর্ণ বিপরীতধারা থেকেই তিনি জয় করেছেন হাজারো দর্শকের হৃদয়। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দারুণ খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি।


১৯৪৩ সালে একটি মাত্রই ছবি করেন বার্গম্যান। আর্নেস্ট হোমিংওয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ ছবির মারিয়া চরিত্রটি প্রায় লুফে নেন তিনি। চরিত্রের ক্ষুধা তখন তাকে পেয়ে বসে। ইনগ্রিডের চিরচেনা রূপ থেকে বেরিয়ে এসেও ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুলের মারিয়া দারুণ আবেদনময়ী হিসেবে ধরা দেয়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। ওই বছর খালি হাতে ফিরলেও পরের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কারটি চলে আসে তার ঝুলিতে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ইনগ্রিড বার্গম্যান আমেরিকার সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী দুই বছরে আলফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ ও ‘নটরিয়াস’ ছবি দুটিতে অনবদ্য অভিনয় করেন তিনি। ফলে সাফল্যের মুকুটে হতে থাকে নতুন নতুন পালকের সাবলীল সংযোজন।


প্রত্যেক শিল্পীর কিছু স্বপ্নের চরিত্র থাকে। ‘জায়ান অফ আর্ক’ ছবির জোয়ান চরিত্রটি তেমনই ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ ছিল ইনগ্রিডের। দরিদ্র ফরাসি জোয়ান (পরে সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে) চরিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কাঠখড় পুরিয়েছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পায় চরিত্রটি। ইনগ্রিডের পালে তখন নতুন হাওয়ায় তর তর করে এগিয়ে চলছে সাফল্যের তরী। হঠাৎই যেন জমাট মেঘের ষড়যন্ত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে ইটালিতে পাড়ি জমান ‘স্টমবলি’ ছবির শুটিংয়ের জন্য। পরিচালক রবার্তো রসেলিনের কাজে আগে থেকেই মুগ্ধ ছিল তিনি। জীবনটা যেন ওলট-পালট হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তার। না হলে সাফল্যের চরম শিখরে বসে, স্বামী-সন্তান তুচ্ছ করে প্রেমেই বা পড়বেন কেন রসেলিনের। তুমুল ওই প্রেমের পরিণতিতে সন্তানসম্ভাবা হয়ে পড়েন তিনি। এ খবর চাউর হতে সময় লাগে না। পুরো আমেরিকা হতবাক হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে জানার পর। হলিউডপাড়া থেকে সিনেট পর্যন্ত তুমুল ঝড় বয়ে যায়। যাকে সাক্ষাৎ দেবীর আসনে বসিয়েছে বিশ্ববাসী, যে রমণী নারীত্বে মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন নিজেকে তার এমন অধঃপতন (!) দর্শক মেনে নিতে পারে না কিছুতেই। সবাই বয়কট করেন ইনগ্রিডকে। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে ‘স্ট্রমবলি’ (১৯৫০)।


এমনতর প্রক্রিয়ায় ইনগ্রিড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে জোয়ান অফ আর্ক হিসেবে, সন্ন্যাসী হিসেবে দেখে। আমি তা নই। আমি শুধু একজন নারী, একজন মানুষই।’ এতো ঘটনায় ইটালিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিনি। পরবর্তী সাত বছর এখানেই কাটিয়ে দেন রোসেলিনের সঙ্গে। এ সময় তাদের এক পুত্র ও যমজ কন্যা সন্তানের জš§ হয়। সাত বছর পর যেন ফিনিক্সের মতোই উঠে দাঁড়ান ইনগ্রিড। ১৯৫৬ সালে আবারও সদর্পে হাজির হন হলিউডে ‘অ্যানাস্টাশিয়া’ ছবির টাইটেল চরিত্রে অভিনয় করে। পুরো ছবিটি চিত্রায়িত হয় ইংল্যান্ডে। ততো দিনে রবার্তোকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল স্তিমিত হয়েছে। অভিমানে মুখ ফেরানো দর্শক আবার ভালোবাসার আলিঙ্গনে বাঁধে ইনগ্রিডকে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার ধরা দেয়। তার জীবনে দীর্ঘ সাত বছরের অভিশাপ যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ছবিটি। ষাট থেকে সত্তরের দশক তিনি অক্লান্ত কাজ করে যান। পেছনের ভুল সুধরে নিতেই এ অবিরাম চলা। ১৯৭৪ সালে আবারও ওই প্রাপ্তি। ‘মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ ছবিতে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার ঘরে তোলেন। শেষ বয়সে সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক যোগ হয় ‘অটাম সানাটা’ দিয়ে।
১৯৭৪ সালে ধরা পড়ে তার ব্রেস্ট ক্যানসার। কর্কট কামড়কে উপেক্ষা করেই টিভি সিরিজ ‘অ্যা ওম্যান কল্ড গোল্ড’ শেষ করে ইনগ্রিড। অবশ্য ছবির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। জীবন নদীর ওপার থেকে তিনি কি শুনতে পেয়েছিলেন, অ্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলো?


ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছরের মাথায় ঠিক তার জন্মদিনেই ১৯৮২ সালে ৮৭ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান ইনগ্রিড। বরফরাজ্যে জন্ম নেয়া রাজস্বী ওই নারী আজন্মের ঠাঁই করে নিয়েছেন লাখো দর্শকের হƒদয়ে।

ছবি : ইন্টরনেট

হোয়াইট বেলুন

তিয়াষ ইসতিয়াক

 



বহু বছর ধরে ইরানের সিনেমা বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়ের নাম! একদমই সাদামাটা কিছু গল্প যে কী করে হৃদয়ের অলিন্দে ছড়িয়ে যাবে, এক চিলতে কিছু অনুভূতি আশ্চর্য রকম ক্ষিপ্রতায় মগজের কোষে কোষে কখন যে জায়গা করে নেবে তা টেরই পাওয়া যায় না! ইরানের সিনেমাগুলোয় এই এক বৈশিষ্ট্য- দেখার সময় আপনার মনে হবে যেন পাশের বাসায় ঘটে যাওয়া গল্পটা কিংবা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা দেখছেন।
পরিচালক রিলে ভাসিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে এক আশ্চর্য চেনা জগতে যেখানে সময় স্থির! জীবনটা যে কী আশ্চর্য সহজ কিন্তু রঙিন হয়ে ধরা দেয় তা কল্পনাই করা মুশকিল!
এমনই এক সিনেমার কথা বলবো আজ। এর পার্সিয়ান নাম ইধফশড়হধশব ঝবভরফ এবং ইংরেজিতে তা হয় ঞযব ডযরঃব ইধষষড়ড়হ (সফেদ বেলুন)। এটি ১৯৯৫ সালের ড্রামা সিনেমা। ইরানের অন্য দশটি ছবির মতো এটিও এক অতি সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী। ইরানে নববর্ষের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি তখন। মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়ে পরিবারের ছোট্ট মেয়ে রাজিয়ার চোখ আটকে যায় এক সুন্দর গোল্ড ফিশের ওপর। এরপর থেকে মায়ের কান ঝালাপালা করে দিতে থাকে ওই ১০০ তোমান (ইরানের মুদ্রা) দামের গোল্ড ফিশটির জন্য! কিন্তু মা অনড়। দারুণ হিসাবি সংসারে একটা শৌখিন মাছের জন্য ১০০ তোমান খরচ করা বড্ড বোকামি। তাছাড়া বাড়িতে কয়েকটা গোল্ড ফিশ তো আছেই। কিন্তু বাজারের গোল্ড ফিশগুলো বেশ নধরকান্তি। রাজিয়ার ভাষায় নতুন বৌয়ের মতোই সুন্দর!


অবশেষে নানান প্রলোভন দেখিয়ে ভাইকে দিয়ে মাকে রাজি করাতে পারে ছোট্ট মেয়েটি! মা ৫০০ তোমান দিয়ে বলে ৪০০ তোমান যেন ঠিক ঠিক ফিরিয়ে আনে। রাজিয়া যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়! তখনই ছুট লাগায় পছন্দের মাছটি কিনতে। পথে বেশকিছু উটকো ঝামেলা পোহানোর পর ওই কাক্সিক্ষত দোকানে পৌঁছায় সে। কিন্তু আরেক সমস্যা বাধায় দোকানি। সে এখন মাছটির জন্য দাবি করে বসেছে বাড়তি দাম। ঠিক যেন উৎসবের সময় আমাদের দেশের দোকানিদের মতো! কঠিন বাস্তবতার ওপর ভীষণ মন খারাপ করে রাজিয়া নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলো, ওই মহামূল্যবান ৫০০ তোমানের নোটটি উধাও!
এখন ছোট্ট মেয়েটি কী করবে! শখের মাছটা কি কেনা হবে না? বাড়ি গিয়ে মাকেই বা কী বলবে? এই ভরাবাজারে একটা নোট কীভাবে খুঁজে পাবে ছোট মানুষ রাজিয়া?

কী আছে এই সিনেমায়? হলিউডের সিনেমার মতো ঘাগু হাতে করা ক্যামেরার তাজ্জব করে দেয়া কারিকুরি নেই, সিজিআই আর স্পেশাল ইফেক্টের দুর্ধর্ষ কাজ নেই, নেই বলিউডের গ্ল্যামারের চাকচিক্য কিংবা চমকদার কৃত্রিম আবেদন। নামি-দামি কোনো অভিনেতাও নেই। আছে কয়েকটা লং, ক্লোজ ও কিছু মাস্টার শর্টের কাজ। তাহলে এই সিনেমা কেন দেখতে হবে? ওই সিনেমায় আসলে আছে জীবন। আছে আশ্চর্য প্রাণবন্ত অভিনয়! ছোট্ট রাজিয়ার ভূমিকায় আইদা মোহাম্মদখানি-র অভিনয় দেখার জন্যই ওই সিনেমা দশবার দেখা যায়! ওই সময় আইদা-র বয়স ছিল মোটে সাত বছর! সাত বছরের একটি ছোট মেয়ে কীভাবে এতো অসাধারণ অভিনয় করেছে তা ভেবে কূল পাবেন না নিশ্চিত। মিষ্টি একটা চেহারা এবং অমন নিষ্পাপ একটা চাহনি দিয়ে মন জয় করবেই আপনার! আর এক্সপ্রেশন? দশে একশ’! অনেক বড়
অভিনেতার সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে সে।

ঠোঁট উল্টে অভিমানি একটা ভঙ্গি করে মায়ের কাছে কীভাবে যে টাকা চায়! টাকা হারিয়ে ফেলার পর তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দৃশ্যগুলায় দর্শকের চোখে বাষ্প জমায়। বড্ড মায়া লাগে। ইচ্ছা হয় রাজিয়াকে মমতায় জড়িয়ে ধরে চোখ-মুছে আদর করে ১০০টি গোল্ড ফিশ কিনে দিতে! টাকাটা হাতে পাওয়ার পর দুনিয়ার সব মায়া নিয়ে এতো চমৎকার একটা হাসি দেয় যে, তা দেখার পর চোখে আরেকবার পানি আসে। এটি অভিনয় নয় যেন অন্য কিছু! কী এক্সপ্রেশন, কী ডায়ালগ থ্রোয়িং! কাঁপিয়ে দেয় ভেতরটা। এর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে হয়তো নিয়ে যাবে ওই ছোট্টবেলার অভিমান মিশ্রিত সব আবদারের সরল দিনগুলোয়। আরেকবার অনুভূত হবে শৈশবের পাওয়া, না পাওয়ার বেদনা। এখানেই তো সিনেমার সার্থকতা।


ইরানের মুভি মায়েস্ত্রো ও সদ্য প্রয়াত আব্বাস কিয়ারোস্তামি অনবদ্য কাহিনীতে তারই অনুসারী ইরানের নয়া স্রোতের জনপ্রিয় পরিচালক জাফর পানাহির
পরিচালনায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘সফেদ বেলুন’। আর পহেলা সিনেমাতেই বাজিমাত! এটি বাগিয়ে নিয়েছে বেশ কয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং নমিনেশন পেয়েছে কয়টিতে। এর মধ্যে আছে ১৯৯৫ সালের কান ফেস্টিভালের সম্মানিত ক্যামেরা ডি’ওর অর্থাৎ গোল্ডেন ক্যামেরা পুরস্কার। আরো পেয়েছে টোকিও আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড, সাও পাওলো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরি পুরস্কার, কানাডার সাডবারি সিনেফেস্ট-এ সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমা ইত্যাদি। তাছাড়া অস্কার পর্যন্ত গড়িয়েছিল এটি। দি গার্ডিয়ান পত্রিকা ওই সিনেমাটিকে সেরা ৫০ ফ্যামিলি মুভির লিস্টে রেখেছে।

দেরি না করে বসে পড়–ন ‘সফেদ বেলুন’ নিয়ে এবং দেখুন আপনার অনুভূতি নিয়ে কেমন খেলা করে সিনেমাটি!

আবিদা সুলতানা

 

 


আবিদা সুলতানার বেড়ে ওঠা একটি স্বনামধন্য সংস্কৃতিমনা পরিবারে। আর এ জন্যই শৈশব থেকেই তার সখ্য গান, নাটক, নাচসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে। ছোটবেলায় গানের চেয়েও নাচের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল তার। রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছেন তিনি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব তার গায়কীতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীত- এ দুটির ওপর আবিদা তালিম নিলেও আধুনিক গানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তখন থেকেই তিনি ওই দুই মাধ্যমে নিয়মিত গান পরিবেশন করে আসছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম প্লেব্যাক করেন। এ পর্যন্ত ৪৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
আবিদা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়েন এবং ১৯৭৫ সালে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ‘সহজ’কে এই গুণী শিল্পী জানিয়েছেন তার আদ্যোপান্ত

সঙ্গীতের শুরু
কবে থেকে গান করেন এমন প্রশ্ন আমাকে কেউ করলে অবশ্যই বলি, মায়ের পেটে থাকতে গান গাই। এর পেছনে বড় ইতিহাস আছে। আমার গানে বাবা, মামা, খালা, নানি, চাচা অর্থাৎ আমার পরিবারের অবদান অনেক। আমার নানিবাড়িতে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, বছরের প্রথম দিন- সব সময় একটা না একটা অনুষ্ঠান থাকতো। আমার অনেক খালাতো ভাইবোন ছিল। সবাইকেই নাচ, গান, নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি- সবকিছুই করতে হতো। এভাবেই আমাদের বেড়ে ওঠা। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গানে আসা। নাচটি অবশ্য আমার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু মা চাইতেন আমি গান করি। তাছাড়া আমাদের বাড়িটি ছিল সাংস্কৃতিক পরিম-লে মোড়ানো। আমার বাবা গান ও অভিনয় করতেন। রম্যরচনা ভালো লিখতেন, ছড়ার অনেক বই প্রকাশ হয়েছে তার। আমার মা ছোটগল্প লিখতেন। ওই সময়ে তিনি ‘বেগম’ পত্রিকায় অনেক লেখালেখি করতেন। বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে মা-বাবাকে দেখতাম এক সঙ্গে গান গাইতে। না হলে কবিতা আবৃত্তি করতেন। ছোটবেলা থেকেই আমাদের রক্তের সঙ্গে মিলেমিশে আছে সাংস্কৃতিক নানান উপাদান। মা-বাবা ও বোনদের প্রভাব আছে বলেই আমি আবিদা সুলতানা এ পর্যায়ে এসেছি। তাদের উৎসাহ না পেলে শিল্পের এক্ষেত্রে কখনোই আসতে পারতাম না। আবৃত্তি করেছি। বাবার চাকরি সূত্রে আমাদের উত্তরবঙ্গে থাকা হতো। শিল্পী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে সব সময়ই সঙ্গীত আর শিল্প চর্চা দেখে দেখে বড় হয়েছি।

আমার শিক্ষক
রাম গোপাল মহন্ত, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, আক্তার সাদমানি, বারীন মজুমদার, ওস্তাদ নারু ও ওস্তাদ সগীরউদ্দীন খানের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছি। সঙ্গীত জীবনে ওই প্রখ্যাত ওস্তাদদের প্রভাব আমার গানেও পড়ে।

জন্মস্থান
বাড়ি মানিকগঞ্জ। এখানে সেভাবে যাওয়াই হয়নি। ছোটবেলায় বাবা চলে গিয়েছিলেন জলপাইগুড়িতে। মা ছিলেন কলকাতায়। পরে ঢাকায় এসে ওনাদের বিয়ে হয়।

পরিবার
আমাদের পরিবারের সবাই গানের সঙ্গে জড়িত। রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী- সবকিছুতে আমাদের অংশগ্রহণ করতে হতো ছেলেবেলায়। আমার গানের অনুপ্রেরণা আমার মা। আমার চাচা শিক্ষাবিদ আব্দুর রশীদ বেহালা বাজাতেন। মা ভালো লিখতেন এবং খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। সঙ্গীতে আমার মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। রফিকুল আলম আমাকে বোঝেন। আমাকে গান বিষয়ে নানানভাবে সহযোগিতা করেন। তার মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবি।

বিয়ে
১৯৭৪ সালে শিল্পী রফিকুল আলমের প্রেমে পড়ি। ১৯৭৫ সালে আমাদের বিয়ে হয়। এক পুত্র রয়েছে আমাদের। রফিকুল আলম খুব কেয়ারিং ও হেলপিং। তবে ওনাকে অ্যাবসেন্স মাইন্ডেড প্রফেসর বলা যায়।

শিল্পী দম্পতির সুবিধা-অসুবিধা
অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। একই প্রফেশন দু’জন থাকলে অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। ওনার ও আমার কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না প্রফেশনের বিষয়ে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা
আমার আসলে গান নিয়ে কোনো প্ল্যান নেই। তবে উপভোগ করি।

মিউজিকের বাইরে নিজের ইচ্ছা
এতিম শিশুদের নিয়ে কিছু করা মিউজিকের বাইরে আমার ইচ্ছা। আর উপস্থাপনার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করি।

ভূপেন হাজারিকার গান
যখন মাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি তখন ১৯৭৪ সালের কথা। বাসায় এলেন আলমগীর কবির ভাই ও ‘চিত্রালী’র সম্পাদক পারভেজ ভাই। ওনাদের সঙ্গে তখনই প্রথম পরিচয়। সীমানা পেরিয়ে ছবিতে ‘বিমূর্ত এই রাত্রে আমার’ গানটি আমার সঙ্গীত জীবনের মাইলফলক। এতো বছর ধরে গানটির জনপ্রিয়তা এতোটুকু কমেনি। এটিই আমার প্রাপ্তি।

বিভিন্ন ভাষায় গান
ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন পিটিভি ছিল। আমরা ৪৫ জন ছিলাম যাদের দিয়ে মোট ২০টি ভাষায় গান করানো হয়েছিল। আমি তখন চায়নিজ ও জার্মান ভাষায় গেয়েছিলাম। এটি এক নেশা, বিভিন্ন ভাষায় গানের নেশা। ডিপ্লোম্যাটদের গান শোনানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওমানে ক’দিন আগে গান করে এলাম। এ পর্যন্ত ৩৫টি ভাষায় গান করেছি।

সন্তান
আমার এক ছেলে ফারশিদ আলম। সে বোহেমিয়ান ব্যান্ডে আছে। এছাড়া একটি চ্যানেলেও আছে।

সংসার
পৃথিবীর যেখানেই থাকি, সংসার খুব মিস করি। আমি সংসারে খুব বেশি ইনভলব আর সংসারের প্রতি সবসময় টান অনুভব করি। বিভিন্ন রকম রান্না করতে ভালোবাসি। আমার বাসায় কোনো পার্টি থাকলে চেষ্টা করি নিজে রান্না করতে। আমার ছোট একটি বারান্দা আছে। সেখানে বেশকিছু গাছ আছে। অবসরে সেগুলো পরিচর্যা করি। আর টিভির ভালো অনুষ্ঠানগুলো দেখার চেষ্টা করি।

সঙ্গীতের স্বীকৃতি ও পুরস্কার
আমার ঘরে প্রচুর অ্যাওয়ার্ড আছে দেশ-বিদেশের। তবে মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্যটাই সবচেয়ে বড়। যদিও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাইনি তবুও পুরস্কার পেয়েছি প্রচুর।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা
একবার ইটালির রোম থেকে দূরে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি পটারির দোকানে ঢুকেছিলাম। ইটালি যাওয়ার ৭ দিন আগে স্বপ্নে দেখেছিলাম ওই দোকানটি। হুবহু ওই দোকান। আমি হতবাক, যাওয়ার সাত দিন আগে দেখা স্বপ্নটি সত্যি হতে দেখা উল্লেখযোগ্য বৈকি!

গান আর সংসার- এই আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকা। এ দুটির যে কোনো একটি ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না।



ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

লিভিং ড্রাগন

শিরিন সুলতানা

 

 

বয়স তখন তার ১২ বছর। একদিন রাস্তার কিছু বখাটে ছেলে মারধর করে তাকে। এরপর শরীরের ঘা শুকালেও মনে থেকে যায় অনন্ত দহন। মূলত এই ঘটনাই পাল্টে দেয় ছেলেটির জীবন। প্রতিশোধ স্পৃহা অথবা আত্মরক্ষা যে কারনেই হোক না কেনো ছেলেটি নিজেকে তৈরী করতে থাকে অপ্রতিরোধ্য লৌহ মানব হিসেবে। মার্শাল আর্টসের দীক্ষায় নিজেকে সুরক্ষার সাথে সাথে শত্রু ঘায়েল করার নানা কৌশল নিয়ে আসে ছেলেটি তার নখদর্পনে। বলছিলাম কিংবদন্তি ব্রুস লির কথা, মার্শাল আর্টসকে যিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে।

১৯৪০ সালের নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখে জন্ম হওয়া এই অপ্রতিরোধ্য মার্শাল আর্টিস্টের পুরো নাম ‘ব্রুস ইয়ুন ফান লি’। জন্ম মার্কিন মুল্লুকের সান ফ্রান্সেসকোতে হলেও শরীরে ছিল পুরোটাই চিনা রক্ত। লি হোই চুয়েন এবং গ্রেস হো দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে লি ছিলেন চতুর্থ। তার জন্মের সময়টায় চাইনিজ ক্যালেন্ডারে ড্রাগনকাল চলছিল যা কি না শক্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। হংকংয়ের চায়নিজ অপেরা স্টার বাবার অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই তিনি শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম অভিনয় করেন মাত্র ৩ মাস বয়সে, ‘দ্য গোল্ডেন গেট গার্ল’ (১৯৪১) ছবিতে।

১২ বছর বয়সে মার খাবার পর মন প্রাণ ঢেলে মার্শাল আর্টের তালিম নিতে শুরু করেন ব্রুস। শিক্ষাগুরু হিসেবে পান ইপম্যানকে। একটানা পাঁচ বছর দীক্ষা নেবার পর লি নিজেস্ব কিছু কলাকৌশল ও দর্শন যোগ করেন কুংফুর সাথে। নাম দেন- জিৎ কুনে দো (The way of the intercepting fist) অস্বাভাবিক ক্ষীপ্রতা তখন তার শিরায় শিরায়। শুন্যে ছুড়ে দেওয়া চাউলের দানা চ্যাপিষ্টিক দিয়ে ধরে ফেলা কিংবা টেবিল টেনিসে নান চাকু দিয়ে খেলে একসাথে দুই প্রতি পক্ষকে নাকানি চুবানি খাওয়ানো ছিলো তার আমুদে খেলা।


একবার এক প্রতিযোগিতায় ১১ সেকেন্ডেই ধরাশায়ী করে প্রতিপক্ষকে। শুধু কি মারামারি? নাচেও দারুন দক্ষ ছিলেন তিনি। হংকংয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘চা চা নৃত্যে’ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে সবাইকে চমকে দেন লি। লিকলিকে পেশীবহুল পেটানো শরীরের মানুষটার মেজাজটাও ছিল বেশ কড়া। এজন্য হংকং পুলিশের সাথে ঝামেলাও পোহাতে হয় তাকে কয়েকবার। সেগুলো অবশ্য কিশোরোত্তীর্ণ বয়সের কথা। বাবা মা তাই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রে। বয়স তখন ১৯ বছর। সদ্য যুবক লি সেখানে চায়না টাউনে এক আত্মীয়ের রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সিয়ালটলে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে ভর্তি হন দর্শন শাস্ত্রে। জীবনে আসে নতুন বাঁক। সখ্যতা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লিন্ডা এমেরির সাথে। পরবর্তীতে প্রেম ও সাতপাঁকে বাঁধা। সিয়াটলেই ব্রুস তার প্রথম কুংফু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে টিভিতে টুকটাক কাজও করতে থাকেন। সেই সুবাদে নাম ডাক হতে শুরু করলে হলিউডের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হন লি। হলিউডের ছবিগুলোতে ষ্ট্যানম্যান ও পাশর্^ চরিত্রের কাজ করে আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেও, সেভাবে কারো নজরে আসছিলেন না তিনি। এরপর লি তার পরিবার নিয়ে চলে আসেন হংকংয়ে। ঘরে তখন তার ফুটফুটে দুই সন্তান। ছেলে ব্রান্ডন লি এবং মেয়ে শ্যানোন লি। হংকংএ সময় বেশ কয়েকটি ছবি হয় তাকে নিয়ে। ‘দা বিগ বস’(১৯৭১), ‘ফিস্ট অফ ফিউরি’(১৯৭২) ও দ্য ওয়ে অফ দা ড্রাগন(১৯৭২) তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শেষোল্লিখিত ছবির রাইটার ডিরেক্টর হিসেবে দুটোতেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছিলেন লি। তার নিজের প্রডাকশন হাউজ কনকর্ড পিকচার্স থেকেই রিলিজ হয় ছবিটি।

ব্রুস লি তখন রীতিমত ষ্টার। হলিউডের ঢিসুম ঢিসুম মারামারিকে একহাত দেখিয়ে মার্শাল আর্টসের জয়জয়কার সারাবিশে^। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ যে ছবি লি’কে হলিউডে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছে তার কাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারী মাসে, হংকংয়ে। শুটিং শেষ হয় মাস ছয়েকের মধ্যেই। সারা বিশ্ব যখন কাপঁছে ব্রুসলি জ্বরে, তখনই ঘটলো সে অপয়া ঘটনা। কয়েকদিন ধরেই মাথায় সেই পুরনো যন্ত্রনা কাতর করছিলো তাকে, সাথে পিঠের ব্যাথা। ডাক্তার অনেক আগেই সনাক্ত করেছিল সেরিব্রাল এডিমা। ব্রেনের একটা অংশে ফ্লুইড জমা হচ্ছিল। অসহ্য ব্যাথাকে পরাভূত করতে ব্যাথা নাশক এ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন লি। পরের সকাল আর দেখা হয় না তার। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ ছবি মুক্তির ছয়দিন আগেই পাড়ি জমান তিনি না ফেরার দেশে। ১৯৭৩ এর ২০জুলাই, সারা পৃথিবী যেনো থমকে যায় কয়েক মুহুর্ত এ সংবাদে। অপাজেয় লি’র এরকম মৃত্যু কেউ যেন মেনে নিতে পারছিলেন না।

শুরু হয় চারদিকে গুঞ্জন। কেউ বলে চায়নিজ মাফিয়া চক্র, কেউ বলে হংকংয়ের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির প্রভাবশালীদের হাত আছে এই মৃত্যুর পিছনে। কেউ বলে তার বান্ধবী বিষ ক্রিয়ায় মেরেছে তাকে। ঘটনা যাইহোক মাত্র ৩২ বছর বয়সেই জীবনের ইতি টানতে হয় মার্শাল আর্টসের মহারাজাকে। তার দর্শন, তার কবিতা, তার লেখনি, সবকিছুই অন্তরালে থেকে গেছে। মানুষ বুঁদ হয়ে শুধুই দেখেছে তার অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ কৌশল। মৃত্যুর পর লি’র তিনটি ছবি মুক্তি পায়, ‘এন্টার দা ড্রাগন’, গেম অব ডেথ ও সার্কল অব আয়রন’। মার্শাল আর্টিষ্ট, প্রশিক্ষক, ছবি নির্মাতা, মানবহিতৈষী, দার্শনিক, অভিনেতা, একের মধ্যে এ যেন অনেক গুনের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধন। এ এক অনন্য কিংবদন্তি ব্রুস লি।

 

মুনলাইট

ফুয়াদ বিন নাসের

 

ব্যারি জেনকিন্স তার ‘মুনলাইট’ ছবিটিকে খুব সহজেই তিনটি পৃথক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমানের প্রিক্যুয়াল-সিক্যুয়াল ও রুপালি পর্দার ব্যবসায়িক সাফল্যের যুগে হয়তো সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ব্যারি যশ-খ্যাতি বা অর্থ-বিত্তের হাতছানিতে সাড়া দেয়ার মানুষ নন। ‘মেডিসিন ফর মেলানকলি’ চলচ্চিত্রেই তার ওই দর্শনের অনেকটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। মুনলাইট ছবিটি তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘লিটল’, ‘কাইরন’ ও ‘ব্ল্যাক’। তিনটি নামই ছবির মূল চরিত্রের নাম। একই মানুষের ভিন্ন তিনটি বয়সের তিনটি রূপ মায়ামির রৌদ্রস্নাত পটভূমিতে আঁকার চেষ্টা করেছেন পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স। মাদকাসক্তি, একাকিত্ব,
সমকামিতার মতো প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিচালক খেলা করেছেন মূল চরিত্র কেন্দ্র করে।


মুনলাইট চলচ্চিত্রটির প্রথম পর্ব ‘লিটল’ আবর্তিত হয় মায়ামির এক বস্তি অঞ্চলে যেখানে দেখা, আমাদের মূল চরিত্র কাইরন ব্ল্যাকের শৈশব। সহপাঠীদের কাছে তাড়া খাওয়া, মায়ের অবহেলা ও বাবার অভাবে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ছেলেটি বাবার ছায়া খোঁজে এলাকার পান্ডা হুয়ানের কাছে। হুয়ানও এই অদ্ভুত ও চুপচাপ ওই শিশুকে পছন্দ করে ফেলে এবং নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তাকে হুয়ানের কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না লিটলের মাদকাসক্ত মা। কিন্তু স্নেহের লোভে লিটল বার বার ওই হুয়ানের চৌকাঠেই ফিরে যায়। হুয়ান এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু লিটলের মায়ের অবহেলা থেকে তাকে রক্ষা করতে না পেরে অসহায় বোধ করে। লিটলের জন্য সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন চায় হুয়ান। আবার মুদ্রার অন্য পিঠে হুয়ানের মাদকের চালানই অন্ধকার নামিয়ে আনে লিটলের


পরিবারে। ওই চক্র চলতেই থাকে।
এরপর দেখতে পাই কৈশোরের কাইরনকে। লিটলের বয়স খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু তার একাকিত্ব কাটেনি। সে অনুভব করে, তাকে পছন্দ করে এ রকম কেউ থাকতেই পারে না। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়েও তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। এলাকা ও স্কুলে সহপাঠীদের অত্যাচার এবং অপমানের শিকার কাইরন মুখ ফুটে তার আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে না। তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী কেভিনের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে তা নিয়েও সে সন্ত্রস্ত থাকে। তার আশপাশের জগতে সে দেখে মানুষের নরপশুসুলভ আচরণ ও হিংস্রতা। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শেষ আশাটুকুও ছেড়ে দেয় কাইরন।
মুনলাইট-এর শেষ পর্বে দেখি যুবক কাইরন ব্ল্যাককে। এখানেই পরিচালক ব্যারি তার সর্বোচ্চ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুই পর্বের সব ইতিহাস, হতাশা, আবেগ এক হয়ে পূর্ণতা লাভ করে সেলুলয়েডের অন্তিমভাগে। ব্যারি জেনকিন্স কোনো নীতিকথা প্রচার করার চেষ্টা করেননি, কোনো উপদেশ দেয়ার প্রয়াসও দেখাননি। মুনলাইটের এই শেষ অংকে বোঝা যায়, ছোট এক ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী- কোনো পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের সমর্থন, সমাজের সাহায্য ছাড়াই। এ রকম অনেক লিটল, কাইরন ও ব্ল্যাকই অশ্রুর মতো সবার অগোচরেই মায়ামির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বার বার তাকে ফিরে আসতে দেখি সব বাধা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অপমান ডিঙিয়ে। তিন বছর বয়সের কাইরন ব্ল্যাককে রূপায়িত করেছেন এলেক্স হিবার্ট, অ্যাশটন স্যান্ডার্স ও ট্রেভান্তে রোডস। পরিচালক জেনকিন্স এখানে তিন অভিনেতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেননি, বরং তিনজন তিনটি চরিত্রই রূপায়ণ করেছেন। চমৎকার সংলাপ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির কারণে কাইরন ব্ল্যাকের বেড়ে ওঠা আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রুপালি পর্দায়। মায়ামির ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল বালুকাবেলায় শত
হাসিমুখের ভিড়েও যে বিষণ্ণতার বীজ লুকিয়ে থাকে সেটিই পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। সেরা ছবির পুরস্কার মুনলাইটেরই প্রাপ্য।

মহাকালের রথের ঘোড়া : সমরেশ বসু

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

 

তারাশঙ্কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আবার সুনীল, শীর্ষেন্দুদের যুগ। এ দু’যুগের মাঝে সমরেশ বসু ছিলেন সেতু হিসেবে। তাঁর জীবন যাপন, ছেলেমানুষি আচরণ অনেকটাই ছিল ফরাসিদের মতো। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল আর অপূর্ব একটা ট্রেড মার্ক হাসি। ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত রাজনগর গ্রামে পৈতৃক বাস্তুভিটায় ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্ম নেন সমরেশ বসু। বাবা ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। কাগজের ম- দিয়ে মূর্তি তৈরী করতেন। বাড়ির পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সমরেশের আদলটা একটু আলাদা। পাঠ্য বই পড়ায় মন নেই তাঁর। বাঁধাধরা শিক্ষার বাইরের জীবন যাপনই তাঁকে বেশি টানে। তবু তাঁকে পাঠানো হলো গিরিশ মাস্টারের পাঠশালায়। পরে গে-ারিয়া গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়লেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা তাঁকে পাঠালেন নৈহাটির রেল কোয়ার্টার্সে দাদা মন্মথ’র কাছে। দাদা ১৯৩৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নৈহাটির মহেন্দ্র স্কুলে তাঁকে ভর্তি করালেন অষ্টম শ্রেণিতে। স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিয়ে, নাটক অভিনয়, খেলাধুলা, শরীর চর্চা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সেসময় কিছু লেখালেখিও শুরু করেন হাতে লেখা পত্রিকা বীনায়।


দেবশংকর বন্দোপাধ্যায় ছিলেন তখন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু। বন্ধুর বাসায় যাওয়া আসার সুবাদে প্রেমে পড়ে সমরেশ বন্ধুভগ্নি গৌরীর সাথে। ‘সমরেশ’ নামটি গৌরীরই দেয়া। তাঁরা যখন পালিয়ে বিয়ে করে সমরেশ তখন ১৮ গৌরী ২১। এই বিয়ে দুই পরিবারের কেউই মেনে নিলেন না। ফলে নৈহাটি থেকে চার মাইল দূরে আতপুরের পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে ২ টাকায় ঘর ভাড়া নিলেন। আতপুরে সমরেশের জীবন এক বড় বাঁক নেয়। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। জগদ্দল আতপুরের শ্রমিকপাড়া ও জীবিকার জন্য লড়াই নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার দিন যাপনের থেকে বহুলাংশেই আলাদা। এক পোলট্রি ফার্মের সঙ্গে কমিশনের শর্তে ডিম, মুরগি, সবজি বিক্রি করে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলেন। সপ্তাহে ৩-৪ দিন খাওয়া জোটে, বাকি দিন অভুক্ত অবস্থায় কাটে।

বিয়ের পর শুরু হয় জীবনের আসল যুদ্ধ সপ্তাহে তিন চার দিন খাবার জোটে তো বাকি দিনগুলোতে অভূক্ত থাকতে হয়। চরম দারিদ্রতায় সাহিত্য চর্চা ছাড়েননি তিনি। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এর ড্রইং অফিসে ট্রেজারের চাকরি পেলেন সমরেশ। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ৬ বছর এখানেই কাজ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। প্রথম সন্তান বড় মেয়ে বুলবুলের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় সন্তান বড় ছেলে দেবকুমারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। তৃতীয় সন্তান মেজছেলে নবকুমারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর। চতুর্থ সন্তান ছোট মেয়ে মৌসুমীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর। এর পাশাপাশি বারাকপুরে জুটফ্রন্টে পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন। সমরেশ আর গৌরী পার্টি সদস্যপদ লাভ করলেন। সংগঠনের কাজের ফাঁকে ‘উদয়ন’ পত্রিকায় আঁকা ও লেখা শুরু করলেন। উদয়ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম ছোটগল্প ‘শের সর্দার’ প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। উদয়ন পত্রিকা তো আছেই, সবচেয়ে বড় ঘটনা ১৯৪৬ সালে শারদীয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘আদাব’ গল্প প্রকাশের সময়। উদয়ন পত্রিকার জন্য আদাব গল্পটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু গৌর জোর করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় গল্প পাঠিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে ওই অর্থে সমরেশের প্রবেশ এ গল্পের মধ্য দিয়েই। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে সমরেশ ও তাঁর পরিবারকে আবারও দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হয়। একই বছর চৌদ্দই ডিসেম্বর সমরেশ গ্রেফতার হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে এক বছর কারাবাস করেন। তিনি বন্দি থাকায় সংসার অচল। মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বিপর্যস্ত গৌরী দেবী। তিনি বন্দি সমরেশের পরিবারের জন্য দেড়শ’ টাকা মাসোয়ারার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। কারমুক্ত হয়ে সমরেশ নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন নিঃসঙ্গ ও বেকার মানুষ হিসেবে। এখান থেকেই তাঁর লেখার সংকল্প জেগে ওঠে। লিখেই জীবন বাঁচাতে মনেপ্রাণে তিনি প্রস্তুত হতে থাকলেন। চারটি নাম নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমরেশ পদচারণা করেছেন- সমরেশ বসু, কালকূট, অশোক ঠাকুর ও ভ্রমর।

বাল্যকালে সমরেশের দারুণ ইচ্ছা ছিল আর্টিস্ট হওয়ার। তাই ছাত্র জীবনে কয়েক বন্ধু মিলে হাতে লেখা কয়েকটা ম্যাগাজিনে গল্প, বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি ছাপাতেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অলঙ্করণও করতেন। তারপর কৈশোর থেকে যৌবন। ওই সময় সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক এলো। বিভিন্ন গল্প, প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন। তাঁকে ছবি আঁকা থেকে
লেখালেখির জগতে নিয়ে আসেন ‘সত্য মাস্টার’। এদিক থেকে বলা যেতে পারে, ‘সত্য মাস্টার’ এর সঙ্গে সমরেশের সাক্ষাৎ বাংলা সাহিত্যেরই এক মাইলফলক। এর মধ্যেই সমরেশের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’ প্রকাশ পায়। তিনি এর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এ চাকরিকালে। তা রূপ পেয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকাকালে। ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাস বিক্রি করে শোধ করলেন এক বছরের বাড়ি ভাড়া। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিটি রোড়েব ধারে’। এরপর ‘শ্রীমতী কাফে’। প্রথম গল্প সংকলন ‘মরশুমের একদিন’।

সমরেশের প্রথম লেখা উপন্যাস ‘নয়নপুরের মাটি’। ‘উত্তরঙ্গ’-এর বহু আগে (১৯৪৬ সালে) ওই বই লেখা। সাহিত্য আসরের দরজার চৌকাঠটা তখন দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলেন তিনি। বছরখানেক ধরে উপন্যাসটির অংশ ‘পরিচয়’ মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। নানান কারণে তা মাঝপথেই থেমে যায়। অনেক দিন পর আবার তা বই আকারে প্রকাশিত হয়।  সমরেশ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ‘সাতকড়ি মাসী’ আর ‘জয়নাল’সহ বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন ‘তরণি’ পত্রিকায়। গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পার্টির বিরাগভাজন হন। পার্টির সঙ্গে ক্রমেই তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তলানিতে এসে ঠেকে। তাকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে ‘গঙ্গা’ উপন্যাস।

১৯৫৮ সালে সমরেশ সাহিত্যে ‘আনন্দ’ পুরষ্কার পেলেন। উদ্দ্যম গতিতে এগিয়ে চলে লেখলেখির কাজ। এরই মাঝে সমরেশ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ছোট শ্যালিকা ধরিত্রীর সাথে। সমরেশ তখন চার সন্তানের পিতা। কল্যাণীতে স্ত্রী গৌরী বসু ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভরা সংসার। ওই সময়ই ছোট শ্যালিকার সঙ্গে শরীর ও মনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গৌরী ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে আর ধরিত্রী ওরফে টুনি সবচেয়ে ছোট, প্রায় সমরেশের মেয়ের বয়সীই। লোকলজ্জার কথা ভাবলে, হয়তো সব দায় ঝেড়ে ফেলে তিনি বেরিয়ে আসতেই পারতেন। কিন্তু ওই পথে হাঁটেননি। ভারতীয় প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু পরকীয়ার জেরে শ্যালিকাকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৪ই মার্চ এবং দুই বোনকে নিয়ে একসঙ্গে সংসার করেছিলেন। এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গৌরী তথা সমরেশের স্ত্রী, ধরিত্রীর দিদি। সমরেশের দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি দিলেন। বুক ফেটে গেলেও মেনে নিলেন নিজের বোনের সঙ্গে স্বামীর বিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের সময় সবার মত সমরেশও আন্দোলিত হয়ে ছিলেন। তখন বাংলা সাহিত্যে রাজা বাদশা ছিল না, তিনিই ছিলেন যুবরাজ। সমরেশ বসুর মত ব্যাক্তিরা বাউ-েলে বলেই জীবনকে দেখতে পেরেছিলেন নানা বৈচিত্র্যে, তুলে আনতে পেরেছিলেন পানাপুকুর, কখনও জমিদার বাড়ির খিলান থেকে কখনও বা ট্রাক ড্রাইভারের ডেরা থেকে জীবনাবর্তন।
জীবনের বৈচিত্র্যতা খুঁজে ফেরার মাঝেই ১৯৮৮ সালের ১২ই মার্চ নিজের জীবনরে পরিসমাপ্তি ঘটে। ৪০ বছরের কিছু সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। হয়তো ভবঘুরে হয়েই যদি আরো কিছুকাল আনাগোনা করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতো।

 

পেইনটিং অমিত রায়

এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন...

ফরিদা পারভীন

 

আমার জন্ম নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার শাঐল গ্রামে ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বাবা মৃত ডা. দেলোয়ার হোসেন ও মা মৃত রউফা বেগম। বাবা সরকারি চিকিৎসা পেশায় থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলাশহরে আমাদের থাকতে হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমার একটা টান ছিল। মা-বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদর-যত্ন বেশি পেতাম। আমার আবদার তারা রাখতেন। আমাদের বাসা তখন মাগুরায়। পাশের বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল। আমিও বাবার কাছে হারমোনিয়াম চাইলাম। কিন্তু দিই-দিচ্ছি করে গড়িমসি করতে লাগলেন। অবশ্য ভেতরে ভেতরে চাইতেন তার একমাত্র সন্তান গানের সঙ্গে জড়িত হোক। তিনিও গান পছন্দ করতেন। এক পর্যায়ে বাড়িতে মিস্ত্রি ডেকে এনে হারমোনিয়াম বানিয়ে দিলেন। আর যার কাছে আমার হাতেখড়ি তিনি হচ্ছেন মাগুরার কমল চক্রবর্তী। তার মাধ্যমেই আমার শুরু গানের পথচলা। 


আজ পর্যন্ত কত গান গেয়েছি এর হিসাব রাখিনি। তাছাড়া সংখ্যা দিয়ে তো শিল্পীর মান বিচার করা যায় না! যেমন- বলা যেতে পারে, অনেক গান আছে। তবে শুনতে একটি গানও ভালো লাগে না। ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের ভাষায়- কুকুর অনেকগুলো ছানা প্রসব করে। কিন্তু সিংহের শাবক বেশি হয় না। যে কয়টা গান আজ পর্যন্ত গেয়েছি এর সংখ্যা বেশি না হলেও মানুষের মনে গেঁথে আছে। ভালোবাসা দিয়ে শ্রোতার হৃদয়ের কাছে অবস্থান করে নিয়েছে। সঙ্গীত যেহেতু গুরুমুখী বিদ্যা সেহেতু বেশ কয়েকজন ওস্তাদের কাছে আমার তালিম নেয়া হয়। ওস্তাদ ইব্রাহিম খাঁ, ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, ওস্তাদ ওসমান গণী, ওস্তাদ মোতালেব বিশ্বাসসহ প্রায় সবাই আমাকে ধ্রুপদী (ক্ল্যাসিকাল) গান শেখাতেন। নজরুল সঙ্গীতের গুরু হলেন ওস্তাদ আব্দুল কাদের ও ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী।

কিন্তু স্বাধীনতার পর আমার লালন সাঁইজির গানের গুরু হচ্ছেন মোকসেদ আলী সাঁই। তার কাছে সাঁইজির গানের শিক্ষা নিই। অনেকটা অনিচ্ছাকৃত ছিল এই তালিম। লালন সাঁইজির জীবদ্দশায় তার অনুসারীদের নিয়ে দোল পূর্ণিমায় মহাসমাবেশ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ দেশে স্বাধীনতার পর ওই অনুষ্ঠানে গান করার জন্য আমার গুরু মোকসেদ আলী সাঁই অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেটিও সাঁইজির একটি গান যা শিখে শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করি। ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ গানটি তখন এতো জনপ্রিয়তা পেল যে, সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিলাম সাঁইজির গানই গাইবো। তখন যে অনুভূতি আমার হয়েছিল সেটি বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু এখন পর্যন্ত উপলব্ধির মধ্যেই আছে। আর তখন থেকেই লালনকে লালন করে চলেছি।


আগেই বলেছি, লালন সাঁইজির গানে আমার কোনো ভালোবাসা ছিল না। আল্লাহর অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। তা হলো, এখনো যেখানেই অনুষ্ঠান করি না কেন, সর্বত্রই দেশপ্রেমের গান দিয়েই শুরু করি এবং সঙ্গতকারণেই লালন সাঁইজির গান দিয়ে শেষ করি। কারণ মায়ের কাছে একাধিক সন্তান যেমন স্নেহে আবদ্ধ থাকে ঠিক তেমনি আমার কাছে দেশাত্মবোধক গান আর লালন ফকিরের গান সমানভাবে সন্তানের মতো। আবু জাফর সম্পর্কে আমার কিছু কথা বলবো। তিনি অনেক বড় মাপের গীতিকার ও সুরকার। যেসব গান লিখেছেন, সব কালজয়ী। যদিও তার গানের সংখ্যা খুব বেশি নয় তবুও বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ যতদিন থাকবে পৃথিবীজুড়ে ততদিন তাদের কাছে আবু জাফরের দেশপ্রেম ও প্রেম পর্যায়ের গানগুলো কখনোই বিস্মৃত হবে না।


অনেক গীতিকারের গান গাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কবি নাসির আহমেদ, সাবির আহমেদ, কবি জাহিদুল হক, যামিনী কুমার দেবনাথ অন্যতম। আমি চার সন্তানের জননী। সবার বড় হচ্ছে মেয়ে জিহান ফারিয়া মিরপুর বাংলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক, বড় ছেলে ইমাম নিমেরি উপল সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র অফিসার, মেজছেলে ইমাম নাহিল অস্ট্রেলিয়ান এমবাসির কর্মকর্তা ও ছোট ছেলে ইমাম জাফর নোমানী উত্তরা ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।


সংগীতের কথা আমি সব সময়ই বলবো। কারণ সংগীত নিয়েই আমার সব জল্পনাকল্পনা। তবে সংগীতের ক্ষেত্রে বলতে হয়, বিশুদ্ধ সংগীত হলো গুরুমুখী বিদ্যা। এর সঙ্গে নিষ্ঠা, সততা তো লাগবেই, অধ্যবসায়ও জরুরি। এ জন্য গুরুর চরণ ধরে পড়ে থাকতে হয়। কোনো মানুষ- সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। মানুষ শুধু চেষ্টা করে যেতে পারে মাত্র। গানের মধ্যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। অপ্রাপ্তি বলে কিছুই নেই। যা আছে, সবই প্রাপ্তি। আর তা হলো ১৯৮৭ সালে ‘একুশে পদক’, ১৯৯৩ সালে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (অন্ধপ্রেম), ২০০৮ সালে এশিয়ার নোবেলখ্যাত জাপানের ‘ফুকুওয়াক কালচারাল অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তি। এছাড়া দেশ-বিদেশের অসংখ্য পদক-সম্মাননা আমার প্রাপ্তির ভা-ারটি ভরে তুলেছে। ২০১০ সালে বাংলা
একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হই।


সঙ্গীত নিয়েই আমার যত ভাবনা। এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন। তাই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছি। এখানে বেশ কয়টি প্রজেক্ট চালু আছে। সেগুলো হলো অচিন পাখি, বাঁশি, অন্যান্য যন্ত্র (একুস্টিক), গবেষণা, স্বরলিপির কাজ, স্টাফ নোটেশন, আঁকাআঁকি ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে ওই ফাউন্ডেশনে লালনের দর্শন নিয়ে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আছি। এ প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এখন শিকারি হিসেবে অনেক চ্যানেল অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। কাজটি প্রথমত ভালো। কিন্তু পরে ওই ধারা টিকে থাকছে না। এর কারণ হচ্ছে অল্পতেই অর্থ হস্তগত করা, ভালোভাবে না শিখেই নাম করার প্রবণতা। এ জন্য দায়ী করবো তাদের মা-বাবাকে। এ কথা এ কারণেই বলছি, অনেক ছেলেমেয়ে একেবারে অর্থহীনভাবে বেড়ে ওঠে। অথচ ওই পরিমাণ জ্ঞান তারা রাখে না। বলা যায়, কেউ কেউ শুধু অর্থের মোহে পড়ে রেওয়াজ করাই ছেড়ে দেয়। সঙ্গীত যে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রতিষ্ঠা পায় এ নিয়ম-নীতি ওইসব বাবা-মা তাদের সন্তানদের শেখান না। আর সন্তানরা তো চিরকালই অবুঝ! সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়। তা হলো, সঙ্গীত আধ্যাত্মিকতার বিষয়। এটি এতো সহজে ধরা যায় না। অনেক অধ্যবসায় ও অনুশীলন দিয়েই অর্জন করা যায় সুর। আমি বলবো, আগামী প্রজন্মের যারা গান করবে তাদের বেশি করে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রতিদিন রেওয়াজ করতে হবে। সর্বোপরি সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। তবেই গান হয়ে উঠবে প্রকৃত গান।

গোফ গপ্পো

 

সেই প্রস্তর যুগে পাথরের ক্ষুর দিয়ে মানুষের ক্ষৌরি করার প্রচলন শুরু হয়। সম্ভবত তখনই মানুষের মধ্যে গোঁফ নিয়ে ফ্যাশন করার ধারণার গোড়াপত্তন ঘটে। অবশ্য খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে প্রথম গোঁফ রাখার খোঁজ মিলেছে। গোঁফ হলো পুরুষের নাকের নিচে এক চিলতে রোমশরেখা। তা কারো সরু, কারো মোটা, কারো গাঢ়, কারো আবার পাতলা। অথচ ওই এক চিলতে জিনিসই নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাট পার্থক্য গড়ে দেয়ার এক মোক্ষম ‘অস্ত্র’! একই সঙ্গে আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও অস্ত্র।
গ্রিক Mustak শব্দ থেকে গোঁফের ইংরেজি Moustache শব্দের উৎপত্তি। Mustak অর্থ উপরের ঠোঁট। পুরুষের মুখে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত চুল গজায়। এর মধ্যে গোঁফে থাকে ৬০০টির মতো। গোঁফ গজানো বা কম-বেশি হওয়ার পেছনে যে হরমোনটি ‘দায়ী’ এর নাম টেস্টোস্টেরন। এই গোঁফ মহাশয় আবার বড্ড আলসে। প্রতিদিন গড়ে মোটে ০.০০১৪ ইঞ্চি করে বাড়ে। আর বছরে বাড়ে ৫-৬ ইঞ্চি করে।


আদিকাল থেকেই গোঁফ মানুষের বড় এক আলোচনার বিষয়বস্তু। জনপ্রিয় ছড়াকার সুকুমার রায় তার ‘গোঁফ চুরি’ ছড়ায় তো ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেনÑ

‘গোঁফকে বলে তোমার আমার, গোঁফ কি কারো কেনা?
গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ‘গোঁফ এবং ডিম’ প্রবন্ধে গোঁফের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গোঁফ নিয়ে বাংলায় প্রবাদ-প্রবচনের শেষ নেই। গোঁফ খেজুরে, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল, গোঁফে তা দেয়া, শিকারি বিড়াল গোঁফে চেনা যায় ইত্যাদি প্রবাদ দৈনন্দিন ঘুরে বেড়ায় আমাদের মুখে। তবে শুধু শিকারি বিড়ালই নয়, গোঁফ দিয়ে চেনা যায় অসংখ্য জনপ্রিয় মানুষকেও। তাদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আশ্চর্য একজোড়া গোঁফ!
যাদের আইকনিক ট্রেডমার্ক গোঁফ তাদের তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে উপরের দিকে থাকবেন স্যার চার্লি চ্যাপলিন ও অ্যাডলফ হিটলার। দু’জনই প্রায় একই রকম অদ্ভুতুড়ে গোঁফধারী ছিলেন। কিন্তু একজন পুরো পৃথিবীতে দিয়েছেন হাসির খোরাক, অন্যজন দিয়েছেন কান্নার উপলক্ষ। জনগণের দৃষ্টি আলাদাভাবে আকর্ষণের জন্য হিটলারের দুর্দান্ত উপায় ছিল তার ওই অদ্ভুত গোঁফের ফ্যাশন। ১৯২৩ সালে নাজি প্রেস সেক্রেটারি ড. সেজুইক অবশ্য হিটলারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন একটি স্বাভাবিক গোঁফের ছাঁট লাগাতে। হিটলার উত্তর
দিয়েছিলেন এভাবেÑ ‘আমার গোঁফ নিয়ে একদম ভাবতে হবে না। যদিও এটি এখনো ফ্যাশন হয়নি তবুও এক সময় ঠিকই ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াবে!’
গোঁফ থেকে বিচ্ছুরিত আত্মবিশ্বাস!!
রাজা-বাদশাহরা প্রচুর সময় নষ্ট করতেন ওই গোঁফের পেছনে। এছাড়া প্রচুর অর্থও নাকি ঢালতেন। বড় ও বাহারি গোঁফ ছিল শৌর্যের প্রতীক। মোগল বাদশাহদের ছিল শৌখিন গোঁফ। সম্রাট আকবরের গোঁফ ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। তাছাড়া সুন্দর গোঁফ ছিল টিপু সুলতান, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলারও।
বিখ্যাত গুঁফোদের মধ্যে আরো আছেন সালভাদর ডালি, জোসেফ স্টালিন, চে গুয়েভারা প্রমুখ।

 

______________________

লেখা : তিয়াষ ইসতিয়াক
মডেল : নীল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

পারফিউম...

 

সুগন্ধি ব্যবহারের প্রচলন সুপ্রাচীনকাল থেকে। মানুষ এক সময় বিভিন্ন সুগন্ধি ফুল আর লতা-পাতার নির্যাস সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করত। প্রাচীনকাল থেকে সুগন্ধি উদ্ভাবনের ইতিহাস খুঁজলে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার এক কেমিস্ট ‘টাপুট্টি’র নাম পাওয়া যায়। তাকে সর্বপ্রথম সুগন্ধি তৈরিকারক হিসেবে ধরা হয়। এরপর সভ্যতা থেকে সভ্যতার হাত ধরে এগিয়েই চলছে সুগন্ধির জয়যাত্রা।
সুগন্ধি এমন একটা অনুষঙ্গ যা মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িত। মন খুশিতে ভরিয়ে দিতে পারে একটি ভালো সুগন্ধি। তা এনে দিতে পারে স্নিগ্ধ একটি অনুভব।
আধুনিককালে সুগন্ধির ঊন্মেষস্থল হিসেবে একচ্ছত্র অধিপতি ধরা হয় ইউরোপের ফ্রান্সকে। ওই দেশে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি তৈরি হয়ে থাকে। সুগন্ধি উদ্ভাবন ফ্রান্সের শিল্পসত্তার বিকাশ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জড়িত। বিশ্বের নামি-দামি সুগন্ধি প্রস্তুতকারকরা ফ্রান্সের অধিবাসী। ২০০৬ সালে টমটাইকার পরিচালিত ‘পারফিউম : দি স্টোরি অফ অ্যা ম্যার্ডারার’ মুভিটি দেখেনি এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। এ মুভিটিতে আমরা খুঁজে পাই পাগলপ্রায় ঠা-া মাথার এক খুনির সুগন্ধি
উদ্ভাবনের শিহরিত পথচলা।


এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, একটা সময় ছিল যখন সুগন্ধির ব্যবহার শুধু সমাজের অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সুগন্ধি ছিল শুধু বিলাসিতার অঙ্গ। এর পেছনে কারণও ছিল। আগে সুগন্ধি তৈরির নির্যাস ও কাঁচামাল ছিল দুর্লভ এবং অনেক দামি। এর মানে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখন কৃত্রিম উপায়েই এসব কাঁচামাল ও নির্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সুগন্ধি তৈরি ও এর ব্যবহার এখন অনেকটাই সহজলভ্য। তাই সুগন্ধির ব্যবহার এখন শুধু বিলাসিতার অংশ নয়, বরং সব বয়সের মানুষের কাছে ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত নিত্যনতুন সুগন্ধি তৈরির ফর্মুলা ও উপকরণ সুগন্ধি ব্যবহারের আবেদনটি বাড়িয়ে তুলেছে সবার মধ্যে।
আমাদের দেশের আবহাওয়া নাতিশীতাষ্ণ হলেও গরমের প্রভাব বেশি। গরমে ঘাম হবেÑ এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সুগন্ধি শুধু যে ঘামের দুর্গন্ধ এড়াতেই কাজ করে তা নয়, বরং এর পরশে আমরা হয়ে উঠতে পারি আরো সতেজ ও প্রাণবন্ত।
এ দেশে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে বিকশিত হয়েছে সুগন্ধির বাণিজ্য। এর আগে এ দেশের বিশ্বখ্যাত সব ব্র্যান্ডের ভালো ভালো সুগন্ধি তেমন সহজলভ্য ছিল না। অনেকেই তাদের প্রিয় সুগন্ধিগুলো বিদেশ থেকে কিনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন আমাদের দেশেই নারী-পুরুষের জন্য আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি।
পুরুষের প্রিয় কিছু সুগন্ধির মধ্যে আছে লাকস্ত রেড, হুগো বস, বারবেরি, আজারো, আরমানি ইত্যাদি। অন্যদিকে নারীদের জন্য আছে গুচি, বুশেরন, স্যানেল, ডলসি গাবানা, এস্কাডা ইত্যাদি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি পাওয়া যায় ‘পারফিউম ওয়ার্ল্ড’-এর
আউটলেটগুলোয়।

 

_____________________
লেখা : সোনাম চৌধুরী
মডেল : রিবা হাসান
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কিউট ইন কুর্তি

 

ফ্যাশন পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর এই পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের পোশাক। তবে ফ্যাশনের কথা আসলেই একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে মেয়েদের পোশাকের কথা। নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাকের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার চেষ্টায় ছুটছে সবাই শপিংমলগুলোতে, কিনছে মনের মতো প্রিয় পোশাক। সব শ্রেণীর মেয়েদের কাছেই সালোয়ার কামিজ বেশ জনপ্রিয়। নারীরা সেলোয়ার কামিজে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। উপরি পাওনা হিসেবে জাকজমকপূর্ণ সালোয়ার কামিজে একটি নারী হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। শুধু উৎসবেই নয় যে কোন অনুষ্ঠানে সালোয়ার কামিজ পরে নিজেকে অতুলনীয় করে তোলা যায়। সুতরাং নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চলুন বেঁছে নিই পছন্দের সালোয়ার কামিজ। বর্তমান ট্রেন্ড-এ সেলোয়র কামিজের ডিজাইন নিয়ে আমাদের কথা হয়েছিল ‘ক্ষনিকা’র স্বত্ত্বাধিকারী ডিজাইনার মারিয়ান ফয়সালের সাথে।

মেরুন সিল্ক
সিল্কের এই কুর্তিতে রয়েছে একটু বড় চড়ষশধ উড়ঃ এর প্রিন্ট। বল গুলোর উপরে করা স্টোন ওয়ার্ক পোশাকটিতে এনেছে পার্টি আমেজ। ভিন্নতা আনতে কালো ছাড়াও এর সাথে গোল্ডেন কালারের দোপাট্টা ও স্যাটিনের পালাজ্জো ভাল লাগবে।

হলুদ
নজর কাড়া হলুদ এই কুর্তি আপনাকে অফিস কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় করবে স্বপ্রতিভ। ফুলস্লিভ হাতা, কর্ড পাইপিং আর ব্যান্ড কলারের সমন্বয়ে লিনেন এই কুর্তির নিচের অংশের বাম পার্শ্বে রয়েছে সাদা এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন অফ হোয়াইট বা সাদা রঙের সেলোয়ার।

 

 

লাল
লাল মানেই মন ভাল করে দেওয়া উজ্জ্বলতা তা সে হোক ‘লাল গোলাপ’ অথবা লাল জামা। ইউনির্ভাসিটি কিংবা অফিস ও সান্ধ্যকালীন আড্ডায় যে কোন ঈড়সঢ়ষবীরড়হ-এর মেয়েকে মানিয়ে যাবে। কাফতান গলা, ফোর কোয়ার্টার হাতার চড়ষশধ উড়ঃ এর লিনেন এই কুর্তিতে রয়েছে ব্ল্যাক এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন গাঢ় নীল বা সাদা পালাজ্জো।

সাদা
যেকোন দাওয়াতের অনুষ্ঠানে সাদা এই কুর্তি আপনার লুক-এ এনে দেবে জৌলুস। কাফতান গলা, লেস আর বাটনের কম্বিনেশনে এই কুর্তিটির গর্জিয়াস উপস্থাপন। সাথে পরতে পারেন বেইজ কালার পালাজ্জো ও দোপাট্টা।

বেগুনী
মেঘলা দিনের একঘেঁয়েমি ও উঁষষহবংং কাটাতে উজ্জ্বল বেগুনী এই কুর্তিটি পড়ে নিমিষেই নিজেকে চনমনে ও আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। মডেলের পরনে যে কুর্তিটি রয়েছে তা লিনেন কাপড়ের উপর ঈড়ৎফ পাইপিং দিয়ে করা। ইধহফ কলার আর ফুলস্লিভ হাতায় এই কুর্তির প্রধান আকর্ষন গাঢ় বেগুনীর উপর হালকা বেগুনী রঙের এমব্রয়ডারি যা অফিসে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় আপনার উপস্থিতি উজ্জ্বল করবে। কুর্তির সাথে পরতে পারেন বেগুনী অথবা সাদা রঙের শেডেড দোপাট্টা ও সালোয়ার।

ফ্লোরাল প্রিন্ট
ফ্লোরাল প্রিন্টেড এই কুর্তিতে লেস বসিয়ে আনা হয়েছে গর্জিয়াস লুক। যা সহজেই বিভিন্ন গেট টুগেদারে পরে যেতে পারেন। সাথে পরতে পারেন ডেনিম অথবা টাইটস্।

 

____________________________________

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত
মডেল : মহতী তাপসী ও সায়মা রুসা
পোশাক : ক্ষনিকা
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
সহজ স্টুডিও
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

 

বসনে বৈশাখ

 

 

গনগনে গরমে হঠাৎ দমকা হাওয়া, এলোমেলো বৃষ্টি, সুতির শাড়িতে বৃষ্টি ফোঁটার জলকেলি, কিশোর-কিশোরীর আম কুড়ানোর উদ্দামতা, বৃষ্টিতে মনের অবগাহনে বৈশাখ যেন এভাবেই ধরা দেয় আমাদের কাছে।
ফ্যাশন সচেতন বাঙালি সারা বছর নানান পূজা-পার্বণে ভিন্ন ডিজাইন ও কাপড়ে নিজেকে রাঙিয়ে নিলেও বৈশাখ মাসে যেন সুতিকাপড় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না।
তাপদাহের মধ্যে সুতির চেয়ে আরামদায়ক বসন আর হয় না। পহেলা বৈশাখ যেমন প্রাণের উৎসব ঠিক তেমনিভাবেই লাল ও সাদা রঙটি বৈশাখ
উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছেন উৎসবপ্রিয় বাঙালি। তাই বাংলা ও বাঙালির জন্য বৈশাখের চিরায়ত রঙ লাল ও সাদা।
ছোট্ট ছেলেটি যেমন লাল-সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বাবার কোলে চড়ে মেলা দেখতে যায় তেমনি লাল চুড়ি ছাড়া মা ও মেয়ের বৈশাখী উৎসব অপূর্ণ রয়ে যায়।
চৈত্র মাসের বিদায় দেয়ার মাধ্যমে বাঙালি প্রস্তুত নতুন সনে বৈশাখ মাস বরণ করে নিতে। তাই রুদ্ররূপী চৈত্র ভুলিয়ে কালবৈশাখী আপন করে নিতে বাঙালি খুলে বসেন হালখাতা। একটি বছরের নানান সাফল্য, কিছু ব্যর্থতা আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মেলবন্ধনে সাড়ম্ব^ড়ে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনার বটমূলে ছায়ানটের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানটি’ আমাদের বৈশাখ বরণের আয়োজনটি বরাবরই পূর্ণ করে। বৈশাখী মেলা, পিঠা উৎসব, নৃত্য, গান, পুতুলনাচÑ এসব কিছুই যেন বৈশাখটি প্রতি বছরই আবারও নতুনভাবে উপস্থাপন করে। চারদিকে বাঁধভাঙা জোয়ার ও কোলাহল, আনন্দিত কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে নবীন-প্রবীণের মিলিত উল্লাসে শহর এবং গ্রামে বাংলায় হয় বৈশাখ উদযাপন। এ উৎসব চিরায়ত ও জাতীয়। সাধ্যমতো প্রতিটি পরিবার আয়োজন করে পান্তা-ইলিশ, নানান ভর্তা, পায়েস, পিঠা-পুলি ইত্যাদি।

এ তো গেল সর্বজনীন বৈশাখী উৎসব উদযাপনের ভূমিকা মাত্র। আমাদের আজকের বসনে বৈশাখ অপূর্ণ রয়ে যাবে যদি এতে বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন নিয়ে দু’কলম না লেখা হয়। বৈশাখের সঙ্গে আসে প্রচ- গরম। তাই বলে কী আর থেমে থাকবে সাজসজ্জা! বৈশাখজুড়ে বাঙালির আধুনিক সাজসজ্জা ও পোশাকে প্রতিফলিত হয় বাঙালিয়ানা। তপ্ত গরমে চিরায়ত সুতি কিংবা খাদি, একরঙা চিকন পাড়ের শাড়ির সঙ্গেও ব্লক ও বাটিক শাড়ি এখন জনপ্রিয়। লাল ও সাদা ছাড়াও ফ্যাশনে এসেছে হালকা রঙের সঙ্গে উজ্জ্বল রঙের মেলবন্ধন। একই সঙ্গে পরতে পারেন সিøভলেস ব্লাউজ কিংবা বাটিক ব্লাউজ। কানে পরতে পারেন হালকা টপ। তবে উৎসবে ঝুমকাও বেশ মানানসই। গলায় পরতে পারেন লকেট, মাটি কিংবা মেটাল ধরনের গয়না, পায়ে নূপুর, হাতে বিভিন্নরঙা চুড়ি, বালা ও ব্রেসলেট। টিপটাই বা কেন বাদ যাবে! পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কপালে এঁকে নিতে পারেন টিপ। বাজারে নানান টিপ কিনতে পাওয়া যায়। সেখান থেকেও বেছে নিতে পারেন পছন্দের টিপ। পোশাকের সঙ্গে চুলের স্টাইল অনিবার্য। গরমে অনেকেই সামার লুকের জন্য বেছে নেন ছোট চুলের স্টাইল। আবার লম্বা চুলের মেয়েদের অনেকেই হাতখোঁপা, এর উপর গাঁদা কিংবা বেলি ফুলের সজ্জায় বেশ সাবলীল থাকেন। অন্যদিকে অনেকে এলোচুলেই স্বকীয়।
আধুনিক বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন মানে কিশোরী থেকে নারীÑ সবাই শাড়ি ছাড়াও সুতির আরামদায়ক বিভিন্ন ডিজাইন ও কাটের সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, ম্যাক্সিড্রেস, লং স্কার্ট, ম্যাগিহাতা টপসে নিজেকে সাজিয়ে নেন।
ছেলেরা গরমে খোঁজেন আরাম। তাই তাদের ফ্যাশনজুড়ে থাকে টিশার্ট, হাফহাতা শার্ট, বারমুডা, সুতি পায়জামা-পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। নারী ও পুরুষÑ উভয়েই পায়ে পরেন কোলাপুরি চপ্পল কিংবা ফ্ল্যাট স্যান্ডেল আর চোখে বিভিন্ন ডিজাইনের সানগ্লাস।

বিগত বছরের দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ ভুলে চলুন এবারও নবআশায় সম্ভাষণ করি বৈশাখ মাসের। উৎসব আয়োজনে যেন নিজের আনন্দ উদযাপনে অন্যের কষ্টের কারণ না হই। অপরের প্রতি হই আরো সহনশীল।

‘মুছে যাক গ্লানি
ঘুচে যাক জরা
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’

বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব প্রত্যেক বাঙালির। এই বৈশাখে চলুন আরেকবার অঙ্গীকারবদ্ধ হই। বিভেদ ভুলে এক হয়ে যাই। এই বৈশাখে আমাদের সব আয়োজন হোক সফল ও নিরাপদ। এভাবেই জেগে উঠুক পোশাকে বাঙালিয়ানা, আপনরূপে উদযাপিত হোক বসনে বৈশাখ। সবাইকে শুভ নববর্ষ।

 

আয়োজনে : স্বাক্ষর ও বর্ণ

ছবি : কৌশিক ইকবাল

পোশাক : লা রিভ

মডেল : তৌসিফ ও নাজমি

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত

 

বৈশাখে লোকজ মেলা ও তারুণ্য

অঞ্জন আচার্য

 

 

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয় নববর্ষ হিসেবে। এছাড়া এ উৎসবে অংশ নেয় ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ দিনে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে অতীত বছরের যাবতীয় দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে নতুন বছরটি যেন হয় সমৃদ্ধ ও সুখময়। অন্যদিকে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে এ দিনটিকে বরণ করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পালিত হয় এ পহেলা বৈশাখ। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই মিল রয়েছে এই বিষয়ে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এই দিন।
অনেক আগে থেকেই বাংলা বারো মাস পালিত হতো হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হতো এই সৌর পঞ্জিকার। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরলা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বহুদিন থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালিত হতো আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তির যুগ শুরু না হওয়ায় ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো কৃষকদের।
ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে বাধ্য করানো হতো খাজনা পরিশোধ করতে। তবে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন বাংলা সনের। তিনি মূলত আদেশ দেন প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার। সম্রাটের আদেশ মতে সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলা সন গণনা। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে। আকবরের সময় থেকেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হতো সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে আপ্যায়ন করাতেন মিষ্টান্ন দিয়ে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন উৎসবের। একসময় এই

 

 

লোকজ সংস্কৃতি : আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে এদেশে উদ্যাপন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের এ উৎসবের সঙ্গে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামগঞ্জের মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। নতুন জামাকাপড় পরে বেড়াতে যায় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে। পরিষ্কার করা হয় ঘরবাড়ি-আঙিনা, সাজানো হয় মোটমুটি সুন্দর করে। সেই সঙ্গে থাকে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। কয়েকটি গ্রামের মিলিত স্থানের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য এ মেলা৷ কেবল বাংলাদেশেই বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে অন্তত দুই শতাধিক বৈশাখী মেলার আয়োজন বসে৷ সেখানে নানা স্বাদের মুড়ি-মুড়কি আর পিঠাপুলি তো রয়েছেই, সেই আদিকাল থেকে জনপ্রিয় পুতুলনাচের আসরও এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ৷ আর নাগরদোলায় হাওয়ায় ভেসে নববর্ষের নতুন মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করার অনুভূতি যেন একেবারেই ভিন্ন৷ এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী৷ দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যেরও৷ অনেক জায়গায় ব্যবস্থা থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা ও কুস্তি উল্লেযোগ্য। এদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি বসে ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। বৈশাখে এসব মেলা হয়ে থাকলেও মেলাগুলো বর্ষবরণ মেলা, নববর্ষের মেলা, বান্নি মেলা আবার কোথাও এলাকার নামে, ব্যক্তি বা অন্যান্য নামে পরিচিতি পেয়ে থাকে। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত এ আবদুল জব্বারের বলি খেলাটি। এছাড়া বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা হয়ে থাকে বৈশাখের প্রথম দিন চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিল, সিআরবির শিরিষ তলা চত্ত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত এসব মেলায় হা-ডু-ডু, কুস্তি লড়াই, লাঠিয়াল নাচ, পুতুল নাচ, সার্কাস, মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াইসহ থাকে মজার মজার আয়োজন। একসময় এসব মেলায় জনপ্রিয় অনুষঙ্গ ছিল বায়োস্কোপ বাক্স। কিন্তু এখন এটি আর দেখা যায় না। তবে অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় পুতুল নাচ, সার্কাসের। এদিকে ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে বসে এক ব্যতিক্রমী মেলা, যার নাম বউমেলা। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে আয়োজিত হয়ে আসছে এ মেলাটি। পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলাটি বসে প্রাচীন একটি বটগাছের নিচে। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে সমবেত হয় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষ্যে। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনষ্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। মিষ্টি ও ধান-দূর্বার সঙ্গে মৌসুমী ফল নিবেদন করেন ভক্তরা। এছাড়া মেলাকে ঘিরে পাঁঠাবলির রেওয়াজও বেশ পুরনো। তবে কালের বিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন ভক্তরা কবুতর উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় আরেকটি মেলার, যার নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন।

তাঁর মৃত্যুর পর ওই জায়গাতেই বানানো হয় সাধকের স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে হিন্দুরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং সেখানে আয়োজন করে মেলার। যার কারণে মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করা। এরপর সেই খিচুড়ি কলাপাতায় করে খায় আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই। সকাল থেকেই মেলাকে ঘিরে ঘটতে থাকে নানা বয়সী মানুষের সমাগম। একদিনের এ মেলাটি জমে ওঠে মূলত দুপুরের পর থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা উপলক্ষ্যে এ মেলার আয়োজন করা হলেও এতে প্রাধান্য থাকে সব ধর্মের মানুষেরই। মেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় শিশু-কিশোরদের। মেলাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসের। এছাড়া মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় কীর্তন গান। খোল-করতাল বাজিয়ে এ কীর্তন গানের আসর চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে চলে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। সে অঞ্চলের প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে স্বতন্ত্র বর্ষবরণ উৎসব। এ উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, বৈসু বা বাইসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই ও চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু নামে পরিচিত। বর্তমানে এ তিন জাতিগোষ্ঠী একত্রে উৎসবটি পালন করে থাকে। উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে যার যৌথ নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈসাবি’। এ উৎসবের রয়েছে নানা দিক। ত্রিপুরা সম্প্রদায় শিবপূজা ও শিবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পালন করেন ‘বৈসুক’ বা ‘বৈসু’ উৎসব। এছাড়া মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব চলে তিন দিনব্যাপী। উৎসবে মারমাদের সবাই গৌতম বুদ্ধের ছবি নিয়ে নদীর তীরে যান এবং দুধ বা চন্দন কাঠের জল দিয়ে স্নান করান সেটিকে। এরপর আবার ওই ছবিটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আগের জায়গায় অর্থাৎ মন্দির বা বাসাবাড়িতে। আদিকাল থেকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এ সাংগ্রাই উৎসব পালন করে আসছে মারমারা। ধারণা করা হয়, ‘সাক্রাই’ মানে সাল শব্দ থেকে ‘সাংগ্রাই’ শব্দটি এসেছে, বাংলায় যা ‘সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। মারমারা ‘সাংগ্রাই জ্যা’র অর্থাৎ মারমা বর্ষপঞ্জি তৈরি মধ্য দিয়ে সাংগ্রাইয়ের দিন ঠিক করে থাকে। 

 

 

১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই এ ‘সাক্রাই’ বা সাল গণনা করা হয়, যা ‘জ্যা সাক্রই’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা উৎসবটি পালন করে চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন মিলিয়ে মোট তিন দিন ধরে। এর মধ্যে চৈত্রের শেষ দিনটিতে থাকে এ উৎসবের মূল আকর্ষণ। ওই দিন প্রত্যেকের ঘরে পাঁচ প্রকারের সবজি দিয়ে বিশেষ একপ্রকার খাবার রান্না করা হয়। তাদের বিশ্বাস, এই পাঁচনের দৈব গুণাবলী আছে, যা আসছে বছরের সকল রোগবালাই ও দুঃখ-দুর্দশা দূর করে থাকে। এছাড়া এদিন বিকেলে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা, বৌচি ইত্যাদি খেলারও আয়োজন করা হয়। কিশোরী-তরুণীরা নদীর জলে ফুল ভাসায়। তিন দিনের এ উৎসবে ওই সম্প্রদায়ের কেউ কোনো জীবিত প্রাণী হত্যা করে না। ‘বৈসাবি’ উৎসবের মূল আয়োজন হলো জলখেলা। উৎসবটি পার্বত্য অঞ্চলে কমবেশি সবার কাছেই জনপ্রিয়। উৎসবে আদিবাসীরা সবাই সবার দিকে জল ছুঁড়ে আনন্দে মাতেন। তাদের মতে, এ জলের মধ্য দিয়ে ধুয়ে যায় বিগত বছরের সকল দুঃখ, পাপ। জলখেলার আগে অনুষ্ঠিত হয় জলপূজা। মারমা যুবকরা এ উৎসবে তাদের পছন্দের মানুষটির গায়ে জল ছিটিয়ে সবার সামনে প্রকাশ করে তাদের ভালোবাসার কথা। এর মধ্য দিয়ে আন্তরিক হয় পরস্পরের সম্পর্কের বন্ধন। তারুণ্যের মেলা : বৈশাখ মানেই বাঙালির উৎসবমুখর একটা দিন। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বৈশাখের প্রথম দিনটি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলেই অংশ নেয় বৈশাখী আয়োজনে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ এই দিনটিকে বাঙালিরা বরণ করে নেয় অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে। নতুন বছরটি যেন সুন্দর, সুখময় ও সমৃদ্ধ হয় এই কামনাই থাকে সবার মনে ও প্রাণে। প্রতিবারই এই সর্বজনীন উৎসবটি ভরে ওঠে তারুণ্যের উচ্ছাসে। উৎসবকে ঘিরে প্রস্তুতিরও কমতি থাকে না তরুণদের মধ্যে। রঙিন পোশাকে তরুণ-তরুণীরা হাঁটে আনন্দ-উচ্ছাসে। অস্থায়ী দোকানগুলোতে পসরা সাজানো হয় বাহারি খাবার। থাকে পান্তা-ইলিশ খাওয়া ধূম। বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত। শহুরে জীবনে পান্তা-ইলিশ ছাড়া যেন নববর্ষ অপূর্ণ থেকে যায়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই বর্ষবরণ উদযাপন শুরু হয়। ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গেয়ে ওঠে রবি ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি। এ গানের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় নতুন বর্ষকে। কণ্ঠশিল্পীদের অধিকাংশই থাকে তরুণ প্রজন্মের। অন্যদিকে বৈশাখী বা নববর্ষ উৎসবের আবশ্যিক একটি অংশ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের অন্যতম একটি আকর্ষণ। এটাও তরুণদের একটি অন্যতম বৈশাখী সংযোজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যাত্রা শুরু করে এর। পায়ে পা মেলায় লাখো মানুষ। শোভাযাত্রায় ফুটিয়ে তোলা হয় আবহমান গ্রামবাংলা ও জীবনের ছবি। এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন রংবেরঙের মুখোশ পরে তরুণরা। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর বৈশাখী নানা গানের আয়োজনে এ দিনটি হয়ে ওঠে আরও উৎসবমুখর। মূলত রমনা বটমূল এই উৎসবের কেন্দ্রস্থল। এসব অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি বছরই মোবাইল কোম্পানিগুলো নিয়ে আসে তরুণদের জন্য হরেক রকম অফার। আর এ অফারগুলোর সঙ্গে নানা রকম উপহার সামগ্রী তো থাকেই। কী গ্রাম কী শহর সব জায়গাতেই সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য। আনন্দে মাতে পুরো দেশের তারুণ্য। পহেলা বৈশাখের বেশ কিছু দিন বাকি থাকতেই শুরু হয় এর প্রস্তুতি। বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও তরুণদের দিনটি হয়ে ওঠে লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। ভোরের আলো ফুটতেই তরুণদের শুরু হয় সাজসজ্জা। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল ও সাদা তো থাকেই, সঙ্গে থাকে বাহারি রং। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা পরে লাল। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিফ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণদের চাহিদার থাকে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকে অধিকাংশ ফ্যাশন-সচেতন তরুণ প্রজন্ম। পহেলা বৈশাখকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে থাকে বৈচিত্র্যময় আয়োজন। ‘এসো এসো এসো হে নবীন, এসো এসো হে বৈশাখ এসো আলো, এসো হে প্রাণ ডাক কাল বৈশাখীর ডাক।’ তারুণ্যের প্রতি সুকান্তের এ আহ্বানই বৈশাখকে করে তোলে আরও বেশি তরুণ। প্রতি বছরেই বৈশাখ আসে নতুন রূপে নতুন সুরে নতুনের আহ্বানে। ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে চলার গানটি

বৈশাখের প্রথম দিনটিতে তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। সূর্য একটু তাতিয়ে উঠলে তরুণেরা গেয়ে ওঠে ফিডব্যাকের ‘মেলা যাইরে’। বছরের সারাটা সময়ে এ আয়োজনে মেতে ওঠার অপেক্ষায় থাকে তরুণরা। আবার অনেকে বৈশাখ আসার আগেই বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে রাখে বৈশাখের দিনটা কীভাবে কাটাবে ভেবে। ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অমিতের কাছে বৈশাখের প্রথম দিনটা সবসময়ই অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে আলাদা। এই দিনটাকে নিয়ে সবসময়ই থাকে তার আলাদা পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা প্রাধান্য পায় সবার আগে। এর সাথে যোগ হয় দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি। আর খাওয়া-দাওয়া? সেটার কথা তো হিসাবের বাইরে। কোথায় কী খাওয়া হবে, তার নেই ঠিক। একই বিভাগের খায়রুলের দিনটা কাটে আর সবার মতোই। দারুণ আনন্দ নিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়ে সে। গন্তব্য রমনার বটমূল। তারপর রমনাতে গিয়ে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা তো এখন একটা রেওয়াজ। সুতরাং তার পান্তা ইলিশ চাই-ই চাই। আর মেলায় ঘোরাঘুরি ছাড়া পহেলা বৈশাখ জমেই না। তাই রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে বৈশাখ উপভোগ করেন শ্রাবন্তী। এদিকে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিবিএ-এর শিক্ষার্থী ফারিয়া, অনিষা, নাফিম, মোনা, মৌ কথায় ওঠে আসে দিনটি উদ্্যাপনের বিবরণ। তাদের কথা, ওই দিনটি কেবলই নিজেদের মতো করে পালন করার দিন। ওই দিন আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না কারো। তাই এ দিনটাকে বেড়ানোর কাজেই সারাদিন কাটায় ওরা। ফারিয়ার কথা, বৈশাখের প্রথমদিনে সকালে গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরে মোটামুটি কাছের সব আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় অল্প সময়ের একটি পরিকল্পনা করে সে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিথিলা থাকে রোকেয়া হলে। সবসময় বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না তার। বৈশাখের এই দিনগুলোতে ছুটি পায় বলে বাসায় চলে যায় সে। ওখানে এই দিনটাতে সকালবেলা সবার আগে বাবা-মায়ের কাছে যায়। এরপর নাস্তা সেরে দেখা করে সব স্কুল ও পাড়ার বান্ধবীদের সাথে। এই দিনটাতে নতুন করে আড্ডায় মেতে উঠে সবাই। তারপর সবচেয়ে প্রিয় আমভর্তা তৈরি করে একসাথে খায় সবাই মিলে। সব মিলিয়ে এই দিনটা তরুণরা হৈ হুল্লর করেই কাটিয়ে দেয়।

বিচিত্র রূপের হালখাতা

সাইমন জাকারিয়া

 

 

হালখাতা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিচিত্র রূপ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাধারণত বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা বাংলা নববর্ষ এলে হালখাতার আয়োজন করেন। তারা এ সময় মূলত নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের সুহৃদ ক্রেতা ও বিভিন্ন লেনদেনকারী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে মিষ্টিমুখ করান। এই মিষ্টিমুখ করানোর ফাঁকে ব্যবসায়ীরা বিগত বছরের হিসাবের খাতার পাট চুকিয়ে নতুন খাতায় নতুন বছরের ব্যবসার হিসাব শুরু করে থাকেন। সুহৃদ ক্রেতারাও হালখাতার আয়োজনে যোগ দিয়ে সারা বছরের বকেয়া পরিশোধ করেন। হালখাতা নামটির ভেতর সংস্কৃতির এই রহস্য লুকিয়ে আছে। আসলে আরবি ‘হাল’ শব্দের সঙ্গে ফার্সি শব্দ ‘খাতা’ মিলে হালখাতা রূপ ধরেছে। আরবি ভাষার ‘হাল’ শব্দটির অর্থ হলো বর্তমান বা চলতি এবং ফার্সি ‘খাতা’ শব্দটির অর্থ হলো বই বা বহি। তাই সামগ্রিক বিচারে ‘হালখাতা’র অর্থ হলো চলতি বছরের হিসাবের খাতা বা বই। পুরনো বছরের পাট চুকিয়ে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা বা বইয়ে হিসাব লেখার সূচনা করার আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি পালনের নামই ‘হালখাতা’।
বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না যেখানে বাংলা নববর্ষ উৎসবের অংশ হিসেবে হালখাতার অনুষ্ঠান হয় না। আগে ওই আয়োজন গ্রামীণ সমাজের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং তাদের দরিদ্র ক্রেতার মধ্যে প্রচলিত ছিল। এখন ওই দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বড় ব্যবসায়ীরাও হালখাতার আয়োজন করে থাকেন। একই সঙ্গে হালখাতার আয়োজন গ্রাম ছাড়িয়ে নগর সমাজেও বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকা মহানগরের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন বাংলা নববর্ষের সময় হালখাতার আয়োজন করতে দেখা যায়।
এক সময় গ্রামে হালখাতার আয়োজনে মিষ্টি হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা দোকানের পাশেই গরম জিলাপি ভাজা হতো এবং ক্রেতারা এসে বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে মজা করে ওই জিলাপি খেতেন। শুধু তা-ই নয়, ক্রেতারা যখন ফিরে যেতে উদ্যত হতেন তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের মালিক কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে তুলে দিতেন বাড়ির সদস্যদের জন্য একটি জিলাপির ঠোঙা।
তাই গ্রামীণ সমাজে হালখাতার জন্য শুধু ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করতেন না, ক্রেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপেক্ষা করতেন যুগপৎ। শুধু জিলাপিই নয়, হালখাতার আয়োজনে কোথাও কোথাও স্থানীয় বিভিন্ন মিষ্টান্ন তথা ম-া-মিঠাই অভ্যাগতদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বড়দের পাশাপাশি হালখাতার আয়োজনে শিশুদেরও সরব উপস্থিতি ঘটে। মূলত অভিভাবকদের হাত ধরেই শিশু-কিশোররা হালখাতার আয়োজনে শরিক হয়ে থাকে। বড়দের মতো শিশু-কিশোরদের জন্যও দেওয়া হয় রসে ডুবুডুবু ধবধবে সাদা বড় রাজভোগ যার ভেতরে থাকে ছোট ক্ষীরের পুঁটলিতে পোরা সুগন্ধি একটি এলাচদানা। খুব তৃপ্তি নিয়ে সব বয়সী মানুষ হালখাতার মিষ্টান্ন যেমন আহার করে থাকেন তেমনি কোথাও দেওয়া কালিজিরা ছিটানো হালকা গেরুয়া রঙের নিমকি খেয়ে কারও মন গলে যায়। নিমকির মচমচে ভাজায় অন্তর চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কোথাও আবার গন্ধ কর্পূূর মেশানো ঠা-া এক গ্লাস পানি হৃদয়টি শীতল করে দেয়। রাজভোগের মিষ্টতার বিলাসী আবেশের সঙ্গে নোনতা নিমকির নিরপেক্ষ স্বাদ দুই বিপরীত রসের স্রোতে রসনায় বৈচিত্র্য আনে বৈকি।
হালখাতার আয়োজন উপলক্ষে নববর্ষ আসার আগের দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। নববর্ষের দিন হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে দুটি বা চারটি কলার গাছ লাগিয়ে একটি প্রবেশপথ তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রঙিন কাগজ দিয়ে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দারুণভাবে সাজানো হয়। জ্বালানো হয় সুগন্ধি আগরবাতি। ব্যবসায়ী বা তার আমন্ত্রিত ক্রেতারা ওই রঙিন ও সুগন্ধ ছড়ানো আয়োজনের মধ্যে আসেন নতুন রঙিন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে। সব মিলিয়ে একটা ফুরফুরে ও সুন্দর ভাব সৃষ্টি হয় হাতখাতার পুরো আয়োজন ঘিরে।
আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হলো, হাতখাতার এ ধরনের আয়োজনের আগেও কিছু কাজ থাকে। যেমন আমন্ত্রপত্র তৈরি, বিতরণ অথবা মৌখিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাতখাতার জন্য প্রস্তুতকৃত আমন্ত্রণপত্রের মাথায়, এমনকি কখনো কখনো হালখাতার জন্য সজ্জিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের মুখে একটা না একটা স্বস্তিবচন লেখা থাকে। ওই স্বস্তিবচন মূলত ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে অর্থাৎ তারা ইসলাম, সনাতন, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান ইত্যাদি যে ধর্ম মতের অনুসারীই হোন না কেন, যার যার ধর্ম মতের প্রচলিত বিশ্বাস ও ভক্তিভাব অনুযায়ী স্বস্তিবচনের শিরোনাম বা বন্দনাস্তবক লেখা হয়ে থাকে। কোথাও হয়তো লেখা থাকে, ‘এলাহি ভরসা’, কোথাও ‘নমো গণেশায় নমঃ’, ‘শ্রীহরি’, ‘জয় রাধা-কৃষ্ণ’ বা ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’, ‘ধম্মং শরণং গচ্ছামি’, ‘সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি’ ইত্যাদি। কোথাও আবার একটা ‘ক্রুশ’চিহ্নও এঁকে দেওয়া হয়। এ ধরনের স্তবক লিখন দেখে হালখাতার অনুষ্ঠানটি ধর্ম প্রভাবিত বলা চলে না। কারণ এ ধরনের লিখনের ভেতর দিয়ে মূলত ব্যবসায়ীর নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রটি বিতরিত হয় সব ধর্মের ক্রেতা বা আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে।
প্রখ্যাত প-িত মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, বর্তমানে হালখাতা ব্যবসায়িক অনুষ্ঠান হলেও আসলে এ হচ্ছে একটা কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান। প্রাচীনকালে ‘দ্রব্য’ বিনিময়ের মাধ্যমে (‘মুদ্রা’ বিনিময়ের মাধ্যমে নয়) যখন ব্যবসা চলতো তখন গৃহস্বামী তার উৎপন্ন দ্রব্যের কতোটুকু নিজের জন্য রেখে অবশিষ্টটুকুর দ্বারা নিজের প্রয়োজনীয় অন্য দ্রব্য নেবেন এ সম্পর্কে একটা হিসাব। তা যে কোনো উপায় হতে পারে। যেমন রাশিতে গেরো দিয়ে, পাথর বা মাটির ঢেলার স্তূপ জমিয়ে তাকে রাখতে হতো। তারপর অনেক পরে তিনি তালের পাতায় ‘টোকা’ রেখে অথবা তুলট কাগজে ‘চোতা’ বানিয়ে ওই কাজ সেরেছেন। বর্তমানে হালখাতা এরই বিবর্তিত রূপ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হালখাতা এখন অনেকভাবে হয়ে থাকে। মানিকগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে হালখাতা উপলক্ষে ‘লাঠিখেলা’, ‘বুড়া-বুড়ির সঙ’ ‘কিচ্ছা’ ইত্যাদি পরিবেশনামূলক লোকশিল্পের আয়োজন করা হয়। এতে একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে হালখাতার নিবিড় সম্পর্ক রচিত হয়। আমাদের ধারণা, হালখাতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এ ধরনের আয়োজন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে হালখাতার এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে বলেই প্রত্যাশা রাখি।

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 


ভারতের অবহেলিত জাদুবিদ্যাটি শ্রেষ্ঠত্বে সিংহাসন পাইয়ে দেয়ার পর না থেমে জাদুশিল্প সব রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলা ও বাঙালিকে গৌরবোজ্বল জাতি হিসেবে নতুনভাবে পরিচিত করেছেন পিসি সরকার।
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের দুর্বল আর্থিক কাঠামোর মধ্যেও মানুষ যাকে ঘিরে জীবন চ্যালেঞ্জ জয়ের স্বপ্ন দেখতো তিনিই পিসি সরকার তথা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।
আন্তর্জাতিক ওই জাদুকর ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত জাদু দেখিয়েছেন। পিসি সরকার শুধু জাদুশিল্পীই ছিলেন না, লেখকও ছিলেন। জাদুশিল্পে পিসি সরকারের কৃতিত্ব হলো, তিনি বহুল প্রাচীন জাদু খেলার মূল সূত্র আবিষ্কার করেন। তার অন্যতম প্রদর্শনী ছিল ‘ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী।
ভবিষ্যতের জাদু সম্রাটের জন্মও যেন একটি ম্যাজিক। ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম অশোকপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল। বাবা ভগবান চন্দ্র সরকার ও মা কুসুম কামিনী দেবীর প্রথম পুত্র সন্তান তিনি। প্রতুল ছিলেন সাত মাসের প্রিম্যাচুরড বেবি। ওই সময়ের যে চিকিৎসা ব্যবস্থা, এতে তার বেঁচে থাকারই কথা নয়। কিন্তু যিনি ভবিষ্যতে গোটা দুনিয়ায় তাক লাগিয়ে দেবেন, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে রাখে হরির ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন খোদ ঈশ্বর। তারা ছিলেন দুই ভাই। পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল চন্দ্র (পিসি) সরকার বড় ও ছোট ভাই অতুল চন্দ্র (এসি) সরকার বা এসি সরকার।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রতুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বাবার ইচ্ছা ছিল, বুইড়া ছেলের আদরের ডাকনাম হবে বুড়ো। বুড়ো বড় হয়ে শিক্ষকতা করবেন। তিনি চাইতেন না ম্যাজিকটি পেশা হিসেবে নিন প্রতুল। সমাজ সাদরে গ্রহণ করবে না ভেবে সরকার পরিবার গোপনে চালিয়ে গেছে নিজেদের জাদু সাধনা। তন্ত্র-মন্ত্রে নয়, প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞান সাধনা। সেকালের বিখ্যাত জাদুকর ঘনপতি চক্রবর্তী ছিলেন তার জাদুবিদ্যার গুরু। হাতে-কলমে জাদু জাদুবিদ্যা শেখা ও চর্চার আরো সুযোগ হয় তার। এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি বই থেকেও চলতে থাকে জ্ঞান আহরণ। সেই প্রাথমিক শিক্ষাক্রম ডালপালা মেলে একদিন মহীরুহে পরিণত হলো। কিন্তু ভাগ্যের লেখনী একেবারেই আলাদা। তাই অংকের ছাত্র হয়েও জাদুবিদ্যাই হয়ে ওঠে প্রতুলের ধ্যান-জ্ঞান।


ভাই অতুল ১৯ বছরের ছোট। দাদার প্রথম দিকের পেশাদার জীবনের সঙ্গী ছিলেন তিনি। পরে মতান্তর হওয়ায় একাই ওই শিল্প মঞ্চস্থ করতেন আলাদাভাবে।
প্রতুলের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বাড়ির পাশেই শিবনাথ হাই স্কুলে। স্কুলে যাতায়াতের পথে একটা খালের দু’পাশে ছিল ‘মাদারী’দের বাস। তাদের কাছেই প্রতুলের জাদুবিদ্যার হাতেখড়ি।
পারিবারিক সূত্রে জাদু ছিল তার রক্তেই। সেই আত্মারাম থেকে শুরু ষষ্ঠ প্রজন্মের দ্বারকানাথ সরকার পর্যন্ত সবাই অল্পবিস্তর ম্যাজিক জানতেন। সপ্তম প্রজন্মের ভগবান চন্দ্রও বাবার কাছ থেকে ওই বিদ্যা চর্চা করেন। কিন্তু তখনকার সমাজ জাদুকরদের খুব একটা সুনজরে দেখতো না। আত্মারামের ওপর সেই সময়ের কাপালিক ও তন্ত্র সাধকরা এতোটাই রুক্ষ ছিলেন যে, আজও তাদের তন্ত্র-মন্ত্রে বারবার এগিয়ে আসে তার নাম। ওই থেকেই সরকার পরিবারের কেউ প্রকাশ্যে কখনো জাদু দেখাননি। তবে প্রতুল সপ্তম  অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় স্কুলের অনুষ্ঠানে  ক্লাসের বন্ধুদের কাছে দেখানো শুরু করেন।
কিছুটা বংশগত ঐতিহ্যও পিসি সরকারকে বাল্যকাল থেকেই জাদুবিদ্যার প্রতি কৌতূহল এ পেশায় আগ্রহী করে তোলে। কিন্তু আদতেই জাদুবিদ্যা শিখবেন কি না, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে মত বিরোধ ছিল।
সমাজ তখন কুসংস্কারাচ্ছন্ন, শ্রেণী বৈষম্যে বিভক্ত ছিল। তুকতাক, ঝাড়ফুঁক করে অসাধ্য সাধন বা মন্ত্রবলে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পেছনে আমল রহস্য ধরে ফেলেন বিজ্ঞানমনস্ক দুই ভাই আত্মারাম ও বাঞ্চারাম সরকার। কিন্তু আধুনিকতায় অনভ্যস্ত সমাজ তা মানতে চায়নি। সহজ-সরল ও নিরক্ষর মানুষকে তা বোঝাতে গেলে আত্মারামের প্রাণনাশ হয় ‘মাদারী’ গোষ্ঠীর হাতে। আর বাঞ্চারাম পালিয়ে বাঁচেন। কারণ তাদের জীবন ধারণের অন্যতম উপায় ছিল জাদুবিদ্যা। উপস্থিত বুদ্ধি ও হাতের কারসাজি দিয়ে তিলটি তাল করে সাধারণ মানুষকে এক কল্পনার জগতে ছায়া দেখাতেন তারা।


ছোট প্রতুলের ওই খেলা বেশ ভালো লাগতো। আগ্রহ তার এতোটাই ছিল যে, একদিন তাদেরই একটা খেলা দেখিয়ে দিলেন তিনি। প্রথমে তারা বিরক্ত হলেও পরে তাকে অনেক খেলা শেখায়। পরবর্তী সময় টাঙ্গাইলে পড়া অবস্থায় সহপাঠীদের জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় তার জাদুবিদ্যার পথ চলা।  
১৯২৯ সালে শিবনাথ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক ও করটিয়া সা’দাত কলেজ থেকে ১৯৩১ সালে মানবিক শাখা থেকে আবারও প্রথম বিভাগে পাস করেন। এরপর আনন্দ মোহন কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ পাস করার পর সম্পূর্ণ মায়ার জগতে প্রবেশ করেন প্রতুল। জাদু সম্রাটের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। শিল্পের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিতে ম্যাজিকের কপালেও কোনো ম্যাজিক জোটেনি। অনেক সংগ্রাম  ও দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে রীতিমতো লড়াই করার পর একদিন ওই নাম ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ালো পিসি সরকার।
বঙ্গ তখন অগ্নিগর্ভ। পিসি সরকার বিতাড়িত হয়ে পরিবারকে নিয়ে কলকাতায় এসে হাজির হন প্রতুল সুফিয়া স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে। ম্যাজিক দেখিয়ে সংসার চালানো এক সময় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। লোহা-লক্কড়ের ব্যবসায়ী তথা তার এক বন্ধু সহ্য করতে না পেরে গ্রামে একটি মাস্টারি চাকরির ব্যবস্থা করলেন। ঠিক ওই সময় আরেকটি চিঠি এসে হাজির। চিঠিতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের গভর্নরের বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে জাদুকর হিসেবে প্রতুলকে। ফলে আর চাকরি করা হলো না তার।


এরপর পেরিয়ে গেল অনেক বছর। ততোদিনে ইউরোপ-আমেরিকার চোখে কালো জাদু ও তন্ত্র-মন্ত্রের দেশ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে ভারত। তাই বলে ওই জাদুবিদ্যার লুট করার কোনো ফন্দি ছিল না ব্রিটিশদের। পরাধীন দেশে ইংরেজরা পথঘাটের জাদুকর মাদারী খেলা দেখিয়ে তাদের কারিগরি বেশকিছু শিখে নিয়েছে।
ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরার সঙ্গে মিশে গেছে পশ্চিমি আধুনিকতা। পরে এপার বাংলা থেকে কলকাতায় চলে আসা সরকার পরিবার পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখিয়ে উপার্জন করতে থাকে। এদিকে নিজের ক্যারিশমাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো গভীর হতে থাকে। সেই সঙ্গে একটু করে বেড়ে উঠতে থাকে ইন্দ্রজালের মায়া।
পিসি সরকারের জাদু শব্দটিতেই আপত্তি ছিল। তিনি মনে করতেন, ওই শব্দটি বড় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু হিন্দু ধর্মের দেবরাজ ইন্দ্র হলেন মায়াবিদ্যার প্রতীক সেহেতু ওই ভাবনা থেকেই তার মঞ্চ উপস্থাপনার নাম হয় ইন্দ্রজাল। এর সঙ্গে যোগ হয় বিনোদন।


১৯৩০ সাল থেকে জনপ্রিয় হওয়া শুরু হয়। তখন কল্লোলনী বিভক্ত ছিল হোয়াইট ও ব্ল্যাক কলকাতা হিসেবে। ওই বিভেদের বেড়াজাল ভাঙতে জাদু সম্রাট নিউ এম্পায়ার থিয়েটার হলটিই বেছে নেন নিজের ম্যাজিক পরিবেশনের মঞ্চ হিসেবে। উঁচু বর্ণ ও সম্ভ্রমের নিউ এম্পায়ার মাসের পর মাস হাউসফুল হয়েছে ব্ল্যাক কলকাতা। জাদুর জগতে ব্যাপক প্রচার লাভের উদ্দেশ্যে তিনি এক সময় নিজের পদবী সরকার বাদ দিয়ে ইংরেজি ‘সোরসার’ শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করের। কারণ শব্দটির অর্থ জাদুকর। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করার পর তিনি আবার নিজের সরকার পদবীই গ্রহণ করেন। তা বিদেশিদের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে আরো আকর্ষণীয়। কিন্তু সেসব খেলার উৎস যে আমাদের দেশীয় সেটিই উহ্য থেকে যায়। দরকার ছিল এমন একজনÑ যিনি ওই দেশের জাদুবিদ্যা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চলে যাওয়া ওই কা-ারি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন প্রতুল চন্দ্র সরকার। তিন দশকের মাঝামাঝি থেকেই তিনি প্রচারের আলোয়। ক্রমেই শুরু হলো স্টেজ শো দেশে-বিদেশে। দেশীয় ম্যাজিকগুলো নতুন জাদুতে বুঁদ হলো দুনিয়া।
১৯৩৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম বিদেশ গমন করেন। তিনি জাপান, ফ্রান্স, আমেরিকাসহ ৭০টির মতো দেশে জাদু প্রর্দশন করে ব্যাপক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ সময় তিনি পর্যপ্ত অর্থও উপার্জন করেন। তার জাদুর ছোঁয়ায় বিশ্বের দরবারে নতুন পরিচিত হলো ভারতবর্ষ। উন্নত বিশ্ব জানলো এবং মানলো, বেঁদে, ওঝা, ঝাড়ফুঁক ও বাজিকরের দেশ ভারতবর্ষ বিজ্ঞান নির্ভর ম্যাজিকও দেখাতে পারে। জাদু মানচিত্রে পিসি সরকারই হয়ে দাঁড়ালো আলাদা ব্র্যান্ড, আলাদা প্রতিষ্ঠান।


১৯৩৮ সালে পিসি সরকার কলকাতার বাসন্তী দেবীকে বিয়ে করেন। সংসার জীবনেও তিনি খুব সুখী ছিলেন। তার তিন ছেলে মানিক, প্রদীপ (পিসি সরকার জুনিয়র) ও পি সরকার ইয়ং। বাসন্তী দেবী ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর মারা যান।  
‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া’  কারো অজানা নয়। এটি পিসি সরকারের জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কোনো শো-র প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট চৌবাচ্চা থেকে অনবরত ভরে চলতে থাকে গ্লাসের পর গ্লাস।
তিনিই বলে গেছেন, ‘আমি চিরজীবন শুধু ম্যাজিকের জগতেই বসবাস করেছি। স্বপ্নের রঙ গায়ে মেখে জীবন কাটিয়েছি। পৃথিবীর অনেক দেশেই গিয়েছি। সেখানকার মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। যতোই তাদের নৈকট্য বেড়েছে, ততোই নিজের দেশকে বেশি করে শ্রদ্ধা করতে ও চিনতে পেরেছি। ম্যাজিক একটি শিল্প। এতে বিজ্ঞান, টেকনোলজি, শারীরিক দক্ষতা ও শোম্যানশিপÑ সবই লাগে। এতে কোনো অলৌকিক কিছুই নেই।’
তাচ্ছিল্য ও অবহেলার বিরুদ্ধে লড়াই করে পথের ধুলায় পড়ে থাকা মাদারীর খেলাটি পিসি সরকার নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে। ভ- সাধুদের ভোজবাজি মানুষকে ঠকানোর কলমঞ্চে উপস্থাপন করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানই অলৌকিক পিতা। ডাইনিবিদ্যার নামে অন্ধকারে পড়ে থাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ভারতীয় জাদুটি তিনি তুলে ধরে ছিলেন বিশ্বের দরবারে। আত্মœবিস্মৃত জাতি তাকে ভুলে গেলেও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে উত্যুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে তার নাম।
ভারতীয় জাদু তথা বৌদ্ধতন্ত্র ও হিন্দুতন্ত্রের দশ মহাবিদ্যার মধ্যে দীর্ঘদিন অনাদরে পড়ে ছিল। পথে পথে ঘুরে বেড়াতো মাদারীর ঝোলায়। এগুলো নিয়ে বিশ্বে বিখ্যাত জাদুকরদের সঙ্গে একই মঞ্চে জাদু প্রদর্শন করতে লাগলেন পিসি সরকার।


জাদুবিদ্যার বিষয়ে পিসি সরকারের ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০। এগুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ম্যাজিক শিক্ষা, হান্ড্রেড ম্যজিক্স, ইউ ক্যান ডু, ছেলেদের ম্যাজিক, ম্যাজিকের কৌশল, সহজ ম্যাজিক, ম্যাজিকের খেলা, মেস মেরিজাম, জাদুবিদ্যা, হিন্দু ম্যাজিক, হিপনোটিজম, ইন্দ্রজাল প্রভৃতি।
নিউইয়র্কের টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ‘এক্স-রে আই’ করাত দিয়ে মানুষ দ্বিখ-িত করা খেলাটি দেখানোর জন্য পিসি সরকারকে বিশেষ বিমানে আমেরিকায় নিয়ে আসে। তার ওই খেলাটি দেখে দর্শক অভিভূত হয়ে পড়ে। তার অপূর্ব প্রকাশভঙ্গির অসাধারণ বাস্তবতার গুণে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। দ্বিখ-িত তরুণীটির খবর জানতে বিবিসি অফিসে এতো টেলিফোন আসতে থাকে যে, দুই ঘণ্টা টেলিফোন লাইন জ্যাম হয়ে যোয়।  খেলাটি দেখানোর পর তিনি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ও সম্মান লাভ করেন।
ফোর্স রাইটিংয়ের জাদু খেলাটি দেখিয়ে সংবাদপত্র মহলে অলোড়ন ফেলে দেন পিসি সরকার। কলকাতা ইম্পেরিয়াল রেস্টুরেন্টে এ কে ফজলুল হককে যে জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করেন এর শিরোনাম ছিল, ‘বাংলার মন্ত্রীদের পদত্যাগ’। এ শিরোনামে একটি সাদা কাগজে প্রথমে তিনি শেরেবাংলা ফজলুল হককে কিছু লিখতে বলেন এবং এর নিচে মন্ত্রীরা স্বাক্ষর করেন। কিছুক্ষণ পর শেরে বাংলা ফজলুল হক নিজের লেখার পরিবর্তে দেখেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা মন্ত্রীরা পদত্যাগ করলাম এবং আজ থেকে জাদুকর পিসি সরকারই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।’ ঠিক এর পরের দিনই বিদেশে একটি দ্রুতগামী ট্রেন আসার মাত্র ৩৮ সেকেন্ড আগে তিনি হ্যান্ডকাফ বন্ধ অবস্থায় ট্রেনলাইন থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। ওই হ্যান্ডকাফটি খুলতে ১৭টি চাবি ব্যবহার করা হতো। এ জন্য তাকে ইংল্যান্ডের জাদুকর সম্মিলনীর তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উইল গোল্ড ও স্টোন বলেছিলেন, ‘তুমি জন্মসিদ্ধ জাদুকর।’
পিসি সরকারের জাদু বিভিন্ন টেলিভিশনে যথা অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন, বিবিসি, শিকাগোর ডাবলিউজিএনটিভি এবং নিউইয়র্কের এনবিসি ও সিবিএস টেলিভিশনে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে।
প্রতুল চন্দ্র সরকার কোনো টাইম ফ্রেম বা সমাজের কোনো শ্রেণীর গ-িতে আবদ্ধ ছিলেন না। ম্যাজিকের মহারাজা হয়েও তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষ।
পিসি সরকার ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে ‘ছায়া যায় কায়া থাকে’ অত্যাশ্চর্য খেলাটি দেখিয়ে ছিলেন। স্টেজে উত্তম কুমারকে তিনি আমন্ত্রণ জানান এবং পেছনে একটি সাদা স্ক্রিনে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখেন। পর্দায় তীব্র সার্চলাইটের আলো ফেলার সঙ্গে সঙ্গে উত্তম কুমারের ছায়া পর্দায় ভেসে ওঠে। স্টেজে তাকে আসন গ্রহণ করতে বলেন। উত্তম কুমার পর্দা থেকে সরে গেলেও তার ছায়াটি বন্দি করে রাখেন। পুরো পৃথিবীতেই ওই খেলা পিসি সরকার ছাড়া অন্য কেউ দেখাতে পারেননি।


নিউ এম্পায়ার প্রেক্ষাগৃহ হয়ে ওঠার পর আর কলকাতায় সেভাবে ম্যাজিক দেখাননি জাদু সম্রাট। এর অন্যতম কারণ ছিল, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোযুক্ত হলের অভাব।
১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে আমেরিকা এবং ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো ও লেনিনগ্রাদ শহরে জাদু প্রর্দশন করে পিসি সরকার প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। তিনিই প্রথম রাজকীয় পোশাক ও আকর্ষণীয় পাগড়ি পরে জাদু প্রদর্শনের প্রচলন করেন।
পিসি সরকারের জাদুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রঙিন চলচ্চিত্র ‘গিলি গিলি গে’ এবং দূরদর্শন তার ফটোগ্রাফির অ্যালবাম প্রকাশ করে। জাদুশিল্পে অসাধারণ পারদর্শীর জন্য বিশ্ববাসীর কাছ থেকে জাদু সম্রাট এবং কালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট উপাধী লাভ করেন তিনি।
জাদু দেখিয়ে পিসি সরকার দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৪৬ ও ১৯৫৪ সালে সর্বশ্রেষ্ঠ স্টেজ ম্যাজিকের জন্য আমেরিকার জাদুর অস্কার নামে পরিচিত ‘দ্য ফিনিক্স’ পুরস্কার দু’দুবার লাভ করেন। জার্মান ম্যাজিক সার্কেল থেকে ‘দ্য রয়াল মেডিলিয়ন’ পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি গোল্ডবার পুরস্কার, ‘সুবর্ণ লরেন মালা’ নামে জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জার্মান পুরস্কার, হল্যান্ডের ট্রিকস পুরস্কার এবং ১৯৬৪ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মশ্রী উপাধি লাভ করেন। জাদু খেলায় কৃতিত্বে জন্য মিয়ানমারের (বার্মা) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্কিন নু তার নাম দিয়েছিলেন ‘এশিয়ার গর্ব’। ভারত সরকার ‘জাদু সম্রাট পিসি সরাকার নামে কলকাতায় একটি সড়কের নামকরণ করেছে। ১৯১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার তার প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি ৫ রুপির স্ট্যাম্প চালু করে।


পিসি সরকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে ১৯৩৭ সালে জাপান সফরের সব অর্থ দান করেন। তিনি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম ও জাপানে ম্যাজিশিয়ান ক্লাবের সদস্য এবং বিলাতের রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন। ইউরোপের বিখ্যাত লেখকরা তার ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে ‘সোরকার’ ও ‘মহারাজা অফ ম্যাজিক’ গ্রন্থ দুটি উল্লেখযোগ্য।
প্রতুল চন্দ্রের গোটা জীবনই ছিল আক্ষরিক অর্থে জাদুতে মোড়া। পিসি সরকার বিদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শো করেন জাপানেÑ ৩৭ বার। তার জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয় ওই দেশেই। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে আরো একবার জাপান সফরে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি জাপানের আশাহিকা  ওয়ারের নিকটবর্তী জিগেৎসু শহরে হোক্কাইডো মঞ্চে ‘ইন্দ্রজাল’ বিস্তারে ব্যস্ত ছিলেন। মুগ্ধ দর্শকের সামনেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মঞ্চ থেকে অদৃশ্য হন চিরকালের জন্য। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ফলে দেশ হারালো তার বরপুত্রকে। ভারতীয় ম্যাজিকে আমদানি হলো এক নতুনধারা।   
ইন্দ্রজালবিদ্যার অম্বেষণে পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি রাখতে তার পরিকল্পনা ছিল আরও বড়। কিন্তু তার অকাল মৃত্যু তখনকার পরিকল্পনাগুলো ভানুমতির বাক্সেই বন্ধ করে দেয়।
ভারতবর্ষের আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে ক্ষণজন্মা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত জাদুকর ঐন্দ্রজালিক পিসি সরকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দ্য  শো মাস্ট গো অন। ঠিক তা-ই হয়েছে। পরিবারের উত্তরসূরিরা বয়ে নিয়ে চলেছে তার জাদু। তাদের সঙ্গে ওই ম্যাজিকের ধারা বয়ে চলেছে ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার অনাবিল গ্রোথের মতো।
অন্ধকার কুস্কারাচ্ছন্ন ওই জাদু বিজ্ঞানটি ঘষে-মেজে প্রতুল চন্দ্র নিয়ে এলেন বিশ্বের জনমঞ্চে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড জার্মানির দর্শক অপলক অবোলকন করলো ভারতীয় জাদুকরের ইন্দ্রজাল।
বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সরকার দ্য সিনিয়র মায়াপুরের বাসিন্দা হয়েছেন। এতো বছর দাঁড়িয়েও অনেকে তার মতো হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেন। তাকেই রোল মডেল করে এগিয়ে চলেন নতুন জাদুকররা। অনেক দূরের তারা হয়ে পুরো ভূমিকায় সিনিয়র। আমাদের বাঙালির বুক আজও তার জন্য গর্বে ফুলে ওঠেÑ বাংলাদেশেরই সন্তান তিনি।

মঘেমল্লার



১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। পুরো বাঙালির জন্য ঐতিহাসিক এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। তা আমাদের সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক চলচ্চিত্র এ দেশে নির্মাণ হয়েছে, হচ্ছে দেশের বাইরেও। সম্প্রতি মুক্তি পায় মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী নিয়ে নতুন চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’। এর কাহিনিতে আমরা দেখা গেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক অবস্থায় গল্পের মূল চরিত্র নূরুল হুদা (শহীদুজ্জামান সেলিম) বাংলাদেশের একটি মফস্বল শহরের সরকারি কলেজের রসায়ণের শিক্ষক। স্ত্রী আসমা ও পাঁচ বছরের মেয়ে সুধাকে নিয়ে তার সুখ-দুঃখের মধ্যবিত্ত সংসার। তাদের সঙ্গে থাকে নূরুল হুদার শ্যালক মানে আসমার ছোট ভাই মিন্টু। একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায় সে। নূরুল হুদাকে রেখে যায় জীবন-মৃত্যুর কঠিন সংকটের মধ্যে। এরপরও নূরুল হুদা নিয়মিত কলেজে যায় এবং পাকিস্তানপন্থি শিক্ষকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করে। মধ্যবিত্তের শঙ্কা, ভয়, পিছুটান তাকে প্রতিনিয়ত অসহায় করে তোলে।
মুষলধারে বৃষ্টির এক রাতে মুক্তিযোদ্ধারা নুরুল হুদার কলেজ এবং পাশের আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। ফলে কোনো কারণ ছাড়াই পাকিস্তানি আর্মিরা নূরুল হুদা ও তার বন্ধু আবদুস সাত্তারকে ধরে নিয়ে যায়। বৃষ্টির মধ্যে যাওয়ার সময় আসমা তার ভাই মিন্টুর একটা ফেলে যাওয়া রেইনকোট নুরুল হুদাকে পরিয়ে দেয়। পাকিস্তানি আর্মির সামনে নূরুল হুদা প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। প্রমাণ করার চেষ্টা করে, সে শিক্ষক মাত্র। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার সংশ্রব নেই। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। আঘাতে নূরুল হুদার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে।

রক্তের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই তার মিন্টুর কথা মনে হয় এবং নিজেকেও মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে শুরু করে। এ জন্য মৃত্যু বা আত্মদান কোনো ব্যাপারই নয়। সে বলেÑ আমি সবকিছু জানি। কিন্তু কিছুই বলবো না। এরপর পাকিস্তানি আর্মির মেজর তাকে গুলি করে হত্যা করে।
চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নুরুল হুদার স্ত্রী আসমা ও তার মেয়ে সুধা চরিত্রে অপর্ণা ঘোষ অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি গত ১২ ডিসেম্বর সারা দেশে মুক্তি পায়। পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রের ওপর শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিছুটা দেরিতে এই প্রথম তিনি নির্মাণ করলেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে মেঘমল্লার। এটি তার প্রথম ফিচার ফিল্ম। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নির্বাচন, সিনেমার মেকিং ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতা রেখেছেন তিনি। তার চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশ সরকার ও বেঙ্গল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড।
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্প ‘রেইনকোট’ অবলম্বনে নির্মিত ওই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা করেছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। শুরুতে এর নাম রেইনকোট নির্ধারিত হলেও পরে করা হয়েছে ‘মেঘমল্লার’। কারণ ভারতে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘রেইনকোট’ চলচ্চিত্র রয়েছে। তাই নাম পরিবর্তন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানের সহযোগিতা ও বেঙ্গল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের প্রযোজনায় চলচ্চিত্রটি পরিবেশন করেছে বেঙ্গল ক্রিয়েশনস।                                                                                     

 

লেখা : দিগন্ত সৌরভ

বিয়ে

 

 

বিয়ে, সাদী, বিবাহ, নিকাহ্ এই চারটি শব্দের সাথে বাঙালি বাংলা ভাষাভাষি সকলেই পরিচিত। বিয়ে সব নারী পুরুষের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা অধ্যায়। পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহকে উৎসাহীত করা হয়েছে। এটি একটি প্রাচীন প্রথা, প্রাচীন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ যৌনাচার শুধু সামাজিক অনাচার তৈরী করে না উৎপাদন ঘটায় এমন কতগুলো রোগ শোক যা সকল অর্থেই ঝুকিপূর্ন এবং অসম্মানজনক। সামাজিক শৃংখলা বংশ ধারা রক্ষায় বিয়ের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার কোনো পথ নেই। বিয়ের আয়োজন সকল ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যেই আনন্দের এক সাজ সাজ রব। বিয়েকে কেন্দ্র করে বর কনে উভয় পক্ষের মধ্যে আনন্দ বেদনা আর নতুন সম্পর্কের সেতু বন্ধন এ এক স্বর্গীয় সুষমা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে যে শুধু মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার সৃষ্টি হয় এমন নয়, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু পাখির মধ্যেও প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যায়। পশু পাখিদের মধ্যে প্রথাগত মন্ত্র উচ্চারণ করে বিয়ে হয় না কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের নর ও নারী তারা একত্রে র্দীর্ঘদিন বসবাস করে সুখের সংসার রচনা করে। বিয়ে নিয়ে সারা পৃথিবীজোড়া প্রবাদ প্রবচন সহ অনেক উন্নত মানের সাহিত্য রচনার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।

বিয়ের আয়োজনে প্রত্যেক ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যে নিজ নিজ রীতি নীতি আচার অনুষ্ঠান বিদ্যমান। আজকাল মানুষের জীবন যাত্রার নাগরিক যে তাড়া বেড়েছে তার কোনো বাহানার শেষ নেই ফলে সকল আয়োজনেই তার প্রভাব পড়ছে। এক সময় লক্ষ্য করা যেত যে বিবাহের আয়োজন নিয়ে দু’টি পরিবার শুধু নয় একটি মহল্লা কিংবা একটি পুরো গ্রাম আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বেশ দুরে থেকে মাইকে, কলের গান, বিয়ের গান বিয়ের গীত কখনো রেকর্ড, ক্যাসেট কিংবা সমবেতভাবে নানা বয়সী নারী পুরুষে কণ্ঠে শোনা যেতো। আজ আর সেই ধরনের আয়োজন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। নানা বর্ণের কাগজ কেটে ত্রিকোণ নিশান, ঝালর কেটে পুরো বাড়ি সাজিয়ে তোলা এ কাজগুলো চলতো দিনের পর দিন অংশ নিতো পাড়া প্রতিবেশী, তরুণী-তরুণ তখনো চলতো নাচ, গান, ছড়াকাটা, ধাঁধাঁ বলা, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি। আজ আর মানুষের অত সময় নেই তাই খবর দেয়া হচ্ছে ডেকোরেশন কোম্পানীগুলোকে, যে আমাদের বাড়ীতে বিয়ে সাজিয়ে দিয়ে যাও আর অমনি হাজির হয়ে গেলো লাল, নীল, হলুদ বাতি আরো কত কী সাজানোর সরঞ্জাম। আর এখন হাল ফ্যাশনের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বিবাহের আনন্দ আয়োজনকে কত আধুনিক আরো কত আনন্দঘন করা যায় সেই বিবেচনা মাথায় রেখে।
এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যে আপনাকে কোনো ঝামেলেই আর যেতে হবে না। আপনি শুধু অর্থের যোগন দেবেন আর কী চাইছেন তাই জানিয়ে দিন, সেই সেই মতো সকল কিছু হাজির হয়ে যাবে আপনার সামনে। ব্রাইডাল ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কোনো কমতি নেই আপনার হাতের কাছে। 
বিয়ের রীতিনীতি জাতি ধর্ম ভেদে বিবাহের রীতিনীতি বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বিয়ের আয়োজন প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে এবং আমরা নানা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে সামাজিক দায়িত্ব পালন ও আনন্দ অনুভব করে থাকি। এই ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহের বহু মাত্রিক আয়োজন বিভিন্ন ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে পরষ্পর প্রবেশ করেছে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দে। কন্যা দর্শন, কন্যা পছন্দ, বর পছন্দ এর সাথে যে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলো আমরা লক্ষ্য করি তা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু খুব ভিতর গত পার্থক্য ছাড়া প্রায় সব একই রকম। আর এটি সংক্রমিত হয়েছে র্দীর্ঘ দিনের সৌহার্দপূর্ণ সহবস্থানের মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও এটি। মুসলিম বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে কন্যার বাড়িতে যে প্রস্তাব নিয়ে মুরুব্বীগণ উপস্থিত হন একে প্রস্তাব বা পায়গাম বলা হয়ে থাকে। তারপর কন্যা দর্শনের দিনক্ষন ঠিক করা, ঠিক একই পদ্ধতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কন্যা দর্শনের রীতি রয়েছে। কন্যা দর্শনের পরে খ্রিষ্ট সম্পদায়ের বিবাহের প্রস্তাবটি কিছুটা ভিন্ন, বর কণে পক্ষ উভয়ে সম্মত হলে পরে বর এবং কণের নাম গির্জায় প্রধান ধর্ম যাযক এর কাছে লিপিবদ্ধ করতে হয় । ফাদার পরপর তিন রোববার তাদের বিস্তারিত পরিচয়সহ বিবাহের প্রস্তবটি তুলে ধরবেন এতে কারো কোনো প্রকার আপত্তি না থাকলে প্রস্তাবটি গৃহীত হবে। পরবর্তী কোনো শুভ দিনক্ষণ দেখে র্গিজায় বিবাহ সম্পন্ন হবে তবে রেওয়াজ আছে যে রবিবার এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের মাসে কোনো বিবাহ সম্পন্ন হবে না। গির্জায় এই পদ্ধতিতে নাম লেখানোকে বন্দ বা বন্ধন বলা হয়ে থাকে।
হিন্দু বা সনাতন ধর্মের প্রাচীন রীতির মধ্যে ছিল বিবাহ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী কোনো আহারই গ্রহণ করতে না। গায়ে হলুদে ব্যবহৃত হলুদ ছেলের গায়ের স্পর্শ করে কনের বাড়িতে পাঠানো হতো। সেই হলুদ কনের গায়ে লাগানো হতো। নিয়ম ছিল গায়ে হলুদের সময় বর সেলাই করা কোনো কাপড় পরিধান করতো না। পাত্র পাত্রীকে বরণ করতে কালো কাজললতা, দেশলাই, সুতো, হলুদবাটা, চন্দন, পঞ্চ শষ্যসহ আরো নানা বিধ উপকরণ দিয়ে বরণ ডালা সাজানো হতো। (এখানে উল্লেখ্য যে ঠিক একই আয়োজনে মুসলিম, খ্রিষ্ট এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।)
সম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় গতির সঞ্চার বৃদ্ধি পেয়েছে সাথে নানাবিধ কুসংস্কার মুক্ত হয়ে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে আলোর দিকে ফলে অনেক পুরোনো রীতিনীতি এখন আর গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। ১৯৬১ সালে জারিকৃত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সকল ধর্ম বর্ণ গোষ্টির বিবাহ অবশ্যই স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।

 

বিয়ে, সাদী, বিবাহ, নিকাহ্ এই চারটি শব্দের সাথে বাঙালি বাংলা ভাষাভাষি সকলেই পরিচিত। বিয়ে সব নারী পুরুষের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা অধ্যায়। পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহকে উৎসাহীত করা হয়েছে। এটি একটি প্রাচীন প্রথা, প্রাচীন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ যৌনাচার শুধু সামাজিক অনাচার তৈরী করে না উৎপাদন ঘটায় এমন কতগুলো রোগ শোক যা সকল অর্থেই ঝুকিপূর্ন এবং অসম্মানজনক। সামাজিক শৃংখলা বংশ ধারা রক্ষায় বিয়ের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার কোনো পথ নেই। বিয়ের আয়োজন সকল ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যেই আনন্দের এক সাজ সাজ রব। বিয়েকে কেন্দ্র করে বর কনে উভয় পক্ষের মধ্যে আনন্দ বেদনা আর নতুন সম্পর্কের সেতু বন্ধন এ এক স্বর্গীয় সুষমা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে যে শুধু মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার সৃষ্টি হয় এমন নয়, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু পাখির মধ্যেও প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যায়। পশু পাখিদের মধ্যে প্রথাগত মন্ত্র উচ্চারণ করে বিয়ে হয় না কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের নর ও নারী তারা একত্রে র্দীর্ঘদিন বসবাস করে সুখের সংসার রচনা করে। বিয়ে নিয়ে সারা পৃথিবীজোড়া প্রবাদ প্রবচন সহ অনেক উন্নত মানের সাহিত্য রচনার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।

বিয়ের আয়োজনে প্রত্যেক ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যে নিজ নিজ রীতি নীতি আচার অনুষ্ঠান বিদ্যমান। আজকাল মানুষের জীবন যাত্রার নাগরিক যে তাড়া বেড়েছে তার কোনো বাহানার শেষ নেই ফলে সকল আয়োজনেই তার প্রভাব পড়ছে। এক সময় লক্ষ্য করা যেত যে বিবাহের আয়োজন নিয়ে দু’টি পরিবার শুধু নয় একটি মহল্লা কিংবা একটি পুরো গ্রাম আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বেশ দুরে থেকে মাইকে, কলের গান, বিয়ের গান বিয়ের গীত কখনো রেকর্ড, ক্যাসেট কিংবা সমবেতভাবে নানা বয়সী নারী পুরুষে কণ্ঠে শোনা যেতো। আজ আর সেই ধরনের আয়োজন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। নানা বর্ণের কাগজ কেটে ত্রিকোণ নিশান, ঝালর কেটে পুরো বাড়ি সাজিয়ে তোলা এ কাজগুলো চলতো দিনের পর দিন অংশ নিতো পাড়া প্রতিবেশী, তরুণী-তরুণ তখনো চলতো নাচ, গান, ছড়াকাটা, ধাঁধাঁ বলা, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি। আজ আর মানুষের অত সময় নেই তাই খবর দেয়া হচ্ছে ডেকোরেশন কোম্পানীগুলোকে, যে আমাদের বাড়ীতে বিয়ে সাজিয়ে দিয়ে যাও আর অমনি হাজির হয়ে গেলো লাল, নীল, হলুদ বাতি আরো কত কী সাজানোর সরঞ্জাম। আর এখন হাল ফ্যাশনের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বিবাহের আনন্দ আয়োজনকে কত আধুনিক আরো কত আনন্দঘন করা যায় সেই বিবেচনা মাথায় রেখে।
এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যে আপনাকে কোনো ঝামেলেই আর যেতে হবে না। আপনি শুধু অর্থের যোগন দেবেন আর কী চাইছেন তাই জানিয়ে দিন, সেই সেই মতো সকল কিছু হাজির হয়ে যাবে আপনার সামনে। ব্রাইডাল ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কোনো কমতি নেই আপনার হাতের কাছে।
বিয়ের রীতিনীতি
জাতি ধর্ম ভেদে বিবাহের রীতিনীতি বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বিয়ের আয়োজন প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে এবং আমরা নানা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে সামাজিক দায়িত্ব পালন ও আনন্দ অনুভব করে থাকি। এই ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহের বহু মাত্রিক আয়োজন বিভিন্ন ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে পরষ্পর প্রবেশ করেছে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দে। কন্যা দর্শন, কন্যা পছন্দ, বর পছন্দ এর সাথে যে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলো আমরা লক্ষ্য করি তা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু খুব ভিতর গত পার্থক্য ছাড়া প্রায় সব একই রকম। আর এটি সংক্রমিত হয়েছে র্দীর্ঘ দিনের সৌহার্দপূর্ণ সহবস্থানের মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও এটি। মুসলিম বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে কন্যার বাড়িতে যে প্রস্তাব নিয়ে মুরুব্বীগণ উপস্থিত হন একে প্রস্তাব বা পায়গাম বলা হয়ে থাকে। তারপর কন্যা দর্শনের দিনক্ষন ঠিক করা, ঠিক একই পদ্ধতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কন্যা দর্শনের রীতি রয়েছে। কন্যা দর্শনের পরে খ্রিষ্ট সম্পদায়ের বিবাহের প্রস্তাবটি কিছুটা ভিন্ন, বর কণে পক্ষ উভয়ে সম্মত হলে পরে বর এবং কণের নাম গির্জায় প্রধান ধর্ম যাযক এর কাছে লিপিবদ্ধ করতে হয় । ফাদার পরপর তিন রোববার তাদের বিস্তারিত পরিচয়সহ বিবাহের প্রস্তবটি তুলে ধরবেন এতে কারো কোনো প্রকার আপত্তি না থাকলে প্রস্তাবটি গৃহীত হবে। পরবর্তী কোনো শুভ দিনক্ষণ দেখে র্গিজায় বিবাহ সম্পন্ন হবে তবে রেওয়াজ আছে যে রবিবার এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের মাসে কোনো বিবাহ সম্পন্ন হবে না। গির্জায় এই পদ্ধতিতে নাম লেখানোকে বন্দ বা বন্ধন বলা হয়ে থাকে।
হিন্দু বা সনাতন ধর্মের প্রাচীন রীতির মধ্যে ছিল বিবাহ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী কোনো আহারই গ্রহণ করতে না। গায়ে হলুদে ব্যবহৃত হলুদ ছেলের গায়ের স্পর্শ করে কনের বাড়িতে পাঠানো হতো। সেই হলুদ কনের গায়ে লাগানো হতো। নিয়ম ছিল গায়ে হলুদের সময় বর সেলাই করা কোনো কাপড় পরিধান করতো না। পাত্র পাত্রীকে বরণ করতে কালো কাজললতা, দেশলাই, সুতো, হলুদবাটা, চন্দন, পঞ্চ শষ্যসহ আরো নানা বিধ উপকরণ দিয়ে বরণ ডালা সাজানো হতো। (এখানে উল্লেখ্য যে ঠিক একই আয়োজনে মুসলিম, খ্রিষ্ট এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।)
সম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় গতির সঞ্চার বৃদ্ধি পেয়েছে সাথে নানাবিধ কুসংস্কার মুক্ত হয়ে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে আলোর দিকে ফলে অনেক পুরোনো রীতিনীতি এখন আর গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। ১৯৬১ সালে জারিকৃত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সকল ধর্ম বর্ণ গোষ্টির বিবাহ অবশ্যই স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।

বরযাত্রা
বরযাত্রা বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষনীয় একটি পর্ব। অল্প কিছুদিন আগেও বরযাত্রায় পালকি ঘোড়ার গাড়ি জল পথে বাহারী বাহারী নৌযান ব্যবহার করা হতো। বরযাত্রা সাজানো নিয়েও মানুষের সার্মথ অনুযায়ী আয়োজনের শেষ নেই। একটি বিশেষ দিনকে আরো প্রাণবন্ত স্মরণীয় করে রাখতে, পোশাক থেকে শুরু করে গাড়ীর বহর, আতশবাজী পোড়ানো সব কিছুতেই আনন্দকে ধরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা।
বরযাত্রা কণের বাড়ীতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষণযেন আরো এক আনন্দের হিলোøাল। সদর দরজা থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত এক কলকাকলী গুঞ্জরণ, বর এসেছে বর এসেছে। কণের নিকট আত্মীয় ভাই বোনেরা গেট আগলে ধরে নতুন বরের কাছ থেকে বক্শীস আদায় করা তখন উভয় পক্ষে মিঠে কড়া নানা কথা পরিবেশকে করে তোলে যেন আরো অম্ল-মধুর।
বর বিয়ের গেট থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়ে বসলো তো বরের স্টেজে আর অমনি লুকানো হয়ে গেল বরের নতুন নাগরা জুতো। আর এ নিয়ে নানা হাস্যরস , এমনি করেই যেন নতুন সম্পর্ককে আরো নিবীর করে তোলা।
হাল ফ্যাশানেও বরযাত্রার আয়োজনে নানা বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মটর শোভাযাত্র ছাড়াও এখন প্রায়ই দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ীতে বরযাত্রার আয়োজন। প্রতীকি পালকির ব্যবহারও শহরে-নগরে চোখে পড়ে আজকাল।

কন্যা দান
বিবাহের যাবতীয় আপ্যায়ন অনুষ্ঠানিকতা শেষে আসে কন্যা দান পর্বটি। এটি একটি বেদনা ভারাক্রান্ত মুহূর্ত এই বিদায় ক্ষণটিতে নিকট আত্মীয় সকলেই অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। জীবনের দীর্ঘ সময় পিতা-মাতার অকৃত্রিম ¯েœহে ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে স্বামীর ঘরে চলে যাবার বিদায় লগ্নটি যেন হৃদয়ের অতলে গিয়ে স্পর্শ করে। পরিবারের মুরুব্বীগণ কন্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দেন তাদের ভালোবাসার ধন তখন নানা আবেগঘণ কথা শোনা যায় উভয় পক্ষে। বর পক্ষ থেকে দেয়া হয় নানা প্রবোধ বাণী। মায়ার জাল ছিন্ন করে অশ্রুভরা নয়নে কন্যাকে বিদায় নিতে হয় জীবনের নতুন এক দীর্ঘ
যাত্রাপথের সূচনায়।


চাঁদ দেখা
বিবাহ অনুষ্ঠানের মধ্যে এ পর্বটি বেশ আমোদঘন একটি সময় আপ্যায়নের কিছু পরে এই সুন্দর মুহূর্তটি আসে, বরকে নিয়ে আসা হয় কণের কাছে, তখন কণের হাতে বর গ্রহণ করেন শরবত ও মিষ্টান্ন। মালাবদলও চলে পরস্পর বর কনের মধ্যে। এ সময় উপস্থিত থাকেন সাধারণত আনন্দমহলের নারীগণ মা, খালা, দাদী, মামী, ফুফু, বোন, সই পাড়া-প্রতিবেশি সকলে। তারপর ওড়না কিংবা লাল বেনারসি কাতানে বর ও কণে মাথা ঢেকে আড়াআড়িভাবে নিচে রাখা হয়, আয়নায় তখন এক সাথে বর কণের সুন্দর অবয়ব ভেসে ওঠে। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হয় একে শাহ্্-নজর Ÿলা হয়ে থাকে।

বৌভাত
এই পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বরের বাড়িতে। বউ ঘরে তোলার পর বর পক্ষের সকল আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রন করা হয়। বৌভাতের অনুষ্ঠানে নতুন দম্পতি সকলকে স্বাগত জানান আপ্যায়ণ পর্বে। এই অনুষ্ঠাটিতে আর কোন ঝামেলা থাকে না। আপ্যায়ণ তদারকি করা আর উপহার সামগ্রী গুছিয়ে রাখা


বরযাত্রা বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষনীয় একটি পর্ব। অল্প কিছুদিন আগেও বরযাত্রায় পালকি ঘোড়ার গাড়ি জল পথে বাহারী বাহারী নৌযান ব্যবহার করা হতো। বরযাত্রা সাজানো নিয়েও মানুষের সার্মথ অনুযায়ী আয়োজনের শেষ নেই। একটি বিশেষ দিনকে আরো প্রাণবন্ত স্মরণীয় করে রাখতে, পোশাক থেকে শুরু করে গাড়ীর বহর, আতশবাজী পোড়ানো সব কিছুতেই আনন্দকে ধরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা।
বরযাত্রা কণের বাড়ীতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষণযেন আরো এক আনন্দের হিলোøাল। সদর দরজা থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত এক কলকাকলী গুঞ্জরণ, বর এসেছে বর এসেছে। কণের নিকট আত্মীয় ভাই বোনেরা গেট আগলে ধরে নতুন বরের কাছ থেকে বক্শীস আদায় করা তখন উভয় পক্ষে মিঠে কড়া নানা কথা পরিবেশকে করে তোলে যেন আরো অম্ল-মধুর।
বর বিয়ের গেট থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়ে বসলো তো বরের স্টেজে আর অমনি লুকানো হয়ে গেল বরের নতুন নাগরা জুতো। আর এ নিয়ে নানা হাস্যরস , এমনি করেই যেন নতুন সম্পর্ককে আরো নিবীর করে তোলা।
হাল ফ্যাশানেও বরযাত্রার আয়োজনে নানা বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মটর শোভাযাত্র ছাড়াও এখন প্রায়ই দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ীতে বরযাত্রার আয়োজন। প্রতীকি পালকির ব্যবহারও শহরে-নগরে চোখে পড়ে আজকাল।

কন্যা দান
বিবাহের যাবতীয় আপ্যায়ন অনুষ্ঠানিকতা শেষে আসে কন্যা দান পর্বটি। এটি একটি বেদনা ভারাক্রান্ত মুহূর্ত এই বিদায় ক্ষণটিতে নিকট আত্মীয় সকলেই অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। জীবনের দীর্ঘ সময় পিতা-মাতার অকৃত্রিম ¯েœহে ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে স্বামীর ঘরে চলে যাবার বিদায় লগ্নটি যেন হৃদয়ের অতলে গিয়ে স্পর্শ করে। পরিবারের মুরুব্বীগণ কন্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দেন তাদের ভালোবাসার ধন তখন নানা আবেগঘণ কথা শোনা যায় উভয় পক্ষে। বর পক্ষ থেকে দেয়া হয় নানা প্রবোধ বাণী। মায়ার জাল ছিন্ন করে অশ্রুভরা নয়নে কন্যাকে বিদায় নিতে হয় জীবনের নতুন এক দীর্ঘ
যাত্রাপথের সূচনায়।
চাঁদ দেখা
বিবাহ অনুষ্ঠানের মধ্যে এ পর্বটি বেশ আমোদঘন একটি সময় আপ্যায়নের কিছু পরে এই সুন্দর মুহূর্তটি আসে, বরকে নিয়ে আসা হয় কণের কাছে, তখন কণের হাতে বর গ্রহণ করেন শরবত ও মিষ্টান্ন। মালাবদলও চলে পরস্পর বর কনের মধ্যে। এ সময় উপস্থিত থাকেন সাধারণত আনন্দমহলের নারীগণ মা, খালা, দাদী, মামী, ফুফু, বোন, সই পাড়া-প্রতিবেশি সকলে। তারপর ওড়না কিংবা লাল বেনারসি কাতানে বর ও কণে মাথা ঢেকে আড়াআড়িভাবে নিচে রাখা হয়, আয়নায় তখন এক সাথে বর কণের সুন্দর অবয়ব ভেসে ওঠে। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হয় একে শাহ্্-নজর Ÿলা হয়ে থাকে।

বৌভাত
এই পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বরের বাড়িতে। বউ ঘরে তোলার পর বর পক্ষের সকল আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রন করা হয়। বৌভাতের অনুষ্ঠানে নতুন দম্পতি সকলকে স্বাগত জানান আপ্যায়ণ পর্বে। এই অনুষ্ঠাটিতে আর কোন ঝামেলা থাকে না। আপ্যায়ণ তদারকি করা আর উপহার সামগ্রী গুছিয়ে রাখা

INTERSTELLAR

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

 

‘ইন্টারস্টেলার’ মুভিটি দেখতে যাওয়ার সময় বেশ ভয়ে ছিলাম। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর দেখতে যাচ্ছি। কাজেই মানুষের খুব প্রশংসায় এটি নিয়ে প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল দশগুণ। একজন পাঁড় নোলানভক্ত (মতান্তরে নোলানয়েড) হিসেবে এর আগেও প্রত্যাশার ভারে ইনসেপশন ভালো লাগেনি। তাই ভয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। কেমন লাগলো তা হয়তো এখন বোঝানো যাবে না। তবে এতটুকু বলতে পারি, আমরা কয়েকজন হল থেকে বের হয়ে ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারিনি। সবার মস্তিষ্কই ব্যস্ত ছিল চলচ্চিত্রটির অন্তিম মুহূর্তগুলো হজম করার দুরূহ কাজে।
ইন্টারস্টেলার ছিল জোনাথান নোলানের মস্তিষ্ক প্রসূত একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট। সে প্রজেক্টটি হাতে নিয়েছিলেন শিতফেন স্পিলবার্গকে মাথায় রেখে। তবে শুরুতেই জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের শুটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পছন্দ হিসেবে প্রজেক্টে চলে আসে বড় ভাই ক্রিস্টোফার নোলান। ওই দুই ভাইয়ের জুটির অন্যান্য চলচ্চিত্রের মতো (মেমেন্টো, প্রেস্টিজ, ইনসেপশন, ফলোয়িং) এখানেও স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ শুরু করে জোনাহ। ছবির বিজ্ঞান অংশ যথাযথ রাখার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় ক্যালটেকের বিখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট কিপ থর্নকে। কিপ থর্নকে নিয়োগ দেয়া ছিল চলচ্চিত্রটির ‘গুড’ থেকে ‘গ্রেট’ হওয়ার পথে প্রথম ধাপ। স্ক্রিপ্টের সিংহভাগ ও স্পেশাল এফেক্টের প্রায় পুরোটাই কিপ থর্নের থিওরেটিকাল গবেষণার অংশ ছিল। চলচ্চিত্রটি বক্স অফিস মাত করে দিলেও পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষায় যেন ফেল না করে এ বিষয়ে নোলান আগেভাগেই নিশ্চিত করেছে এভাবেই। কিপ থর্নের মডেল অনুসরণ করে যেভাবে ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাকহোল বা ফিফথ ডাইমেনশান নোলান আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন তা নিঃসন্দেহে শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা।

মহাকাশবিদ্যাই কি এ চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক? অবশ্যই নয়। চলচ্চিত্রটির পটভূমিটিই বড় অদ্ভুত। ভবিষ্যতের পৃথিবী। সেখানে ভূমি এমনই ঊষর হয়ে গেছে। এতে গুটিকয়েক শস্য ছাড়া অন্য কিছুই ফলানো সম্ভব নয়। এ পৃথিবীতে মানুষের প্রধান পেশা কৃষি কাজ, জৈবজ্বালানির ভা-ার প্রায় নিঃশেষ। এর মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে হানা দেয় ভয়ানক বালুঝড়। মানব জাতি কোনোমতে টিকে আছে পৃথিবীতে। এ রকমই একটি সময় মহাকাশচারী কুপার (ম্যাথু ম্যাককনাহে) ও তার পরিবার নিয়ে শুরু হয় ইন্টারস্টেলারের কাহিনী। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মহাকাশযাত্রা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কাজেই সবার মতো কুপারের পেশাও কৃষি কাজ। তার বড় ইচ্ছা ছেলে ও মেয়ে দু’জনই মহাকাশ বিজ্ঞান পড়বে। কিন্তু স্কুল থেকে বলা হয়, পৃথিবীতে এখন মহাকাশচারীর থেকে কৃষক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে কুপারের মেয়ে মার্ফের (ম্যাকেঞ্জি ফয়) রুমে এক অশরীরী অস্তিত্ব প্রায়ই হানা দেয়। বই আপনাআপনি পড়ে যায় শেলফ থেকে, মাঝে মধ্যে দুর্বোধ্য সংকেত দেয়ারও চেষ্টা করে। এ রকমই এক সংকেতের মর্ম উদ্ধার করে কুপার আবিষ্কার করে নাসার এক অতি গোপনীয় প্রজেক্ট। সে জানতে পারে, মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ ভরসা নাসার ওই মিশন। মিশনে তার সঙ্গে যোগ দেন মিশনের হেড প্রফেসর ব্র্যান্ডের মেয়ে (অ্যান হ্যাথওয়ে)। মিশনের সবাই জানে- তারা যাচ্ছে অনেক দূরে। আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে অজানা অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে বসবাসযোগ্য গ্রহের সন্ধানে। সেখানে হয়তো গড়ে উঠবে মানব জাতির নতুন বাসস্থান। তারা সবাই জানে, ফিরে আসার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। যদি ফিরে আসা হয়, তাহলে পৃথিবীতে পেরিয়ে যাবে অনেক সময়। তাই নিজেদের পরিবারকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়েন অজানার উদ্দেশে।


চলচ্চিত্রটির এই বিন্দু থেকে কাহিনী দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক পটভূমিতে আমরা দেখি, কুপারের নেতৃত্বে মহাকাশযান এন্ডিউরেন্সের অভিযান। সেখানে সময়ের ¯্রােত ধীরে বইছে। কারণ তারা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে একটি কৃষ্ণ গহ্বরের খুব কাছাকাছি। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীতে যেখানে সময় বইছে খর¯্রােতা নদীর মতো সেখানে ছোট্ট মার্ফ বড় হয়ে (জেসিকা চ্যাসটেইন) কাজ করছে অশীতিপর বৃদ্ধ প্রফেসর ব্র্যান্ডের (মাইকেল কেইন) অধীন। সে মেলানোর চেষ্টা করছে এক দুরূহ ইকুয়েশন। তা দেবে মানবমুক্তির সন্ধান। আরও মেলানোর চেষ্টা করছে তাকে তার বাবা ছেড়ে যাওয়ার বেদনা এবং বাবার প্রতি অভিমানটি এক সুরে।
ইন্টারস্টেলারের বিশ্লেষণ করতে গেলে ভবিতব্য হিসেবেই সবার প্রথম চলে আসবে কুব্রিকের ম্যাগনাম ওপাস ‘২০০১ : আ স্পেস ওডিসি’র সঙ্গে তুলনা। স্পেস ওডিসি ওই সময়ের সাই-ফাই ছবির একটি মাইলফলক ছিল। তা অনেক বছর পর্যন্ত কেউ ছুঁতে পারেনি। তেমনি নোলানের ম্যাগনাম ওপাস ইন্টারস্টেলারও এই যুগের সাইাফাই ছবির মাইলফলক হয়ে থাকবে- এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ চলচ্চিত্রটি মাইলফলক হয়ে থাকবে গত বছরের সেরা অভিনেতার অস্কার বিজয়ী ম্যাথু ম্যাককোনাহে, অ্যানে হ্যাথওয়ের ক্যারিয়ারেও। কারণ সেলুলয়েডের ক্যানভাসে ফুটে ওঠা বিজ্ঞানের জটিল থিওরি, ইকুয়েশন বা মহাজাগতিক সত্য ছাপিয়ে দিন শেষে উঠে এসেছে দুই বাবা ও তাদের দুই মেয়ের বিচ্ছেদ এবং তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের কাহিনী। মহাজাগতিক একাকিত্ব, অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার মতো ভয়, অহানায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা- এ ধরনের অনন্যসাধারণ কিছু অনুভূতি নিয়ে খেলা করেছেন নোলান। তার বাছাই করা অভিনেতাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সবকিছু ছাপিয়ে আবেগটিই রুপালি পর্দায় সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক হান্স জিমারের সুরের মূর্ছনা ও নিউ ডিল স্টুডিওর চোখ ধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্টস- সব মিলিয়ে ইন্টারস্টেলার নোলানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হওয়ার জোর দাবিদার।
সবশেষে যারা এখনো ইন্টারস্টেলার দেখেননি তাদের জন্য ছোট একটা উপদেশ হলো, ছবিটি দেখার আগে ব্ল্যাকহোল, ওয়ার্ম হোল, স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে যদি কিছুমাত্রায় হোমওয়ার্ক করে যান তাহলে মুভিটি উপভোগের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এছাড়া আপনিও আমার মতো ছবি শেষ করার পর ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারবেন না- এটি গ্যারান্টি!

Page 1 of 2

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…