ক্যানভাসের কবি কালিদাস

 

শিল্পরসিকদের নানাভাবে মোহবিষ্ট করার ক্ষমতা রাখেন যে চিত্রশিল্পী তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশের প্রথিতযশা নিরীক্ষাধর্মী কাজের জন্য বিখ্যাত কালিদাস কর্মকার। এই চিত্রশিল্পীকে এখনো ছুঁতে পারেনি বার্ধক্য। তাঁর কাজে-কর্মে, শিল্পবোধে তাই ছুঁয়ে যায় তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা। তাঁর ছবিতে মানবীয় অভিজ্ঞতা, জ্ঞাতী সম্পর্কের ভাষা ইত্যাদি মুহূর্তেই মূর্ত করে তোলেন। তার ছবির শেকড় গাঁথা এ জনপদেরই মাটিতে। অ্যাক্রিলিক, মিশ্র মাধ্যম, গোয়াশ, কোলাজ, ওয়াশি, মেটাল কোলাজ, ড্রইং, ডিজিটাল লিথো, মিশ্র- নানান মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন জীবনের উপজীব্য। জীবন প্রণালি, নানান ধর্মের সমন্বয়, লোকশিল্পের বিভিন্ন প্রতীক উপাদান হিসেবে চলে আসে তাঁর বিস্ময়কর শিল্প সৃষ্টিতে। তাঁর চিত্রকলায় এ জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন উত্থান উপাখ্যান ও আন্দোলনের অনুষঙ্গে এসেছে যখন হাতের যা কাছে পেয়েছেন তা দিয়েই। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে মৃত্যুমুখ যোদ্ধার যন্ত্রণাকাতর অভিব্যক্তি, এসেছে আবহমান বাঙালির ষোল কলাসহ নানান বিষয়। তাঁর এসব অনবদ্য সৃষ্টির কোথাও অস্পষ্টতাও দেখা যায়নি।

এবছরে একুশে পদকে ভূষিত খ্যাতনামা এ শিল্পীর সাথে সহজের কথোপকথনে উঠে এসেছে শিল্পীজীবনের নানা উপাখ্যান। শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পে তিনি বললেন, ‘যেহেতু আমি কর্মকার পরিবারের সন্তান সেহেতু শৈশবেই বড়দের দেখাদেখি আঁকতে শুরু করি। ওই সময় কলকাতা থেকে জয়নুল আবেদিনসহ অন্য কয়েক প্রথিতযশা শিল্পী এসে ঢাকায় আর্ট কলেজ স্থাপন করলে স্কুল জীবন শেষে ঢাকা ইনস্টিটিউট অফ আর্টস-এ ভর্তি হই এবং ১৯৬৩-৬৪ সালে চিত্রকলায় আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি লাভ করি। এরপর কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট থেকে ১৯৬৯ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান নিয়ে চারুকলায় ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করি।’

সহজের প্রশ্ন ছিল আপনি নিজেকে কোন ঘরানার শিল্পী বলে মনে করেন? তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘নিজেকে র্শিল্পী মনে করি না আমি। সারা জীবন নতুন কিছু করতে চেয়েছি। যা কিছু করেছি সবই নিরীক্ষা। সারা বিশ্বে ছোটাছুটি করে কাজ করতে পছন্দ করি যাতে আমাদের চিত্রশিল্প আধুনিক থেকে আধুনিক হয়ে ওঠে।’
আপনার ক্যানভাসে কী বলতে চান এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি ছবি আঁকি নিজের জন্য, দেশের জন্য মানুষ নিয়ে আমার বেদনার কথা বলতে চাই ক্যানভাসে।

প্রদর্শনী বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, বললেন- দেশে-বিদেশে এ পর্যন্ত আমার নির্বাচিত চিত্র প্রদর্শনীর সংখ্যা ৭১। এছাড়া আন্তর্জাতিক দলবদ্ধ বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছি।
নিরীক্ষাধর্মী কাজ করতে আপনার কেমন লাগে? তিনি বললেন, ‘আমি দেশে তো করিই। তাছাড়া ভারত, পোলান্ড, ফ্রান্স, জাপান, আমেরিকায় আধুনিক শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে উচ্চতর ফেলোশিপ নিয়ে সমকালীন দেশ-বিদেশে কাজের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছি। ফ্রিল্যান্স শিল্পী হিসেবে এসব করছি সেই ১৯৭৬ সাল থেকে।’
ছাপচিত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমিই প্রথম ছাপচিত্রের প্রচলন করেছি। এটা এখন ঘরে-ঘরে হচ্ছে।’
মূর্ত ও বিমূর্ত প্রশ্নে, তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে বিমূর্ত বলে কিছু নেই। সবকিছুই মূর্ত। সবকিছু নির্ভর করছে আপনার চোখ ও মন ওই জিনিসটিকে কীভাবে বা কত গভীরভাবে দেখছে এর ওপর। আপনি একটি শিশির ফোঁটা একটি ঘাসের ডগাতে দেখলে তা সেভাবেই দেখেন। কিন্তু তা কখন কোন রঙের বিচ্ছুরণ ঘটায় সেটিই কোনো শিল্পী তার চিত্রে ধারণ করেন। এটিকেই আমরা বিমূর্ততা বলি। আসলে সবই মূর্ত।’

খ্যাতিমান শিল্পী হিসেবে বর্তমানে আমাদের শিল্পাঙ্গনে কীসের অভাব বোধ করেন? উত্তরে বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশে, এমনকি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশেও যে জিনিসটি রয়েছে তা আমাদের এই স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৪৭ বছর পরও আমরা পেলাম না। অতি দুঃখ ভরে জানাতে হচ্ছে, আমাদের দেশে কোনো জাতীয় আর্ট গ্যালারি নেই। দেশের বিখ্যাত ১০ শিল্পীর শিল্পকর্ম এক সঙ্গে দেখা যাবে- এমন কোনো চিত্রশালা বা আর্ট মিউজিয়াম নেই। অথচ জাতীয় চিত্রশালা হলো কোনো দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক-বাহক। আশা করি, স্বাধীনতার পক্ষের সরকার আমাদের এ দাবিটির বাস্তবতা অনুধাবন করে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া এটি যেহেতু খুব বড় খরচের ব্যাপার নয় সেহেতু ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকে এগিয়ে আসতে পারেন।’

মানুষ ধীরে ধীরে এসব প্রর্দশনী ও ললিতকলার ব্যাপারগুলো থেকে দূরে চলে যাচ্ছে এর কারণ কী বলে মনে করেন? ‘এ ব্যাপারে দারিদ্র্যকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু আমাদের বর্তমানের অবিশ্রাম যানজট জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কোথায় কখন পৌঁছাতে

পারবো তা আমরা কেউই জানি না। রাস্তার মধ্যেই মানুষের মন মরে যায়, সুখ উড়ে যায়- সে কীভাবে তখন বিভিন্ন প্রদর্শনীতে যাওয়ার কথা চিন্তা করবে! এই যানজট আমাদের কাজের একটা অন্তরায়। এটি শুধু আমাদেরই নয়, রাষ্ট্রীয় অনেক কাজেই স্থবিরতা নামিয়ে এনেছে। এই অঞ্চলের মানুষের মন পলির মতোই নরম। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার লড়াই, বঞ্চনার শিকার ইত্যাদি কারণে মানুষের মন বসে যাচ্ছে। তবে এত অস্থিরতার পরও শেষ পর্যন্ত মানুষ জেগে উঠছে নিজস্ব পরিক্রমাতেই।’

শিল্পী না হলে কী হতে চাইতেন প্রিয় কালিদাস? ‘আমি কর্মকার পরিবারের সন্তান। জন্মের পরই দেখেছি আমাদের পরিবারের সবাই ভালোবেসে নিজের মন থেকে শিল্প সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছেন এবং সবাই মানসিক আনন্দে রয়েছে। আমিও হাতে কাজ তুলে নিই। শিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকি। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ আসেনি, চেষ্টাও করিনি। তাছাড়া আমার ছোট দুই ভাইও শিল্পী। তারা ইউরোপে কাজ করে পুরস্কৃত হয়েছে।’

পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্পী জানান, ‘আমার দুই মেয়ে। তারা দু’জনই বিদেশে রয়েছে। আমার স্ত্রী বহুদিন আগেই পরপারে চলে গেছে। আমি এখন নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি আর শিল্প ভাবনায় ডুবে আছি।’
পুরস্কার ও প্রাপ্তি সম্পর্কে কোনো আক্ষেপ আছে? উত্তরে ক্যানভাসের কবি কালিদাস জানান ‘মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। শিল্পকলার ‘শিল্পী সুলতান পুরস্কার’ পেয়েছি। এ বছর (২০১৮) ‘একুশে পদক’ পেলাম। আন্তর্জাতিকভাবেও অনেক পুরস্কার পেয়েছি।’

শিক্ষকতা করার প্রসঙ্গে বলেন, ‘না, কোথাও শিক্ষকতা করিনি, এখনো করছি না তবে, যাদের না করতে পারি না তারা বাসায় এসে কাজ শেখে। শিক্ষকতা বলতে যা বোঝায় সেটি বাসাতেই করি।’
মনের মতো ছবিটি এঁকেছেন কিনা প্রশ্নের উত্তরে হেসে বললেন, ‘না, তা পারিনি। তবে বহু ভালো ছবি এঁকেছি। বেঁচে থাকলে চেষ্টা চালিয়ে যাবো।’
শিল্পীর চেষ্টা অব্যাহত থাকুক। সহজের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিবাদন।

 

প্রশ্ন ও সম্পাদনা : সহজ ডেস্ক
অনুলিখন : রাশেদ মামুন
ছবি : আরাফাত

রবীন্দ্রনাথ আবার আসবে বলেছিল

প্রফেসর ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

মেয়েটা প্রথম কথা বললো
তুমি কি রঙের জাদুকর?
: জাদুকর নই। আমি শিল্পী। ছবি আঁকি।
তবে রঙ নিয়ে খেলছ যে বড়!
: খেলছি কোথায়, ছবি আঁকছি।
তোমার কাছে কাগজ নেই? তখন থেকে কোরা কাপড়ে কী ঘষছ?
: এটা কোরা কাপড় নয়, প্রিপারেশন করা সাদা ক্যানভাস। আমি তো রঙ-তুলি দিয়ে ছবি আঁকছি।
ছবি না ছাই আঁকছ। কালো রঙ শুধু খরচ হচ্ছে, কিছুই তো হচ্ছে না।
: তেলরঙের ছবি। আদল ফুটে ঊঠতে সময় লাগবে। আমার তো করার কিছুই নেই। আর কালো রঙ কোথায় দেখছ, এ তো লাল রঙ।
আমি দেখছি কালো আর তুমি বলছ লাল।
: নিশ্চয় তোমার পূর্বপূররুষ মৌমাছি ছিল।


তা হবে কেন?
: মৌমাছি লাল রঙ দেখতে পায় না। লালকে কালো দেখে। তাই তো মৌচোর মৌমাছিগুলো লাল ফুলে বসে না। আমাদের চোখে যে ফুল একই রঙের, মৌমাছির কাছে তা ধরা দেয় নানান রঙে।
আমি তো জানতাম না।
: সব কথা জানতে হবে, এর কোনো মানে নেই। আমিও অনেক কিছু জানি না।
তুমি বলছ, তোমার ছবিতে লাল রঙ।
: সে তো সবাই বলবে। তা ছাড়া কালো তো কোনো রঙই নয়।
তাহলে যে কালোকে রঙ বলি! আমার কাজল কালো চোখ, মেঘ কালো চুল, কপালের কালো টিপ সবই কি মিথ্যা?
: কোনোটাই মিথ্যা নয়।
তুমি যে বললে।
: কালো হলো সব রঙের অসমসত্ত্ব মিশ্রণ।
তাহলে সাদা রঙ?
: সাদা হলো সব রঙের সমসত্ত্ব মিশ্রণ।
তাহলে ওই রঙ ছবিতে ঘষে লাভ নেই, বরং আমার কপাল দেখো কেমন হাট হয়ে আছে। এতে লাল রঙ ঘষে দাও।
: তোমার কপালে লাল রঙ ঘষবো!
হ্যাঁ, তাই তো বলছি। দেখছ না, কপালে সিঁদুর নেই। সিঁদুর ছাড়া মেয়েদের কপাল মানায়।
: এ তো রঙ। সিঁদুর নিয়ে এসো পরিয়ে দিই।
সিঁদুরের কৌটা হারিয়ে ফেলেছি সেই কবে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম এসেছিল।
: তুমি রবীন্দ্রনাথকে দেখেছ?
দেখবো না কেন! সেই তো আমাকে পতিসরে নিয়ে এলো।
: তোমার বয়স কতো? বরীন্দ্রনাথ পতিসরে এসেছিলেন ১৮৯১ সালে।
মেয়েদের বয়স জানতে নেই।
: তুমি কোথায় থাকো?
তা তো বলবো না।


: রবীন্দ্রনাথ পতিসরে বসে কোন কোন কবিতা, গল্প লিখেছিলেন তা তুমি জানো?
জানি। ঘরে বাইরে, শাস্তি, চৈতালীর ঋতুসংহার, চিত্রার পূর্ণিমা আর সন্ধ্যা।
: তুমি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসো।
রবীন্দ্রনাথকে সবাই ভালোবাসে।
: তুমি রানু, না কাদম্বরী?
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে রানু বা কাদম্বরী হতে হবে কেন?
: তুমি কি জানো, রবীন্দ্রনাথও বর্ণান্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথ সব রঙকে চিনতে পারতেন না। রঙকানা ছিলেন তোমার রবীন্দ্রনাথ।
তুমি কি আমাকে বোকা বানাচ্ছ?
: বোকা বানাবো কেন? পৃথিবীর অনেক মানুষ আছে যারা বর্ণান্ধ। বর্ণান্ধতা বা ডাল্টনিজম প্রধানত দুই ধরনের হয়। প্রথমত. শ্রেণিভুক্ত মানুষ লাল ও নীল প্রভাবিত বর্ণটি সবুজের মধ্যে দেখে এবং দ্বিতীয়ত. শ্রেণিভুক্ত মানুষ গোলাপি ও হালকা সবুজের পার্থক্য বোঝে না। আর এক ধরনের বর্ণান্ধ আছে, বিশেষ করে দুর্গম সমুদ্র উপকূলে যারা বসবাস করে এমনই উপজাতির মানুষ পৃথিবীকে সাদা-কালোয় দেখে। বর্ণান্ধতা নারীদের চেয়ে পুরুষের মধ্যে বেশি। ফিজি, নিউ গিনি ও কঙ্গোর পুরুষদের মধ্যে বর্ণান্ধতার প্রকোপ বেশি। মানুষ, বানর বা এপম্যান, মাছ, সরীসৃপ ও কীটপতঙ্গেও বর্ণানুভূতি প্রখর বিশেষ করে যেসব প্রাণীর পরাগায়ণের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। চতুষ্পদ স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোনো বর্ণানুভূতি নেই।
তাহলে ষাঁড় লাল কাপড় দেখলে ক্ষেপে যায় কেন?
: ষাঁড় তো লাল, নীল, সবুজ আলাদা করে চিনতেই পারে না। যে কোনো রঙের কাপড় দিয়েই ষাঁড়কে উত্তেজিত করা যায়।
তাহলে রবীন্দ্রনাথ জীবনের এতো জয়গান করলেন কী করে?
: সে প্রশ্নটি আমারও। আমারও জানতে ইচ্ছা করে রবীন্দ্রনাথ সত্যিই বর্ণান্ধ ছিলেন কি না। সমস্যা হলো...!
কী সমস্যা?
: রবীন্দ্রনাথই জানিয়েছেন, তিনি বর্ণান্ধ। লাল বর্ণ নাকি তার চোখেই পড়ে না অর্থাৎ ‘প্রটানোপিয়া’। তবু তার ছবিতে লাল বর্ণের সমাহার রোজ ম্যাডায়ার, ক্রিমসন লেক, ভারমিলিয়ন রেড, স্কারলেট রেড, ইন্ডিয়ান রেড। রবীন্দ্রনাথ নীল বর্ণও বড় একটা ব্যবহার করতে চাইতেন না। কিন্তু তার অনেক নিসর্গচিত্রে সমুদ্র বর্ণ নীল, প্রুশিয়ার নীল, কোবাল্ট নীল, আলট্রামেরিন, বিশেষ করে আকাশের পটভূমি গড়ে তুলতে ব্যবহার করেছেন। তবে লালের প্রতি আকর্ষণ সত্ত্বেও হলুদ বা সবুজ বর্ণ যথেষ্ট ব্যবহার করেছেন। যেমন নিসর্গচিত্রে প্রতিকৃতি রচনায় অথবা হলুদের ওপর সবুজ। বর্ণান্ধ থিউরিতে বলা হয়, 

"Colour Blindness is the inability to distinguish the difference between certain colours. The condition results from an absence colour-sensitive pigments in the cone cells of retina, the nerve layer at the back of eye. Most colour vision problems are inherited are present at 1 out of 12 men and 1 out of 20 women. A person with colour blindness has trouble seeing red, blue, or mixture of these colours. The most common type is red-green Colour-blindness where red and green are seen as the same colour"


রঙ নিয়ে আরো কথা আছে। বাইরের জগৎ থেকে আসা তথ্য চোখ সংগ্রহ করে এবং তা মস্তিষ্কে প্রেরণ করার আগে তাৎক্ষণিকভাবে চোখ তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। চোখ আর মস্তিষ্কের সম্পর্ক খুবই অদ্ভুত ধরনের। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হওয়া ব্যাপারটি এখানে সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে মনের আড়াল হলে চোখের আড়াল অর্থাৎ মন না চাইলে চোখ কী করে দেখবে! এর একটা সহজ প্রমাণ হলো, সাদা কাগজের ওপর লাল রঙের একটি বৃত্ত আঁকতে হবে। এরপর কিছুক্ষণ বৃত্তটির দিকে নির্ণিশেষ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ এক সময় দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আরেকটি সম্পূর্ণ সাদা কাগজে দিকে তাকালে একটি আবছা সবুজ রঙের বৃত্ত দেখা যাবে। এর কারণ হলো, লাল বৃত্তটির দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে লাল রঙের প্রতি সংবেদনশীল গ্রাহকযন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও স্বল্প সময়ের জন্য তার কর্মক্ষমতা লোপ পায়। তাই আমরা যখন দ্বিতীয় সাদা কাগজটির দিকে তাকাই তখনই ওই কাগজ সমস্ত রঙ প্রতিফলিত করলেও লাল গ্রাহকযন্ত্র ক্লান্ত থাকায় এর কাজ সঠিকভাবে করতে পারে না। অপরপক্ষে নীল ও সবুজ গ্রাহকযন্ত্র সতেজ থাকায় পূর্ণশক্তিতে কাজ করে এবং মুহূর্তের জন্য আমরা লাল রঙের পরিপূরক বলে সবুজ রঙটি দেখতে পাই। এতে এটিই প্রমাণিত হয়, চোখ যে রঙ দেখতে চায়, মন ওই রঙটিই দেখায়।
রঙের এতো কথা!
: আরো কথা আছে। রঙ চিত্রশিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রঙ কখনো আলো, কখনো প্রতীক, কখনো পরিপ্রেক্ষিত এবং কখনো বিষয়। চোখ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙের ভুবন। অক্ষর ও সংখ্যার মতো রঙ মানুষের সহজ ও স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ। রঙের ভাবার্থ, ভাষা ও ব্যঞ্জনার প্রকাশ সাধারণত এভাবে করা হয়ে থাকে
সাদা : পবিত্রতা, শুভ্রতা, শান্তি, বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও আভিজাত্য।
কালো : শ্রীহীন, মলিন, ধ্বংস, শোক ও বিকৃতি।
লাল : প্রেম, আনন্দ, সৌন্দর্য, বিপ্ল¬ব, আশা ও জীবন।
কমলা : হৃদয়াবেগ, কামনা ও উষ্ণতা।
নীল (কোবাল্ট) : সহনশীলতা, রোমান্টিকতা, অসীমতা ও জ্ঞান।
নীল (প্রুশিয়ান ) : ভয়, অস্বস্তি, উদ্বেগ ও হিংস্রতা।
সবুজ : প্রকৃতি, প্রাণ, মুক্তি, সততা, তারুণ্য ও বিশালতা।
হলুদ (লেমন) : ধর্মীয় আবেগ, প্রজ্ঞা, তাপ, আশ্বাস, নৃশংসতা, কাপুররুষতা ও প্রতারণা।


হলুদ (সোনালি) : ঐশ্বর্য, স্বাস্থ্য, বিস্ময় ও সমৃদ্ধি।
বেগুনি : হতাশা, দুঃখ ও নির্জীবতা।
বাদামি : মন্থরতা ও ঔদাসীন্য।
পিঙ্গল : বিষাদ ও বিস্মৃতি।
ধূসর : মৃত্তিকা ও শূন্য প্রান্তর।
চিত্রশিল্পে ব্যবহার উপযোগী রঙ দু’ভাবে ভাগ করা হয়েছে। তা হলো
মৌলিক (অবিমিশ্র) বা প্রাইমারি রঙ : লাল, নীল ও হলুদ।
মাধ্যমিক বা সেকেন্ডারি রঙ : কমলা, বেগুনি, ধূসর, পিঙ্গল, সবুজ, বাদামি, গোলাপি ইত্যাদি।
এবার ছবির কথা বলো। কার ছবি আঁকছ মডেল ছাড়া? তুমি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?
: আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হতে যাবো কেন?
তাহলে যে বড় দেমাগ করে মডেল ছাড়া ছবি আঁকছ!
: রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কেউ বুঝি মডেল ছাড়া ছবি আঁকতে পারে না?
না, পারে না।
: আমি যে মেয়েকে ভালোবাসি তাকেই আঁকবো ভেবেছি।
সেই মেয়ে কি আমি?
: তুমি নও, অন্য কেউ। তার জন্যই তো আমি এখানে এসেছি।
সে মনে হয় পালিয়ে গেছে, বরং আমার ছবি আঁকো। তোমার মডেল হবো আমি।
: তা কী করে হয়!
কেন হয় না। আমি বুঝি সুন্দর নই?
: তুমি অনেক সুন্দর। যার ছবি আঁকছি সে আরো সুন্দর।
হতেই পারে না।
: হতে পারে না কেন?
আমি বলছি, তাই। ছবি শেষ করে দেখো।
: আমার ছবি শেষ হতে সময় লাগবে।
আমি অপেক্ষা করবো।
: কোথায় যাচ্ছ তুমি? এই যে বললে অপেক্ষা করবে?
আমার বুঝি কাজ নেই? বসে বসে তোমার ছবি আঁকা দেখবো?
: এই যে বললে আমার মডেল হবে।
বয়েই গেছে তোমার মডেল হতে! ওই দেখো।
: কী?
বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে রামধনু।
: আমরা বলি রঙধনু।


রামধনু বলতে দোষ কী?
: হিন্দু ধর্মের মানুষ ভাবে, ওটা রামচন্দ্রের ধনুক। তাই রামধনু।
মুসলিমরা তা মানতে নারাজ, তাই।
রঙের ধনুক রঙধনু।
: রঙের আবার জাতি-ধর্ম!
জাতি-ধর্মের নয়, ব্যাপারটি বিশ্বাসের। ইংরেজিতে এর নাম রেইনবো। বাংলা নামের অর্থের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। রঙধনুর সাতটি রঙ বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। ইংরেজিতে এর সংক্ষেপ ‘ভিবজিওর’ আর বাংলায় ‘বেনীআসহকলা’।
: কোথায় তুমি? আমি কার সঙ্গে কথা বলছি? ছবি আঁকা শেষ হয়ে গেছে।
ক্যানভাসের ছবির দিকে তাকিয়ে দেখো।
: কী আশ্চর্য! এ তো তোমার ছবি।
তুমি তো আমার ছবিই একেঁছ।
: আমি তো অন্য কারো ছবি আঁকতে চেয়েছিলাম। এটি কী করে সম্ভব হলো!
পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
: আমার কাছে এসো। তোমাকে তো দেখতে পাচ্ছি না।
আমাকে আর কখনো দেখবে না তুমি।
: তা কী করে হয়!
আমি যে এ রকমই।
: আমি তো তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
এই যে বললে, তুমি অন্য কাউকে ভালোবালো?
: সেই মেয়ে যে তুমি তা আমিও জানতাম না।
ভালোবাসার আগে আমার মনের খবর জানা উচিত ছিল।
: তবু তোমাকেই যে আমি ভালোবেসেছি!
আমি যে ক্যানভাসের ছবি হয়ে গিয়েছি।
: ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে এসো।
আমি যে তোমার হতে পারবো না!
: কেন পারবে না?
আমি যে অপেক্ষায় আছি!
: কার জন্য অপেক্ষা করে আছ তুমি?
রবীন্দ্রনাথের জন্য।
: রবীন্দ্রনাথের জন্য! তুমি কি পাগল? রবীন্দ্রনাথ আর কখনো আসবে না।
রবীন্দ্রনাথের জীবনে কোনো মিথ্যা নেই।
: এটি সত্য-মিথ্যার কথা নয়। একটি বড় ভুলের মধ্যে আছ তুুমি।
আমি জানি। তবুও আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ আবার আসবে বলেছিল।
: পতিসরে অনেক খুঁজেছি তাকে। দেখা হয়নি। শুধু মনে পড়ে
‘জীবন যদি শুকায়ে যায়, করুণা ধারায় এসো, সকল মাধুরী লুকায়ে যায় গীতসুধা রসে এসো ...’

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যি আবার আসবে? সে যে বলে গেল!

ঈদে সাজাই ঘর

লেখা : শায়মা হক

 


ঈদ- তা হোক না ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই ওই ছোট্টবেলা। আর ছোটবেলার আনন্দের স্মৃতিতে কিছুটা হলেও হারিয়ে যাওয়া।
ঈদের দু’একদিন আগে ঘরবাড়ি ঝেড়ে-মুছে ঝকঝকে তকতকে করে তোলার নানান প্রস্তুতি। বিছানার চাদর, টেবিল ক্লথ ইস্ত্রি করে ধোপাবাড়ি থেকে ফিরে আসা বা ঈদ উপলক্ষে শত ব্যস্ততার মধ্যেও একটু সময় করে একগোছা ফুল কেনার দৃশ্যগুলো কারই না মনে পড়ে!


শত শত বছর ধরেই ঈদ এলে অন্দর মহলে পড়ে যায় সাজ সাজ রব। অতিথি আপ্যায়নে সেমাই, ফিরনি, জর্দা, কাবাব- নানান সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সাজের দিকেও থাকে যে যার সাধ্যমতো নজর। দিন বদলেছে, বদলেছে নানান আকাক্সক্ষা বা চাহিদাও। এখন শুধু ধোপাবাড়ি থেকে চাদর, পর্দা কাচিয়ে আনাতেই রুচি বা আকাক্সক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। এখন নতুন পোশাকের পাশাপাশি উৎসবগুলোয় নতুন কুশন, পর্দা কেনাতেও অনেকেই কার্পণ্য করেন না। তাই তো ঈদের আগের রাতে ফুলের দোকানগুলোতেও দেখা যায় অনেক ভিড়। সবাই চান উৎসবের দিনে একটু তাজা ফুলের সুবাসে সুবাসিত করে তুলতে ছোট্ট গৃহকোণ। কেউ কেউ পুরো বাড়িতে নতুন করে রঙ বা আসবাবপত্র বার্নিশ করে পুরনো জিনিসে নতুনের বৈচিত্র্য এনে ফেলে।


সে যাই হোক। লিখতে বসেছিলাম ঈদের বিশেষ দিনটির বিশেষ গৃহসজ্জা নিয়ে। ঈদের বিশেষ গৃহসজ্জার শুরুটা ভাবতে হবে মূল প্রবেশপথ থেকে। এরপর বসার ঘর, খাবার ঘর, এমনকি শোয়ার ঘর থেকে টয়লেট বা বারান্দা হয়ে কিচেন পর্যন্ত কোনো অংশই অবহেলার যোগ্য নয়। প্রথমেই মূল প্রবেশপথটি সাজানোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে এমনই ভাবে যেন সেটি অতিথিকে বাড়িতে স্বাগত জানাতে সহায়তা করে। এখানে বড় বা মাঝারি কারুকার্যময় মাটির পটারি, সবুজ-সতেজ গাছপালা, পাথর, ইদানীংয়ের টেরারিয়াম, ল্যাম্প- এসব ছাড়াও মাটির পাত্রে পানি দিয়ে ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে ফ্লোটিং মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া যেতে পারে। প্রবেশপথের দেয়াল আয়না ও ছোট কাজ করা টেবিল এবং এতে কিছু শোপিস, ক্যাক্টাস জাতীয় গাছ বা ফোটোফ্রেম সাজিয়ে দেয়া যায়।


এরপরই আসে বসার ঘর বা ড্রয়িং রুমটি। প্রায় সবাই সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়ে সাজান ওই ঘর। কেউ কেউ ওই ঘরটি আধুনিক সাজে সাজাতে ভালোবাসেন, কেউ বা দেশীয় উপাদান দিয়ে দেশীয় আঙ্গিকে সাজাতে ভালোবাসেন। সাজের ধরনটি যাই হোক না কেন, উৎসবে প্রতিটি সাজই হওয়া চাই স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল, আনন্দময় ও মন ভালো করে দেয়ার মতো।
দেশীয় আঙ্গিকে সাজানো বসার ঘর : এমন একটি ঘরে কাঠ, বেত বা বাঁশের সোফা কিংবা অন্য আরামদায়ক ডিজাইনে বসার ব্যবস্থা করলে ভালো দেখাবে। সোফার কভার, কুশন কভার হতে পারে হালকা বা উজ্জ্বল রঙের। আবার সোফা ও কুশনের কালার কনট্রাস্ট হতে পারে। এখানে পর্দার রঙেরও সামঞ্জস্য থাকতে হবে। পর্দার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মেঝেতে শতরঞ্জি বা শীতলপাটি বিছানো যেতে পারে। দেশীয় ঢঙে সাজানো বসার ঘরে মাটি, কাঠ, বেত বা পাটের তৈরি শোপিস বেশি মানাবে। দেয়ালেও ঝোলানো যেতে পারে কাঠ, পাট বা পেপার ম্যাশের মুখোশ। পটারি ও ল্যাম্পের ব্যবহারও এ ঘরটিকে আলাদা মাত্রা দেবে। আবার ফ্লোরেও বসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ফ্লোরে নকশিকাঁথার ম্যাট বিছিয়ে বা শতরঞ্জি পেতে বসার আয়োজন করা যেতে পারে। এর ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা যেতে পারে কিছু রঙিন কুশন ও তাকিয়া। মাটির ফুলদানি বা সিরামিকের বড় জার দিয়ে সাজানো যেতে পারে বসার ঘরের একটা পাশ। দেয়ালে ঝোলানো যায় দৃষ্টিনন্দন আর্ট বা পারিবারিক স্মৃতির ফটোগ্রাফস। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সামনের দোকানগুলোয় ভিন্ন ধরনের কৃত্রিম ফুল, ঝাড়বাতি, ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প, মাটি দিয়ে তৈরি চিত্রকর্ম ও বাঁশের তৈরি নানান সামগ্রী পাওয়া যায় যা দিয়ে দেশীয় ঢঙে ঘর সাজানো মনোরম হয়ে উঠতে পারে।


আধুনিক ঢঙে সাজানো বসার ঘর : আধুনিক ঢঙে সাজানো বসার ঘরে ঈদের সাজের ক্ষেত্রে সোফা ও কুশন কভারের রঙ ব্ল্যাক, অফহোয়াইট, চকলেট, কফি, মেরুন ইত্যাদি হতে পারে। একই সঙ্গে পর্দার রঙটিও হতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পর্দার কাপড়ের ক্ষেত্রে একটু ভারী সিল্ক, নেট বা সিল্কের সঙ্গে লেসের ভারী ডিজাইন ভালো লাগবে। সোফা ও পর্দার রঙের সঙ্গে মিল রেখে মেঝেতে বিছিয়ে দেয়া যায় পুরু কার্পেট। সেন্টার টেবিলটি চৌকোনো, ওভাল বা সার্কেল শেইপের হতে পারে। সার্কেল শেইপের সেন্টার টেবিলের মাঝে ক্রিস্টাল বোলে বেশকিছু রঙিন মার্বেল বা আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শোপিস রাখা যেতে পারে। এছাড়া চৌকোণা বা ওভাল টেবিলে মোম, ছোট গাছ বা শোপিস দিয়ে সাজানো যেতে পারে। ওই সঙ্গে সিলিংয়ে ঝোলানো যেতে পারে ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি। ঘরের কোণায় কোণায় সবুজ ইনডোর প্লান্টস ঘরটি সজীব ও প্রাণবন্ত করে তুলবে।


খাবার ঘর : ঈদের সাজে বসার ঘরের পরই ভাবতে হবে খাবার ঘরের সাজসজ্জা নিয়ে। কারণ ঈদের দিনে ওই ঘরেই অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। ঈদের উৎসব পূর্ণতা পায় খাবার ঘিরে। তাই সুন্দর পরিবেশনার সঙ্গে সঙ্গে খাবার টেবিল ও ঘরটিকেও দিতে হবে পরিপাট্য রূপ। লম্বাটে আকৃতির টেবিলের মাঝে সুদৃশ্য রানার বিছিয়ে দেয়া যায়। একই সঙ্গে রঙিন ম্যাট বিছিয়ে দেয়া যায় আবার রানারের ঠিক মাঝখানে রাখা যেতে পারে ছোট ফুলদানিতে সতেজ ফুল বা সুদৃশ্য রঙিন মোমসহ মোমদানি। উৎসবে তো শোকেস থেকে নামিয়েই উঠিয়ে রাখা হয় সুদৃশ্য ক্রোকারিজ। খাবার টেবিলের কাছাকাছি ছোট একটা টেবিল বা র‌্যাকে প্রয়োজনীয় প্লেট, গ্লাস, চামচ রাখা যায়। টেবিলের ঠিক ওপর রঙিন ল্যাম্পশেড খাবার ঘরটিতে মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করবে।


শোয়ার ঘর : ঈদের দিন সকাল বেলাটিতেই বিছানাটি চাদর বা বেড কভারে ঢাকুন টান টান করে। সাইড টেবিলে ফুলদানিতে সাজিয়ে দেয়া যায় সুগন্ধি ফুল। বেড কভারের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে পর্দার রঙ ও কাপড় নির্বাচন করা উচিত। বেড সাইড টেবিল ল্যাম্প বা ঘরের কোণে কর্নার ল্যাম্পও ঘরটিকে মায়াময় করে তুলতে পারে। মেঝেতে কার্পেট ও দেয়ালে পেইন্টিং শোবার ঘরটি করে তুলবে আরো আকর্ষণীয় এবং মনমুগ্ধকর। শিশুদের শোবার ঘরটিকে সাজানো যায় কার্টুন বেড কভার, কুশন বা মজাদার পোস্টারে। দেয়ালে কার্টুন একে দেয়া যেতে পারে। ঈদ উপলক্ষে শিশুদের ঘরের দরজা বা কর্নার নিরাপদ দূরত্বে ইলেকট্রিক সুদৃশ্য রঙিন টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো যেতে পারে।
রান্নাঘর : ঈদের অন্যতম আকর্ষণ খাওয়া-দাওয়া। রান্নাঘরে যেন সবকিছু হাতের নাগালেই পাওয়া যায় এদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। রান্নার প্রয়োজনীয় সব জিনিস জায়গামতো গুছিয়ে রাখতে হবে। এক কোণায় রাখা যেতে পারে ছোট টব বা ফুলদানি। গান শোনার ব্যবস্থা থাকলেও রান্না করা বেশ আনন্দময় হয়। কিচেন ডোরে ঝুলিয়ে দেয়া যেতে পারে টুংটাং চাইম। চাইমের মিঠে সুর রান্নার ক্লান্তি বা পরিশ্রান্তি দূর করে দেবে।
বারান্দা ও সিড়ি বা ছাদ : বারান্দা, সিঁড়ি কিংবা ঘরের দরজার পাশে জীবন্ত গাছ সাজিয়ে দেয়া যায় কিংবা ঝুলন্ত টবে পাটের শিকায় ঝুলিয়ে দেয়া যায় লতার গাছ। টবগুলোর পাশে মাটির শোপিস কিংবা মাটির ল্যাম্প বারান্দায় আলাদা সৌন্দর্য দেবে। এছাড়া বারান্দা বা ছাদের কোণায় মাটির বড় পাত্র বা টবে নানান শোপিস ও প্লান্টস দিয়ে সাজানো যায় ফেইরি গার্ডেন। বারান্দায় সুসজ্জিত জলদেশের কাব্যে অ্যাকুরিয়াম সাজিয়ে দেয়া যায়।

সব ঘরের ঝুল ঝেড়ে ফেলতে হবে। ফ্যান, টিউব লাইট সুন্দর করে মুছে ফেলতে হবে। বসার ঘরের সোফাগুলো পরিষ্কার করে রাখতে হবে। যেসব সোফার কভার ধোয়া যায় সেগুলো ধুয়ে ফেলতে হবে। আর যেসব ধোয়া সম্ভব নয় সেসব ফার্নিচার স্প্রে দিয়ে মুছে ফেলতে হবে।  সপ্তাহখানেক অগেই বিছানার চাদর, কুশন কভার, বালিশের কভার, টেবিল ক্লথ ধুয়ে ইস্ত্রি করে রাখতে হবে। টাইলসের মেঝে পানিতে স্যাভলন বা ডিটারজেন্ট মিশিয়ে কিংবা লিকুইড ক্লিনার দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। ঘরের আনাচে-কানাচে ও ছাদে ঝুল ঝেড়ে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। ফ্যান, লাইট, কিচেন ক্যাবিনেট, জানালা-বারান্দার গ্রিল, দরজার কারুকাজ, সিঁড়ি ইত্যাদি আগেই পরিষ্কার করে রাখতে হবে। ঈদের দু’তিন দিন আগে বাড়ির প্রতিটি টয়লেটের মেঝে ভালো করে ঘষে রাখতে হবে। টয়লেটে টয়লেট পেপার, লিকুইড সোপ- এসব প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখতে হবে। তাজা ফুল বা ইনডোর প্লান্ট টয়লেটের বেসিন কিংবা শেলফে রেখে দেয়া যেতে পারে। বারান্দার টবগুলো ধুয়ে-মুছে পারলে রঙ করিয়ে নিলে ভালো হয়। ঈদের আগের দিনই গ্লাস ও প্লেটগুলো নামিয়ে ধুয়ে-মুছে রেখে দিলে ঈদের দিন তাড়াহুড়া থাকবে না। টিশ্যু বক্স, এয়ার ফ্রেশনার, হ্যান্ড ওয়াশ, জরুরি ওষুধ আগেই মজুদ করে রাখা উচিত। এতে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ঈদের ছুটিতে আশপাশের মেডিসিন শপ বন্ধ থাকলেও কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।


বাড়ির অন্দর গৃহকর্ত্রীর রুচিশীলতার পরিচয় দেয়। তাই এর প্রায় পুরো কৃতিত্বই দিয়ে দেয়া যেতে পারে গৃহকর্ত্রীকেই।
যাহোক, উৎসবের আনন্দে নান্দনিক গৃহসজ্জা এবং মুখরোচক খানা-খাদ্যের সমাহারে ভরে উঠুক প্রতিটি অন্তর ও হৃদয়। সবাই যে যেখানে আছেন- আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাবেন উৎসবের এদিনটি আনন্দ-উচ্ছলতায়। নিরাপদে ও সুস্থ থাকুন সবাই। সবার প্রতি রইলো ঈদের অনাবিল শুভেচ্ছা। 

ঈদ উৎসব ও নন্দনতত্ত্ব

ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী




ঈদ ‘আওদ’ শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। আওদ-এর আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন বা বার বার ফিরে আসা। অষ্টম শতকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ওই সময় সুফি, দরবেশ, তুর্কি- আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের সূত্রপাত বলে মনে করা হয়। অবশ্য তা ছিল বহিরাগত ধর্ম শাসক, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশের ধর্ম সামাজিক পার্বণ নয়। বাংলাদেশে রোজা পালনের প্রথম ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় ‘তাসকিরাতুল সোলহা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের বিবরণ থেকে জানা গেছে, আরব দেশের শেখউল খিদা-র ৩৪১ সন মুতাবিক অর্থাৎ ৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আগমন। ঢাকায় ইসলাম ধর্ম প্রবেশের আগে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা ও বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুরের রামপালে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। শেখউল খিদা চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রী চন্দের শাসনকালে (৯০৫- ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সবুজ বদ্বীপে আগমন করেন বলে অনুমান করা হয়। তাদের প্রভাবেই বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদ প্রচলিত হয়েছিল- এটাও প্রমাণ সাপেক্ষ নয়। কারণ ‘নামাজ’, ‘রোজা’, ও ‘খোদা হাফেজ’ শব্দের ব্যাপক প্রচলনে বোঝা যায়, অ্যারাবিয়ানরা নন, ইরানিয়ান সুফি-দরবেশদের দ্বারাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছে। উপরোক্ত তিনটি শব্দই আরবি নয়, ফার্সি। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তার প্রধান আমাত্য মীর আবুল কাসেম একটি ঈদগাহ (২৪৫-১৩৭ ফিট আয়তন) নির্মাণ করেন। ভূমি থেকে ১২ ফিট উঁচু ওই ঈদগাহের চতুর্দিকে ১৬ ফিট উঁচু সুদৃশ্য প্রাচীর ঘেরা। ঈদগাহে মেহরাব ও মিনার নির্মিত হয়েছিল। মোগল আমলে রাজদরবার, আদালত, সেনা ছাউনি ও বাজারে কেন্দ্রে অবস্থান ছিল ওই ঈদগাহের। সেখানে শুধু সুবেদার, নায়েবে নাজিম, অভিজাত মুসলমান কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনরাই এখানে ঈদের নামাজ পড়তে পারতেন। পরে ঈদগাহ ময়দান জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ওই ঈদগাহ ময়দানের পাশে ঈদের সময় মেলা বসতো। মোগল আমলে ঈদের দিন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ও আনন্দ উৎসব হতো। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে গণমুখী শাহী ঈদগাহের উপস্থিতি দেখে। সুফি-সাধকদের ভূমিকাও ছিল এক্ষেত্রে অনন্য এবং অধিকতর জনসচেতন। উনিশ শতকের শেষ দিকে ঈদের আনুষঙ্গিক আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় একটি নতুন উপাদান ‘লোকজ মেলা’। ওই মেলায় শোলার তৈরি পাখি, ফুল, কুমির, হাতি, ঘোড়া, নকশা তালপাখা, চিত্রিত শখের হাঁড়ি ছাড়াও অনেক লোকজ খেলনা পাওয়া যায়। আর দই, মিষ্টি ও জিলাপির পসরার কোনো তুলনা নেই। ওই ধারা এখনো বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিরাজমান। ঈদ যে বাংলাদেশের মুসলমানদের মহোৎসব এর বড় প্রমাণ উৎসবমুখর ঈদের বাজার। তা নি¤œবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের এক যোগসূত্র। এর সঙ্গে আবার যুক্ত কোরবানির মহোৎসব। ‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ অতীব নিকটবর্তী হওয়া। কোরবানির পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত নি¤œবিত্তের কোটি কোটি নারী-পুরুষ। বলা চলে, ঈদের প্রস্তুতি সারা বছর ধরে এবং সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নও ঈদ উৎসবের বাইরে নয়।

 


পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মের যে উৎসব উদযাপিত হয়, ঈদ উৎসব ওই তুলনায় কনিষ্ঠতম। কিন্তু আয়োজনের ব্যাপকতায় সবচেয়ে বড়। সমকাল থেকে ১৩৮৮ সৌর বছর আগে এই উৎযাপন শুরু হয়। ইসলামের বার্তাবাহক নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের অব্যহতি পর প্রথম ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়। অ্যারাবিয়ানদের ইহুদি ধ্যান-ধারণা ও জাহেলি প্রথার পরিবর্তে দুই ঈদ ছিল আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য ঘোষিত উপহার। ইসলামি আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসী পালন শুরু করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর আগে আরবে পৌত্তলিক ভাবনায় অগ্নিপূজকদের ‘নওরোজ’ ও মূর্তিবাদীদের ‘মিহিরজান’ নামে দুটি শ্রেণিবৈষম্য, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ উৎসব পালিত হতো। এর পরিবর্তে দুই উৎসব বয়ে আনে আনন্দবার্তা। শ্রেণিবৈষম্যহীন, পবিত্র আর ধর্মানুভূতির মেলবন্ধনের মহোৎসব। ঈদুল ফিতর শব্দের অর্থ রোজা ভাঙার দিবস। ঈদুল ফিতরের আগের রাতকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় ‘লাইলাতুল জায়জা’। এর অর্থ পুরস্কার রজনী। ঈদুল আজহাকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় ‘ইয়ামুজ জায়েজ’। এর অর্থ পুরস্কারের দিবস। এছাড়া আছে আলবেনিয়ান, আরবি, বাংলা, চায়নিজ, গ্রিক, হিন্দি, হিব্রু, সিলেটি নাগরী ও তামিল ভাষায় দুই ঈদের আলাদা নাম প্রচলিত। দেড় হাজার বছরেরও বেশি ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে। ক্যামেরাবিহীন যুগে চিত্রশিল্পীরা ধরে রেখেছেন ঈদ উৎসবের ছবি। অবশ্য ইসলামিক অনুশাসনে ছবি আঁকা নিয়ে বিরোধ-বিতর্ক রয়েছে। ঈদ উৎসবের যতো চিত্রশিল্প রয়েছে এর মধ্যে শোভাযাত্রার ছবি বেশি। বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত মানুষ দলবেঁধে ঈদগাহ ময়দানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শোভাযাত্রায় হাতি, ঘোড়া, রাজকীয় পালকি ও নকশাদার ছাতার ব্যবহার রয়েছে। কোনো কোনো ছবিতে আতশবাজি পোড়াচ্ছেন নারীরা। বোরাকের ছবি এঁকেছেন শিল্পীরা। মাথায় চাঁদ-তারাখচিত মুকুট শোভিত বোরাকের বোরাক, ছবির ভেতর ফার্সি ও আরবি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি। মোগল আমলের ছবিতে স¤্রাটকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সব ছবির ভেতর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতা ও ঠা-া রঙ ব্যবহারের চাতুর্যতা প্রশংসনীয়। বিশ্বশিল্পে ইসলামিক চিত্রকলার একটি বিশাল স্থান রয়েছে, বিশেষ করে পার্শিয়ান ও মোগল মিনিয়েচার চিত্রশিল্প। ওই চিত্রশিল্প পর্যবেক্ষণে এর ইতিহাস জানা জরুরি।


শিল্প প্রতিভার দ্বারাই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে তাকেই শিল্প বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত শিল্পকে নানানভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অস্কার ওয়াইল্ড যেমন ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন তেমনি লিও টলস্টয় অথবা বার্নাড শ’ শিল্পের সামাজিক মূল্যমানকে শিল্পের উদ্দেশ্য মনে করেছেন। অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, ‘সুন্দর সৃষ্টিই হচ্ছে শিল্পের একমাত্র লক্ষ্য- ‘দ্য আর্টিস্ট ইজ দ্য ক্রিয়েটর অ্যা বিউটিফুল থিংক’। শিল্পে নীতির প্রশ্নকে তিনি স¤পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন- ‘দেয়ার ইজ নো সাচ থিংক অ্যাজ অ্যা মোরাল অর ইমমোরাল বুক’। লিও টলস্টয় তার ‘হোয়াট ইজ আর্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, শিল্পের মধ্যে প্রকাশিত হবে সেসব ‘ফিলিং ইনডিস পেনসিবল ফর দ্য লাইফ অ্যান্ড প্রগ্রেস টুওয়ার্ডস ওয়েলবিং অ্যা ইনডিভিজুয়ালস অ্যান্ড অ্যা হিউম্যানেটি’। ফ্রেজার তার ‘দ্য গোল্ডেন বাউস’ গ্রন্থে অকাল্ট ম্যাজিক ইত্যাদি বিষয়কে প্রাচীন শিল্পের উৎসমুখ বলে উল্লেখ করেছেন। শিল্পকলায় অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। প্লেটোর অনুকরণতত্ত্বে শিল্প হলো ‘আর্ট ইজ ডাউলি রিমোভড ফ্রম রিয়ালিটি’ অর্থাৎ ঈশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্বসংসার তৈরি করেছেন এরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পের প্রেরণা হিসেবে তার ধারণা ছিল শিল্পী শিল্পকর্ম সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। প্লেটো শিল্পীর অন্তরে নিজস্ব ‘অ্যাসেনসিয়াল ক্রিয়েটিভ স্প্রিট’কে অবিশ্বাস করতেন। ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই শিল্প সৃষ্টি সম্ভব।


নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের নির্মিতিকে কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়নি। এটি ভারতীয় সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। সমাজের একদিকের পরিবর্তন অনিবার্যভাবে অপরদিককে প্রভাবিত করে। এটিই হচ্ছে ভারতীয় সমাজ, শিল্প ও শিল্প-কারখানার আন্তঃসম্পর্কের প্রকৃত ‘গতি বিজ্ঞান’। উপনিষদের সৃষ্টি ও জীবন সংক্রান্ত ‘মেটাফিজিকাল’ বা অধিবিদ্যামূলক দর্শন ও ঈশ্বর ধারণা কয়েক হাজার বছর ধরে এই উপমহাদেশে দিয়েছিল এক সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। তা প্রতিফলিত হয়েছে সারা ভারতবর্ষের লোকশিল্প, লোকসাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যবৈচিত্র্যের মধ্যে একই সুরের খেলা, বহুর মধ্যে একই সুরের স্পন্দন। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে আর্যদের আগমন এবং এই উপমহাদেশে আর্য ও দ্রাবিড়দের সহাবস্থানের দ্যোতক ভারতবর্ষের বেদ উপনিষদের স্বীকৃতির পর বহু জনগোষ্ঠী উপমহাদেশে এসেছে। ভারতবর্ষের মহামানবের মূল স্রোতে মিশে গেছে অনেক সময় নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য রেখেও।


খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে মুসলমানরা এলো এক অতি উচ্চাঙ্গের সংস্কৃতি ও ধর্মবোধ সঙ্গে নিয়ে। তাদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ভারতবর্ষে কোনো গ-িবদ্ধ ধর্মমত ছিল না। হিন্দু জনসমাজের মধ্যে ছিল বেদ ও উপনিষদের দর্শন। ওই দর্শনের বিস্তৃত অঙ্গনের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে নানান বিশ্বাস বা অবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মাচারণ করতো। এই প্রথম এক জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে বাস স্থাপন করেও উপমহাদেশের মূল স্রোতের বাইরে নিজেদের বিশিষ্ট সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় স্থাপন করে। হিন্দু সমাজেও এই সময় ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র বোধের উদয় হয়। বহু হিন্দু ধর্মান্তরিত হন। পশ্চিম এশিয়ার ইসলামিক দেশগুলো থেকেও ভারতবর্ষে এসে বসবাস স্থাপন করেছিল বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি-দার্শনিক, কবি, ঐতিহাসিক ছাড়াও স্থপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও নানান ধরনের পারদর্শী কারুশিল্পী। ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে এক বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি। ভারতীয় মুসলিমের সংস্কৃতি এবং পশ্চিম এশিয়া ও ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠে ওই সংস্কৃতি। দুই সামন্ততান্ত্রিক দেশের নাগরিক সংস্কৃতি মুসলিম ও মুসলিম-উত্তর দরবারি শিল্প। আদিম সমাজ থেকে যখন মানুষের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে উত্তরণ ঘটে তখন ওই সামন্ততান্ত্রিক সমাজে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি গড়ে ওঠে এক নাগরিক সংস্কৃতি, নতুন সমাজের নগর ও জনপদগুলো কেন্দ্র করে। ভারতবর্ষের লোকসমাজ আদিবাসী সংস্কৃতি ও মুসলিম সমাজের দরবারি সমাজ বাদ দিলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজ জাতি-বর্ণে বিভক্ত হয়। ওই সমাজে লোকসংস্কৃতির নানান অভিব্যক্তি, বিশেষ করে লোকশিল্পের উপজাত বস্তু ৯টি শিল্পভিত্তিক বর্ণের অবদান। বৃত্তিভিত্তিক বর্ণ-বিভাগের ফলে প্রাচীন ভারতের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নাগরিক সংস্কৃতি
প্রয়োজনীয় সর্ববস্তু সম্ভারের জন্য বংশানুক্রমিক ভাবধারা ও অসাধারণ দক্ষতার


অধিকারী বর্ণাশ্রয়ী শিল্পীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মধ্যযুগে ইসলামি শিল্প-সংস্কৃতি- যাকে দরবারি শিল্প বলা হয় এর সংস্পর্শে এলো হিন্দু নাগরিক সংস্কৃতির শিল্প। ওই মিলনের ফসল হিসেবে ভারতবর্ষের নাগরিক শিল্প এমন এক নান্দনিক গুণ অর্জনে সমর্থ হয়েছিল যে, পৃথিবীজুড়ে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ওই যুগে। মোগল শাসন আমলে ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের যে স্থাপত্য ধারা প্রবর্তিত হয় তা দেখা যায় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাসাদ, মসজিদ, দুর্গ, দরবার কক্ষ, স্মৃতিসৌধ্য, মিনার প্রভৃতির বিচিত্র বর্ণ ও অলঙ্করণের মাধ্যমে। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমন সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচন করে। এতে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও মুসলমান এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ভাব ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করতে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম হয়েছিল। সিন্ধুর বিশেষ এলাকা ‘মানসুরা’য় (বর্তমানে ধ্বংস্তূপে পরিণত) নির্মিত ক্ষুদ্র পরিসরের মসজিদ ছাড়া ওই সময়ের স্থাপত্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়-পরবর্তী মুসলিম বিজয় এবং স্থায়ীভাবে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটা সহজ করে দিয়েছিল। একাদশ শতাব্দীতে গজনির সুলতান মাহমুদ একাধিকবার ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু যে কোনো প্রাসঙ্গিক কারণেই হোক, তিনি স্থায়ীভাবে এখানে রাজত্ব করেননি এবং তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নির্মাণে ব্রতী হননি। অবশ্য তিনি গজনিতে অনেক সুরম্য প্রাসাদ ও ধর্মীয় ইমারত ও বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। গজনির স্থাপত্যরীতি
পরবর্তীকালে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে বহুলাংশে অনুসৃত হয়েছে। এর সাক্ষ্য বহন করে দিল্লির কুতুব মিনারের নির্মাণ কৌশল।


ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম স্থাপত্যকে সাধারণত  প্রধান তিনটি শৈলীতে ভাগ করা যায়। তা হলো দিল্লির সুলতানি স্থাপত্যরীতি, মোগল রাজকীয় শৈলী ও প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক স্থাপত্যশৈলী। শৈলীগত পরিবর্তন ঘটলেও মোগল স্থাপত্য অলঙ্করণে ইসলামি ধারাবিবর্জিত কোনো বিষয় রচিত হয়নি। ইসলামি শিল্পকলার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অলঙ্করণ। ইসলামি শিল্পকলাকে মূর্তিবিবর্জিত বা আইকনিক শিল্পকলা বলা হয়েছে। অপরাপর শিল্পকলার মতো ইসলাম কেন্দ্র করে কোনো ‘আইকনিক’ বা মূর্তি শিল্প গড়ে ওঠেনি। ইসলামি শিল্পকলায় অলঙ্করণের ব্যবহার দু’দিক থেকে বিচার করা যায়- উপকরণভিত্তিক ও মোটিভভিত্তিক। অলঙ্কণের প্রকারভেদ নির্ভর করে উপকরণের ওপর। উমাইয়া যুগে পাথর ও মার্বেলের সর্বজনীন প্রয়োগের ফলে যে ধরনের অলঙ্করণের উদ্ভব হয়, আব্বাসীয় যুগে ইটের ব্যবহারে তা দেখা যায় না। এ কারণে পাথরের ওপর যে ধরনের নকশা দেখা যায় তা সাধারণত খোদাই বা স্টোন কার্ভিং ‘ফুসাইফিসা’ বা মোজাইক, ওপুস সেকটাইল বা সাদা পাথর কেটে রঙিন পাথর বসিয়ে নকশা করা। পাথরের ওপর বিভিন্ন আকারের নুড়ি, কাচ, মার্বেল প্রভৃতি বসিয়ে যে মোটিভ সৃষ্টি করা হয় তাকে মোজাইক বলে। আব্বাসীয় যুগে মোজাইকের ব্যবহার হ্রাস পেলেও সামারার ভগ্নপ্রাপ্ত বালকুয়ারা প্রাসাদ থেকে প্রচুর মোজাইক উদ্ধার করা হয়। ওপুস সেকটাইল-এর প্রয়োগ ভারত উপমহাদেশে মোগল আমলে, বিশেষ করে সম্রাট আকবরের স্থাপত্যকীর্তিতে (ফতেপুর সিক্রির জামে মসজিদ, সেকেন্দ্রায় আকবরের সমাধি, আগ্রায় ইতিমদল্লার সমাধি) দেখা যায়। এছাড়া মোগল স্থাপত্যগাত্রে ফ্রেস্কো, স্টাকো, টেরাকোটা, রঞ্জিতটালী ও পিয়েত্রা দুরার বহুল ব্যবহার করা হয়েছে। আর শিল্পের ইতিহাস বদলে দিয়েছে আবয়বিক

বিমূর্তলোকের বাসিন্দা : রশিদ আমিন

 

 

ভাবনার বিমূর্তরূপ যাঁর ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে ওঠে তিনি রশিদ আমিন।
নিভৃতচারী এই শিল্পী মননে বিমূর্তলোকের বাসিন্দা। ধ্যানস্থ তাঁর আপন কাজে, তবে নির্লিপ্ত নন পারিপার্শ্বিক টানাপড়েনে। এই শিল্পীর মুখোমুখি হয়েছিলেন শাকিল সারোয়ার

 

আপনার শৈশব-কৈশোর কোথায় কেটেছে?
আমার শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইলে। আমার শৈশবের টাঙ্গাইল ছিল একটি ছোট্ট মায়াবী শহর। ওই শহরেই আমার বেড়ে ওঠা। একটা চমৎকার সাংস্কৃতিক আবহ ছিল এই শহরে। নাটক, সঙ্গীত, নৃত্যানুষ্ঠানÑ এসব আয়োজনে মুখরিত থাকতো ওই শহর। ছিল অনেক শিশু সংগঠন। এ রকমই একটি শিশু সংগঠন ছিল ‘কচিকাঁচার মেলা’। এখানেই আমার ছবি আঁকার শুরু আমার শিল্পী সত্তার সূচনা।

আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন
আমার বাবা টাঙ্গাইলে পোস্ট মাস্টার ছিলেন। ৯ ভাইবোন আমরা। বড় একটি পরিবার। আমরা চার ভাই ও পাঁচ বোন। ভাইয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। বড় ভাই নাট্যজন মামুনুর রশীদ। মেজভাই সাংবাদিক। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। সেজভাই ডাক্তার। তিনি বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কামরুল হাসান খান। বোনরা সবাই স্নাতক, কেউ কেউ স্নাতকোত্তর পাস এবং চাকরি করছে। বোনরা সাংস্কৃতিক জগতে আসতে পারেননি। কারণ বাবা কিছুটা রক্ষণশীল ছিলেন।

কবে থেকে ছবি আঁকার তাগিদ অনুভব করলেন এবং ছবি আঁকাই বা কেন বেছে নিলেন?
ছবি আঁকায় আমার পরিবারে কোনো পূর্বসূরি ছিলেন না। বলা যেতে পারে আমিই এক্ষেত্রে পথিকৃৎ। তবে আমার বড় ভাই নাটক করতেন। সেক্ষেত্রে কিছুটা প্রেরণা ছিল। আমি একটি শিশু সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম যা আগেই বলেছি। সেখানেই আমার ছবি আঁকার হাতেখড়ি। আমি যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আর্ট কলেজে ভর্তি হবো। তখন থেকেই আমার পেশাদার শিল্প শিক্ষার শুরু। আমার ভাইয়েরা সবাই আমাকে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন। ছবি আঁকা বেছে নেয়ার বড় কারণ হচ্ছে, এটা এমন একটা বর্ণময় ভুবন, এই ভুবনে যে প্রবেশ করেছে তার এখান থেকে নিস্তার নেই। আমিও এই ভুবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। তবে আরো কিছু কারণ ছিল। তা হলো, ছবির মধ্য দিয়ে নিজেকে যতো সহজে প্রকাশ করা যায়, অন্য মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম স্বাধীন পেশাদার শিল্পী হবো। তা আর সম্ভব হয়নি। শিক্ষকতায় ঢুকতে হলো। তবে এটিও আমার জন্য একটি আনন্দদায়ক অধ্যায়। আমার একটি বিশাল ছাত্রভুবন তৈরি হয়েছে। তাদের সঙ্গে শিল্প পাঠ দেয়া ছাড়াও নানান সুখ-দুঃখে জড়িয়ে গিয়েছি। তাদের কাছ থেকেও অনেক শেখার আছে।

পেইন্টিংয়ের কোন ধারাটি আপনাকে বেশি টানে?
আমি মনে করি, পেইন্টিং হচ্ছে খুব একটা ইচ্ছা-স্বাধীনের ভুবন। এর মধ্য দিয়ে আমার অন্তরের একেবারের ভেতরের নির্যাসটা বের করে নিয়ে আসতে পারি। তাই সব সময় বিমূর্তধারাটিই বেশি পছন্দ করি। অবশ্য বিমূর্তধারার শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা খুব কঠিন। কারণ মানুষ পেইন্টিংয়ের মধ্যে সব সময় একটি আকার অথবা অবয়বই খোঁজে। যখনই দেখে নিরাবয়ব অথবা নিরাকার তখনই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটি একটি সংগ্রাম। মানুষের দৃষ্টি নিরাবয়বের মধ্যে টেনে নিয়ে আসা। আমার গুরু মোহাম্মদ কিবরিয়া তা পেরেছিলেন। বিমূর্তধারার সঙ্গে এক ধরনের আধ্যাত্ম চেতনার সংমিশ্রণ ঘটাতে হয়। অনেকেই ভুল বোঝেন। এটা ঠিক তথাকথিত ধর্মীয় আধ্যাত্ম নয়। এটি প্রকৃতি, বিশ্বব্রহ্মা- ও মহাশূন্যের সঙ্গে শিল্পীর এক নিবিড় খেলা।

শিল্পী হিসেবে বলুন, নিজের শিল্পসত্তা প্রকাশে আপনি কতোটুকু স্বাধীন?
আমি এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার শিল্পসত্তা প্রকাশের ব্যাপারে পুরোপুরি স্বাধীন ও আপসহীন। নিজস্ব শিল্প-ভাবনা ও শিল্প-প্রকাশ টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করেছি। আজ পর্যন্তও তা করছি। অন্যের রুচি অনুযায়ী ছবি আঁকিনি। অনবরত নিজেকেই প্রকাশ করতে চেয়েছি।

স্বদেশ আপনাকে কতোটুকু টানে এবং ওই টান আপনার কাজে কতোটকু প্রভাব ফেলেছে?
স্বদেশ আমার এক গভীর প্রেরণা। যা-ই আঁকি না কেন, সেখানে স্বদেশ থাকে, থাকে স্বদেশের রঙ। সুযোগ পেলেই ভ্রমণ করি। এতো সুন্দর আমাদের দেশ! বর্ষা আমার প্রিয় ঋতু। বর্ষায় ‘বর্ষামঙ্গল’ শিরোনামে ছবি আঁকি এবং গত দুই বছরে অনেক ছবি জমেছে। ভাবছি ভবিষ্যতে একটা প্রদর্শনী করবো।

নিজের কাজে আপনার তুষ্টি কতোটুকু?
আমার কাজে মোটেই তুষ্ট নই। অনবরত একটি অতৃপ্তি কাজ করে। অনেক ছবি আছে বছরের পর বছর ফেলে রেখেছি, শেষ করতে পারি না। দেশে কিংবা বিদেশে কার কার কাজ আপনাকে মুগ্ধ করে, ভাবায় এবং প্রাণিত করে? দেশে মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মনিরুল ইসলাম আমার প্রিয়। আসলে কিবরিয়া স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখেছি, একজন শিল্পী কীভাবে শিল্পের সাধক হয়ে ওঠেন। আমাকে সব সময় তাকে সন্ত শিল্পী হিসেবেই মনে হয়েছে। বিদেশে ক্যান্দেনেস্কি, মার্ক রথকো, পিকাসো, তাপিস আমার প্রিয়। তাদের কাজের ভেতর রঙ ও রেখার সঙ্গে দারুণ এক আধ্যাত্ম বোধের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এটিই আমাকে খুব টানে।

 

_______________________

লেখাঃ শাকিল সারোয়ার

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু

ভাস্কর্য

একজন হামিদুজ্জামান

 

 

‘আমি যে গ্রামে বেড়ে উঠেছিলাম সেখানকার প্রায় সবাই ছিলেন শিক্ষিত। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের খবরাখবরও রাখতেন তারা। দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ম্যাগাজিন আসতো আমাদের গ্রামে। ভারতীয় ম্যাগাজিনগুলোয় আঁকা থাকতো অনেক ছবি। ভারতীয় শিল্পীদের আঁকা ছবির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় এসব ম্যাগাজিনেই। আমি খুব অভিভূত হতাম, মাঝে মধ্যে আঁকার চেষ্টাও করতাম। তখন থেকেই আমার শিল্পের পথে চলার শুরু। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে স্কুলের খাতাতেও চলতো এই চেষ্টা’-
কথাগুলো বলছিলেন বিখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান। যার কাছে পরীক্ষার খাতাও কখনো কখনো হয়ে উঠতো ক্যানভাস।
বাবা ধার্মিক মানুষ হলেও রীতিমতো উৎসাহ দিতেন তার কর্মকা-ে। একদিন বাবার অনুরোধে পাড়ার মসজিদের ছবি আঁকলেন তিনি। অভিভূত বাবা ওই ছবি মসজিদের ইমামকে উপহার হিসেবে দিলেন। তিনিও ভারী খুশি হলেন। এরপর তার দাদার মুখাবয়বের সঙ্গে মিলে যায় এমন একটি স্কেচ এঁকে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো হামিদুজ্জামানের কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতো। বাবার পাশাপাশি আশপাশের অন্য অনেকের উৎসাহে অনুপ্রাণিত হন তিনি।


এ পর্যন্ত হামিদুজ্জামান যতো ছবি এঁকেছেন এর সবই নিজের ভেতর থেকেই এসেছে। তার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি কি সহজ ছিল ওই সময়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘না, তেমন সহজ ছিল না। ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাস করি। এরপর ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছিলাম ভৈরব কলেজে। আমার সাবজেক্ট ছিল সায়েন্স। দুই মাস ক্লাস করার পর ওই সাবজেক্ট আমার একদম ভালো লাগলো না। কিছুতেই ওইসব ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে আমার মন বসছিল না। বাড়িতে এসে বাবাকে বললাম, ভালো লাগছে না একদম। আমি পড়তে পারছি না। এর মধ্যে অবশ্য জেনে গিয়েছি ঢাকার আর্ট কলেজের কথা। আর ওই সময়ের মধ্যে আঁকার হাতটা একটু ভালো হয়ে উঠেছিল। তাই বাবার কাছে এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য গো ধরলাম। আমাদের ওখানে যে পোস্ট অফিস ছিল সেখানে ভালো এক পোস্ট মাস্টার ছিলেন। তার সঙ্গে আমার বাবার খুব ভালো সখ্য ছিল। গল্পে গল্পে বাবা যখন ওনাকে জানালেন, আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য বায়না ধরেছি তখন তিনি বললেন, ছেলে যেখানে ভর্তি হতে চায় সেখানেই ভর্তি করিয়ে দিন। আবার অনেকে বললেন, চারুকলায় গেলে আমি নষ্ট হয়ে যাবো। কিন্তু সব মিলিয়ে বাবা শেষ পর্যন্ত আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন।

আর্ট কলেজে ভর্তির ভাইভা নিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন স্যার।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বললেন ওই ঘটনা ‘আমি ও বাবা দু’জনে মিলে সরাসরি ওনার বাসায় চলে গিয়েছিলাম। ঢাকায় আসার আগে বাবা বেশ খোঁজখবর করে জয়নুল আবেদিন স্যারের বাসার ঠিকানা নিয়ে আসেন। আমরা যখন তাঁর বাসায় গেলাম দেখা করতে তখন আমাকে তিনি বললেন, দেখি তুমি কী আঁকো? তখন তাঁকে আমার কিছু আঁকা ছবি দেখালাম। এরপর তিনি সেগুলো দেখে আমাকে বললেন, তুমি কাল আর্ট কলেজে গিয়ে আমার নাম বলবে। বলবে জয়নুল আবেদিন ভর্তি করিয়ে নিতে বলেছেন। তারা তোমাকে ভর্তি করিয়ে নেবে।’
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়াটা কম কথা নয়। আর হামিদুজ্জামানকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। এর প্রমাণ তিনি তখন পেয়েছিলেন যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘হঠাৎ একদিন আবেদিন স্যার আমাকে ডাকলেন। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। ওনার সামনে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার এক্সিবিশনে কতোটি ওয়াটার কালার আছে? মুখ কাচুমাচু করে বললাম, বেশ কিছু আছে স্যার। স্যার বললেন-ওগুলো দেবে, আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে ফ্রেম করিয়ে দেবো। আমার কাছে যেগুলো ছিল সেগুলো স্যারের কাছে দিয়ে দিলাম। আমাদের প্রিন্ট মেকিংয়ের অনেক বড় বড় ফ্রেম ছিল। টিচাররা ইউজ করতেন মাঝে-মধ্যে। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার ছবিগুলা সব ফ্রেম করা হয়ে গেছে। এরপর সেখানে আবেদিন স্যার এসে বললেন- এই শোনো, তোমার যে কয়টি ছবি আছে তা আমি কিনে নিলাম। এগুলো আমার। আমার যে বিভিন্ন গেস্ট আসে তাদের এগুলো প্রেজেন্ট করবো। তুমি অফিস থেকে পয়সা নিয়ে যেও। আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি আর আবেদিন স্যার আমার ছবি কিনেছেন! খুশিতে কেঁদে ফেলি। এটি আমার জীবনের অনেক বড় পাওয়া এবং অবশ্যই অনুপ্রেরণা তো বটেই।


ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচয় হলো কবে জিজ্ঞাসা করতেই হামিদুজ্জামান বললেন, ‘এ ভাবনাটা ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর যখন বিদেশে যাই তখন মাথায় আসে। ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় আমার একটা মেজর অ্যাকসিডেন্ট হয়। এতে আমার মাথায় অনেক আঘাত লাগে। এরপর মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর ফাইনাল পরীক্ষা দিই এবং পাস করি। এরপর লন্ডনে চলে যাই চিকিৎসার জন্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা আমাকে চার মাস লন্ডনে থাকতে বললেন। তবে সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, কিছু ছবি বিক্রি করে বেশকিছু টাকা হাতে করেই লন্ডনে গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসা করাতে আমার তেমন কোনো টাকা লাগেনি। আমি স্টুডেন্ট বলে আমাকে চিকিৎসকরা ফ্রি চিকিৎসা করিয়ে দিলেন। আর এর মধ্যে লন্ডনে বেশ কিছুদিন থাকার সুবাদে ফ্রি টাইমে ঘোরাঘুরি করা শুরু করি। এরপর মাঝে বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে প্যারিস ও রোমেও ঘুরতে যাই। এ সময় দেখে ফেলি ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভিকটোরিয়া অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, পোট্রেইট গ্যালারি, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামসহ রোমের বিখ্যাত সব গ্যালারি। মূলত ওই সময়টাতেই ভাস্কর্য আমাকে একটু আলাদাভাবে টানতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে প্রতিস্থাপিত বিভিন্ন ভাস্কর্য দেখে ভাবতাম, এই মেটালের ভাস্কর্যগুলো কতো লড়াই করে প্রকৃতির ভেতর টিকে রয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে রয়েছে বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী। এগুলো অনেক ঐতিহ্য বহন করতে পারে। এসব চিন্তা থেকেই ভাস্কর্যের প্রতি আমার এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়।’
হামিদুজ্জামান যদিও পেইন্টিং নিয়ে পড়াওশানা করেছেন তবুও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও প্রফেসর রাজ্জাকের উৎসাহে ১৯৭০ সালে আর্ট কলেজে ভাস্কর্যের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক হওয়ার পর ভারতের বড়দা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি।
এরপর ১৯৭৬ সালে বড়দা মহারাজা সাহাজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ করেন। পরে ১৯৮২-১৯৮৩ সালে স্কাল্পচার সেন্টারে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুকাল চারুকলার শিক্ষকতা শেষে অবসর নেন তিনি।
পড়াতে খুব ভালোবাসতেন বলেই অনারারি প্রফেসর হিসেবে এখনো মাঝে মধ্যেই ক্লাস নেন।


দেশে-বিদেশে বহু ভাস্কর্যের জনক হামিদুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে বঙ্গভবনের ‘পাখি পরিবার’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংশপ্তক’ এবং ১৯৮৮ সালে সিউল অলম্পিকের ‘স্টেপস’ কাজগুলো প্রচুর সুনাম এনে দিয়েছে তাকে। ওই কাজগুলো করতে গিয়ে ভাস্কর্য চর্চায় কোনো বিদেশি প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিদেশি প্রভাব থাকবে কেন! আমাদের সংস্কৃতির চিরায়ত প্রভাব রয়েছে ওই কাজগুলোয়। এসব ভাস্কর্য বিদেশি ধাতুতে নির্মিত হলেও এতে আমাদের স্বকীয়তা রয়েছে। কারণ ভাস্কর্য চর্চা তো আমাদের কারো কাছ থেকে ধার করা নয়। ভাস্কর্য চর্চায় আমরা নতুন নই। আমাদের টেরাকোটা এ অঞ্চলের ভাস্কর্যের চিরায়ত প্রভাব বহন করে। ওই টেরাকোটা অনেক বছরের পুরনো। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আমাদের ভাস্কর্য চর্চার শিকড় আছে। আমরা চাইলেই আমাদের স্বকীয়তা নিয়ে কাজ করতে পারি। এ জন্য কারো দ্বারস্থ হওয়ার দরকার হয় না।’

হামিদুজ্জামান তাঁর শিল্পে সমৃদ্ধ করুন আমাদের সংস্কৃতি, তাঁর হাত ধরে আলাদা বৈশিষ্ট্য ধারণ করুক উমহাদেশের ভাস্কর্য শিল্প। হামিদুজ্জামানের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

 

_____________________________
সাক্ষাৎকার : শাকিল সারোয়ার
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

নীল অশ্বারোহী

ছবির ভালোবাসার গল্প

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

: বৃষ্টির ভেতর এভাবে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে নির্ঘাত গাছের মতো শিকড় গজাবে।
: ভালো হবে। সূর্য উঠলে লোকে দেখবে নদীর পাড়ে নতুন দুটো গাছের জন্ম হয়েছে।
: কোন গাছ হবো?
: অশোক, না হয় নাগলিঙ্গম।
: না, পৌরাণিক কোনো গাছ নয়।
: তাহলে কী?
: অশত্থ, না হয় বট।
: ওতো মহীরুহ। ও গাছে ফুল নেই।
: ফুল দরকার নেই, ফলে ভরা গাছ। ফলভুখ পাখিগুলোর কলরবে মুখর শাখা-প্রশাখা।
: তাহলে মানুষের কী হবে! মানুষ তো ও গাছের ফল খায় না।
: মানুষ গাছের ফল মানুষ খাবে না। পথিক বিশ্রাম নেবে। হুতোমপেঁচা, বুনোহাঁস, কাঠঠোকরা, বক,
পানকৌড়ি বাসা বাঁধবে খোড়লে, বাকলেÑ সেই গাছ।
: স্তন্যপায়ীরা থাকবে না। কাঠবিড়াল, বাদুড়, বানর, কালোমুখ হুনুমান।
: এগুলোও থাকবে।
: গাছ হতে ইচ্ছা করছে না। গাছের জন্ম বৃত্তান্ত বড় কঠিন। গাছে ফুল ফুটবে, ফল হবে। পাকা ফলের বীজ মাটির নিচে পড়বে, ওই মাটির শক্ত আবরণ ভেদ করে বের হওয়া। জল আর সূর্যের আলো শরীরে মেখে শত্রু-মিত্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। তারপর এক জায়গায় জীবনভর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা।

ভাবতেই ভয় করে!
: তাহলে পাখি হও?
: সে মন্দ নয়। কী পাখি!
: আবাবিল।
: আবাবিল অনেক ছোট। এতো উঁচুতে উড়ে বেড়ায়, তাকিয়ে থাকলে চোখ লেগে যায়। ওর শিস আর ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ ছাড়া কেউ কি দেখে ওর সবুজ শরীর।
: তাহলে আলবাট্রোস। দুটো বিশাল ডানায় ভর করে সমুদ্রের বাতাসে ভেসে বেড়াবে।
: তাও না। ও তো মৎসভোজী পাখি। মাছ আমার প্রিয় নয়। তাছাড়া অথৈ সমুদ্রের লোনা জলে ভেসে বেড়ানো, বসার ঠাঁই নেই।
: কেন, জাহাজের উঁচু মাস্তুলে বসবে।
: ওখানেও সুবিধা নেই। নাবিক আর ক্রুদের লোভী চোখ ফাঁকি দেওয়াÑ তা বড় শক্ত কাজ।
: তাহলে ছবি হবো আমি।
: সে আরো শক্ত কাজ।
: কেন?
: প্রাকৃতির সৃষ্ট কোনো কিছু ছবি নয়। মানুষ পাহাড়, আকাশ, মেঘ, নদী, চাঁদ, সূর্য।
: আর আমি!
: তুমি তো ছবির মতো সুন্দর।
: তাহলে ছবির গল্প বলো।
: শিল্পীদের ধারণা, প্রকৃতির সবকিছু ছবির মতো নিখুঁত নয়। ওই খুঁতগুলো চিহ্নিত করে, এর উপযুক্ত রূপায়ণ করে প্রকৃতির প্রকৃত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেন শিল্পী। ছবি নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর এ এক অসম শক্তির লড়াই। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর বলতে বোঝায়, প্রকৃতির সৃষ্টি আর ছবি এক নয়। ছবি হলো শিল্পী কতোভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন এরই শেষ ফল। এটি মোটেও শিল্পীর খেয়াল-খুশির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং শিল্পী উপায় বের করেন মাত্র। মূল প্রকাশের ভাষাটি সমাজের অবকাঠামোয় স্তরীভূত। সমাজের সচেতন ও অসচেতনতার মেলবন্ধন হলো ছবি। তাই ছবিই সমাজের আত্মা। ছবির গঠন যে বিষয়বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শিল্পী গ্রহণ করেন তা থেকে উদ্ভূত

ভাব নিয়েই ছবির জন্ম দেন। এই সম্পর্কিত সচেতনতা থেকে বোঝা যায়, বিশেষ যে তল থেকে শিল্পী ছবি তৈরি করবে তা সমাজ বিচ্ছিন্ন হলেও এর নিয়ন্ত্রক শিল্পী নিজে এবং নিজেকে কেন্দ্রে রেখে বস্তু বিশেষের সঙ্গে একমাত্রিক বাদানুবাদ থেকে তার ছবি জন্ম নেয়। এই একমাত্রিকতার দিকটির বিশে¬ষণ দেয়া যায় বিশ শতকের চিন্তা থেকেই। ইমানুয়েল কান্ট-এর ডিজইন্টারেস্টেডনেস বা নিষ্কাম দৃষ্টির তত্ত্ব বিশ্লে¬ষণ করে ব্রিটিশ সাইকোলজিস্ট অ্যাডোয়ার্ড বুলফ বলেছেন, বস্তুকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে দুটি বিষয় দরকার এবং কোনো একটি বস্তুকে এর প্রায়োগিক ব্যবহার থেকে দূরে মেনে নিয়ে একটি রোহিতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করা। দুই. এই রোহিতকরণের ফলে যে দূরত্ব জন্ম হয় ওই দূরত্ব থেকে অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা আবিষ্কার শুরু করা। তা ধনাত্মক একটি প্রক্রিয়া। এই চিন্তবিদ প্রথম প্রস্থ প্রক্রিয়ার দূরত্বের কম-বেশি হয় বলে দাবি করেন অর্থাৎ কখনো বস্তুর প্রতি নিষ্কামতার মাত্রা বেশি থাকে, কখনো কম। কান্টিয়ান দর্শনের নিষ্কাম দৃষ্টি দিয়ে দেখার যে নমুনা পাওয়া যায় এর প্রতিফলন উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের মার্কিন প্রকাশবাদীদের মধ্যে দেখা যায়। ড্রইং, রঙ, টেক্সার ছবির অনুভূতির দিকে নির্দেশ করে অর্থাৎ এই উপাদানগুলো নির্দেশবাচক বস্তু। এর মানে, ছবি মনের অনুভূতি নির্দেশ করে। সংগঠনবাদিতার মূল মনন ইমানুয়েল কান্ট বর্ণিত পথে আবিষ্কৃত হয়। বস্তুর সংগঠন কিংবা বুনটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এর সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বÑ এমনটি মনে করেন ইমানুয়েল কান্ট। উপস্থাপিত বস্তুর অনুপস্থিতিতে যে সংগঠন রয়ে যায়, বুনট স্পষ্ট হয়Ñ কান্টের মতে তা-ই ওই সভ্যতার মৌল পাওনা। এই চিন্তা পাথেয় করে গড়ে উঠেছে আধুনিকতাবাদীদের বিতরণ প্রক্রিয়া। ক্যানভাসের পরিসর থেকে অথবা এর ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়েছে বিষয়। প্রথমে পরিচিত বিষয়, পরে জ্যামিতিক বা বিমূর্ত বিষয়ও। এই বাদ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য তলটিই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা। রঙ হচ্ছে তলের মূল বিষয়, এমনকি টেক্টাইল ভ্যালুজ অর্থাৎ তলের চরিত্রও তা-ই মূল্যবান বলে বিবেচনা করা শুরু হয়। সৃষ্টিশীল দৃষ্টিতে বস্তু বা উপাদানটি অবলোকন ও বিশে¬ষণ করে ফর্ম সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে ড্রইং প্রস্তুত করার যে মৌলিক নীতি রয়েছে এর সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে শিল্পীদের ছবিতে। মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে প্রথমেই দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটি সুদক্ষ করতে বলা হয়েছে। শিল্পীর দৃষ্টিশক্তি কতোটা সুদক্ষ তা বলার অবকাশ নেই। প্রতিটি বিষয় বা বস্তু শিল্পী এমনভাবেই দেখেন যে, বস্তুর অবয়বগত খুটিনাটি অংশগুলো তার মনের মধ্যে প্রোথিত হয়ে যায় এবং তা তুলি বা ছেনির আঁচড়ে নির্ভুলভাবে প্রকাশ পায়। ছবিকে বুঝতে হলে এর মূল নীতিগুলো বোঝা জরুরি। পাঁচটি মূল নীতি হলো দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সুদক্ষ করা, নিজের কর্মনৈপুণ্যের উন্নয়ন সাধন করা, ছবির প্রচ্ছন্ন সৃষ্টিধর্মিতা অবলোকনকল্পে ফর্মের সুন্দর আকার-আকৃতি সম্পর্কে নিজের কর্মনৈপুণ্য বুদ্ধি করা, ফর্ম যে স্ট্রাকচার বা আকার-আকৃতির ওপর নির্ভরশীল তা সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরার বিষয়টি অনুধাবন করা। এ পাঁচটি মূল নীতিতে যেসব তথ্য সন্নিবিশত হয়েছে এগুলো সাধারণ মানুষের আওতার বাইরেই থেকে যায়। যারা সাধারণ তাদের দেখার পালা। আর শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ দর্শকের দেখানোর।

কারণ সাধারণ দর্শকের চেয়ে কোনো শিল্পী বহির্দৃষ্টিতে যেমন দেখেন তেমনই অন্তর্দষ্টিতেও দেখে থাকেন। ফলে তার দেখায় নুতন নতুন আকার, ফর্ম, রূপ ইত্যাদি উঠে আসে। মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন করে দেখতে শেখায়। মানুষকে যা নাড়া দেয়Ñ এমন বিষয় খুঁজে বের করাই হচ্ছে কোনো শিল্পীর দায়িত্ব। ছবি এক অপূর্ব বিদ্যা যা একমাত্র বিশেষ প্রতিভার দিয়েই নির্মাণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে সেটিকেই ছবি বলা হয় যার বিকাশ অথবা প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে চালিত নয়, বরং একটি সুকুমার বোধ ও কল্পনা প্রতিভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের আদিমতম ছবিতে এর প্রথম জয়যাত্রার আনন্দ এবং উৎসাহের প্রভা ও তেজ দেখা যায়। জড়তা থেকে মুক্তি দেয়া আনন্দ ও ভোগের অধিকার দেয়া এবং মানুষকে ক্ষমতাবান করে তোলা, রস এবং রূপ সৃষ্টি বিষয়ে এই হলো ছবির মূল উদ্দেশ্য। আধুনিককালের অনেক সমালোচক ছবির তত্ত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা শিল্পীর কাছে একটি নির্বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির আশা করেছেন। ছবিটি মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত। প্রাচীন থেকে আধুনিকাল পর্যন্ত ছবিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অবশ্য ছবির প্রকৃত সংজ্ঞা নির্ণয় খুবই দুরূহ যা মুহূর্তে মুহূর্তে মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে গোলকধাঁধায় ফেলে। ছবি হতে পারে ধ্যান, ভাবনা, কল্পনা বা বিস্ময়ের প্রকাশ। বৈদিক ঋষিরা তাদের সুর্যমন্ত্রে বর্ণনা করেছেন, ছবি হলো ব্যক্তিত্বের লুপ্তি ও আবেগর প্রস্থান। আধুনিককালে মনস্তাত্ত্বিক গবেষকরাওÑ যেমন গেস্টাল্ট থিওরিতে বলা হয়ে থাকে, ছবি হলো মানব জীবনের আবেগ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি সবকিছুর মিলিত এক প্রত্যয় যা মানুষকে অপার্থিব জগতের দিকে নিয়ে যায়। অকাল্ট ম্যাজিক বা মিস্টিসিজম ইত্যাদি বিষয় প্রাচীন ছবির উৎসমুখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছবি অনুকরণ অর্থাৎ ইমিটেশনের প্রসঙ্গ সুপ্রাচীন। গ্রিক শব্দ ‘মাইমেসিস’ ইমিটেশন বা অনুকরণের অনুকরণ। আরেকটি তত্ত্বে ছবি হলো ইশ্বর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিরূপ হিসেবে যে বিশ্ব সংসার তৈরি করেছেন ওই বিশ্ব সংসারেরই দ্বিতীয় প্রতিরূপ হচ্ছে ছবি। ছবির প্রেরণা হিসেবে তাঁর ধারণা ছিল, শিল্পী ছবি সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। শিল্পীর অন্তরে তাঁর নিজস্ব ‘এসেনশিয়াল ক্রিয়েটিভ স্পিরিট’টি অবিশ্বাস করলে এবং ঐশ্বরিক প্রেরণাজাত কোনো বিশেষ তাগিদ শিল্পীর ওপর ভর করলেই ছবি সৃষ্টি সম্ভব। ছবি দর্শনের ক্ষেত্রে এবং ছবির তত্ত্ব বিষয়ে প্রতীচীর দার্শনিকদের অবদান সুদূরপ্রসারী। গ্রিক দার্শনিকরা ছবিকে ভেবেছিলেন অসত্যের জগৎ হিসেবে। কেননা ছবি হচ্ছে ‘বিশেষ প্রতিভাস’-এর অনুকরণ। কিন্তু কেউ আবার ছবিকে সত্যের আধার রূপ ভেবেছিলেন অর্থাৎ ছবির মাধ্যমে মানুষ জীবনের এমন কয়েকটি শাশ্বত অথচ নির্দিষ্ট মূল্যবোধে পৌঁছে যা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অনুকরণ বিষয়ে ভিন্ন ধারণা হলো, অনুকরণ একটি ব্যাপক বিষয় অর্থাৎ শিল্পী নিছক অনুকরণ করে না, বরং এমনভাবে অনুকরণ করতে সচেষ্ট হয় যেখানে বিষয়টি শিল্পীর কল্পনার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে একটি নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটায়। ছবি হলো দৃষ্টিগোচরতায় পৃথিবীকে অনুভব করার এক আবেগময় কৌশল। ছবি একটি ব্যাপক শব্দ। এ কারণে অবস্থানগত বিভক্তি ও ছবির দর্শনে সীমারেখা নির্ণয় খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। কারণ ছবি কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ব্যাপার নয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সভ্যতার ঊষালগ্নে ছবি গুহামানবের জীবন সংগ্রামের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ছবি ছিল পারলৌকিক সাফল্যের চাবিকাঠি। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থায় ছবি ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাচ্য ঐতিহ্যে ইহলৌকিক নির্বাণ লাভের প্রয়োজনে ধর্মীয় কর্মকা-ের অঙ্গ হয়েছে ছবি কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ছবি শব্দটি প্রায় মানব সভ্যতার মতো সুপ্রাচীন। মানুষ যেদিন থেকে শিল্পচর্চা শুরু করেছিল ওইদিন থেকেই মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের গণনা শুরু। প্রাচ্যের ঋষিদের ধারণায় ছবি প্রত্যক্ষরূপে বহ্মস্বরূপের সঙ্গে একাত্ম যার উৎস আনন্দে এবং পরিশেষও আনন্দে। প্রাচ্যেও ছবিতে ইন্দ্রিয় সংবেদনশীলতার সাহায্যে দর্শকমনে অতীন্দ্রিয় জগৎ আলোড়িত করে, মানুষের খ- ভাবনার অপূর্ণতাকে ভরিয়ে তোলে প্রতীক ও সাদৃশ্যের মাধ্যমে। অনুকরণবাদও প্রাচ্যের আচার্যরা সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে অনুকরণ, অনুদর্শক, অনুকীর্তন শব্দের উল্লে¬খ রয়েছে। ছবির সূত্রেও বলা হয়েছে ‘যথা নৃত্যে তথাচিত্রে তৈলোক্যানুকৃতিঃস্মতঃ’। নন্দনতত্ত্বের আধুনিকতম মতবাদের স্রষ্টার মতে, ছবির সঠিক সংজ্ঞা হলো ছবি সংজ্ঞা বা প্রতিভা নির্ভর। ছবির উপস্থিতি চিন্তার জগতে নয়, বোধের জগতে। ছবি সত্যের সঠিক অনুলিপি নয়, প্রতীক মাত্র। ছবি এক প্রকার আত্মপ্রকাশ হলেও বিচার ও সঞ্চারের বিষয় হিসেবে শিল্পীর আত্মচরিত্র থেকে তা স্বতন্ত্র। ছবির শৈলীই শিল্পী। শিল্পীর চরিত্র যে কীভাবে শিল্পে প্রকাশিত হবে এর কোনো নির্দিষ্ট সাধারণ নিয়ম নেই। শিল্পীর ছবিতে আধুনিকতার অন্য এক মাত্রা আছে যেখানে সমন্বয় সাধনাই সব নয়। আধুনিক মনন ও জীবনের মধ্যে আছে অনেক তমশালীন গহ্বর। অনুদ্ঘাটিত ওই রহস্যময়তা সৃষ্টি জগৎকে আলোড়িত করেছে ছবি। প্রকৃতির উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও ছবি বিমূর্ততার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়। অভিব্যক্তিমূলক বিমূর্ততার একটি ধারায় নিঃসর্গ বিমূর্তায়িত হচ্ছে আবার জৈবিক কোনো রূপবন্ধ ভেঙে ভেঙে বিমূর্ততার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিমূর্ততার সঙ্গে প্রকৃতিগতের মূল পার্থক্য এই যে, আঙ্গিক-প্রস্থান হিসেবে ততোটা প্রতিবাদের প্রেরণায় এর সৃষ্টি ও বিকাশ নয়। এর দুর্বলতার ক্ষেত্র সেটিই যেখানে প্রতিষ্ঠিত আঙ্গিক গ্রহণ করা হয়েছে। তা অনুপ্রেরণায় নয়Ñ নতুনত্ব ও অভিনবত্বের প্রত্যাশায়। এর কারণ হয়তো ছবির আত্মপরিচয় সন্ধানের পথপরিক্রমাতেই নিহিত আছে। ছবির রস আস্বাদনে শিল্পীও সাধারণ দর্শকের যে চেতনার পার্থক্য তা তার অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকেই হয়ে থাকে। পদ্ধতিগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, মননশীলতা ও সৃজনশীল মনের জারকরসে যে কোনো বস্তু বা ভাবকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জনের মাধ্যমে নানানভাবে উদ্ভাসিত করে তুলতে পারেন কোনো শিল্পী। এই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে কোনো দর্শকের অংশগ্রহণ বাস্তব কারণে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে কোনো দর্শকের যে ব্যাপারটি নিতান্ত প্রয়োজন তা হচ্ছে শিল্পকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা। ছবি যেহেতু একটি দৃশ্যমান ব্যাপার সেহেতু দেখার চোখটি তৈরি থাকা চাই। আধুনিক ছবিতে অভিনব বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হতে কোনো দর্শকের চোখটি যেমন তৈরি হয়ে ওঠে তেমনি তার অভিজ্ঞতার ঝুলিটিও ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে ওঠে। দর্শকের অভিজ্ঞতার ভা-ারটি যতোই স্ফীত হতে থাকে ততোই ছবির আপাত অদ্ভুত বস্তুগুলোর সামনে থেকে অদৃশ্য মায়াবী পর্দা সরে যেতে থাকে। তখন আর বিমূর্তচিত্র অজানা গ্রহের কিম্ভূত বস্তু মনে হয় না, আধুনিক ছবি মনে হয়, চিরচেনা ছবি।
: এ তো কঠিন গল্প। আমাকে বরং তুমি ছবি এঁকে দেখাও।
: কিসের ছবি।
: আমার ছবি।
: ছবি আঁকতে কাগজ, রঙ, তুলি, ইজেল, বোর্ডÑ কতো আয়োজন। তারপর...।
: তারপর কী!
: যার ছবি আঁকা হবে, আমাকে সে ভালোবাসে কিনা তা জেনে নিতে হবে। তবেই হবে ছবি।
: আমি তো তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি যা জানো এর চেয়ে বেশি।
: পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হবে।
: পরীক্ষা দিলে নির্ঘাত ফেল করবো। তবে ছবি আঁকার কায়দা শিখিয়ে দিতে পারি।
: তুমি শিখিয়ে দেবে ছবি আঁকার কায়দা?
: কেন নয়। আমার সাদা শাড়ির আঁচলে আঁকবে তোমার ছবি। আমার লম্বা চুলের বেণীর ডগা তোমার তুলি। বৃষ্টির জল আর তোমার মনের সব রঙ মিশিয়ে হবে জলছবি।
: কী আশ্চর্য তোমার ছবি আঁকার কায়দা। আমাকে অবাক করলে তুমি। এভাবে কখনো ভাবিনি! ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করেছ।
: ছবি আঁকার কায়দা তোমার পছন্দ হয়েছে?
: হ্যাঁ হয়েছে। তবে তোমার ছবি নয়, শাড়ির আঁচলে নদীর বুকে আকাশের ছবি আঁকি।
: না, তা তো চিরচেনা ছবি হবে।
: তাহলে কিসের ছবি আঁকবো?
: আমার দুঃখের ছবি এঁকে দাও।
: দুঃখের ছবি বুঝি আঁকা যায়! বরং নীল পদ্মের ওপর প্রজাপতির পাখার ছায়ায় তুমি ঘুমিয়ে আছÑ এঁকে দিই।
: ওই ছবির দরকার নেই। আমি তো রাজার মেয়ে নই!
: তুমিও রাজার মেয়ে।
: মিথ্যা কেন বলো তুমি? তোমার মুখে মিথ্যা মানায় না।
: তাহলে ঘোড়ার ছবি আঁকিÑ নীল অভ্রের ডানা।
: এঁকে দাও ঘোড়ার পিঠে তুমি।
: আমি তো রাজপুত্র নই।
: তুমিও রাজপুত্র। শিল্পীরা ছবির রাজপুত্রÑ দ্য ব্লু রাইডার। ওই চেয়ে দেখো নীল মেঘের ভেতর থেকে ছুটে আসছে।
: নীল অশ্বারোহী!
: হ্যাঁ, নীল অশ্বারোহী। তুমিই তো অশ্বারোহী।
: আর তুমি?
: ওই নীল অশ্বÑ তোমার ছবি!

 

বাংলাদেশের শাখা শিল্প ও শঙ্খ সমুদয়

বিলু কবীর

 

 


আমরা সাহিত্য বলতে স্বভাবত এক ধরনের লেখা বা পাঠ রচনা বুঝি। কিন্তু ‘সাহিত্য’ শব্দটি ব্যুৎপত্তিগত পটভূমিকায় ব্যাখ্যা করতে গেলে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয়ই সাহিত্য। ‘সাহিত্য’ শব্দটি এসেছে ‘সহিত’ থেকে। অতঃপর যা কিছু আমাদের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রভাবক ও প্রভাবিত তা-ই আসলে সাহিত্য। এই যদি হয় বাস্তবতা তাহলে কি সাহিত্য ওই জটিলে না গিয়ে প্রধান ও সরল প্রশ্ন দাঁড়াতে পারে যে, কী সাহিত্য নয়। এই অর্থে শামুক-ঝিনুক-শঙ্খ বিষয়ে সব আলোচনা এক কথায় ‘শঙ্খ সাহিত্য’ বললে বেমানান তো হয়ই না, বরং বেশ মানিয়েই যায়। তা করতে গেলে অবাক হয়ে দেখতেই হবে, সামান্য গুগলি-কড়ির মতো আপাততুচ্ছরা আমাদের সৌন্দর্য বোধ, লোকবিশ্বাস, ধর্মাচার, রূপকথা, মিথ-পুরাণ, চারুশিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি, খাদ্য অভ্যাস, চিকিৎসা, নির্মাণ, গদ্য-পদ্য ইত্যাদিতে কী ব্যাপক পরিমাণে জায়গা দখল করে আছে।

ঝিনুক, শঙ্খ প্রাণী হিসেবে বিস্ময়কর। এর বহিরাবরণ যেমন কঠিন, ভেতরটিও তেমনই নরম থলথলে। অতো নরমটি সুরক্ষা দিতেই কী প্রকৃতি এর বাইরে অমন শক্ত পাঁচিল করে দিয়েছে! এর দৈহিক গড়নে রকমফের, রঙ-বর্ণে বিস্ময়কর চারু সৌন্দর্য তো রয়েছেই। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটির বৈপরীত্য ও স্বকীয়তা বিদ্যমান। যেমন এর প্রতিটিরই খোলস শক্ত। কিন্তু সব খোলসের দরজায় পাল্লা নেই। বিশেষ করে এটি ডাঙার শামুকে দেখা যায়। শামুক যখন আত্মরক্ষার্থে বা ঘুমুনোর জন্য ওই দরকারি পাল্লাকে ছিটিয়ে দেয় তখন ভেতর থেকে এমনভাবে খিল এঁটে নেয়ে যে, সে ছাড়া অন্য কেউ তা খুলতে পারে এমন কার সাধ্যি আছে! কারো কারো আছে চিংড়ির মতো লম্বা লম্বা নলো হাত-পা। কারো আছে পা বিহীন চেটো জাতীয় চলৎশক্তি। কারো শিং আছে, চুলের মতো এঁটো ঝিল্লি-ইন্দ্রিয় আছে, কারো বা নেই। কারোর খোলসজুড়ে কতো রকেমের কাঁটা, কারো গা তেলা-মসৃণ। কেউ বহু কোণা, পেছনটি সুচালো। কেউ কোণাহীন, পেছনটি দস্তুর মতো বোঁচা, ঢ্যাপা গোলাকার। কারো কারো বহু বর্ণ, কারো এক বর্ণ, কেউ নিতান্তই বিবর্ণ। এগুলো বিস্ময়কর, ভয়ঙ্কর ও অভয়ঙ্কর।
ঝিনুক, শামুকের চরিত্র-চারিত্র্য ও স্বভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যে এর অনেক প্রয়োগ দেখা যায়। বিশেষ করে লোকছড়া, ধাঁধা, সংগীত ও বাগধারায় শামুক-ঝিনুক-শঙ্খের একাধিক উল্লেখ মেলে। যেমন ‘মামারাই রাঁধে-বাড়ে/ মামারাই খায়;/ আমরা গেলি পরে/ ঘরে দুয়ের দেয়।’ যে প্রজাতির শামুকে দরজায় পাল্লা পদ্ধতি আছে সেগুলোর আচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্দেশক ওই ধাঁধাটি বাঙালির লোকছড়ায় সমৃদ্ধি, মূল্যবান ভাব সম্পদ ও প্রাকৃতিক কুশীলবের সৌন্দর্য তুলে ধরেছে। ‘হাটে মা টিমটিম/ তারা মাঠে পাড়ে ডিম/ তাদের খাড়া দুটো শিং/ তারা হাটে মা টিমটিম।’ ডাঙার আটপৌরে শামুক নিয়ে অজ্ঞাত প্রাচীন কবির রচনায় ওই পুরনো লোকছড়াটি বাঙালি মাত্রেরই মুখস্থ। শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালিদের উচ্চারণের ছান্দসিক কোষে ছড়াটির প্রথম পঙ্্ক্তি ‘হাটে মা টিমটিম’ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাট্টিমা টিমটিম’। ফলে এর অর্থ উদ্ধারের ব্যাহতিটাই জটিল হয়ে পড়েছে। মূলত এটি শামুক নিয়ে সুরচিত একটি লোকছড়া। এক ধরনের স্থলচর একরঙা শামুক যা বয়েসী বাঙালির গেঁও জীবনের পরিচিত না থেকেই পারে না। এই শামুকগুলো আকারে সামান্য বড়। এর খোলস পেছনের দিকে চোখা ও রঙ সাদা-বেগুনে ছোপ। এগুলো টিমটিমে গতিতে স্যাঁতসেঁতে মাঠে চলে-ফেরে। অতি মিনমিনে গতিতে যখন এগুলো চলে তখন এর মাংসল মাথায় মাংসেরই দুই প্রস্ত শিং দৃষ্টিগোচর হয়। বলাই বাহুল্য, এগুলোর মাঠেই ডিম পাড়ে। তবে মাঠের মধ্যে নয় ধারে-কিনারে, নিচু ডোবা, আড়ালে-নিভৃতে এবং পরিমাণে ঢের। শামুকের শ্লথের গতির সঙ্গে ধীরগতি তুলনীয় বলে বাংলা বাগধারায় ‘শম্বুক গতি’ বলে একটা কথার চল রয়েছে। ‘সাগরপাড়ে কুড়াই ঝিনুক মুক্তা মেলে না। কতো লোকের আনাগোনা তুমি এলে না।’ বয়সী বাঙালির কে না জানে, ভালোবাসার বক্তব্যে সমৃদ্ধ এই সাগরিকা ঝিনুক।
‘শাঁখের করাত’ বাঙালির আরেকটি চিরায়ত ও বহুল পরিচিতি বাগধারা। এটি সামাজিক-রাজনৈতিকসহ বহু ক্ষেত্রে উদাহরণ। টিপ্পনি, কটাক্ষ হিসেবে উচ্চারিত ও ব্যবহৃত হয়। অন্য যে কোনো করাতের চেয়ে শাঁখারি শিল্পীদের ওই করাতের বিস্ময়কর ব্যতিক্রম হলো, এটি উল্টালেও কাটে, টানলেও কাটে। দেখতে অর্ধচন্দ্রের মতো ওই করাত দড়িতে ঝুলিয়ে দুই হাতে ধরে কোনো শাঁখারি শঙ্খের গয়না ইত্যাদি বানাতে ওই করাত ব্যবহার করে থাকেন।
বাংলার ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রকৃতিতে অনেক পাখি আছে। এগুলোর নামকরণ হয়েছে তাদের চরিত্রের প্রধান চারিত্র্যের পেিরপ্রক্ষিতে। মাছরাঙা,
কাঠঠোকরা, গাঙশালিক, মৌটুসী, কাদা খোঁচা প্রভৃতি। এমনই তিনটি পাখির নাম হলো শামুকভাঙা, শঙ্খচিল ও শামুকখোট। শক্ত ঠোঁটে এগুলো শামুক ভেঙে খায়। এগুলোর ঠোঁট শক্ত, বড় ও সুচালো। ‘বানরের গলায় মুক্তার মালা’ বাঙালির আরেকটি সামাজিক অর্থবাচক বাগধারা। এর সঙ্গে শঙ্খ-শামুকের যোগ রয়েছে।
কোনো কোনো শামুক-ঝিনুকের খোলসের দরজা আছে, পাল্লা নেই। কোনো কোনোটায় পাল্লা আছে। কিন্তু যে কথা বলার জন্য এখানে এতোটা
ইনানো-বিনানো তা হলো, এক কিছিমের ঝিনুক আছে যেগুলোর শরীরের পুরো খোলসটাতেই দরজার দুটি সমান পাল্লার মতো। একেবারে সমান দুটি বাটির কৌটাসাদৃশ। বন্ধ করলে কারো সাধ্য নেই তা খোলে। আবার যেগুলোর খোলসে দরজা আছে, পাল্লা
নেই সেগুলোর দরজা খোলা বটে কিন্তু এর মধ্যে খোলসের মালিক, মানে গেরস্ত একবার যদি ঢোকে তাহলে কারো ক্ষমতা হবে না সেটিকে বের করা যদি না নিজ থেকে বের না হয়।
শঙ্খ-শামুক-ঝিনুকের অনেক গুণাগুণ রয়েছে। ‘গুণাগুণ’ বলতে এগুলোর মধ্যে গুণ তো আছেই, অগুণও রয়েছে। হ্যাঁ, এটি মনে রেখেই শব্দটির ব্যবহার করেছি। ‘পঁচা শামুকে পা কাটা’ বলে একটি অতি প্রাচীন বাগধারা রয়েছে বাংলা সাহিত্য বাস্তবতায়। এর মধ্যে অতীতের সমাজচিত্রের অনেক বিশ্লেষণযোগ্য সংবার্তা রয়েছে। জলাভূমির প্রাচুর্য, শামুক-ঝিনুকের আধিক্য, বাঙালির নগ্ন পায়ে হাঁটা-চলা, নিচু জমিতে চাষাবাদ, পচা শামুকে পা কাটলে এর ক্ষতে অধিক ভোগান্তি হয়। আরো অপকারিতা আছে এর। অসাবধানতাবশত বেশি চুন খেয়ে ফেললে জিভ মুখ পুড়ে যায়। বাঙালির একটি বাগধারাই রয়েছে ‘চুন খেয়ে গাল পুড়েছে দই দেখে ভয়’। এর মানে, গোয়াল পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘে ভয় আর কী! ব্যাখ্যা সামান্যই। কিন্তু উদাহরণ প্রয়োগ এবং সামাজিক অর্থব্যঞ্জনা গভীরভাবে জীবন স্পর্শী। কালী দাস প-িত নাকি খাল-বিল-ডোবা হেঁটে পার হওয়ার সময় জুতা পরতেন, অন্য সময় খালি পা। কেন! কারণ জলের মধ্যে কোথায় যে পচা শামুক আছে তা

উল্লেখ করা দরকার, পৃথিবীতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ প্রজাতির শঙ্খ-ঝিনুক রয়েছে যেগুলোর সবই সামুদ্রিক। এর বাইরে রয়েছে স্থলবাসী ও অন্যবিধ জলাশয়ের ওই জাতীয় অমেরুদ-ী। এগুলোর খোলস পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো বা হয়। যেহেতু এখানে কথা উঠেছে সেহেতু জানা দরকার, আকৃতিতে প্রকৃতিভেদে এগুলোর লম্বায় ০.১ থেকে ১৩৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। আর ওজন? পুঁথির একটি দানার মতো ক্ষুদ্রাকার থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হতে পারে একটি ঝিনুকের। এর মধ্যে কয়েকটি বছরে ৫০ কোটির মতো ডিম পাড়ে। তা থেকে ঘণ্টা দশেকের মধ্যে বাচ্চা বা বাবুসোনারা জন্মগ্রহণ করে। এগুলোর ৬ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে বলে তথ্য পাওয়া যায়। কোনো কোনোটির চোখ-মাথা আছে, কোনোটির নেই। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিস্ময়ে ভরা হলো, এগুলোর যৌনজীবন বা আতœউপগত হওয়ার বিষয়টি। এক্ষেত্রে কেঁচোর সঙ্গে এর মিল রয়েছে। কেঁচোর যেমন নারী-পুরুষ হয় না, এগুলোরও তা-ই। কেঁচো যেমন আত্মসঙ্গমী, নিজে নিজের সঙ্গে রতিরমণে মিলত হয়, শামুক-শঙ্খও তেমনই। তাই এগুলোকে বলা হয় এক লিঙ্গ বা বহু লিঙ্গ। একই দুই বলে একাই উভয়। আবার উভয়ই এক বলে একা! নিজেই নিজের বউ আবার নিজেই নিজের স্বামী। প্রকৃতি এগুলোর এই বৈধতা দিয়েছে। উভয়লিঙ্গ, জেন্ডার ভারসাম্য।

শাঁখ বা ঝিনুক যে প্রাকৃতিক মুক্তার উৎপাদক এ বিষয়টি বাংলার নিসর্গ, সাহিত্য, বাণিজ্য এবং যাকে বলে ঐতিহ্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শাঁখ বা শঙ্খ দিয়ে যেসব গয়না প্রস্তুত করা হয় এর যে কারুমূল্য, কুটির শৌল্পিক ঐতিহ্য এ বিষয়টি পৃথক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। আবার ধর্মীয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও পৌরাণিক মিথের সঙ্গে এবং আমাদের সনাতন ধর্মে শঙ্খের অনেক যোগ রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরও উল্লেখ করে বলতে গেলে ১৯৪৭ সাল-পূর্ব স্বরাজ আন্দোলনে শঙ্খানাদি বা শঙ্খধ্বনির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ভূমিকা ছিল।
শাঁখের গয়নায় গৌরবের মুক্তা ব্যবহার করতে আমাদের আনন্দের শেষ থাকে না। কিন্তু মুক্তায় আসলে ঝিনুকের কতোটা দুঃখ-কষ্টের ফসল তা যে এর কতোটাই বেদনার লালা, কতোটাই অন্তর্বেদনার জমাট অস্থির পাথর এ কথা ক’জন ভাবে! ঝিনুকের কোনো স্বাভাবিক প্রসব নয় মুক্তা। দুর্ঘটনাবশত ঝিনুকের দেহের ভেতরে যখন কোনো শক্ত বস্তু বিঁধে (বালিকণা, ধারালো পাথরকুচি, হাড় বা অন্য কিছু আটকে যায়) তখন ঝিনুকটি আহত ও বেদনাদগ্ধ হয়। বেশ কিছুদিন ওই ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণাসহ অনেক কষ্ট করে চলে। তখন ওই বস্তটি উগড়ে দেয়ার জন্য তার অঙ্গারাভ্যন্তরেই একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিঁধে যাওয়া দানাটির আকর যতো বড় হয়, ঝিনুকের ওই প্রক্রিয়াটিও ততো দীর্ঘদিনের হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি হলো ঝিনুকের ক্ষতস্থানে এক ধরনের লালা নিৎসরিত হয়ে ওই কণা বা দানা আবৃত করে করে একটা গোলাকার কিংবা প্রায় গোলাকার কঠিন পি- তৈরি করে এবং এক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা ঝিনুকের দেহ থেকে বিযুক্ত হয়। এটিকেই আমরা মুক্তা হিসেবে কুড়িয়ে পাই। এর মসৃণ ওপর পিঠে সুন্দর মনোহারিত্বের একশেষ। ঈষৎ গোলাপি দুধেল হয় এর চকচকে শরীর। বাংলাদেশে এক ধরনের নীলাভ বহু মূল্যবান মুক্তা কদাচিৎ পাওয়া যায়। বিল অঞ্চলের এক বিশেষ প্রজাপতির সিঞ্চন এই নীল পাথরের উৎপাদক। আধুনিককালে যে মুক্তার চাষ হয় তাও পদ্ধতিগতভাবে একই। এটি নিরীহ ঝিনুকগুলোর ওপর অমানবিক অত্যাচারেরই এক নিষ্ঠুর অর্জন। মানুষ কৃত্রিমভাবে ঝিনুকের ভেতরাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি করে ওই ক্ষতে বালিকণা, পাথরকুচি বা ছোট কাচের টুকরো ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এবার নিরূপায় ঝিনুক যন্ত্রণাকতর হয়ে যথানিয়মে বেদনার লালায় ওই বর্জ্যটি মুড়িয়ে মুড়িয়ে মুক্তা নামের মণি নির্মাণ করে।

শাঁখার বিষয়টিও আলাদাভাবে আলোচিত হওয়া সমোচিত। শঙ্খ কেটে শাঁখা বা এক ধরনের বিশেষ চুড়ি বানানোর যে প্রাচীন শিল্প, শাঁখারি শিল্প হিসেবে তা বাঙালির অতি পুরনো একটি লোকারুর সাক্ষী। সনাতন হিন্দু ধর্মে ওই শাঁখা-সিঁদুরের বিশেষ সামাজিক বিষয়ের অভিব্যক্তি রয়েছে। মোটা সাদা শঙ্খ কেটে ওই চুড়ি তৈরি করা হয়। শঙ্খর ডায়া যতো চিকন বা মোটা হয়, তা চাক চাক করে কাটলে চুড়ি ততো চিকন বা মোটা হয়ে থাকে। যখন তা খুব চিকন নলের মতো তখন কাটলে কব্জির চুড়ির বদলে আঙুলের আংটি হয়। ওই কাটাকুটির জন্য যে করাতটি ব্যবহার কা হয় এরই ঐতিহ্যবাহী নাম ‘শাঁখের করাত’। করাত লোহার। কিন্তু শাঁখ কাটার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে ওই রকমের নাম। ওই করাতের বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। এভাবে কাটার পর এতে নকশা আঁকা হয়। ওই নকশা আঁকতে নরুনের মতো ছোট বাটালি এবং এর অনুপাতে হাতুড়ি ব্যবহার করা হয়। এ থেকেই বাঙালি হাতির দাঁতে নকশা খোঁদাইয়ের কাজে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বিশেষত মানকা হাতির কচি দাঁতে নকশা কাটা এবং শাঁখা অলঙ্করণের ধারণাটি একই। অবিভক্ত ভারত আমলের আসাম সংলগ্নতা ব্যাহত হওয়ার পর বাংলার ওই দ- শিল্পের উঠতি কারুশিল্পের বিকাশ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। পলিশ করা শাঁখায় আলো পড়লে এক ধরনের ঈষৎ গোলাপি-নীলচে রঙধনুর তির্যক মৃদুতা খেলে যায়। হিন্দু নারীর সিঁদুর ও শাঁখা পরার বিষয়টি তার সধবা অবস্থার পরিচায়ক। বয়েসি নারীর হাতে শাঁখা ও কপালে সিঁদুর না থাকলে বুঝতে হবে তিনি বিধবা। আর কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ওই শাঁখা ও সিঁদুরের অনুপস্থিতির মানে হলো মেয়েটি অবিবাহিত। এর সঙ্গে কুসংস্কার ও প্রথা বিশ্বাসের যোগ রয়েছে যে, বিবাহিত নারীর পক্ষে শাঁখা না পরা এবং বিধবার পক্ষে শাঁখা পরা অমঙ্গলের সূচক। বিশেষ করে বিবাহিতার হাত শাঁখাশূন্য হলে স্বামীর আয়ুক্ষয় বা অন্যান্য অমঙ্গল হয় বলে পৌরাণিক মিথ রয়েছে। শাঁখা নিয়ে আরো কিছু লোকবিশ্বাস বাঙালির প্রাচীন জীবন থেকে চলে আসছে। গর্ভবতী গাভী এবং সদ্য প্রসূত বাছুরের গলা একপ্রস্থ সুতায় এক চাকতি শঙ্খখ- বালার মতো করে ঝুলিয়ে দিলে গাভী-বাছুরের জাদু-টোনা, ছুৎ, নজর লাগা, ভূত-প্রেতের আশ্রয়ী ইত্যাদির প্রতিরোধ হয়। হারের লকেটের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া ওই শঙ্খখ-কে শঙ্খবচলয় বলা হয়। আরো একটি গ্রামীণ নাম আছে, মনে করতে পারছি না। অন্যদিকে নকশি কাজ করা সোনার পাত গেঁথে দিয়ে ঝিনুকের লকেট তৈরির শিল্পকৌশল বাঙালি মণিকারের বহু পুরনো সোনারু কর্ম। শঙ্খের পলার ওপর কাজ করা স্বর্ণের পাত বসানো কিংবা স্বর্ণের ওই পাতে মিনা করাও বাঙালির প্রাচীন স্বর্ণ-শঙ্খ শিল্পের ঐতিহ্য। ওই দক্ষতা প্রসঙ্গে এ কথা বলা যেতে পারে, আমাদের মণিকাররা স্বর্ণকারের অন্য নাম যে ‘শেঁকরা’ এটিও এসেছে ‘শাঁখারি’ থেকে। এ শাঁখারির মাতৃশব্দ হলো শঙ্খ  শাঁখ  শাঁখা। শাঁখারি হচ্ছে ওই জাত বংশ যারা শঙ্খজাত গয়নাপত্র বানিয়ে পুরুষ পরস্পরায় জাতি ব্যবসা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাই বলা যেতে পারে, বাঙালি হিন্দু জাতিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শঙ্খের মাটি, স্বর্ণ, জাল, লোহা, তাঁতের মতো একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যেমন শাঁখারি চুনারি বা চুনে তারা বংশীয় পদবিপ্রাপ্ত হয়েছেন মূলত শঙ্খ কিংবা ঝিনুক থেকে। সুন্দরবন অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে ‘শামুক খোটা’ নামে একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওই গোত্রের মানুষ সুন্দরবন থেকে শামুক, ঝিনুক, শঙ্খ সংগ্রহ করে জীবিকানির্বাহ করে থাকে। যেমনটি বাওয়ালিরা গোলপাতা, মাওয়ালিরা মধু ও মোম সংগ্রহের কাজ করে থাকেন ঠিক ওই রকম।
শঙ্খধ্বনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়। গায়ত্রী সন্ধ্যায় শাঁখ বাজানো গৃহস্থের জন্য বিশেষভাবে মাঙ্গলিক। ওই শঙ্খবিধানির বিষয়টি এতোটাই বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করা হয় যে, তা এখনো অলঙ্ঘনীয় ধর্মাচার হিসেবে পরিগণিত। হিন্দু ধর্মের কোনো কোনো দেব-দেবী ওই শঙ্খ বা মহাশঙ্খ ধারণ করেন। যেমন বিষ্ণু ভৈরবি, কামাখ্যা, বরাহ, কুর্ম, সূর্যসহ কেউ কেউ। বিশেষ করে বিষ্ণু শঙ্খ, ক্রি, গদা ও পদ্ম ধারণ করেন বলে তার একটি নামই হয়েছে ‘শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী’। বিয়েতে ওই শাঁখ বাজিয়ে নবদম্পতির জীবনের সামগ্রিক মঙ্গল নিশ্চিত করা হয়। যখন ওই শঙ্খনাদকে আশীর্বাদ হিসেবে স্বর্গীয় বিবেচনা করা হয় আবার বাতাসের বিপরীতে মুখ দিয়ে ধরে শাখের পেছনের ছিদ্রে কান পাতলে যে সোঁ সোঁ গভীর আওয়াজ শ্রুত হয় তখন তা নাকি সমুদ্রের নাদ বা ক্রন্দন। এ বিষয়ে লোকবিশ্বাস নির্ভর কিংবদন্তি বা লোককাহিনীর চল রয়েছে যে, এই শঙ্খশব্দ নাকি শাঁখের সমুদ্র ব্যঞ্জনার হাহাকার রোল। আসলে শঙ্খ খোলসের মধ্যে কয়েকটি প্যাঁচ থাকে। এর ভেতর দিয়ে গতি সম্পন্ন বাতাস নির্গত হতে বাধা পায় বলেই এমন গোঙানির শব্দ হয়।


রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শঙ্খের ব্যবহার বিষয়ের অর্থটি নিশ্চয়ই বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবীর শঙ্খ ধারণের যে পৌরাণিক ঘটনা তা মূলতই রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ সংক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য, রাজনীতিতে রাজনীতিই। যুদ্ধ, জয়, রাজ্য, সিংহাসন, স্বর্গবিচ্যুতি এসবও অতি অবশ্যই রাজনৈতিক বিষয়। আবার তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে শঙ্খধ্বনিও আজকের কিউগলেরই নামান্তর। যা সর্বতভাবেই রাজনৈতিক ঘটনা তা যতোই হোক না কেন, পৌরাণিক।
যাহোক, ১৯৪৭ সাল-পূর্ব ব্রিটিশবিরোধী যে ‘স্বরাজ’ আন্দোলন এতে ভারতীয়রা অভিনব প্রতীকী ভাষায় সাবধানতা অবলম্বনে নির্দেশিত ছিল। সব পরিবারে যখন ওই মহল্লায় কোনো গোড়া পুলিশ বা ইংরেজ সৈনিক তল্লাশির জন্য কিংবা রেইট করতে ঢুকবে তখনই গৃহস্থ শঙ্খ ও কাঁসর বাজাবে যেন তাদের বাড়িতে কোনো উৎসব পার্বণের কাজ চলছে। আর ওই শঙ্খধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লুকিয়ে থাকা স্বরাজ কর্মী অথবা তাদের আশ্রয়দাতারা দ্রুত সাবধান হয়ে থাকেন। বিশেষ করে স্বরাজ কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে সরে পড়তে বা যথাযথ আতœগোপন করতে পারেন।


রাজনৈতিক ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শঙ্খ, শামুক, ঝিনুক ও গুগলির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা যে ছিল এ কথা বেশি বয়সীদের জানা থাকলেও নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে জানা না থাকারই কথা। এ অঞ্চলে ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোটের চল শুরু শুরুর আগে এবং দ্রব্য বিনিময় প্রথা উঠে যাওয়ার পর, মানে, ওই দুটি যুগের মাঝখানে একটা দীর্ঘ কাল ছিল। তখন টাকা বা মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হতো। কানাকড়ি মূল্য নেই’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, পকেটে টাকাকড়ি নেই’, ফেলো কড়ি নাও মাল’, পাঁচকড়ি বাবু’ এসবই সাক্ষ্য দেয় এক সময় কড়িই ছিল টাকা বা পয়সা।
ওই কড়ি এক প্রকার প্রাকৃতিক শঙ্খ বা ঝিনুক ছাড়া অন্য কিছুই নয়। পরে কড়ি খেলার যে চল হয় তাও কড়ি মুদ্রা আমলে। এই কড়ি খেলা ছিল ওই আমলের জুয়া।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো ভূমিকা রয়েছে ঝিনুক বা শঙ্খার। আগে মানুষ জলাভূমি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে রাখতো। আবার স্থান বিশেষে সংশ্লিষ্ট কারখানার প্রতিনিধি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে গৃহস্থ বা সংগ্রাহকদের কাছ থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে তা দিয়ে বোতাম, চুলের কাঁটা ইত্যাদি তৈরি করতো। এক সময় আমাদের পোশাক শিল্প লোহার টিপ বোতাম এবং ঝিনুকের গোল ও চৌকা দুই ছিদ্রের বোতামের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শাঁখারি, চুনারি ও শামুকখোটাদের জীবিকার প্রধান কাঁচামালও ছিল শঙ্খ বা ঝিনুক এ কথা আগেই বলেছি। কালে কালে চুনারিদের ঘরে ঘরে ঝিনুক পোড়ানো হাঁপর বা চুলার প্রচলন বিলপ্ত হয়। কৃষিতে অপরিণামদর্শী কীটনাশক প্রয়োগের ফলে বিভিন্ন জলাশয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে ঝিনুক-শঙ্খর বিবিধ বংশ। আবার বৈজ্ঞানিক ও খামার পদ্ধতিতে মাছ, হাস-মুরগি ইত্যাদি চাষের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে শামুক, ঝিনুক ও শঙ্খর ওপর চাপও পড়ে বেশ। ফলে যে কোনো অঞ্চলে যে কোনো জলাশয়ে প্রচুর ঝিনুক-শামুক পাওয়ার ক্ষেত্রে ভাটা পড়তে থাকে। এর পরিণতি এখন চরমে। তাই চুন তৈরিতে চুনারিদের ঝিনুক জোগাড় ও ব্যবহারের পদ্ধতিই পাল্টে গেছে। এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপাড় ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় সবচেয়ে বেশি চুনা উপাযোগী ঝিনুক পাওয়া যায়। ওইসব অঞ্চলে (বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) বড় মহাজন ভাটা করে ঝিনুক গোড়ানোর বিরাট কারখানা বসিয়েছেন। সেখান থেকে বিভিন্ন জেলায় ট্রাকভরে উৎপাদকরা পোড়া ঝিনুক ক্রয় করে নিজ নিজ জেলায় নিয়ে কেবল ঘোটাঘুটির কাজ করে পাইকারি ও খুচরা দামে কাজ থাকে।
ঝিনুক যে কেবল শাঁখারি, প্যাঁকড়া, চুনারি ও শামুক থেকে সৃষ্টির পটভূমিকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তা নয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের নামকরণ হওয়ার ক্ষেত্রেও ঝিনুক-শামুক বিশেষ অবদান রয়েছে শাঁখারীবাজার, ঝিনাইগাতি, ঝিনাইদহ, শাঁখবাড়িয়া, মুক্তাগাছা প্রভৃতি। চুনারুঘাটের নামকরণের পেছনেও ঝিনুকের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। এছাড়া ঝিনুক, শামুক, শঙ্খ, কড়ি ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের অনেক গ্রামের নাম নিশ্চয় পাওয়া যাবে। শাঁখারীপট্টি, চুনপাড়া এসব নাম তো সিংসন্দেহে মিলবে।


ঝিনুক, শামুক, শঙ্খের দেহ গড়নই কেবল বিচিত্র সুন্দর নয়, এর রঙ মনোহারি অপূর্ব বর্ণিল। দুটি ক্ষেত্রেই এর রকমফের বিস্ময় উদ্রেককারী সুন্দর। যে প্রজাতি, রঙ, মিঠা বা নোনা পানির হোক না শঙ্খ, এমনকি যে আকৃতিরই হোক না কেন, একটি ক্ষেত্রে এর অপরিহার্য মিল দেখা যায়। প্রতিটির খোলস খুব শক্ত এবং ভেতরটি ভীষণ নরম ও নাজুক। আবার খোলসের ক্ষেত্রে মিল হলো এগুলো একরঙা-বহুরঙা, কাঁটাযুক্ত-কাঁটামুক্ত, লম্বা-বেঁটে, ঢোপা-টেপা, গোল-তেকোণা, ভোঁতা-সুচালো যে আকারেরই হোক না কেন, ওই খোলস হয় আবশ্যিক ভাবেই প্যাঁচ বিশিষ্ট। ওই প্যাঁচ একাধিক এবং অনেক ক্ষেত্রে অগণতি।
শামুক ভাঙা, শঙ্খচিল এই পাখি দুটির নাম যে শঙ্খের সঙ্গে বেশ একটা সম্পর্কিত এ কথা আগেই বলেছি। বিষ্ণু দেবতার কথাও বলা হয়েছে যে, তার আরেক পৌরাণিক নাম হলো শঙ্খক্রিগদা পদ্মধারী। এছাড়া বাংলা সাহিত্য ও শব্দ ভা-ারে কিছু উচ্চারণ রয়েছে যা শঙ্খের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন শঙ্খকার, শঙ্খচিল, শঙ্খচূড়া, শঙ্খচুনি, শঙ্খবলয়, মহাশঙ্খর তেল, সুতাশঙ্খ, শঙ্খবিষ, শঙ্খমালা, শঙ্খনীল, শঙ্খমুখ। এর প্রতিটি বিষয় ভিত্তি করে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগটি এখানে বিশেষ বিবেচনায় গ্রহণ করা গেল না। যদি আলোচনা করা যেতো তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট উপভোগ হতো যে, শঙ্খ কতো বহুরৈখিক আঙ্গিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থবহ বিষয় হিসেবে জেঁকে আছে। শঙ্খর যে বস্তুমূল্য এর বাইরেও বহুভাবে সাহিত্যিক ও রূপকাল্পনিক ভাবমূল্য রয়েছে। এ জন্য ওই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, শঙ্খ বাহ্যত যতো সামান্যই হোক না কেন তা লোকপৌরাণিক, আর্থসামাজিক এবং রীতিমতো ভাবসাহিত্যিক সম্পদ হিসেবে বহুরেখায় অত্যন্ত মূল্যবান। আসলেই শঙ্খের মাহাত্ম শঙ্খের চেয়েও অনেক। শঙ্খ বাহ্যত যা, আসলে এর চেয়ে বেশি।

 

মডেল : ঐশ্বর্য্য রহমান
পোশাক ও স্টাইলিং : সহজ টিম
মেকোভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

পাহাড়ি রাজকন্যা

 

 

গল্পটা এক পাহাড়ি রাজকন্যার। রাঙামাটির তবল ছড়িতে তার জন্ম। যেখানে পাহাড়ের কোল জুড়ে বাস করে কর্ণফুলির শাখা নদী। ভোর বেলায় ঘুম ভাঙতেই জানালায় এসে দাঁড়াত মেয়েটি। দেখত পাহাড় আর নদীর আলিঙ্গন। আকাশের ঘননীল আর গাছের সবুজ পাতা, রঙিন বুনোফুল তাকে রঙ চিনিয়েছে। বাতাসে শুকনো পাতার মর্মর আর পাখির গান তার ভেতরের শিল্পসত্বাকে জাগিয়ে দিয়েছে। তাই তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন রঙ- তুলি। তিনি শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। তার বেড়ে ওঠার গল্প, জীবন যাপন, শিল্পভাবনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। কথোপকথনে ছিলেন লাবণ্য লিপি

 

লাবণ্য লিপি: আপনার ছেলেবেলার কথা বলুন। কেমন ছিল সে দিনগুলো?
কনকচাঁপা: আমার জন্ম রাঙামাটির তবল ছড়িতে। সেখানেই কেটেছে আমার শৈশব- কৈশোর। কী সুন্দর ছিল সে দিনগুলো। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই বয়ে গেছে কর্নফুলির একটা শাখা। প্রতিদিন ঘুম ভাঙতেই আমি জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। নদী, পাহাড়, গাছপালা, আকাশ সব মিলিয়ে সে কী অপরূপ দৃশ্য! মনে হতো যেন স্বর্গের খুব কাছাকাছি আছি আমি। পাহাড়ের গাছে গাছে কত রঙ বেরঙের বুনোফুল ফুটত। একেক ঋতুতে একেক রঙের প্রাধান্য থাকত। সাদা রঙের সদরফ ফুল, হলুদ বিজু ফুল, লাল টকটকে জবা, মাদাঙা, বুনো অর্কিড আরো কত কী! সামনেই তো পয়লা বৈশাখ। এই সময়ে আমরা নানা রঙের সেসব ফুল তুলে মেতে উঠতাম বিজু উৎসবে। এখনকার মতো মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে এত ব্যবধান ছিল না। আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যেত সাদা হাতি, হরিণের দল, বানর, বুনো হাঁস, বনমোরগ, বনবেড়াল, বাজপাখি। কী বিশাল ছিল বাজপাখির ডানা! আমি তো মনে করি প্রকৃতির এই ভার্জিন বিউটিই আমার ভেতরের শিল্পস্বত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলেছে। আদিবাসী নারীদের বৈচিত্রময় জীবন, সাজ সজ্জা- আমাকে অণুপ্রাণিত করেছে।

লাবণ্য লিপি: ছেলেবেলা থেকেই তাহলে আপনার আঁকাআঁকির শুরু?
কনকচাঁপা: সত্যি বলতে তাই। তখন তো আর আমি ছবি আঁকা শিখিনি। কিন্তু সুন্দর কিছু দেখলেই আমার তা আঁকতে ইচ্ছে করত। আমি রঙ পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে বসে যেতাম। আর তা দেখেই কিন্তু এসএসসি পাশ করার পর আমার বাবা আমাকে চারুকলায় ভর্তি করে দেন। সেকান থেকে আমি ফাইন আর্টস- এ সাস্টার্স করি ১৯৮৬ সালে। তারপর আমি ১৯৯৩- ৯৪ সালে আমেরিকান পেন- স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আলিয়ান্স ফেলোশিপ করি।

লাবণ্য লিপি: আপনার ছবিতে আদিবাসী নারীর প্রাধান্য থাকে। এটা কী আপনি নিজে আদিবাসী নারী বলে?
কনকচাঁপা: হ্যাঁ, তা তো বটেই। আমি নিজে আদিবাসী এবং বিশেষ করে নারী বলেই হয়তো আদিবাসী নারীদের বঞ্চনার জায়গাটা খুব ভালো করে জানি এবং বুঝি। ছেলেবেলা থেকে দেখছি, পরিবারের যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন পুরুষেরা। অথচ নারীরা সব কাজেই সমান শ্রম দিচ্ছেন। এখন অবস্থা অনেকটাই বদলেছে। তবু নারীরা সমঅধিকার এবং মর্যাদা পাননি। এ অবস্থা দূর করার জন্য সবার আগে দরকার শিক্ষার। পাশাপাশি পুরুষদের সহযোগিতা। তাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নারীদের কাজ করার সুযোগ এবং স্বীকৃতি দিতে হবে। আমি নিজে আমার স্বামী খালিদ মাহমুদ মিঠুর কাছে সেই সহযোগিতাটুকু পেয়েছি বলেই আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি বলে মনে করি। তবে সমাজে নারীদের অবস্থাও কিন্তু এখন অনেকটাই বদলেছে। আমি আমার ছবিতে সেটা দেকাতে চেষ্টা করি। আমার ছবিতে দেখবেন আলো- আঁধারের খেলা থাকে। অর্থাৎ আলো আসছে।

 

লাবণ্য লিপি: শুনেছি আপনি সপরিবারে ভেজিটেরিয়ান...
কনকচাঁপা: আমি এবং আমার ছেলে- মেয়ে নিরামিশভোজী। মিঠু অবশ্য মাছ মাংস খায়। আমি বরাবরই প্রাণী হত্যার বিপক্ষে। তাই মাছ মাংস খাই না। আমার ছেলে তো দুধ এবং দুধের তৈরি কোনো খাবারও খায় না। ওর ভাবনা হচ্ছে, গরুর দুধে ন্যায্য অধিকার তার বাছুরের। বাছুরকে বঞ্চিত করে সেটা মানুষ খায়। এটা অন্যায়। তাই সে খায় না। এই যে আমরা মাছ মাংস খাই না, তাতে তো আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরং আমরা বেশ ভালো আছি। প্রকৃতিকে ভালোবেসে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশেই মানুষ ভালো থাকতে পারবে; প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়। যে কোনো ধ্বংসই মানুষকে শুধু বিপর্য়ের মুখেই ঠেলে দেবে, ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

লাবণ্য লিপি: আপনার ছবিতে বিভিন্ন সামাজিক অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়।
কনকচাঁপা: হ্যাঁ, যে কোনো ধ্বংস, অন্যায়- অনিয়ম আমাকে ব্যথিত করে। আমার ভেতরে রক্ত ক্ষরণ হয়। আমি শিল্পী। যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি রঙ- তুলিতে করি। ধর্মীয় রেসারেসি আমাকে কষ্ট দেয়। বৌদ্ধ বিহার জ্বালিয়ে দেয়া হলো। পুরে গেল বুদ্ধের মূর্তি। আমি পোড়া বুদ্ধের ছবি এঁকেছি। এটা আমার এক ধরণের প্রতিবাদ। আমরা তো পোড়া বুদ্ধ দেখতে চাই না! বুদ্ধ তো শান্তির কথা বলে, মঙ্গলের কথা বলে। তার ওপর হামলা কেন! এই যে মানুষ নির্বিচারে গাছ কাটছে। এতে পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। পশু- পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি অবশ্যই এর বিরুদ্ধে। পাহাড়ি জমি নিয়েও যে বিরোধ, আমি মনে করি সরকারের হস্তক্ষেপে সেটারও একটা সুষ্ঠু সমাদান হওয়া দরকার।

লাবণ্য লিপি: একজন শিল্পী হিসেবে আপনি নিজেকে কতটা স্বার্থক মনে করেন?
কনকচাঁপা: শিল্পীরা আজন্ম তৃষ্ঞার্ত। আমি কাজ করে যাচ্ছি। কতটা সার্থক সে কথা সময় বলবে। তবে পেয়েছিও অনেক। দেশি বিদেশি অনেক সম্মাননা পেয়েছি। এগুলো আমার দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আদিবাসী পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে আমি গর্ববোধ করি। তবে যখন আমি বিদেশে যাই, তখন আমি পুরো বাঙালি সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করি।

 

ছবিঃ ফয়সাল সিদ্দিকি কাব্য 

শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতান: এক অনন্য উজান

প্রফেসর ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

 

‘দ্য বেস্ট প্লেস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড টু লিভ ইন বাংলাদেশ।’ এই সবুজ বদ্বীপের শুকনো কাঁকর বিছানো, কখনো জল-কাদায় একাকার উঠানÑ যেখানে শৈশবে বেড়ে উঠেছে এক অনন্য উজান, লুকিয়ে আছে প্রসবকাতর মায়ের নীল চিৎকার। এ সবুজ বদ্বীপই হচ্ছে বিশ্ব সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে এক সমৃদ্ধ অঞ্চল। এই সমৃদ্ধির রথে চড়ে যে যার গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়। অবশ্য তাদের উপলব্ধি বার বার টেনে নিয়ে গেছে শিকড়ের সন্ধানে। সেখানে প্রোথিত রয়েছে তাদের গৌরব-উজ্জ্বল অতীত, তাদেরই অগ্রজ। যে মৃত্তিকায় তাদের অনন্ত ছোটাছুটি সেই মধুর মৃত্তিকায় উত্থিত তাদেরই আরো এক অগ্রজ স্বমহিমায় অন্য এক আত্ম পরিচয়ে।
সময়ের পার্থক্যের কারণেই এ অসম্ভব উদার ক্ষ্যাপা বোহেমিয়ান শিল্পীর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ১৯৮১ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে ভর্তি হওয়ার পর। প্রাথমিক পরিচয়ে মাত্রা অতিরিক্ত কোহল ক্লান্ত শারীরিক কম্পনের মধ্যে বুঝতে পারি, এই দুনিয়াটি যারা বাসযোগ্য করে যেতে চায় এর অন্তরালে থেকেও এমন কিছু বিস্ফোরক জীবনের দায় বয়ে যায়। তা আমাদের মতো সাধারণ পতঙ্গ সদৃশ্য মানবের ডানা ছেঁটে দেয়। কাহিল করে তার ইনার স্ট্রেনথ দিয়ে। এই শিল্পী শেখ মোহম্মদ (এসএম) সুলতান। তিনি রাজমিস্ত্রির একমাত্র সন্তান। কৈশোরের আঁকা অসাধারণ স্কেচ ও পেইন্টিং অসাধারণ দক্ষতায়মুগ্ধ নড়াইলের জমিদারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ পর্যন্ত আসার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।


এর পরবর্তী অধ্যায়Ñ সুলতানের জীবনসিঁড়ি অন্য আর পাঁচ-দশ-পাঁচশ’ চিত্রশিল্পীর মতোই খ্যাতি ও স্বীকৃতির ডামাডোলে যথানিয়মে একেক ধাপ করে পর্যায়ক্রমে ইউরোপ-আমেরিকার আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশনের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে সুলতান তাঁর চিত্রকলার ডিঙিতে চড়ে চূড়ান্ত উজানে যেতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। শিল্পমোদীরা ধরেই নেন, এসএম সুলতান প্রতিষ্ঠানের চিরনির্দিষ্ট আর্ট গ্যালারি, স্টুডিও, মিউজিয়াম বা আর্কাইভগুলোয় নিজেকে সচেষ্ট রাখবেন, ক্রমেই বন্দি করে ফেলবেন অন্য পাঁচ খ্যাতিমানের মধ্যে। ঠিক এখান থেকে আমাদের বিস্ময়ের শুরু। এখানেই বোধের বিস্তৃতি। তথাকথিত ধর্তব্যের সম্পূর্ণ বাইরে, শিল্পের অত্যাধুনিক নিরীক্ষাভূমির অকপট স্রোতে ভাসিয়ে দিলেনÑ যেন ওই অহেতুক সভ্যতা, কোলাহলের সভ্যতা, লোক দেখানো সভ্যতা, যুদ্ধবাজদের সভ্যতা থেকে নিজেকে গোপন করে নিলেন, লুকিয়ে ফেললেন আজন্ম সেই মাটির বিষাদ বুকে নিয়ে।


সুলতান সম্পূর্ণ অন্তর্গত এক আত্মজৈবনিক সাধনার আহ্বানে সাড়া দিলেন। তা ছিল মধ্য পঞ্চাশের পাশ্চাত্যের অস্থিরতা। বাংলার সামাজিক ভাগ্য প্রকাশে তখনো মন্বন্তরের দগদগে ক্ষতগুলো অক্ষত থেকে গেছে। ইউরোপের সংস্কৃতি রাজপাট ফর্মালিজমের অধিগ্রহণে নতুন এক কালচারাল রিউম্যাটিজমে আক্রান্ত হয়েছে। মহান দুই স্প্যানিশ শিল্পী গোইয়া ও পাবলো পিকাসোÑ উভয়েই কালেক্টরদের সর্বগ্রাসী ব্যবসায় ঐতিহাসিক সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। একটি ছবিকে ১৫৬ টুকরো করে নিলাম ডাকা শুরু হয়ে গেছে। ইউরোপীয় অর্থগৃন্ধু সময় কণ্টক গোইয়ার ‘দানব’কে ডাইনিংরুমে সাজিয়ে দিয়েছে অনায়সে। পিকাসোর ‘নৃশংসতা’ ডিজাইনের গ-িতে হাঁপিয়ে উঠেছিল যেন এমনই কোনো সময়। শুধু সুলতানই নন, সারা পৃথিবীর যূথচারী ক্লান্তি তর্পণকারী মানুষ একটু করে বুঝতে শুরু করেছিল সংস্কৃতির মূল নিয়ামক তার মানবীয় উত্থানে। জীবন বিছিন্ন রঙরেখা, সুরছন্দ, গদ্য-পদ্য আসলে আরো নির্বাপিত জনবিক্ষোভের অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে অন্তর্গত স্বপ্নের গভীরে কাজ করে। ঠিক সেই মধ্য পঞ্চাশে কেউ কোথাও বুঝতে না পারলেও আজকের বিশ্ব শিল্পমন্দায় হ্যাকনিড জীবন ভাষ্য ও দার্শনিক যৌনসম্ভার যেন লুপ্তপ্রায় সুররিয়ালিস্টদের তৎকালীন বিযুক্তির দুর্ভাগ্যে কাজ করে গিয়েছিল তা বোঝা সম্পন্ন হয়েছে। পুরনো পাতা ওল্টাতে বড় বেশি কাতর হতে হয় ওই কারণেই। কেরুয়াকের ‘অন দ্য রোড’ কিংবা গিনসবার্গের ‘ফাউল’ পড়লে তেমনই বোঝা যায় উৎসব, সিনেমা, ইমেজ, কল্পনায় ওরিয়েন্টাল জলপ্রপাত কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল। মনে রাখা যেতে পারে, সার্ত্রে যে মধ্যরাতেই কড়া নেড়ে থাকুক না কেন, অ্যাবস্ট্রাকশন তথা অ্যাম্বিগুইটির চূড়ান্ত লোক উচ্ছ্বাস, সেই অষ্টপ্রহরের তর্পণ-অর্পণগুলো, এমনকি বিযুক্ত হওয়ার সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও একই সঙ্গে আধুনিক প্রয়োগ কল্পগুলো এই এশিয়া প্রান্তরের ঘাস-জমিন, জল- পাহাড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কালোনিয়াল সংহারবাদী মানসতা নিপাত যাচ্ছে। দৌড়ে বেড়াচ্ছে সাহেব-সুবো, স্পন্সর, কমিটি, গবেষক, বায়ার, প্রডিউসর ও দালাল-ফড়িয়াবাজ।


আমরা প্রত্যেকেই চেয়েছিলাম কিছু একটা ঘটে যাক। সব ছেড়ে চলে যাই। মিশে যাই, বিলিয়ে দিই নিজেকে, মিলিয়ে দিই সাধারণ্যে। বোহেমিয়ান না-ই বা হলাম, অন্তত একটিবারের জন্য লোকে বলুক, ‘আহা, কী করে ফেলল! এমন ধন-মানে উৎসর্গকৃত জীবনটি ছেড়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে বেরিয়ে পড়ল? আমাদের উৎকণ্ঠা, পাপবোধ, প্রত্যাখ্যান ও মমতা মাখানো বোধে মননের নিহিত পরিক্রমায় সামান্য শক্তিটুকুও সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। অথচ প্রবল ইচ্ছায় অনাগত সম্ভাবনার দিকে নিষ্ফল চেয়ে থাকছি। এক ব্যর্থ ধ্বস্ত, ক্লেদাক্ত সময়ের অবগুণ্ঠনে শুধু কাতর হয়েছি। আবেগ নিরপেক্ষ হয়েই লিখছিÑ যদি একটিবারের জন্যও পারতাম! পারতাম নিজেকে ছিন্ন করতে, টুকরো টুকরো করতে সেই বোধের সমীপে, শিল্পের যূপকাষ্ঠে যদি পারতাম পা রাখার জায়গাটুকুকে তোয়াক্কা না করে গলা বাড়িয়ে দিতে?


শিল্পী দোমিয়ের কারাবাস থাকাকালীন চিঠিতে লিখেছিলেন তার কালি ফুরিয়ে যাওয়ার নিদাঘ যন্ত্রণার্ত মুহূর্তের কথা। আমরা বুঝতে পারলাম আধুনিকতার চিত্রলেখেটি কেমন করে সহজ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ওই গত দশকেই শিল্পী সালভাদর দালির অন্ধকার ক্যাসেলে জীবনটিকে সংকীর্ণ যাপনের মধ্য দিয়ে যে আরেক ফলিত বাস্তবতার সূত্রপাত ঘটল এর বিশ্লেষণ কোন ভাষায় করা যাবে? আমরা খেই হারিয়েছি। মাল্টিমিডিয়ার জয়যাত্রার বিজ্ঞাপনী দুনিয়ার মেগাস্টার দালি যখন ক্যাসেলের মধ্যে ঢুকে পড়লেন তখন কোনো পাপবোধ, কোনো বিচ্ছিন্নতা তাকে মদদ দিয়েছিল। কেনই বা নিঃসঙ্গ এক জীবন চর্চার অস্থির উন্মেষের কথা বললেন দালি? যদি বলা হয়, এও এক পোস্টমোর্ডানিস্ট ভেল্কির চরকিচক্কর, পালিয়ে বাঁচাÑ তাহলে!
আমার বিষয় এটি নয়, বিষয় এক অনন্য উজান শিল্পী সুলতানের ছিটকে যাওয়া, ফিরে আসার দিনপঞ্জিটি আরেকবার খতিয়ে দেখা। হ্যাঁ, ইউরোপ ভ্রমণকালে যখন তিনি খ্যাতির তুঙ্গে তখন মানুষ উত্তেজিত, অস্থির রোমকূপগুলো প্রায় নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। ঠিক যে সময় আর কাঁটা দেয় না শরীরে, জীবনে খ্যাতির মধ্যগগনÑ এমন একটা মুহূর্তেই স্বেচ্ছানির্বাসন নিলেন সুলতান। ক্যাসেলের অন্ধবৈচিত্র্য বা নির্ধারণের চর্চা, সাধনা নয়। তিনি ফিরে এলেন তার উৎসে। জীবনের শুরু যে মৃত্তিকায় সেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম নড়াইল, নিজের গ্রামÑ যে পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। তাকে নিয়ে একটি কথাও হলো না বা তিনি বলার সুযোগ দিলেন না। ফিরে এলেন আন্তর্জাতিক শিল্প ময়দানের গৌরবময় দিনগুলো অস্বীকার করে, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে।
‘ইউরোপ থেকে ফিরে আসার পর সেখানে পাওয়া যাবতীয় যশ ও খ্যাতি আমি পুরোপুরি ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। তথাকথিত স্বীকৃতিগুলো আমার গ্রামে নিয়ে আসতে চাইনি, চাইনি এ সম্পর্কে কেউ কিছু জানুক। যখন আমার পুরনো সহপাঠী বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি তখন আমার মনে হয়, আমি যেন আবার সেই শৈশবে প্রত্যাবর্তন করছি। যখন তাদের সঙ্গে কথা বললাম তখন বুঝলাম, তাদের চিন্তা-ভাবনা ও স্বপ্নগুলো যেন আমারই খুব কাছাকাছি। এভাবে আমি যত আমার গ্রামের প্রত্যন্তে জড়িয়ে পড়লাম ততই ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলাম কৃষকদের সঙ্গে। দেন আই ফেলট মাইসেলফ আন্ডার গো অ্যা ডিপ ট্রান্সফরমেশন। আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম। ইউরোপ থেকে তুলে আনা সব আদব-কায়দা ও ভাবনা-চিন্তা অনেক পেছনে পড়ে থাকল। আই বিকেম কমপ্লিটলি হোল ইন টিউন উইথ মাই পিপল অ্যান্ড মাই কান্ট্রি। দিস ট্রান্সফরমেশন গিভ মি ডিপ ফিলিংস অফ পিস অ্যান্ড কনটেনটমেন্ট।’
ফিরে এলেন সুলতান। আশ্রয় নিলেন বুনো গাছগাছালিতে ভরা পরিত্যক্ত স্থাপত্যে। না, কোনো পরিপাটি ঘরদোর তিনি সাজাতে পারেননিÑ যেন নৈঃশব্দ অথবা কোনো শূন্য সময়ের বিনীত জাগরণে একটি করে ভাষার মুকুলগুলো ফুটিয়ে তুললেন তার নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার মাঠে-প্রান্তরে। অথচ আমরা আছি একই রকম আদি, অকৃত্রিম। অ্যাগ্রারিয়ান ভিজনকে আয়ত্ব করার জন্য বইপত্র ঘেঁটে প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ সাজিয়ে, বাকবিত-ার জাবর কেটে, সেমিনার-সভা-সমিতিতে আপ্রাণ বজায় রাখতে চেষ্টা করছি অন্তঃসারশূণ্য র‌্যাডিকালিজম। চেষ্টা করছি বোঝাতে কত বেশি অনুগত আমরা প্রগতির নাড়ির টানে। একবার ভেবেও দেখছি না ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থমগ্নতা এবং শ্রেণি-নিবন্ধ আমলাতান্ত্রিক গণঅহঙ্কারেও আমাদের মর্মান্তিক মানবিক দুর্গতি কি নিদারুণ এক পচন সম্ভব অনুষ্ঠান ঘটিয়ে তুলেছে।


উধাও সন্ধানী এই শিল্পী আপাত বিযুক্তির ভরে নিজেকে সেই জীবন চর্চা ও শিল্পকৃতির ঐকান্তিক যোগসূত্রে চিহ্নিত করলেন। তার জীবন শুরু হয়েছিল ইউরোপিয়ান মাস্টারদের প্রভাব সম্বল ক্যানভাসের রঙরেখায়। তিনি সরে এলেন সম্পূর্ণ জ্যান্ত এক বাস্তবতার অধরায় ধরা দিতে। তার নিশ্চয়ই জানা ছিল, বাস্তবতার সরলতা বিষয়ের বিতর্ক দুনিয়াব্যাপী শৈলী সংস্কারে প্লাবণ ঘটিয়ে ফেলেছে। তার এও জানা ছিল, বিমূর্ত চিত্রপটের বহুমাত্রিক প্রকাশ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা সম্প্রতি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। তবু তার আত্মগত বিপন্নতাই শুধু নয়, দুর্গতিক্লিষ্ট গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে অকৃত্রিম সখ্যে নেমে আসেন শিকড়ের দিকে কোনো যৌথ অবচেতনার ঐশ্বর্যের গভীরে।
এভাবেই শুরু হলো এসএম সুলতানের গত ৩০-৩৫ বছরের কৃচ্ছ্র সাধন, শিল্পযোগযাত্রা। অযুত ক্যানভাসের সরসতায় রঙের বৈচিত্র্য, রেখার বিচিত্র সম্পাদনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সর জটিল ছন্দে চিত্রিত করলেন আধুনিক শিল্পকারুতন্ত্রের এক তৃতীয় ভূবন। বহু মূল্য বিদেশি রঙ পরিহার করে তিনি বেছে নিলেন দেশজ পটুয়াদের গাছগাছালি, শিকড়-বাকড় থেকে উদ্ভূত রঙ। স্বল্প খরচে বেশি ও বড় কাজ করতে হলে অনেক দ্রব্য ব্যবহারই শ্রেয়। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে আমি ঝুটের কাপড়ে শিরিষের আঠা ব্যবহার করতাম। কিন্তু দেখা গেল বর্ষায় ক্যানভাসগুলোয় ড্যাম্প ধরে যাচ্ছে। তখন গাবের আঠা ব্যবহার করতে শুরু করলাম। তা জেলেরা জালের জন্যে ব্যবহার করেন।’
মধ্য পঞ্চাশে দেশে ফিরে সুলতান প্রাথমিক স্তরে অসম্ভব কিছু ল্যান্ডস্কেপ আঁকতে শুরু করেন। মানুষ সেখানে ততটা গ্রাহ্য নয়Ñ যেন জীবন আনন্দীয় প্রাতিস্বিক বোধ ও শস্য ক্ষেত্রের জৈবিক উপমা সমাহার। প্রগলভ উষ্ণতায় শিল্পী তার কাক্সিক্ষত চিত্রগুলোয় আরোপ করেন এক বাদামি সভ্যতা। তিনি বলেন, ‘তুমি দেখবে, ব্রাউন ইজ দ্য ডমিনেন্ট কালার। কেননা ব্রাউন হলো মাটি, পৃথিবীর ঘরবাড়ির ও কৃষকের রঙ। এই বাদামি রঙ ও কার্ভড ফর্মস ক্রিয়েট অ্যা ফিলিং অফ ইউনিটি ইন মাই পেইন্টিংস। বলা হয়, বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দেশ। কিন্তু তাই-ই বা হবে কেন? এখানে কৃষকের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম সঞ্চালিত হয়ে আসছে স্মরণাতীতকাল ধরে। তেভাগা আন্দোলন, কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম, কত কী!। অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, এই আধুনিক যুগে কেন আমার ছবিতে কৃষকদের এত সেকেলে করে আঁকি...। তাদের বলি যে তারা আজও প্রাচীন। তারা আজ কী করছে? দিস কালটিভেশন অফ ল্যান্ড ইজ প্রিমিটিভ ওয়ার্ক। সো দেয়ার এন্টায়ার অ্যাকজিসটেন্স ইজ প্রিমিটিভ। দেখো, এসব আদিম মানুষকে বেছে নিয়েছি আমার ছবির বিষয় হিসেবে। কেননা দে আর আউটসাইড দ্য টেরর অফ আওয়ার প্রেজেন্ট ওয়ার্ল্ড। বৃহৎ শক্তির কসমোপলিটন শহরগুলোয় আজ কী হচ্ছে, কীভাবে তারা নিজেদের নিউক্লিয়ার হলোকাস্টের জন্য তৈরি করছে। আমার বিশ্বাস, এসব শহর অভিশপ্ত হয়ে পড়েছে। একদিন তারা নিজেকে ও নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে। আমি ভেবে দেখেছি, আমার ছবির এসব মানুষ এসব ধ্বংসের দিকে আত্মহননের দৌড়ের থেকে অনেক বাইরে। আই ফিল দ্যাট দে উইল অ্যা নিউক্লিয়ার হলোকাস্ট। দে উইল কন্টিনিউ টু কাল্টিভেট দেয়ার ল্যান্ড অ্যাজ অলওয়েজ।’


ইতোমধ্যে মানুষ এসেছে সুলতানের ছবিতে আদমের রূপ নিয়ে। বলিষ্ঠ, সুগঠিত শরীরের মধ্যে বীরত্বের প্রতীকী নিয়ন্ত্রণ। বিস্তৃত ও অনন্ত তার ক্যানভাসে ধরা পড়তে শুরু করে শ্রম এবং কর্ষণের অভিনব সব মুহূর্ত। তিনি ছিলেন পরিবার বিচ্ছিন্ন একাকী জীবনে অভ্যস্ত। তার একা চলার পেছনে কোনো গূঢ় বার্তা কাজ করে ছিল কি না তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। তবে জীবনের শেষার্ধে এসে তিনি সামাজিকভাবে দায়িত্ব নেন নিম্নবর্গের মধ্যবয়স্ক হিন্দু বিধবা রমণীর। তার দুই সন্তানের সঙ্গে নিজেকেও গ্রথিত করলেন পারিবারিক আস্তানার সহজিয়া বাস্তবতায়। এর পর পরই যেন দেখা যায় তার ছবিতে মানুষ এক বিশেষ ভূমিকা নিয়ে রঙরেখার বৈশিষ্ট্যে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। এই মানুষ আমাদের চোখে দেখা মানুষ থেকে যেন অনেক বেশি বলবান, মাসকিউলার। তাদের যেন নিরন্তর শ্রমের প্রতীকে চিহ্নিত করে তিনি তৈরি করতে চান এক দুর্দান্ত ‘মিথিকাল ইভেন্ট’। তার ক্যানভাসের মানুষজন, গাছপালা, প্রকৃতি-পাথর যেন আর্কিটাইপাল চিত্র-চেতনার জন্ম দিয়ে যায়। তার কৃষক যেন সেই আদমের আদলে, উৎসের গভীর গোপনে এক ক্লান্তিকারী, স্বপ্নচারী সৃষ্টির জাল বুনে যায় আমাদের বিদ্ধ করে। নিজেদের অজ্ঞানতাতেই বিপন্ন বোধ করি আমরা। বুঝতে চেষ্টা করি, কেন হাজারো ছবি এঁকে একটিও বিক্রি করার তাগিদ অনুভব করলেন না সুলতান।
আমার বিষয় ছিল এক অনন্য সাধারণ শিল্পী মানুষের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ, আমাদেরই অজ্ঞানতা, নষ্ট সভ্যতার বিশ্লেষিত মুহূর্তগুলো খুঁচিয়ে দেওয়া। তাই আপাতত ওই শিল্পী এসএম সুলতানের মুখের কথাগুলো বাঙ্্ময় অভিযোজনে সাজিয়ে এই নিবন্ধের শেষ পর্যায় প্রবেশ করবো। ‘ক্ষমতায় আসীন লোকজন সব সময়ই দরিদ্র কৃষকদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু ফেলে। দেখায়, তারা কৃষকের কত বন্ধু। কিন্তু এসবই ভাওতা। তারা কখনোই কৃষকের পাশে দাঁড়ায় না। যদি তা সত্য হতো তাহলে কৃষকের সঙ্গে তাদের কাজ করতে দেখতাম। দেখতাম তাদের সঙ্গে খেতে, খামারে কাজ করতে। তাদের সংগ্রাম ও দুঃখের অংশীদার হতে। বৈদেশিক সাহায্য আমাদের দেশে কৃষকের নামে উপচে পড়ছে। কিন্তু ওই অর্থ কখনোই কৃষকের ঘরে পৌঁছায় না। পুরোটিই শহরে আটকে থাকে এবং তুমি জানো তা দিয়ে কি হচ্ছে? কতিপয় বড়লোকের বিলাস সামগ্রী কেনা হচ্ছে। যদি আজ কিংবা কাল ওই বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কী হবে? শহর শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু গ্রামে? কিছুই ঘটবে না। কোনো পরিবর্তনই দেখা যাবে না। গ্রামের চাষি সব সময়ই বেঁচে থাকবেন। আরেকটা সমস্যা হলো, কৃষককে বোঝানো হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ঐতিহ্যবাহী দেশজ পদ্ধতি থেকে অনেক ভালো! মাঝে মধ্যে টিভির অনুষ্ঠান দেখি। কোনো এক কৃষি বিষয়ের অনুষ্ঠানে কয়েক কৃষককে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনারা জানেন এই গাছের চারা দিয়ে কি হয়? বলতে পারেন এটি কোন জাতীয় গাছ? যখন কোনো কৃষক বলেন, এটি কোন ধরনের বা কী তখন তাকে বলা হয়, ‘ও! নো, এটি তা নয়।’ তারপর এক তরুণীর ছবি ভেসে ওঠে টিভির পর্দায়। তিনি পাঠ করতে থাকেন কিছু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। এর পাশাপাশি বলেন, ‘ইউ আর নট রাইট। ইউ হ্যাভ দি রঙ আইডিয়া। দিস প্লান্ট ইজ অ্যাকচুয়ালি...’ ইত্যাদি। যাদের এই কথাগুলো বলা হচ্ছে সেসব কৃষকের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, তাদের প্রাচীন পিতা-প্রোপিতামহের পেশাগত গর্ব ধ্বংস হতে চলেছে। এর পরিবর্তে জায়গা নিচ্ছে নতুন ধরনের হীনম্মন্যতা। তারাই হলো আমার ছবির বিষয়। ‘আই ক্যান নট হেলপ বাট ফিল ফর দেম... ফর দেয়ার ডে টু ডে কনসার্নস, প্রবলেমস, স্ট্রাগলস।’ তুমি কি একটা বিষয় জানো? আজকের কৃষক আর গান করেন না। জারি-সারি, লোকসঙ্গীত আজ আর গ্রামঞ্চলে শোনা যায় না। আসলে কোনো না কোনোভাবে কৃষকের কাছ থেকে তার গানটি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ইদানীং শহরের লোকজন তাদের কৃষকদের, নগর বাউলদের দিয়ে ব্যান্ড মিউজিকে লোকসঙ্গীত প্রডিউস করছে। কিন্তু তারা সেগুলো সম্পূর্ণ বিকৃত করে শোনাচ্ছে। এই কৃষকরা গান শোনেন তাদের ওই পুরনো গানগুলো রেডিওতে কিংবা টেলিভিশনে বাজানো হচ্ছে, দে ফিল দেয়ার মিউজিক... হুইচ ওয়াজ দি অরিজিনাল এক্সপ্রেশন অফ দেয়ার জয়েস, দেয়ার পেইনস, দেয়ার সরোজ... দে ফিল দিস মিউজিক ইজ বিইং মেড মকারি অফ অ্যান্ড দে বিকাম টেরিবলি স্যাড।
আপতত শেখ মোহাম্মদ সুলতান আমাদের অপদার্থ দিন যাপনের মুখে কালি মাখিয়ে দেন! অজড় খিলানগুলো শব্দ করে ওঠে। বেজে ওঠে অপদস্থ জীবনের ভাঙা রেকর্ড।


ছেড়ে যেতে হয়, হারাতেই হয়। তবুও শিল্পী এসএম সুলতান এক স্বপ্নচারী অনন্য উজানের দেখা পান কর্ম সংশ্রব, উদ্ধার, স্বপ্ন সম্মোহন, চেতনার হার্দিক যোগসূত্রে। আত্মমগ্ন, অস্ফুট বাক্যে জানা হয়ে যায় তার স্বপ্ন বৃত্তান্ত। অন্য নামের অভাবে আমরা যাকে স্বপ্ন বলি, সেই স্বপ্ন দেখি! কারণ আমি অসাধারণ কেউ নই। তবে আমার স্বপ্ন দেখা চলে কর্ম-কোলাহলের ভেতর, গাছের মতো আকাশের দিকে শাখা-প্রশাখা, পত্র-পুষ্পে বেড়ে ওঠার মতো। আমার স্বপ্নে একটা দ্বীপ আছে। ওই দ্বীপ হলো আমাদের এই সবুজ বদ্বীপ। মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি জন্মেছিলাম এই দ্বীপে অনেক মানুষ, পশু-পাখি, পোকা-মাকড়, সরীসৃপ ও অরণ্যের গাঢ় আচ্ছাদনের ভেতর। আমার মনে হয়, আবার একদিন নিশ্চয় জন্মাবো এই সবুজ বদ্বীপে, আমার স্বপ্নের দ্বীপে। আমি একা নই, এখন আমার চারপাশে যারা আছে জীব-জগৎ, অরণ্য-প্রকৃতি তারা সবাই জন্মাবে। শুধু ততদিনে আমার স্বপ্নের দ্বীপ পৃথিবী ব্যপ্ত হবে ... এই পৃথিবী সেই দ্বীপ হবে ততদিনে।

 

 মৃৎশিল্পের স্বরূপ সন্ধান

ফয়সাল শাহ

 

বাংলাদেশের লোক-ঐতিহ্যের গৌরবময় সুবিশাল ক্ষেত্রের মৃৎশিল্প অন্যতম। বস্ত্রশিল্পের তাঁত ও তন্তুজাত সৃষ্টিশীলতা, বাঁশের কাজ, লোহা এবং পিতলের কাজ, দারুশিল্প, দড়ি ও বেতের কাজ, পাটজাত দ্রব্যের বহুবিধ ব্যবহারিক কাজের জন্য শিল্প, নকশিকাঁথা শিল্প, লোকজ-স্থাপত্য, রন্ধনশিল্প, নৃত্য-সঙ্গীত, চিত্রশিল্প, সাহিত্য কাব্যÑ মোট কথা, জীবনযাপনের জন্য সাধারণ মানুষের আবেগ, নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা, উপযোগিতা ও উপস্থাপনাসহ একটি সম্পূর্ণ এবং যথার্থ চলমান শিল্পস্রোত আধুনিক শিল্প বহুলাংশে প্রাগুপ্ত ধারা থেকে নিজের জন্য হাত বাড়িয়ে সাহায্য গ্রহণ করে একটি নতুন উপস্থাপনায় হাজির হয়ে ওই শিল্পের একটি নান্দনিক মাত্রা অর্জনে সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

যে কোনো দেশের চিত্রশিল্পে সাধারণত দুটি মূল ধারা বিরাজ করে। একটি সনাতন বা লোকজ শিল্প। অন্যটি হচ্ছে সময়ের প্রতিঘাতে আস্তে আস্তে সম্প্রসারিত ও বিবর্তিত সাম্প্রতিক বা আধুনিক শিল্পধারা। একটি অপ্রাতিষ্ঠানিকÑ যুগে যুগে প্রবাহিত সাধারণ মানুষের দ্বারা পালিত ও চর্চিত হয়ে থাকে প্রায় অপরিবর্তিত ধারার শিল্প। তাদের জীবনধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সামাজিক ঘটনাবহুল আচার-বিচার, বাদ-প্রতিবাদ, জীবন-সংগ্রাম, অন্যায়-অবিচার নিয়ে কাঁচা হাতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ চিত্র। অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে আগুয়ান প্রাচ্য-প্রতীচ্য আধুনিক জগতের সাম্প্রতিক ইঈিতময় কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত মননশীল চিন্তা, বোধ ও উপস্থাপনা দ্বারা একটি যুগোপযোগী শিল্পধারা। এ দুটি ধারা আপাতদৃষ্টিতে ভিন্নমুখী হলেও দ্বিতীয় ধারা সব সময়ই প্রথম ধারাটি দ্বারা প্রভাবিত ও নির্ভরশীল। কিন্তু প্রথম ধারা কখনো দ্বিতীয় ধারার ওপর নির্ভর করে চর্চিত হয় না। তাই আবহমান বাংলার লোকজশিল্প গভীর জীবনভেদী একটি চলমান স্রোত। এটি নীরবে-নিভৃতে কারোর প্রতি দৃষ্টি বা মুখাপেক্ষী না হয়ে একমনে অন্তস্থিত একটি নদীর ফল্গুধারার মতো স্রোতোস্বিনী হয়ে বয়ে যায় কালে কালে। তা বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি ঋদ্ধিমান অবস্থানের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। লোকজশিল্প সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে বাদ দিয়ে তাদের জীবন চলে না। এ জন্য বাংলাদেশের লোকশিল্প খুবই শক্তিশালী ও ঐতিহ্যময় এবং গৌরবের। যেহেতু এটি মৌলিক, আদি ও স্বয়ম্ভূ সেহেতু বহুমাত্রিক। আধুনিক শিল্পের বিকাশ লোকজধারা থেকে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত, বিবর্তিত, উন্মেষিত ও পরিশীলিত হয়ে হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় প্রাপ্ত শিল্প নিদর্শনের নান্দনিক ও ব্যবহারিক শিল্পের বিভিন্ন ফর্ম দ্বারা উৎসাহিত হয়েছে, ঐতিহ্যটিকে সম্মান জানিয়ে নিজের মতো নতুনতর সময়োপযোগী শিল্প নির্মাণে বিভিন্ন মাধ্যমে জগৎবিখ্যাত সব শিল্পীদের মধ্যেই দেখা যায়। ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনের মৌলিক নান্দনিক ও দার্শনিক গুণাবলির সঙ্গে এভাবেই শিল্পীরা একান্তেই নিজস্ব শিল্প আদর্শের ভাবনার উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন কিছু তৈরি করে একদিকে যেমন শিল্প ভাস্করটিকে সমৃদ্ধ করেছেন, অন্যদিকে তেমনি তাদের তৈরি শিল্প মানুষের কল্যাণে মৌলিক রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে এগিয়ে নিয়েছেন বিশ্বটিকে। গুহাচিত্রের সহজ-সরল ধারা আধুনিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়েছে। মোট কথা, লোকজশিল্প হচ্ছে শিল্পের আদি ও মূল আধার। সেখান থেকে ধারণা, শৈলী, পরিসর ও আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তু আহরিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান, শফিউদ্দিন আহমেদ, রশিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ শিল্পী বাংলার লোকজশিল্পধারা থেকে উৎসাহিত হয়েছিলেন। শিল্প নির্মাণে তৈরি হয়েছিল লোকশিল্প মিশ্রিত এক নতুন ধারা। এ দেশের শিল্পীরা স্বাধীন চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে লোক-ঐতিহ্যের বিভিন্ন গুণের বহুবিধ উপাদান-উপকরণ সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ করেছেন আধুনিক ভাবধারার শিল্প। তারা ঐতিহ্য রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসানের মতো মহান শিল্পীরা দেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাটি মূর্ত করেছেন। তাদের শিল্পে মানবতার জয়গান মুখরিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলার মানব-মানবী, এ দেশের মূল উৎপাদক কৃষকসহ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়াবলির অন্তর্নিহিত শক্তি।

বাংলার পুতুল, মাটির বহুবিধ পাত্র, গ্রামের নারী, মানুষ, পশু-পাখি, নিসর্গ দৃশ্য থেকে তারা অনায়াসে সহজ-সরল রেখা ও রঙগুলো নিয়ে নিজস্ব শিল্প সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে চিত্রশিল্পে নিজের দেশের শিল্প-নির্যাস শিল্পীর সৃষ্টিশীলতায় ধরা পড়বেই এবং সেটি চিত্রশিল্পের মান বিচারে অন্যতম একটি নান্দনিক মাত্রা গঠন করতে সাহায্য করে। প্রতিটি শিল্পমাধ্যমে এই দেশজ সময়, সমাজ, আবহাওয়া ও উপাদানের ব্যবহার প্রভূতভাবে হয়ে থাকে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে লোকশিল্প চর্চা চলে আসছে দুনিয়াব্যাপী। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেকার শিল্প নিদর্শন বড় একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে প্রতœ খননের ফলে প্রাপ্ত মহাস্থানগড় তথা প্রাচীন পূর্ণবর্ধনে খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে চতুর্থ শতকে প্রকৃতির বিভিন্ন নকশার ছাপ দিয়ে তৈরি করা সুন্দর ধূসর ও লাল রঙের মৃৎপাত্র লোকশিল্পের প্রাচীনতম নিদর্শন। আমাদের কলমি পুঁথিতে মন্ত্র-তন্ত্রের ছক আঁকা দেখা যায় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে, পুঁথিচিত্র দেখা যায় ১৮০৫ সালে রচিত নারায়ণ দেবের মনসামঙ্গলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পা-ুলিপি বিভাগে তা সংরক্ষিত আছে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক প-িত হেরোডোটাসের কাল থেকে লোকঐতিহ্য সম্পর্কে কৌতূহলের প্রমাণ পাওয়া গেলেও কোনো দেশের, বিশেষ করে স্বদেশের অসংস্কৃত অতীত (ঠঁষমধৎ অহঃরয়ঁরঃরবং) সম্পর্কে অনুসন্ধান ছেলেমি বলে বিবেচিত হতো।

শিল্পকলার বিভিন্ন শাখাÑ মৃৎশিল্প, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চিত্রকলায় নবোপলীয় মানুষ কিছু প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। তখন সবচেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল মৃৎশিল্প। মিসর, ইরাকের জারমো, ইরানের সিয়াংক, আনাতোলিয়া ও গ্রিসের নবোপলীয় মৃৎপাত্র এর সাক্ষ্য বহন করে। চাকার আবিষ্কার নবোপলীয় যুগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুমারের চাকা যে চক্রাকার গতিতে কাজে লাগানো হয় তা পরবর্তী সব সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এখনো গ্রামবাংলার কুম্ভকার সম্প্রদায়ভুক্ত মৃৎশিল্পীরা ওই চাকে নির্মাণ করে চলেছেন মৃৎপাত্র।
প্রাচীনকাল থেকে মৃৎপাত্র তৈরির প্রধান মাধ্যম ছিল মানুষের হাত। বড় পাত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন হতো পাটি অথবা চাঁটাই-জাতীয় দ্রব্য। সভ্যতার বিকাশ ও মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ পদ্ধতির পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন উপাদান-উপকরণের আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ফলে মৃৎপাত্র নির্মাণের জন্য চাকার সঙ্গে যুক্ত হয় ছাঁচ। বিভিন্ন দেশে বহু গোষ্ঠীর মানুষ অনেক রকম মাটির দ্রব্য তৈরি ও ব্যবহার শুরু হয়। ফলে অঞ্চলভিত্তিক রঙ, অলঙ্করণ, আকার-আকৃতি ইত্যাদিতে বৈচিত্র্য দেখা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত মৃৎশিল্পে এর প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশে সভ্যতার মূল উৎস তার নদ-নদী। এ অঞ্চলে বড় পাহাড়-পর্বত না থাকায় পাথরের মূর্তি তৈরির তেমন প্রচলন ছিল না। যে স্বল্প সংখ্যক পাথরের মূর্তি রয়েছে এর কাঁচামালও ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে এখানকার শিল্পীরা তাদের শিল্পসত্তার স্বাক্ষর রেখেছে মাটির তৈরি শিল্পকর্মে। নদ-নদী, খাল-বিলে প্রাপ্ত কাদামাটি দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মে সাধারণ কৌশল প্রয়োগ করে এ দেশের শিল্পীরা সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চায় আত্মনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশের প্রতœক্ষেত্রে যে পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে সেসব নির্দশন যেন আজও অনেকাংশে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে।

মৃৎশিল্পে নান্দনিক ও ব্যবহারিক দুটো বিষয়ের সমন্বয় সব সময় সবক্ষেত্রে রয়েছে। তবে ব্যবহারিক মৃৎপাত্র বাসন-কোসন, থালা-বাটি, হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদির গুরুত্ব যুগে যুগে ধারণ করেছে সর্বস্তরের মানুষ। মৃৎশিল্পীরা ব্যবহারিক মৃৎপাত্র তৈরি করার সময় যথার্থ ব্যবহার উপযোগী আকৃতি তৈরিতে সচেতন থেকেছেন, উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ পাত্র। বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এখনো বাংলাদেশের বিভিন্নি স্থানের মধ্যে সাভার, মানিকগঞ্জ, শিমুলিয়া, কাকরান, কাগজীপাড়া, কুমিল্লা, বরিশাল, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, রাজশাহী ইত্যাদি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মৃৎসামগ্রী তৈরি হয়। এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে কারখানায় মৃৎশিল্প। কারখানায় উৎপাদিত তৈজসপত্র ও স্থাপত্য মৃৎশিল্প এ দেশের ঘরে ঘরে সমাদৃত। তা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে।
নদীমাতৃক সভ্যতা থেকে যেমন এ দেশের এই শিল্প মাধ্যমের উৎপত্তি তেমনি মানব সভ্যতার বিকাশেও এর সহায়ক ভূমিকা রয়েছে। শিল্পীরা ধর্মীয় ও ব্যবহারিক সামগ্রী নির্মাণের সমান্তরালে টেরাকোটা ফলক, ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যে সমসাময়িক মানুষের জীবনযাত্রা, জীবজন্তু, পশুপাখি, ফুল-ফল, লতা-পাতা ইত্যাদি দৃশ্যে তাদের শৈল্পিক ও নান্দনিক গুণাবলির যে প্রকাশ করেছেন তা বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক চেষ্টায় ঢাকা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পী মীর মোস্তফা আলীর উদ্যোগে মৃৎশিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মৃৎশিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাশ্চাত্যধারায় আধুনিক উপাদান-উপকরণের সমন্বয়ে সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণের গতিপথ তৈরি হয়। পরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মৃৎশিল্প চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। এ দেশের শক্তিশালী পরম্পরার দক্ষতার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে মৃৎশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

বাংলাদেশে আধুনিক মৃৎশিল্প চর্চার ক্ষেত্রে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প বিভাগের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই ১৯৬১ সালে সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়। এই দীর্ঘ সময়ের বিবেচনায় শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমের মতো ভাস্কর্য, চিত্রকলা, প্রিন্ট ইত্যাদি বিষযের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমকক্ষতা অর্জন যথেষ্ট সময় লেগেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী এ দেশের কয়েক শিল্পী বিদেশ থেকে মৃৎশিল্পবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ফলে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিজ্ঞানভিত্তিক কলাকৌশলের পরিচয় ঘটে এ দেশে। সমকালীন শিল্পীরা মৃৎশিল্পের ব্যবহারিক গ-িতে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুনতর ভাবনায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। ফলে শিল্পীরা এক নিবিড় ঐতিহ্য সঙ্গে নিয়ে আধুনিক কলাকৌশলের সহায়তায় সৃজনশীল মৃৎশিল্প নির্মাণ করে চলেছেন। কারণ সম্প্রতি মৃৎশিল্পটি সৃজনশীল বা আধুনিক ভাবধারায় উপস্থাপনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কালে কালে এটি ধারণ করেছে আধুনিক থেকে আধুনিকতর রূপ।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের স্বকীয়তায় রয়েছে নিম্নমাত্রায় পোড়ানো গেজবিহীন সামগ্রী। এর পাশাপাশি সৃজনশীল মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিল্পীরা ঐতিহ্য চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন আধুনিক কলাকৌশল ও গেজ। কেননা মৃৎশিল্পে কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণ নির্ধারণ ও মৃৎশিল্পে ব্যবহৃত গেজের সঠিক তাপমাত্রা ইত্যাদি বস্তু নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের হাজারো বছরের শিল্প- ঐতিহ্য অনুধাবন করতে হলে এ দেশে মাটি খুঁড়ে পাওয়া মৃত্তিকা সামগ্রী এবং আজও যে চর্চা অব্যাহত রয়েছে এর দিকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাকাতে হবে।

কত সহস্র বছর আগে মানুষ নিতান্তই প্রয়োজনের তাগিদে মাটি রূপান্তরিত করেছিল তৈজসপত্রে। রূপান্তরের ওই ধারায় এখন তা রূপ নিয়েছে শিল্পে। এর পেছনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে মূলত এ দেশের মৃৎশিল্পের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসটিই। আমাদের মৃৎশিল্পের উপাদান থেকে শুরু করে কারিগরি দিক, নকশা, নির্মাণশৈলীÑ সবই স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৃৎপাত্রের মধ্যে একটা পার্থক্য থাকলেও এই ভিন্নতার মধ্যেও আছে নিবিড় ঐক্য। এ কারণেই অন্যান্য দেশের মৃৎপাত্র থেকে এটিকে আলাদা করা যায় খুব সহজেই। এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের মাটি অনেক সহজলভ্যও।

মাটির সঙ্গে প্রিয় মৃত্তিকার নিবিড় সখ্য মানুষের। বহুকালের পুরনো এই সম্পর্ক বিভিন্ন রঙে রূপে প্রকাশিত। মাটির নম্র স্বভাব মানুষকে বিশেষভাবে কাছে টানে। কাদামাটিতে কল্পনা গড়ে নেয় মানুষ। বিভিন্ন আকৃতি ও অবয়ব দেয়া হয়। দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় বহুমাত্রিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে নরম কাদামাটি। তবে যিনি শিল্পী, যার শিল্পিত বোধবুদ্ধি তার বেলায় আলাদা কথা।
প্রকৃত শিল্প নির্মাণে যেমন প্রয়োজন ফর্ম ভেঙে নান্দনিক ও দার্শনিক মনোভাব প্রকাশ করা তেমনি মৃৎশিল্পে রয়েছে সব বিষয়ের উপস্থিতি। কোনো মৃৎশিল্পীকে শুধু ফর্ম ভাঙা কিংবা রঙের ইলিউশান তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, জানতে হয় এর উপাদানের স্বভাব, সঠিক তাপমাত্রা ও মৃৎশিল্পে ব্যবহৃত সব সরঞ্জামের প্রকৃত ব্যবহার।

টেরাকোটা শিল্পের অতীত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ শিল্পমাধ্যমটি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ধনাঢ্য শ্রেণির চাহিদা পূরণে প্রসার লাভ করেছে। অন্যদিকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণেও প্রসার লাভ করেছে বহু মাত্রায়। মসজিদ, মন্দির থেকে শুরু করে সরকারি পর্যায়ের সুবিশাল ভবন অলঙ্করণে এ মাধ্যমটি বিশেষ ভূমিকা রেখে তৈরি করেছে বিশাল ঐতিহ্য সম্ভার। সম্প্রতি বাংলাদেশে শুরু হয়েছে সুপরিকল্পিত, উন্নততর ব্যবহার উপযোগী স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ। বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত মানুষ। তারা হচ্ছে শহরমুখী। তাদের জীবন ও জীবিকার কারণে সংক্ষিপ্ত হতে চলেছে মানুষের আবাসস্থল, অফিস-আদালতসহ সব স্থান। স্থপতিরা নির্মাণ করে চলেছেন স্বল্প পরিসরে জ্যামিতিক ফর্ম বিন্যাসে আধুনিক থেকে আধুনিকতর বসবাস উপযোগী ভবন। এসব ভবনে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে ঘটছে আন্তর্জাতিকীকরণ। প্রায় প্রতিটি স্থান জীবন ও বাস্তবতার প্রয়োজনটিকে প্রাধান্য দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সূত্রে গড়ে তুলছেন স্থপতিরা নাগরিক জীবনের ব্যস্ততম চাহিদায়। এই ব্যস্ততম গতিশীল ধারায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ইন্টেরিয়র। ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন উন্নত উপাদান। বিন্যাস করা হচ্ছে সৃজনশীল ভাবধারায়। মৃৎশিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমসহ টেরাকোটাশিল্প উঠে এসেছে গৃহসজ্জায় সাধারণ মানুষের কাছে।
মৃৎশিল্পে বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয় অপরিহার্য হওয়ায় কালোত্তীর্ণ টেরাকোটা ফলক নির্মাণ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করা শিল্পীই করতে পারেন। নিয়মিত মৃৎশিল্প মাধ্যমের চর্চা ও গবেষণাই ওই শিল্পের গৌরব উজ্জ্বল ঐতিহ্য অক্ষুণœ রাখতে পারবে। বাংলাদেশে গত চার দশকে আধুনিক শিল্পকলার অগ্রগতি বেশ প্রশংসনীয়। একাধারে এ দেশের শিল্পকলা বলিষ্ঠ, বৈচিত্র্যময় ও উদ্দীপ্ত। সমকালীন আধুনিক মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ দেশের শিল্পীদের প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ঐতিহ্য চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা। এ দেশে মৃৎশিল্পের আধুনিক চর্চা খুব বেশিদিন না হলেও এর জটিল ও কঠিন রাসায়নিক সমীকরণ সাপেক্ষের নিয়মিত শিল্পী হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। এ শিল্পমাধ্যমে যারা নিয়মিত চর্চা করেছেন তারাই শুধু শিল্পভাষা ও নতুনত্বের অনুসন্ধান করে শিল্প নির্মাণ করেছেন।

বাংলাদেশের সমকালীন মৃৎশিল্প ভুবনের কর্মকা- নিঃসন্দেহে বিশালায়তন। প্রায় তিন দশকের বিভিন্ন প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পস্রষ্টার কর্মনিষ্ঠার বৈচিত্র্যতায় সমৃদ্ধ হয়েছে সৃজনশীল মৃৎশিল্প। ধারাবাহিকভাবে অপেক্ষাকৃত তরুণ মৃৎশিল্পীদের সৃজন ও সাফল্য উত্তর উত্তর এ দেশের মৃৎশিল্প তথা সৃজনশিল্পের পরিম-ল সম্প্রসারণ করছে। এটি উপকরণ ও মাধ্যমের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনায় সহায়তা করলেও প্রধান ও অগ্রজ শিল্পস্রষ্টাদের সামগ্রিক সাফল্যেরই প্রতিধ্বনি।
প্রথম সারির তথা পূর্বসূরি মৃৎশিল্পীদের শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজন্মের মৃৎশিল্পী ও সমকালের অপেক্ষাকৃত নবীনরা শিল্পাঙ্গনে নব নব মাত্রা যোগ করে অগ্রজ শিল্পস্রষ্টাদের সাফল্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। এখনো ওই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বলা যায়, গত তিন দশকের মৃৎশিল্প নির্মাণ সাধনায় নিসর্গ, প্রকৃতি, বস্তু ও অবয়বভিত্তিক বাস্তুবাদী ব্যবহার উপযোগী নির্মাণরীতির সঙ্গে যুগোপযোগী আধুনিক নির্মাণ কৌশলের, বিশেষত টেরাকোটায় সমবিমূর্ত ও বিমূর্ত এবং প্রকাশবাদী ধারা প্রভৃতির সম্মিলন ঘটেছে। বাংলাদেশের মৃৎশিল্প অঙ্গনে ওই ধারা বা কৌশলে সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন শিল্পী অলক রায়। তার প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে বস্তু, বিষয় ও উপাদান-উপকরণের সৃজনশীল উপস্থাপনা। ফলে উন্মোচিত হচ্ছে মৃৎশিল্প বিন্যাসের নতুন ধারা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের পরম্পরায় যোগ হচ্ছে আধুনিক রীতি ও নির্মাণ কৌশলের নবতর আবিষ্কার।

 

বৈঠকখানা ...

হুমায়রা মোস্তফা সোহানী

 

একটি বাসার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করার সময় ফয়ারের পরে আসে লিভিংরুম কিংবা ড্রয়িংরুম ডিজাইন প্রসঙ্গ। প্রথমেই আসে রঙের ব্যবহার। লিভিংরুমে যে রঙই ব্যবহার করা হোক না কেন, এর প্রভাব পড়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের ওপর। তাই সচেতনভাবে ড্রয়িংরুমের রঙ নির্ধারণ করা উচিত। কারণ ভুল রঙের ব্যবহার একদিকে যেমন অতিথিদের বিব্রত করে, অন্যদিকে তেমনি সঠিক রঙের ব্যবহার তাদের মন শান্ত বা আরামদায়ক করে তোলে। যেমন হালকা আকাশি ও সাদার ব্যবহার রুমটিকে আরো প্রশস্ত, স্নিগ্ধ এবং আরামদায়ক করে তেমনই লাল ও কমলার ব্যবহার রুমের আবহ অনেকটা উত্তপ্ত করে।
চিরায়তভাবে বিল্ডিংয়ের অন্যান্য রুম থেকে ড্রয়িংরুমের দেয়াল একটু ব্যতিক্রম হয়। লিভিংরুম হচ্ছে সাধারণ খোলা জায়গা। তাই লিভিংরুমটি এমন হওয়া উচিত যাতে এর নিজস্বতা প্রকাশ পায়।
আজকাল বাজারে অনেক সুন্দর ও বিভিন্ন মানের ওয়াল পেপার পাওয়া যায়। তবে অবশ্যই ওয়াল পেপার বাছাইয়ে সচেতন থাকতে হবে। এর বেমানান ডিজাইন প্রয়োগ আপনার ও পরিবারের পুরো রুচিবোধ নষ্ট করে দিতে পারে। ওয়াল পেপার ছাড়াও বাজারে কালার কোম্পানিগুলো টেকচার্ড, মেটালিক ও নন-মেটালিকসহ বিভিন্ন ডিজাইন বাজারজাত করছে। এসব ডিজাইনও আনতে পারে আধুনিকতার ছোঁয়া। এসব ইলিউশন পেইন্ট আজকাল কেবল দেয়ালেই নয়, বরং সিলিংয়েও ব্যবহারে দেয় শৈল্পিক ছোঁয়া। তবে সিলিংয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে হালকা রঙ নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।
এতোক্ষণ লিভিংরুমের রঙ এবং ওয়াল পেপারের ব্যবহার সম্পর্কে জানলাম। এবার আসা যাক ফার্নিচারে কাঠ ও বোর্ডের ব্যবহারে। লিভিংরুমে হালকা বোর্ডের কাজ তথা ওয়াল পেনেলিং ফলস সিলিং ডিজাইন করা হয়। তবে তা অবশ্যই খুব অল্প পরিসরে ডিজাইন করতে হবে। না হলে পুরো ঘরটিই ঘুমোট মনে হবে।

দুই.
আমাদের দেশে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। তা হচ্ছে, যতো বেশি কাঠ বা বোর্ডের কাজ করা হয় ততো বেশি সুন্দর হয়। বস্তুত সিলিংয়ে সামান্য কিছু ডিজাইন করাই যায়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে বিল্ডিং প্ল্যান পরিবর্তন করায় কিছু বিম এলোমেলোভাবে বেরিয়ে রুমের সৌন্দর্য ব্যাহত করে। তাই ফলস সিলিংয়ের প্রচলন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলস সিলিংয়ে হালকা লাইটের ব্যবহার লিভিংরুমের আবেদন বাড়ায় ছাড়া কমায় না। তবে খেয়াল রাখা জরুরি যাতে তা কমার্শিয়াল স্পেসগুলোর মতো জাঁকজমক না হয়। হালকা আলোর উৎসেও লিভিংরুমে নান্দনিক আবহ আনা সম্ভব।
এরপরই আসে ফ্লোর বা মেঝের সজ্জা। বাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কার্পেট পাওয়া যায়। রুমের আবহ আনুযায়ী কার্পেটের ব্যবহার লিভিংরুমকে আরো জীবন্ত করে তোলে। অনেকে আবার বাহারি টাইলস অথবা মার্বেল দিয়ে লিভিংরুমের মেঝের ডেকোরেশন করে থাকেন। এছাড়া আজকাল উডেন ফ্লোরের এফেক্ট দেয়ার জন্য অনেকে এমডিএফ-এর ওপর ভিনিয়ার্ড উড পেস্ট করা আর্টিফিশিয়াল ফ্লোর ব্যবহার করেন। তবে এমডিএফের ওপর ভিনিয়ার্ড উড পেস্ট করা আর্টিফিশিয়াল ফ্লোরের চেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং উডের ওপর পেস্টিং ভিনিয়ার্ড ফ্লোর বেশি টেকসই হয়।
লিভিংরুমের ফার্নিচার কেনার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে তা যেন রুমের সঙ্গে মানানসই হয়। অনেক সময় আমরা ভালো লাগা থেকে এমন সব ফার্নিচার কিনে আনি যা হয়তো রুমের আকার আনুযায়ী বড় কিংবা তুলনামূলক ছোট হয়ে যায়। এ দুটি ব্যাপারই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার হয়তো ঘরের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা ক্ল্যাসিকাল মুডে। অথচ ফার্নিচার আনা হলো কনটেম্পোরারি। তখন ঘর সাজানোর পুরো কাজটিই ভেস্তে যায়।
সবশেষে যা না বললেই নয় তা হলো, লিভিংরুমে যাতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস সঞ্চালনের ব্যবস্থা থাকেÑ অবশ্যই এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। বড় একটি খোলা জানালা অনেক দামি আসবাব সাজানোর চেয়ে অনেক সময় বেশি আবেদন সৃষ্টি করতে পারে।

 

ছবি: সোহানী’স ইনটেরিয়র

ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প

ফয়সাল শাহ

 

 

যা কিছু মানুষের প্রাণের রূপ, মনের সৃষ্টি চিত্র, মূর্তি, কবিতা, থালা-বাটি, হাঁড়ি-কলসি, আসপিঁড়ি, পুতুল, খেলনা, হাত, পা, কান, কণ্ঠ, সিঁথি ও শিরের ভূষণ সোনা, রুপা, তামা, পিতল, মণি-মাণিক্য, মুক্তা, শঙ্খ ও পুঁতিতে। জড় যদিও এর উপাদান তবুও চিন্ময় এর ছটা। বস্তুতে বস্তুতে এর নির্মাণ স্বপ্ন সত্যে, আরো সত্য এর স্থিতি ও গতি। সব শিল্প চেষ্টা ও সৃষ্টি অখ- মানব জীবনে অঙ্গীভূত। হৃদয় যদি দেহ, মন, হৃদয়, বৃত্তি বা চেতনায় কোনো একটি ভূমিতে আবদ্ধ না হয়, মানুষের শিল্প চেষ্টা ও সৃষ্টিও তাহলে সর্বতোমুখ। অখ- জীবন উপলব্ধি এবং সেটিকে সুষমাদানের প্রয়াস থেকে আসে যে শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা এর মূল সুর এক হলেও বিভিন্ন শাখার আঙ্গিক এবং আবেদনের তারতম্য আছে। নান্দনিক চেতনায় চালিত দৃশ্য, শ্রাব্য বা উচ্চারিত কোনো রূপকল্প ও প্রতীক নিয়ে শিল্পের জগৎ। দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয় নির্ভর সব সৃষ্টিকর্মের মধ্যে দর্শনেন্দ্রিয়গ্রাহ্য শিল্পের একটি জগৎ। দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয় শিরোনামে আলোচ্য। এখানে হাত ও হাতিয়ারের সাহায্যে তৈরি কয়েক পর্যায়ের যে শিল্প কর্ম আছে, যথেচ্ছভাবে সেগুলোকে আমরা লোক, কারু, হস্ত, কুটির ও ক্ষুদ্রশিল্প নামে অভিহিত করি। লোকশিল্প প্রাচীন সমাজের যে জাদু ও লৌকিক বিশ^াসের ছাপ বহন করে এর থেকে উদবর্তবাদের জন্ম। প্রাগৈতিহাসিক ও আদিম মানব সমাজের ধ্যান-ধারণা লোকজীবনে আচ্ছন্ন করে আছে। এর অভিব্যক্তি কখনো প্রচ্ছন্নভাবে, কখনো প্রকাশ্যে। লোকবিশ^াসের বৈশিষ্ট্য নিঃসন্দেহে লোকায়ত শিল্পকে করেছে অনন্য, দিয়েছে তাকে নিগূঢ় অর্থ। এ আদিমতার নির্যাস যে আজও লোকশিল্পে বর্তমান এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই বলে এ শিল্পের স্বতন্ত্র সত্তা অস্বীকার করা যায় না। ব্যবহারিক ঐন্দ্রজালিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়াও লোকশিল্পটি দেখতে হবে নিছক নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাছাড়া প্রাগৈতিহাসিক ও প্রাচীন শিল্পের প্রসার হয়েছিল সমাজের প্রাকস্বাক্ষরতা স্তরে।


বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যই গড়ে উঠেছে লোকসমাজের অবস্থান, ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, জীবন যাপন প্রণালি, আচার-আচরণ, বিশ^াস-সংস্কার ও মূল্যবোধ কেন্দ্র করে। লোকসমাজ দেশের জনগোষ্ঠীর প্রধান অংশ। তারাই পুরনো ঐতিহ্যের ধারক। তাদের জীবনধারা গড়ে উঠেছে নানান বৃত্তি-পেশা, ধর্ম ও রক্তধারার ভিত্তিতে। তবে এই লোকসমাজের বসবাস যে কেবল গ্রামে তা নয়, অনেকে শহরেরও বাসিন্দা। এই লোকসমাজের শিল্পচর্চার প্রমাণ মেলে বস্তগত উপাদানের মধ্যে। সাধারণ অর্থে এগুলোকে আমরা লোকশিল্প বলতে পারি। অত্যন্ত সহজ, সরলভাবে এসব শিল্পকর্ম তৈরি। এই শিল্পীরা তো সমাজের সাধারণ স্তরের মানুষ।
বাংলাদেশের লোকশিল্পের বিকাশ ও বিবর্তনে তিনটি ধারা দেখা যায়, ধর্মীয় (জরঃঁধষ), আলঙ্করিক (উবপড়ৎধঃরাব) ও ব্যবহারিক (টঃরষরঃধৎরধহ)। লোকশিল্পের উপাদানগুলো শ্রেণীবিন্যস্ত করতে গেলে এই ধারাগুলোর বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের লোকশিল্পের মূল উপাদান মাটি, বাঁশ, বেত, সুতা, কাপড়, কাঠ। মাটি দিয়ে তৈরি তৈজসপত্র, খেলনা, পুতুল, পিঠার ছাঁচ। কাপড়, সুতা, পাট দিয়ে তৈরি নকশি কাঁথা, নকশি শিকা, নকশি পাখা। কাঠ দিয়ে তৈরি পুতুল, বাদ্যযন্ত্র ও পটচিত্র, পুঁথির পাটাচিত্র। বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি বোনা শিল্প এক সময় নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল। এ দেশের মানুষের এসব লোকশিল্পের ক্ষেত্র বড় বিস্তৃত।
আমাদের লোকশিল্পের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন মেলে মৃৎশিল্পে। এই শিল্পের প্রাচীনতম ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া গেছে চৎড়ঃড় ওহফরধহ ঈঁষঃঁৎব-এ সিন্ধু সভ্যতার প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে। আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার ওই পোড়ামাটির পুতুলে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে বাংলাদেশের পাহাড়পুর ও ময়নামতি বৌদ্ধবিহারে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলক ও পুতুলের সঙ্গে। তারা ওই সাদৃশ্যের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, পোড়ামাটির শিল্পের কাল উত্তীর্ণ (ঞরসবষবংং) যে ধারাটির সূত্রপাত ঘটেছিল সিন্ধু অঞ্চলে তা আমাদের এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল পর্যন্ত পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়েছিল। পোড়ামাটির শিল্প তৈরির উপকরণগুলো এবং এ প্রযুক্তি (ঞবপযহরয়ঁব) বিশ্লেষণ করলে সব অনুসন্ধ্যিৎসু ব্যক্তির কাছেই বিষয়টি অবশ্য পরিষ্কার হবে।


সূচি শিল্পের কথাও যদি বলি তাহলে সেখানেও দেখবো ওই সিন্ধু সভ্যতায় আবিষ্কৃৃত মূর্তিতে সূচি শিল্পের নকশা করা পোশাকের নিদর্শন। ১৯২৯ সালে পর্তুগিজ মিশনারি সেবাস্তিয়ান ম্যানরিক উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব জিনিস তারা নিয়ে যেতেন এর মধ্যে বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল লোকশিল্পজাত সূচি শিল্প। এই সোনারগাঁওয়ের সঙ্গে প্রায় পরিপূরক একটি শব্দ মসলিন কাপড়। সোনারগাঁওয়ে তৈরি এই মসলিন কাপড় দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছিল। এটি বিদেশে রফতানি হয়। এই শিল্পকর্ম নিয়ে কিংবদন্তিরও অন্ত নেই। তাই যুগে যুগে বাংলার লোকজশিল্প সব সময় সব শিল্পের অফুরন্ত আধার ও উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। ভবিষ্যতের শিল্পীদেরও এই উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
লোকশিল্প ঐতিহ্যবাহী এ কারণে যে, তা মোটিফ, প্রতীক ও অলঙ্করণের ধাঁচ পুরুষানুক্রমে ধরে রাখতে সক্ষম। এ শিল্প সদ্য সব ঐতিহ্যের সৃষ্টি করে। মৌলিক পরিচয় হারিয়ে নিছক অলঙ্করণে রূপান্তরিত হয়েছে এমন সব রূপকল্পে নতুন মর্ম আরোপ করে এর পুনঃপ্রবর্তনে লোকায়ত এ শিল্প। কারণ কোনো গোঁড়া মতবাদ দ্বারা তা শৃঙ্খলিত নয়। লোকশিল্পে শিল্পীর অবস্থান ততোটা উদগত নয়। কেননা এ শিল্পটি নিছক ব্যক্তি বিশেষের সৃজনশীলতা না বলে বলা যায়, একটি সঞ্চিত মৌলিকত্ব। এর আত্মপ্রকাশের স্বীকৃতির পাশাপাশি আছে সম্প্রদায়ের যৌথ অভিব্যক্তি।
একাডেমিক আর্ট বা আধুনিক চিত্রকলার সঙ্গে লোকশিল্পের তফাত হলো, চারুশিল্পী উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে তার শিল্পকর্মে হাত দেন। তার সৃষ্টিতে স্বীয় ‘কপিরাইট’ স্বীকৃত। তার অনুকারী চৌর্যবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন। তিনি পরিশীলিত ব্যক্তি এবং পরিশীলিতজনের উদ্দেশ্যে তার সৃষ্টি! লোকশিল্পের মালিকানা গোটা গ্রামীণ সমাজের। তার অনুকরণ দোষণীয় নয়। তার কদর সরল-সহজ সমাজে। তবে পরিশীলিতজনের কাছেও তার আবেদন ব্যর্থ নয়। দরবারি অথবা বিদগ্ধ শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে লোকশিল্পের আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, প্রথমোক্ত শিল্পের পরস্পরের সম্পর্ক শিথিল। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্পÑ প্রতিটির ক্ষেত্র আলাদা এবং একের আঙিনায় অপরের প্রবেশ বড় একটা দেখা যায় না। লোকশিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম অন্যান্য নির্ভর পরস্পর প্রবিষ্ট। ওই সূত্র তৈরি করে উদ্দেশ্যের ঐক্য, শ্রম ব্যবস্থা বিন্যাস, সামাজিক পারঙ্গমতা, নির্ভরশীলতা। একই ব্যক্তি বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পী। একই শিল্পী খেলনা পুতুল তৈরি করছেন, অন্য সময় ঘরবাড়ি, কোনো সময় প্রতিমা। এ যোগসূত্রের ফলে গড়ে ওঠে সর্বাশ্রয়ী ডিজাইন। প্রাত্যহিক জীবন সম্পৃক্ত বলে লোকশিল্পের সংক্ষিপ্ত সংযমী গড়ন। বাহুল্যবিহীন বলে, ফর্ম ও ডিজাইন যথাযথ। অধুনা পরিশীলিত পরিবেশে লোকশিল্পের অবস্থান চিহ্নিত করে এর পরিচয় দেয়া হয়।


আবহমান বাংলার লোকজশিল্প গভীর জীবনভেদী একটি চলমান স্রোত। তা নীরবে-নিভৃতে কারোর প্রতি দৃষ্টি বা মুখাপেক্ষী না হয়ে একমনে অন্তস্থিত একটি নদীর ফল্গুধারার মতো স্রোতোস্বিনী হয়ে বয়ে যায় কালে কালে। এটি ওই দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি ঋদ্ধিমান অবস্থানের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যময় কারুকাজ মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্পের তাঁত ও তস্তুজাত সৃষ্টিশীলতা, বাঁশের কাজ, লোহা ও পিতলের কাজ, দারুশিল্প, দড়ি ও বেতের কাজ, পাটজাত দ্রব্যের বহুবিধ ব্যবহারিক কাজের জন্য শিল্প, নকশি কাঁথা শিল্প, লোকজস্থাপত্য, রন্ধন শিল্প, নৃত্যসঙ্গীত, চিত্রশিল্প, সাহিত্য, কাব্য। মোট কথা, জীবন যাপনের জন্য সাধারণ মানুষের আবেগ, নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা, উপযোগিতা ও উপস্থাপনাসহ একটি সম্পূর্ণ এবং যথার্থ চলমান শিল্প স্রোত আধুনিক শিল্প বহুলাংশে প্রাগুক্তধারা থেকে নিজের জন্য অনায়াসে হাত বাড়িয়ে সাহায্য গ্রহণ করে একটি নতুন উপস্থাপনায় হাজির হয়ে ওই শিল্পের একটি নান্দনিক মাত্রা অর্জনে সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আধুনিকধারার শিল্পটি গ্রহণ করে বা না করে সাধারণ কিংবা অসাধারণ মানুষ অনায়াসে জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু লোকজধারার বেলায় অন্য চিত্র। লোকজশিল্প সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে বাদ দিয়ে তাদের জীবন চলে না। তাই বাংলাদেশের লোকশিল্প খুবই শক্তিশালী ও ঐতিহ্যময় এবং গৌরবের। যেহেতু এটি মৌলিক, আদি ও স্বয়ম্ভূ সেহেতু বহুমাত্রিক। আধুনিক শিল্পের বিকাশ লোকজধারা থেকে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত, বিবর্তিত, উন্মেষিত ও পরিশীলিত হয়ে হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।
প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনে নতুনের আবির্ভাব ঘটেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হচ্ছে। এতে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে চাহিদা ও রুচির ক্ষেত্রে। বিশ^জুড়ে এই যে আবহ তৈরি হয়েছে এর ছোঁয়া আমাদের দেশেও এসে পৌঁছেছে। গ্রামগুলো দ্রুত যেন শহুরে রূপ লাভ করেছে। নিদেনপক্ষে শহরের প্রভাব সেখানে পৌঁছে যাচ্ছে। বাংলাদেশে লোকশিল্পের ইতিহাস পর্যলোচনা করলে দেখা যায়, এর বিকাশ প্রায় রুদ্ধই। এর পেছনে কারণ অনেক। প্রধান কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতির ভোগবাদপ্রবণ প্রভাব। ওই প্রভাবই অক্টোপাসের মতো হাত-পা বিস্তার করে অতি দ্রুতই শাখা বেড়ে দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা আমাদের পুরনো সমাজ কাঠামো ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। আত্মকেন্দ্রিকতা, ব্যক্তিস্বার্থপরতা দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধনে চিড় ধরাচ্ছে। প্রযুক্তি ও মিডিয়ার কল্যাণে এর ফল রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামগঞ্জেও। যৌথ পরিবার ছেড়ে অনেকেই এখন আলদা হয়ে ছোট পরিবারে জীবন যাপন করতে আগ্রহী হচ্ছেন।


আমাদের আবহমানকাল ধরে গড়ে ওঠা একটি গৌরবময় ও সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে, আছে একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। আহার-বিহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-বিশ^াসে তো কোনো কৃত্রিমতা নেই। এ জন্যই তো লড়াই করে ভূখ- জয়ের আকাক্সক্ষা জেগেছিল এ দেশের মানুষের। প্রত্যাশা ছিল জনগোষ্ঠীর জীবনের নিজস্ব ‘প্যাটার্ন অফ লাইফ’ সংরক্ষণ করা। আধুনিকতা ও বিশ^ায়নের জোয়ারে তা কি হারিয়ে যাবে?
আমাদের দেশে তো ভৌগোলিক পরিবর্তন হয়েছে। মেঠোপথ দ্রুতই রাজপথ হয়ে যাচ্ছে। লোকযানের পরিবর্তে চলছে যান্ত্রিক যানবাহন। নদীগুলো ক্রমান্বয়ে পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নাব্য নদীগুলোয় চলে যান্ত্রিক যানবাহন। এ জন্য সময়ের চাহিদা ও রুচির পরিবর্তনেই হারিয়ে যাচ্ছে জনপ্রিয় লোকশিল্প ও কারুশিল্পের বিভিন্ন নিদর্শনÑ যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহীর নকশি কাঁথা, কাগমারী-ধামরাইয়ের পিতল-কাঁসা শিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, সিলেটের শীতলপাটি, চট্টগ্রামের ঝুড়ি বোনা শিল্প, সোনারগাঁওয়ের দারু ও ঝিনুক শিল্প ও অন্যান্য। এসব পণ্যের বাজার না থাকা এবং নৃতত্ত্বের ভাষায় উপযোগিতা ও ফ্যাশনহীনতার জন্য অধিকাংশ বনেদি লোকশিল্পী পরিবারই পেশা বদল করেছে। জীবিকার জন্য যে পথ তাদের বেছে নিতে হয়েছে এর সঙ্গে পূর্ব পুরুষের পেশার সম্পর্কই নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ, নগরায়নের দ্রুত বিস্তার সময়ের বিষয়। পরিবর্তনের এই জোয়ার তো অপ্রতিরোধ্য। এ পরিবর্তন চলতেই থাকবে। এক্ষেত্রে আমাদের কাজ হবে একটিই। তা হলো, আমরা যেন নিজেদের ইচ্ছা ও পছন্দমতো ওই পরিবর্তনটি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের লোকশিল্পের উপাদানটি রূপান্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, রূপান্তর ততোটুকুই হবে যতোটুকুতে দেশের মাটির স্পর্শ ও ঘ্রাণ থাকবে। শিল্পের উপাদান ঠিক রেখে নকশায় একটু রূপান্তর আনাই যেতে পারে কিংবা নকশার মোটিফ ঠিক রেখে উপাদানে একটু পরিবর্তন আনাই যেতে পারে।
বাংলাদেশের লোকশিল্পের ঐতিহ্য রক্ষা করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য বলে আমি মনে করিÑ
 

- লোকশিল্পসহ লোকসংস্কৃতির সব বিষয় চর্চা ও গবেষণার জন্য দেশে জাতীয় লোকশিল্প ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা।
- লোকশিল্প অঞ্চল সনাক্তকরণ।
- লোকশিল্পের প্রদর্শন, ডকুমেন্টেশন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।
- পুনরুজ্জীবিত করার জন্য লোকশিল্পীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান।
- লোকশিল্পের দিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা।
- লোকশিল্প বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।
 পাঠ্যবইয়ে লোকশিল্পের বিষয়ে প্রবন্ধ ও নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তকরণ।

ঐতিহ্যবাহী কাঁসাশিল্পের সেকাল-একাল

নূর কামরুন নাহার

 

বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে প্রাচীন চারু ও কারুশিল্প। নন্দনতাত্ত্বিক দিক দিয়েও এই চারু ও কারুশিল্পের রয়েছে ব্যাপক গুরুত্ব। বগুড়ার মহাস্থান গড়, কুমিল্ল¬ার ময়নামতি এবং অতি সম্প্রতি নরসিংদী জেলার ওয়ারী বটেশ্বরীর খননকার্য এই প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৫০০ অব্দ থেকে প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীরা মৃৎশিল্প, লৌহ নির্মিত হাতিয়ার, কাঠের তৈরি সামগ্রী, ধাতব বিভিন্ন কৃষি সামগ্রী, ধর্মীয় ও গৃহকর্মের জন্য নানা সামগ্রী প্রস্তত করতো। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো যেমন বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও বিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে তেমনি
মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং তাদের আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশও প্রতিফলিত করে।
চারু ও কারুশিল্প সামগ্রীকে মোটা দাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় Ñ
ক. দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী
খ. ধর্মীয় ও উৎসব-অনুষ্ঠানের সামগ্রী
গ. ব্যক্তিগত সাজসজ্জার সামগ্রী
ঘ. সম্প্রদায় বিশেষের জন্য স্থাপত্যশিল্প (যাযাবর, আদিবাসী, পশুপালন, কৃষি)
ঙ. গ্রামীণ বা কোনো সম্প্রদায়ের জন্য স্থাপনা
চ. ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী (ধাতব মুদ্রা ইত্যাদি) এবং
ছ. দৃষ্টিনন্দন (আনন্দ, উৎসব ও উপভোগের সামগ্রী)। এসব শিল্পকর্মে যাজক সম্প্রদায়, রাজা ও ধনাঢ্য শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। তামা, ব্রোঞ্জ, পিতল, কাঁসার তৈরি এসব শিল্পকর্মের নানান উদ্দেশ্য ও ব্যবহার থাকলেও এগুলো বাংলার জীবন আচরণ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং বাংলার ঐতিহ্য প্রকাশ করে।
প্রাচীন তৈজসপত্র বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে কাঁসার তৈজসপত্র। একটা সময় ছিল যখন কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র বাড়ি ও বংশের ঐতিহ্য প্রকাশ করতো। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ও বনেদি ঘরে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট কাঁসার থালা ছিল। এসব কাঁসার থালা ও সামগ্রীর কোনো
কোনোটির ওপর থাকতো বাহারি নকশা। বাড়ির কর্তার থালাটি হয়তো থাকতো একটু বড় অথবা বেশি কারুকার্যময়। এতে সংসারে কর্তার কর্তৃত্বকে প্রকাশ করতো। কাঁসার এসব সামগ্রী শুধু নিত্যপ্রয়োজনে ব্যবহার করা হতো তা নয়, এগুলো মানুষের শৌখিনতাও প্রকাশ করতো। এসব জিনিসে অনেক সময় ব্যবহারকারীর নাম উৎকীর্ণ করা থাকতো। প্রত্যেকের ঘরেই তখন শোভা পেতো কাঁসার থালা, বাটি, জগ, গ্লাস, পাতিল, গামলা, কলসি, বালতি, পানদানিসহ নানান কিছু। অনেকে কাঁসার তৈরি শৌখিন হুঁক্কাও ব্যবহার করতেন। এমনকি ইঁদারা ও কুয়ার পাড়ে কাঁসার বদনা ব্যবহার হতো। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে কাঁসার জিনিসপত্র উপহার দেয়া ছিল বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ। যাকে উপহার দেয়া হতো তার নাম এবং যিনি উপহার দিতেন তার নাম খোদাই করা থাকতো এসব সামগ্রীতে। শিল্পের মর্যাদায় কাঁসা এতোটাই উপরে ছিল যে, কারো ঘরের আভিজাত্য নির্ণিত হতো বাড়িতে রক্ষিত কাঁসার তৈজসপত্র দেখে। দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে কাঁসাশিল্পীদেরও ছিল বেশ নামডাক। এই শিল্পীদের আলাদা মর্যাদাও ছিলো সমাজে। এই শিল্পীরা কে কতো নিখুঁত ও ঝকঝকে কাঁসার বাসন বানাতে পারেন এর প্রতিযোগিতা হতো।

কাঁসা শিল্প
শিল্পীদের নিবেদন, একনিষ্ঠতা ও প্রতিযোগিতা কাঁসা শিল্পটিকে নিয়ে গিয়েছিল বহুদূর। ইতিহাসের ওই পটভূমিতে দেখা যায় কয়েক হাজার বছর আগে কয়েকটি সভ্যতাজুড়ে রয়েছে এই কাঁসা শিল্প। এর প্রমাণসরূপ প্রতœতত্ত্ববিদরা দেশের অনেক স্থানে খনন করে আজও কাঁসার জিনিস পাচ্ছেন। টাঙ্গাইল, ধামরাই, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, পাবনা এলাকা ছিল কাঁসার জিনিসপত্রের অন্যতম এলাকা। বিশেষ করে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল ও ঢাকার ধামরাই ছিল কাঁসা শিল্পের সূতিকাগার। এছাড়া দেশের প্রতিটি কোণায় গড়ে উঠেছিল কাঁসা শিল্প। টাঙ্গাইল ও ধামরাইয়ের কাঁসা সামগ্রী রফতানি হতো বিদেশেও। সুন্দর কারুকাজ, নান্দনিক ও গুণগত মানে এ দেশের কাঁসার জিনিসপত্র এতোটাই নাম কুড়িয়েছিল যে, ব্রিটিশ শাসকরা কাঁসাশিল্পীদের প্রশংসা করে পুরস্কার ও পদক দিয়েছিল। তাদের মধ্যে আছেন টাঙ্গাইলের মধুসূদন কর্মকার, গণেশ কর্মকার, বসন্ত কর্মকার, যোগেশ কর্মকার ও হারান কর্মকার।

কাঁসা শিল্পের পূর্বকথা
বাংলাদেশ বা অবিভক্ত বাংলায় কাঁসা-পিতলের প্রচলন কবে শুরু হয়েছিল তা সঠিক করে বলা যায় না। প্রতœতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীন সভ্যতার আমলে ব্রোঞ্জ শিল্প ব্যবহার থেকেই এর শুরু। আবার কেউ কেউ এটিকে মহাস্থানগড়ের সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। ১৫৭৬-১৭৫৭ সনে মোগল আমলে এ
উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে কাঁসা-পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ আমলেও এ শিল্পের প্রসার ঘটে। তবে বলা হয়, রাজা গৌড় গোবিন্দের শাসন আমলে উপমহাদেশে ভারতের কংস বণিকদের মাধ্যমে এই দেশে কাঁসা শিল্পের প্রচলন হয়। ওই হিসাবে কংস বণিকরাই কাঁসা শিল্পের উদ্ভাবক।

একটা সময় সব ধর্মের মানুষের কাছে কাঁসা শিল্প ছিল জীবন যাপনের অংশ। সব আচার-অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় কাঁসার ব্যবহার। মণিকাররা যেমন গহনা বানানোর কারিগর হিসেবে গর্ব করতেন তেমন কাঁসার শিল্পীরাও বনেদিদের আভিজাত্য রক্ষায় গর্ব করতেন। কাঁসার তৈরি ভাস্কর্য প্রচুর সুনাম কুড়ায়। প্রাচীন জিনিসপত্র ও ভাস্কর্য দেখে ধামরাইয়ের শিল্পীরা প্রথমে কাঁসা দিয়ে নানান ভাস্কর্য বানান। এরপর পিতল ও তামার ব্যবহার শুরু করেন। এখন পর্যন্ত কাঁসা, তামা, পিতল দিয়ে ছোট-বড় ভাস্কর্য ধামরাইয়েই বানানো হচ্ছে। রথযাত্রার ওপরও বড় ভাস্কর্য বানিয়েছেন ধামরাইয়ের কাঁসা শিল্পীরা।

অলঙ্কার ও শোপিস সামগ্রী
সোনা-রুপা অলঙ্কারের সঙ্গে তামা-পিতল অলঙ্কারেরও ব্যবহার ছিল এক সময়। এছাড়া পিতলের ফুলদানি, আতরদানি, ট্রে, বিভিন্ন শোপিসের প্রচলন ছিল। গ্রামের কারিগর পাতা, ফুল, পাখি, মাছ, চাঁদ, তারা ইত্যাদির অবিকল নকল করে এক বিশেষ ধরনের অলঙ্কার তৈরি করতেন। পিতল দিয়ে অবিকল বিভিন্ন প্রাণীর অবয়বে তৈরি করা হতো নানান শোপিস। অতীতে অলঙ্কার ও শোপিস সামগ্রী তৈরি একটি পারিবারিক পেশা ছিল। কারিগররা মন্দির ও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও সমৃদ্ধ পরিবার-পরিজনের জন্য হাতে তৈরি সোনা, রুপা, পিতল ইত্যাদি সামগ্রীÑ আতরদানি, গোলাপ জলের পাত্র, চামচ, পানির বোল বা গামলা ও তরবারির খাপ ইত্যাদি তৈরি করতেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ার বিলুপ্ত কাঁসা-পিতলের ঐতিহ্য
সত্তরের দশকের মধ্যভাগে সিরামিকের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হওয়ায় কাঁসার সামগ্রীর ওপর প্রথম বড় আঘাত আসে। সিরামিকের প্লে¬ট, গ্ল¬াস, কাপ, পিরিচ, জগ নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের ঘরে প্রবেশ করে। আসে বাহরি ডিনারসেটসহ বিশেষ ধরনের সিরামিক সামগ্রী ও কাচের তৈরি বাসনে-কোসন। এছাড়া আসে স্টিলের নানান সুন্দর বাসন-কোসন।
আশির দশকে সিরামিক আর স্টিলের সঙ্গে পাল্লা দিতে আসে মেলামাইন। রকমারি ও নজরকাড়া ডিজাইনে সিরামিক, মেলামাইন ঘরে ঘরে প্রবেশ করে কাঁসাটি হটিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে কাঁসার বাসন-কোসন হয়ে পড়ে অচেনা। কালেভদ্রে কোনো বাড়িতে এখন কাঁসার যে জিনিস দেখা যায় তা অ্যান্টিকস হিসেবেই সংরক্ষিত। এসব জিনিস হয়তো স্মৃতিকাতরতা আনে। এগুলোর সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে আছে পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি।

কাঁসাশিল্পীদের দুর্দিন
কামারের হাতুড়ির আওয়াজে যে গ্রাম আর বাজারগুলো মুখরিত হয়ে থাকতো এক সময়Ñ সেগুলো এখন নীবর এবং কারিগরশূন্য হয়ে জানান দিচ্ছে কাঁসা শিল্পের চরম দুগর্তির কথা।
কাঁসার নির্বাসনে এবং নানান প্রতিকূলতায় কাঁসাশিল্পে নিয়োজিত প্রায় আশি হাজার থেকে এক লাখ কারিগরের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। এরই মধ্যে বহু শ্রমিক পেটের দায়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। অনেকে জীবিকার অন্বেষণে চলে গেছেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। হিন্দুদের বিয়ে-শাদি ও পূজা-পার্বণে কাঁসার ব্যবহারটি পূত-পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ঢাকার জিঞ্জিরা, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও বিক্রমপুরে কাঁসা শিল্প কোনোমতে টিকে আছে।
কাঁসাশিল্পীরা বলেন, এককালে কাঁসা শিল্পের চাহিদা ছিল এবং মানমর্যাদা ছিল শিল্পীদের। ভাগ্যের দুর্বিপাকে এ পেশায় নেমে এসেছে দুর্দিন। মনোরম চোখ ধাঁধানো আকর্ষণীয় স্টিলের সামগ্রী, মেলামাইন ও দেশ-বিদেশের নজরকাড়া কাচের রকমারি সামগ্রীর কারণে কাঁসা শিল্প চরমভাবে মার খাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য সামগ্রীর তুলনায় কাঁসার মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণেও ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে কাঁচামালের মূল্যও অত্যন্ত চড়া। ফলে আগের মতো আর পুষিয়ে উঠতে পারছেন না কাঁসারুরা।
কাঁসাশিল্পীরা জানান, তারা ঢাকার বকশীবাজার থেকে ২০০-২২০ টাকা কেজিতে কাঁচামাল কিনে নানান সামগ্রী তৈরি করে তা বিক্রি করেন মাত্র ২৭০ টাকায়। তবে পাইকাররা তাদের কাছ থেকে কম দামে কিনলেও বেশি দামে বিক্রি করেন।
শত প্রতিবন্ধকতা আর চরম হতাশার মধ্যেও কাঁসাশিল্পীরা সযতেœ কাঁসা দিয়ে কলস, বাটি, বালতি, পানদানি, প্রদীপ, ফুলের টব, গামলা, তবলা, ডিশ, থালা-বাসন, মূর্তি ও দাঁড়িপাল্লাসহ সৌন্দর্যবর্ধক নানান সামগ্রী তৈরি করে তা বাজারজাত করছেন। এই শিল্পে ভর করে এখনো দেশের হাজার হাজার কাঁসাশিল্পী বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

কাঁসা শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
তামা-পিতলে শুধুই বাসন-কোসনই নয়, এই তামা-পিতলে তৈরি হতে পারে নিঁখুত সব ভাস্কর্য। এরই বাস্তব প্রমাণ ঢাকা থেকে মাত্র ২০
কিলোমিটার উত্তরে ধামরাইয়ে।
সত্তরের দশক পর্যন্ত সত্যিকারেরর অ্যান্টিকই কেনাবেচা হতো ধামরাইয়ে। অ্যান্টিক যখন শেষ হয়ে যেতে লাগলো তখন এর মতো ভাস্কর্য তৈরি ও বিক্রি করার আগ্রহ বাড়তে থাকে। এ আগ্রহ থেকেই আশির দশকে এখানে কাঁসা-পিতলের ভাস্কর্য নির্মাণ করা শুরু হয়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে এ ভাস্কর্য খুব বেশি আলোচিত না হলেও প্রতি বছর ধামরাইয়ের এই তামাপল্লী ঘুরে দেখে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাস্কর্যপ্রেমীরা।
ধামরাই মেটাল ক্রাফটের স্বত্বাধিকারী সুকান্ত প্রায় ২২ কর্মীকে নিয়ে মূর্তি গড়ার কাজ করে থাকেন। তামা দিয়ে নিখুঁত নারীমূর্তি, দাবার ছক, হাতির পিঠে রাজাÑ এমন দুর্লভ ও নান্দনিক ভাস্কর্য তৈরি করেছেন তিনি। যে বিশেষ ভাস্কর্যটি তৈরি করা হবে মোম দিয়ে এর একটি অবয়ব বানানো হয়। এরপর এতে নানান নকশা ও সুক্ষ্ম কারুকাজগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। এরপর মোমের ওই মূর্তির ওপরে দেয়া হয় তিন স্তরের মাটির প্রলেপ। এরপর তা পোড়ানো হয়। ভেতর থেকে মোমের মূর্তিটি গলে বেরিয়ে আসে। থেকে যায় শুধু মাটির ছাচে মোমের মূর্তির প্রতিবিম্ব। এরপর ওই মাটির ছাঁচে গলিত তামা ঢুকিয়ে তৈরি করা হয় এই ভাস্কর্যগুলো। বর্তমানে এই ভাস্কর্যগুলোর প্রধান ক্রেতা হলো বিদেশি ভাস্কর্য ব্যবসায়ীরা।
সুকান্ত বণিক জানান, মাত্র ৮০০ ডলারে কেনা মূর্তিগুলো বিদেশিরা ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দাম চড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছেন। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই শিল্পের চাহিদা আছে ব্যাপক। ভারতে এ ধরনের মূর্তি তৈরি হলেও উৎপাদন পদ্ধতি খুব বেশি বাণিজ্যিক হওয়ায় তাদের ওইগুলো আমাদের দেশের ভাস্কর্যের মতো এতোটা নিঁখুত হয় না। তিনি জানান, এক ফরাসি পর্যটকের কাছে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেন তামা-কাঁসায় গড়া একটি শীতলা মূর্তি। দক্ষ হাতে গড়া অসাধারণ কারুকার্যময় ওই পৌরণিক ভাস্কর্যের রেপ্লিকায় মুগ্ধ ফরাসি পর্যটক দেশে ফিরেই আরো ছয়টি কাজের ফরমায়েশ পাঠান। সেগুলো ফ্রান্সে পাঠানোর সময় বিমানবন্দরের শুল্ক বিভাগ পুরাকীর্তি বলে সন্দেহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠায় সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগে। এক বছর পর সেগুলো পুরাকীর্তি নয় বলে ছাড়পত্র দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বে হতাশ ওই ফরাসি পর্যটক এরই মধ্যে বাতিল করে দেন অর্ডার।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের মেটাল হাউসের নামে রফতানি লাইসেন্স আছে। সব ভাস্কর্যের গায়ে নিয়ম অনুসারে খোদাই করে কারখানা ও উৎপাদনের তারিখও দেয়া থাকে। এরপরও পুরাকীর্তি পাচারের বিষয় আসে কী করে? পাশের দেশ ভারত, নেপালে
একদিনের মধ্যে এসব পণ্যের ছাড়পত্র দেয়া হয়। আমাদের দেশে বড়জোর এক সপ্তাহ লাগতে পারে। তাই বলে এক বছর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ধামরাইয়ের আরেক কাঁসারু প্রকাশ বণিক বলেন, ‘আমাদের এখানে লস্ট ওয়াক্স পদ্ধতিতে এগুলো তৈরি করা হয়। তা পুরোটাই দক্ষ হাতের শৈল্পিক কাজ। এ কারণে আমাদের সামগ্রীগুলো বিদেশিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

হিন্দু দেব-দেবী ও পৌরণিক চরিত্রের রেপ্লিকা বা ভাস্কর্য তৈরির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো পথে হাঁটছে এই শিল্প। এসব চরিত্রই কেবল গড়া হচ্ছে না, ঘরসজ্জার নান্দনিক উপকরণও তৈরি হচ্ছে ধামরাই এবং পাশের শিমুলিয়ায়। কারিগররা নিপুণ হাতে সৃষ্টি করছেন গৃহসজ্জার উপকরণ, পশু-পাখির মূর্তি, দাবার ছকসহ শৈল্পিক পণ্য। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও এ পণ্যগুলো চাহিদা বাড়ছে।
তামা-পিতল, কাঁসা ও অষ্টধাতুতে গড়া শিল্পকর্মগুলো নিয়ে কোনো প্রচার বা উদ্যোগ নেই। এই ধরনের তামা-পিতলের ভাস্কর্য বানানোর প্রয়াস আমাদের দেশে ধামরাই ছাড়া আর কোথাও নেই। অবশ্য ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় কিছু শিল্প তৈরির প্রয়াস থাকলেও তা কেবল নান্দনিক বাসন-কোসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রফতানি ছাড়পত্রের জটিলতায় এই শিল্পের বিকাশ বিঘিœত হচ্ছে বলে মনে করেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।
পুরাকীর্তি পাচারের অভিযোগে আটক হওয়ার ভয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিবাসী বাংলাদেশিরাও তামা-কাঁসায় গড়া শিল্পপণ্য বিদেশে নিতে সাহস দেখান না। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেতে কখনো কখনো সময় লাগে এক থেকে দেড় বছর। ফলে বিদেশের বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এ পথে পা মাড়াচ্ছেন অনেক আগ্রহী উদ্যোক্তা। কিন্তু কারুকাজ ও শিল্প সৌন্দর্যে আমাদের দেশের কাঁসারুরা অদ্বিতীয়। কারণ নানান
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বংশ পরম্পরায় দক্ষ এক শিল্পী সম্প্রদায় যুক্ত আছেন এ পেশায়। রফতানি বাজারে এ শিল্প দিয়ে দারুণভাবে অবস্থান করে নিতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত পড়ে আছে অবহেলায়। সরকার এ শিল্পের প্রসারে বিশেষ নজর দিলে এটি তার হারানো ঐতিহ্য ফেরত পাওয়াসহ দেশের সুনাম ছড়িয়ে দিতে পারে। ওই সঙ্গে আনতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

 

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু 

আমার যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু অর্জন করি 

নাসরিন বেগম

 

সহজ : আপনার আঁকা ছবির বিষয় ও উৎস সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম : ১৯৯৪ সালে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে মেডিটেশন করতাম। তখন পাইওনিয়ার ব্যাচে ছিলাম। ওই সময়ের কোয়ান্টাম বর্তমান অবস্থার মতো ছিল না। ওই কোর্সের মধ্যে অনেক বিষয় ছিল। এর মধ্যে আমার যে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো মহাজাতক আমাদের বলতেন, ‘আপনাদের মধ্যে হীরা, মণি, মুক্তা, জহরতÑ সবই আছে। তবে এগুলো ছড়ানো-ছিটানো। আমি সেগুলোর মালা গেঁথে দিয়ে দিলাম।’ এই কথাগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগতো। আরেকটি মজার বিষয় হলো স্পেইসে ভ্রমণ করানো। এটি আমার খুবই প্রিয় বিষয়। মেডিটেশনের মাধ্যমে কাল্পনিক স্পেইসে ঘুরে আবার যখন আমাদের নিয়ে আসা হয় তখন আমি সেখানেই থেকে যাই। এরপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে ওঠানো হয়। আরেকটি হলো সমুদ্রে ভ্রমণ করানো। মহাজাতক আমাদের বলতেন, ভাবেন, আপনিই সমুদ্র। ওই সমুদ্রই আমার ছবির মধ্যে প্রধান্য পেয়েছে। সেন্ট মার্টিনসে যখন গিয়েছিলাম তখন একটা জিনিস দেখলাম, ডোবার মতো কিছু গর্ত আছে সেখানে। ভাটার সময় সেখানে বসলাম। পানির মধ্যে থাকা ছোট ছোট শামুক-ঝিনুক আমার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। পরে এসে তা আঁকলাম এবং রিফ্লেকশ করলাম, আমিই সমুদ্রকন্যা। সবকিছু আমাকে ঘিরেই। এ জন্য আমার সব ছবিই মেয়ে চরিত্র। আসলে সবকিছুরই পেছনে একটা ইতিহাস থাকে। আমি সাধারণত যে কোনো কোর্স করতে গেলে আমার যতোটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু নিই। আমার স্কুল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষার কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলবো কোয়ান্টাম মেথডের কথা।

সহজ : চিত্রকলার মানুষ হিসেবে এর পাঠ্যকলা সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম: আসলে আমার পাঠ্যকলা কিছুই না। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতাম। স্কুল থাকলে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। স্কুল থেকে এসে নিজের কাজ নিজেরই করতে হতো।

সহজ : আপনার শিল্পকলায় আসার ব্যাপারে কার অবদান রয়েছে?
নাসরিন বেগম : আমার মা। তিনিই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। আমার মা খুবই সংস্কৃতিমনা ছিলেন। বাবা ছিলেন খুব সাধারণ মানুষ। বাবার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা ছিল না আমি কী করছি বা না করছি। আমার মা খুবই গুণী ব্যক্তি। তিনি বই পড়া, সেলাই ইত্যাদি করতেন। আরেকটা বিষয় মনে পড়ে গেল, ওরিয়েন্টাল আর্টটা এসেছে এমব্রয়ডারি থেকে।

সহজ : ছোটবেলায় কী ধবনের ছবি আঁকতেন?
নাসরিন বেগম : আমরা সবাই এমব্রয়ডারি করতাম। আমার সব বোনই তা পারতেন। ছোটবেলাতেই অ্যানামেল পেইন্টের কাজ করতাম। এ কাজ করা বেশ কঠিন। তাছাড়া আমাদের পরিবারের সবাই নিজের কাজ নিজেই করতেন। আমি এতো ছবি আঁকতাম যে, অংক করতে পারতাম না। এক সময় আমার মনে হলো, অংকে ফার্স্ট হতে হবে আমাকে। এরপর ফার্স্ট হই। এরপর থেকে অংক কষা ও ছবি আঁকা দুটিই সমানতালে চলতে থাকে।

সহজ : বর্তমান চিত্রগত প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
নাসরিন বেগম : আর্ট অ্যানিমেশন সিনেমা আমার অনেক পছন্দের। মনে হয় যেন জীবন্ত। যেমন ‘আইস এইজ’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের কথা বলা যাক। এর প্রতিটি চরিত্র, গ্রাফিক্স কী অসাধারণ! এটি আমার এতো ভালো লেগেছে যে, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সহজ : আপনার চারুকলা ইনস্টিটিউট জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন।
নাসরিন বেগম : চারুকলায় ভর্তি হয়ে প্রথম যেদিন প্রথম ক্লাস করি সেদিন আমার টিচার আমাকে বললেন, সামনে যেহেতু দু’দিন চারুকলা বন্ধ সেহেতু ওই দু’দিন কোয়ার্টার শিট খাতায় দুটি ড্রয়িং এঁকে নিয়ে এসো। কিন্তু আমি একটি ছবি এঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি জানতে চাইলেন, একটা ছবি এঁকে এনেছি কেন। বললাম, স্যার, আমি তো কিছু রোজগার করি। তাই সময় পাইনি। এ কথা বলতে ভয় পাইনি। কারণ মানুষকে কখনো ভয় পাই না। ফলে অপ্রিয় সত্য বলতেও কখনো ভয় পাই না। ওনার ছাত্র থাকাকালে আর কোনোদিন আমাকে কিছু বলেননি। কেননা আমি খুব আন্তরিকভাবে কাজ করতাম।

সহজ : আপনার রেজাল্ট ভালো হতো কীভাবে?
নাসরিন বেগম : আমাদের ক্লাসের হলরুম ছিল ৮০ জনের। একদিকে ৪০ জন, আরেকদিকে ৪০ জন করে রুমজুড়ে আমরা বসতাম। ছবি আঁকতে না পারলে শিক্ষকদের সামনে কান্নাকাটি শুরু করে দিতাম। এরপর আমার শিক্ষকরা বলতেন, তুমি ভালো রেজাল্ট করবে, সমস্যা নেই। রেজাল্ট বের হওয়ার পর দেখি সত্যিই খুব ভালোভাবে পাস করেছি। আরেকটা বিষয় ছিল, যতোক্ষণ না সঠিকভাবে কাজ করতাম ততোক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতাম।

সহজ : এ রকম কি কখনো হয়েছে যে, কোনো কাজ আপনি করতেই পারছিলেন না?
নাসরিন বেগম : হ্যাঁ, হয়েছে। এ রকম সময় আমি টিচারদের সামনে এসে প্রচ- কান্নাকাটি করতাম এবং বলতাম, স্যার, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। শিক্ষক যখন একটু দেখিয়ে দিতেন তখন হয়তো সমাধান হয়েছে। আগে একটা বিষয় ছিল, কে কোন ডিপার্টমেন্টে যাবেন তা শিক্ষকরা ঠিক করে দিতেন। এখন তা হয় না। এখন কাকে নিলে তার পলিটিকাল জায়গাটা পাওয়ারফুল হয় সেটিই বেশি দেখা হয়। মাঝে প্রায় ২০ বছর চারুকলায় ডিটেইল ওয়ার্ক ছিল না। ডিটেইল ওয়ার্ক করলেই শিক্ষকরা বলতেন এগুলো কী আঁকি? ওনারা পরিষ্কারভাবে কোনো কিছু বলতেন না। বলতেন ছেড়ে দাও, ওখানে একটু ঝাপসা করে দাও ইত্যাদি। আমি বলতে গেলে শিক্ষকদের কাছ থেকে তেমন কিছু শিখিনি। কারণ আপনি যা বোঝাবেন তা পরিষ্কার হতে হবে। যখন ৩০ বছর জীবনের আমি প্রথম ফার্স্ট ডিভিশন পেলাম তখন টিচার হলাম। আমার এখনো মনে হয়, আসলেই কি আমি ভালো ছবি আঁকতে পারি? আবার ভাবি, আমি এতো পারছি কেন? ফার্স্ট হয়েছি কেন? নিশ্চয়ই আমি ভালো ছবি আঁকি। আমার সহপাঠীদের প্রত্যেকের ছবি এঁকে দিতাম। মানে, টিচিংয়ের কাজটা আমিই করে দিতাম। আমি এটিই মনে করতাম, সবাই ভালো করুক। সবাইকে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। নিজে একা সামনে যেতে চাই না। কিন্তু আমার এসব চেষ্টা সফল হয়নি। আমার শিক্ষকতা জীবনটা সফল নয়।

সহজ : এমনটি হওয়ার কারণ কী?
নাসরিন বেগম : এই যে আমরা টিচার। আমাদের মধ্যে একজন ভালো হই এবং অন্য দশজন যদি তা না হন তাহলে তো হবে না। আমার ওপর অনেক বাধা আসে কেন আমি এতো দূর এলাম? এছাড়া ভাংচুর থেকে যতো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা দরকারÑ আমার শিক্ষকতার ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে। তবে যতো বেশি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, আমিও ততো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছি এবং ততো বেশি আমার রাস্তা তৈরি হয়েছে। স্টুডেন্টদের সবাই নাম্বার চায়। আমার ক্লাসমেটদের যা করে দিতাম তথা হাত, পা, চোখ ডিটেইলটাÑ ওরা কেউ তা চায়নি। আমার ডিপার্টমেন্ট বা চারুকলার বাইরে আমি যে ওরিয়েন্টে ছবি আঁকতাম সেটিতে বহু প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে আসতে হয়েছে। আমাদের সিনিয়ররা তথা বিখ্যাত আর্টিস্টরা বার বারই বলেছেন, কেন এতো ধরে ধরে আঁকো, এগুলো কী করো? এগুলো ছাড়ো, এগুলো টিকবে না। কিন্তু ২০০০ সালে ইউরোপে গিয়ে অনেক বড় সম্মান পেয়েছি। আমাকে তারা বলেছেন, তোমার ছবিতে তোমার দেশ ও দেশের সৌন্দর্য আছে। অথচ ইউরোপ যাওয়ার আগে বিখ্যাত এক টিচার আমাকে খুব অপমান করেছিলেন। তাকে বলেছিলাম, আমি যা আঁকি তা বুঝে-শুনে আঁকি। আমার পেইন্টিংসের এ-টু-জেড, ডট, লাইন, রেখাÑ সবকিছু বলে দিতে পারবো। আপনি সেটি পারবেন না। একদিন যদি ইতিহাস লেখা হয় তাহলে আমার নাম সবার আগে যাবে। এ কথাটি ওনার ওপর প্রচ- রাগ করেই বলেছিলাম। এখন সবাই আমার জায়গায় আসতে বাধ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে আমার স্টাইল সবাই অনুসরণ করছে। যখন ডিটেইল ওয়ার্কটা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, পিএউচডি হচ্ছে তখন সবাই জানতে চাইÑ পেইন্টিং ডিপার্টমেন্টে আমার অনুসারী কারা। এ জন্য এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, সবাই কখন আমার জায়গায় আসবেন। বিদেশিরা নিজেদের কাজের মূল্য দেন। আমাদের দেশে তা দিতে চায় না। কারণ সবাই চান কীভাবে খ্যাতি এবং কতো দ্রুত অর্থের পাহাড় তৈরি করা যায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা নয়। জীবদ্দশায় কোনো স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করি না। কেননা মনে হয়, আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। আরো কিছু দেয়ার আছে। তা যতো দিন না শেষ হবে ততো দিন মৃত্যুও হবে না।

সহজ : ছেলেবেলার এমন কোনো ঘটনা বলুন যা এখনো আপনাকে নাড়া দেয়।
নাসরিন বেগম : ছোটবেলার কোনো ঘটনা তেমন একটা নাড়া দেয় না। তবে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ৯ মাস আমরা বন্দি ছিলাম কলোনিতে। নিরাপদেই ছিলাম। কোথাও বের হইনি। আমার বাবা যেহেতু সরকারি চাকরি করতেন সেহেতু কলোনিতে তল্লাশি চালানো হয়নি। এটি একটি স্মরণীয় বিষয়। আমার ভাই পলিটেকনিকে ফাইনালের স্টুডেন্ট ছিলেন। ছবি আঁকতেন। ২ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের পর পরই তিনি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। আমার ভাইয়ের বড় চুল ছিল। মা বললেন, চুলগুলো ছোট কর। কেননা ধরপাকড় শুরু হয়েছে। ভাই বললেন, ঠিক আছে, ছবি তুলে এসে চুল কাটাবো। তিন বন্ধু মিলে চুল কাটাতে গেছেন। এরপর আমার ভাই আর ফিরে আসেননি। তখন একটা বিষয় মনে হয়েছিল, আমার ভাই যদি মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে মারা যেতেন তাহলে বড় শান্তি পেতাম। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সম্মান দেয়া হয়নি। অস্ত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপরও কোনো মূল্যায়ন হয়নি। শেখ মুজিবকে নানানভাবে বোঝানো হয়েছে উল্টোটা। আমরা সব বোন বড় হয়ে গেলাম। সব দায়িত্ব তখন আমাদের মা-বাবার। আমরা পাঁচ বোনের মধ্যে আমি একজন মারা গেলে কী ক্ষতি হতো, ভাইটা যদি বেঁচে থাকতেন! তখন আমার মনে হলো, ছেলে ও মেয়ে বিভেদ করা কেন? ওই হিসেবে বলবো, আমি মেয়ে হয়েও পুরুষের চেয়ে বেশি যোগ্যতা আমার। এছাড়া ছোটবেলাটা আমার জন্য তেমন কোনো আহামরি বিষয় ছিল না। খুবই সাধারণ ছিলাম।

সহজ : আপনার পেইন্টিংসে মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে এসেছে?
নাসরিন বেগম : মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে যদি বলতে হয় তাহলে বলবো, বধ্যভূমি বা ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে মিরপুর বধ্যভূমিতে যে মানুষ হত্যা করেছিল এর বাইরে ছবি আঁকতে পারি না। এতো দিন সমালোচনা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে না ঠিকমতো। এ বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো, মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তারা এখনো তাকিয়ে আছেন অপলক। আমরা তা শুনতে পাচ্ছি না। আমার পেইন্টিংসে এই যে গোলাকার দেখা যাচ্ছে তা হলো তাদের বিচার প্রত্যাশার আর্তি। কথাগুলো বুদ্বুদ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর পাশে যে পিঁপড়ার সারি দেখা যাচ্ছে তা দিয়ে বুঝিয়েছি ‘পিঁপড়া সমাজবদ্ধ শৃঙ্খল প্রাণী’। পিঁপড়ার সঙ্গে মানুষের অনেক মিল আছে। কিন্তু পিঁপড়ার সুশৃঙ্খলতার এ শিক্ষাটা আমরা নিচ্ছি না। এখানে পিঁপড়া রূপক হিসেবে এসেছে। বাঙালিদের সবই আছে এবং আমরা অনেক সমৃদ্ধ। তবে আমাদের মনটাই ছোট।

 

ছবিঃ শোভন আচার্য্য অম্বু 

চিত্রশিল্পের ম্যাজিকম্যান

প্রফেসর ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী 

 

সেলফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো আবেগঘন অনুরোধ, ‘স্যার, ভিনসেন্টকে নিয়ে লিখুন, আমার প্রিয় শিল্পী।’ শাকিল সারোয়ারের বিনম্র অথচ ‘সহজ’ কণ্ঠস্বর। আবার শুরু হলো অসমাপ্ত কাব্যগ্রন্থ ‘কখনো মানুষের গান’-এর শরীর ব্যবচ্ছেদ।

“অনেক দিন হয়ে গেল ভিনসেন্ট ভ্যান গগের শরীরী সত্তা
প্যারিসের ওইভরস গ্রামের মাটির সঙ্গে মিশে গেছে
তার আত্মার সাথে আমার যোগাযোগ মিশে যায়নি
থাকবে এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার পরও, যেমন তার সহোদর থিও ভ্যান গগ থিও ছিল ভিনসেন্টের এক ভালোবাসার দ-
এক সহোদর হবার দ-
এ কোন দ- এ কোন দায়
আকাশ প্রমাণ রহস্যই হয়ে থাকলো মাটির পৃথিবীর মানুষের কাছে
কিছু মানুষ জন্মায় যাদের অভিধানে
না পাওয়া শব্দটি ছিল মুদ্রণ প্রমাদ
ভিনসেন্ট কেন এমন এক শব্দবিহীন অভিধান বয়ে বেড়ালো যাপিত জীবনে
আমি নই, কে একজন অস্ফুট শব্দ করে বলে ওঠে
‘দ্য গুড ডাই ফার্স্ট, অ্যান্ড দে হুজ হার্টস আর ড্রাই অ্যাজ সামার ডাস্ট,
বার্ন টু দ্য সকেট”
(‘কখনো মানুষের গান’, কাব্যাংশ-১)

যারা উনিশ শতকের কিংবদন্তি ভিনসেন্ট ভ্যান গগের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তারা অবশ্যই থিউ ভিনসেন্টকে লেখা চিঠিগুলো পড়বেন। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের, শিল্পের প্রতি শিল্পীর
ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। এমনকি থিউ তার প্রথম পুত্র সন্তানের নাম রেখেছিলেন ভিনসেন্ট।

দ্য হেগ, ২৮ জানুয়ারি ১৮৭৩
ব্রাসেলস তোমার ভালো লেগেছে আর ভালো থাকার জায়গা পেয়েছ জেনেও ভালো লাগছে। আঙ্কেল হাইন সুন্দর কিছু ছবি আর ড্রইং নিয়ে প্যারিস থেকে ফিরেছেন। সোমবার পর্যন্ত অ্যামস্টাডার্মে ছিলাম, জাদুঘর দেখতে গিয়েছিলাম। এখানে নতুন আরো বড় একটা জাদুঘর হতে যাচ্ছে। শিল্পী ক্লয়সনের ছবি দেখতে ইচ্ছা করছে, তার যে কয়টা ছবি দেখেছি, আমার খুব ভালো লেগেছে। ইটালিয়ান শিল্পী রোত্তার ছবির ফটোগ্রাফ আমি চিনি। ব্রাসেলসের এক্সিবিশনে দেখেছি। কখন কী ছবি দেখছ, অবশ্যই আমাকে জানাবে। তুমি যে অ্যালবামের নাম দিয়েছ, আমি ওটার কথা বলিনি। বলেছি শিল্পী কোরো-র লিথোগ্রাফের একমাত্র অ্যালবামটির কথা।

লন্ডন, ৩১ জুলাই ১৮৭৪
তুমি যে ‘মিশেল’ (শিল্পী জর্জ মিশেল) পড়ছ আর ভালো করে বুঝতে পারছ জেনে খুশি হয়েছি। আমরা যা মনে করি, প্রেমের শক্তি এর চেয়ে অনেক বেশি। ওখানে একটা বাক্য আছে, ‘মেয়েরা কখনো বুড়ো হয় না।’ কথাটা একটা প্রত্যাদেশ বা বাণী। এর মানে এই নয় যে, পৃথিবীতে বুড়ো মেয়ে নেই। সে যতোক্ষণ ভালোবাসে এবং ভালোবাসা পায় ততোক্ষণ সে বুড়ো নয়। পুরুষের চেয়ে মেয়েরা আলাদা। আর আমরা মেয়েদের সম্পর্কে খুব কম জানি। ‘এ’ ভালো আছে। আমরা এক সঙ্গে হেঁেট বেড়াই। কারো যদি এক জোড়া খোলা চোখ থাকে আর তার ভেতর রশ্মি থাকে তাহলেই ওই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। ইংল্যান্ডে ফেরার পর থেকে ড্রইংয়ের প্রতি ভালোবাসাটা আর নেই। প্রচুর পড়াশোনা করছি।

লন্ডন, ৬ মার্চ ১৮৭৫
অ্যাডাম বিড’-এর মেয়েটাকে তুমি বুঝতে পেরেছ জেনে ভালো লাগছে। অনাবাদি জমির ল্যান্ডস্কেপ, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গ্রাম চলে গেছে। বালুময় পথ, দু’ধারে মেটে রঙের ঊষর প্রান্তরে চুনকাম করা মাটির কুঁড়েঘর, শ্যাওলা ধরা ছাদ, প্রান্তরে কালো কালো কাঁটা ঝোপ, দিগন্তে সাদা এক ফালি মেঘ নিয়ে বিষণœ আকাশ। বিষয় যদিও জর্জ মিশেল-এর কাছ থেকে ধার করা তবুও এখানে মিশেলের চেয়ে আরো মহৎ ও পবিত্র অনুভূতি আছে।

প্যারিস, ২৪ জুলাই ১৮৮৫
বৃষ্টিতে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ ও পার্লামেন্ট হাউসের একটা ছবি পেয়েছি। ছবিটা দ্য নিত্তিস-এর। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ওখানে হেঁটে
বেড়াতাম। ওয়েস্টমিনস্টার চার্চ ও পার্লামেন্ট হাউসের পেছনে সূর্য ডোবার সময়টায় কেমন দেখায় তা আমার জানা আছে। শীতকালে ভোরবেলার তুষার ও ঘন কুয়াশা পড়া দৃশ্যও আমার খুব পরিচিত। তবুও আমার ভালোবাসার লন্ডন ছেড়ে আসা আমার জন্য ভালো হয়েছে। তোমাকে ওরা লন্ডনে পাঠাবে তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। রকার্ট-এর ‘সিøভ টাইম অব লাইফ’ ও ‘অ্যাট মিড নাইট’-এর জন্য ধন্যবাদ। দ্বিতীয় ছবিটা শিল্পী মুসের ‘সেপ্টেম্বর নাইট’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্যারিস, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৫
পথ এতো সংকীর্ণ! খুব সাবধানী হতে হবে। যেখানে যেতে চাই সেখানে অন্যরা কীভাবে পৌঁছেছে তা তুমি জানো। সেই সহজ পথ আমরাও নেবো। প্রার্থনা ও প্রাত্যহিক কাজÑ আমাদের সব শক্তি দিয়ে হাতে যে কাজ আসবে তাই করবো। বিশ্বাস করবো ঈশ্বর আমাদের ভালো উপহার দেবেন।

অ্যামস্টাডার্ম, ১৮ সেপ্টেম্বর ১৮৭৭
বাবা লিখেছিলেন, তুমি অ্যান্টহবার্গে গিয়েছিলে। খুব জানতে ইচ্ছা করছে, ওখানে কী দেখলে। বহুদিন আগে জাদুঘরের পুরনো ছবিগুলো আমিও
দেখছিলাম। শিল্পী রেমব্রান্ট-এর সুন্দর পোরট্রেইটের কথা এখনো যেন মনে করতে পারি। পরিষ্কার করে জিনিসগুলো মনে রাখতে পারা অবশ্যই ভালো। কিন্তু আমার কাছে যেন একটা সুদীর্ঘপথের ছবির মতো হয়ে আছে। দূর থেকে ঝাপসা আর ছোট হয়ে চোখ আসছে। এক সন্ধ্যায় এখানে নদীতে আগুন লাগতে দেখলাম। অ্যালকোহল বা ওরকম কিছু একটা পানীয় বোঝাই স্টিমার পুড়ে যাচ্ছিল। অতোটা বিপদের কিছু ছিল না। কারণ জ্বলন্ত স্টিমারটাকে ওরা অন্য জাহাজগুলোর ভেতর থেকে বের করে নিয়ে নোঙর করার জায়গায় নিয়ে বেঁধে ফেলেছিল। আগুন যখন দাউ দাউ করে উঠতে লাগল তখন সেই সৈকত আর সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কালো এক সারি মানুষ ও আগুনের চারপাশ দিয়ে ঘুরে-ফিরে চলা ছোট ছোট নৌকা দেখা যাচ্ছিল। আগুনের শিখার প্রতিফলন হচ্ছিল পানিতে। এর ভেতর নৌকাগুলোকে কালো
দেখাচ্ছিল। গ্যালারি ফটোগ্রাফিকে জ্যায়ের যে ফটোগ্রাফগুলো ছিল, তোমার মনে আছে কি না জানি না। পরে অবশ্য নষ্ট করে ফেলেছিল। ‘ক্রিসমাস ইভ’, দি ফায়ার’ এবং অন্যগুলোর মধ্যে এ দৃশ্যটির প্রভাব রয়েছে। চার্লস ডিকেন্স যে বলেছেন, ‘গোধূলির মহিমা, গোধূলি নামছে।’ কথাগুলো বাস্তবিকই যথার্থ। আসলে গোধূলির মহিমা তখনই বিশেষ করে বেরিয়ে আসে যখন একই
মানসিকতার মানুষ এবং ধর্মগুরুরা হৃদয়ের অন্তস্তÍলের পুরনো ও নতুন সম্পদ নিয়ে আলোচনা করে। গোধূলি তখনই মহিমান্বিত হয় যখন দু’জন তার নামে একত্র হয় এবং তিনি তাদের মধ্যে বিরাজ করেন। আর এই জিনিসগুলো যে জানে এবং তাদের অনুসরণ করে চলে সে সত্যিই আশীর্বাদিত।
শিল্পী রেমব্রান্ট এটা জানতেন। কারণ তিনি তার হৃদয়ের সমৃদ্ধ সম্পদ থেকে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে কালচে, বাদামি, কয়লা, কালি দিয়ে বেথানির বাড়ির যে ড্রইংগুলো করেছেন তা তো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আছে। সে বাড়িতে গোধূলি নেমেছে। সে জানালা দিয়ে আলোটুকু আসছে। তারই বিপরীতে গম্ভীর ও আঁধারাচ্ছন্নতায় মহান এবং প্রভাবিত করার মতো একটা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাদের প্রভু। যিশুর পায়ের কাছে বসে আছেন মেরি ... আর মার্থা যে ঘরের ভেতর কি না কী নিয়ে ব্যস্ত। যতোদূর মনে পড়ছে, আগুন জ্বালাচ্ছে বা ওই রকম কিছু করছে। ওই ছবি বা ওর বাণী আমি কোনোদিন ভুলবো বলে আমার মনে হয় না। ওখানে যেন বলা হয়েছে, আমি পৃথিবীর আলো। যে অনুসরণ করবে তার অন্ধকারে ঘুচে যাবে এবং সে জীবনের আলো পাবে।

দ্য হেগ, ১৫ মার্চ ১৮৮৩
আমাকে অবাক করা ঘটনাটা তো এখনো বলা বাকি। বাবার একটা চিঠি পেয়েছি। চিঠিটা আমার খুব মিষ্টি আর আনন্দের মনে হয়েছে এবং চিঠির ভেতর পঁচিশটা গিল্ডার ছিল। বাবা লিখেছেন, কিছু টাকা পেয়েছেন যার আশা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তারই কিছুটা আমাকে দিতে চেয়েছেন। কত ভালো করেছেন, তাই না?
কিন্তু আমার সংকোচ লেগেছে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা চিন্তা আমার মাথায় এলো। বাবা সম্ভবত কারো না কারো কাছ থেকে শুনতে পেয়েছেন, আমি খুব অভাবে আছি? এই উদ্দেশ্যে তিনি টাকা পাঠিয়েছেন এমন যেন না হয়। কারণ আমার অবস্থার এ রকম ধারণা করা ঠিক হবে না এবং এতে বাবার এমন সব দুশ্চিন্তা হতে পারে যা একেবারেই অমূলক। আমার কথার অর্থ বাবাকে বোঝাতে চাইলে তিনি যা বুঝবেন এর চেয়ে ভালো বুঝবে তুমি। আমার ধারণায় আমি অত্যন্ত ধনী। অর্থের দিক থেকে নয়, এই ধনী এ কারণে যে, আমার কাজের মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছি যার ভেতর আমার হৃদয় ও আত্মা সম্পূর্ণ দিয়ে নিবেদিত থাকতে পারি এবং তা আমার বেঁচে থাকা অর্থময় করে, অনুপ্রাণিত করে। অবশ্যই আমার মেজাজ পাল্টায়। কিন্তু মোটামুটি একটা শান্তি তো আছে। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আছে শিল্পে। এই যে একটা শক্তিশালী স্রোত, এই স্রোত মানুষকে আশ্রয়ের দিকে নিয়ে যায় এবং একটা মানুষ যখন তার কাজ খুঁজে পায়, সে আর দুর্ভাগাদের মধ্যে পড়ে না। যে কোনো অবস্থাতেই এটি এক বিরাট আশীর্বাদ। আমি বলতে চাইছি, আমার হয়তো আপেক্ষিক বড় বড় বিশেষ কিছু অসুবিধা আছে। দুঃখের দিনও হয়তো আছে আমার জীবনে। কিন্তু আমাকে দুর্ভাগাদের একজন মনে করাটা চাইবো না এবং তা সত্যও নয়। তুমি চিঠিতে মাঝে মধ্যে একটা কথা লেখো যা আমারও মনে হয় কখনো কখনোÑ জীবনটা কীভাবে যে চালাবো তা বুঝতে পারি না। দেখো, প্রায়ই আমার বিভিন্ন কারণে এই অনুভূতিটা হয়। কেবল আর্থিক ব্যাপারে নয়, শিল্পের ক্ষেত্রে এবং সাধারণভাবে জীবনের ক্ষেত্রে তো বটেই। কিন্তু এটিকে কি তোমার ব্যতিক্রম কিছু বলে মনে হয়? সামান্য সাহস আর উদ্যম আছে এমন প্রত্যেকেরই কি এমন মুহূর্ত আসে না? দুঃখ, যন্ত্রণা,
বিষণœতার মুহূর্ত আমার মনে হয় সবার জীবনেই আছে এবং তা সচেতন মানুষের জীবনের একটা অবস্থা। কোনো কোনো মানুষের মনে হয়, আত্মসচেতনতা থাকে না। যাদের আছে, তারা মাঝে মধ্যে দুঃখে থাকতে পারে। কিন্তু ওই কারণে তারা অসুখী নয় বা এটা তাদের জীবনের ব্যতিক্রমী কিছুও নয়। কখনো কখনো মুক্তি আসে, কখনো বা অন্তর্গত নতুন উদ্যোগ আসে এবং আবার উঠে দাঁড়ায় মানুষ শেষ পর্যন্ত। তারপর একদিন হয়তো আর দাঁড়াবে না এবং তাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমি আবার বলছি, আমার ধারণায় মানুষের ভাগ্যই এ রকম। বাবার চিঠিটায় আমার একটা চিঠির উত্তর ছিল। বেশ ভালো মনে আছে, আমার চিঠিটাও আনন্দময় ছিল। কারণ তাতে আমার স্টুডিওর পরিবর্তনগুলোর কথা লিখেছি। এমন কিছু লিখিনি যাতে বাবার মনে আমি যে আর্থিক বা অন্য কোনো অসুবিধায় আছি এমন চিন্তা আসতে পারে। হয়তো বাবাও এসব কিছু লেখেননি। তার চিঠিও খুব সহজ আর উষ্ণ। কিন্তু টাকাটা এতো অপ্রত্যাশিত যে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মাথায় এই চিন্তাটা এলো, এমন কী হতে পারে, বাবা আমার জন্য চিন্তিত? আমার এ ভাবনাটা যদি ভুল হয় তাহলে এ নিয়ে লেখা অনর্থক হবে। মনে হবে যেন বাবার সহৃদয়তা আমার মনে প্রথমত. এ ধারণাটাই দিয়েছে, আসলে টাকাটা পেয়ে অত্যন্ত কৃতজ্ঞবোধ করছি। না পেলে করতে পারতাম না এমন অনেক কিছুই পারবো এ দিয়ে। কিন্তু আমার ভাবনাগুলো জানালাম। কারণ যদি তুমি দেখো, আমাকে দিয়ে বাবা চিন্তিত তাহলে আমার চেয়ে তুমি ভালোভাবে তাকে আশ্বস্ত করতে পারবে।’

দ্য হেগ, ৭ মে ১৮৮২
এবার শীতে এক সন্তানসম্ভবা মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। তার পেটে যার সন্তান সে তাকে ত্যাগ করেছে। মা হবে মেয়েটি, রুটির জন্য রাস্তায় হাঁটছেÑ বোঝো কেমন ব্যাপার! মেয়েটাকে মডেল হিসেবে নিয়েছি। পুরো শীতকাল ধরেই আমার মডেল হয়ে সে কাজ করেছে। তার পুরো পারিশ্রমিক তাকে দিতে পারিনি। তবে তার ঘর ভাড়া দিয়েছি। ইশ্বরকে ধন্যবাদ, তাকে আর তার সন্তানকে নিজের খাবার ভাগ করে দিয়ে অনাহার এবং শীত থেকে বাঁচাতে পেরেছি। তার সঙ্গে লিডেনে গিয়েছি। সেখানে একটা মাতৃসদন আছে। সন্তান হওয়ার সময় সে এখানে থাকবে। মনে হয়, যার সামান্য মনুষ্যত্ববোধ আছে এমন সব মানুষই এ অবস্থায় একই ব্যবহার করতো। যা করেছিল তা এতো সহজ আর স্বাভাবিক যে, তা কাউকে বলার দরকার আছে। মেয়েটা মডেলের পাশাপাশি আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীসুলভ আচরণ করে। বিয়ে যেহেতু মানুষ একবারই করে, সেহেতু তাকে বিয়ে করার চেয়ে আর ভালো কী করা যায়! কারণ তাকে সাহায্য করার এটাই একমাত্র পথ। তা না হলে দুর্ভাগ্য তাকে পুরনো রাস্তায় যেতে বাধ্য করবে যার শেষ অতল খাঁদ।

প্যারিস, ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৬
অ্যান্ডারসনের গল্পের জন্য ধন্যবাদ। এখনো আমার ‘হাইপেরিয়ান’ পড়া হয়নি। এটি এলিয়টের ‘সিনস ফ্রম ক্লারিকাল লাইফ’-এর একটা ‘অনুতপ্ত জ্যানেট’। গল্পটা এক পুরোহিতের জীবন নিয়ে। অধিকাংশ সময়ই সে এক শহরের নোংরা অলি-গলির অধিবাসীদের মধ্যে কাটায়। তার পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে বাগানের
বাঁধাকপির ডগা ইত্যাদি চোখে পড়ে। আরো দেখা যায় গরিব ভাড়াটেদের লাল ছাদ আর ধোঁয়া ওঠা চিমনি যারা সাধারণত অসিদ্ধ মাংস ও জলোসিদ্ধ আলু খায়। চৌত্রিশ বছর বয়সে সে মারা যায়। দীর্ঘ অসুস্থতার সময় এক অপ্রকৃতিস্থ নারী তার পরিচর্যা করলো। তার ওপর নির্ভর করে সেই মহিলা রোগমুক্তি লাভ করে এবং শান্তি খুঁজে পায়। পুরোহিতের সমাধি পর্বে রয়েছেÑ ‘যারা আমাকে বিশ্বাস করে তাদের জন্য আমি পুনরুজ্জীবিত এবং জীবন, মৃত হলেও সে বেঁচে থাকবে।’
ভিনসেন্ট এই পুরোহিতের জীবনের প্রতিচ্ছবি নিজের জীবনে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছিলেন যেমনভাবে করেন ম্যাজিকম্যানরা। তিনিও যাজক হওয়ার জন্য দু’বার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন শিক্ষার্থী হিসেবে। ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ হল্যান্ডের বেলজিয়ান সীমান্তবর্তী গ্রুট জুনভার্ট-এ প্রটেস্টান্ট পল্লী যাজকের অনটনময় সংসারে ভিনসেন্টের জন্ম। ১৮৯০ সালের ২৯ জুলাই প্যারিসের ওইভরস গ্রামে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর ছয় মাসের মধ্যে শোকাহত থিউ-ও হল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। ২৩ বছর পর তার দেহবাশেষ সংগ্রহ করে ওইভরস-এ ভিনসেন্টের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। ভিনসেন্ট উইলিয়াম-এর মৃত্যুর একশ’ বছর পর থেকে উনিশ শতকের ম্যাজিকম্যান চিত্রশিল্পের মেগাস্টারে রূপান্তরিত হয়েছেন। তার জীবনচরিত সিনেমা, উপন্যাস, নাটক, মিউজিক, প্রামাণ্যচিত্রের বিষয় হয়েছে। তার সম্পর্কে যতো গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সমসাময়িক কালের আর কোনো চিত্রশিল্পীকে নিয়ে রেকর্ড বুকে তা নেই।
ভিনসেন্টের চিত্রকর্ম এখন ইউরোপ, আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যের জাদুঘর, আর্ট গ্যালারির গর্বিত সংগ্রহ। একেকটি ছবির মূল্য আমাদের কল্পনারও বাইরে। বিশ্বের সব নিলামঘর তার একটি ছবি সংগ্রহের জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে গ্রুট জুনভাট থেকে ওইভরসে। পৃথিবীর শিল্পানুরাগী ও শিল্পোৎসাহী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন মহাকাব্যের ট্র্যাজিডি নায়ক। ১৮৭৯ সালে ভিনসেন্টের জীবন ব্যবচ্ছেদ হয়েছে দারিদ্র্য আর সিদ্ধান্তহীনতায়। চিত্রশিল্প দিয়ে জীবিকা অর্জনের কোনো সম্ভাবনা নেই জেনেও তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন শিল্পী হবেন। সহোদর থিউকে লিখলেন, ‘অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শিল্পী হবো, অন্য কিছু নয়। চরম হতাশায় যে রঙ-তুলি নামিয়ে রেখেছিলাম তা আবার হাতে তুলে নিলাম। নিজেকে উৎসর্গ করলাম শিল্প জগতে। ম্যাজিকের মতোই বদলে গেল আমার চারপাশ।’
থিউয়ের অর্থানুকূল্যেই ভিনসেন্ট কাজ শুরু করলেন। নতুন পারিবারিক আবাস নুয়েনেনে পিতার মৃত্যুর সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। অ্যান্টরপে তার পরিচয় হয় জাপানিজ ছাপচিত্রকলার সঙ্গে যা চিত্রশিল্পে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ১৯৮৬ সালে রোগপা-ুর শরীর নিয়ে প্যারিসে থিউয়ের কাছে আসেন। তার নাটকীয় জীবন উপাখ্যান আরো বর্ণময় হয়ে ওঠে। থিউ এক পৌরাণিক চরিত্র হয়ে ওঠে তার বাউ-ুলে, অবুঝ, বিশৃঙ্খল, অভিমানী ভাইয়ের শাশ্বত সম্পর্কের ছবি তুলে ধরে। থিউয়ের মাধ্যমে এবং অদম্য আগ্রহে ভিনসেন্ট শিল্পী পিসারো, সুরা, তুলজ লোত্রেক, পল গঁগ্যা, পল সেজান-এর মতো খ্যাতি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অচিরেই ভিনসেন্ট হয়ে ওঠেন নাগরিক শিল্পী। ইমপেশনিজম প্রবলভাবে নাড়া দেয় তাকে। তার প্যালেট ধূসর ও ভারী রঙ বর্জন করে হয়ে ওঠে হালকা, উজ্জ্বল ও বর্ণময়। জ্যাঁ-বাপিস্ত গুইলামিন ও কামিল পিসারো দুই ইমপ্রেশনিস্ট এবং ডিভিশনিস্ট শিল্পীর অনুপ্রেরণায় তিনি উজ্জ্বল বর্ণে ছোট ছোট স্ট্রোক ব্যবহার করে আঁকতে থাকেন সিটিস্কেপ, ল্যান্ডস্কেপ, সান ফ্লাওয়ার স্টাডি। ১৮৮৬ সালে ব্রিটেন থেকে ফিরে আসা পল গঁগ্যার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সখ্যতা তার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। গঁগ্যার ব্যক্তিত্ব ও স্বভাবে ছিল উচ্চকিত প্রচ-তা। শিল্প বিশ্বাসে তিনি ছিলেন একরোখাভাবে আত্মবিশ্বাসী। তার কাজেও ছিল প্রচলিত সব নিয়ম উল্টে দেয়ার দুঃসাহস। তিনিই প্রথম বর্ণকে ব্যবহার করেন বস্তুর গাত্রবর্ণ চিত্রণের বদলে আবেগ ও অনুভূতির বাহন হিসেবে। বাস্তবভিত্তিক আলোছায়ার বদলে উজ্জ্বল-দীপ্ত বর্ণের সমতলীয় প্রয়োগে দৃশ্য রচনার উদাহরণও প্রথম সৃষ্টি করেছেন গঁগ্যা। ভিনসেন্ট পরবর্তীকালে তার ছবিতে রেখা, আকৃতি ও রঙের যে অগ্নিগর্ভ সম্মিলন ঘটিয়েছেন, যা তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এ জন্য অবশ্যই তিনি ঋণী গঁগ্যার কাছে। ১৮৮৭ সালের শেষ নাগাদ ভিনসেন্টের কাছে প্যারিস জীবন হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর। নাগরিক জীবন তার কাছে দুঃসহ হয়ে ওঠে। তিনি তৃষিত হয়ে ওঠেন তার প্রিয় কিষাণ ও অন্তÍজ শ্রেণীর মানুষের কাছাকাছি যেতে যাদের সঙ্গেই রয়েছে তার প্রাণের যোগ। ১৮৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় আর্লেতে চলে যান।

ইউরোপের উত্তর অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ অঞ্চলের প্রকৃতিগত বিরাট পার্থক্য রয়েছে। উত্তর হলো প্রধানত কুয়াশাচ্ছন্ন ও রৌদ্রহীন। প্রকৃতি সেখানে ধূসর ও বর্ণহীন। ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া উষ্ণ ও রৌদ্র-আলোকময় এবং প্রকৃতি বর্ণবিভায় ঝলমলে। আর্লেতে এসে ভ্যান গগ যেন তার স্বপ্নের বিষয়বস্তুর সন্ধান পেলেন। যে রঙের উচ্ছ্বাস তিনি তার চিত্রশিল্পে ঘটাতে চেয়েছেন, এখানে প্রকৃতিই তা ছড়িয়ে রেখেছে পথ-প্রান্তরে। শুধু বেছে নিয়ে তা ক্যানভাসে রূপময় করে তোলার অবকাশ মাত্র। যে ধরনের মানুষের সান্নিধ্যে তিনি স্বস্তিবোধ করেন সেই সরল ও সজীব গ্রামীণ মানুষের দেখাও পেলেন এখানে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিতেও তার দেরি হলো না। প্রতিদিন তিনি গ্রামের মেঠোপথ ধরে অনেক দূর হেঁটে যেতেন এবং একটি বিষয় নির্বাচন করার পর রঙ-তুলি ও ক্যানভাস-ইজেল নিয়ে আবার ফিরে আসতেন সেখানে। এভাবে ঘুরে পাওয়া মানুষের মতো তিনি দিনের পর দিন এঁকে গেছেন ছবি। ক্লান্তি নেই, ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই, প্রখর রোদে, এমনকি একটি হ্যাটও মাথায় নেই। আর্লের পনেরো মাসে ভিনসেন্ট এঁকেছেন প্রায় অসাধ্য দুই শতাধিক তৈলচিত্র। এছাড়া কয়েক হাজার রেখাচিত্র। অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে আঁকা হয়েছে ছবিগুলো। তুলির উদ্দীপ্ত ক্ষিপ্র আঁচড়ে টালমাটাল সেগুলো। অথচ এগুলোর মধ্যেই রয়েছে শিল্পীর জীবনের অধিকাংশ শ্রেষ্ঠতম শিল্পকর্ম। একটি ছবিতেও নির্মাণ ও সামঞ্জস্যের বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। প্রতিটি চিত্রশিল্পই গঠন সৌকার্যে শুধু নিটোল নয়, অভিনবও। উজ্জ্বল, স্পন্দিত, রক্তিম লাল, পান্না, সবুজ, রৌদ্রাভ হলুদ ও প্রদীপ্ত নীলের এমন সম্মিলনও আগে কেউ দেখেননি। ইমপ্রেশনিজমের আলোর উদ্ভাসকে অতিক্রম করে ভিনসেন্ট পৌঁছে গেছেন বর্ণের এক নবতর অর্থময়তার জগতে।

‘মাংশল তাঁবুর আবরণে সাদা হাড়ের কাঠামো/ ঘুমকাতর শরীরে অনুভূত হয় কঙ্কাল/ কবে কে প্রথিত করেছে এই নিরেট সাদা অবকাঠামো/ অর্বুদ নদীরেখার জাল বোনা রক্ত নালিকা/ অদৃশ্য এই বস্তু কাঠামো নিয়ে এতো অহঙ্কার/ বাস্তবতা তো এক সুন্দর সর্বনাশ/ অর্থ যশ ক্ষমতা অমৃৃত মন্থনে কাটে জীবন/ পাললিক হাসপাতাল থেকে লাশের মিছিলে শামিল/ আমি জীবিত না মৃত নাকি নিবিড় পর্যবেক্ষণে/ অক্ষিপটলে ঢুকে পড়ে নক্ষত্র কণা/ ঘরের আলো-আঁধারির ভিতর মাকড়সার তাঁত বোনা / মিথের ফেনায় ভাসতে থাকে ভিনসেন্টের ছবি/ মধ্যরাতে মাঘী পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে/ স্বর্ণমেষের ডানায় চেপে পৃথিবীতে নেমে আসে স্বর্গের দেবীরা/ মানুষের চোখের আড়ালে নগ্ন হয়ে স্নান করে অধরারা/ যুগল চন্দ্র চকর জলে ভেসে ভেসে/ পান করে ধবল জ্যোৎস্না/ কর্ণকুহরে অশরীরী থিউ ভ্যান গগের কণ্ঠস্বর, ফিনিক্সের মতো ডানা চাই/ তুমি তো বেঁচে আছ, ঈশ্বরকে বলে দাও।/ আমি তার কাছে যাবো, ভিনসেন্টের কাছে যাবো, ওই নক্ষত্রলোকে।’
(‘কখনো মানুষের গান’, কাব্যাংশ-২)

রামকিঙ্কর

ড. মো.আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী

 

 

ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়েছেন কৃষক, দিনমজুর, খনির শ্রমিক ও গ্রামের সাধারণ মানুষ। কারো চেহারা রুক্ষ, কারো তেজদীপ্ত, কারো আবেগময়। বুড়ো, প্রৌঢ়া, যুবক-যুবতী ও শিশু। ঝাড়বাতির কোমল আলো সম্মানীয় করে তুলেছে অতিথিদের অবয়ব। কেউ গান গাইছে, কেউ গল্প-গুজবে, কেউ পানাহারে মত্ত। শিল্পী অনুরোধ করেছেন, অতিথিরা যেন কৃত্রিম আচরণ না করেন। স্বাভাবিক আচরণের মধ্য দিয়েই আনন্দ উপভোগ করার জন্য বলা হচ্ছে। তাদের আনন্দ উৎসবে রেখে সামান্য দূরে চলে এসে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালেন শিল্পী। সৌন্দর্যের ভেতর ঈশ্বরের অনুভব রচনা করতে হবে।

প্রাজ্ঞতার ভেতর সারল্য তৈরি করতে হবে। যিশু ও তার অনুচরদের এভাবে রচনা করতে হবে যেন তাদের মধ্যে মানবিক ও ঐশ্বরিক গুণাবলি থাকে। সৌন্দর্য ও ঐশ্বরিক স্বাভাবিকতার যোগফল প্রয়োজন যা কোনো মানুষের মধ্যে পাওয়া কঠিন। কারো মুখের আকৃতি, কারো হাত, কারো হাসি, কারো বেদনার্ত মুখাভাস, কারো গ্রীবাÑ এসবের যোগফলে যিশুর রূপ তৈরি করেছিলেন লিউনার্দো দা ভিঞ্চি তার ‘লাস্ট সাপার’ বা শেষ ভোজ ছবিতে।

ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে দৃশ্যশিল্প ঘুরে দাঁড়ালো নতুন আঙ্গিকে। লিউনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ও রাফায়েল হলেন এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শিল্পী চরিত্র। ‘ভার্জিন অফ দি রকস’ এবং মেরি, যিশু ও সেইন্ট অ্যানের অপূর্ব ড্রইংয়ের প্রেক্ষাপট শারীরযন্ত্র ও শারীর সংস্থানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার অপূর্ব উদাহরণ লিউনার্দোর ‘নোট বুকস’। আবার জ্যামিতিক অংকনের চূড়ান্ত হলো গিরলানদাইও-এর

‘শেষ ভোজ’। উলফিনের ভাষায়Ñ ‘এন অ্যাসেমব্লেজ উইথআউট অ্যা সেন্টার’। লিউনার্দোর ছবির নাটকীয় সংহতি আশ্চর্য। তিনজন করে শিষ্যের চারটি দল পিরামিডের আকারে উপস্থাপিত যার শীর্ষবিন্দুতে স্বয়ং যিশু। শিল্পীর সমস্যা কম ছিল না। সব চরিত্রই পুরুষ। ডাইনিং টেবিল ছাড়া কোনো আসবাব নেই। নেই প্রেক্ষাপট বা গতির সম্ভাবনা। শুধু উপবিষ্ট যিশুর পেছনের জানালা দিয়ে অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান প্রকৃতি। অথচ একটি অত্যন্ত উদ্বেগভরা, আত্মজিজ্ঞাসাভরা মুহূর্ত ও ১২ শিষ্যে প্রত্যেকের বিশিষ্ট প্রতিক্রিয়া। যিশুর মুখ শেষ করতে পারেননি শিল্পী। কারণ তিনি কোথায় সন্ধান করবেন জেথসিমানি উদ্যানে ঈশ্বরপুত্রের নিদারুণ ব্যাকুলতা, বীর্যবান ইচ্ছা, প্রশান্ত আত্মসমর্পণ! তিনি তো আর মায়ের কোলে ক্রীড়াচঞ্চল শিশু নন। ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। অথচ মানুষের জন্য করুণায় বিষণœ ঈশ্বরপুত্র।

ইউরোপীয় শিল্পকলার উত্তুঙ্গ বিকাশ ঘটে পাশ্চাত্য সভ্যতার উদয়াচল গ্রিসে। তবে গ্রিসের মূল ভূখ-ে শিল্পকলার উৎকর্ষ লাভের অনেক আগেই তার অদূরবর্তী দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরের ক্রিট দ্বীপে শিল্পের জয়যাত্রা শুরু হয়। ক্রিটানরা ছবি আঁকতো প্রাসাদ, অট্টালিকার দেয়াল ও তৈজসপত্রের উপরিতলে। প্রাচীন মিসরীয়দের মতো মৃত ফারাও কিংবা সমাজের অভিজাতদের পরলৌকিক কল্যাণ বা পরিত্রাণের জন্য নয়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইহলৌকিক পরিবেশই রঙে আনন্দময় করে তোলা। গ্রিকরা খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৪০০ বছর আগে শিল্পকলায় মানবদেহ সৌন্দর্য এমন এক ভঙ্গিমায় রূপায়িত করে যা আজও অনতিক্রান্ত। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার অবক্ষয়ের পর শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা রোমের অভ্যুত্থান ও ইউরোপের জয়। এক ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার দ্বারা প্রভাবান্বিত রোমানরা ছিল গ্রিস থেকে বহু দূরে মধ্য ইটালির টাইবার নদীর তীরে ল্যাটিনভাষী উপজাতি। রোমান শিল্পীরা গ্রিক শিল্পীদের এমনভাবে অনুকরণ ও অনুসরণ শুরু করে যে, অচিরেই গ্রিক ও রোমান শিল্প একীভূত হয়ে রোমান শিল্প যেন গ্রিক শিল্পেরই অবিচ্ছিন্ন ধারায় পরিণত হয়। আধুনিক ইউরোপের ধ্রুপদী শিল্প বলতে যুগপৎ গ্রিক ও রোমান শিল্পটিই বোঝায়। প্রাচ্য শিল্প প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্তÑ নিকট প্রাচ্যের শিল্পকলা অর্থাৎ যা মূলত ভারতীয় শিল্পকলা নামে পরিচিত এবং দূরপ্রাচ্যের শিল্পকলা ফার ইস্টার্ন আর্ট বা চীন ও জাপানের শিল্পকলা। প্রাচ্য শিল্প বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের প্রতীকবাদিতা প্রভাষিত। বৌদ্ধ দর্শনে বিশ্বব্রহ্মা-ের মূলীভূত তত্ত্বে পাঁচটি উপকরণ রয়েছে। প্রথম উপকরণ মৃত্তিকা। মৃত্তিকা অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতীকগত ব্যঞ্জনা হচ্ছে একটি চতুষ্কৌনিক আয়তক্ষেত্র বা কিউব। কিন্তু এর দ্বিমাত্রিক স্বরূপ হচ্ছে চতুষ্কৌনিক রেখা অঙ্কনের বহুবিধ বিস্তার ও সংকোচনকে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় উপকরণ পানি। পানির প্রতীক হচ্ছে গোলক। দ্বিমাত্রিকতায় ওই গোলক একটি বৃত্তে পর্যবসিত হয়। পানি যখন উঁচু থেকে নিচে পড়ে তখন গোলকের আকারে পড়ে। কিন্তু বাধা পেয়ে অগ্রসর হলে গতিধারায়ব বৃত্ত ও অর্ধবৃত্তের আকারে পরিলক্ষিত হয়। তৃতীয় উপকরণ অগ্নি। অগ্নির প্রতীক হচ্ছে ত্রিভুজ বা শঙ্কু। সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ঊর্ধ্বমুখী সুচালো কোণের মতো অগ্নির গতিও ঊর্ধ্বমুখী। চতুর্থ উপকরণ বায়ু। বায়ুর প্রতীক হচ্ছে অর্ধচন্দ্র বা ক্রিসেন্ট। বায়ু যেহেতু অদৃশ্যমান সেহেতু বায়ুর তাড়নায় বস্তুর প্রকৃত আকৃতির যে পরিবর্তন হয়, বায়ুর প্রতীক সেভাবে নির্মিত। পঞ্চম উপকরণ আকাশ। আকাশ বা শূন্যের প্রতীক হচ্ছে ডিম্বাকৃতি। যেহেতু আকাশ শূন্য এবং এর কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি নেই সেহেতু ডিম্বাকৃতি সাদৃশ্য নির্মাণ করে আকাশকে বোঝানো হয়েছে।

চীন কিংবা জাপান অথবা ভারতীয় শিল্পে যে কোনো বস্তু গঠন নির্মাণের ক্ষেত্রে মৌলিক আকৃতি হিসেবে বৃত্ত আকৃতি বা ডিম্বাকৃতি ফর্ম বেশি দেখা যায়। প্রাচ্যের শিল্পীরা মানব শরীরের মূল কাঠামো বা অস্থি সংস্থানের দিকে খেয়াল করেননি। তারা গাত্র আবরণ সংবলিত সম্পূর্ণ অবয়ব বৃত্ত আকৃতি ও ডিম্বাকৃতি রেখার টানে সুচিহ্নিত করেছেন। পাশ্চাত্য শিল্পের মূল আকৃতি কিউব ও

পলিহেড্রন। কিউব সমান ছয়তলার চতুষ্কৌনিক আকৃতি ও

পলিহেড্রন বহুবিধ তলের একটি ঘনক। শিল্পে প্রেক্ষাপটগত শুদ্ধতা নির্মাণের জন্য তাদের কিউব বা পলিহেড্রনের আকৃতিটি গ্রহণ করতে হয়েছিল। তাছাড়া মানব শরীর আঁকতে শরীরের মূল কাঠামো বা অস্থি সংস্থানটি অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছে। শরীরের অভ্যন্তর ভাগের অস্থির সংস্থান বিবেচনার মধ্যে রেখে ইউরোপের শিল্পীরা শারীরিক গঠন নির্মাণ করতেন। এ জন্য রেনেসাঁস যুগের শিল্পীকে শবব্যবচ্ছেদে দক্ষ হতে হতো। পাশ্চাত্য শিল্পে প্রেক্ষাপট অর্থাৎ আলোছায়ার মাধ্যমে রঙ ঘনত্বের তারতম্য সৃষ্টির যে শিল্পবিজ্ঞান রয়েছে, প্রাচ্য শিল্পে ওই পেক্ষাপটের সমর্থন নেই। প্রাচ্যের শিল্পীরা সম্ভবত প্রেক্ষাপটের মূলনীতিগুলো জানতেন এবং এর বাস্তব অবলোকনের প্রচলিত রীতিকে গ্রাহ্য করেননি। কেননা কোনো কোনো সময় উল্টো প্রেক্ষাপটের ব্যবহার দেখা গেছে। অজান্তার ভিত্তিচিত্রে এ ধরনের প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। রেনেসাঁসের আগেই পশ্চিম

ইউরোপের শিল্পীদের প্রধান প্রবণতা ছিল দৃশ্য জগতের হুবহু অনুকরণ করা। এ ছাড়া চিত্রে প্রেক্ষাপট ব্যবহারের কারণে দর্শকের দৃষ্টিকে চিত্রপটের বাইরে একটি বিন্দুতে স্থির করে। দর্শকের দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য বিন্দুতে গিয়ে মিলিয়ে যায়। ফলে ছবি হয় ত্রিমাত্রিক এবং আকারগুলো চিত্রপটে অনুপ্রবেশ করে। প্রাচ্যের শিল্পীরা চিত্রপটটি দ্বিমাত্রিক ভূমি ও বাস্তব জগৎ ত্রিমাত্রিক হিসেবে গণ্য করেছেন। কিন্তু চিত্রপটে পুনর্চিত্রণ করার সময় দ্বিমাত্রিকতায় এঁকেছেন তারা। পাশ্চাত্যের শিল্পীরা প্রেক্ষাপটের কাছে-দূরের তারতম্য নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিত্রপটের দ্বিমাত্রিক স্বভাব অক্ষুণœ রেখে ত্রিমাত্রিক বস্তুকে দ্বিমাত্রিক স্বভাবে পর্যবসিত করেছেন। অ্যাবস্ট্রাক এক্সপ্রেশনিজম অথবা পোস্ট এক্সপ্রেশনিজমের চিত্রগুলোই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রাচ্য শিল্পে বিশেষ করে চীনের ভূদৃশ্যের দূরত্ব আছে। দূরত্বের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, আছে অসীমের বিন্যাস। পাশ্চাত্যের শিল্পীরা বস্তুটি আলোছায়ার তারতম্যের মধ্যে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রাচ্যের শিল্পীরা শুধু প্রমাণিত আকৃতি গ্রহণ করেছেন, আলোছায়ার কথা ভাবেননি। একটি বস্তুর ওপর আলো এসে পড়লে দৃশ্যত এর বর্ণগত ও আকৃতিগত যে পরিবর্তন দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, প্রাচ্যের শিল্পীরা তা কখনো বিচার্য ভাবেননি। ফলে প্রাচ্যের শিল্পকলা ডেকোরেটিভ বা অলঙ্কৃত রূপকল্প বলে ইউরোপীয় চিত্র সমালোচকরা আখ্যা দিয়ে থাকেন। এরিখ নিউটন (১৮৯৩-১৯৬৫) এটিকে বলেছেন একটি আদর্শ সত্যের অন্বেষণ। ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে সত্য হচ্ছে দৃশ্যগত বাস্তব অবস্থানের রূপব্যঞ্জনা। প্রাচ্যের শিল্পীর কাছে সত্য হচ্ছে আদর্শের রূপায়ণ। ইউরোপীয় শিল্পকলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি বস্তুর যথার্থ দৃষ্টিগোচর স্বরূপক নির্ণয় করার জন্য শিল্পীরা বহুকাল শ্রমসাধ্য সময় দিয়েছেন। কী দেখছি অর্থাৎ কোন বস্তু দেখছিÑ ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে এটি বড় কথা নয়, কীভাবে দেখছি সেটিই বড় কথা। যুগভেদে এভাবে বস্তু দেখার কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে এবং বস্তুর নির্ণেয় স্বরূপ নতুন নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। প্রাচ্যের যেহেতু বস্তুই উৎকৃষ্ট সেহেতু যুগভেদে বস্তুর স্বরূপের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তাই প্রাচ্যের শিল্পীর কাছে একটি সবুজ গাত্র আবরণ সর্বদাই অনাবিল সবুজ। অবশ্য ইউরোপীয় শিল্পীর কাছে তা নয়। ইউরোপীয় শিল্পী আবরণের ওপর আলোছায়ার খেলা দেখেন। সবুজটিকে কোথাও অধিকতর গাঢ় সবুজ, কোথাও সবুজ এবং কোথাও হালকা সবুজ করে উপস্থাপন করেন অর্থাৎ ইউরোপীয় শিল্পীর বিচারে আলোছায়াই একটি বস্তুর রঙ নির্ধারিত করে, প্রাচ্যে তা নয়। বিশ্ব শিল্পকলার ইতিহাসে ভাস্কর্য চর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ ভাস্কর্যকলা একটি সংস্কৃতি, একটি দেশের সভ্যতা ধরে রাখে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের অতীত জানতে সহজ হয়। অবশ্য শিল্পকলার উৎকর্ষতা নিয়ে ছিল বিভিন্ন মত। ভাস্কর্যে ত্রিমাত্রিক গুণের কারণে দর্শকের কাছে বস্তুসাদৃশ্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। চিত্র অপেক্ষা ভাস্কর্য অনেকগুণ স্থায়ী ও গতিশীল। তাই শিল্পকলায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ ভারত উপমহাদেশের অংশীভূত বাংলাদেশ বর্তমানে খ-িত হলেও ঐতিহ্য সন্ধানে সুদূর গৌরব উজ্জ্বল অতীতে প্রবেশ অনিবার্য। এখন শিল্পীকুল যে ওই ঐতিহ্য থেকে উৎসাহিত হয়েছে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ঔপনিবেশিক আমলে সরাসরিভাবে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি, ভাস্কর্য, চিত্রকলার স্বকীয় ও অনুকৃতি আমদানি করে ২০০ বছরের শাসনকালে। অখ-িত ভারতবর্ষে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ইউরোপের বহু শিল্পী এসেছিলেন। ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, মানুষজন ও সংস্কৃতি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শিল্প, সংস্কৃতি, রুচিরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ইউরোপিয়ান স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা ভারতীয় শিল্পীদের অবশ্যই প্রভাবিত করে। ফলে শিল্প বিদ্যালয়ের সুনির্দিষ্ট শিক্ষা পদ্ধতির ভিত্তিতে এক সুনির্দিষ্ট শিল্পধারা গড়ে ওঠে। তা একাডেমিক স্টাইল বা রীতি নামে পরিচিত। ব্রিটিশ একাডেমিক রীতির আদর্শে গড়া এই নতুন ভারতীয় শিল্প ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করে এ দেশের নতুন শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজেও। কলকাতার বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট প্রতিষ্ঠা, শিল্পীদের গোষ্ঠী ক্যালকাটা গ্রুপ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায় ও রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের কার্যধারা অবিভক্ত বাংলার শিল্পধারাটি বিকশিত করে। এরপর ভাস্কর হিসেবে সমাধিক পরিচিত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ (১৯০৬-১৯৮০) ভাস্কর্যকলায় স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এর পূর্ণতার পরিচয় পাওয়া যায় তার ১৯৩৮সালে নির্মিত সাঁওতাল পরিবার ভাস্কর্যে। ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ-এর ভাস্কর্যের সূচনা হয় পাশ্চাত্য শিল্পীদের কাছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের দ্বন্দ্ব, একই সঙ্গে উভয় ধারা থেকে রসদ সংগ্রহ করে নিজেকে পরিশীলিত করেছেন। তার চিত্রকলায় যেমন নিসর্গচিত্রে দেশীয় পটভূমিতে দেখা যায় তেমনি ভিনসেন্ট ভ্যান গগ কিংবা পল সেজানের প্রতিচ্ছায়া ও কিউবিস্টদের পথ ধরে তিনি বিমূর্তাশ্রায়ী। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছিল কলকাতাতেও। এ প্রসঙ্গে রিবেল আর্ট সেন্টারের কথা বলা যায়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলÑ দেশজ শিল্পের প্রকৃত চরিত্র ও সত্তাটি রক্ষার জন্য পাশ্চাত্যের শিল্পরীতির আঙ্গিক আয়ত্ত এবং রিয়ালিস্টিক বা বাস্তববাদের দিকে ধাবিত করা। রামকিঙ্কর এক মডেল খুঁজছেন। নিজের জন্য, ছবির কৌশলের জন্য প্রয়োজন এক মডেলের। তাকে স্পর্শ, আঘাত ও হৃদয়ে প্রবেশ করে তার হৃদয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ভালোবাসায় ডুবিয়ে, জীবনের দিক থেকে আশ্রয়হীন করে চিনে নেবেন তিনি। শান্তিনিকেতনে মীরা দেবী (ভাস্কর মীরা মুখপাধ্যায়, ১৯২৩-১৯৯৮)-এর কাজে সাহায্য করেন সাঁওতাল এক রমণী। দেখা হলো সাধারণত্বে অসাধারণ রাধারানীর সঙ্গে। রাধারানী তার সাধনা, পরীক্ষার একটি উপকরণ হতে পারে। শিল্পী এদগার দেগা-কে ফরাসি দার্শনিক ও কবি পল ভ্যালোরি প্রশ্ন করেছিলেন, ড্রইংয়ের দ্বারা তিনি কী বোঝেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ড্রইং ইজ নট অ্যা ফর্ম। ইট ইজ ওয়ে অ্যা লুকিং অ্যাট ফর্ম। লুকিং অ্যাট ফর্মের ভেতর ধরতে হবে যন্ত্রণা এবং তার বিস্তৃত বোধ ও সীমানা। ওই সীমানার ভেতর নিজেকে অত্যাচারিত করার প্রবণতায় রামকিঙ্কর মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার সঙ্গে রাধারানীর পরিচয় সামান্য সময়ের। এ পরিচয়ের মধ্যেই আহ্বান করেছিলেন তার কাছে আসতে। তিনি জানতেন, রাতে রাধা আসবে তার কাছে। মীরা দেবীর বাড়ি ও রামকিঙ্করের স্টুডিওর মাঝে কাঁটাতারের বেড়া। সন্ধ্যার পর থেকে এপারে তিনি মাঠে বসে একতারায় শব্দ তুলছেন। কিন্তু মনোযোগী নন। সন্ধ্যা পেরিয়ে অস্থির রাত, সময় সমুদ্র তালগোল।

কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে অন্ধকারে এক রমণীর লজ্জিত পদক্ষেপ। অস্থির রামকিঙ্কর শিল্পের নতুন আকৃতি ও নিজেকে প্রকাশ করার ব্যগ্রতায় সবকিছু ভূলে গিয়ে রাধারানীকে দু’হাতে তুলে নিয়ে এলেন কাঁটাতারের বেড়ার এপারে। তাকে স্টুডিওর মডেল বক্সের ওপর আধশোয়া করে এমনভাবে রাখলেন, রাধা যেন কলের পুতুল। রাধা স্বপ্নের ঘোরের ভেতরে

আছেনÑ শব্দহারা লজ্জায় রক্তহীন। অথচ অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব যন্ত্রণার কাছে প্রৌঢ়া। রামকিঙ্করের কাছে স্টুডিওর পরিবেশে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। পেন্সিলের টানে ধরে রাখতে হবে রাধার শরীরের ফর্ম। ওই ফর্মের ভেতর ঝলসে উঠবে তীব্র যন্ত্রণা। কোহল-ক্লান্ত রামকিঙ্করও শল্যচিকিৎসকের মতো শুরু করলেন রাধার শরীর ব্যবচ্ছেদ, এক অলৌকিক ময়নাতদন্ত। তা দিয়ে বোঝা যায় এক মানবিকার মনের গভীরতা। শরীরের ভেতর আরেক শরীর। গর্ভের ভেতর বেড়ে ওঠা এক শরীরে আরেক শরীরের মতো অবিকল রূপে। ওই রূপে একটি বিশেষ ফর্ম শিল্পী এদগার দেগা-র কাছে। তার স্নানরতা ছবির বিষয়ের মতো, স্নানের পর এক তরুণী পেছন ফিরে তার চুল থেকে জল মুছে নিচ্ছে খুব স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু শিল্পীর ক্যানভাসে মোটা রেখার টানে তা ফুটে উঠেছিল অপূর্ব দেহ ভঙ্গিমায়। তা এখনো মুগ্ধ করে গ্যালারির দর্শককে। রামকিঙ্করের সঙ্গে দীর্ঘ বসবাসের এক সময় সন্তানসম্ভাবা হলেন রাধা। এ সময় রামকিঙ্কর একটি ম্যাডোনা চিত্র আঁকলেন। তার কোল থেকে নেমে আসছে চারটি শিশু। তার একটি চোখের আভাস দৃশ্যামান। অন্যদিকের চোখ ডুবে আছে ঘন চুলের নিচে। তার দুটি স্তন উন্মুক্ত। চারটি শিশুর মুখ সেখানে। বসুন্ধরার প্রতীকী রূপ। সব শিশুর জন্য মায়াবতী দুধঘর নিয়ে প্রস্তুত। রামকিঙ্করের কল্পনা ও রাধারানীকে প্রত্যক্ষ করা এক ম্যাডোনার চিত্র। দীর্ঘদিন সন্তানসম্ভাবার কোনো ইঙ্গিত না পেয়ে রাধারানী এক ব্রাহ্মণ পুত্রকে দত্তক নিয়েছিলেন। দত্তক নেয়ার পর জানতে পারেন তিনি সন্তানসম্ভাবা। ধর্মীয় মতে, দত্তক নেয়ার পর নিজের সন্তান জন্ম দেয়া অনাচার। তাও আবার ব্রাহ্মণপুত্র! একদিকে অনাচার, লজ্জা, ভয়। অন্যদিকে নারীত্বের গর্ব, মা হওয়ার প্রবল ইচ্ছা। একদিকে যন্ত্রণা, অন্যদিকে গর্ভের শিশুকে বাড়িয়ে তোলার আঁতুড় মমতা।

রাধারানীর সংকটকালে শিল্পী রামকিঙ্করের কাছে ছবির বিষয়ের আরেক নুতন দিগন্ত খুলে গেল। নারীত্বের গর্ব ও তার যন্ত্রণা। আঁকতে শুরু করলেন গর্ভযন্ত্রণার নারীচিত্র। তার যন্ত্রণার মধ্যে বসে আছে সেই নারী। ভারী স্তন যুগল ঝুলছে স্মৃতিতে সন্তানের মুখের কাছে। কিন্তু শিশুর অবয়বে চোখ, মুখ, নাক অদৃশ্য। আবার রাধাকে দাঁড় করিয়ে আঁকলেন তার তলপেটে সারা শরীরে আঁচড়। রাধারানী সেই সন্তানকে নষ্ট করে ফেলেছিলেন পালিত পুত্রের জন্য। কারণ ধর্মীয় মতের বিরুদ্ধ স্রোতে যাওয়ার ক্ষমতা তার ছিল না। রামকিঙ্কর ওই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। তিনি রাধার কষ্টের অনুভবটি প্লাস্টার দিয়ে তৈরি করলেন অসাধারণ এক ভাস্কর্য ‘মাতৃত্ব’। তার তলপেট স্থূলকায়, দু’হাত উপরে। ওই হাতের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে শিশু। শিশুর মুখ দু’স্তনের আড়ালে যেন দু’স্তনের মাঝে শিশু ঘুমিয়ে আছে। নারী চরিত্রের মুখে হাসি ও সারা শরীরে এক যন্ত্রণাহীন প্রশান্তি। রাধারানীর বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে। বর ছিল তার চেয়ে তিনগুণ বয়সের। বিয়ের কিছুদিন পর রাধা গিয়েছিলেন স্বামীর ঘর করতে, স্বামীর ভালোবাসায় সিক্ত হতে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন স্বামী তার প্রেমে অবিচল নন। তার একটি রক্ষিতা আছে। ওই সময় মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বাড়ি এলেন রাধা। বাবা সব শুনে বললেন, ‘ওখানে গিয়ে কাজ নেই। আমি তোর জন্য অন্য ব্যবস্থা করে দেবো।’ বাবার কথায় সায় দিলেও কিছুদিনের মধ্যে রাধা শরীরের ভেতর এক পুরুষের টান অনুভব করেছিলেন। তা ছিল চিরন্তন। তার স্বামী নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন রাধার বাবার বাড়িতে। ভালোবাসার গল্প করেন, শোনেন রাধা। শরীর ও মনের জন্য বাবার কথা অমান্য করে রাধারানী স্বামীর হাত ধরে আবার নিজের বাড়ি গিয়েছিলেন। যুবতী রাধা। স্বামী তাকে ব্যবহার করেন। না পাওয়ার চেয়ে এ অনেক ভালো। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর রাধার ঠাঁই হলো শান্তিনিকেতনে মীরা দেবীর বাড়িতে। এই হলো রাধারানী ও রামকিঙ্করের অধরা।

শান্তিনিকেতনে রাধারানীর ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন (১৯৮৯) রানাঘাটের লিটল ম্যাগাজিন ‘পুনরুত্থান’-এর দুই সম্পাদক আমার বন্ধুজন শান্তিনাথ ও গৌতম চট্টপাধ্যায়। আমি তখন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যকলা অনুষদের স্নাতকোত্তর শেষ পর্বের ছাত্র। শান্তি ও গৌতম বলেছিল, চলো যাই তিনজন মিলে এক সঙ্গে। আমার যাওয়া হয়নি রাধারানীকে সম্মান জানানোর জন্য।

 

গৌতম ও শান্তি : এখন আপনার মনে হয় না সন্তান থাকলে ভালো হতো?

লজ্জা মিশ্রিত কষ্টের ভেতর রাধারানীর উত্তর : ভালো হতো। তাকে নিয়ে থাকতাম। এখন ভাবি, কেন নষ্ট করলাম একজন মহান পুরুষের উত্তরাধিকার!

গৌতম ও শান্তি : রামকিঙ্করের কথা মনে হয় না?

রাধারানী : তার মুর্তির সামনে দাঁড়ালে কান্না পায়। এমন মানুষ হয় না। এমন ভালো কেউ বাসতে পারবে না।

গৌতম ও শান্তি: আপনার প্রথম স্বামী ভালোবাসতেন না?

রাধারানী : কারো সঙ্গে কারো তুলনা করতে চাই না। কেউ তো কারো মতো নয়।

গৌতম ও শান্তি : আর কিছু বলবেন তার সম্পর্কে?

রাধারানী : বাবু মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, রাধা, শ্মশানে অমৃত (মদ) দিস (রাধারানী তার কথা রেখেছিলেন। শ্মশানে অমৃত ঢেলে দিয়েছিলেন যেখানে রামকিঙ্করের দেহাবশের শেষ চিহ্ন ছিল। কিছু সময় নিমগ্ন থাকার পর আবার কথা বলেন

রাধারানী)। প্রথম দিকে মনে সন্দেহ হতো, বাবু কেন শ্মশানে অমৃত ঢেলে দিতে বলেছিলেন!

গৌতম ও শান্তি : এখন সন্দেহ নেই?

রাধারানী : না।

গৌতম ও শান্তি : কেন?

রাধারানী : তা তো ভেবে দেখিনি!

 

রাধারানীর কাছে এর ব্যাখ্যা না থাকলেও গৌতম ও শান্তিনাথের মতো আমাদের সবার জানা হয়ে গেছে ওই অমৃত কথা।

শিল্প অনুরাগী মানুষ তার শিল্পের ভেতর দিয়ে পান করেন ওই অমৃত।

একজন তপু খান

 

আপনার চোখে ভাস্কর্য শিল্প কী ও কেন?

ভাস্কর্য শিল্প হলো এর অধিক ডাইমেনশনের কাজ। ভাস্কর্য শুধু প্রাণী বা মানুষের দেহ গড়ে তোলা নয়, ইমারতও এক ভাস্কর্য শিল্প। এই শিল্প যে কোনো মাধ্যমে হতে পারে। আগে শিল্পীরা মাটি, পাথর, কাঠÑ এগুলো ব্যবহার করতেন। এখন ইচ্ছামতো মাধ্যম ব্যবহার করা যায়। এই শিল্প ইতিহাসের ধারক ও বাহক।

ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি আপনার আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো?

ছোটবেলা থেকেই ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। বাসায় কোনো শোপিস আনলে তা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতাম। মাটি দিয়ে তা বানানোর চেষ্টাও করতাম। ভারতে প্রথম ভাস্কর্য দেখার সুযোগ হয়। পরে অনেক দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন জাদুঘর ভিজিট করেছি। ওইসব কাজ দেখে খুবই অভিভূত হই। কীভাবে একটি জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা ও ঐতিহ্য ভাস্কর্য শিল্পে তুলে আনা যায় তা না দেখলে বোঝা যাবে না। এ জন্যই আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয় ভাস্কর্য শিল্পে।

এ শিল্পটি সঙ্গে নিয়ে আপনার পথচলার অভিজ্ঞতা আমাদের বলুন।

মূলত টেরাকোটা স্কাল্পচার করি। আমার স্টুডিওতে দেশি-বিদেশি ভিজিটর সব সময় আসা-যাওয়া করেন। তাদের মধ্যে টেরাকোটা ভাস্কর্য সংগ্রহের আগ্রহ দেখেছি। অনেকেই এ মাধ্যমে ভাস্কর্য তৈরির প্রশিক্ষণ নিতেও আগ্রহী। প্রথম টেরাকোটা স্কাল্পচার ওয়ার্কশপ করাই। পরে ওইসব কাজ দিয়ে প্রদর্শনী করি। তা প্রচুর সাড়া জাগায়।

ভাস্কর্য শিল্প নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

বাংলাদেশ থেকে প্রথম টেরাকোটা মিনিয়েচার স্কাল্পচার এক্সিবিশন করি আমেরিকার মেরিল্যান্ড-এ। এ দেশে প্রথম টেরাকোটা স্কাল্পচার ওয়ার্কশপ করাই। আগামীতে আরো টেরাকোটা স্কাল্পচার ওয়ার্কশপ করাবো এবং এ শিল্পটি সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলবো।

অন্য শিল্পকলা যেমনÑ চিত্রকলা, ছাপচিত্র, প্রাচ্যকলা বা বুনন শিল্পের মধ্যে ভাস্কর্য শিল্পের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে মনে করেন?

আমার কাছে ভাস্কর্য শিল্পই সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম মনে হয়। কারণ এই শিল্প দুয়ের অধিক ডাইমেনশন হওয়ায় বক্তব্য ফুটিয়ে তোলা যায় বেশি এবং অনেক সহজে।

 

এটি ওই জায়গায় স্থাপন করা যায় এবং সহজ বোধগম্য।

ভাস্কর্য শিল্পের সঙ্গে আপনার পথচলা কতটুকু সার্থক হয়েছে?

সার্থকতা এখনো বুঝতে পারছি না। কাজ করছি ভাস্কর্য শিল্প নিয়ে। আগ্রহীদের মধ্যে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। অনেক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এই পথ অনেক দুর্গম। তবু জানি, এগোতে হবে অনেক দূর।

ভাস্কর্য শিল্পে অবদান রাখার জন্য আপনাকে আপনার পরিবার কোন চোখে দেখে বা তাদের অভিব্যক্তি কী?

পরিবারের সব সদস্য আমাকে আমার কাজে প্রেরণা দেন ও সহযোগিতা করেন। আমার বাসা ও স্টুডিও একই বিল্ডিংয়ে হওয়ায় সবার সহযোগিতা সব সময়ই পাই।

ভাস্কর্য শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? বিভিন্ন দেশে আপনার ভ্রমণ ও অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

বাংলাদেশে ভাস্কর্য শিল্পের অবস্থানের কথা জানাতে গেলে বলতে হয়, উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান তৈরি হয়নি।

 

সারা দেশে একই শিল্পীর ভাস্কর্য স্থাপন করা হচ্ছে। এতে মনে হয়, এ দেশে আর কোনো ভাস্কর্য শিল্পী নেই। পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি। এই শিল্প দেখার তৃষ্ণা মেটাতে চেষ্টা করেছি। ওয়াশিংটন ডিসি-র স্কাল্পচার গার্ডেন-এ বিভিন্ন শিল্পীর ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে তা পরিবর্তন করে অন্য শিল্পীদেরও সুযোগ দেয়া হয়। আমার ইচ্ছা এ দেশেও ওই রকম একটা গার্ডেন স্থাপন করা।

আপনি বিশেষ কোনো শিল্পীকে অনুসরণ করেন কী?

কোনো বিশেষ শিল্পীকে অনুসরণ করি কি না তা জানি না। আমার নিজস্ব চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা দিয়ে শিল্পকর্ম করি। তবে আমার ভালো লাগা শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম হলেন হেনরি মুর, মাইরন, লরেঞ্জ বারতোলিনি ও পিকাসো। অনেকেই বলেন, মুরের প্রভাব আছে আমার কাজে। থাকতেও পারে নিজ অজান্তেই।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আপনার প্রদর্শনীর কথা বলুন।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনেক প্রদর্শনী করেছি। ভাস্কর্য প্রদর্শনী দেশে এখনো এককভাবে করা হয়নি। গ্রুপের সঙ্গে করেছি। এ বছর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করার ইচ্ছা আছে। গত জুনে আমেরিকার মেরিল্যান্ডে একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করেছি। বিপুল সংখ্যক ভিজিটর ছিলেন।

দেশ-বিদেশে আপনার করা ভাস্কর্য কী কী ও গ্রাহক কারা?

আমার ভাস্কর্য সব পোড়া মাটির আকারে। খুব বড় হয় না। দেশ-বিদেশে অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। দেশে এমপি রীমা (তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে), অভিনেতা তারিক আনামসহ অনেকের। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া-য় অনেকের সংগ্রহেই আছে আমার ভাস্কর্য।

বর্তমানে আপনি কী করছেন?

এ শিল্প নিয়েই কাজ করছি আমার স্টুডিওতে। এ ছাড়া উড কারভিং, মেটাল ওয়ার্ক, টেরাকোটা টাইলস নিয়েও কাজ করি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি।

এই পথে চলতে আপনার কোনো বাধা আছে কি?

খুব বড় ধরনের বাধা আছে বলে আমার মনে হয় না। মুসলিমপ্রধান দেশ বলে ইচ্ছামতো কাজ করা যায় না। আমি নারী নিয়ে বেশি কাজ করি। তবে কাজের ধরন কিছুটা বদলাতে হয়েছে। নুডি নিয়ে খুব একটা কাজ করা যায় না। তাই বিমূর্ত বা আধা বিমূর্ত কাজ করি।

তরুণ ভাস্কর্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার কোনো বক্তব্য থাকলে বলুন।

তরুণদের বলি, ভাস্কর্য শিল্প অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। এই শিল্প নিয়ে চর্চা করো। এই শিল্পের মাধ্যমে নিজ দেশের ইতিহাস, শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা নিজেদের ও বিশ্বের কাছে তুলে ধরো। সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখো। সব খারাপ কাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে।

মাধ্যমগতভাবে আপনি কোন উপকরণে ভাস্কর্য গড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন (পোড়ামাটি, কাঠ, ধাতব, বালি-সিমেন্ট ইত্যাদি)?

আমি যেহেতু মৃৎ শিল্পী সেহেতু পোড়ামাটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম।

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…