Page 1 of 2

‘যেভাবে বিচিত্রগামী, যাই আমি...’

প্রবীর ভৌমিক

 

শক্তি চট্টোপাধ্যায় চলে গেছেন প্রায় দুই দশক আগে। কলেজ স্ট্রিটের এক বিখ্যাত প্রকাশক একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘যে লেখক মৃত্যুর পরও ২০-২৫ বছর ধরে জাগরুক থাকেন তার প্রতিভা সম্পর্কে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না।’ সবাই নন- কোনো কোনো কবি, সাহিত্যিক মৃত্যুর পরও হেঁটে যান, হেঁটে যেতে পারেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই বিরলতমদের একজন। ১৯৯৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য পত্রিকা তাকে নিয়ে সংখ্যা প্রকাশ করেছে। গবেষণা করেছেন বেশ কয়েক ব্যক্তিত্ব। তাকে নিয়ে গ্রন্থ রচনাও কম হয়নি। প্রশ্ন হলো, এর উৎস কী!
তাঁর কবিতার বাকভঙ্গি, বাকরীতি এক স্বাতন্ত্র্য ঘরানা গড়ে তোলে। এসবই এসেছে তার নিজের মতো করে, জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে। এই জীবন যাপন উদ্দাম কিন্তু সহজ-সারল্যে ভরপুর। এই জীবন যাপনে লেগে থাকে দুঃখের অনন্য গভীরতা। কারণ সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়। নিজেকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলতে পছন্দ করতেন তিনি। কিন্তু কেন এই স্বেচ্ছাচার! মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের শিকড়ে কুঠারাঘাত। কখন যে তিনি কোথায় থাকতেন তার ঘনিষ্ঠরা তো ছার, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ও জানতেন না। এই যে বিশৃঙ্খলা তার মধ্যে এই বিপুল পদ্য (তার ভাষায়) রচনা বিস্ময়কর নয় কী! তার জীবন যাপন নিয়ে যতো কাহিনী এর ৫০ শতাংশ সত্য হলেই মধ্যবিত্তের কাছে আতঙ্কের রূপকথাও বটে।


শুধু কি কবিতা রচনা? এর পাশাপাশি কবিতা বিষয়ক সংগঠন করা, বিভিন্ন সংকলন সম্পাদনা করা। একটা কথা বলা হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই। এ সংজ্ঞাটি ঠিক বোধগম্য হয় না। ‘মানুষ তোমার পাশে আছি’ বলে চেঁচাতে হবে! নাকি হতে হবে কোনো রাজনৈতিক দলের দরদাম। ১৯৫৯ সাল থেকে সত্তরের দশকের প্রথম অর্ধাংশজুড়ে যে আন্দোলন ও আলোড়ন এবং তা দমন করতে যে পুলিশি সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন তার মতো করে। সত্তরের দশকের বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন যে তরুণরা তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যে নিষ্ঠুরতায় দমন করা হয়েছিল তা আজও রাষ্ট্রীয় হিং¯্রতার চরম কুৎসিত উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় তখন লিখছেন-

‘বিষণœ রক্তের দাগ রেখে গেছে অন্ধকারে ফেলে
মু-হীন তরুণের উজ্বল বিমূঢ় এক দেহ
খোলা ছিল গলির গৃহস্থ জালনা আর
রোষমুক্ত তরবারি ঘাতকের হিং¯্র সাংঘাতিক...’

বাংলাদেশের অনেক কবি-সাহিত্যিকই জানেন এ দেশের সাহিত্য, শিল্প সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনুরাগের কথা। যখন বাংলাদেশ হয়নি তখনো পূর্ব পাকিস্তান। ওপারের লেখালেখি প্রায় আসতোই না। তখন অনেক শ্রম, প্রভূত কষ্টে তিনি ১৯৫৯ সালে সম্পাদনা করেছিলেন ‘পূর্ববাংলার শ্রেষ্ঠ কবিতা’। এমন পর্বে বিস্তারিত জানা গেছে, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। মানবিক গুণে শীর্ণ ওই দৃষ্টিভঙ্গি। কবি নির্মলেন্দু গুণের রচনা থেকে জানা গেছে, ওই অস্থির সময়ে তরুণ এবং তখন এপার বাংলায় প্রায় অপরিচিত বাংলাদেশের এই কবির পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে নির্মুলেন্দু গুণ এ কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু ওই অংশটুকু দিয়েই তার কবিতা বোঝা যাবে না। বহুমাত্রিক তার বিস্তৃতি। তার কবিতার চলন।


বিভিন্নœ সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তিনি কবিতা লিখতে এসেছিলেন। ওই চ্যালেঞ্জের প্রথম প্রকাশ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’তে জানিয়েছিলেন, তিনি অনেক দিন থাকতে এসেছেন। দুই-তিনটি গ্রন্থের উল্কা উত্থানের ¯্রষ্টা হতে আসেননি। প্রথম দিকে আংশিকভাবে থাকলেও পরের দিকে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়- স্বতঃস্ফূর্ত, সাবলীল ও ধারাবাহিকভাবে। মাথায় চাপ নিয়ে তার পাঠককে উপস্থিত হতে হয় না।
কোনো তুলনায় যাচ্ছি না। জীবনানন্দকে বোঝাতে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বোঝাতে নিজেই মাঠে নেমেছেন চূড়ান্ত সপ্রতিভতায় শব্দ আর ধ্বনির তুমুল তোলপাড়ে। কেমন ছিল তার কবিতার আলোড়ন! কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের ভাষায়- ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায় আসরে ঢুকেই এমন হই চই শুরু করলেন- মানুষ, নিসর্গ ও সর্বোপরি ঈশ্বর নামক বহু ব্যবহারে ঢলঢলে বস্তুটিকে ত্যাগ করে এমন সব বিপজ্জনক কবিতার গোলা ছুড়তে লাগলেন যে, চারপাশের পুরনো মূল্যবোধের ঠুঁটো জগন্নাথ মার্কা বিগ্রহগুলি মাটিতে পড়ে এ-ওর মাথা ঠোকাঠুকি করতে লাগলেন। প্রথম কবিতার এই সেই তা-ব। তারপর ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে দেয়া। দেশের এমাথা-ওমাথা থেকে নোটিশবিহীন পর্যটন আর তা থেকে কুড়িয়ে আনা অমূল্য রতœরাশি। এটা খুব সহজ কাজ

নয়। চেয়ার-টেবিলে বসে ভারী ভারী তত্ত্বের পুস্তক পাঠান্তে শক্তির কবিতা রচনা নয়। নিজেকে পুড়িয়ে একদম খাঁটি করে তুলে এই লেখা, এই পদ্য (!) রচনা।’
একদিকে কবিতার ত্রাস, আর্তনাদ, হাহাকার। অন্যদিকে জীবনকে ভালোবেসেও মৃত্যুর রহস্যময় প্রাচুর্য। রবীন্দ্রনাথের মতো মৃত্যুশক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে দেবতা নয়, বরং এক অনিবার্য পরিণতি-

“কী হবে জীবন লিখে? এই কাব্য এই হাতছানি
এই মনোরম মগ্ন দীঘি, যার দু’দিকে চৌচির
ধমণী- নেহাতই টান আজীবন সমস্ত কুশল
ফাঁস থেকে ছাড়া পেয়ে এই মৃত্যুময় বেঁচে থাকা?”


তার মৃত্যুবোধ ভালোবাসা থেকে উঠে আসা। মৃত্যুবোধের বিপরীতে প্রেম। জীবনের কয়েকটা বছর নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিয়ে তিনি ভালোবেসে মরে যেতে চান। প্রেম যেন তার কাছে এক আলৌকিক আলো। নর-নারীর নেহাত যৌন সম্পর্ক নয়- জীবনের বন্ধনে আচ্ছাদন তার ভালোবাসা চাই, সম্পর্কের ভালোবাসা। এটি তার
কবিতাকে ক্রমেই করে তোলে নম্্র, পেলব ও মন্ত্রের মতো স্থির। তিনি বলেছেন, ‘প্রেম অনির্বাচনীয়তা পায় অবশেষে, যৌনতা সেখানে জায়গা পায় না।’ নিরিখের পেলব স্পর্শে উচ্চারণ করেন-

‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কি না?’


পাঠক লক্ষ্য করুন, কী প্রচ- সাহস, আত্মবিশ্বাস, বেপরোয়াভাবে ‘ফিরৎ’ শব্দটির অমোঘ প্রয়োগ। আর ‘লিখিত’ না হলে ‘ফিরৎ’ হয় না। সর্বোপরি ‘তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো’। নর-নারীর যৌন সম্পর্কের অনেক ক্লেদাক্ত বর্ণনা কবিতায় পড়েছি, অন্যান্যদের কবিতায়। কিন্তু নিসর্গ, নির্মোহ আর বাউলের বৈরাগ্য নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম মায়া ডেকে আনে ঘরের দাওয়ায়। তার ‘ভালোবাসা সব জানে, গোপনে আকণ্ঠ ভালোবাসা।’
এই যে কথা নেই, বার্তা নেই নিরুদ্দেশ যাত্রা, ঝুঁকির জীবন- এই পর্যটনগুলো নিশ্চয়ই ফুলশয্যা ছিল না। অনিশ্চিত কণ্টকের শয্যা। আর এখান থেকে, অরণ্য ও নিসর্গ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আহরণ করেছেন ভালোবাসার ব্যতিক্রমী সব ফুল-মালা। ঈশ্বরবোধ, মৃত্যু, জীবন, প্রকৃতি, রোমান্টিকতা, স্বেচ্ছাচার ও প্রেম- এ জটিল রসায়নেই তার অনন্যতা।
ঈশ্বরবোধ, শক্তির ঈশ্বর কোনো ধর্মের গুরুঠাকুর নন, ঈশ্বরের অলৌকিকত্ব নয়- একটা নির্ভরতার অবয়ব। যতোদূর জানি, কোনো ধর্মীয় লোকাচার ছিল না তার। ওইসব ধর্ম লোকাচার পালনের সময়ই বা কোথায় তার! তার প্রধানতম ধর্ম তো কবিতা। কিন্তু ঈশ্বর আছেন-

‘ঈশ্বর থাকেন জলে/তাঁর জন্য বাগানে পুকুর/আমাকে একদিন কাটতে হবে।
আমি একা... /ঈশ্বর থাকুন কাছে এই চাই- ’

এই যে ঈশ্বর সেটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত, মানুষের ঈশ্বর, সদর্থক ঈশ্বর। এই যে ঈশ্বর, তিনি দৈনন্দিন কার্যকলাপের মধ্যে থাকেন। মন্দিরে পাথরের বিগ্রহ নন, এমনকি কবিতাতেও-

‘কবিতাকে তার খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারি
যে-জন ঈশ্বর, বাঘ, পারিজাতময়, স্বর্গ, নারী।’

কলকাতায় এখন অনেক কিছুই হয়েছে, হচ্ছে। আর কিছু না হোক- কপট আলো, বিশ্ব যুব ফুটবল, ফিল্ম উৎসব, খাদ্য উৎসব, নাচ-গান, টাকা উড়ছে। খালাসীটোলা নয়, কবিরা এখন সম্ভ্রান্ত পানশালায়। কবিদের অধিকাংশই রাজা পাল্টালে আসন টেনে নিয়ে রাজার পাশে বসেন। একজন নেই, একজন দৈব উন্মাদ, একজন বাউল। একজন ‘এই শহরের রাখাল’ যিনি কয়েক মাস স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়ে ‘ডুয়াস’ বা ‘কালডুংরি’ থেকে এই মধ্যরাতে কলকাতায় ফিরেছেন। নেশাগ্রস্ত এবং ভূতগ্রস্তও বটে। ক্লান্ত হয়তো। বাড়ি ফিরবেন তার বাবুই, তাতার আর ‘সোনার মাছির কাছে’। এক পা বাড়ির দিকে, আরেক পা সদ্য ফেলে আসা অরণ্যমায়ায়। যাবেন বেলঘাটার দিকে, ট্যাকসি ডাকলেন- ‘ট্যাকসি, বেলঘাটা যায়াগা।’ ট্যাকসিচালক সম্মত হলেন। এবার অদ্ভুত আচরণ- ‘যাও, চলা যাও।’ এ দৃশ্য আমার মতো আরো অনেকেই দেখেছেন।


এখন কলকাতায় সব আছে। শুধু সেই হেমন্তের অরণ্যের ‘পোস্টম্যান’ নেই যিনি অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ দেখতে পান। ফলে এখন হেমন্তের থেকে অস্বস্তিকর বৃষ্টি।
নেই কী! আছেন কোথাও আড়ালে-আবডালে। আছেন মগ্ন পাঠকের হৃদয়ের কাছাকাছি, মেধার কাছাকাছি। মাঝে মধ্যে দুঃখবোধে আক্রান্ত হন-

‘তোমাদের জন্য ভারি দুঃখ হয় আমার
দুঃখ হয় তোমাদের দেশে শিল্প সাহিত্যের জন্য
তাদের সামনে পিছনে তাদের রেখে যাচ্ছো?
তোমরা কি সবাই এ্যামেরিকান ট্যুরিষ্ট?’
(যে হিবরুগান তুমি)

এ কবিতার প্রসঙ্গ দেশ, কাল, সময় যাই হোক না কেন- কলকাতার ক্ষেত্রে কি বর্তমানে প্রযোজ্য নয়!
আপনার শারীরিক অনুপস্থিতি পুষিয়ে দিচ্ছে আপনার বিপুল ও বহুমাত্রিক রচনা। আপনার শব্দহীন ৮৩ বছরের গর্জন। ভালো থাকুন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। আপনার পুরনো কলকাতায় আপনার মতো থাকুন। শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ তো আগেই বলেছেন, ‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটি কলকাতা।’

 

লুপ্তপ্রায় প্রজাতি ও পিতা-পিতৃব্যদের সাবধান বাণী

জাকির তালুকদার

 


আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা হাড্ডি খিজির শূন্যে পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে আমাকেও ডাকে- আহেন! এট্টু জলদি করেন! পাও দুইখান মনে লয় ইস্ক্রুপ মাইরা মাটির লগে ফিট কইরা দিছেন!
খিজিরের তাড়া, নিরন্তর তাড়াও আমাদের পা’গুলোকে এখন স্থবিরতা থেকে মুক্তি দিতে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হয়ে চলেছে। গতি ব্যর্থতা কি আমাদের জিন বৈশিষ্ট্য?
খিজির বিরক্ত হয়ে বলে, তাইলে হালায় বইয়া বইয়া খোয়াব দ্যাখেন! আমি যাইগা। খিজিরের তাড়া আছে। কারণ সে জানে যে, সে কোথায় যাবে। কিন্তু আমি কি আর অতো সহজে নড়তে পারি? নাকি খিজিরের কথামতো সঙ্গে সঙ্গে দৌড় লাগানো আমার সাজে? আমি তো পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজি, ফ্যানের বাতাস ছাড়া গরমের দিনে ঘুমাতে পারি না, ঠা-া কোকাকোলা খেতে পছন্দ করি এবং মাঝে মধ্যে খাই। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেট খেলা থাকলে ওইদিন অন্য কাজ ভালো লাগে না, প্যালেস্টাইনের ওপর ইহুদি হামলায় নিদারুণ মনঃক্ষুণœ হই এবং কেজিতে দুই-পাঁচ টাকা বেশি দিয়ে হলেও চিকন চালের ভাত খাই। আমা হেন মানুষ কি আর হাড্ডি খিজিরের কথায় হুটহাট বেরিয়ে পড়তে পারে? আমি বরং তাক থেকে বই নামিয়ে পড়তে শুরু করি। বই পড়া মানে হলো জ্ঞান অর্জন। আর জ্ঞান অর্জন হলে কোথায় যাওয়া উচিত তা বোঝা যায় এবং পদযাত্রার একটা মানচিত্রও পাওয়া যেতে পারে। খিজির আবার বলে, আরে, কীসব কিতাব-উতাব পড়বার লাগছেন! মিছিল তো দূরে চইলা যাইতাছে!
যাক, মিছিল আর কতো দূরে যাবে! তাছাড়া মিছিলে গেলেই তো শুধু হলো না, মিছিলের গতিপথ বলে দিতে হবে না? বলে দেয়ার লোক লাগবে না? গতিপথ বলে দেয়ার লোক না থাকলে মিছিল তো সোজা গিয়ে ধাক্কা খাবে পাথুরে দেয়ালে কিংবা ঝপাৎ করে পড়বে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে।

তাছাড়া মিছিলে গিয়ে হবেটা কী? আমাদের তো শেখানো হয়েছে যে, পুঁজিবাদই মানব জাতির অনিবার্য নিয়তি। জানানো হয়েছে, মানুষের ওপর মানুষের শোষণ চলতেই থাকবে। অনাহার, অপুষ্টি, অশিক্ষা, অবর্ণনীয় দারিদ্র্য আর বিপরীতে সম্পদের পাহাড় হচ্ছে মানব জাতির অনিবার্য বিধিলিপি। বিশ্বায়নের নামে গোটা পৃথিবীটা ভাগ করে নেবে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি। মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে যে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তা বাহুল্য বিবেচিত হবে। অধিপতি শ্রেণি যাকে সংস্কৃতি বলবে তাকেই মেনে নিতে হবে নিজেদের সংস্কৃতি বলে। আমাদের নারীদের লাবণ্য, শিশুদের পুষ্টি, প্রৌঢ়-বৃদ্ধদের প্রশান্তি, যৌবনের সৃষ্টিশীলতা- সব কিছু চিরস্থায়ী দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকবে চিরকালের জন্য। আমাদের শেখানো হয়েছে যে, এই অসাম্য থেকে মুক্তির কোনো উপায় মানব সমাজের নেই, এমনকি মুক্তির চিন্তা করাটাও অন্যায়। শেখানো হয়েছে যে, প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই, প্রতিবাদ করতে গেলেই বরং আরো চেপে বসবে অত্যাচারের বজ্রমুষ্টি। বিনীত প্রার্থনা জানাতে হবে। নম্র প্রার্থনায় নতজানু হলে হয়তো কিছুটা ছাড় পাওয়া গেলেও যেতে পারে। সবাই না পাক, অন্তত কেউ কেউ পাবে। যেমন তফসিলিদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে মন্ত্রী পর্যন্ত বানানো হয়, সাঁওতালদের মধ্য থেকে কোনো কোনো আলফ্রেড হেমব্রম-কে যেমন ম্যাজিস্ট্র্রেট বানানো হয়। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গেলেই তাকে মরতে হবে আলফ্রেড সরেন-এর মতো কিংবা নিখোঁজ হয়ে যেতে হবে কল্পনা চাকমার মতো। এর চেয়ে বই পড়তে পড়তে একটু অতীত থেকে ঘুরেও আসা যায়।

জলকলের ডানপাশ দিয়ে আয়ুব খানের বানানো ষাট ফুটি পিচ-পাথরের রাস্তা দূরের জেলার দিকে রওনা দিয়ে ঠিক উপজেলা পরিষদের তোরণের সামনে মিলেছে পাগলা রাজার রাস্তার সঙ্গে। পাগলা রাজার রাস্তা লম্বালম্বিভাবে অবশ্য বেশি বড় নয়। তবে বিস্তারে আয়ুব খানের রাস্তার সঙ্গে ভালোভাবেই পাল্লা দেয়। জনশ্রুতি, ওই রাস্তায় নাকি রাজার ছয় হাতি পাশাপাশি হাঁটতো মাহুতের তত্ত্বাবধানে বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়ে। শহরের ঘোষপাড়ার প্রতিষ্ঠাতা আদি ঘোষের ঘি খাঁটি না ভেজাল মেশানো তা নির্ণয় করেছিল রাজার কোনো এক হাতিই। খাঁটি ঘি নাকি পুং জননাঙ্গে মালিশ করার সঙ্গে সঙ্গে হাতি পেচ্ছাপ করে দেয়। এটা নাকি হাতি সমাজের এক মহান বৈশিষ্ট্য। তো খাঁটি ঘি তৈরির

সুবাদে হাতির পেচ্ছাপ করায় রাজা প্রীত হয়ে নিজে রাজবাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঘি পারিতোষিকসহ সংগ্রহ করার পাশাপাশি নারদ নদের দক্ষিণপাড়ে ঘোষপাড়া প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিলেন। রাজার রাস্তায় এখন হাতির চলাচল থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তবে মনুষ্য চলাচল এখনো একটি প্রবহমান বাস্তবতা। পাগলা রাজার রাস্তার দু’ধারে শিরিষ গাছের সারি। হাঁটতে গেলে যদি মৃদুমন্দ বাতাস থাকে তাহলে শিরিষ সঙ্গীত শোনা যেতো নিশ্চিত। যেতো বলার কারণ হলো, এখন আর ওই শিরিষ গাছগুলো নেই। স্বাধীনতার ঘোষক দাবিদার যখন প্রথম মিলিটারি আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন তখন তিনি নাকি পাগলা রাজার রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

উদ্যোগের চিহ্নস্বরূপ কাটা হয় শিরিষ বৃক্ষগুলো। বাকি কাজ আর এগোয়নি। ফলে পাগলা রাজার রাস্তা ধরে হাঁটতে গেলেও আমাদের প্রাক-যৌবন আর শিরিষের শির শির ধ্বনিতে মোহিত হওয়ার সুযোগ পেতো না। উপজেলা পরিষদ থেকে দক্ষিণ দিকে রওনা দিয়ে জলকলের বামপাশ দিয়ে হর্টিকালচার প্রজেক্ট পেরিয়ে ডোমপাড়া মাঠের কালভার্ট পর্যন্ত পৌঁছাতেই শেষ হয়ে যায়। কালভার্ট থেকে সরু ইট-কংক্রিটের আধুনিক রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে বনলতা বালিকা বিদ্যালয়, সমবায় বিভাগের অফিস, রাজা প্রতিষ্ঠিত দাতব্য চিকিৎসালয় যা এখন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, নতুন নতুন বসতবাড়ি, ফার্নিচারের কারখানা, বরফকল, নগরবাসীর মনন চর্চার চিহ্ন হিসেবে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পাশে ডা. কায়েস উদ্দিনের বিষণœ হোমিওপ্যাথির দোকান। সেখানেই আমি জীবনে প্রথম এক কমিউনিস্টকে চাক্ষুষ করি দৈনিক সংবাদ পাঠরত অবস্থায়। তখন দৈনিক ইত্তেফাকের রমরমা। বাড়িতে পেপার রাখা হবে- এতোখানি জাতে তখনো ওঠেনি আমাদের পরিবার। এখনো নয়। পাড়াতে চায়ের দোকান দুটি। একজনের নাম নবাব আলি, অন্যজনের বাবু মিয়া। রাজ-রাজড়ার শহরে একজন নবাব, অন্যজন বাবু। তারা উভয়েই কিছুটা মরমিয়া ধরনের। বুঝে ফেলেছিল চায়ের দোকান চালিয়ে তাদের সংসারের অবস্থা আর যাই হোক, রমরমা হয়ে উঠবে না। তাই দোকান চালালেও তাদের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব। দু’দোকানেই একজন করে ছোঁকরা কর্মচারী। তারাই চা বানায়, কাপ মাজে, মাটি আর শিক দিয়ে তৈরি চুলায় দৈলা গুঁজে দেয়। বাবু আর নবাব মোটামুটি খদ্দেরদের কাছ থেকে পয়সা-কড়ি বুঝে নেয় আর বাকি-টাকির হিসাব রাখে। তো দু’দোকানেই দৈনিক ইত্তেফাক। কিছুদিন রাজনীতি করা পাড়ার স্বনামখ্যাত জুয়াড়ি সিরাজুল চাচা আমাদের সেই সেভেন-এইটে পড়ার বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পেপারের শাঁস হচ্ছে এর উপ-সম্পাদকীয় কলাম। তখন উপ-সম্পাদকীয় লেখেন স্পষ্টভাষী, লুব্ধক, সুহৃদ প্রভৃতি নামের আড়ালে অতি জ্ঞানী ব্যক্তিরা। বিভিন্ন বিষয়ে লেখা হয় উপ-সম্পাদকীয়। কিন্তু একটি বিষয় থাকবেই। তা হচ্ছে কমিউনিস্টদের গালি দেয়া। একই সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করা যে, কমিউনিস্টরা হচ্ছে ভয়ানক মানুষ। দেশ ও জাতির ধ্বংসই কমিউনিস্টদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান, এমনকি মিলিটারিও ভয় পায় কমিউনিস্টদের। সিরাজুল চাচার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের শহরে কমিউনিস্ট আছে কি না। তিনি নাম বলেছিলেন এবং ঘটনাক্রমে একদিন হোমিওপ্যাথির দোকানে বসে থাকা কমিউনিস্টকে দেখিয়েও দিলেন।
আমি তো থ!

এই লোক নাকি ভয়ঙ্কর! নিরীহ গোবেচারা গোছের মানুষ, মাঝারি উচ্চতা, বয়স প্রৌঢ়ত্ব ছুঁয়েছে, মুখে সরলতার ছাপ, হেসে হেসে গল্প করছেন ডাক্তারের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা আরো জনাতিনেক লোকের সঙ্গে। হাতে দৈনিক সংবাদ।
প্রাক-তারুণ্যের ওই বয়সে ওইদিনই বুঝে গেলাম, কোনো একটি মিথ্যার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হয় ওই কমিউনিস্ট লোক মিথ্যা, না হয় দৈনিক ইত্তেফাক মিথ্যা।
কারণ কয়েকদিন আগেই যখন পাগলা রাজার রাস্তার শিরিষ বৃক্ষনিধন পর্ব চলছিল তখন ওই লোককে দেখেছিলাম বৃক্ষনিধনের প্রতিবাদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে। বৃক্ষের প্রতিও যাদের এতো ভালোবাসা তারা মানব জাতির এতো বড় দুশমন হয় কীভাবে? ওই লোক থেকে দূরে থাকিস! সিরাজুল চাচা তো বলেনই, আব্বাও সতর্ক করে দেন। আমাদের ব্যাচের ছয়জনের তখন টার্গেটই হয়ে যায় ওই লোকের কাছে যাওয়া। এমনকি যে আসাদ দুই মাস ধরে পড়াশোনা শিকেয় তুলে শুধু ডিসি অফিসের নাজির কুতুবউদ্দিনের মেয়ে নার্গিসকে একনজর দেখার জন্য এবং তাকে নিজেকে দেখানোর জন্য দিনে অন্তত চার পাক মারে হেমাঙ্গিনী ব্রিজ টু চাঁদমারী মাঠ পর্যন্ত সেই আসাদও এই প্রথম নার্গিস ভিন্ন অন্য কোনো বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।
ওই লোকের কাছে ভিড়লে অসুবিধা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে বহুদর্শী গৃহঅন্তঃপ্রাণ বাপ-চাচারা বলেন যে, ওই লোকের কাছে গেলে তোদেরও কমিউনিস্ট বানিয়ে ছাড়বে সে। আর কমিউনিস্ট হলে তার ইহকাল-পরকাল শেষ! সর্বনাশ! এমন একটা বিপজ্জনক মানুষকে এই লোকালয়ে বাস করতে দেয় কেন শহরের মানুষ? দেয়! কারণ গণতন্ত্রের দেশ তো। কাউকে দেশ থেকে বের করে দেয়া যায় না। তবে নজর রাখা হয়। খুব কড়া নজর। এই শহরে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের অন্তত অর্ধেক গোয়েন্দাকেই রাখা হয়েছে শুধু ওই একটা লোককে ছায়া হয়ে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। তাই অন্যদিকে নজরই দিতে পারে না গোয়েন্দা বিভাগ। এ কারণেই তো শহরে চুরি-ডাকাতি আর স্মাগলিংয়ের রমরমা অবস্থা। আমরা কমিউনিস্টের প্রতি এতোই আকর্ষণ বোধ করি যে, তার কাছে ঘেঁষার জন্য আমাদের মগজের মধ্যে পরিকল্পনা তৈরি হতে থাকে অবিরাম।

প্রথমে পরিকল্পনা করা হলো, তার ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হবে। কিন্তু তার ছেলে থাকলে তো! বিয়েই করেননি লোকটা। আমাদের অন্য পরিকল্পনাগুলোও কাজে আসে না। তখন আমরা আবার ধরি সেই সিরাজুল চাচাকেই। কিন্তু রাজি করাতে পারি না। উল্টো সিরাজুল চাচা আমাদের যে গল্প শোনান তা শুনে আমরা তো থ। এই জেলার প্রধান সরকারি নেতা- যিনি এখন জেলার হর্তা-কর্তা ও বিধাতা সেই নেতাও নাকি তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে ওই কমিউনিস্টেরই শিষ্য ছিলেন। কাজেই সবার চেয়ে তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন ওই লোক কতোখানি বিপজ্জনক। পরিস্থিতি আঁচ করতেও তার কোনো জুড়ি নেই। রাজনীতির সবচেয়ে ভালো গুরুর কাছে শিক্ষা পেয়েছেন যে! সেই নেতার একটি গল্প শোনান সিরাজুল চাচা। ওই গল্প শুনে আমরা এতোই ভয় পেয়ে যাই যে, ভয়ে আমাদের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে চায়। ফলে আমাদের আর কমিউনিস্টের কাছে যাওয়া হয়নি। সেই থেকেই মিছিলে যেতে আমাদের এতো দ্বিধা ও ভীতি। নতুন শতকের নবম বছরে গল্পটি হয় এই রকম-

নেতার দরজায় এমন ভিড় সব সময়েই থাকে। সব জায়গাতেই মাছি ওড়ে। কিন্তু যেখানে মাছির দল থকথকে হয়ে জমে থাকে, বুঝতে হবে সেখানে গুড়-চিনির সিরা আছে। তার দরজাতেও গুড়-চিনি আছে। ক্ষমতার গুড়-চিনি। তিনি যখন বাড়িতে ঢোকেন বা বাড়ি থেকে বের হন, কখনো গেটের জটলার দিকে তাকান না। কিন্তু জটলা আছে টের পান। জটলা আছে দেখে এক ধরনের তৃপ্তিও পান। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার গাড়ির কাঁচে- স্লামালেকুম স্যার, আদাব স্যার, নমস্কার স্যার জাতীয় শব্দ এসে বাড়ি খায়। তিনি কখনো না তাকিয়ে হাত তোলেন, কখনো শুধু একটু মাথা ঝাঁকান, কখনো কানে মোবাইল ফোন চেপে ধরে ভুশ করে বেরিয়ে যান।


গেটের জটলা থেকে তার তদবির ঘরে পৌঁছাতে অনেকেরই বেশ সময় লাগে। তবে কেউ কেউ ঠিকই লেগে থেকে সুযোগ করে নিতে পারে। যেমন- আজকের ছেলেটি পেরেছে। ছেলেটিকে দেখে বাহ্যিকভাবে তার ভ্রƒ একচুলও কাঁপেনি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি সত্যিই একটু টাল খেয়ে গেছেন। দু’দিন ধরেই খাচ্ছেন। গেটের সামনে কৃপা প্রার্থীর জটলায় ছেলেটিকে তিনি আগেই দেখতে পেয়েছেন। দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠেছিলেন। এ কাকে দেখছেন তিনি! এতো চেনা চেনা লাগছে কেন?
গেট থেকে তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতে ছেলেটির তিন দিন লেগেছে। তাকে খুঁটিয়ে দেখলেন তিনি। নাহ! একে তিনি দেখেননি। কিন্তু এরপরই চমকে উঠলেন ভয়ঙ্করভাবে। আরে, এ তো তিনি! তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি নিজে! এ কীভাবে সম্ভব! মাথাটার তখন একবার চক্কর দিয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না এবং তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে তার ভেতরের অপরিসীম অভিযোজন ক্ষমতা যা তাকে এতো দূর এনেছে। ফলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেন তিনি। বুঝতে পারেন, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি তিনি নন- অন্য আরেক মানুষ, আরেক যুবক। তার মধ্যে তিনি শুধু নিজের অতীতের একটুখানি ছায়া দেখতে পেয়েছেন। তার ৩০ বছর আগের অতীত যখন তিনি বিপ্ল¬বী রাজনীতি করতেন। কী সমস্যা তোমার?


আমার একটি চারিত্রিক সনদপত্র দরকার। তার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কথাগুলো বললো ছেলেটি।  তিনিও এমনভাবেই কথা বলতেন সেই সময়। বিনয়ের আতিশয্য নেই, কৃপা প্রার্থীর কুণ্ঠা নেই। তেমনই নেই অভব্যতাও। ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট কেন? চাকরি চাই? ছেলেটা কোনো উত্তর দেয় না।

শুধু মৃদু হাসে। দিনতিনেক না কামানো গালে ঘন হয়ে গজিয়ে ওঠা কচি ধানচারার মতো দাড়ি। জিন্সের প্যান্টের ওপর খাদির পাঞ্জাবি অপরিষ্কার না হলেও ইস্ত্রিবিহীন। তাকে ডাকছে ৩০ বছর আগের দিনগুলো। কিন্তু তার সেই অভিযোজন ক্ষমতা এখনো ক্রিয়াশীল এবং অচিরেই তা তাকে ফের বর্তমানে ফিরিয়ে আনতে পারে। তিনি তার এখনকার মনোভঙ্গি ও বাচনভঙ্গি ফেরত পান।
কিন্তু তোমাকে আমি ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেবো কীভাবে? আমি তো তোমাকে চিনিই না। তুমি রাষ্ট্র বিরোধী বা গণবিরোধী কোনো কাজে জড়িত কি না তা আমি জানবো কীভাবে?
ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত ভাবলো। তার চোখের দিকে আরো একবার তাকালো সোজাসুজি। একটু নির্মিলিত হয়ে এলো তার চোখের পাতা। যখন কথা বললো তখন কণ্ঠস্বর মন্ত্র, গাঢ়, স্তোত্র পাঠের মতো সুগভীর- আমি শপথ করে বলছি যে, পৃথিবীর কোনো অন্যায় হত্যাকা-ে আমার কোনো অংশগ্রহণ নেই! ফিলিস্তিনি নারী-শিশু ও স্বাধীনতা যোদ্ধাদের ওপর যুগ যুগ ধরে যে গুলিবর্ষণ চলছে, আমি তাতে অংশ নিইনি। অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে যেদিন থেকে ইরাকের শিশুদের দুধ ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে সেদিন থেকে ভাতের লোকমা মুখে তুলতে আমি অপরাধ বোধে আক্রান্ত হই।

নেলসন ম্যান্ডেলা যতো দিন কারারুদ্ধ ছিলেন ততো দিন  নিজেকেও বন্দি ভেবেছি। কবি বেঞ্জামিন মলয়েজ-এর ফাঁসির দিনটিকে আমি শোক দিবস হিসেবে পালন করি প্রতি বছর। আমেরিকার ছোড়া কুহকি ক্লাস্টার বোমাকে চকলেট ভেবে হাতে তুলে নিয়ে রক্তাক্ত হয় যে আফগান শিশুরা তাদের সঙ্গে আমিও রক্তাক্ত হই প্রতিনিয়ত। বসনিয়ার গণহত্যা ও নারী ধর্ষণের জন্য প্রতিদিন ক্ষমা প্রার্থনা করেছি আমার সহোদরাদের কাছে। আমি শপথ করে বলছি, যারা ফুলবাড়ীতে গুলি চালিয়েছে, রক্ত ঝরিয়েছে কানসাটে তাদের সঙ্গে আমি ছিলাম না। আপনি বিশ্বাস করুন, প্রতিদিন আমাদের দেশে যতো কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, যে দুর্নীতির কারণে আমাদের পুরুষরা জীবিকাহীন, নারীরা লাবণ্যহীন, শিশুরা পুষ্টিহীন সেসব দুর্নীতির সঙ্গে আমার কোনো সংস্রব নেই। আমি শপথ করে বলছি...। যুবক বলেই চলেছে। তার কণ্ঠস্বরে পুরো ঘরে নেমে এসেছে স্তব্ধতা। কিছুক্ষণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে যুবকের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর খস খস করে লিখলেন, এই যুবক আমাদের রাষ্ট্র ও আমাদের বিন্যাসিত সমাজের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তাকে রাষ্ট্রের কোনো কাজে কোনোদিন নিয়োগ দেয়া চলবে না।

কারণ সিরাজুল চাচা মনে করিয়ে দেন- নেতার মনে হয়েছে, ছেলেটির মধ্যে তার পুরনো গুরুর ছায়া। গুরু এখনো এমন বিরূপ ও প্রতিকূল সময়েও মাঝে মধ্যে বানিয়ে ফেলতে পারেন এখনকার স্থিতাবস্থার জন্য ভয়ানক হুমকিস্বরূপ এমন এক-দুই বিপজ্জনক তরুণ কিংবা যুবক।

 

রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের সাংস্কৃতিক জটিলতা

হায়াৎ মামুদ

 

এক.
জীবন যেন বহতা নদী। তো শুধু দু’কূলের শাসনে নিয়ন্ত্রিত জলধারা নয়। নদী মানে জলের স্বভাব, এর পটভূমি ও জলতলের মৃত্তিকা-চরিত্র, জলের গভীরতা, বর্ণ, চতুষ্পার্শ্বের ভূসংস্থান এবং নিসর্গ দৃশ্য- সবকিছুই। জীবনও তেমনি জড়িয়ে থাকে কোনো না কোনো জনগোষ্ঠীর জন্ম ও মৃত্যু এবং এর মধ্যবর্তী কালপরিধিতে তার আচরিত জীবনধারা নিয়ে। সংস্কৃতি ওই
জীবনপ্রবাহের ভেতরে ধীরে ধীরে তৈরি হতে হতে এগিয়ে চলে নদীর মতোই। জল ছাড়া যেমন নদী নেই, জীবন বাদ দিয়ে কোনো সংস্কৃতি নেই। কিন্তু ওই জীবন কার? মানুষেরই তো। আর মানুষ বাঁচে সময় ও ভূগোলে। নির্দিষ্ট সময় ও ভূমি চিহ্নিত সীমানায় তার অবস্থান তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে বলে সেটিই তার জীবনীশক্তি। এর বলে সে ক্রমেই বেড়ে ওঠে যেন কোনো বৃক্ষের বেড়ে ওঠা- পরিণত হয়, ডালপালার উন্মীলন ও পুষ্পের প্রস্ফুটনে সে ধীরে ধীরে নিজের বৈশিষ্ট্য ও চারিত্র্য অর্জন করে। ওই প্রক্রিয়া জটিল বলেই সংস্কৃতির চরিত্রও জটিল এবং প্রক্রিয়াটির মধ্যেই চলিষ্ণুতা আছে বলে কোনো জনগোষ্ঠীর যে বিশালায়তন ক্রিয়াকা-কে আমরা সংক্ষেপে ‘সংস্কৃতি’ নামে চিহ্নিত করি। তার ধমনিতে একটা গতিশীলতা থেকেই যায়। আর ওই অন্তর্নিহিত গতির আবেগ ও প্রবাহের কারণেই আমরা যে যা-ই মনে করি না কেন, ‘সংস্কৃতি’ কোনো অনড়, কালনিরপেক্ষ, ভূগোল নিরপেক্ষ, অপরিবর্তনক্ষম ঘটনা নয়- মনুষ্য জীবনের মতোই সে সর্বদা সপ্রাণ ও জঙ্গম। একক ব্যক্তি বা সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর মতোই সংস্কৃতিরও চাওয়া-পাওয়া আছে, আশা-আকাক্সক্ষা আছে, ব্যর্থতা ও আশাভঙ্গও আছে। এ জন্যই পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেমন, তেমনই বাঙালি সংস্কৃতির বেলায়ও সার্বিক বিচারে সংস্কৃতি প্রসঙ্গ নিরতিশয় জটিল। তাই এর সরলীকরণ সম্ভব নয়।


বাঙালির সংস্কৃতি কোনো সরল ও একরৈখিক ব্যাপার যে হতে পারে না তা বোঝার জন্য বেশি দূর যেতে হয় না। নতুনভাবে কোনো প-িতি গবেষণারও প্রয়োজন নেই। কেবল দুটি মৌলিক বিষয়
বিবেচনায় রাখলেই চলে- বাঙালির জন্মকাল ও স্বদেশভূমি অর্থাৎ আমরা যারা বাঙালি তাদের প্রথম আবির্ভাব কখন ও কোথায়? নিজের জন্ম পরিচয় অনুসন্ধান যেমন ব্যক্তিমানুষের আদি জিজ্ঞাসা তেমনি জনগোষ্ঠীর অপরিহার্য কৌতূহল নিঃসন্দেহে। দেখতে পাবো, প্রাগার্য একটি জাতি কয়েক হাজার বছর কতো অজস্র রকমের বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহের ভেতরে যেতে যেতে আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যখন তার একটি অংশকে ভাবতে হচ্ছে- এতো দিন পরও সে কে বা তার পরিচয় কী? বাঙালি জাতির ওই অংশটির নাম ‘বাঙালি মুসলমান’। গত শতাধিক বছরের উপরে বাঙালি মুসলিম এই একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে বিড়ম্বিত হয়েছে- বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় কী? প্রশ্নটি নিশ্চয়ই হাস্যকর। কেননা এর উত্তর তারও জানা যে, সে বাঙালি এবং সে মুসলমান। তবুও হাসির উদ্রেক না করে এই প্রশ্ন আমাদের যে ভাবায় এর কারণ হলো- কোনো জনগোষ্ঠীর মনে বিনা কার্যকারণে এমন প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে না। ওই কার্যকারণের সম্বন্ধ সূত্রগুলো আমরা জানি, বহু গবেষক ও প-িত তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে কোনো জনগোষ্ঠীর এমন সংশয় ও হীনম্মন্যতাবোধ আছে কি না জানি না- যেমন বাঙালি মুসলমানের আছে।


বাঙালি মুসলিমের আত্মপরিচয় জিজ্ঞাসা সর্বৈবভাবে সংস্কৃতি জিজ্ঞাসা। (অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমাকে বার বার ‘বাঙালি মুসলমান’ কথাটি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে আমি লজ্জিত। কারণ আমি জানি, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে মুসলমান ছাড়াও হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আছেন। তবু একমাত্র মুসলমান সমাজকেই প্রসঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু করার কারণ না বললেও চলে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং ওই প্রাবল্যের জন্য অন্য ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যার ওপর তার আগ্রাসী শারীরিক ও মানসিক চাপ)। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি কী? এমন অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় সব সময়ই থাকছে এ জন্য যে, জনগোষ্ঠীর এক বিপুল অংশকে বহুকাল ধরে এ প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলেছে এবং এরই উত্তর হিসেবে বাঙালি মুসলমান যেসব ক্রিয়াকা- নির্ভুল ও একমাত্র সত্য বলে বিভিন্ন সময় বিবেচনা করেছে- সময় এবং ইতিহাস সেগুলো বার বার খারিজ করে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ের ভেতর দিয়ে যে নবীন দেশ আবির্ভূত হলো এর নাম যে ‘বাংলাদেশ’ হবে তা নিয়ে কারো মনে বিন্দুমাত্র সংশয় বা কোনো ভাবনা-চিন্তা মাথায় আসেনি। এর কারণ হলো, আত্মরক্ষা ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ওই প্রাণপণ সংগ্রামে বাঙালি হিসেবে একত্মবোধই যদি একমাত্র প্রাণশক্তি হয়ে থাকে তাহলে অর্জিত বিজয়ের নাম ‘বাংলাদেশ’ ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারতো? সঙ্গতভাবেই আমরা ভেবেছিলাম, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাবই বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের শেষ ও চূড়ান্ত ঐতিহাসিক জবাব। আমাদের নাম বাঙালি, দেশের নাম বাংলা এবং বহুজাতিক (নৃতাত্ত্বিক অর্থে) ও বহুধর্মীয় এই জনগোষ্ঠীকে যে ঐক্য সূত্র ‘বাঙালি জাতি’তে রূপান্তরিত করেছে এর নাম ‘বঙ্গ সংস্কৃতি’। দুর্ভাগ্য এই যে, ‘বাংলাদেশ’ হওয়ার পরও পুরনো প্রশ্ন বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে এবং আমাদের জীবৎকালে মনুষ্যজন্মের যে সার্থকতা ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠায় আমরা উপলব্ধি করেছিলাম ওই সুকৃতিকে ওই প্রশ্ন আজ উপহাস ও ধ্বংস করার জন্য উন্মুখ। এ ঘটনা বেদনার ও লজ্জার অবশ্যই। কিন্তু দুষ্টবুদ্ধিদের চক্রান্ত বলে ব্যাপারটি উড়িয়ে দিতে আমার হৃদয় ও যুক্তিবোধ সায় দেয় না। কারণ যা-ই হোক, এ কথা মানতেই হবে- আমাদের ন্যায় ও সত্য ওদের মনে আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। যারা চক্রান্তপরায়ণ তারাও যে আমাদেরই লোক অর্থাৎ বাঙালি, এটিও ভুললে চলবে না। অনেক পরিশ্রমে যে অঙ্ক কষে ‘বাংলাদেশ’ নামে উত্তর পাওয়া গেছে, ওরা আবার ওই অঙ্ক কষতে চায় কেন? অন্যতম কারণ নিশ্চয় এই যে, অঙ্কটি আমরা বোঝাতে পারিনি। বোঝানোর উপায় হচ্ছে- নিজের সংস্কৃতিকে অনুধাবন করা, ঠিকঠিক শনাক্ত করা এবং সেভাবে অন্যকে চেনানো ও বোঝানো।


আমি বাঙালি- এই পরিচয় যদি সত্য হয় তাহলে আমার সংস্কৃতিও বাঙালি। অনেকের চিন্তায় যে বিভ্রান্তি আসে এর কারণ সব সংস্কৃতির জটিলতার মতোই বঙ্গ সংস্কৃতি জটিল বলে। এ জন্যই বঙ্গ সংস্কৃতির বাহ্যিক চেহারা ও অন্তর্গত মৌলিক গড়ন সজ্ঞানে ও সচেতনভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বাঙালি মুসলমান যে দোলাচলচিত্ততার শিকার শতাধিক বছর ধরে হয়ে এসেছে ওই বিভ্রান্তি ঘুচিয়ে এটিকে স্থির প্রতিষ্ঠ হতে হলে জ্ঞান ও চিন্তার পথ ধরেই আজ অগ্রসর হতে হবে। এছাড়া বিকল্প পন্থা নেই। কেননা ভাবের পথ বেয়ে অতি সহজেই যেখানে যাওয়া যেতো, আমরা স্বআরোপিত মূঢ়তায় ওই দরজা বহু আগেই বন্ধ করে দিয়েছি।


দুই.
বাঙালির বাস যে ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে (রাষ্ট্রিক সীমানা নয়) সেটিই তাদের আদি বাসভূমি- এই সত্য সর্বাগ্রে স্মরণ রাখা জরুরি। বাঙালি এ রকম কোনো জাতি নয় যাকে বহিরাগত বলা যাবে। একটি প্রতিতুলনায় ব্যাপারটি স্পষ্ট করা যাক- মার্কিন জাতির আদি বাসভূমি আমেরিকা নয়। যে যে জনগোষ্ঠী আজ সম্মিলিতভাবে মার্কিন জাতিসত্তায় একীভূত হয়েছে তারা সবাই বহিরাগত। বাঙালি ওই রকম কোনো জাতি নয়। আমাদের পিতৃপুরুষের দল এ ভূমিরই আদি বাসিন্দা ছিল অর্থাৎ আমরা এই ভূমি থেকে উদ্ভূত। এমন নয় যে, এ মাটিকে আমাদের নিজের করে নিতে হয়েছে। আর্য আগমনের আগে এ ভূখ-ে আমরা বাঙালিরাই ছিলাম। এরপর সময়ের প্রবাহে আর্য এসেছে তাদের জীবনধারা নিয়ে, এসেছে হিন্দু। ধর্মমত বোঝাচ্ছি না, বলতে চাইছি বাংলার বাইরে ভারতীয় আবার ধর্মকে বাদ দিয়েও নয়, বাঙালি সংস্কৃতির চেহারা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাঙালির চিত্তলোকে সদা প্রস্ফুটিত থাকা প্রয়োজন।
বাঙালির সংস্কৃতি মানে বাংলা ভাষা, বাঙালির সামাজিক আচরণ ও জীবনধারার পদ্ধতি, ধর্মাচার, আবহমানকালের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং রবীন্দ্রনাথ।

তিন.
যে কোনো জনগোষ্ঠীর নাড়ির বন্ধন যে একক সূত্রে গাঁথা হয় এর নাম ভাষা। মনে রাখতে হবে, ভাষা কোনো নিরাশ্রয়ী শব্দপুঞ্জ নয়, ভাষা মানেই হচ্ছে দেশ ও কালের সীমানায় আবদ্ধ
জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের বাঙ্ময় প্রকাশ। ফলে যে কোনো জাতির জন্ম ও বিকাশের লক্ষণাবলি ভাষা তার শরীরে ধারণ করে থাকে। বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর বর্ণ সাংকর্যে যে বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে এর নিয়ন্ত্রক ধর্ম বিশ্বাস এ জন্যই নয়। কেননা ধর্মের ভিন্নতা বিভাজনরেখাই শুধু প্রতিষ্ঠা করে। ধর্ম নয়- যা সবাইকে একতাবদ্ধ করে তা হলো দেশের ভূগোল। ভূগোল অর্থ দেশের সামগ্রিক ভূপ্রকৃতি ও নিসর্গবিন্যাস। মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় জীবনধারণের জন্য পরিশ্রমে অর্থাৎ মাটিকে নিয়ে। আমাদের ক্ষেত্রে জলকে নিয়েও। এর মানে হলো, জীবনধারণের সমপদ্ধতি এবং তৎসম্পৃক্ত যাবতীয় ক্রিয়া ও কল্পনা-মেধা একটি জনগোষ্ঠীকে এক পঙ্ক্তিতে বসায়। ওই বাস্তব অবস্থাই যে কোনো জাতির একমাত্র নিয়ামক শক্তি। বাঙালি সংস্কৃতির মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে বাংলার কৃষিভিত্তিক ও নদী নির্ভর সমাজে এবং বাঙালির স্বভাব-চরিত্র তথা তার আবেগপ্রবণতা, কল্পনাবিলাস, অভিমান, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাপ্রবণতা- সবকিছুই তার আবাসভূমির ভৌগোলিক সংস্থানের দান। এক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাব, অন্তত ইসলাম ধর্মের প্রভাব নিতান্তই অল্প। এমন একটি ধর্ম যার উৎপত্তিস্থল মরু অঞ্চলে। এটিকে বর্ষা প্লাবিত তৃণশ্যামল ভূমিতে রোপণ করে ফলবতী বৃক্ষের আশা করতে হলে নতুন জায়গার জল-মাটিকে স্বীকার করে নিতেই হয়। আউলিয়া-দরবেশ যারা এ দেশে এসেছিলেন বা থেকে গেছেন তারা তা জানতেন। তাই বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের কোনো সংঘাত অতীতে কখনো ঘটেনি।

বাঙালি মুসলমানকে কখনো ভাবতে হয়নি তারা ‘বাঙালি’, না ‘মুসলমান’। তারা জেনে এসেছেন, তারা বাঙালি বটে আবার মুসলমানও বটে। মুসলমান হতে গেলে বাঙালি থাকা যায় না- এই অযৌক্তিক চিন্তা অত্যন্ত সাম্প্রতিক কালে বিগত শখানেক বছর ধরে বাংলার মাটিতে সুকৌশলে ধীরে ধীরে ছড়ানো হয়েছে। এই আমদানি উত্তর ভারতের। মুসলমান হতে গেলে সত্যিই বাঙালি থাকা যায় না যদি ওই ‘মুসলমান’-এর অর্থ হয় উত্তর ভারতের মুসলমান। একই সঙ্গে উত্তর ভারতীয় ও বাঙালি- উভয়ই তো হওয়া সম্ভব নয় অর্থাৎ বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্বের বিরোধের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। সবটুকুই কল্পনাপ্রসূত সমস্যা। ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের আচরিত ধর্মানুষ্ঠান ও ধর্মচিন্তা আরবদের কাছ থেকে আসেনি। প্রধানত তা ইরানের দান এবং এরও দেহে বার বার কলি ফিরিয়েছে এ দেশের আদি হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও জীবনাচার- এ সত্য অস্বীকারে মিথ্যা প্রশ্রয় দেয়া হয়। গুরুবাদ-পীরভক্তি, মিলাদ-মাহফিল, কথকতা ইত্যাদির সম্পর্ক সূত্র সবাইকে ভেবে দেখতে বলি। সমাধি কেন্দ্র করে ধর্মানুষ্ঠান কোন সংস্কৃতির দান? ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের সংস্কৃতিতে রামায়ণের এতো প্রবল প্রভাব কেন? ভারতবর্ষের চেয়ে হিন্দু নেপাল অন্য ধরনের হিন্দু কেন? ইত্যাকার সাংস্কৃতিক প্রশ্নাবলি বিবেচনা করা দরকার। বাঙালি মুসলমানদের বিয়ে পদ্ধতির সঙ্গে বাঙালি হিন্দু বিয়ে অনুষ্ঠানের সাযুজ্য এবং ভারতবর্ষের অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিয়ে আচারের সঙ্গে এর পার্থক্যও অনুধাবনযোগ্য বিষয়।
বাংলাদেশের অধিবাসী হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ও সামাজিক জীবন চর্চায় সাযুজ্যধর্মী সাধারণ উপাদানগুলোর একত্র রূপই বাঙালির সংস্কৃতি।

চার.
বাঙালি সংস্কৃতির বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ বাঙালির দেশ-সমাজ-ভাষা ইত্যাদির মতো বিশালায়তন প্রসঙ্গগুলোর সমকক্ষ একটি বিষয় বলে আমার ধারণা। এর কারণ শুধু এই নয় যে, কোনো জনগোষ্ঠীর মেধা ও যুগ-যুগান্তের মননশক্তি সংহত হয়ে যার মধ্যে প্রকাশিত হয়, বাণী নির্ভর ওই শিল্পকলার সর্বশ্রেষ্ঠ এক প্রতিভূ বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামে আবির্ভূত হয়েছেন। বঙ্গ সংস্কৃতির আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য প্রসঙ্গ হওয়ার অন্যতম বা প্রধানতম কারণ এই যে, সাম্প্রতিক কালের ‘বাঙালি’র তিনি নির্মাতা। বাঙালি সংস্কৃতির চেহারা তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং তার ভেতরে এসে বাঙালি সংস্কৃতি এক নির্দিষ্ট ও বিশিষ্ট মোড় নিয়েছে। বাঙালির সামাজিক আচরণে সুরুচির দীক্ষা রবীন্দ্রনাথের দান। বঙ্গ রমণীর পোশাক-পরিচ্ছদের বিন্যাস তার এক ভ্রাতৃবধূ বাঙালিকে শিখিয়েছেন। সভা-সমিতি, অনুষ্ঠান পরিচালন পদ্ধতি, জন্ম উৎসব বা শোকসভা প্রভৃতি সামাজিক যৌথ কর্মের উপযোগিতা ও ব্যবহার আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই শিখেছি। ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে নান্দনিকতার সাধনা তিনি সারা জীবন যেভাবে করেছেন, পুরো বাঙালি জাতির সামনে আজ তা উদাহরণ- বাঙালির জীবনধারা ও সমাজ আচরণ, বৌদ্ধ, বহিরাগত মুসলমান ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। আমরা গ্রহণ, বর্জন ও সংশ্লেষণ করতে করতে এগিয়েছি- যেমন ইতিহাসের নিয়মে সব জনগোষ্ঠী পথ চলে। আমাদের সুদূর প্রাগার্য স্মৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলা ভাষার শব্দাবলিতে এবং আমাদের জীবন আচরণের বহু কিছুতে। পরে সর্বাধিক দীর্ঘ সময় বাঙালি যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিম-লে বাস করেছিল তা বৌদ্ধ। উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দু ধর্ম আচার বঙ্গ সমাজে কখনোই তেমন দৃঢ়মূল ও গভীর প্রসারী হতে পারেনি। এরও পরে এসেছে ভারতের বাইরে থেকে এবং উত্তর ভারত থেকে মুসলমানের দল।

ব্যাপক ধর্মান্তরীকরণ হয়েছে। কিন্তু ধর্মান্তরিতদের দৈনন্দিন ও সামাজিক ব্যবহার পূর্বাপর একই থেকে গেছে। তারপর এসেছে খ্রিস্টান ও ব্রাহ্ম ধর্ম এবং জীবন আচার। এ সবকিছুর মিলনে বাঙালিত্ব নিজের মতো করে ক্রমেই গড়ে উঠেছে। মনুষ্যদেহের যেমন স্বধর্ম আছে, ওই ধর্ম অনুযায়ী দেহবহির্ভূত কোনো কিছুকে গ্রহণীয় মনে করলে তা গ্রহণ করে এবং আত্তীকরণ করে নেয় আর বর্জনীয় যা তাকে কোনোক্রমেই গ্রহণ করে না- সংস্কৃতিও চলে এ জাতীয় স্বধর্মের আনুগত্য স্বীকার করে। বাঙালির কোনো ক্ষতি ইসলাম করেনি। তখনই গোলমাল বেধেছে যখন বাঙালি মুসলমান ‘অন্যদের মতো’ মুসলমান হতে চেয়েছে। আমরা কখনোই ভেবে দেখি না, কোনো বাঙালি হিন্দুর সঙ্গে উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দুর তফাত কতখানি কিংবা বাঙালি বৌদ্ধের সঙ্গে মিয়ানমার, কি চায়না-জাপান বা মঙ্গোলিয়ার বৌদ্ধের পার্থক্য। বাঙালি মুসলিম ও ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানের প্রতিতুলনা অথবা ইরান ও আরবের মুসলমানের পার্থক্য কি আমরা একবারও চিন্তা করে দেখি? কখনো কি ভেবেছি আফ্রিকার মুসলিম ও খ্রিস্টান জনগণ ইউরোপ এবং এশিয়ার মুসলমান বা খ্রিস্টানদের থেকে কোথায় কতোখানি আলাদা ও এর কারণ কী? আমরা ক’জন জানি, বাঙালি হিন্দু রমণীরা শুভকর্মে যেভাবে উলুধ্বনি দেন, অমন উলুধ্বনি ছাড়া লিবিয়ার মুসলমানদের কোনো সামাজিক শুভ অনুষ্ঠান সম্পন্নই হয় না? সবাই কট্টর মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আরব জগতের রাষ্ট্রগুলো সর্বদাই এ-ওর বিরুদ্ধে ছুরি শানাচ্ছে কেন? এসবের পশ্চাৎ প্রেক্ষাপটে কারণটি যা-ই থাকুক, সব ঘটনাই মৌলিক একটি সত্য প্রতিষ্ঠা করে দিচ্ছে- ধর্ম কোনো জাতিসত্তার একমাত্র নিয়ামক কখনোই হতে পারে না। বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি যখন থেকে ভাবতে শুরু করেছে যে, একমাত্র ধর্মকে নিয়ে তারা বাঁচবে বা বাঁচা উচিত তখন থেকেই তার বুদ্ধিভ্রংশতার শুরু। ধর্ম যে কোনো সংস্কৃতিরই প্রান্তিক উপাদান মাত্র, একমাত্র বা সর্বশ্রেষ্ঠ উপাদান কখনোই নয়- এই সরল সত্য তার স্মরণই হয় না। অংশ যখন সমগ্র অপেক্ষা অধিক আয়তন ও ভার দাবি করে তখন সমগ্রের ভারসাম্যহীনতায় যে বিপত্তি এবং অনাসৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, বাঙালি মুসলিম দীর্ঘকাল এর মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। এসব কারণেই শুধু ধর্ম নয়, সংস্কৃতি যে কৃষিভিত্তিক তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঋতু উৎসবের প্রবর্তনায় আমাদের সামাজিক উৎসবাদির ভেতরে সেগুলো গ্রথিত করতে পেরেছিলেন। এভাবে অজস্র সামাজিক কর্মসাধনায় তিনি স্বজাতির মনন ও কল্পনা উদ্দীপিত করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে ব্রাহ্ম ছিলেন তা আমরা মনে রাখি না। ব্রাহ্মেরা নিরাকারবাদী। এ দেশে ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীরা রবীন্দ্রনাথকে নস্যাৎ করতে গিয়ে ওই তথ্য ভুলে যান। এমনিতে রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মত্ব মনে রাখা জরুরি নয়। কিন্তু যারা ধর্মকেই ‘একমাত্র সংস্কৃতি চিহ্ন’ হিসেবে মনে করেন তারা ভুলে যান কী করে?

অনন্য রনবী

 

ছাত্র জীবনে শুধু সমুদ্র নিয়েই বহু কাজ করেছেন জলরঙে। সমুদ্রও আলাদা রঙে ধরা দিয়েছে তাঁর অঙ্কনে। কাজ করেছেন কক্সবাজার থেকে টেকনাফের সমুদ্রপাড়ে। পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের চরে ডাইয়ের কাজ করেছেন অসংখ্য। এঁকেছেন ধূসর পদ্মা, পানি আর চিক চিক করা চর, কালো কালো নৌকার পাল। জলরঙ ছাড়াও অন্যসব মাধ্যমেও সমান বিচরণ তাঁর। প্রকৃতি ও মানুষের পাশাপাশি এঁকেছেন উড়ালডানার পাখি, নিশ্চুপ পাখি, মোরগ, মহিষ, ষাঁড়, বাউল, বানরওয়ালা কতো কী!
আর্ট কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালেই তাঁর আঁকা ছবি স্থান করে নেয় ঢাকার বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। দেশে-বিদেশে ওই পঞ্চাশের দশক থেকে এখন পর্যন্ত বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে নিজেকে চিনিয়েছেন এক ভিন্ন দর্পণে। বহুবিধ শিল্পবোধ শুধু রঙ-তুলিতে সীমাবদ্ধ করেননি। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তার কর্মে ছিল তীক্ষè ও বুদ্ধিদীপ্ত যা দশকের পর দশক মানুষকে ভাবিয়েছে, জুগিয়েছে চিন্তার খোরাক। পথশিশুর মুখে তুলে দিয়েছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাষা যা তৎকালীন আর্থসমাজ ব্যবস্থায় নাড়া দিয়েছিল প্রবল। মাসিক ‘সহজ’-এর পক্ষ থেকে এক শুক্রবার গিয়েছিলাম ওই গুণী শিল্পীর নিজ বাসভবনে। কথা প্রসঙ্গে শিল্পীজীবনের আদ্যপান্ত জানালেন চিত্রশিল্পী ও টোকাই চরিত্রের জনক প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী বা রনবী।

প্রথমেই শিল্পীজীবনের অর্জনের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি হেসে বললেন, ‘এই যে আমার কাছে ছুটে এসেছ এটিই তো বড় অর্জন। তারপরও বলি, একুশে পদক (১৯৯৩), চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৯), শিশুদের বই ডিজাইনের জন্য অগ্রণী ব্যাংক অ্যাওয়ার্ড (১৯৯২ ও ১৯৯৫), ১৯৬৮ সাল থেকে ১৩ বার ন্যাশনাল বুক সেন্টার পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছি। বার্জার থেকে আমাকে দেয়া হয়েছে আজীবন শিল্পীখ্যাতি।’

মানুষের জীবনে প্রেম অলৌকিক ছোঁয়া। এই স্পর্শের বাইরে কেউ নয়। শিল্পী ও কবির প্রতিটি দিন-ক্ষণ প্রেমে রঙিন কিংবা বেদনায় মলিন। এই বেদনার মালিন্য কিংবা রঙ কতোটা রঙিন তা অন্তরালেই রয়ে গেল তাঁর কথায়, ‘আমাদের সময়ে মেয়েরা কঠিনভাবে গৃহে অন্তরীণই থাকতো। তারপরও যে কেউ প্রেম করিনি তা নয়। প্রেম তো চিরন্তন। তবে আমার ওই সময়ের জীবনপ্রবাহ এতো ব্যস্ততা, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গেছে যে, সেভাবে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি। তবে শিল্পী, লেখক, সৃজনশীল সব মানুষের জীবনে রোমান্টিক কিছু বিষয় অর্র্থাৎ ভালো লাগা, না বলা কথা এসব তো থাকেই। ওইসব গোপন জিনিস আড়ালেই থাক।’

লেখালেখির সঙ্গে রনবীর নিবিড় সম্পর্কের কথা আমাদের অনেকেরই জানা। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন লিখেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘লেখালেখি আমার স্কুল জীবনের সঙ্গি।
ছোটবেলায় পত্রিকায় ছোটদের পাতায় লেখা ছাপা হতো। তা দেখে খুব মজা পেতাম। আমার এই লেখালেখি তো আর লেখক বা সাহিত্যিক হওয়ার জন্য নয়, হঠাৎ মনে হয় আর লিখে ফেলি। আবার ছবি আঁকার মুড না থাকলে লিখি। পাবলিশাররা বলে, একটা বই দেন; পত্রিকা বলে, লেখা দেন; কখনো বলে ছড়া দেন, উপন্যাস দেন, রম্য রচনা দেন, ছোটদের গল্প দেন। মন ভালো থাকলে স্টুডিওর মধ্যেই বসে যাই মনে যা আসে তা-ই লিখি। আমার টুকটাক লেখালেখির শুরু ওই স্কুল জীবনেই। আমার প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৭-৫৮ সালের মাঝামাঝি ইত্তেফাকের ‘কচিকাঁচার আসর’-এ। নিয়মিত পত্রিকায় কলাম লিখতাম। এখনো মাঝে মধ্যে লিখি। শিশুদের জন্য লেখা আমার প্রথম বইটি প্রকাশ হয় ১৯৯১ সালে। বছর দুয়েক সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় টিভি রিভিউ লিখতাম।’ গান সম্পর্কেও বলতে গিয়ে বললেন, ‘গান শুনি। গান আমার প্রাণ, আমার উত্তেজনা। আগে আমাদের বাড়িতে গান-বাজনা কেউ করেনি, কেউ সঙ্গীতজ্ঞ নয়। কিন্তু গান ভালোবাসে সবাই। এখন অবশ্য আমার ছোট ছেলে রাতুল ভালোই গান করে। মা-বাবা থেকে শুরু করে মামা-মামি,

আমার ছোট ভাইবোন সবাই গান পছন্দ করে। বাড়িতে তখনকার সময়ে কলের গান ছিল। আমাদের গান শোনার চর্চা ছিল’। চিত্রকলা, কবিতা ও সঙ্গীত এ তিনটি বিষয় আপনি কীভাবে দেখেন প্রশ্নের উত্তরে রনবী সরাসরি বললেন, ‘চিত্রকলা, কবিতা আর গান তিন ভাইবোন। এগুলো যখন এক সঙ্গে থাকে তখন নানান খুনসুটিতে সংসার মেতে ওঠে। একটি ছাড়া আরেকটি সম্পূরক হয় না। কে কী রকম, কোন মাধ্যমটিতে কাজ করবে সেটিই হলো আসল কথা। যিনি লিখছেন তার যে রস, যিনি আঁকেন তারও একই রস। ভাব প্রকাশের মাধ্যমগত দিকটি শুধু ভিন্ন। এভাবে যদি বলি তো ঘটনা একই। যিনি কবিতা লেখেন তার যে রস, অনুভূতিগত চেতনা আবার লেখার ঢঙ, লেখার ধরন, লেখার টেকনিক এসবই যেমন তাদের আছে তেমনি আমাদেরও আছে। তারাও যেমন বলেন গানটা বেশ ভালো হয়েছে তেমনি আমরাও আমাদের ছবির কম্পোজিশন ভালো বলি। সব দিক থেকে ঘটনা একই। সমাজে কবি, শিল্পী, গায়ক খুবই গুরুত্ব বহন করে।’
ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে ওঠা ছবিগুলো বোধগম্য হয়ে ওঠে দর্শকের কাছে আর বিমূর্ত ছবিগুলোয় চেয়ে থাকে শত প্রশ্নের চোখ। এক্ষেত্রে ছবিটি বোধগম্য করার জন্য আপনি কী ধরনের কাজ করেন প্রশ্নের উত্তরে রনবী বলেন, ‘আমার কাজে পারস্পেক্টিভ রাখি না। ছবি আঁকতে গেলে বিষয়ের সঙ্গে প্রকৃতি আলাদা করে ফেলি। যেটা করি তা হলো কোথাও পারস্পেক্টিভ অর্ধেক রাখবো, কোথাও রাখবো না; কোথাও বার্ডস ভিউ থেকে, কোথাও বা নিচে বসে দেখছি এই রকম ভাব আনি। তারপর যেটা করি তা হলো ভিউয়ার্সটি মনোযোগী করানো। পরিচিত দৃশ্য হলে সেগুলো আমার মতো করে সাজাই। আমার পছন্দসই দিকগুলো রাখি। আবার আলো কোথায় ফেলবো, আলোর আদৌ দরকার আছে কি না এগুলো নিয়ে ভাবি। এসব বিষয় কখনো হয়তো খুব সফল হয়, কখনো হয়ও না’।

দীর্ঘদিন সাপ্তাহিক বিচিত্রার ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন। ফ্যাশন সচেতন না হলে তা কী করে সম্ভব এ প্রশ্নের জবাবে, ‘হ্যাঁ ছিলাম। অনেক কাজ করেছি। ওই কাজে যে শিল্পবোধের প্রয়োজন তা হয়তো আমার ভেতরেই ছিল। তাছাড়া যুবক বয়সে আমিও কম ফ্যাশন সচেতন ছিলাম না। বিচিত্রার এ কাজের জন্য এ দেশের ফ্যাশনে এক প্রকার জোয়ার এসেছে বলা যায়। বিচিত্রার দেখাদেখি অনেক পত্রিকাও এগিয়ে এসেছে।’

আপনি কীভাবে পেয়েছিলেন টোকাইকে ‘টোকাই আমার ভাবশিশু। সে পথশিশু, অনাথ হলেও কিছুর তোয়াক্কা করে না, বেয়াদবি করে না, মজার মজার কথা বলে। এই যে টোকাই, সে শুধু সামাজিক কথাই বলে। এতে সরাসরি রাজনীতি না থাকলেও সামাজিক বাস্তবতার একটা রাজনীতির দিক থাকে। আট-নয় বছরের একটা ছেলে। পরনে চেক লুঙ্গি মোটা পেটটায় কষে বাঁধা। মাথায় ছোট করে ছাঁটা খাড়া চুল। সময় নেই, অসময় নেই চিৎকার করে গান গায়। রাস্তায় পথচারীকে কখনো অহেতুক কিছু প্রশ্ন করা আর ঘড়ি হাতে লোক দেখলেই সময় জানতে চাওয়াটা ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। রাস্তার ছিন্নমূল অন্য কয়েক শিশুর মতোই ছেলেটি টোকাই। ওই দেখা থেকেই জন্ম নিল টোকাই।’

আপনি তো শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানদের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। তাদের কতোটা কাছ থেকে দেখেছেন ‘শুধু জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান নন, শফিউদ্দীন আহমেদ, মোস্তফা মনোয়ার, রশিদ চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাকসহ
বাংলাদেশের আরো যারা খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী আছেন তাদের সরাসরি ছাত্র আমি। আমার সৌভাগ্য যে, তাদের প্রত্যেকের নৈকট্য আর সাহচর্যে আসতে পেয়েছি। আর্ট কলেজে ভর্তির আগে ভাবতাম, ওখানে গেলে মনে হয় শুধু ছবি আঁকা হবে। পরে দেখি অত্যন্ত কঠিন একটা লেখাপড়ার সেশন রয়েছে। সেটি ছিল ভিন্ন এক জগৎ। শিক্ষকরা আমাদের তো শেখাতেন, একই সঙ্গে নিজেদের কাজ নিয়েও ব্যস্ত থাকতেন। তারা একেকজন একেক স্টাইলে কাজ করতেন, একেকজন একেকভাবে পড়াতেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এক রকম, কামরুল হাসান আরেক রকম। আমরা প্রত্যেকের স্টাইল অনুসরণের চেষ্টা করতাম। এভাবে সবার কাজ দেখতে দেখতে কিংবা শুনতে শুনতে নিজের একটা স্টাইল তৈরি হতো।


শিল্পীদের আঁকা ছবি এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে বলে মনে করি না। শিল্পের সঙ্গে সমাজের এই দূরত্ব কীভাবে কমানো যায় ‘শিল্প সমাজে একটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা ছবি কেনে বা সংগ্রহ করে ইন্টেরিয়র সাজায়। অনেকে শখ করে বিশ্বের বিখ্যাত সব শিল্পীর ছবি সংগ্রহ করে। কিন্তু শিল্পরস কতোজন আহরণ করে এ বিষয়ে সন্দেহ আছে। আসলে শিল্প অনুধাবনে সমাজটিকে আরো শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে আমাদের।
দেশের তরুণ সমাজের প্রতি আপনার ভাবনা কেমন ‘অবাক আর মন খারাপ লাগে এটা ভেবে যে, কী এমন ঘটে, কী এমন তাদের চোখের সামনে দেখানো হয়, কেমন করে কী তাদের মাথায় ঢোকানো হয় এতো ভালো ভালো পরিবারের, লেখাপড়া জানা ছেলেরা আত্মঘাতী কাজে জড়িয়ে পড়ছে! তারা তো ধ্বংস হচ্ছেই, একই সঙ্গে নিরস্ত্র-বিপন্ন মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে দিচ্ছে। এভাবে নিজের জীবন শেষ করে দেয়ার তাদের কোনো অধিকার নেই। তাই তরুণ প্রজন্মকে বলছি তোমরা দেশটিকে ভালোবাসো, দেশের মানুষকে ভালোবাসো। তোমাদের শিক্ষা-দীক্ষা দেশের মানুষের স্বার্থে ব্যবহার করো। জীবন তো একটা... নাকি?’
প্রিয় চিত্রকর্ম কোনটি প্রশ্নের উত্তরে রনবী বললেন, আমার প্রিয় চিত্রকর্ম বলতে গেলে অগণিত। কতো শতো ছবি আর শিল্পী এসে ভিড় করে মনের মধ্যে! এর মধ্যে অন্যতম প্রিয় ছবির কথা বলতে পারি। সেটি পাবলো পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’। তিনি ছবিটি আঁকেন ১৯৩৭ সালে। এর পটভূমি স্পেনের গুয়ের্নিকা শহরের গৃহযুদ্ধ। আমার প্রিয় চিত্রকর্ম পিকাসোর গুয়ের্নিকা-র ক্যানভাসে তেলরঙ। ছবিটি আছে মুসেও রেনে সোফিয়া, মাদ্রিদ, স্পেনে। চিত্রটিতে রঙ আছে তিনটি সাদা, কালো ও ধূসর। এই তিন রঙ ব্যবহার করার কারণ হলো ছবিতে বিবর্ণতা-বিষাদ ফুটিয়ে তোলা। তেলরঙের ওই ছবিতে দেখা যায়, একটি ঘর যার বাঁ পাশে উন্মুক্ত অংশে একটি ষাঁড়, তার সামনে মৃত শিশু নিয়ে কান্নারত মা, মাঝখানে প্রচ- উন্মত্ত একটি ঘোড়া আঘাতপ্রাপ্ত। ঘোড়ার শরীরের নিচে এক সৈনিক। অশুভ চোখের আকৃতির একটি বাল্ব জ্বলছে ঘোড়ার মাথার ওপর। এছাড়া যুদ্ধের বীভৎসতা ও ধ্বংসলীলা মনে গেঁথে গেছে। মাইকেলেঞ্জেলো আর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ছবি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সুযোগ হয়েছে
‘মোনালিসা’ দেখার। দেখেছি রেমব্রান্ট, রেনোয়া, ভ্যান গগ, গগার ছবি। মাইকেলেঞ্জেলোর ‘মোজেস’ ভাস্কর্যটি অন্য রকম এক শিল্পকর্ম মনে হয়েছে। ভাস্কর্যটির একটি রেপ্লিকা রোম থেকে সংগ্রহ করেছি।

নিজের পরিবার সম্পর্কে রনবীর বললেন, ‘আমি ১১ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। আমাদের বিয়েটা হয় পারিবারিক পছন্দে। আমার স্ত্রী নাজমা বেগম। আমাদের দুই ছেলে আর এক মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর এখন পুরোদস্তুর পারিবারিক মানুষ। আমার বড় ছেলে রাহিলুন নবী। সে এখন লন্ডনে। মেয়ে নাজিয়া তাসমেনিয়া। ছোট ছেলে রকিবুন নবী। সে এখন নেমেসিস ব্যান্ডের ভোকালিস্ট। গায়ক রাতুল নামে পরিচিত। আমি অতীতের কিছু ভুলি না। ওই শৈশবের দিনগুলো থেকে আজকের দিনটির সকাল পর্যন্ত সবই মনে আছে। ওই স্মৃতি সম্ভার চয়ন করেই বৃদ্ধ জীবন পার করছি।’


সাক্ষাৎকার : শাকিল সারোয়ার
অনুলিখন : রাশেদ মামুন
ছবি : শোভন আচার্য্য (অম্বু)

 

মৃত্যুঞ্জয়ী দর্শনের প্রত্যয়ের আলোতে পথচলা

যতীন সরকার

 

‘কোনো বিপ্লবী প্রতিভার মৃত্যু নেই। মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রে অতিক্রান্ত পথের নিশানা। মুক্তিসংগ্রামীর গলায় যে জয়ের মালা দোলে তা কোনোদিন বাসি হতে পারে না। কারণ মুক্তিসংগ্রামী সে মালা দিয়ে যায় তার উত্তরপুরুষের গলায়। অব্যাহত জীবনস্রোতের মোকাবিলায় এখানে মৃত্যুকেই মনে করা যেতে পারে অর্থহীন। অমরতার এই দর্শনকে সামনে রেখে যদি আমরা রবীন্দ্রনাথের স্থায়িত্ব-অস্থায়িত্ব বিচার করতে বসি তাহলে নিরবধিকাল পর্যন্ত যেতে না পারলেও অনেক দূর যেতে পারবো।’ রণেশ দাশগুপ্ত ১৯৬৮ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে রণেশ দাশগুপ্ত একটি প্রবন্ধে এই কথাগুলো লিখেছিলেন। প্রবন্ধটির শীর্ষনাম ‘মার্কসবাদী দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ’। অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে বিধৃত এ লেখাটিতে রণেশ দাশগুপ্ত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে স্থায়িত্ব-অস্থায়িত্ব বিচার করতে গিয়ে দুটো দিক সামনে নিয়ে এসেছিলেন। এ দুটো দিকের একটির আশ্রয় অবশ্যই মার্কসবাদ, অন্যটির অস্তিত্ববাদ। মার্কসীয় দর্শনের অভ্যুদয়ের পর থেকেই এ দর্শনকে বিভিন্ন ধরনের বাদ-প্রতিবাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তৃত্বশীল বুর্জোয়ারা তখন থেকেই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকারের দর্শনের উদ্ভাবন ঘটিয়ে মার্কসবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।  বিগত শতকের ষাটের দশকে বুর্জোয়াদের উদ্ভাবিত যে দর্শনটি সবচেয়ে বেশি কোলাহলের সৃষ্টি করেছিল সেটির নাম অস্তিত্ববাদ। রণেশ দাশগুপ্ত তার ছোট্ট লেখাটিতে অত্যন্ত দৃঢ়সংবদ্ধরূপে অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল মর্ম তুলে ধরেছেন এবং এ দর্শনটির প্রধান দুটো উপধারার পরিচয় উদ্ঘাটন করেছেন। অস্তিত্ববাদও ‘বিদ্রোহী ও স্বাধীনতাপ্রিয় ব্যক্তি’র অভীপ্সাকে ধারণ করে বটে কিন্তু সে অভীপ্সা একান্তভাবেই ‘একক দায়িত্ববোধ’-এর। তবে অস্তিত্ববাদের যে দুটো উপধারা রয়েছে তার প্রথমটি ‘একটি সর্বধ্বংসী মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে ধর্মীয় সংঘজীবনে মাথা গুঁজে থাকা’টাকেই শ্লাঘ্য বিবেচনা করে।

আর দ্বিতীয়টি চায় ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনের গণসমাবেশে শরিক’ হয়ে থাকতে। প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টি অবশ্যই অগ্রসর চিন্তার ধারক। এ অগ্রসর উপধারাটিরই প্রধান ধারক ছিলেন ফরাসি মনীষী জাঁ পল সার্ত্রে। এ রকম অগ্রসর হতে গিয়েই স্বভাবতই সার্ত্রে মার্কসের অনুরাগী ও অনুসারী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অস্তিত্ববাদী বলেই তার পক্ষে মার্কসের প্রতি অনুরাগ বজায় রাখা কিংবা প্রকৃত মার্কস অনুসারী হওয়া বা থাকা সম্ভব ছিল না। সার্ত্রেসহ কোনো অস্তিত্ববাদীই ‘পূর্বসূরি’দের খুব বেশিদিন সঙ্গে নিয়ে চলার পক্ষপাতী নন। রণেশ দাশগুপ্ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘কোনো মহৎ শিল্পীরও মৃত্যুর পর সার্ত্রে তাকে বড়জোর এক পুরুষ পর পর্যন্ত সজীব সাথী বলে মানতে রাজি আছেন।’ কাজেই সার্ত্রীয়সহ সব অস্তিত্ববাদীর দৃষ্টিতেই রবীন্দ্রনাথের মতো মহৎ শিল্পীও ইতোমধ্যেই ‘বাসি ফুলের মালা’য় পরিণত হয়েছেন।  মার্কসবাদীদের বিবেচনায় এ রকম দৃষ্টি একান্তই ভ্রান্ত। সদ্য বিগত মানুষদের তো মার্কসবাদীরা ‘সজীব সাথী’রূপে গ্রহণ করেনই, বহু পূর্বকালে বিগত হয়ে যাওয়া মানুষদের সাথিত্বও তারা পরিহার করেন না, বরং সেই মানুষদের রেখে যাওয়া সম্পদের সদ্ব্যবহার ঘটিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করে তোলেন। মহামতি লেনিনের বিশ্লেষণে বিষয়টি উঠে এসেছে এভাবে- ‘বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের ভাবাদর্শ হিসেবে মার্কসবাদ বিশ্ব ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করেছে এ জন্য যে, তা কখনোই বুর্জোয়া যুগের মূল্যবান সুকৃতিকে বিসর্জন দেয়নি, বরং মানবচিন্তা ও সংস্কৃতির দুই সহস্রাধিক বছরের বিকাশের মধ্যে যা কিছু মূল্যবান ছিল তাকে আত্মস্থ করেছে এবং ঢেলে সাজিয়েছে। এই ‘আত্মস্থ করা’ ও ‘ঢেলে সাজানো’টাই পূর্বসূরিদের ব্যাপারে উত্তরসূরিদের দায়িত্ব।

মহান রুশ লেখক ও চিন্তক তলস্তয়ের প্রসঙ্গ সূত্রে লেনিন মন্তব্য করেছিলেন- ‘কোনো শিল্পী যদি প্রকৃত মহৎ হন তাহলে তার রচনায় বিপ্লবের কোনো না কোনো মর্মগত অংশ প্রতিফলিত না হয়ে পারে না।’ মহৎ শিল্পী রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রযোজ্য। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিচারে রবীন্দ্রনাথের মতো মহৎ শিল্পীই শুধু নন, মহৎ-অমহৎ বা শিল্পী-অশিল্পী নির্বিশেষে কোনো মানুষের সামান্য কৃতিও ‘ধরার ধুলায় হারা’ হয়ে যায় না, কারো মৃত্যুকেই সমাপ্তি বলে ধরে নেয়া যায় না, যুগ থেকে যুগান্তরে সব মানবিক ঐতিহ্যই প্রবহমান থেকে প্রতিনিয়ত নবায়িত হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বাগানের পঙ্্ক্তি উদ্ধৃত করেও এই মার্কসীয় প্রত্যয়টিকে উপস্থাপন করা যায়। যেমন- ‘শেষ নাহি যে শেষ কথাকে বলবে?/আঘাত হয়ে দেখা দিল আগুন হয়ে জ্বলবে।/... পুরাতনের হৃদয় টুটে আপনি নূতন উঠবে ফুটে,/জীবনে ফুল ফোটা হলে মরণে ফল ফলবে।’ স্মরণ করতে পারি কাজী নজরুল ইসলামের কথাও- ‘মৃত্যু জীবনের শেষ নহে নহে/অনন্তকাল ধরি অনন্ত জীবনপ্রবাহ বহে।’

রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী সামনে রেখেই যদিও রণেশ দাশগুপ্তের ‘মার্কসবাদী দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল তবুও মানতেই হবে যে, প্রবন্ধের বক্তব্যটিকে কেবল রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গেই আটকে রাখা চলে না কিংবা কেবল অস্তিত্ববাদী দর্শনের ভ্রান্তি নির্দেশেই এটির সীমা নির্ধারিত হয়ে থাকেনি। প্রবন্ধটির তাৎপর্য অনেক গভীর ও কালাতিক্রমী। রণেশ দাশগুপ্তের ভাবনার আলোর প্রক্ষেপণ ঘটিয়ে বর্তমানকালে উদ্ভাবিত ও প্রচারিত অনেক মতবাদেরও বিচার-বিশ্লেষণ করে নিতে পারি আমরা এবং এমনটিই করা উচিত।  বিগত শতকের ষাটের দশকে অস্তিত্ববাদকে আশ্রয় করে মার্কসবাদকে হেয়প্রতিপন্ন করার অপপ্রয়াস চলেছিল যেমন, তেমনই সে শতকেরই পরবর্তী দশকগুলোয় এ রকম অপপ্রয়াসে সংযুক্ত হয়েছিল আরো কিছু অপদর্শন। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর থেকে অনেক অনেক অপদর্শনই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। একমাত্র মার্কসীয় দর্শনের আলোতেই সেসব অপদর্শনের স্বরূপ দর্শন ও সেসবের অপপ্রভাব থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব।  সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ে সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট বুর্জোয়া তাত্ত্বিকদের খুশি অসম্ভবেরও সীমা ছাড়িয়ে উঠেছিল। এ রকম এক তাত্ত্বিক তো ‘


ইতিহাসেরই সমাপ্তি’ ঘোষণা করে বসেছিলেন অর্থাৎ ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা নামক এই তত্ত্ববিদের মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই চিরকাল অচল-অনড় হয়ে থাকবে, এ ব্যবস্থাতেই ইতিহাসের প্রবহমানতা নিস্তব্ধ হয়ে যাবে। ফুকোয়ামার তত্ত্বকে সত্য বলে মেনে নিলে একালের পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের মোড়লটিকেই বিশ্বেশ্বর সর্বশক্তিমান প্রভুরূপে মেনে নিতে হবে এবং এ প্রভুত্বের অবসান কখনো কেউই ঘটাতে পারবে না- সে কথাও না মেনে উপায় থাকবে না।  আরেক তাত্ত্বিক স্যামুয়েল হান্টিংটন মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্বকে ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিতে চাইলেন এবং ‘সভ্যতার সংঘাত’ নাম দিয়ে সৃষ্টি করলেন এক অপতত্ত্ব, প্রকৃত প্রস্তাবে যাতে অসভ্যতারই আগমনী গান গাওয়া হয়েছে। ফুকোয়ামা-উদ্ভাবিত অপতত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগকে সুনিশ্চিত করার জন্যই যেন হান্টিংটন সাহেব কোমর বেঁধে লেগেছেন। তার মতে, সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা দুনিয়াই হলো খাঁটি সভ্যতার একমাত্র ধারক। এর বাইরের চৈনিক, জাপানিজ, ইসলাম, হিন্দু, সøাভিক ও লাতিন আমেরিকান- এ রকম সব সভ্যতা একেবারেই মেকি অথবা নিম্নমানের, সভ্যতা নামের যোগ্যই নয় এগুলো। সংঘাতের মধ্য দিয়ে এগুলোর পরাভব ঘটিয়ে একমাত্র পশ্চিমা সভ্যতাই যখন একমাত্র নিরঙ্কুশ সভ্যতারূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে, তখনই ঘটবে সভ্যতার সংঘাতের অবসান। বুঝতে একটুও অসুবিধা হয় না যে, শ্রেণিসংগ্রামই ইতিহাসের চালিকাশক্তি- এই মার্কসীয় প্রত্যয়ের বিরুদ্ধে সভ্যতার সংঘাতের কল্পতত্ত্বটিকে দাঁড় করানো হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন এককালের অনেক মার্কসবাদিত্ব বিভ্রান্তির গাড্ডায় পড়ে ‘প্রাক্তন মার্কসবাদী’তে পরিণত হয়েছেন অথবা সংশয়ের দোলায় দুলছেন। এ সময়কার ভাবজগতের পরিচয় দিতে গিয়ে আমাদের দেশেরই একজন বিশিষ্ট চিন্তক অথচ স্বল্পপরিচিত- গোলাম ফারুক খান একটি প্রবন্ধে লিখেছেন :

“সাম্প্রতিক দশকগুলোয় চিন্তার জগতে প্রতিষ্ঠিত পুরনো প্রত্যয়গুলোর জায়গায় অনেক নতুন ধ্যান-ধারণা এসে জুড়ে বসেছে- ইতিহাস-আলোচনায় তাই রাজনীতির চেয়ে ডিসকোর্স, অর্থনীতির চেয়ে আত্মপরিচয়, বস্তুগত বিষয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক বিষয় এবং শ্রেণির চেয়ে সম্প্রদায় বড় হয়ে উঠেছে।... পোস্টমডার্নিজম ও পোস্ট কলোনিয়ালিজম নামের বৃহত্তর চিন্তা কাঠামোর মধ্যে ডালপালার মতোই গজিয়ে ওঠা সাব-অলটার্নবাদ, নয়া-ঐতিহ্যবাদ, কমিউনিটারিয়ানবাদ, জাক লাকাঁপন্থী উত্তরাধুনিক ফ্রয়েডবাদ ইত্যাদি নানান ঘরানার নতুন মনন-প্রবণতাগুলো সম্পর্কে একেবারে অসহিষ্ণু না হয়েও এ কথা হয়তো বলা যায় যে, বাইরের তফাত যা-ই হোক কিছু মৌলিক জায়গায় তাদের অবস্থান খুব কাছাকাছি। আজকের ‘পোস্টমার্কখচিত’ বুদ্ধিবৃত্তিক আবহে মানবমুক্তির দর্শনমাত্রই এক ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ যা কোনো না কোনো পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যে চালিত এবং বিশেষকে ভুলে সামান্যে নিবদ্ধ। ইতিহাসের যাত্রা ইতোমধ্যে ‘সমাপ্ত’। প্রগতির ধারণা এখন ইউরোপকেন্দ্রিকতার জন্য নিন্দিত।...
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং বিজ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতাও এখন নানানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ- বলা হচ্ছে, বিজ্ঞান ‘আগ্রাসী’ ও ‘পিতৃতান্ত্রিক’ এবং যাকে আমরা বৈজ্ঞানিক সত্য বলে জানি কোনো বিজ্ঞান-ব্যতিরেকী উপায়ে লব্ধ সত্যের চেয়ে বাড়তি মর্যাদা পেতে পারে না।”
এমন সব অপভাবনার কবলে পড়ে বামপন্থীদেরও অনেক গোষ্ঠী মার্কসবাদী বুলি আউড়িয়েই মার্কসীয় দর্শনের অনেক প্রকার বিকৃত ভাষ্য প্রচার করছে এবং নানান বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কমিউনিস্টবিরোধী ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। তাদের সম্পর্কে একালের প্রখ্যাত মার্কসবাদী চিন্তাবিদ এজাজ আহমদের নির্দ্বিধ অভিমত হলো :


‘দক্ষিণপন্থীদের দুনিয়াজোড়া আক্রমণ, বামপন্থীদের পশ্চাদপদসরণ, এমনকি আমাদের জাতীয়তাবাদের মধ্যে প্রগতিশীল যা কিছু ছিল সেটুকুরও পশ্চাৎগতি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সামগ্রীর উৎপাদন এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্লেষণের মূলগত পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে দিয়েছে। এই পুনর্বিন্যস্ত বিশ্বপরিসরে আমরা সব বুর্জোয়া দেশেই সম্পূর্ণ নতুন বুদ্ধিজীবীর প্রাধান্য দেখছি। তারা জায়গা করে নিয়েছে বামপন্থি বলে দাবিদার একটি শিবিরে। এই নতুন বুদ্ধিজীবীদের স্বভাবসুলভ ঠাট-ঠমকগুলো এ রকম- তারা অনবরত বিপুল উৎসাহে তৃতীয় বিশ্ব, কিউবা, জাতীয় মুক্তি ইত্যাদি বুলি আউড়ে বামপন্থি মহলে বৈধতা পেতে চায় আবার তারা খোলাখুলি ও উদ্ধতভাবে কমিউনিস্টবিরোধী। অনেক সময় তারা এমনকি ধ্রুপদী মার্কসবাদের উৎসজাত অন্য ঐতিহ্য অর্থাৎ সোশ্যাল ডেমক্রেসির সঙ্গেই নিজেদের জড়াতে চায় না, কোনো ধরনের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও সামান্য পরিমাণে জড়াতে চায় না। কিন্তু নিজেদের জাহির করে বুর্জোয়াবিরোধী বলে। জাহির করে অ্যান্টিইমপিরিসিজম, অ্যান্টিহিস্টরিজম স্ট্রাকচারালিজম হিসেবে প্রচারিত নীৎশীয় ধারার স্পষ্টত প্রতিক্রিয়াশীল নানান ধরনের মানবতন্ত্রবিরোধিতার নামে, বিশেষ করে লেভি স্ত্রাউস, ফুকো, দেরিদা, গ্লাকসম্যান, ক্রিস্তেডা প্রমুখের নামে।’

এজাজ আহমদের মতো যারা মার্কসীয় দর্শনের ঘনিষ্ঠ অনুসারী তাদের অনেকেই আজ এখানে-ওখানে গজিয়ে ওঠা মেকি মার্কসবাদীদের স্বরূপ উন্মোচনের এবং এর বিপরীতে মার্কসীয় দর্শনের প্রকৃত তাৎপর্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের অনেক বেশি শ্রমশীল হতে হচ্ছে, প্র্যাগমাটিজম থেকে পোস্টমডার্নিজম ও নিও-লিবার‌্যালিজমসহ একালীন বুর্জোয়াদের উদ্ভাবিত ও প্রচারিত সব ‘ইজম’ বা ‘বাদ’-এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এসবের ভ্রান্তি নির্দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হচ্ছে। আবার প্রকাশ্য বিরোধিতাকারী যারা, তেমন শত্রুদের মোকাবিলার পাশাপাশি গায়ের পাশ ঘেঁষে থাকা ভ- মিত্রদের ভ-ামি সম্পর্কেও সচেতন ও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সচেতন সতর্কতায় মার্কসবাদকেও প্রতিনিয়ত ধারালো ও শানিত করে তুলতে হচ্ছে। কারণ সব স্থিতধী মার্কসবাদীই জানেন- মার্কসবাদ কোনো অচল-অনড় ‘ডগমা’ নয়, বিভিন্ন দেশে ও কালে এর প্রয়োগ পদ্ধতিতে যে বৈচিত্র্য দেখা দেয়, সেই বৈচিত্র্যই এর তত্ত্বকেও সমৃদ্ধ ও বহুমুখী করে তোলে। তত্ত্বের সমৃদ্ধি সাধনে সতত নিয়োজিত আছেন যেসব ধীমান সাধক তাদের ভাবনাকে পাথেয় করেই আমাদের পথ চলতে হবে, চলতে চলতেই আরো পাথেয় সংগ্রহ করে নিতে এবং অতীতের ভ্রান্তির অপনোদন ঘটাতে ও ভবিষ্যতের নিশানা খুঁজতে হবে।

মনে রাখতে হবে, মার্কসবাদের যে দর্শন ডায়ালেকটিক বস্তুবাদ সেটি কোনো ‘রেডিমেড’ তত্ত্ব বা দর্শন নয়। যে দর্শনের নামের সঙ্গে যুক্ত আছে  ‘ডায়ালেকটিক’ কথাটি সে দর্শনটি নিজেও নিশ্চয়ই ডায়ালেকটিকের নিয়মের অধীন। প্রতিটি তত্ত্বেরই যেমন চিরায়ত উপাদানের পাশাপাশি থাকে তার একান্ত সাময়িক ও আপেক্ষিক উপাদান তেমনটিই আছে মার্কসবাদ তথা ডায়ালেকটিক বস্তুবাদের ক্ষেত্রেও। ডায়ালেকটিক বস্তুবাদী দর্শন দেখিয়েছে যে, ইতিহাসের বিকাশধারা যতো স্তর অতিক্রম করে চলে, সেই প্রতিটি স্তরেই বিশেষ বিশেষ ধরনের সামাজিক নিয়মের উদ্ভব ঘটে এবং স্তরান্তরে গিয়ে অথবা স্তরান্তরে যাওয়ার পথেই পুরনো নিয়ম বাতিল হয়ে যায় ও নতুন নিয়ম দেখা দেয়। মার্কসবাদের এসব সাময়িক ও আপেক্ষিক উপাদানকে এর মূলতত্ত্বের চিরায়ত উপাদানের সঙ্গে এক করে ফেললেই ঘটে যায় নানান ধরনের ভ্রান্তি ও বিপত্তি। অতীতে এবং বর্তমানেও মার্কসবাদীরা বারবার এসব ভ্রান্তি ও বিপত্তির খপ্পরে পড়েছে এবং পড়ছে। অথচ মার্কসবাদের উদ্ভব যুগেই ফ্রেডারিক অ্যাঙ্গেলস জানিয়ে রেখেছিলেন-
‘...সমস্ত অনুক্রমিক ঐতিহাসিক ব্যবস্থাই উত্তরণকালীন প্রবহমান স্তর মাত্র। ...প্রতিটি স্তরই প্রয়োজনীয় এবং সেহেতু যে সময়ে ও যে কারণ থেকে তার উৎপত্তি সেই বিবেচনায় তা যুক্তিসঙ্গত... এতে (অর্থাৎ ডায়ালেকটিক দর্শনে) কোনো কিছুই চূড়ান্ত পরম, পবিত্র নয়... ডায়ালেকটিক দর্শন... স্বীকার করে যে, জ্ঞান ও সমাজের নির্দিষ্ট স্তরগুলো তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিসম্মত। কিন্তু কেবল এতোটুকুই মাত্র।

এ দৃষ্টিভঙ্গির (ডায়ালেকটিক দর্শনের) রক্ষণশীলতা একান্তই আপেক্ষিক; এর বিপ্লবী চরিত্রই হলো পরম সত্য- যে একমাত্র পরম সত্যকে ডায়ালেকটিক দর্শন স্বীকার করে।’  (দ্রষ্টব্য : ‘খঁফরিম ঋঁষবিৎনধপয’, চৎ. চঁন. গড়ংপড়ি ১৯৬৪, চধমব-১২)
অ্যাঙ্গেলসের এ বক্তব্যকে চিন্তা-চেতনায় সদা জাগ্রত না রাখলে মার্কসবাদের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন এবং এর যথাযথ প্রয়োগে ভ্রান্তিমুক্ত হওয়া যাবে না, বিপত্তির হাত থেকেও মুক্তি ঘটবে না।  বিশ শতকের শেষ দশকে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় অচিন্তিত-পূর্ব বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর মার্কসবাদীদের জন্য ভ্রান্তিমুক্ত হওয়া ও বিপত্তি সম্পর্কে সচেতন থাকা আগের চেয়েও অনেক বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। সারা দুনিয়ার মার্কসাবদীদেরই আজ নির্মোহ আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। তবে সেই আত্মজিজ্ঞাসা যেন কোনোমতেই আত্মধিক্কারে পর্যবসিত না হয়। বিপ্লবের পথে চলতে গিয়ে মার্কসবাদীরা কেবলই ভুল করেনি কিংবা কেবলই বিপত্তির খপ্পরে পড়ে থাকেনি। নিকট-অতীতের ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায় যে, মার্কসবাদীদের অর্জন অনেক। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে যাওয়ার পরও সেসব অর্জনের সবকিছুই হারিয়ে যায়নি বা যাবে না। মাত্র ৭০ বছর টিকে থেকেই সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব বিভিন্ন দেশে যে সমর্থক প্রভাব রেখে গেছে, তথাকথিত বিশ্বায়নের যুগেও তা বহুলাংশে অম্লান আছে ও থাকবে এবং অতীতের ভ্রান্তি সংশোধন করে বিবিধ বিপত্তিকেও প্রতিহত করবে। ইতোমধ্যেই সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট দখলের সেøাগান এবং শতকরা একজন একচেটিয়া পুঁজিপতির বিরুদ্ধে নিরানব্বই জনের অধিকার প্রতিষ্ঠার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকটই এর আশু বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে।


এসব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। তবে সেসব কথা বলে আমাদের বর্তমান আলোচনাকে প্রলম্বিত করার কোনো প্রয়োজন নেই। লেখাটি শুরু করেছিলাম বিশ শতকের বুর্জোয়াদের ‘অস্তিত্ববাদ’ নামক দর্শন সম্পর্কে মার্কসবাদী মনীষী রণেশ দাশগুপ্তের বক্তব্য দিয়ে। রণেশ দাশগুপ্ত তার ছোট্ট লেখাটিতে মৃত্যু সম্পর্কে অস্তিত্ববাদীদের নৈরাশ্যজনক বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়েই মার্কসীয় দর্শনের মৃত্যুঞ্জয়ী ভাবনাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। মৃত্যুঞ্জয়ী মার্কসীয় দর্শনের কাছে একালীন বুর্জোয়াদের উদ্ভাবিত সব অপদর্শনই হার মানতে বাধ্য। অস্তিত্ববাদী দর্শনের ভ্রান্তি উদ্ঘাটনে রণেশ দাশগুপ্ত যেভাবে মার্কসীয় দর্শনকে ব্যবহার করেছেন, সেভাবেই অন্যসব অপদর্শনের ভ্রান্তি-নির্দেশে আমাদের প্রবৃত্ত হতে হবে। তেমনটি করলে শুধু নানানবিধ অপদর্শনের অপপ্রভাব থেকেই মুক্ত হব না, মৃত্যুঞ্জয়ী মার্কসীয় দর্শনের প্রত্যয়ের আলোতে পথ চলে আমরাও সব মৃত্যুকে জয় করে নেবো। শুধু মৃত্যুকে জয় করা নয়, জয় করে নেবো অতীতকেও। ‘মৃত্যু জীবনের শেষ নহে নহে/অনন্তকাল ধরি অনন্ত জীবনপ্রবাহ বহে’- এ কথা যেমন সত্য, অতীত যে অতীতেই বিলীন হয়ে যায় না সে কথাও তেমনই সত্য। অতীতের পৃষ্ঠপটেই গড়ে ওঠে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ- এটিও অমোঘ বৈজ্ঞানিক প্রত্যয়। কেবল মার্কসবাদীরাই নয়, প্রখ্যাত মার্কিন লেখক উইলিয়াম ফকনারও একই প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, ‘দি পাস্ট ইজ নেভার ডেড, ইন ফ্যাক্ট দেয়ার ইজ নো পাস্ট।’  এমন প্রত্যয়ের সঙ্গে পথ চললে কোনো অপশক্তিই কি আমাদের পথভ্রষ্ট করতে পারবে?

 

জীবনাঙ্ক

মাসুদা ভাট্টি

 

 

অদিতির গল্পটা বেশ সরল ছিল। ওই সরলতাটুকু সবার জানা উচিত।
অদিতি দেখতে চাঁদের মতো। এ কথা জন্মের পর থেকেই শুনে আসছে ও। প্রথম প্রথম ও মনে করতো, ওর মা ওকে আদর করে এ রকমটা বলে। কিন্তু বড় হয়ে যখন সবাই ওকে বলতে লাগলো, ও দেখতে চাঁদেরই মতো তখন ওর আসলে নিজের চেহারাটা নিয়ে ভীষণই লজ্জা হতে লাগলো। কিন্তু চেহারা তো আর লুকিয়ে রাখা যায় না! ও চাইলে বোরখা পরতে পারতো। তবে সেটি কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এটা ওকে কেউ বোঝায়নি। ও নিজে নিজেই বুঝেছে। তাই নিজের চাঁদের মতো চেহারাটাকে নিয়েই ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করেছে। ইচ্ছা আছে বিদেশে পড়তে যাওয়ার। কিন্তু এর ব্যবস্থা করার আগেই চাকরিটা হয়ে গেল এবং সেটিও এক বিশাল একটি বিদেশি সংস্থাতেই। বাবা বললেন, চাকরিটা শুরু করো, দেখবে ওরাই তোমাকে একদিন বাইরে পড়ার সুযোগ করে দেবে। তবে চাকরি শুরুর আগেই ওর ভিন্ন রকম জীবনটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। শুরুটায় ওর ইচ্ছার চেয়েও অনেক বেশি কাজ করেছিল ঘটনার গতি- যে গতি নিয়ে ওর ভেতর সন্দেহ শুরু হয়েছিল প্রথম থেকেই। তারপরও অদিতি শুরু করেছিল। জীবনটা এতো সহজভাবে শুরু হয়ে যাবে, ও ভাবেনি। কিন্তু শুরু তো হয়েই গেল মনে হয়।


ওকে যে-ই দেখবে সে-ই এখন বলবে, তোমার আর কী! দেখতে সুন্দর, যেখানে গিয়ে দাঁড়াবে কেউ না করতে পারবে না। এ রকম কথা ও শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ওর কখনো মনে হয়নি যে, ও খুব সহজেই সবকিছু পেয়েছে। লেখাপড়ার কথাই যদি ধরি, তাহলে অদিতি বরাবর ভালো ছাত্রী। ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যেই থেকেছে ও। এ জন্য ওকে লেখাপড়া করতে হয়নি। দিন-রাত খাটতে হয়েছে। মা নিজে পড়িয়েছেন, বাবা কখনো অদিতির সঙ্গে বই নিয়ে না বসলেও সারাক্ষণ কানের কাছে বলেছেন, ‘ভালো রেজাল্টের বিকল্প নেই। আমাদের তো অতো টাকা-পয়সা নাই মা, তোমাকে লেখাপড়া করেই ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে, বুঝলা?’ বাবার সঙ্গে অদিতির সম্পর্কটা খারাপ নয়। ওর ক্লাসের অন্য মেয়েদের মতো নয়। ও বাবার কাছে চাইলেই অনেক কথা বলতে পারে। আর মা তো মা-ই। জেলা শহরের সবচেয়ে পুরনো স্কুলটায় তিনি পদার্থবিদ্যা পড়ান। জীবনের সবকিছুকেই তিনি ফিজিক্সের সূত্র দিয়ে যাচাই-বাছাই করার চেষ্টা করেন। অদিতির সঙ্গে কখনো বন্ধুত্ব হয়নি ঠিকই কিন্তু অদিতি নিশ্চিত জানে, মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর আগেই মা বুঝতে পারবেন ওর ভেতরে কী হচ্ছে। এটা ওই ছোট্টবেলা থেকেই ও জেনে জেনে বড় হয়েছে। একটা মাত্র মেয়ে হওয়ায় মা ও বাবার সব মনোযোগ ওর দিকে ছিল। কখনো কখনো এতে ওর রাগও হয়েছে। মনে হয়েছে, আরেকটা ভাই-বোন থাকলে হয়তো তাদের ওপর মা-বাবার নজর যেতো এবং ও হয়তো একটু অন্য রকম কিছু একটা করার সুযোগ পেতো। কিন্তু ওই অন্য রকম কিছুটা কী, ও নিশ্চিত করে জানে না। তবে ও নিশ্চিত জেনেছে এবং পরে প্রমাণও পেয়েছে, যে মেয়ের বাবা তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেছে সে মেয়ে একটু অন্য রকমভাবে বড় হয়। তার ভেতর সামান্য হলেও ভিন্ন রকম ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। এটা ওর ধারণা নয়, বিশ্বাস।
কলেজ শেষ করে যখন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এলো তখন মা-বাবা ওকে পই পই করে কিছুই শেখায়নি, বোঝায়নি। আসলে ওকে তো ছোট থেকেই নিজের মতো করে বড় হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন ওরা। নতুন করে কিছুই আর বোঝাতে হয়নি। কেবল একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ডাইনিং টেবিলে রাখা পানির জগ থেকে পানি আনতে গিয়ে ও শুনে ফেলেছিল মা বলছেন, ‘আমার মেয়েটা এতো সুন্দর হলো কেন বলো তো? এই দেশে সুন্দর মেয়েদের একা থাকাটা ভয়ঙ্কর একটা ঝুঁকির ব্যাপার। ও একা ঢাকা থাকতে পারবে তো?’


বাবা খুব শান্ত ভঙ্গিতে বলছিলেন, ‘এতো ভাবছ কেন? হোস্টেলে থাকবে। সেখানে বাকি মেয়েরা থাকতে পারলে আমাদের মেয়েটাও পারবে। তুমি ভেবো না। মেয়ে ঠিক সামলে নেবে।’ বাবাকে অদিতি কোনোদিনই কিছু নিয়ে উত্তেজিত হতে দেখেনি। সরকারি ব্যাংকে এতো বড় পদে থেকেও ভদ্রলোক সম্পর্কে সবচেয়ে বড় সুনাম হলো, তিনি নাকি ঘুষ খান না। অনেকবার বাবাকে বলতে শুনেছে অদিতি- ‘আমার তো ঘুষ খাওয়ার প্রয়োজন নেই।


যা আছে এতেই চলে যাচ্ছে, চলে যাবে, একটাই তো মেয়ে আমাদের। আসলেই তা-ই। অদিতিদের বাড়িটা তিনতলা। দুটি ফ্লোর ভাড়া দেয়া। গ্রামের বাড়ি থেকে বছরের সব ফসল আসে, বিক্রিও নাকি হয় অনেক। এগুলো মা-ই দেখাশোনা করেন। ছুটি নিয়ে গিয়ে হলেও নিজের হাতে তিনি ধান, গম, সরিষা, মসুর, ছোলা- সব ঠিকঠাক করে আনবেন। মাঝে মধ্যে কষ্টই হয় খুব, বিশেষ করে গরমের সময় যেসব ফসল হয় সেগুলো তোলা শেষ হলে যখন তিনি ফিরে আসেন তখন চেহারার দিকে তাকানো যায় না। কয়েকবার বিছানাও নিতে হয়েছে। কিন্তু নিষেধ করলে বলবেন, ‘ও তোমরা বুঝবে না। ফসল ফলানোর আনন্দই আলাদা।’ অদিতিকে ওর মা তুমি করে বলেন। ভুল করেও কখনো মেয়েকে তুই বলেননি তিনি। বাবা অবশ্য মেয়েকে তুই করেই ডাকেন।
ছোট্ট জেলা শহর। সবাই সবাইকে চেনে। অদিতির মা-বাবাকেও যারা চেনেন তারা জানেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা বৃথা। এতো সুন্দর মেয়েটা শহর থেকে বাইরে চলে যাবে পড়তে, কার না কার হাতে পড়ে- এ রকম দুঃখ অনেকের মনেই আছে। যারা জানেন না, তাদের কেউ কেউ ওই ইন্টারমিডিয়েটে পড়া থেকেই অদিতির মা-বাবার কাছে এসে মেয়েকে বিয়ে দেবেন কি না জানতে চেয়েছেন। তাদের সোজা উত্তর, ‘নিশ্চয়ই, বিয়ে তো দেবোই। কিন্তু ওর পছন্দের ছেলের সঙ্গে। আর ও যখন বিয়ে করতে চাইবে।’


অদিতির কলেজের বন্ধুরা ওকে সব সময়ই বলতো, আহা রে! আমাদের মা-বাবারা যদি তোর মা-বাবার মতো হতো, কী ভালো হতো, বল? একেকটা ছেলের নাম নিয়ে বলতো, ওকে নিয়ে গিয়ে সোজা মা-বাবাকে বলতাম, এর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দাও, ব্যস, বিয়ে হয়ে যেতো। লেখাপড়া থেকে মুক্তি পেতাম। অদিতি ওদের কথা শুনে হাসতো শুধু। হাসা ছাড়া কি-ই বা বলার আছে! ওর মাঝে মধ্যেই মনে হতো, সবকিছু কেমন সুন্দর, মসৃণ, কোনো বাধা নেই কোথাও। ওর জীবনটা কি একটু বেশিই অন্য রকম? ওর ভেতরে এ রকম প্রশ্নও উঠতো।


ঢাকায় পড়তে এসে অবশ্য এই প্রশ্নের আর সুযোগ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় জায়গাটাকে বাইরে থেকে যতোই উদার আর দারুণ মনে হোক না কেন, জায়গাটা মোটেই সুবিধার নয়। লেখাপড়া হয় মোটামুটি। কিন্তু সেটি নিজেরই তাগিদে করতে হয়। আর সুযোগ-সুবিধাও কম। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় পড়েছে অদিতি কেবল, কোনো অভিজ্ঞতা তো নেই। এরপরও মনে হয়, এতো বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয়, এর লাইব্রেরিটা এ রকম কেন? এর শিক্ষকরাই বা এমন কেন? পড়ানোর চেয়ে কেবল সময় কাটানোই যেন মূল কাজ তাদের। যদিও কেউ কেউ চেষ্টা করেন ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর জন্য তবুও তাদের পক্ষে সব সময় সম্ভব হয় না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয় পড়তে এসেও অদিতিকে এ বিষয়ে বই খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হতে হয়েছে। যে শিক্ষকের কাছেই একটু বেশি বোঝার চেষ্টা করেছে তাদের কেউ কেউ যে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেননি তা নয়। তবে অদিতি নিজেকে সামলাতে শিখেছিল এক অসম্ভব কাঠিন্যের আড়াল দিয়ে। সব সময় ওই কঠিন চাহনি কিংবা আচরণে যে কাজ হয়েছে তা নয়, কেউ কেউ অতিরিক্ত আগ্রহী হয়ে ওকে নানানবিধ যন্ত্রণা দিয়েছে। ঠিক এ রকম সময়ে অদিতি হাঁপিয়ে উঠেছে। এ রকম সময়েই ওর মনে হতো, কী হতো আরেকটু কম সুন্দর হলে! ও খেয়াল করে দেখেছে, মেয়েদের আসলে সুন্দর-অসুন্দর বলে কিছু নেই, মেয়ে মানেই হচ্ছে লক্ষ্যবস্তু। এটা বুঝতে পেরে এক ধরনের স্বস্তিবোধ করেছে ও। নিজের ভেতরে কখনো যে প্রেম টের পায়নি তা নয়। কিন্তু ওই যে মা-বাবা নিজেরই ওপর ওর দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে অদিতি সব সময় ভেবেছে, সময় তো পালিয়ে যাচ্ছে না, এ সময় পরেও আসবে। নিজেকে সামলেছে ও। তাছাড়া সহপাঠীদের কাউকে ওর কখনোই বর হিসেবে যোগ্য মনে হয়নি। সিনিয়র কিংবা শিক্ষকদের একেকজনের আচরণ, বিশেষ করে ছোঁক ছোঁক করাটা ও একদম মেনে নিতে পারেনি। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা ও পার করে দিতে পেরেছিল কোনো রকম ঘটনা ছাড়াই। টুকটাক যা ঘটেছে এতে ওর কোনো হাত ছিল না। এগুলো হতোই। কেবল দুঃখজনকভাবে সেটি ওর সঙ্গে হয়েছে। ওকে আড়ালে কিংবা কখনো কখনো প্রকাশ্যে কেউ কেউ ‘সুন্দরী কাঠের টুকরা’ বলেও ডাকতো। ও মনে মনে হেসেছে কেবল, কখনো কোনো প্রতিবাদ করেনি।


ওই সুন্দরী কাঠের টুকরোটাই একদিন প্রেমে পড়ে গেল ওর চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র রওশন ইব্রাহিমের। কোনো সিনেমাটিক ঘটনায় প্রেম নয়, বরং খুব সাধারণ ওই প্রেম। রওশন নয়, অদিতিই রওশনকে বলেছিল প্রথম ভালবাসার কথা। পরিচয় থেকে প্রেম হওয়া পর্যন্ত ঘটনা এতোটাই অনুল্লেখযোগ্য যে, এটা আলাদা করে বলার কিছুই নেই। এরপরও উল্লেখ করার মতো ঘটনা হলো, প্রেম হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই রওশন বিয়ে করতে চাইলো। কারণ ওর একটা স্কলারশিপ হয়ে গিয়েছিল ততোদিনে লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিকসে। বিয়ে না করে বিদেশ চলে যাওয়াটা ভালো লাগেনি রওশনের। তাই দু’দিকের বাড়িতে জানিয়েই রওশন আর অদিতি বিয়ে করেছিল। খুব হঠাৎ হঠাৎ নানানবিধ ঘটনা জীবনে ঘটতে থাকে যার কোনো ব্যাখ্যা থাকে না কিংবা থাকলেও ঘটনার আকস্মিকতায় সেগুলো কেমন গুলিয়ে যায়। অদিতিরও তেমন হয়েছিল ওই সময়টায়। প্রেম হওয়া, বিয়ে হওয়া, তারপর রওশনের চলে যাওয়া। এর মধ্যেই ওর নিজের পরীক্ষা এবং চাকরি হয়ে

যাওয়া- সব মিলিয়ে অদিতি ওই পুরো সময়টা নিয়ে খুব বেশি ভাবার সময় পায়নি। ভাবলে দেখতে পেতো, ওই দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির মধ্যে নানান রকম ফাঁকফোকর রয়েছে যা পূরণ করা পরে ওর পক্ষে আর কখনোই সম্ভব হয়নি।
ওদের অফিসটা গুলশানে। একটা তিনতলা বাড়ির পুরোটা। এক বিঘার প্লটের ওপর বাড়িটা। তাই অর্ধেক নানান গাছগাছালিতে ভরা। বেশ সুন্দর একটা বাগান আছে। প্রায়ই ওরা কলিগরা মিলে ওখানে বসে গল্প করে। বিদেশি সংস্থাটি এ দেশের রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়েই নানান গবেষণা করে আর সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে। পুরোপুরি মাল্টিন্যাশনাল একটি অফিস। ওদের ঢাকাপ্রধান এক আইরিশ আমেরিকান। অদিতির লাইন ম্যানেজার ভারতীয়। ওদের ক্যান্টিনে প্রায় অনেক ধরনের খাবার রান্না হয়, দেশি-বিদেশি, হালাল। ওর অবশ্য এ বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। হালাল-হারাম সম্পর্কে অদিতি জানে না তা নয়। কিন্তু এ রকম অফিশিয়ালি বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়া হয় বলে ও জানতো না। আসলে ও তো এর আগে কোথাও চাকরি-বাকরি করেনি! বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি দেখেছে। তবে হলগুলোর ক্যান্টিনে এখনো হালাল-হারাম আলাদা করে গুরুত্ব দেয়া হয় না। অবশ্য ধরেই নেয়া হয় যে, এখানে যারা আসবে তারাই হালাল খাবে। আর অন্য ধর্মের ছেলেদের জন্য তো আলাদা হলই আছে। মেয়েদের জন্য অবশ্য আলাদা হল নেই। এখানে মেয়েরা যার যার ধর্ম নিজেই বাঁচায়। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো দায়িত্ব নেই মেয়েদের ধর্ম রক্ষার- অন্তত খাবার-দাবার দিয়ে।
অদিতিদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেসব গবেষণা হয় সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরে নেয়া যায়। অনেক সুনাম ওই প্রতিষ্ঠানের। দেশের নামকরা গবেষকরা ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এই কিছুদিন হয় ওদের প্রতিষ্ঠান তরুণ গবেষকদের নিয়ে একটি প্রকল্প শুরু করেছে। ওই প্রকল্পে একদল তরুণ গবেষককে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণার জন্য। অফিসের একটি ফ্লোর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে ছোট ছোট কিউবিকল করে। তারা সারা দিন কাজ করে নিজেদের পছন্দমতো বিষয় নিয়ে। ওই গবেষকরা বেশির ভাগই বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া করে এসেছে। অদিতি তাদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে। ওর ভাবতে মজা লাগে, বাংলাদেশ সম্পর্কে এতো বিষয় নিয়ে কাজ হচ্ছে। অথচ কেউ এগুলো নিয়ে তেমন খোঁজখবর রাখে বলে ওর জানা নেই।


ওর সহকর্মীরাও বেশ মজার। প্রত্যেকের সঙ্গেই ওর সম্পর্ক বেশ ভালো। তবে ইফতেখার নামের ছেলেটাকে ওর মনে হয়েছে কেমন যেন সম্পূর্ণ অন্য রকম। পোশাক-আশাকে তো বটেই, হার্ভার্ড থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে মাস্টার্স করেছে। পিএইচডি করার আগে অদিতির মতো কিছুদিন কাজ করবে বলে দেশে চলে এসেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, মুখে চাপ দাড়ি, প্যান্ট পরে ‘টাখনু’র উপরে। অফিসে দু’বার নামাজের সময় হলে সবার আগে ওজু করে নামাজ পড়তে যায় এবং প্রায়ই বাকিদেরও জোর করে। কেউ কেউ তো এখন লজ্জায় পড়েই নামাজ পড়তে যায় ওর সঙ্গে। অফিসে এসেই নাকি ইফতেখার ওই অফিসে নামাজের জায়গার তৈরির জন্য কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতে শুরু করে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এসব ক্ষেত্রে খুব উদার। প্রার্থনার জায়গা দিতে তাদের কোনোই দ্বিধা ছিল না। কেউ বলেনি এতো দিন। তাই দেয়নি। কিন্তু ইফতেখার বলার সঙ্গে সঙ্গেই আলাদা জায়গা হয়ে গিয়েছিল। অফিসের সবাই ইফতেখার সম্পর্কে আড়ালে নানান কথা বলে। ও কোনো মেয়ের দিকে তাকায় না, খুব কট্টর- এসবই বলার মতো কথা। বাকিটা কেউ জানেই না হয়তো। অদিতি ভাবে, কোনো মানুষকে নিয়ে এভাবে আড়ালে-আবডালে কথা বলার কিছুই নেই, বরং প্রশ্ন থাকলে সোজা-সাপ্টা জিজ্ঞাসা করাই ভালো। অদিতি ভেবেই রেখেছিল, একদিন ইফতেখারকে চা খেতে বলবে ওর সঙ্গে ক্যান্টিনে। হয়তো ছেলেটার সঙ্গে কেউ কথা বলে না বলে ও নিজেও কারো সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা পায়। কারো ধর্ম আচরণ তাকে বিচার করার মাপকাঠি হতে পারে না- অদিতি ভাবে। কিন্তু এর আগেই অদিতিকে রওশন জানায় ইফতেখারের কথা। ওরা নাকি খুব ভালো বন্ধু এবং ওদের ইমেইলে পরিচয়ও করিয়ে দেয় রওশন।


অদিতিকে রওশন লিখেছিল, ‘ইফতেখারের কথা তোমাকে কখনো বলিনি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু। তোমাদের অফিসেই আছে। খুব ব্রাইট রিসার্চার। ওকে সহযোগিতা করো, প্লিজ!’ একই ইমেইলে ইফতেখারকেও লিখেছিল, ‘ইফতেখার, অদিতি আমার স্ত্রী। তোমার প্রয়োজনে ও তোমাকে সব সহযোগিতা দেবে।’ ইংরেজিতে লেখা ওই ইমেইলটা অদিতির ভালো লাগেনি। ভালো বন্ধুর সঙ্গে স্ত্রীর পরিচয় করিয়ে দেয়ার ধরনটাই যেন কেমন মনে হয়েছিল ওর কাছে। এরপরও ইফতেখারের সঙ্গে ও কথা বলেছিল। এমনিতেই তো ওকে চা খাওয়ার কথা বলতে চেয়েছিল অদিতি। এর আগেই ওই সুযোগ এসে গিয়েছিল। অদিতি খেয়াল করেছিল, ইফতেখার কখনোই ওর দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। কেউ যদি মুখের দিকে না তাকায় তাহলে তার সঙ্গে কথা বলাটা এক ধরনের শাস্তি। অদিতির খারাপ লাগছিল। ভেবেছিল, পরে কোনোদিন এটা বলবে ইফতেখারকে। এর আগেই অদিতিকে অবাক করে দিয়ে ইফতেখার বলেছিল, ‘আপনাকে একটা দায়িত্ব দেবো, আশা করি, করে দেবেন। রওশন সাহেবকে আমি বলেছি। তিনি বলেছেন, আপনি কাজটা করে দেবেন।’ রওশন সাহেব! আপনারা না বন্ধু? অদিতি একটু হালকা হওয়ার চেষ্টা করেছিল।


অদিতির ওই প্রগলভ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ইফতেখার বলেছিল, আপনার তো আমাদের রিসার্চ ডাটাবেজের অ্যাকসেস রয়েছে, তাই না? আমাকে অ্যাকসেস পাসওয়ার্ডটা দিতে হবে। আমার প্রয়োজন। ওটা তো কাউকে দেয়া নিষেধ। আপনার কোন পেপারটা প্রয়োজন, আমাকে বলুন। আমি সেটি বের করে আপনার ফোল্ডারে জমা করে দেবো- অদিতি একটু অবাক হয়েই ইফতেখারকে বলেছে। না, আমার পাসওয়ার্ডটাই প্রয়োজন। আপনাকে এ ব্যাপারে রওশন সাহেব বলবেন। কেউ বললেই আপনাকে পাসওয়ার্ড দিয়ে দেবো তা তো হয় না ইফতেখার। আমি সেটি করবো না। আপনি করবেন এবং আপনাকে সেটি করতে হবে- ইফতেখারের গলার আওয়াজ এতোটাই ঠা-া যে, অদিতির একটু ভয়ই হলো। কিন্তু অদিতিও গলাটাকে যথাসম্ভব কঠিন করেই বললো, দেখা যাবে করি কি না। তবে আমি করবো না, সেটি ধরে রাখতে পারেন। সেদিনের ওই আলাপচারিতা নিয়ে অদিতি ভেবেছে অনেক। কারো সঙ্গে আলাপ করবে কি না সেটিও ভেবেছে। কিন্তু কী মনে করে যেন চুপ থেকেছে। বিশেষ করে পরের দিনই রওশন ফোন করে অদিতিকে বলেছে, ইফতেখার যা চাইছে, সেটি ওকে দিয়ে দাও অদিতি।


অদিতি জিজ্ঞাসা করেছে, কেন বলো তো? তিনি পাসওয়ার্ড চাইছেন কেন? আমি তো ওনাকে বলেছি, ওনার যে ফাইল দরকার সেটি ওনাকে বের করে দেবো। সেটি এমনিতেই দিতাম, দিতে আমি বাধ্য। যার যার বিষয় অনুযায়ী রিসার্চ পেপার বের করে দেয়াই তো আমার কাজ। কিন্তু তিনি পাসওয়ার্ড চাইলে তো সেটি আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়, তাই না? দেখো, আমি বলেছি বলেই তুমি পাসওয়ার্ড ওকে দেবে। না, তুমি বলেছ বলেই আমাকে পাসওয়ার্ড কাউকে দিতে হবে সেটি মনে করি না। আমার কর্মক্ষেত্রে আমার লয়ালিটি আমার কর্তৃপক্ষের প্রতি, অন্য ক্ষেত্রে হয়তো সেটি তুমি। অদিতি বেশি বাড়াবাড়ি করছ তুমি- রওশনের গলার স্বর চড়ে। অদিতি ততোটাই শান্তস্বরে বলে, না, একদম বাড়াবাড়ি করছি না। যেটি স্বাভাবিক সেটি করছি। বুঝতে পারছি না, তোমরা কেন একটা অন্যায় আবদার নিয়ে আমার সঙ্গে জোর করছ? এটা অন্যায় আবদার নয়, ওর এটা দরকার। আর তুমি এটা দেবে, ব্যস!  এটি দেবো না। দরকার হলে কালই অফিসকে জানাবো এটা। তুমি এটা করবে না অদিতি। তোমার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে এর পরিণাম ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।  আমার তো মনে হচ্ছে কোনো ভয়ঙ্কর কারণ আছে এর পেছনে। না হলে আমাকে তুমি এভাবে হুমকি দিতে না। তোমার যা ইচ্ছে, তুমি তা-ই করতে পারো। কাউকে পাসওয়ার্ড দেবো না এবং কালই অফিসে এটা জানাবো- বলেই অদিতি ফোন রেখে দিয়েছিল।


ফোন রেখে দিয়ে মনে শান্তি পাচ্ছিল না একদম। কী এমন কারণ হতে পারে যার জন্য রওশন এতো রূঢ় ব্যবহার করলো ওর সঙ্গে? পাসওয়ার্ড দিয়ে ওরা কী করবে? এই যে হঠাৎ করেই ইফতেখারকে রওশনের বন্ধু হিসেবে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া, এরপর প্রথম পরিচয়েই ইফতেখারের এ রকম পাসওয়ার্ড চাওয়া এবং তারপর এ জন্য ওর ওপর রওশনের এ রকম চাপ দেয়া- সব কেমন যেন গোলমেলে ব্যাপার বলে মনে হতে থাকে অদিতির। ও সিদ্ধান্ত নেয় সত্যি সত্যিই কাল অফিসে গিয়ে ওর লাইন ম্যানেজারকে বলে দেবে ঘটনাটা। এতে যা হয় হবে, পরে দেখা যাবে। এ পর্যন্ত অদিতির জীবনের গল্পটা বেশ সরল-সোজাই, পাসওয়ার্ড সংক্রান্ত ওই সামান্য টানাপড়েন ছাড়া। কিন্তু রওশনের ফোন কেটে দেয়ার মাত্র আধা ঘণ্টা পরই অদিতির জন্য যে এতো বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সেটি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।

রওশনদের ফ্ল্যাটটা সাততলায়। বারোতলা বিল্ডিংয়ের সাততলাটা পুরোটা ওদের। অদিতিকে নিয়ে রওশন উঠেছিল ওই বিশাল ফ্ল্যাটের এক পাশে। বাকি পাশটায় রওশনের মা-বাবা থাকেন ওর বোনকে নিয়ে। বোনটা অটিস্টিক, বিয়ে-থা হয়নি। অদিতির ভালো লেগেছিল এই আলাদা থাকার ব্যাপারটা। অবশ্য খাওয়া-দাওয়া সব একসঙ্গে। রওশন চলে যাওয়ার পরও ব্যাপারটা এমনই চলছে। অদিতি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে গিয়ে গল্প-টল্প করে। তারপর খাওয়া-দাওয়া করে নিজের ঘরে চলে আসে। সেদিনও খাওয়া-দাওয়ার পর রুমে আসার পরই রওশনের ফোন এসেছিল। ফোনটা কেটে দিয়ে খুব মন খারাপ লাগছিল অদিতির। এর চেয়েও কষ্ট দিচ্ছিল রওশনের হুমকি। অদিতি গুম হয়ে বসেছিল সোফায়। টিভিটা চলছিল তখনো। সাউন্ড অফ করা ছিল কথা বলার সময়। তখনো বাড়ায়নি সাউন্ডটা। ঠিক তখনই ওর ঘরে এসেছিলেন ওর শ্বশুর। বলেছিলেন, তোমার মোবাইল ফোনসেটটি দাও। মোবাইল ফোনসেটটি টেবিলের ওপরই ছিল। সেটি দেখতে পেয়ে ছোঁ মেরে তুলে নিলেন। এরপর বললেন, ‘কাল থেকে তোমার বাইরে যাওয়া বন্ধ।’ ভদ্রলোক গট গট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং অদিতির মনে হলো বাইরে থেকে রুমটা বোধহয় তালাও

দেয়া হলো। অদিতি হতবাক কিংবা এর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে গিয়েছিল বোধ করি। ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কী হলো! ও কেমন যেন অজ্ঞান হওয়ার মতো করে নেতিয়ে রইলো সোফার ওপর। এরপর ঘুমিয়ে পড়েছিল নিশ্চয়ই। যখন ঘুম ভাঙলো তখন গভীর রাত। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো- ৩টা প্রায়। টিভিটা তখনো চলছে শব্দহীন। অদিতি বসে বসে ভাবে, কী হলো! হঠাৎ কী হলো? সবদিক থেকে ওকে এ রকম আঘাত করা হলো কেন? প্রথমে রওশন, এরপর রওশনের বাবা। ওর বুঝতে কষ্ট হয় না যে, নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর কোনো ব্যাপার রয়েছে এর পেছনে। কিন্তু ওই ভয়ঙ্কর ব্যাপারটি ঠিক কী সেটি ধরতে পারে না অদিতি। এখন ওর হাতে কোনো মোবাইল ফোন নেই। বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা নেই। ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, আরে! ল্যাপটপটা তো আছে। ইমেইল তো করা যেতে পারে। ও সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ খুলে বসে। দেখে ঘরের ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। বাকি যে নেটওয়ার্কগুলো দেখাচ্ছে- সবই পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড। কেবল ‘আইকন’ নামে স্থানীয় যে ইন্টারনেট সার্ভিসটি আছে সেটিতে কোনো পাসওয়ার্ড নেই। কিন্তু অদিতি জানে যে, এটাতে কানেক্ট করার পর ঠিক পাসওয়ার্ড চাইবে। অফিস থেকে ওদের সবাইকেই ওই পাসওয়ার্ড দেয়া হয়েছিল। বলেছিল, ওই পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে নিজের মতো করে পাসওয়ার্ড বদলে নিতে। অদিতি মনে করতে পারে না ও বদলেছিল কি না। মোবাইল ফোনে গ্রামীণের সার্ভিস, বাসায় ওয়াইফাই, অফিসে নিজস্ব নেটওয়ার্ক, সব সময় কোনো না কোনো নেটওয়ার্কের আওতাতেই ও থাকে। তাই আলাদা করে ওই আইকন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু এখন! এই ভয়ঙ্কর সময়ে মনে হচ্ছিল, আসলে প্রয়োজন থাকে। নেটওয়ার্ক যতো বাড়ানো যায় ততোই হয়তো ভালো। অদিতি আইকন নেটওয়ার্কে ক্লিক করে। ও যুক্ত হয়। নতুন উইনডো খোলে। সেখানে ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড চায়। অদিতি প্রথমে নিজের নাম লেখে ইউজার নেমের জায়গায়। এরপর পাসওয়ার্ড বসিয়ে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে এন্টার চাপে। কী আশ্চর্য! আইকন ওকে ওয়েলকাম মেসেজ পাঠায়। অদিতির নিজেকে এর চেয়ে ভাগ্যবান কোনোদিন মনে হয়নি। ও দ্রুত একটা ইমেইল টাইপ করে সরাসরি ওর বসকে সবকিছু জানিয়ে। কী কারণে জানে না, ওর বরের কথা সম্পূর্ণ গোপন করে যায় অদিতি। নিজের বন্দিদশার কথা লিখবে কি না ভাবতে ভাবতে লিখেও ফেলে। এরপর মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।


পরদিন সকালে বাসায় পুলিশ আসে। ওকে বের করে নিয়ে যায়। ঢাকায় কোথায় উঠবে ও- পুলিশ যখন ওকে এ কথা জিজ্ঞাসা করে তখনো ঠিক ভাবেনি ও আর এই বাড়িতে ফিরবে না। তাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। এরপর এক আত্মীয়ের বাসার ঠিকানা বলে। কিন্তু সেখানেও কি উঠবে ও? মা-বাবাই বা কী বলবে? এসব ভাবতে ভাবতে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথা বলে অদিতি। গুলশান থানাতেই কথা হচ্ছিল। কতো প্রশ্ন অফিসারের। সবটির উত্তর ও জানেও না। এরপরও যা পারে বলে। তারপর অফিসে আসে। কেবল রওশন সম্পর্কে কোনো কথাই ও বলে না পুলিশকে। আশ্চর্যজনকভাবে পুলিশ অফিসারও রওশন সম্পর্কে কিছুই জানতে চায় না ওর কাছে। ততোক্ষণে অফিসে পুলিশ গেছে। ইফতেখারকে অ্যারেস্ট করেছে। মাল্টিন্যাশনাল অফিস বলে কথা! সবকিছু যেন কেমন দ্রুতই হয়ে যায়। ইফতেখারের কিউবিকল আর ড্রয়ার থেকে অসংখ্য লিফলেট ও বই জব্দ করা হলো। ওর কম্পিউটারটা নিয়ে গেল পুলিশ। বলা হলো, এই কম্পিউটারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। পরের দিনের পত্রিকাতেই বিস্তারিত খবর জানা গেল। একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের হয়ে কাজ করছিল ইফতেখার, এখানে বসে কর্মী সংগ্রহ করেছিল ও। হার্ভার্ডে থাকতেই ওর ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ও যখন বুঝতে পেরেছিল যে, ও আর ওখানে কাজ করতে পারবে না তখনই দেশে চলে আসে। হয়তো ভেবেছিল, এখানে ওকে আর কেউ ধরতে পারবে না। কিন্তু ঠিক ধরা পড়ে গেল। পুলিশ যখন ইফতেখারকে নিয়ে যাচ্ছে তখন অদিতির মনে হলো, এভাবে তো রওশনকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করবে। আজ হয়তো ইফতেখারের জায়গায় রওশনও থাকতে পারতো কিংবা এ দেশের পুলিশ যদি ওই দেশের পুলিশকে কিছু জানায়? অবশ্য রওশন সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছুই বলেনি পুলিশকে। কেন লুকালো এ কথা! সেও তো এক তীব্র বিস্ময়ের ব্যাপার ওর কাছে। নিজের কিউবিকলে ও মাথা নিচু করে বসে থাকে। আর তখনই মনে পড়ে কিছুদিন আগে দেখা একটা ফরাসি

সিনেমার কথা। সিনেমা দেখার নেশা ওর পুরনো। ব্রিটিশ কাউন্সিল, আঁলিয়স ফ্রঁসেতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। তখন থেকেই ফিল্ম সোসাইটিতে জড়িয়েছিল ও। তাই ইউরোপিয়ান সিনেমার প্রতি ওর আলাদা ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই নিজেই গিয়ে দেখে সিনেমা কেনে অদিতি। পাইরেটেড কপি, এতে কী! সিনেমা দেখার সুযোগ তো পাচ্ছে ও।
সিনেমাটি ফ্রান্সের মূলধারার কি না বলতে পারবে না। তবে একটি আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি ছেলের প্রেমে পড়ে এক ফরাসি মেয়ে। দুর্দান্ত আধুনিক মেয়েটির জীবন নিয়ে কোনো ভাবনা নেই, নেই কোনো পরবর্তী চিন্তাও। ভেসে থাকতেই ভালোবাসে সে। কিন্তু ওই ছেলের প্রেমে পড়ে বুঝতে পারে সে আসলে এক ভয়ঙ্কর মৌলবাদী জঙ্গি। ইউরোপকে অশান্ত করার কৌশল নিয়ে কাজ করছে। খুব দুর্বল গল্প। এর চেয়ে ঢের সিরিয়াস সিনেমা দেখেছে অদিতি। কিন্তু এ মুহূর্তে ওই সিনেমাটির গল্পটিই কেন মনে পড়লো অদিতির? ওর সঙ্গে মিল আছে বলে?


সিনেমায় গোটা পৃথিবীর ওপর বিরক্ত ছেলেটি কেবল ভালোবাসে মেয়েটির উতাল-পাথাল শরীরকে। মেয়েটি সিদ্ধান্ত নেয়, ওই শরীর দিয়েই তাকে ও বের করে আনবে ওই ধ্বংসের পথ থেকে। মেয়েটি শুরু করে। নিজেকে তৈরি করে। আরো সুন্দর করে তোলে। বিষয়টি সম্পর্কে মেয়েটি বিস্তর লেখাপড়া করে। এরপর কাজে নেমে যায়। একটি ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটানো থেকে ছেলেটিকে সরাতেও সফল হয়। অবশ্য শেষটা অতো ভালো ছিল না। মানুষকে কি ১৮ বছরের পর আর বদলানো যায়!
অদিতির মনে পড়ে সিনেমাটির কথা ওই কিউবিকলে বসেই। কিন্তু ভেবে পায় না, রওশনকে কী করে এর থেকে বের করে আনবে ও। নিজের সঙ্গে নিজেই তর্ক শুরু করে দেয়। ইচ্ছা করলেই ওই সম্পর্ক থেকে ও বেরিয়ে আসতে পারে। একতরফা ডিভোর্স দিলেই হয়ে যায়। তবে অদিতি তো রওশনকে ভালোবেসেছে। ভালোবেসে বিয়েও করেছে। রওশনের যদি আজ কোনো কঠিন রোগ হতো তাহলে রওশনকে ও ছেড়ে চলে যেতে পারতো, নাকি যাওয়াটা ঠিক হতো? এও তো এক ভয়ঙ্কর রোগই। তাহলে?
অদিতি নিজেকে বোঝাতে শুরু করে। গোছাতেও শুরু করে। তবে ঠিক কোথায় রওশনের দুর্বলতা সেটি ঠাহর হয় না ওর। এরপরও ভেতরে ভেতরে খুঁজতে শুরু করে অদিতি। দিনটা কেটে গেছে থানায়। এখন প্রায় সন্ধ্যে। অফিসের অনেকেই চলে গেছে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বলে এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কোথাও। নিশ্চয়ই ফিস ফিস হচ্ছে চারধারে। অদিতি উঠে দাঁড়ায়। বাথরুমে গিয়ে চোখ-মুখে জলের ঝাপটা দেয়। বাথরুমে মৃদু আলো জ্বলছে। কিন্তু সব পরিষ্কার দেখা যায়। আয়নার সামনে দাঁড়ানো অদিতি। ওর পুরো শরীরটা দেখা যায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে অপলক আয়নার দিকে তাকিয়ে। আর তখন আবারও ওর মনে হয়, ও আসলে রওশনকে ভালোবাসে খু-উ-ব।
ভালোবাসলেই তার অনৈতিক কাজকে যেমন সমর্থন দেয়া যায় না তেমনই কেবল অনৈতিক কাজের ধুয়া তুলে ভালোবাসার মানুষকে মুখের কথাতেই ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না! অদিতি ভাবে রওশনের কাছেই চলে যাবে কি না। ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে আসে বাইরে।


ঢাকায় সন্ধ্যে নামছে। মানুষ বাড়ি ফিরছে। তাড়া টের পাওয়া যায় মানুষের মধ্যে, যানবাহনের মধ্যেও। ভীষণ গরম পড়েছে। তবে হালকা ঠা-ার একটা হাওয়াও বইছে। অদিতি হাঁটতে থাকে। ভেতরে ভেতরে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ওর ভেতরটা এখন বেশ হালকা। অন্তত দিনভর যে ভার ও বইছিল এর থেকে তো বটেই। এই প্রথম নিজেকে সুন্দরী ভেবে ওর অসম্ভব ভালো লাগে। এর আগেও যে দু’একবার লাগেনি তা নয়। কিন্তু আজকেরটা একেবারেই অন্য রকম ভালো লাগা। ওর হাঁটার গতি একটু হলেও বেড়ে যায় এ কথা ভাবতে ভাবতে।

এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি দেখি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

 

 বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে একটা সমালোচনা প্রায়ই শুনতে পাই’ আজকাল তেমন ভালো গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছে না, মনে দাগ কাটার মতো সাহিত্য আর তৈরি হচ্ছে না। কবিতার ক্ষেত্রে সমালোচনাটা একটু বেশি এবং তার কারণটা (?) সহজবোধ্য। অনেকে আমাদের প্রবন্ধ-সাহিত্য নিয়েও আক্ষেপ করেন। প্রবন্ধে আমরা ষাট-সত্তরের চিন্তাভাবনা থেকে কি খুব এগিয়েছি? এ রকম একটি প্রশ্নের সামনে আমাকে মাঝে মধ্যেই পড়তে হয়। এই সমালোচনার যে ভিত্তি নেই তা নয়। তবে ঢালাওভাবে এটি করা হলে আমার শক্ত আপত্তি থাকবে। কবিতা অনেক লেখা হচ্ছে, অনেক কবিতাই হয়তো কয়েক পঙ্ক্তি পড়ে রেখে দিতে হয়। তাই বলে ভালো কবিতা যে লেখা হচ্ছে না তা তো নয়। ভালো কবিতা পড়তে হলে শুধু জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যের পাতা ওল্টালে চলবে না, লিটল ম্যাগাজিনগুলোও পড়তে হবে। একই কথা খাটে গল্পের ক্ষেত্রে এবং হয়তো অনেক বেশি প্রবন্ধের ক্ষেত্রে। এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো আমাদের সাহিত্যের বাতিঘর এবং এর বাতিওয়ালারা প্রায় সবাই তরুণ। আমাদের সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নেই- এমন কথা যারা বলেন তাদের হয়তো মূল স্রোতের বাইরের ওই তরুণ লেখকদের সঙ্গে তেমন পরিচয় নেই। যে সাহিত্যের একটা সমৃদ্ধ অতীত আছে, একটা দ্বন্দ্বসংকুল বর্তমান আছে। এর একটা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আছে। অতীত নিয়ে আমাদের একটা অহঙ্কার আছে। বর্তমান নিয়ে যদি ওই অহঙ্কারটি তেমন না থাকে তাহলে বুঝতে হবে, সাহিত্যের ভূমিটা হয় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, নয় তো সেখানে আমরা যথেচ্ছ নির্মাণ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি; তৈরি করছি অগোছালো নানান স্থাপনা।
সাহিত্য-সমালোচনা এই ভূমিক্ষয়ের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, সাহিত্যের দরদালানের নির্মাণকলা, এর ত্রুটি-বিচ্যুতি, সৌন্দর্য-অসৌন্দর্যের হিসাব নেয়। এতে ওই ভূমিটা সুরক্ষা পায়, এর ওপর গড়ে তোলা বা তুলতে যাওয়া নির্মাণগুলো মূল্য সন্ধানী ও
আত্মবিশ্লেষণী হয়। দুর্ভাগ্যের আমাদের সাহিত্য-সমালোচনা আজকাল এসবের অনুপস্থিতি দিয়েই যেন এর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। আমাদের বর্তমানের অর্জন কম নয়। কিন্তু ওই অর্জনের মূল্য বিচার আমাদের তৃপ্তি দেবে, নাকি আরো ভালো কিছু করতে না পারার আক্ষেপটা বাড়াবে? আমরা উঁচুমানের সাহিত্য সৃষ্টি করছি, নাকি নিজেরাই এটিকে শুধু ‘বিশ্বমানের বিশ্বমানের’ বলে ঢোল পেটাচ্ছি? যদি দ্বিতীয়টিই হয় তাহলে বাস্তবতা কেন এমন হচ্ছে? এর একটি ব্যাখ্যায় তাহলে যাওয়া যায় এবং আগামী দিনের সাহিত্য নিয়ে আমার প্রত্যাশার কথাটিও এই সুযোগে বলা যায়। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের সাহিত্যের সম্ভাবনাটি মার খাচ্ছে তিন-চার জায়গায়। আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে চলছে

অরাজকতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় চলছে শৈথিল্য, মনোজগৎ দখল করে নিচ্ছে দৃশ্য মাধ্যম বই নয়, দৃশ্য মাধ্যম এবং আমাদের পড়ার সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়ে দেখার সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যে জাতির ভাষা বিপন্ন, জাতি মাতৃভাষার একটি সুশ্রী, মান সম্পন্ন প্রকাশটি কোনোভাবে আয়ত্ত করতে না পেরে এক বিকৃত, মিশ্র ভাষায় কাজ চালিয়ে যায় ওই জাতির সাহিত্য শক্তিশালী হয় না। আমি যখন দেখি, এ দেশের বিশাল সংখ্যক তরুণ মাতৃভাষায় একটি বাক্যও ইংরেজির আক্রমণ ও উচ্চারণগত বিকৃতি বাঁচিয়ে বলতে অসমর্থ তখন ভাবি, এর প্রভাবে সাহিত্য কি পাল্টাবে? পাল্টে কি যাচ্ছে না? সাহিত্যেও ঢুকবে অথবা ঢুকছে অপ্রকাশের দৈন্য, নিমপ্রকাশের বিকৃতি? তবে সবচেয়ে বড় কথা, যে ভাষা সব চিন্তার বাহন ওই ভাষা যদি সামান্য চিন্তাটিকেও সহজ ও সুন্দরভাবে প্রকাশে অক্ষম হয় তাহলে এ ভাষাভাষীর চিন্তার ক্ষেত্রেও থাকবে সংকট। পশ্চিমে দেখুন, জাপান-চীনের দিকে তাকানÑ একজন শেমাস হিনি অথবা গুন্টার গ্রাস কি তাদের ভাষা বিকৃত করে, উচ্চারণ বিকৃত করে ফরাসি-স্প্যানিশ শব্দ ঢুকিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে পরিবেশন করছেন? লন্ডন-শিকাগোর এক পথচারীও যখন কথা বলেন তখন কি মনে হয় না এই মাত্র লিখে যেন তা তিনি পড়ছেন? এমনই সঠিক ও সুঠাম সেসব বাক্য এবং প্রকাশ। এই শক্তি কি আমাদের আছে?
আমি স্বপ্ন দেখি, আমরা প্রত্যেকে মাতৃভাষাকে ওই শক্তি, দরদ আর দক্ষতা নিয়ে ব্যবহার করছি যে শক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার একটি প্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন। স্বপ্ন দেখি, সারা দেশের স্কুলের শিশুরা বই পড়ছে, লাইব্রেরি থেকে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের বই নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখি, সারা দেশে পড়ার সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে। মানুষের চিন্তা স্বচ্ছ হচ্ছে, প্রকাশ বলিষ্ঠ হচ্ছে এবং মানুষ ক্রমাগত বুদ্ধির জগতে একটার পর একটা অর্জনের পতাকা তুলে ধরছে। মানুষ পশ্চিমের পণ্য সংস্কৃতি ও মেধাহীন দৃশ্য মাধ্যমের ধূর্ত চালে বদলে যাওয়া বিকৃত বাংলা ভাষাটিকে বিদায় জানাচ্ছে। যেদিন এই হবে বাংলাদেশের অবস্থা সেদিন আমাদের সাহিত্য ক্রমাগত উঁচুর দিকে যাত্রা করবে। সেদিন এক তরুণ কবির অথবা তরুণ গল্পকারের বইয়ের প্রথম সংস্করণ ৪০-৫০ হাজার বিক্রি হয়ে যাবে। আগামী দিনের সাহিত্যের বিষয়বস্তু নিয়ে কারা, কী লিখবেন, কেমনভাবে লিখবেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয় হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে কি না সেসব লেখায়, এতে শুধুই নগর জীবন প্রতিফলিত হবে কি নাÑ এসব নিয়ে ভাবি না। আমি ভাবি, শিক্ষা ও ভাষার ক্ষেত্রে এক পুনর্জাগরণের কথা, আত্মপ্রকাশের তীব্র শক্তি আর চিন্তার শানিত হয়ে ওঠার কথা। আমার স্বপ্নে ওই সম্ভাবনাটি নদীর স্বচ্ছ জলের নিচে নুড়িপাথরের মতো দেখতে পাই। সেটি যদি হয় তাহলে সাহিত্য নিয়ে তোলা অন্যসব প্রশ্ন কাক্সিক্ষত সমাধান পেয়ে যাবে।

আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে গর্বের পাশাপাশি একটি উদ্বেগ কিছু কালো ছায়া ফেলে চলেছে। উদ্বেগটি তৈরি হয়েছে সমাজের মূল্যবোধে ভয়ানক কিছু পরিবর্তন থেকে। গত ৩০-৪০ বছরে সমাজে ব্যাপক দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, দুর্নীতি বেড়েছে; ধর্ম-ব্যবসা, রাজনীতির নামে স্বার্থ হাসিলের চর্চা এবং মানুষে মানুষে দূরত্ব বেড়েছে। এখন ভোগের সংস্কৃতিই যেন প্রধান সংস্কৃতি। আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতিগুলোর প্রকাশেও এখন আড়ষ্টতা অথবা সেগুলো যাচ্ছে একালের মন্ত্র ‘ফিউশন’-এর রন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের

গ্রামীণ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মতান্ত্রিক সমাজের চাপ ও পুঁজিবাদী দৃশ্য সংস্কৃতির আগ্রাসনে। এখন পহেলা বৈশাখ বলুন, নবান্ন উৎসব বলুন- সবই তো এক আপাত বন্ধুসুলভ নগরকেন্দ্রিকতায় নিয়ন্ত্রিত। এখন বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় পালাগান, গম্ভীরা অথবা লাঠিখেলার আয়োজন হয়। বাউলশিল্পীরা সেসব কোম্পানির সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান পরিবেশন করেন। পুঁজির আগ্রাসন ঠেকানো মুশকিল, পুঁজির মতলবটাও বোঝা মুশকিল। সংস্কৃতির ওই বিবর্তন সময়ের বিচারে হয়তো অবধারিত। এখন দৃশ্য মাধ্যমের যুগ এবং দৃশ্য মাধ্যমের প্রধান উদ্যোক্তা ও উদ্গাতা হচ্ছে পুঁজি। আমাদের সংস্কৃতির পক্ষে এর আঁচ বাঁচিয়ে চলা মুশকিল। তাই বলে অসহায় আত্মসমর্পণ কেন? সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা নয়। সংস্কৃতি সার্বিক জীবন আচরণের একটি পরিশোধন প্রক্রিয়ার নামও। এই জীবন আচরণে গত ৪০ বছরে এসেছে অনেক পরিবর্তন। সমষ্টির পরিবর্তে ব্যক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রধান, ভাগ করার পরিবর্তে একা ভোগ করার বাসনাটি হয়ে উঠছে তীব্র। ফলে সংস্কৃতির সব প্রকাশের মধ্যে একটি উগ্র ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা যেন প্রবল হয়ে উঠছে।


সংস্কৃতি কি মানুষের বেঁচে থাকা এবং তার অধিকার ও সম্মানের কথা বলে এখন? অথবা সংস্কৃতি কি আগের মতো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরিতে উৎসাহ দেয় আমাদের? বহুজনের অন্তর্নিহিত শক্তি এখন দুর্বল হচ্ছে প্রচার ও আচার সর্বস্বতায়। এর পাশাপাশি ভোগবাদের ফলে সংস্কৃতিও এখন সংগ্রহযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। কয়েক বছর আগে এক চিত্রসংগ্রাহক আমাকে জানিয়েছিলেন, তার সংগ্রহে দুটি সুলতান ও তিনটি কিবরিয়া আছে। এই প্রবণতা সংস্কৃতির সামষ্টিক অঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানার সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়ার মতো। ভোগবাদের সমস্যা আরো আছে। যে পণ্যটি তাৎক্ষণিক তৃপ্তি জোগাতে ব্যর্থ হয় ওই চর্চা তা প্রত্যাখ্যান করে। সংস্কৃতির ভেতর শুধুই যে সুন্দর ও চিত্তগ্রাহী বিষয় থাকবে তা তো নয়। সংস্কৃতির ভেতর জীবনে কষ্ট, বঞ্চনা ও ক্ষোভের প্রকাশগুলোও তো থাকবে শান্তরসের পাশাপাশি বীভৎসরসের মতো। ভোগবাদের প্রকোপে তাহলে সংস্কৃতিকে কি আমরা শুধুই ইন্দ্রিয়মোহন এক বিনোদন চর্চায় রূপান্তরিত হতে দেবো? সংস্কৃতিতে অধিকার তো সবার এবং আমাদের দেশজ সংস্কৃতির সব প্রকাশের উৎস তো সেই ব্রাত্যজনের জীবন চর্চায় যারা পণ্যায়িত পৃথিবীতে চলে যাচ্ছেন আরো প্রান্তসীমায়। বস্তুত এখন ‘ব্রাত্যজনের সংস্কৃতি’ বলে সমষ্টির এক অভিন্ন উত্তরাধিকারে একটি বিভাজন রেখা টানা হচ্ছে যার একদিকে এলিট শ্রেণির সংস্কৃতি যা ‘উচ্চ সংস্কৃতি’ নামে সুবিধাপ্রাপ্ত, অন্যদিকে ওই ব্রাত্যজনের ‘অসংস্কৃতি’- ‘নিম্ন সংস্কৃতি’। এই বিভাজন রেখার একদিকে ক্ষমতা, অন্যদিকে ক্ষমতাহীনতা- এ দুই অবস্থানের দ্বন্দ্ব ক্ষমতাহীনের জন্য শোচনীয়। ‘উচ্চ সংস্কৃতি’র আবার ঝোঁক হচ্ছে পশ্চিম-আহ্লাদ, বিশ্বকেন্দ্রের সঙ্গে একটি সংযুক্তির অভিলাষ। এই সংযুক্তির একটি ধোঁকা তৈরি করছে দৃশ্য মাধ্যম। কম্পিউটারের বোতামে হাত রেখে বৈশ্বিক সাইবার সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাওয়ার বিভ্রম পশ্চিমের একটি ধোঁকা। কারণ যে প্রযুক্তির এক শতাংশ আমি তৈরি করিনি ওই প্রযুক্তি না বাজিয়ে প্রশ্নহীন গ্রহণ করার মধ্যে একটি বিপদ থেকে যায়। ওই বিপদটি নিজের মাটি-সময়-কাল ভুলে নিরালম্ব হয়ে যাওয়ার।


সংস্কৃতি নিয়ে আমার স্বপ্নে এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি দেখিÑ যে পুনরুত্থান মানুষকে তার শিকড় ও মাটিতে নিয়ে যাচ্ছে; সমষ্টির জীবনের ও ভালোবাসার কাছে। তার সামান্য চাওয়া-পাওয়া, সম্মান ও বিশ্বাসের
জায়গাটায় নিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্য মাধ্যম আমাদের উৎপাদন নয়। তবে আমরা এটিকে ব্যবহার করবো, প্রয়োজন হলে আত্মস্থ করবো। কিন্তু তা পশ্চিমের আরোপিত সূত্র মেনে নয়, বরং আমাদের চিরকালীন সৌন্দর্য, মূল্যবোধ ও ভালোবাসার সূত্র মেনে- এ রকম একটি প্রত্যাশা আমার আগামীকে নিয়ে। সংস্কৃতি নিয়ে আমার স্বপ্নের মূলে আমাদের প্রকৃতি, জনজীবন ও জনজীবনের দোলাচল। আমাদের নদীগুলো নিঃস্ব হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জীবন কেন নিঃস্ব হবেÑ যে জীবনে জলসিঞ্চন করতে পারে আমাদের সংস্কৃতির বহতা নদী? করেই যাচ্ছে, বস্তুত? আমার স্বপ্নে স্রোতস্বিনী, শক্তিমতী এই সংস্কৃতি নদী কলকল শব্দে বয়ে যায় আগামী থেকে আগামীর পথে।

 

মৃন্ময়ী 

সাহানা খানম শিমু

 

 

         কবিতার শেষ পংক্তিটা শেষ করে আপলোড দিতেই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে শোবার অভ্যাস করেছে কয়েক বছর হলো। টেবিল চেয়ারে বসে এখন আর লেখা হয় না,কষ্ট হয়,ব্যাক পেইনের কারনে। বয়স বাড়ছে,শরিরে এটা ওটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শোবার সময় সাইড টেবিলে পানি,জরুরী অসুধের ব্যাগ,চশমা,কলম,কাগজ,ছোট একটা টর্চ নিয়ে রাখে। মোবাইল থাকে আরও হাতের কাছে,বালিশের পাশে। ঘুমের  সমস্যার কারনে শোবার সময় ল্যাপটপে লেখালিখি করে,কখনও ফেসবুকে বসে,কখনওবা ইউ টিউবে গান শোনে টের পায় না,এভাবে এক সময় ঘুমািয়ে পরে। ঘুমের জন্য শুয়ে দেখেছে,এপাশ ওপাশ করতে করতে রাত প্রায় অর্ধেক পাড় করে দেয়,তবুও ঘুম ধারে কাছে আসে না। ছেলে মেয়ে দুটো বিদেশে চলে যাবার পর থেকে ঘুমের সমস্যা শুরু হয়েছে, সেই সাথে একাকিত্বটা খুব পেয়ে বসেছিল।  কিন্তু তমশা একাকিত্বের কাছে হার মানেনি,সঙ্গি করে নিয়েছে লেখালিখি। ধুলো জমেছিল কবির কল্পনায়,কবিতা তৈরির মালমশল্লায়। ভালোবাসার গভীর হাত দুটো দিয়ে প্রায় দু'যুগের ধুলো ময়লা,পোকা মাকরের ঘর বসতি সরিয়ে  নিজের ভেতরে আবার জায়গা করে দিয়েছে কবিতাকে। গড়ে তুলেছে কবিতার প্রিয় প্রাঙ্গন। 

 

     ইদানীং মাঝে মাঝে এমন হচ্ছে,গভীর মনোনিবেশ করে কোন কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াতে গেলে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। প্রেসার বাড়ল কি? নাকি অন্য কোন সমস্যা ! দেখি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তমাল,তানি প্রায় প্রতিদিনই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বলে। আজ যাই,কাল যাই করে যাওয়া হয়ে উঠছে না। কাল সকাল হোক,অবশ্য অবশ্যই যাব,পুরো শরিরটা চেক আপ করাব,আর আলসেমি নয়,আপন মনে বলছে তমশা। 

 

     কবিতাটি কম্পোজ করাই ছিল,সপ্তাহ খানেক আগে লিখেছিল,এখন কিছু ঘসামাজা করে ফাইনাল টাচ দিয়ে ফেসবুকে আপলোড করল। কবিতা লেখার সময় কবি রুশো রায়হানের কিছু কথা অনুসরণ করে চলে তমশা। যেমন - তিনি বলছিলেন কবিতা লিখেই ছাপতে দেবে না,রেখে দেবে,ছোঁবে না। কবিতাকে জাঁক দেবে। কয়েকদিন পর যখন বের করবে দেখবে কবিতাটি কেমন মাখনের মতো কোমল কোমনীয় হয়ে উঠেছে। তখন কাটতে,ছাটতে আরাম হবে,কবিতাকে তার পরিপূর্ন রূপ দিতে সহজ হবে। আরেকদিন বলছিলেন  -খেয়াল রাখবে,কবিতার গায়ে যেন বাড়তি মেদ না জমে। কবিতা হবে মেদহীন সৌন্দর্যের আধার। 

 

     মাথার পেছনটা শিরশির করছে,মাথাটা সোঁজা করে রাখতে কষ্ট হচ্ছে,হাত দুটো অবশ লাগছে। এরকম খারাপ তো আগে কখনও লাগেনি,মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এতদিন কি জানান দিচ্ছিল -তমশা সাবধান হও। কিন্তু তমশা গায়ে মাখেনি,ভেবেছে কিছু না। 

 

    সিনঙ্গেল মা তমশা,অনেক প্রতিকুলতা,ঘাত প্রতিঘাত সয়ে বাচ্চা দুটোকে বড করেছে। ছেলে মেয়েদেরকে মানুষ করেতে যেয়ে অনেক কঠিন হতে হয়েছে। ব্যক্তি তমশা এত কঠিন স্বভাবের ছিল না। বাস্তবতা ওঁকে কঠিন করেছে। রিপন যখন ছেড়ে গেলো তখন তমালের বয়স পাঁচ আর তানি মাত্র দুই। কঠিন না হলে সিনঙ্গেল মায়ের পক্ষে জীবন চালানো সম্ভব হতো না। রিপনের সাথে সংসারের শুরুটা মধুরই ছিল। বিয়ের বেশ 'বছর পর যখন তমশা চাকরির সোপান গুলো মসৃন ভাবে অতিক্রম করছিল তখন থেকে গোলযোগটা শুরু,তবে শুরু আর শেষের ব্যবধান খুব কম। দ্রুত অতি দ্রুত বদলে গেলো রিপন এবং রিপনের ভালোবাসার মন্ত্রমুগ্ধতা। মেয়েদের স্বাধীনতায় অবিশ্বাসী ছিল না প্রেমের সময়গুলোতে। পরে তমশার মনে হয়েছে প্রেমের সময়টাতে মেয়েদের স্বাধীনতার পক্ষে থাকার সুবিধা বেশি। রিপনের সুবিধাবাদীতার ভুরি ভুরি উদাহরণ দাড্ করাতে একটুও কষ্ট হবে না তমশার। তবুও উকিলের সামনে শুধু এটুকুই বলেছে - এক ছাদের নিচে বিছানা ভাগাভাগি করে চলা আর সম্ভব নয়। তমশার এগিয়ে যাওয়ার বিরোধিতাই ছিল সম্পর্কের চিঁড ধরানোর মূল কারন। যদিও কখনই রিপন স্বীকার করেনি তমশার চাকরিতে ওর সমস্যা। রিপনের কথা হলো চাকরির সুবাদে পুরুষের সাথে বেপরোয়া মেলামেশায়। আজ পর্যায় এসেও খুব হাসি পায় তমশার,যদি সমস্যা নাই থাকত তা হলে ছাডাছাডির ছয় মাসের মধ্যে একজন অল্প বয়সি মেয়েকে ঘরের বৌ করে তুলতে তোমার রুচিতে বাঁধল না ? সে মেয়ে সত্যিকার অর্থে শুধুই ঘরের বৌ। রিপন একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ তোমার বৌ হোক এটা তুমি কখনই চাইতে না। তোমার ইচ্ছে মতো চলবে,হাসবে,খেলবে। তোমার কথা শুনবে এরকম একটা মেয়ে মানুষকে তোমার বৌ রূপে তুমি চেয়েছিলে। তবে আমার সাথে সম্পর্কে কেন জড়ালে  ? আসলে তোমার মানষিক বৃদ্ধি কখনই গডপডতার উপরে ছিল না। 

 

     তমশা আর মাথা সোঁজা করে রাখতে পারছে না। সব কিছু ঝাপসা লাগছে। হাত পা অবস হয়ে আসছে,খুব দুর্বল লাগছে। সারা শরির জুড়ে কি যেন বয়ে যাচ্ছে। কি হল আমার ? অনেক কষ্টে সময় দেখল রাত দেড়টা। আমার যে খারাপ লাগছে কাউকে বলা দরকার,এতো রাতে কার ঘুম নষ্ট করব? মোবাইলটা হাতে নিল, বড আপা আর মেঝ ভাই ঢাকায় থাকেন,একজন উত্তরা অন্যজন মিরপুর। আর সব ভাই বোন তো বিদেশে পাডি জমিয়েছে। এতো রাতে উনাদের ঘুম ভাঙাবো? হয়তো তেমন কিছু না। কষ্ট করে এতো দুর কলাবাগান আসতে হবে। তাছাড়া ড্রাইভার ডাকাডাকি করে না পেলে শুধু শুধু টেনশন বাড়বে আর কিছু না। তার চাইতে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীকে ডাকব ? নাকি আর একটু দেখব। খাটের পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কতকটুকু পানি খেলো। একটু মনে হয় ভালো লাগছে ! দেখি আরেকটু। 

 

    রিপনের সাথে সম্পর্ক শেষ হবার পর ভয় ছিল মনে,যদি ছেলেমেয়ে দুটোকে তমশার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। পারবে বুকের মানিক দুটোকে ছেড়ে থাকতে? না,কখনই বাচ্চাদুটোকে ছাড়বে না,কিছুতেই ছাড়বে না। যত রকম আইনী লড়াই আছে করবে তবুও ছাড়বে না। না,লড়াই যুদ্ধ কিছুই করতে হয়নি,রিপন বাচ্চাদের দ্বায়িত নিতে চায়নি। শুধু কিছু অর্থ দিয়ে দায় মুক্ত হতে চেয়েছিল। ফিরিয়ে দিয়েছে তমশা একটা ফুটো কডিও নেয়নি। নিজে খেয়ে না খেয়ে বাচ্চাদের বড করেছে। বাচ্চাদের বড করতে করতে হঠাৎ ভয় ঘিরে ধরে,তবে এবার ভয়ের কারন রিপন নয়,নিজের আত্মজকে নিয়ে ভয়। তমশার পরিচিত একজন সিনঙ্গেল মায়ের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা  তমশাকে ভাবিয়ে তোলে। একা  মা অনেক কষ্ট করে তার  দুই ছেলেকে বড করে তুলছিল। ছেলে দুটোর কাছে আমেরিকা প্রবাসী বাবার ইমিগ্রেশনের টোপ,ত্যাগী মায়ের ভালোবাসার চাইতে বেশি দামি মনে হয়েছিল।  ছেলে দুটো এখন মায়ের সাথে সম্পর্ক শেষ করে আমেরিকায় বাবার কাছে চলে গেছে। মা তাকে ছেড়ে যেতে না করেছিল,এই তার অপরাধ। মা কেঁদে কেটে বুক ভাসায়,দেখার কেউ নেই। এদিক দিয়ে তমশা নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করে, তমাল, তানি মাকে ভালো বুঝতে পারে। মায়ের কষ্টের জায়গা গুলো ওদের অপরিচিত নয়। এটুকুতেই তমশার স্বস্তি। আরও খারাপ কিছুও তো হতে পারত। তমশার ছেলে মেয়েরা মায়ের খোঁজ খবর রাখে। প্রতিদিন ওরা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ঘুমানোর আগে মায়ের সাথে কথা বলে। তমশাও সকাল দশটার মধ্যে ছুটা বুয়া বিদায় করে ওদের ফোনের অপেক্ষার থাকে। কথা হয়,কখনও কখনও ভিডিও অন করে নাতি নাতনিদেরকে দেখায়। তমাল তানি ছুটি ছাটা পেলে দেশে আসে মাকে দেখতে,তাই বা কম কি। 

 

     তমশা তো ভালোই ছিল,হঠাৎ কি যে হল আজ বুকে কেমন চাপ অনুভব করছে,গ্যাস হলো কি ! পেটে গ্যাস হবার মতো আজ কি খেয়েছে ? কিছুতেই মনে করতে পারছে না, হ্যা মনে পড়েছে,দুপুরে ডাল ভাতের সাথে জলপাইয়ের আচার খেয়েছিল। একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখবে,ভাবছে তমশা। অসুধের ব্যাগটা কাছে নিল,একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখি,ভালো লাগতে পারে। 

 

    তমাল তানি কতবার বলেছে ওদের কাছে কানাডায় যেয়ে থাকতে। এমনকি তমাল কয়েকবার তমশাকে নিতেও এসেছিল,তমশা যেতে রাজি হয়নি,তমালকে একাই ফিরে যেতে হয়েছে। কেন যেন দেশ ছেড়ে যেতে একটুও ইচ্ছে করে না। ছেলে মেয়ে দুটো এতো চাইছে তবুও তমশার মন সায় দেয়নি। আসলে এই বয়সে এসে নিজের গন্ডি ছেড়ে নিজের পরিবেশ ছেড়ে যেতে পারেনি। তমশা জানে ওর মধ্যে  কিছু কিছু একগুয়েমি আছে,কিছুটা একরোখা ভাবও আছে। মেঝ চাচার কথাটা কানে বাজে এখনও 

     '  তমশা জিদ করিস না,এতো একরোখা মেয়ে আমি আর দেখিনি,ফিরে যা স্বামীর কাছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এমন হয়েই থাকে,রাগের মাথায় জামাই বাবাজী....' 

    বাবাহীন সংসারে মেঝ চাচার তত্বাবধানে থাকলেও তার কথা মতো আর ফিরে যায়নি রিপনের সংসারে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে নিজের ভেতর বাইরে গুছিয়ে নিয়ে আলাদা থাকা শুরু করেছে ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে। তমশার খুব জানতে ইচ্ছে করে,রিপন তুমি আমার নামে মিথ্যে অপবাদ কেন দিলে? তুমি ভালো করেই জানতে আমি কোন সম্পর্কে জড়াই নাই,জড়ালে তো তাকে নিয়েই সংসার করতাম। তুমি সত্য কথাটা কেন বলো নাই? তোমার চেয়ে আমার এগিয়ে যাওয়াটা তোমার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। রিপনের চেয়ে  তমশার চাকরিটা ভালো ছিল,এটা কিছুতেই মানতে পারছিল না রিপন। যদিও দুজনে সহপাঠী ছিল। নিজ যোগ্যতায় চাকরিটা পেয়েছিলো তমশা। প্রথম দিকে প্রতিদিন কথা কাটাকাটি,বিষয়টা ছিল তমশার চাকরি। কথা কাটাকাটি ঝগড়ায় রূপ নিতে বেশি সময় লাগেনি। তারই এক পর্যায় রিপনের হাত উঠে এলো তমশার গায়ে,এরপর আর এক মুহূর্ত্য দেরি করে নি। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চলে এসেছিল মায়ের কাছে। 

 

      আর মাথাটাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঘাড়ের পেছনে শির শির করছে। বুকের বা পাশের ব্যাথাটা বুক জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দম নিতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন? বাতাসে কি অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছে? আমি কেন অক্সিজেন টানতে পারছি না। আমার কি হল? তবে কি আমি মরে যাচ্ছি? আমার আয়ু শেষ হয়ে আসছে? শেষ নিশ্বাসটা শুধু বাকি? তমশার মাথাটা কাত হয়ে পরে গেলো বিছানায়,মুখটা খানিক বিস্ফারিত হয়ে আছে, বাতাসের অক্সিজেন টেনে নেবার ব্যাকুলতায়। একটা হাত বিছানা থেকে ঝুলে পড়েছে। অন্য হাতটা মুঠোবন্ধ। 

দেখে মনে হচ্ছে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। 

 

    জীবন আর  মৃত্যুর বসবাস,এতো কাছাকাছি! কয়েকটা মুহূর্ত্য মাত্র,একটা মানুষ ইহলৌকিক জগত থেকে অন্য আরেক জগতে প্রবেশ করল। যে জগত থেকে আর ফিরে আসা যায় না। তার সব,সব কাছের মানুষ গুলো,প্রিয় জিনিস গুলো যেমনিভাবে ছিল তেমনি পরে রইল। রাত কতো হবে! তিনটা সারে তিনটা। নিসার দেহ পড়ে আছে বিছানায়,পাসে ল্যাপটপ খোলা পড়ে রযেছে। ফেসবুকের পাতায় সদ্য ভুমিষ্ঠ কবিতাটা যেন খল বল করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাশে জন্মদাত্রী জন্ম দানের বেদনায় নীল হয়ে পড়ে আছে। 

 

    চারিদিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে,কয়েকটা মাছি তমশার মুখে এবং শরিরের খোলা অংশে এসে বসছে এবং উড়ছে। নিস্তব্ধ,নিঝুম,নিরব চারপাশ,খানিক পর পর  ব্লুপ ব্লুপ শব্দে ফেসবুকের  পাতায় কবিতাটিতে ক্রমাগত লাইক আর কমেন্টস পড়ছে। 

 

অদৃশ্য কাঠগড়ায়
দাঁড়ানো মানুষটি

জাকির তালুকদার

 

তার দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দিতে জমায়েত হওয়া মানুষের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। কিন্তু দেখছিল না কিছুই। সে দেখছিল কেবল নিজের ভেতরের মানুষকে। একনাগাড়ে কথা বলছিল নিজের সঙ্গেই- আমি তো কখনো প্রেমিকাদের ছাড়া অন্য কোনো নারীকে স্পর্শ করিনি! কোনো নারীকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার শরীর ও অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করিনি। যখন কাউকে আর ভালোবাসতে পারছিলাম না তখন তো ভালোবাসার অভিনয় চালিয়ে যাইনি। তাকে অপদস্থকারীর দল চিৎকার করে গালি দিচ্ছিল- তুমি নারী নির্যাতনকারী! তোমার বিচার হবে।  নারী নির্যাতনকারী! এমন অভিযোগ তার নামে কীভাবে উত্থাপন করে লোকে? সে কাউকে মানসিক নির্যাতনও করতে চায়নি কখনো- শারীরিক নির্যাতন তো দূরের কথা। কোনো মেয়ে যে মুহূর্তে খুব দুর্বলভাবে হলেও ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে সে ওই শব্দটিকে মর্যাদা দিয়েছে। সে একবার সামনের লোকজনকে উদ্দেশ করে বলতে চায়- তোমরা কি কোনো নারীর কাছে, কোনো যুবতীর কাছে আমার এই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে চাও? কোনো যুবতী যদি এমন ঘটনার পক্ষে আমার হয়ে সাক্ষ্য দিতে চায় তাহলে সেটি কি তোমরা বিশ্বাস করবে?


বলতে ইচ্ছা করলেও সে কিছুই বলে না। কারণ জানে যে, সামনের জমায়েতের কেউ কোনো যুবতীর মুখ থেকে অভিযুক্তের পক্ষে এমন বয়ান শুনলেও তা বিশ্বাস করবে না। কেননা তারা নিজেরা কোনোদিনও তার পরিস্থিতিতে মৃদু ‘না’ শব্দটিকে এতোটা গুরুত্ব দিতে পারবে না। তবে সে নিজে এই পরিস্থিতিতেও চার বছর আগেকার ঘটনাটি চোখের সামনে দেখতে পেতে থাকে।

মেয়েটির নাম তো সে কখনোই উচ্চারণ করবে না। নিজের কাছেও নয়। আগে থেকেই সময় ঠিক করা ছিল। সে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিল। মেয়েটাও ইউনিভার্সিটি থেকে। মেয়েটি বলেছিল, আজ আমি আমার দেবতাকে আমার পূজার নৈবেদ্য নিবেদন করবো! উত্তরে সে বলেছিল, আমি দেবতা নই অথবা ভুল দেবতা। নৈবেদ্য উৎসর্গের পর তোমার অনুশোচনা হতে পারে। মেয়েটি বলেছিল, মানুষ চিনতে ভুল হতে পারে। কিন্তু দেবতা চিনতে ভুল হয় না। তুমি আমাকে গ্রহণ করো! আমাকে ধন্য করো! আমাকে পূর্ণ করো! তারপর পাপড়ির মতো মেলে দিতে শুরু করেছিল নিজেকে। ওই সাদামাটা সাবলেট রুমটা তখন প্রতিমুহূর্তে পরিণত হয়ে হচ্ছিল প্রেমমন্দিরে। পূজারিণী একবার হচ্ছিল বনলতা সেন, একবার হচ্ছিল হেলেন। সে কাক্সিক্ষত পুরুষের সামনে একের পর এক উন্মোচন করে চলেছিল বাৎসায়নের শৃঙ্গার অধ্যায়।

মিলন অধ্যায়ে প্রবেশের আগে সে যুবতীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মিথুন মুদ্রা- কোনটি তোমার ভালো লাগবে? তোমার যা যা ভালো লাগবে, আমারও তা-ই চাই। সব চাই! সব রকম চাই! তুমি তো অভিজ্ঞ দেবতা। আমাকে বাজাও!
তাদের পৌরুষ আর নারীত্ব আবৃত করে তখন জলপাইয়ের পাতাও ছিল না। তাদের শরীরের ভেতরে ও বাইরে তখন লাভা স্রোত। তারা অপেক্ষমাণ শয্যায় চলে গিয়েছিল। মেয়েটি শৃঙ্গারে সিক্ত হতে হতে বার বার বলছিল, আরো! আরো!
সেও তখন চূড়ান্তযাত্রার জন্য প্রস্তুত। মেয়েটির হাতের মধ্যে তার উত্থিত পৌরুষ। নিচে আর ওপরে দুই শরীর এক হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময়ে মেয়েটি বলে উঠলো, না! প্রথমে সে এই ‘না’ শব্দটির তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারেনি। তাই জিজ্ঞাসা করেছিল, কী ‘না’? আর দেরি করা যাবে না? এখনই প্রবেশ করবো? মেয়েটি খুব মৃদুস্বরে বলেছিল, আমার খুব ভয় করছে। না করলে হয় না গো? আজ না করলে হয় না? এখন না করলে হয় না?
সে তৎক্ষণাৎ নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল মেয়েটির ওপর থেকে। বলেছিল, অবশ্যই।


তারপর পরম যতেœ মেয়েটিকে শয্যা থেকে উঠে বসতে সাহায্য করেছিল। মেঝেতে স্তূপাকার বস্ত্রখ-গুলো এগিয়ে দিয়ে বলেছিলম তোমার কাপড় পরে নাও। মেয়েটির তখন কাপড় পরতেও যেন দ্বিধা। কী করবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু তার তখন কোনো দ্বিধা ছিল না। কারণ ‘না’ শব্দটি সে পরিপূর্ণভাবে শুনতে পেয়েছিল।  মেয়েটি রিকশায় উঠে রওনা হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেলফোনে পাঠিয়েছিল আর্তধ্বনি- এতোটা ভালো হতে তোমাকে কে বলেছিল! ভালো! না তো! সে তো ভালো হওয়ার জন্য নিজেকে সংবরণ করেনি। কেন করেছে তা যুবতী বোধহয় বুঝতে পারবে না। অন্য ক’জনই বা বুঝবে! তার বিচার করতে আসা এই জমায়েতেরও কেউ বুঝবে না। কারণ তাদের আছে কেবল তার প্রতি জিঘাংসা। তাকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারলে তারা নিজেদের চোখে নিজেরাই ‘হিরো’ হয়ে উঠতে পারবে। সেটিই হবে তাদের কুয়ো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 
জমায়েত তাকে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি নারী নির্যাতনকারী! এ কথা স্বীকার করলে আমরা তোমার শাস্তির মাত্রা কমিয়ে দেবো। সে তাদের দিকে করুণার চোখে তাকায়। তারা তো আর জানে না যে, সে নিজেকে আত্মসমালোচনার জগতে সমর্পণ করে রেখেছে অনেক সময় আগে থেকে। জীবনের সব নারীসঙ্গ স্মৃতি আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে দেখছে নিজের অজান্তেও কোনো নারীকে কোনো ধরনের নির্যাতন করেছে কি না। জমায়েত দাবি করছে, এক যুবতী তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে। ৩০ বছর যার বয়স সে তো যুবতীই বটে। যুবতীকে তুমি চেনো? ব্যারিস্টারি ধরনের প্রশ্ন। চিনবো না কেন! খুব ভালো করে চিনি। তার ওপর তুমি নির্যাতন চালাচ্ছ!
এ যে দেখছি একেবারে রায় দিয়ে দিচ্ছে! অবশ্য রায় দেয়ার এখতিয়ার লোকটার আছে কি না তা নিয়েও ভাবে না সে। তার মন-মস্তিষ্ক দখল করে আছে ‘নারী নির্যাতন’ শব্দটি।  যে কি না কোনোদিন স্নেহ দেখানোর ছলেও কোনো মেয়েকে স্পর্শ করার সুযোগ নেয়নি সে করেছে নারী নির্যাতন! কোথাও কি একটা বড়সড় ভুল থেকে গেছে তার জীবনের কোনো বাঁকে?


শ্যালিকাদের সঙ্গে মানুষ ঠারে-ঠোরে ইঙ্গিতময় ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে। নাক টেপে, গাল টেপে, সুযোগমতো বেশি কিছুও। সমাজ ও পরিবারে সেগুলোকে সহাস্য বৈধতা দেয়া আছে। কিন্তু সে তো তেমন কিছুও কোনোদিন করেনি!
আবার সন্তও সে নয়। নিজেকে আসলে কোনোদিন ওইভাবে ভাবাই হয়নি।  তার বিচারের আয়োজন করা যুবতীর কথা ভাবে সে।  মেয়েটি তাকে বলেছিল, আমাদের পরিবার এই ছোট্ট শহরে খুব ঘৃণিত। আমাদের পুরুষরা সবাই মদ্যপ, লম্পট ও অকর্মণ্য। তাই আমাদের বাড়ির মেয়েদের বাধ্য হয়ে নিজের জন্য এবং পরিবারের জন্য অনেক কিছুই করতে হয়। নিজের গতি নিজেরই করতে হয়। তাদের সবারই জীবন প্রশ্নবিদ্ধ, কণ্টকিত এবং মহল্লায় মুখরোচক আলোচনার খোরাক। আমি ওই পথে যেতে চাই না। আমাকে সাহায্য করুন। সরাসরি এভাবে কথা বলাটা ভালো লেগেছিল তার। তবে কারো জন্য কিছু করার মতো ক্ষমতাশালী ও ধনাঢ্যও সে নয়। তবু করতে পেরেছিল। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার পদে নিয়োগ পেতেও লাখ লাখ টাকা লাগে। তবু সে বিনা পয়সায় সেটি করে দিতে পেরেছিল।  তারপর যুবতী এসেছিল ঋণ শোধ নয়, ঋণ স্বীকার করতে। তেমন লোভ জাগানিয়া শরীর-সৌন্দর্য নয়। তবু শরীর ছাড়া মেয়েটির দেয়ার যে আর কিছুই নেই! সে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, আমি বেশ্যাগমন করি না। করিনি কখনো।

মেয়েটির চোখে পানি- আমাকে বেশ্যা বললেন! না। তোমাকে বেশ্যা বলিনি। তবে নিজেকে বেশ্যাগামী বলার কথা বলেছি। কোনো কিছুর বিনিময়ে নারীর শরীর ভোগ করা মানেই তো আমার বেশ্যাগমন করা। যুবতী প্রথমে বুঝতে পারেনি এ কথার অর্থ। খুব কমজনেই পারে।  সে তখন খোলাসা করে বলেছিল, আমার কাছে টাকা-উপহারের বিনিময়ে কোনো নারীদেহ ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা।  অধীনস্থ কোনো নারীকে মুখে পদ-পদবি-প্রমোশন-অফিসে বাড়তি সুবিধার কথা না বলেও ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা।  সামাজিক নিরাপত্তা বা অন্য কোনো সুরক্ষাদানের বিনিময়ে কৃতজ্ঞতার শরীর গ্রহণ মানে বেশ্যাগমন করা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর দেয়ার কথা বলে কোনো ছাত্রীর সঙ্গে যৌনতা মানে বেশ্যাগমন করা।  কারো মুগ্ধতার সুযোগ নিয়ে তাকে ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা। সোজা কথা প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া যে কোনো নারীর সঙ্গে শোয়া মানে বেশ্যাগমন করা। সে তো কোনোদিন এই ধরনের কিছু করেনি। অথচ তাকে তারা নারী নির্যাতক বলছে কেন? সে তখন চরম বিভ্রান্ত। জমায়েত তার দিকে আঙুল তুলেছে যে মেয়েটির করা অভিযোগে- সে তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, আমি কি তোমার ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন চালিয়েছি?  মেয়েটি চোখ নামিয়ে নেয়।  সে কণ্ঠস্বর তীব্র ও তীক্ষè করে মেয়েটিকে বলে, তুমি নিজে শুধু একবার বলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো। নইলে আমিই তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবো।
মেয়েটি কোনো কথা বলে না, বরং হঠাৎ করেই জমায়েত থেকে সরে যেতে থাকে। পেছন ফিরে হাঁটতে থাকে। জমায়েত তখন ভগ্ন উৎসাহ। তবু ব্যারিস্টার হাল ছাড়তে চায় না। বলে, আমি তোমাকে দেখে নেবো!  সে নির্বিকার।
 
জমায়েত ভেঙে যায়।  তার এখন নির্ভার লাগার কথা। কিন্তু তা ঘটে না। নিজেকে নির্দোষ জেনে আত্মপ্রসাদ লাভ করার কথা। কিন্তু কোনো স্বস্তির অনুভূতি আসে না।  সে বরং নিজের অতীত তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। কোথাও কি রয়ে গেছে তার দ্বারা নারী নির্যাতনের কোনো ঘটনা কিংবা গোপন কোনো ইচ্ছা? বাইরের কোলাহল থেমে গেছে। তাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে আসা লোকজন ফিরে গেছে বিফল মনোরথ হয়ে। কিন্তু সে নিজের কাছে নিজের উত্তর খুঁজতেই থাকবে।
তার সামনে অপেক্ষা করছে অনেক প্রহরের আত্মনিগ্রহ।

লেখকের স্বাধীনতাই
তার লেখকসত্তা

হাসান আজিজুল হক

 

১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয়ে যায় তখন আমার বয়স বেশ কম। অনেকের ধারণা, আমি ওই বাংলা থেকে এই বাংলা এসেছি নিশ্চয় কোনো চাপের মুখে। কথাটি একেবারেই ঠিক নয়। আমি কোনো চাপের সম্মুখীন হইনি।
গ্রাম থেকেই স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন দিয়েছি ১৯৫৪ সালে। তখন আর ম্যাট্রিকুলেশন বলা হতো না। ১৯৫৪ সাল থেকেই পরীক্ষার নাম হয়ে ছিল স্কুল ফাইনাল। সচ্ছল হলেও আমাদের গ্রামের একটা খ্যাতি ছিল। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কাশিমবাজারের মহরাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী। আমাদের গ্রাম ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। গরিব ঘরের মেয়ে কাশীশ্বরী দেবীকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ওই যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে পাস করেছি। চাপের মুখেই যদি দেশ ছাড়তাম তাহলে ১৯৪৭ সালেই ছাড়তাম। তা না করে আমি সাত বছর ওই পশ্চিমবঙ্গেই ছিলাম। এ থেকে একটা কথা স্পষ্ট, সাম্প্রদায়িকতা নগ্ন চেহারা আমার আশপাশে দেখিনি। সব জায়গাতেই সাম্প্রদায়িকতা শুরু করে চিহ্নিত কতিপয় সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। তারা কখনো স্বার্থ, কখনো হিং¯্রতা থেকে কাজটি করে। এটি এই বাংলাতে দেখেছি, ওপার বাংলাতেও দেখেছি।

১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একদিনেই কয়েক লাখ লোক মারা গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একেবারে পশ্চিম সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় আমরা ওই দাঙ্গার বিষয়টি তেমন টের পাইনি। নির্বিঘেœই ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করেছি। যাহোক, স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন পাস করার পর হয়তো ওখানেই অর্থাৎ বর্ধমানে রাজ কলেজে ভর্তি হতাম। কিন্তু পাস করার পর বিশেষ কারণে এ দেশে এসেছিলাম। বিশেষ কারণ বলতে, আমার ভগ্নিপতি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজে এবং তারপর কিছুদিনের মধ্যেই দৌলতপুর বিএল

(ব্রজলাল) কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত হন। আমার একমাত্র বড় বোন ও ভগ্নিপতির ইচ্ছা হলো, আমি যেন বিএল কলেজেই ভর্তি হই। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। আমি খুলনার দৌলতপুর এসে বিএল কলেজে ভর্তি হয়ে যাই, থাকি বোনের বাড়িতে। কলেজ জীবনে বহু স্মৃতি আছে। কতো স্মৃতির কথা আর বলবো! তখন থেকেই আমার লেখালিখি শুরু। এক বন্ধু জোটানো গেল। ওই বন্ধুর চার আনা আর অনেক কষ্টে জোগাড় করা আমার চার আনাÑ এই আট আনা দিয়ে আমরা কাগজ-কালি কিনতাম। ওই সময়টা দেয়াল পত্রিকার খুব চল ছিল। দেয়ালের গায়ে হাতে লেখা পত্রিকা, গল্প, কবিতা বোর্ডের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। সেখানে পাঠকরা পড়ে পাশে মন্তব্য লিখে যেতেন।
পত্রিকা এক সপ্তাহ পর পর পরিবর্তন করা হতো। আমি আর আমার বন্ধু বিমল মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। একটু একটু গল্প লিখতাম, কোথাও থেকে কবিতা জোগাড় করতাম। এই মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। ওই দেয়াল পত্রিকা থেকেই আমার সাহিত্যকর্ম শুরু। ওখানে দেখেছিলাম, আমাদের প্রিন্সিপাল এএফ ফজলুর রহমান লিখেছিলেন, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই ক্লাস টুডে’। তখন এক ছেলে এসে ক্লাসের ‘সি’টা মুছে দেয়। এর মানে দাঁড়ায় ‘ল্যাস’, মানে বালিকাদের। খুবই  খারাপ কথা।  যখন প্রিন্সিপাল এসে দেখলেন ছাত্ররা মজা করেছে তখন তিনি ‘এল’টাও মুছে দিলেন। তখন মানেটা দাঁড়ালো, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই অ্যাস টুডে’। ফলে ছাত্ররা সব গাধা হয়ে গেল। এমন অনেক মজার মজার স্মৃতি রয়েছে। কলেজ ছাত্ররা রাজনীতি করতো দেশের প্রয়োজনেই। কোনো পিটাপিটি-মারামারি, ভাগ বসানোÑ এসবের ব্যাপার ছিল না। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কেউ রাজনীতি করতো না। সম্পূর্ণ আদর্শভিত্তিক রাজনীতি। আমিও এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের সম্ভবত

দ্বিতীয় কমিটিরই সক্রিয় সদস্য ছিলাম। এরপরই গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করা লাজুক ছেলেটি অল্প সময়ের মধ্যে যথেষ্ট রকমের কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। আমাদের কাছে তখন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রধান নেতা ছিলেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতাম, পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণভাবে শোষণ করার জন্যই ডিভিশনটি ওয়েলকাম করেছিল। তারা তখন মনে করেছিল, এটি হলে আর কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। কলকাতা আর পূর্ব বাংলা একসঙ্গে থাকলে সেখানে অনেক অসুবিধা। তখন আমাদের সাহিত্য তো তেমন হয়ে ওঠেনি। যে ক’জন বড় বড় লেখক ছিলেন তারা কলকাতাতেই চাকরি করতেন। আহসান হাবীব, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ও সরদার জয়েন উদ্দীন। তাদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ দেশ-বিদেশ  ঘুরে বেড়াতেন। সরদার জয়েন উদ্দীনও কলকাতাতেই চাকরি করতেন। তখন একমাত্র আবু ইসহাককেই আমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলতাম। তার ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ উপন্যাসটিই আমরা গৌরবের বলে মাথায় রাখতাম। আমার ওপার বাংলার সাহিত্য নিয়ে বেশি পড়াশোনার কারণ ছিল, সেখানেই আমার প্রথম শিক্ষা জীবন পার করেছি। স্কুলের লাইব্রেরি ছিল। সেখানেই প্রচুর পড়াশোনা হয়ে গেছে। শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র পড়া হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ প্রমুখ ওখানেই শেষ করি।
১৯৫৭ সালে একটি উপন্যাস ‘শামুক’ লিখেছিলাম। সেটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় দিয়েছিলাম। তা এতোকাল চাপা পড়ে ছিল। এখানে খুব বই সংগ্রাহক খোন্দকার সিরাজুল হক একদিন আমাকে দেখান, আমি যে উপন্যাসটি জমা দিয়েছিলাম সেটি তার কাছে আছে। ব্যস, ওই শুরু। তিনি আমার পেছনে লেগে গেলেন বই আকারে প্রকাশ করার জন্য। অবশেষে ২০১৫ সালের বই মেলায় তা প্রকাশ করা  হয়। বইটি বের করে কথা প্রকাশনী।
১৯৫৭ সালে লেখালেখিটা একটু করে চলছিল। ১৯৫৮ সালে যখন বাধ্যতামূলক টিসি নিয়ে আসি তখন আমার অসম্ভব দৈন্যদশা। বাবা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। আমার বড় ভাই খুব ছোট চাকরি করেও দশটি করে টাকা ও অনার্সের একটি করে বই পাঠাতেন। তখন অধ্যাপক আবদুল হাই আমাকে খুব ¯েœহ করে রাজশাহী কলেজের নিরিবিলি একটা সার্ভেন্ট কোয়ার্টার দিলেন। একই সঙ্গে সব সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন।


আত্মীয়স্বজন কেউ নেই, বড় ভাইও ঢাকায় থাকেন। তখন একা আমি। অনেক লড়াই করেছি। কিন্তু কখনো ভয়ে ভীত হইনি। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি।  যারা সবচেয়ে অগ্রসর তাদের সঙ্গেই থেকেছি। প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে ভয়ও পাইনি। আমার কাছে পঞ্চাশের দশকের স্মৃতিটা এক অর্থে বলতে হলে মানুষের পেশিশক্তি পাকিয়ে ওঠার মতো। আমার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনচিন্তার বিকাশ ঘটছে। এর প্রভাব আমার পরবর্তী সাহিত্য জীবনে এসে পড়েছে। তাই আমার সাহিত্যকর্মে যতো মর্মান্তিক বিষয়ই থাকুক না, কখনো কোনো ভেজা চোখ দেখা যাবে না, কখনো কোনো দুর্বলতার প্রশ্রয় পাওয়া যাবে না, রোমান্টিক ভাবালুতা মিলবে না।
১৯৬০ সালের মার্চে রাজশাহী শহরের মিয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে কাঠের তকতায় বুকে তুলার বালিশ দিয়ে ‘শকুন’ গল্পটি লেখা হয়েছিল। ১৯৬০ সালে ‘শকুন’ লেখার পরই মোটামুটি ঠিক করি, লেখালেখিটাই আমার মুখ্য। এখানেই থাকবো। এর পাশাপাশি অধ্যাপনা করবো। কারণ সেখানে আমার স্বাধীনতা কেউ হরণ করতে পারবে না। অন্য কোনো পেশায় তা সম্ভব নয়। তাই সিএসএস পরীক্ষা দেয়া বা অন্য কোনো বড় চাকরির ব্যাপারে চেষ্টাই করিনি, একদম করিনি। শিক্ষকতাই করবো বলে স্থির করি এবং তা-ই করেছি। লেখালেখির জীবনটা বেছে নিয়ে এর মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছি।

বর্ষা রানীর ঈদ

 

 



পৃথিবীজুড়ে সৃষ্টির উৎসব বৃষ্টিতেই। আর এই বৃষ্টি বর্ষার কন্যা। বর্ষা রানীর সব উপাদান দিয়েই সাজানো আমাদের এই জগৎ। কী জমিনে, কী অন্তরীক্ষে রানীর আগমনে বদলে যায় সব, নদী-খাল-বিল ফিরে পায় যৌবন। মেঘবতী আকাশ জলে টইটুম্বুর।

‘কেমন বৃষ্টি ঝরেÑ মধুর বৃষ্টি ঝরেÑ ঘাসে যে বৃষ্টি ঝরেÑ রোদে যে বৃষ্টি ঝরে আজ/কেমন সবুজ পাতাÑ জামীর সবুজ আরোÑ ঘাস যে হাসির মতোÑ রোদ যে সোনার মতো হাসে/Ñ কবি জীবনান্দ দাশের এই পঙ্ক্তিতে যথার্থই প্রকাশ পেয়েছে ঋতু রানী বর্ষা। মেঘ যেন সেজেই বসে থাকে, ইচ্ছা হলেই নামবে যখন-তখন।

গ্রীষ্মের তাপদাহে বিবর্ণ প্রকৃতির প্রাণ ভিজিয়ে দিতেই বর্ষার আয়োজন। ঝরে অবিরাম বর্ষাধারা। থেমে থেমে মেঘ কল্লোলে নেচে ওঠে প্রাণ। উঠানে জলের নৃত্য। বাতাসে বাতাসে দুলে ওঠে শাপলা-পদ্মের ছন্দমধুর কাব্য। তবে এমন প্রকৃতির দৃশ্যপট কোথায় মিলবে এই শহরে? দিনভর কদম আর রাতজুড়ে মল্লিকার মাতাল সুবাস কে এনে দেবে আমাদের এই প্রিয় ইট-পাথরের জঙ্গলে! বর্ষার রূপ দেখতে হলে যেতে হবে আমাদের শিকড়ে, আমাদের গ্রামে। অবারিত খোলাপ্রান্তর, ঘন-কালো মেঘ, আকাশ যেখানে সেজে আছে দীর্ঘ পরিসরেÑ এমন বিমুগ্ধঘোর, গম্ভীর আবেদন, অন্তর অলিন্দে প্রেমানন্দে গেয়ে ওঠেÑ

‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়!/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝর ঝর/তপনহীন ঘন তমসায়।’

বর্ষার রূপ, রস, সুন্দরে বিমোহিত এই জনপদের কবি-শিল্পী তথা সৃজনশীল মানুষ। বর্ষার অবারিত জল-হাওয়ায় প্রলুব্ধ বাংলার ভাটিয়ালি সুর ও স্বরে প্রকৃতি কাঁদে এবং কাঁদায় বিরহীমন। মেঘের ডাক শুনে বুকের ভেতর গুমরে ওঠে প্রিয়জনকে পাশে না পাওয়ার আকুলতা। রাধারূপী সব প্রেমিকা আভিসারে ছুটতে চায় যেন। বরষার ঝরা জলে আছে এমন আর্তি-কীর্তি, আছে ভাঙন ও ডুবে যাওয়া সমতল সংসার। বর্ষা মানেই কেমন কেমন! বর্ষা মানেই এই মেঘ এই বৃষ্টি, রৌদ্র-ছায়ার আপসহীন লীলা যা অবশ্যই লোকনন্দন বিষয়।

বর্ষা বাংলা বর্ষের দ্বিতীয় ঋতু এবং এর স্থিতি আষাঢ় ও শ্রাবণ (মধ্য জুন থেকে মধ্য আগস্ট)Ñ এই দুই মাস। বর্ষাকাল প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ুপ্রবাহের ফল। মূলত অবিরাম বৃষ্টিতে স্ফীত হয় বর্ষার জলধারা। সবুজ লাবণ্যময় হয়ে ওঠে রূপসী বাংলা। বসন্ত আর বর্ষাÑ এই রাজা-রানী বাংলা ঋতু পার্বণ ও রূপ-লাবণ্যে বিপরীত সুন্দর।

পার্বণপ্রিয় বাঙালিদের মধ্যে বর্ষা ধর্মীয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে নানান আঙ্গিকে। আষাঢ়ের পূর্ণিমাতিথি গৌতম বুদ্ধের গৃহী জীবন ও বুদ্ধত্ব লাভের পর তার জীবনের বহুমাত্রিক স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল। এদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রকৃতি পূজার অংশ হিসেবে সর্প দেবী মনসা পূজার প্রচলন বোধহয় প্রচীনকাল থেকেই।
এছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জগন্নাথ পূজা ও রথযাত্রার মতো ধর্মীয় কার্যকরণ পালন করে থাকেন এ বর্ষা ঋতুতেই।

গত কয়েক বছরের মতো এবারেও চন্দ্র মাস হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশেষ উপাসনার মাস রমজান শুরু হয়েছে জ্যৈষ্ঠে। তাই বহু কাক্সিক্ষত ঈদুল ফিতর পালিত হবে এ আষাঢ়েই...। ঘনঘোর আষাঢ়ে মেঘের ফাঁক গলে শাওয়াল মাসের বাঁকা-ক্ষীণ চাঁদ দেখা গেলেই শুরু হবে ঈদের আড়ম্বর। ঘরে ঘরে বাঙালি মুসলমানরা দীর্ঘ সিয়াম পালন শেষে আত্মিক আনন্দে নিজদের বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত আরাধনার ঈদে। এই ঈদ ধনী-গরিব সবার। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এই মেলবন্ধন জগতে বিরল। ঈদুল ফিতর মুসলিম অর্থনীতিতে বেশ তাৎপর্য বহন করে জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে। ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক হক সম্পর্কে সজাগ করে তোলে প্রতিটি মুসলমানের অন্তর। চন্দ্র মাস হিসেবে বাংলার প্রতিটি ঋতুতে ঘুরে ঘুরে আসে এই ঈদ...। এবারের বৃষ্টিমগ্ন ঈদ হয়তো ভেজাবে আনন্দের শীতলতায়... জলাধারের স্ফটিক স্বচ্ছ জলে শাওয়ালের চাঁদে রঙিন ছায়ার-মায়ায় বাঙালি জনপদ হয়ে উঠুক সব মানুষের আনন্দলোক।

 

_____________________________________
আয়োজনে : স্বাক্ষর জামান ছবি : কৌশিক ইকবাল
পোশাক : সোহান করিম
মেকওভার    : মানামি ইলাহী
মডেল : সাদিয়া রায়হান
লেখা : শাকিল সারোয়ার

মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে

আলী যাকের

 

 


বয়স যখন বাড়ে, মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে তখন স্বভাবতই তারা পেছনের দিকে তাকান। অনেকে মানুষের এই অতি স্বাভাবিক আচরণের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অথচ এটিই মানুষের ধর্ম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কেন স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে অনেকে অনেক রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি নিজের মতো করে বিষয়টি নিয়ে ভাবার চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে আমারও একটি ব্যাখ্যা আছে। আমি মনে করি, মানুষ যখন দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে, বয়সের ভারে ন্যুজ্ব দেহ তখন সে অতীতের স্মৃতি থেকে, তার যৌবন থেকে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। এতে অন্যায়ের কিছু দেখি না। আমি মনে করি, এটিই স্বাভাবিক। এই যে পেছনে ফিরে তাকানো, এই যে স্মৃতির মেলা ভিড় করে আসা আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, এতে এমন অনেক কিছুই খুঁজে পাই স্মরণে যা থেকে আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অনেক দিকনির্দেশনা পেতে পারি। আমার মনে পড়ে, বেশ কিছুকাল আগে এই বিষয়ের ওপর ইংরেজি একটি কলাম লিখেছিলাম। এর শিরোনাম ছিল ‘ণবংঃবৎফধু, ড়হপব সড়ৎব!’ এ শিরোনামটি অনেক বছর আগের একটি ইংরেজি গান থেকে নেয়া। এ গানটি আমাদের তারুণ্যে আমরা গুন গুন করে গাইতাম। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ‘নস্টালজিয়া’। এর কোনো জুতসই বাংলা খুঁজে পাইনি। ‘স্মৃতিনির্ভরতা’ বোধহয় এর সবচেয়ে কাছাকাছি শব্দ। তবে গোল বাধিয়েছে ‘নির্ভরতা’ শব্দটি। নস্টালজিয়া বলতে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয় সেটিকে একটি বাক্যে আমরা বর্ণনা করতে পারি এভাবেÑ ‘স্মৃতি সততই সুখের’। এই সুখস্মৃতি সব বয়সের সব মানুষের জন্যই সমান আবেদন সৃষ্টি করে বলে আমার মনে হয়। আমার মনে আছে, আমি অত্যন্ত অপরিণত বয়স থেকে স্মৃতিস্পর্শ। আমার প্রিয় একটি নীল তোয়ালে ছিল। একবার মায়ের সঙ্গে কলকাতায় নানাবাড়ি যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে জানালা গলে ওই তোয়ালেটি বাতাসে উড়ে যায়। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে তোয়ালেটি খুঁজে নিয়ে আসি। ওই কাজটি করা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করেন মা। যা ছিল, এখন নেই এর প্রতি মানুষের আকর্ষণ সর্বদাই সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই বোধহয় চিন্তাশীল মানুষের কাছে স্মৃতি বিষয়টি এতো হৃদয়ের কাছাকাছি এসে যায়। এ রকম বেশকিছু স্মৃতি আছে অতীতের যা কখনোই ভুলে যাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরা যাক। আমাদের প্রজন্মের যারা ওই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে কিংবা এতে অংশগ্রহণ করেছে তাদের পক্ষে ওই সময়কার স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। এ রকম অনেক বিষয় আছে।


ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় বাল্যকালের দিনগুলো। আমি নিশ্চিত, প্রত্যেকেরই বাল্যকাল নিয়ে মধুর সব স্মৃতি রয়েছে। অনেক দুঃখজনক স্মৃতিও থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ দুঃখের কথা ভাবতে চায় না। ওই সুখস্মৃতিগুলো ধরে রাখে হৃদয়ে। আমার বাল্যকালের অধিকাংশ সময় কেটেছে খুলনা ও কুষ্টিয়ায়। থাকার জন্য খুলনায় বাবা একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর বাড়ি পেয়েছিলেন খুলনা পুলিশ লাইনসের ঠিক উল্টোদিকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, ওই বাল্যকালের পর অনেকবারই যেতে হয়েছে খুলনায়। ওই শহরে গিয়ে যে ঠিকানাতেই থাকি না কেন, রিকশা করে কিংবা হেঁটে একাধিকবার ওই বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি এবং প্রতিবারই যেন ফিরে গিয়েছি ওই বাল্যকালে। অনেক খ- স্মৃতি মনে এসেছে যেন কোনো নিñিদ্র অন্ধকার থেকে লাফিয়ে উঠে এসে উপস্থিত হয়েছে একেবারে দুই চোখের সামনে। ওই বাড়ির সামনেই পুলিশ লাইনস সংলগ্ন একটি গলি চলে গিয়েছিল ভেতর দিকে। ওই গলির মুখে একটা ছোট্ট মুদির দোকান ছিল। ওই দোকানে এক আনা পয়সা দিলে এক টুকরো গুড় পাওয়া যেতো। কোনো সময় মা আমার কোনো কাজে খুশি হয়ে যদি এক আনা পয়সা আমাকে বখশিশ দিতেন তাহলে দৌড়ে চলে যেতাম ওই দোকানেÑ এক টুকরো গুড় কিনতাম, খেতে খেতে চোখ বুজে আসতো। স্বর্গসুখ কাকে বলে ওই স্বাদ যেন পেতাম গুড়ের টুকরোর মধ্যে। অমন মিষ্টি আর জীবনে কখনো খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে আমার মিষ্টির প্রতি দুর্বলতার কথা। ইংরেজিতে যাকে বলে ঝবিবঃ ঞড়ড়ঃয তা-ই আমার ছিল বাল্যকাল থেকে। আরো পরে আমাদের দল যখন নাটক করতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে গেছে সেখানকার নাট্যবন্ধুদের প্রথমেই জিজ্ঞাসা করতাম, আচ্ছা, তোমাদের শহরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মিষ্টি কী? তারপর হৈ-হুল্লোড় করতে করতে সবাই মিষ্টি খাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়তাম


রাস্তায়। এখন অবশ্য মিষ্টি খাওয়ার কথা ভাবাও প্রায় পাপ। আমার রক্তে মিষ্টির আধিক্যে আজ মিষ্টিহীন জীবন যাপন করছি।
যাকগে সে কথা। ফিরে যাই খুলনার গুড়ের টুকরোয়। ওই মিষ্টি ছিল আমার খাওয়া শ্রেষ্ঠ মিষ্টি। খুলনায় আমরা অর্থাৎ আমি, আমার ছোট বোন ও পাশের বাড়ির নাজমা সারা দিন নানান দুষ্টুমি করতাম। সেটি মোরব্বা চুরি থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির কিচেন গার্ডেন থেকে গাজর-মুলা চুরি, পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে সাত চাড়া খেলা নিয়ে ফাইট, কিং কং খেলায় সহখেলোয়াড়দের পিঠে ভীষণ জোরে টেনিস বল ছুড়ে দেয়াÑ এসব। খুলনায় পুরনো একটা সার্কিট হাউস বিল্ডিং ছিল যশোর রোডের ধারে বিশাল মাঠের একপাশে। ওই সার্কিট হাউসের সামনে একটা অ্যারোপ্লেনের কঙ্কাল পড়ে ছিল। ওই প্লেন নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত হয়েছিল কাছে-পিঠে কোথাও। ব্রিটিশরা ওইখানে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আমরা যখন ওই প্লেনের কঙ্কাল আবিষ্কার করি তখনো এর হাড়গোড় সব ক্ষয়ে যায়নি। গদিহীন সিটের খাঁচা ছিল তখনো। এরই ওপর বসে প্লেন চালানোয় মগ্ন হতাম কতো বিকালে। মনে হতো সারা বিশ্ব যেন ঘুরে বেড়াচ্ছি প্লেনে চড়ে। ওই প্লেনের ফাঁকফোকর দিয়ে নানান বুনো লতাগুল্ম মাথা উঁচিয়ে তাকাতো আকাশের দিকে। মনে পড়ে, ওই লতাগুল্মের মধ্যে একটি ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল ফুটেছিল। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় ইটের পাঁজার মধ্য দিয়ে মাথা উঁচিয়ে ওঠা রক্তকরবী ফুল আবিষ্কার করেছিলেন। এই আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা আমাদের এক অসাধারণ নাটক দিয়েছে ওই ফুলের নামেই। আমার ওই গাঢ় ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল দেখলেই তা খেতে ইচ্ছা করতো। ওই প্লেনের কঙ্কালের ভেতরে বসে খেলায় আমার নিত্যসঙ্গী ছিল আমার বোন ঝুনু। তার অনুপ্রেরণা ও আমার লোভের বশবর্তী হয়ে কচরমচর করে ওই ফুল খেয়েছিলাম একবার। মনে আছে, গলা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। লেবু, তেঁতুল ইত্যাদির সঙ্গে মায়ের হাতে মারও খেতে হয়েছিল প্রচুর। এই মারের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল কচু ফুলের কণ্ঠরোধ করা ওই বেদনা। মনে পড়ে, মা-বাবার সঙ্গে সরকারি লঞ্চে সুন্দরবনে গিয়েছিলাম একবার। বাবা পাকা শিকারি ছিলেন। তার ছিল একটি অত্যন্ত নামজাদা বিলেতি কোম্পানির তৈরি দোনলা বন্দুক। বাবা অনেক হরিণ শিকার করেছিলেন ওই যাত্রায়। হরিণ শিকার বোধহয় বৈধ ছিল তখন। মনে পড়ে, দারুণ উল্লসিত হয়েছিলাম আমরা সবাই। আজ যখন জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি পড়ি, ‘ক্যাম্পে শুয়ে, শুয়ে কোনো এক হরিণীর ডাক শুনি, কাহারে সে ডাকে!’Ñ হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। হরিণের জন্য প্রাণ কাঁদে। হরিণীর জন্য প্রাণ কাঁদে। জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ পেরিয়ে এসে অনেক অতীত ভাবনা অথবা কাজ নিয়ে গ্লানিবোধ হয়। এটিই বোধহয় নিয়ম।


বাবা কুষ্টিয়ায় এলেন এরপর। কুষ্টিয়ায় আমার বোধবুদ্ধির উন্মেষ ঘটে বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এই একটি ব্যাপার আছে যা সবার বেলায় এক সময় বা একই পরিস্থিতিতে হয় কি না বলা মুশকিল। বুদ্ধির সঙ্গে হয়তো মানুষের বয়সের একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু বোধের সম্পর্ক? মনে হয় তা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গ যখন উঠলোই তখন বিষয়টি সম্পর্কে আরো দু’চারটি কথা বলতে চাই। সুকান্তের ওই বিখ্যাত লাইন নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। তাই তার কাছে পূর্ণিমার চাঁদটি মনে হয়েছিল ঝলসানো রুটি। বোধের সঙ্গে মনের যেমন একটি প্রগাঢ় সম্পর্ক আছে তেমনি দেহেরও একটি সম্পর্ক আছে অবশ্যই। খেয়াল করা সম্ভব হবে, চাঁদ যতোই ঝলসানো রুটি বলে তার কাছে মনে হোক না কেন, ঝলসানো রুটির কথা মনে করে কবিতা ‘ছুটি’ দেয়ার অন্ত্যমিল সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন ঠিকই। অর্থাৎ তার দারিদ্র্য বা ক্ষুধা তাকে কাব্যবিমুখ করতে পারেনি। তবুও বলবো, কুষ্টিয়ায় আমার ওই বাল্যকালে নিসর্গের সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এই তীব্রতা পেতো না যদি আমার উদর পূর্ণ না থাকতো। বয়সের তোয়াক্কা না করেই বোধের উন্মেষ হতে পারে। তবে বুদ্ধির স্ফুরন হয় কি না তা বলতে পারবো না। বাল্যকালের এসব স্মৃতি আমাকে আজকের এই জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে। অবশ্য আমি স্বীকার করি, আমার জীবনে যদি ভালো কোনো কাজ করে থাকি তাহলে সেটি যে যা-ই বলুক না কেন, অকিঞ্চিৎকর কাজ।


যাহোক, এই কলামে ব্যক্তিগত কথাগুলো বললাম এ কারণে যে, আমাদের অতীত আমাদের সবার জীবনে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করে যায়। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের সবারই জীবন কিছু মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ওই মূল্যবোধগুলো নিয়ে কথাবার্তা হয় প্রায়ই এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বুঝতে পারি, আমাদের জীবনে মূল্যবোধের অবক্ষয় এতো সর্বগ্রাসী হয়েছে যে, আমরা একটি বিপজ্জনক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি। সেদিন কোনো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে একটি আলোচনাচক্রে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সংঘাতের পেছনে যে পথভ্রষ্ট তরুণ সমাজ আজ ব্যাপৃত আছে এর কারণটি কী এবং এখান থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়? বলেছিলাম, এই পথ হারানো তরুণদের পথ দেখানোর দায়িত্ব যাদের ছিল অর্থাৎ আমাদের প্রজন্মÑ তারা তাদের কাজটি ঠিকভাবে সম্পন্ন করেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমাদের প্রজন্ম কেবল অর্থ উপার্জনে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। পরবর্তী প্রজন্মকে কখনোই তারা সঠিক পথ দেখায়নি। এই অপরাধের মাসুল আজ দেশ ও জাতিকে দিতে হচ্ছে। এখনো যদি আমরা আমাদের কর্তব্যের প্রতি উদাসীন থাকি তাহলে দুই প্রজন্ম পর এ দেশে ভালো মানুষ আর থাকবে না। অথচ আমাদের প্রজন্মের সবাই নিজের গুরুজনদের তত্ত্বাবধানে সব মূল্যবোধ সম্পৃক্ত একটি সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে শুনে এসেছেন, প্রত্যক্ষও করেছেন। আমরা কেন এখনো ওই মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সৎ চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে ওই কাজে ব্রতী হই না?


লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

চিহ্ন

শহীদুল হক খান

 

 


ডিভোর্সের কথা চলছিল কয়েক মাস ধরেই। পলিনা ও পরশকে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছে। তবে তাদের মতের পরিবর্তন হয়নি। পরশ বলেছে, আমরা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। কিন্তু বিয়ের তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই দেখেছি আমাদের মতের অনেক অমিল, চিন্তার অমিল, পরিকল্পনার অমিল।
বন্ধুবান্ধবরা বলেছে, তোমাদের হাসিমুখ দেখে তো তা মনে হয় না। কী চমৎকার হেলে-দুলে হানিমুন করে এলে! পরশ জবাব দিয়েছে, হানিমুন করা মানেই সুখী সংসার নয়। এক বিছানায় ঘুমানো মানেই সুখী দম্পতি নয়।
এরপর সবার অনুরোধ রাখতে গিয়ে তারা হিসাব করে করে তিনটি বছর পার করলো। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। সেদিন ছিল তাদের বিয়েবার্ষিকী। সকালে পলিনা নিজ হাতে পরশের জন্য রান্নাবান্না করে এক সঙ্গে খাবার টেবিলে বসলো।  আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, তারা আলাদা হয়ে যাবে। কোন কোর্ট-কাচারি নয়, উকিল-ব্যারিস্টার নয়। নিজেরাই নিজেদের ডির্ভোস নিয়ে নেবে। যেহেতু কেউ কারো কাছে কোনো চাহিদা তুলবে না, পাওনা-দেনার কোনো হিসাব-নিকাশ হবে না সেহেতু ভদ্রলোকের মতো দু’জন দু’জনার সঙ্গে সর্ম্পক শেষ করে দিন শেষে দুই পথে চলে যাবে।

খাবার টেবিলে খেতে খেতে প্রথম কথা তুললো পলিনা। বললো, আমার দু’একটি জিনিস নেয়ার ছিল।
নির্দিধায় নিয়ে যেতে পারো। পরশ উত্তর দিলো।
- তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হয় তখন তোমার চোখে এই চশমাটা ছিল। আর চশমাটা ছিল বলেই তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। অনেক ব্যক্তিত্ববান মনে হয়েছিল। তাই এ চশমাটা আমি নিয়ে যেতে চাই।
পরশ চোখ থেকে চশমাটা খুলে রাখলো।
পলিনা বললো, পরে দিলেই হতো, যাওয়ার সময়।
পলিনার চোখের দিকে তাকিয়ে পরশ বললো, যেটা দেয়ার তা আগে দিয়ে দেয়াই ভালো।  
দু’জন ধীরগতিতে খাবার খাচ্ছে। নীরবতা বলে দেয়, এই মুহূর্তে কারো মুখে কথা নেই। আবারও নীরবতা ভাঙলো পরশ। বললো, তোমার পরবর্তী চাওয়া?
পলিনা বললো, গত বছর বই মেলায় তোমাকে একটা হলুদ পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলাম হিমু সাজার জন্য। ওই পাঞ্জাবিটা আমাকে দাও।
- ওই পাঞ্জাবি দিয়ে তুমি কী করবে? মেয়ে হিমুরা তো হলুদ শাড়ি পরে। আর মেয়েরা তো হিমু হয় না।
আমি কী করবো সেটি তো আমার ব্যাপার, তুমি দিবে কি না বলো?
- আলোচনার শুরুতেই তো বলেছি, যা খুশি তুমি নিতে পারো, আমার আপত্তি নেই।
হ্যাঁ, এ জন্যই আমি তসলিমা নাসরিনের তিনটা বই নিয়ে যাবো।
- কোন তিনটা বই?
আমার ছেলেবেলা, ক আর ফরাসি প্রেমিক।
- এই বই দিয়ে তুমি কী করবে? এগুলো তো অনেক অশ্লীল, নোংরা বই।
না, মোটেও অশ্লীল আর নোংরা বই নয়। এই বইয়ে যা লেখা আছে, সব সত্য।
- তোমার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না।
সেটি সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে মোটেও তা মনে হয় না।
- তুমি যেহেতু তসলিমাকে পছন্দ করো, তাই এ কথা বলছ।
না, পছন্দ নয়। আমি তাকে সমর্থন করি। আমার মেয়েবেলা বইয়ে তিনি তার ছোটবেলা মামা, চাচা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে কথা অবলিলায় লিখে পাঠককে জানিয়েছেন। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার এক মামাতো ভাইও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কলেজ থেকে ফেরার পথে গাউছিয়ায় এক দুষ্ট ছেলে আমার বুকে হাত দিয়েছিল- কথাগুলো কাউকে বলতে পারিনি।
- এখন যে বলছ?
যেহেতু সর্ম্পক শেষ হয়ে যাবে সেহেতু দু’একটা কথা প্রকাশ করে দিলাম। তাসলিমা ‘ক’ বইয়ে কয়েক কবি

লেখকের সঙ্গে তার আন্তরিকতার কথা বলেছেন। বই ছাপা হওয়ার পর কতো হই চই, কতো মামলা-মোকদ্দমা! পরে দেখা গেল সব চুপচাপ।
- আর কী চাই?
বিশেষ কিছু নয়, একটা ছোট স্মৃতি।
- কী সেই স্মৃতি।
চলো কফি খেতে খেতে বলি।
কফির কাপ হাতে নিয়ে দু’জন গিয়ে বসলো বারান্দায়। কিছুক্ষণ আগে পলিনা গোসল করেছে। তার ভেজা চুলের মিষ্টি গন্ধ এবং বাগান থেকে ভেসে আসা ফুলের গন্ধ একাকার হয়ে গেছে। গাছে গাছে কেমন যেন নেশা লাগানো ভাব।
অনেকক্ষণ পর পলিনার দিকে তাকিয়ে পরশের মনে হলো, পলিনা আসলেই খুব সুন্দর। কিন্তু তার খুব বাজে ধরনের একটা মেজাজ, কোনো কিছুতে আপস না করার জেদ কোনোভাবেই স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। ২৪ ঘণ্টার দিনকে মনে হয় যন্ত্রণার ৪৮ ঘণ্টা। অথচ তার সঙ্গে যেদিন পরিচয় হয় সেদিন পরশের এক বন্ধু বলে, তার বোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বাংলা বিভাগে। প্রথম দিনের আলাপে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছে পলিনা অনেক বোঝে। শস্তা বিষয় শস্তা জনপ্রিয়তা নয়, অনেক গভীরে যেতে পারে।
পরের সাক্ষাতে আলোচনার বিষয় ছিল খেলাধুলা। এ বিষয়েও তার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা অনেক। তবে খেলা নিয়ে বেশি মাতামাতিটা পছন্দ করে না। যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে, দেশের খেলোয়াড়দের বিজয়ী হিসেবে যতো অতিরিক্ত মাথায় তুলেছে ততোই তারা পচা তালের মতো পড়ে গলে গেছে। পলিনার পরামর্শ- আমাদের সব খেলোয়াড় ভালো, অসম্ভব ভালো। তাদের মাথা নষ্ট না করে ঠিকমতো খেলতে দেয়া দরকার। রাজনীতি, দুর্নীতি নিয়ে সে কোনো মন্তব্য করতে চায়নি। দেশ সম্পর্কে তার ধারণা- এমন দেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কথা উঠতেই বলেছিল, কোনো এক সময় হয়তো প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু ছিল। এখন ওসব নেই। যা আছে তা হলো সেক্স। পয়সার বিনিময়ে, কথার বিনিময়ে, প্রেমের নামে, ভালোবাসার নামে, বিয়ের নামে টিকে আছে শুধু ওই সেক্স।
পরশকে দীর্ঘক্ষণ ভাবতে দেখে পলিনা জানতে চাইলো- কী এতো ভাবছ? সিদ্ধান্ত পাল্টাবে নাকি?
পরশ অত্যন্ত জোড় দিয়ে বললো, প্রশ্নই ওঠে না। সিদ্ধান্ত যেটা নেয়া হয়েছে, দ্যাট ইজ ফাইনাল।
- গুড, আমারও তা-ই মত। শুধু একবার তো নয়, এই তিন বছরে আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের এক সঙ্গে থাকা হবে না।
আমাদের দু’জনের চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনার এতো পার্থক্য, কোনো অবস্থাতেই দু’জনার এক সঙ্গে থাকা চলে না। এবার তোমার শেষ চাওয়াটা কী বলো। সময় যতো কম নষ্ট হবে ততোই ভালো।
- হ্যাঁ বলছি। তবে এর আগে বলে নিই, এতে যেন আবার সিদ্ধান্ত না বদলাও।
প্রশ্নই ওঠে না।
- তুমি তো ঘুম থেকে দেরিতে ওঠো। আমি আগামীকাল সকালে উঠেই চলে যাবো।
আগামীকাল সকালে কেন? কথা তো ছিল আজই চলে যাবে।
- হ্যাঁ, কথা ছিল। তবে একটা চিহ্ন নিয়ে যাবো।
চিহ্ন?
- হ্যাঁ, বিয়ের পর আমাকে তুমি অনেকবার সন্তান নিতে বলেছ। নিইনি।

ভেবেছি যেখানে সম্পর্কই থাকবে না সেখানে ওইসব আবেগ-অনুভূতি প্রশ্রয় দিয়ে লাভ কী?
তাহলে আজ?
- আজ মনে হলো। দোষ সব তো আমার। মেজাজ বলো, মর্জি বলো, অভিমান বলো- সব তো আমার জন্য। তাই তোমার মতো ভালো মানুষের একটা চিহ্ন যদি আমার কাছে থাকে- সে ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবো, অহঙ্কার করতে পারবো।

রাত নেমেছে অনেকক্ষণ। রাতের খাওয়া শেষ করে পরশ বিছানায় চলে গেছে। পলিনা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিছানায় যাওয়ার। ঘর বাঁধার পর থেকে বিশেষ রাতে বিশেষ সময়ের জন্য বিশেষ কিছু প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। আজও ওই প্রস্তুতি নিতে সে ভুল করলো না। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। একের পর এক শরীর থেকে পোশাক সব সরিয়ে ফেললো। সবচেয়ে পছন্দের পারফিউমটা এখানে, সেখানে, সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্প্রে করলো। হালকা করে রেকর্ড প্লেয়ারে একটা গান বাজালো। গানটা হেমন্ত মুখপধ্যায়ের ‘এই রাত তোমার আমার’। গানের শব্দটা একটু বাড়িয়ে, একটু কমিয়ে এমনভাবে ব্যালান্স করলো যাতে বিছানায় শুয়ে  শুনতে পারে এবং এই শোনার মধ্যে যেন শুধু গান শোনা নয়, একটা গানের আমেজ থাকে, মাদকতা থাকে। পরশের পাশে পলিনা গিয়ে তার গায়ে হাত রাখলো।
পরশ বললো, এসেছ?
পলিনা বললো,  হ্যাঁ, এসেছি।
- এটাই তো শেষ আসা, তাই না?
হয়তো বা। আবার নাও হতে পারে।
- তোমাকে যখন কাছে পাই তখন মনে হয় স্বর্গটা আমার খুব কাছে।
আর যখন দূরে থাকি।
দূরে থাকা নয়, যখন তুমি আমার সঙ্গে মেজাজ করো, বাজে ব্যবহার করো, জিদ দেখাও, পাজিপনা করো তখন মনে হয় আমি যন্ত্রণার মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি।
- থাক ওসব কথা। এখন এ রাতটাকে, রাতের এ সময়টাকে তুমি শুধু সুখ দিয়ে ভরে দাও।
সুখ চাইলে কথা বন্ধ করতে হবে।
- কথা বন্ধ করলাম। আর কথা বন্ধ করবো কী? তুমি নিজেই তো ঠোঁটে আটকে দিয়ে আমার কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছ।
দু’জনার কথা থেমে গেল। বাইরে মনে হচ্ছে ঝড়োহাওয়া বার বার আছড়ে পড়ছে। এক সময় গানটা থেমে গেল। তারা দু’জন ক্লান্ত হয়ে যার যার বালিশে মাথা রাখলো। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

রাত শেষে ভোর হলো। ভোর বলতে অনেক বেলা হলো। পরশ ঘরময় খুঁজে দেখলো, পলিনা চলে গেছে। টেবিলে তার জন্য নাশতা বানিয়ে রেখে গেছে। ডিভোর্সের দলিলে নিজের দস্তখতটাও করে দিয়ে গেছে। একটা ছোট্ট কাগজে এনগেজমেন্ট রিংটা রেখে লিখে গেছে, ‘তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে স্মৃতিচিহ্ন। ভালো থেকো। সন্তান ছেলে হোক অথবা মেয়ে তার নামটা তুমি রাখবে।’

দুই ভূত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 



লালু আর ভুলুর কোনা কাজ নেই। তারা সারা দিন গল্প করে কাটায়। সবই নিজেদের জীবনের নানান সুখ-দুঃখের কথা বলে। কথা বলতে বলতে যখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না তখন দু’জনে খানিক কুস্তি লড়ে। তাদের কুস্তিও খুব একঘেয়ে। কেউ হারে না। কেউ জেতে না। কুস্তি করে তাদের ক্লান্তি আসে না, ঘামও ঝরে না। এর কারণ হলো, লালু আর ভুলু দু’জনই ভূত। প্রায় ১৪ বছর আগে দুই বন্ধু মনুষ্য জন্ম শেষ করে ভূত হয়ে লালগঞ্জের লাগোয়া বৈরাগী দীঘির ধারে আশ-শ্যাওড়ার জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়ে আছে। মামলা-মোকদ্দমা থেকেই বাক্য আলাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয়, বুড়ো বয়সে মাত্র সাত দিনের তফাতে লালু আর ভুলু পটল তোলে। ভূত হয়ে যখন দু’জনের দেখা হলো তখন দু’জনের মনে হলো পুরনো ঝগড়া জিইয়ে রাখার আর কোনো মানেই হয় না। তাই দু’জনের বেশ ভালো ভাব হয়ে গেল। সময় কাটানোর জন্য তারা মাঝে মধ্যে ইচ্ছা করে ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেও দেখেছে। কিন্তু দেখা গেল, ঝগড়াটা তেমন জমে না। আরো একটা আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা ভূত হয়ে আজ পর্যন্ত এ তল্লাটে কোথাও কখনো আর কোনো ভূতের দেখা পায়নি।
ভুলু বলে, হ্যাঁ রে লালু, গাঁয়ে গত ১৪ বছরে তো বিস্তর লোক মরেছে। তাদের ভূতগুলো সব গেল কোথায় বল তো?


সেটি তো আমিও ভাবছি, আমরা ছাড়া আর কাউকে তো কখনো দেখিনি! আরো কয়েকজন থাকলে সময়টা একটু কাটতো ভালো।
ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে।


আমারও ভালো ঠেকছে না! বেশিদিন এ রকম চললে আমাদের এ গাঁ ছাড়তে হবে। সেটি কী সোজা! আমি গাঁ ছাড়ার চেষ্টা করে দেখেছি, ভারী সূক্ষ্ম একটা বেড়া আছে। চোখে দেখা যায় না। এতোই মিহি যে, ওই বেড়া ভেদ করা অসম্ভব।
বটে, এ তো ভারী অন্যায় কথা! আমরা কি সব জেলখানার কয়েদি নাকি রে?
মনে হয় এক জায়গার ভূত অন্য জায়গায় গেলে হিসাবের গোলমাল হবে বলেই যমরাজা বেড়া দিয়ে রেখেছে।
তা আটপেয়ে যমরাজাটাই বা কোথায়? আজ পর্যন্ত তো তার দেখাটি পেলাম না।
হবে রে হবে। এই একঘেয়ে বসে থাকাটা আমার আর ভালো লাগছে না। বরং গাঁয়ের ভূতগুলো কোথায় গায়েব হচ্ছে সেটি জানা দরকার। আরো গোটা কয়েক হলে দিব্যি গল্প-টল্প করা যেতো। দল বেঁধে থাকতাম।
তাহলে খুঁজেই দেখা যাক।
তাই চলো।


দুই বন্ধু মিলে অতঃপর ভূত খুঁজতে বের হলো। কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে হয়রানিই সার হলো। একটা ভূতের গায়ের আঁশও দেখা গেল না।
বড় চিন্তার কথা হলো রে লালু!
বটেই তো! এ রকম তো হওয়ার কথা নয়।
একটা কথা বলি, যতীন মুৎসুদ্দির বয়স হয়েছে। অবস্থাও ক’দিন ধরে খারাপ যাচ্ছে। এখন-তখন অবস্থা। চল তো গিয়ে তার শিয়রে বসে থাকি। আত্মাটা বের হলেই খপ করে ধরবোক্ষণ।
কথাটা মন্দ বলোনি। তাহলে চলো যাই।
দু’জনেই গিয়ে যতীন মুৎসুদ্দির শিয়রে আস্তানা গাড়লো। খুব সতর্ক চোখে চেয়ে রইলো যতীনের দিকে। যতীন বুড়ো মানুষ, শরীর জীর্ণ, শক্তিও নেই।
দু’দিন ঠায় বসে থাকার পর তিন দিনের দিন যখন গভীর রাত তখন লালু আর ভুলু দেখলো যতীনের আত্মাটা নাকের ফুটোর কাছে বসে সাবধানে বাইরে উঁকি-ঝুঁকি মারছে।
লালু চেঁচিয়ে উঠলো- ‘ওই বেরোচ্ছে। সাবধান রে ভুলু, ঘ্যাঁচ করে ধরতে হবে কিন্তু।’
হ্যাঁ, একবার বেরোক বাছাধন।


তা আত্মাটা বের হলো বটে কিন্তু ধরা গেল না। শরীর ছেড়ে হঠাৎ এমন চোঁ করে এরোপ্লেনের মতোই উড়ে গেল নাকের ফুটো দিয়ে যে, লালু-ভুলু হাঁ করে চেয়ে রইলো। তারপর ‘ধর ধর’ করে ছুটলো পেছনে।
যতীন মুৎসুদ্দির আত্মা সোজা গিয়ে গণেশ গায়েনের বাড়িতে ঢুকে পড়লো। পিছু পিছু লালু আর ভুলু।
যতীনের আত্মা দেখেই গণেশ গায়েন একগাল হেসে বললো, এসেছিস? তোকে নিয়ে ‘সাত হাজার সাতশ’ পনেরোটা হলো। দাঁড়া যতেন, দাঁড়া, তোর শিশিটা বের করি। মলম-টলম ভরে একদম রেডি করে রেখেছি। এই বলে একটা দু’ইঞ্চি সাইজের শিশি বের করে যতীনকে তার ভেতরে পুরে কয়েকটা নাড়া দিয়ে ছিপি বন্ধ করে তাকে রেখে দিল। তারপর আপন মনেই বললো, আর দুটো হলেই কেল্লা ফতে। পরশু ঝুনঝুনওয়ালা লাখখানেক টাকা নিয়ে আসবে। ‘সাত হাজার সাতশ’ সতেরোটা হলেই লাখ টাকা হাতে এসে যেতো। টাইফয়েড হয়ে ১৪ বছর আগে শয্যা নিতে হলো বলে লালু আর ভুলুর ভূত দুটো হাতছাড়া হলো। না হলে আমাকে আজ পায় কে! সে দুটোকে পেলে হতো।
লালু-ভুলু দরজার আড়ালে থেকে কথাটা শুনে ভয়ে সিটিয়ে রইলো।
গণেশ গায়েন ঘুমালে তারা ঘরের তাকে জমিয়ে রাখা সাত হাজার সাতশ’ পরেরোটা শিশি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলো। প্রতিটিতে একটা করে ভূত মলম মেখে ঘুমিয়ে আছে।
লালু, দেখেছিস!


দেখেছি রে ভুলু, কী করবি?
আয়, শিশিগুলোকে তাক থেকে ফেলে আগে ভাঙি।
তাই হলো। দু’জন মিলে নিশুত রাতে ঝন ঝন করে শিশিগুলো ঠেলে ফেলে দিল মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমন্ত ভূতগুলো জেগে মহাকোলাহল শুরু করে দিল।
ভুলু তাদের সম্বোধন করে বললো, ‘ভাই-বোনেরা, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমরা তোমাদের উদ্ধার করতেই এসেছি।’
সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো।
গণেশ গায়েনও ঘুম ভেঙে উঠে ধমকাতে লাগলো- ‘চুপ, চুপ বেয়াদব কোথাকার! তোদের তো মন্তর দিয়ে বেঁধে রেখেছি।’
কে শোনে কার কথা! ভূতগুলো মহানন্দে চিৎকার করতে করতে লালু-ভুলুর সঙ্গে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল।
গণেশ দুঃখ করে বললো, ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় রে। কতো ভালো কাজ হতো তোদের দিয়ে! ঝুনঝুনওয়ালা তোদের নিয়ে গিয়ে তার আয়ুর্বেদ ওষুধের কারখানায় চোলাই করে কর্কট রোগের ওষুধ বানাতো। তা তোদের কপালে নেই। তা আমি আর কী করবো?’

মানুষের ভাগ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

 

মানুষের ভাগ্যটি আজ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। তা হলো এই, বাংলাদেশের দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি এখন আরো অসহ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি আসলে একদলীয়ই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্র ওই দলেরই হয়ে যায়। অপর দল আগের দলের মতোই আচরণ করে। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, পরের সরকার আগের সরকারের চেয়ে ভালো তো নয়ই, বরং আরো খারাপ হয়ে থাকে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি একদলীয় আরো এক অর্থে। সেটি হলো, উভয়দলই হচ্ছে বিত্তবানদের দল। সামাজিকভাবে তারা পরস্পরের পরিচিত, ক্ষেত্র বিশেষে আত্মীয়ও, অধিকাংশ সময়ই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ, ওঠাবসা একই রকমের, আচার-আচরণও তা-ই। দুটি দল হলেও তারা উভয়ই বড়লোকদেরই দল। এ জন্য তাদের এক দলই বলা যায়। লোকে বিকল্প খোঁজে। ভাবে, এ দুই দলের বাইরে যাবে। কিন্তু যাওয়া সম্ভব হয় না।


মাঝে মধ্যে সামরিক শাসন দেখতে পাওয়া যায়- কখনো প্রকাশ্যে, কখনো ছদ্মবেশে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া যায়, ভেতরে ভেতরে তারা ওই একই দলের। তারাও বিত্তবানদেরই স্বার্থ দেখে। স্বার্থ দেখার ওই কাজে যুক্ত হয় আরেক অপশক্তি। সেটি হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। এটি আরো ভয়ানক। ওই ভয়ানক শক্তিও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এর ফল সবচেয়ে ভয়াবহ।


আমরা ব্রিটিশ আমলে ছিলাম। অবশ্যই ভালো ছিলাম না। পাকিস্তান আমলও আমাদের জন্য দুঃসহ। এখন বাংলাদেশে আছি। কিন্তু ভালো আছি- এমনটি বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ আছেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগেই ভালো ছিলাম! কখন, কীভাবে ভালো ছিলেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। তারা আদর্শায়িত করেন পেছনের দিনগুলোর। কারণ বর্তমান অসহ্য, ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। অতীতে আমরা মোটেই ভালো ছিলাম না, অসন্তুষ্ট ছিলাম। এ জন্য আন্দোলন করেছি, মুক্তি চেয়েছি। শাসক বদল হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রও ভেঙেছে। পরে দেখা গেছে, মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের ভাগ্য বদলায়নি। কেবল শাসকই বদলেছে। নতুন যারা শাসক হয়েছেন তাদের কেউ কেউ অতীতে যে খারাপ অবস্থায় ছিলেন তা নয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ধনবান মানুষ এবং তারা একই দলের। একইভাবে শাসন অর্থাৎ শোষণ করছে। এটি আমরা বুঝি, কথাটি আমরা বলিও। তবে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু করতে পারি না।
দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে। তাকে উন্নতির লক্ষণ বলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? ওই প্রশ্নটি তো থাকেই। এটি শুধু গুণগত উৎকর্ষের বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, নাকি অসামাজিক হয়ে উঠছে? অসামাজিক হওয়ার অর্থ, এখানে শুধু যে অপরাধপ্রবণ হওয়া তা নয়, বিচ্ছিন্ন হওয়া। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হচ্ছে এবং ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি আগেও ছিল। এখন উন্নতির আলোক উদ্ভাসের আড়ালে এটি আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত মানুষ এখন কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, অন্যের স্বার্থ দেখতে চায় না। তার মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পায় না। সে অসামাজিক হয়ে ওঠে। শিক্ষাকে আমরা জাতির ভবিষ্যৎ বলে বিবেচনা করি। কোন ধরনের মানুষ এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে? স্বার্থপর, নাকি সামাজিক- এ প্রশ্নটি প্রাথমিক হওয়া উচিত, হয় না। এই অবস্থা কেমন করে বদল করা যাবে? ছোট ছোট সংস্কার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব সংস্কার প্রযুক্ত করতে হবে পুরো ব্যবস্থাটির পরিবর্তনের সঙ্গে। না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেমনটি হচ্ছে তেমনটি অন্যত্রও ঘটতে থাকবে এবং ঘটছেও।


বলা হয়, মানুষের চরিত্র ঠিক নেই। অভিযোগ, মানুষের মধ্যে সহনশীলতার বড় অভাব। দুটিই সত্য। কিন্তু মানুষ তার চরিত্র কীভাবে ঠিক রাখবে যেখানে সমাজ চরিত্রহীন! চরিত্রহীনরাই তো এখন সমাজের শীর্ষে রয়েছে। তাদের আদর্শেই সাধারণ মানুষ দীক্ষিত হচ্ছে। সহনশীলতা অবশ্যই নেই। কেননা সমাজে লুণ্ঠনই হচ্ছে প্রধান সত্য। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির লালসায় এমন কাজ নেই যা করতে লোকে পিছপা হয়। মানবিক সম্পর্কগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি সেটি নিশ্চয়ই এ সমাজ এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এ সমাজ ভেঙে সেখানে নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এই নতুন সমাজের জন্য যথোপযুক্ত মতাদর্শ প্রয়োজন। ওই মতাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই বিকল্প সমাজ গড়া সম্ভব। মতাদর্শের ব্যাপারটি দার্শনিক।


এ প্রসঙ্গ উঠলেই বলা হয়, এটি হচ্ছে বড় বড় কথা। এ রকম ধারণার পেছনে যে যুক্তি নেই তা নয়। মতাদর্শ অনেক সময়ই বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে চায় না। সাধারণ মানুষ ছোট ছোট সমস্যার কারণে মতাদর্শের কথা ভাবার সুযোগ পায় না। আর মতাদর্শে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এর পথ খুঁজে পান না।
মূল ব্যাপারটি সোজা। তা হলো ব্যক্তির মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটি অর্জন করতে হলে সমষ্টিগত ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। যে কিশোর একদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষে তিনি পেশা নিয়েছেন শিক্ষকতা। কিন্তু দেখলেন, মুক্তি আসেনি। কারণ শাসক বদল হয়েছে ঠিকই, ব্যবস্থার বদল হয়নি। ওই শিক্ষককে আবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। এবার তার আন্দোলনটি পেশাগত। তিনি যে আন্দোলনরত অবস্থায় প্রাণ দিলেন এতে এটিই প্রমাণ হলো, ব্যক্তিগত মুক্তি তো বটেই, পেশাগত মুক্তিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়।


আমাদের এই বদ্বীপে মাটি শক্ত নয়। তাই খুঁটি গাড়তে হয় এবং খুঁটিই অবলম্বন করা চাই। এ খুঁটি হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। সমাজে এখন সবাই ওই খুঁটি গাড়তে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়েছে। এমন ব্যাপক নিষ্ঠুরতা সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি কেমন করে সৎ থাকবে! সৎ থাকতে গেলে হয় তিনি বিপদে পড়বেন, না হলে পিছিয়ে পড়বেন। আর যদি ব্যক্তি সৎ থাকতে পারে তাহলেও কি সমাজ বদল হবে? মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করার জন্য এ অসুস্থ সমাজ বদল করা চাই। এ জন্যই দরকার বিকল্প রাজনীতি। সংগঠিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজ বদলাবে। লক্ষ্যটি থাকবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এটিকে সমাজতান্ত্রিক বললেও অন্যায় করা হবে না। কেননা এ সমাজে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমাদের গণমাধ্যম, টেলিভিশন, আলাপ-আলোচনায় অনেক কথাই বলা হয়। সেগুলো ফুলঝুরির মতো। কিন্তু মূল সমস্যাটি যে এ অসুস্থ সমাজ বদল করা সেটি উঠে আসে না।


এখন এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত যে, প্রাইভেট মানেই ভালো আর পাবলিক মানেই খারাপ। এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন- সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। অথচ আমরা যে মুক্তির জন্য লড়েছি তা সব সময়ই ছিল পাবলিকের কাজ, প্রাইভেটের নয়। কিন্তু এখন পাবলিক হেরে গেছে প্রাইভেটের কাছে। এ জন্যই আমাদের এমন দুর্দশা। শেয়ার মার্কেটের কথা ধরা যাক। সেখানে যে কেবল মতলববাজ ও ধড়িবাজরাই যায় তা নয়। নিরুপায় সাধারণ মানুষও ভিড় করে। এর কারণ হলো, পাবলিক বিনিয়োগের স্থান অত্যন্ত সংকুচিত। ওই ক্ষেত্রটি প্রসারিত হলে মানুষ সেখানেই যেতো। এখানে না যেতে পেরে মানুষ প্রাইভেটের কাছে যায় এবং বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে যা দরকার তা হলো পাবলিককে বড় করা প্রাইভেটের তুলনায়। তাহলেই প্রাইভেট নিরাপদ হবে। আসলে ব্যক্তিও তো বিবেচনার চূড়ান্ত বিন্দু। তাকেই সমৃদ্ধ ও সুখী করা চাই। কিন্তু ব্যক্তি জড়িত সমষ্টির সঙ্গে। এ জন্য সমষ্টির ভাগ্য না বদলালে ব্যক্তির ভাগ্যও বদলাবে না এবং যতোটুকু বদলাবে তা সুরক্ষিত থাকবে। বদলটি এখানেই দরকার। দেশের মানুষ এ বদলের জন্যই সংগ্রাম করেছে। বার বার তারা দেখেছেন প্রাইভেট পদদলিত করছে পাবলিককে। তাই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ মোটেই শেষ হয়নি। এ যুদ্ধটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাই সমাজ বদলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।


সমাজ বদলের প্রশ্নে দু’দলই অনড়। কেননা ওই ঘটনাটি ঘটলে তাদের সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই জনগণকে এগোতে হবে মুক্তির দিকে। মুক্তির ওই যাত্রায় কারা নেতৃত্ব দেবেন? তারাই নেতৃত্ব দেবেন যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। কতো দ্রুত তারা এগিয়ে আসছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন এর ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ‘বিকল্প চাই’- এ উপলব্ধিটি এখন প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু ওই আওয়াজ যেন এর আসল প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের বিভ্রান্ত না করে। এ প্রয়োজনটি হলো সমাজ রূপান্তরের অর্থাৎ সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন জরুরি। তবেই মানুষের সত্যটি একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের অবস্থানটি নিশ্চিত হবে সবার উপরে।

জলকাচ

রঞ্জনা ব্যানার্জী

 

এক ঝলকেই চিনে ফেলেছিলাম। অল্পক্ষণের দেখা। তাও ভুলিনি। মাথার ভেতর খোদাই হয়ে আছে ওই শেষ বিকেলের সূর্যের পিছলানো আলো, কনকনে ঠান্ডা জলে পাথরের খাঁজ থেকে খুঁচিয়ে বের করা গোলাপি অথবা বেগুনি ওই কাচ!
আমাদের খাবার আসতে দেরি হচ্ছিল। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ। আমার জন্মদিন। অনেক দিন পর আমরা বাইরে খেতে এসেছি। বিয়ের পর পর বাইরেই খেতাম বিশেষ দিনগুলোয়। এক সময় বিশেষ দিনগুলো আর বিশেষ রইলো না। কাজের চাপে অদ্রিশ তারিখ নয়, বারের হিসাব রাখতো। আর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ঢুকে গিয়েছিল প্ল্যানারে- গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের নিকাশে। ওইসব অতি বিশেষ দিনের ক্রমাংকে আমার বিশেষ দিনগুলো বিশেষত্ব হারিয়েছিল।
সেদিন অদ্রিশ মেনু কার্ডে চোখ বোলাচ্ছিল। আমি মেনু দেখছিলাম না। দেখার দরকার নেই। আমি জানি কী খাবো। ফিশ অ্যান্ড চিপস। এবার কন্সিভ করার পর থেকে ওই খাবারটাই আমার পছন্দের চূড়ায়।
কাচটা আসলে বেগুনি, গোলাপি নয়। এই সেদিন লকেটে বাঁধাই করে দিয়েছে অদ্রিশ। এখন আমার গলায় থাকে বুকের মধ্যিখানে গা ছুঁয়ে। ওয়েট্রেস মেনু বুঝে নেয়ার সময়ই চোখ চলে গেল অদূরে। আমার কোণাকুণি বসেছিলেন তারা। কোনো সিনিয়র ক্লাবের ক্রিস্টমাস পার্টি হবে হয়তো। কেউ কেউ মাথায় সান্টা টুপি পরেছে, কেউ রেইন ডিয়ার অ্যান্টলার। আমাদের খাবার চলে এসেছিল মিনিটেই। অদ্রিশের শর্মা আর করোনা বিয়ার। আমার হেডক ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’, সঙ্গে টারটার সস’ আর লেবু দেয়া জল। আমি যেখানে বসেছি সেখান থেকে তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। দুটি টেবিল লাগিয়ে বসেছেন তারা। দশজনের মতো। তাদের মধ্যে বেমানান এক সুকেশী তরুণীও আছে। কেবল তার মাথাতেই উৎসবমুখর কোনো টুপি নেই। পরিপাটি চুল। হঠাৎ চেহারাটা মনে পড়ে গেল। এ তো তিনি! শির শির শীত লাগছিল আমার। বিশ্বাস হচ্ছিল না!
আমার চমকানো অদ্রিশের নজর এড়ায়নি- ‘কী ব্যাপার?’ মাছের ফিলেতে সবে ছুরি কাটা গেঁথেছিলাম। জমে রইলো হাত। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল অদ্রিশ। পেটের ভেতর ঠিক তখনই আমার রাজকন্যা আলতো নড়ে উঠেছিল। আমি কোনোমতে বলি, ‘সেই ভদ্রলোক!’ অদ্রিশ জিজ্ঞাসু চেয়ে থাকে।
তরুণীকে দেখি জায়গা ছেড়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছে। খাওয়া শেষ তাদের? আমার তর সয় না। হারানো যাবে না তাকে। অদ্রিশের অবাক দৃষ্টি উপেক্ষা করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াই। চলে যাই সটান তাদের টেবিলে। তরুণী তখনো কাউন্টারে। ভণিতা না করেই জিজ্ঞাসা করি, ‘কেমন আছেন?’ তার চোখে বিভ্রান্তি। তড়বড় করে বলি, ‘জলকাচটা আমিই খুঁচিয়ে বের করেছিলাম।’ আমার দিকে তিনি ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকেন। ‘আপনার মনে নেই?’ ঠিক তখনই অনুভব করি আমার পিঠে অদ্রিশের হাত। টেবিলের অন্যরা অবাক তাকিয়ে! তার সামনে ছোট একটা চকোলেট কেক। ‘হ্যাপি বার্থডে টু রন’। মাঝখানের মোমবাতিটা জ্বালানো হয়নি। ম্যানেজার ছুটে আসে। তার সঙ্গে তরুণী- ‘এনিথিং রং?’ লকেটটা তুলে ধরি- ‘মনে পড়ে? এ কাচটা বিরল। কেবল সময়ের হিসাবে নয়, এটিই আমাকে অন্ধকার খাদ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। আমার এই দ্বিতীয় জীবন আপনার দান।’ তিনি অপলক তাকিয়ে থাকেন লকেটটার দিকে। গলা থেকে খুলে লকেট তার চোখের সামনে ধরি। তিনি হাতে নেন, দেখেন। বিড় বিড় করে বলেন, “একশ’ বছরের কাছাকাছি হবে, ভেরি রেয়ার।” আমি অবাক! তিনি জানতেন। ‘আপনি বুঝেছিলেন সেই দিন?’ তিনি মৃদু হাসেন এবং লকেটটা আমাকে ফিরিয়ে দেন। আমার মাথা কাজ করছিল না। চেনা নেই, জানা নেই আমাকে কেন দিয়েছিলেন? তরুণী ও অন্যরা অবাক তাকিয়ে! অদ্রিশ বুঝে গেছে ততক্ষণে। সেই বলে ঘটনাটা- এক কিউরেটর ওই এত্তটুকু পাথরটার জন্য তিন হাজার ডলার চেয়েছিল। ওই থেকে আমরা খুঁজছি তাকে। ‘এটা আপনার কাছে রেখে দিন’- অদ্রিশ অনুরোধ করে। আমার দিকে তিনি তাকিয়েছিলেন। অথচ আমাকে দেখছেন বলে মনে হচ্ছিল না- ‘ওটা তোমার গলাতেই মানাচ্ছে।’ স্থান-কাল ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরি। আমার মাথায় আলতো হাত বোলান- ‘গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড।’ তরুণী জানায়, তিনি তার দাদু। বাকিরা তার দাদুর বন্ধু এবং আজ তার জন্মদিন। আমার বুক ধক করে ওঠে। মনে হতে থাকে, সবকিছু অন্য কারো ছকে ঘটছে! তরুণীকে আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর দেয় অদ্রিশ। যদি তিনি মত পাল্টান তাহলে যেন নিঃসংকোচে জানান আমাদের। ফিরে আসি নিজের জায়গায়। পেছনে তখন সবাই গাইছে- ‘হ্যাপি বার্থ ডে টুু রন।’ আমিও মনে মনে গাই, ‘হ্যাপি বার্থডে টু আস।’
তারা বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমরাও উঠে পড়ি। ওই রাতে অনেকক্ষণ বার্কলি বিচে বসে ছিলাম দু’জন। আকাশজুড়ে হাজার তারার বুটি। ঠিক মাঝখানে গোল কাঁসার থালার মতো চাঁদটা জেগে ছিল আমাদের চোখের জলের সাক্ষী হয়ে। ওই সৈকতেই সেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অথবা আমার দ্বিতীয় জীবনপ্রাপ্তি হয়েছিল।
‘তুমি চাইলে রাখতে পারো। আমি বাবল দেয়া কাচ খুঁজছি’- তিনি বলেছিলেন। কথা বলার সময় সেদিনও আমাকে দেখেছিলেন। অথচ দেখছিলেন না। ভারী কাচের ভেতর দিয়ে তার চোখ আমার চোখ ছুঁতে পারেনি। দৃষ্টিহীনদের মতো আমাকে ছাড়িয়ে অন্য কোথাও ভেসে গিয়েছিল ওই দৃষ্টি। বাবল দেয়া কাচ মানে কী বুঝতে পারিনি, জানতেও চাইনি। হাত বাড়িয়ে চুপচাপ নিয়েছিলাম। গোলাপি মসৃণ ছোট ত্রিভুজ আাকৃতির স্বচ্ছ পাথর। কখনো গোলাপি কাচের পাথর দেখিনি আগে। মাঝে মধ্যে দুধসাদা বা সবুজ চোখে পড়েছে বালিতে অথবা জলের নিচে। ভদ্রলোক পাথরটি আমার হাতে গুঁজেই পা চালিয়েছিলেন উল্টোদিকে। খাকি শটস আর ক্রিম টি-শার্ট ও মাথায় হ্যাট। সূর্য ঢলার আগের তীব্র কমলা আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়েছিল। আমি চোখের ওপর হাত ঢেকে আলো ছেনে তার চলে যাওয়া দেখেছিলাম।
আমি একাই এসেছিলাম সেদিন। আমার কাজ ঠিক বেলা ৩টায় শেষ হয়েছিল। লাইব্রেরিতে তেমন লোকজন ছিল না। বইগুলোর কল নম্বর মিলিয়ে তাকে তুলে রাখার পর তাকে সাহায্য করেছিলাম বই বাছাইয়ে। ছেঁড়া-খোঁড়া, অতি ব্যবহারে বাঁধাই ঢিলে হয়ে যাওয়া বইগুলো ‘ফ্রেন্ডস অফ লাইব্রেরি’র চ্যারিটিতে যাবে। বেলা ১১টার দিকে দুই শিশু এসেছিল তাদের মায়েদের সঙ্গে। হল্লা হয়েছিল খানিকটা। একই পাজল নিয়ে দু’জনেই টানাটানি।
আমি অনিয়মিত। কেবল কেউ ছুটিতে গেলেই ডাক পড়ে। সাধারণত শনি-রবিবারের শিফটেই আমাকে ডাকে। ওই দু’দিন ভিড় থাকে অনেক। সেদিন বুধবার। হঠাৎ করেই আমার ডাক পড়েছিল। কেবল দু’ঘণ্টা। যার শিফট তিনি হঠাৎ অসুস্থ। অনেক দিন পর উইক ডে-তে কাজ। রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। বাড়িতে দম বন্ধ লাগছিল।

ব্রাউন আর গার্থ এসেছিলেন লাঞ্চের পর। তারা রোজ আসেন। দু’জনই রিটায়ার্ড। শনি বা রবিবারে তারা আসেন না। তাই আমার সঙ্গে খুব একটা দেখাও হয় না। গার্থ বেশ আলাপী। লাইব্রেরিতে বই পড়ার চেয়ে কথা বলাতেই তার আগ্রহ বেশি। সেদিন আমাকে দেখে নামটা বলার চেষ্টা করলেন বেশ ক’বার। আমার নাম স্নিগ্ধা। ছোট করার কোনো উপায়ই নেই। আমার সুপারভাইজর শুরুতে নামটি ছাঁটাই করে ‘সু’ বলে ডাকার চেষ্টা করেছিলেন। আমি সাড়া দিইনি। আমার নাম নিয়ে কেউ কারিকুরি করুক তা আমার পছন্দ নয়। ‘স্নিগ্ধা’ শেষমেশ তাদের কাছে হয়ে গেছে ‘স্নিডা’। তাও সই। তবে সু কিছুতেই নয়।
গার্থ বিপত্নীক । ছেলেমেয়ে নেই। সেদিন বলেছিলেন সরকারি হোমে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কাজের বাইরে আমাদের কথা বলা নিষেধ। সুপারভাইজর সব খেয়াল করেন। তাই গার্থের সঙ্গে কথা এগোয়নি। আসলে সেদিন তার সঙ্গে দেখা না হলে সৈকতে যাওয়া হতো না আর নিকষ কালো বিষন্নগন্ডি থেকে আমিও বের হতে পারতাম না। তিনি যাওয়ার সময় পেয়ারাগন্ধি এক ধরনের লজেন্স দিয়েছিলেন হাতে গুঁজে। তা ছোট ছোট ও দারুণ স্বাদের। আমার চোখে জল জমেছিল। ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কোনো অনর্থ না হয়ে যায়! কাজে ইমোশন দেখানো নিষেধ। সবাইকে ছেড়ে আমাকে কেন? কেন যেন মনে হয়েছিল, তিনি জেনেছেন কোনোভাবে। আমার অগোচরে আমার মিসক্যারেজ আর মেল্ট ডাউন নিয়ে কথা হয় আমি জানি। পৃথু বৌদি সুপারভাইজরের পড়শি। পৃথু বৌদির সূত্রেই আমার এ কাজটি পাওয়া।
সে ১৩ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই চলে গিয়েছিল। তাল তাল রক্ত। হাসপাতালে পুরোদিন রাখেনি, পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাড়িতে ঢুকতেই সাপের মতো পাক খেয়ে খেয়ে ঠা-া গ্রোথ তলপেট বেয়ে উঠছিল। দরজা খুলে বাঁক নিলেই ওই ছবি। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, গাঢ় নীল ঘেঁষা কালো চোখ। আমি তাকাইনি। আমাকে হাতে ধরে বিছানায় দিয়ে এসেছিল অদ্রিশ। ছবিটি চুম্বকের মতো টানছিল। পায়ে পায়ে চলে গিয়েছিলাম আবার প্যাসেজে। ‘মাম্মা’- আমার কানের কাছে কেউ ফিসফিসিয়ে ডেকেছিল। আহা বাবুটা আমার! মায়ের কাছে রইলি না। আমি হাঁটু ভেঙে পড়ে গিয়েছিলাম ছবিটার সামনে। রাতে পৃথু বৌদি আর তপনদা এসেছিলেন। পৃথু বৌদি অনেক বুঝিয়েছিলেন- ‘১৩ সপ্তাহে কিছুই তৈরি হয় না। অযথাই মন খারাপ করছ।’ আমার এসব কথা একদম ভালো লাগছিল না। অদ্রিশকেই ভস্ম করছিলাম মনে মনে। কী দরকার ছিল রাজ্যের লোককে ডাকার!
স্বপ্নটি দেখতে শুরু করি আরো পরে। ফেনা ফেনা ঢেউয়ের চূড়ায় সে বসে আছে। মাথা ঘিরে দেবশিশুর মতো সবুজ শ্যাওলার মালা। মাম্মা!- দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে। এতো কাছে। তাও কিছুতেই তাকে ছুঁতে পারছিলাম না। ‘মাম্মা’!- ধড়মড় করে উঠে বসেছিলাম। বিছানা থেকে নেমে চলে গিয়েছিলাম ছবিটির কাছে। চুলের ডগায় জলের ফেনা লেগে আছে যেন। অদ্রিশ এসেছিল পিছু পিছু। কিছু বলেনি। লিভিংরুমে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসেছিলাম শোয়ারঘরে একা। সারা রাত এপাশ-ওপাশ করেছি। সকালের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি অদ্রিশ নেই। ছবিটি যে নেই তা বুঝেছি অনেক পর। কিন্তু ফাঁকা দেয়ালজুড়ে এক মাথা ঝাঁকড়া চুলে জলের বিন্দু নিয়ে সে জেগেই রইলো। অদ্রিশকে কখনো জিজ্ঞাসা করিনি ছবিটির কথা।
আমার ঘুম হতো না রাতে। কেবল কানভরে ঢেউয়ের গর্জন আর মাম্মা ডাক। মাঝে মধ্যে নোনা জলের গন্ধ ঝাপটা দিতো নাকে। সে কী বলতে চায় আমাকে? ওই শুরু। সময় পেলেই জলের ধারে। বার্কলি বিচ আমার বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের ড্রাইভ। পুরো সামার প্রায় প্রতিদিন গিয়েছি। কোনো কোনোদিন দু’বার। মনে হতো হেঁটে চলে যাই ঢেউয়ের চূড়ায় তার খোঁজে।
সেদিন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়েও এসেছিলাম গোধূলিবেলায়। দিন ছোট হচ্ছে। গাড়ি পার্ক করে পাথরের সিঁড়ি ভেঙে জলের কাছে যেই এলাম সেই সূর্য ডোবার আনজাম করছে। ভদ্রলোককে শুরুতে খেয়াল করিনি। বালিটা পেরিয়ে হাঁটুজলে দাঁড়িয়েছিলাম। মাংস কেটে হিম ঢোকাচ্ছিল ঠান্ডা কনকনে জল। সূর্যটা বাম কোণায় লাল চোখে শেষ জরিপ করছে। কেউ নেই আশপাশে। মনে হলো আজই ওইদিন! এই অস্থিরতার শেষ হোক আজ। হঠাৎ দেখি তাকে। আমার ডানপাশে। একটু দূরে যেন জল ফুঁড়ে বের হলেন! উবু হয়ে জলের নুড়ির খাঁজ থেকে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করছিলেন। আচমকা মাথা তুললেন এবং আমাকে বললেন, ‘সাহায্য করবে একটু?’ আমাকে ঝট করে কেউ যেন টেনে ফেরালো তীরে। এগিয়ে গেলাম। তিনি দেখালেন ছোট, প্রায় দেখা যায় না এমন গোলাপি আভার কাচের টুকরোটি। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা! এতো ছোট টুকরো নজরে এলো কীভাবে? তার বাঁকানো লোহার শলাটা দিয়ে টেনে বের করতে পারছিলেন না। হাত ডুবিয়ে নখের খোঁচায় দু’তিনবারের চেষ্টায় বেরিয়ে এলো বাইরে। কী সুন্দর! আমার হাত জমে গিয়েছিল ঠান্ডায়। তিনি উঁচু করে সূর্যের দিকে মেলে ধরলেন টুকরোটি। এরপরই জানালেন, বাবল নেই এতে। চাইলে আমি রাখতে পারি। হাত পেতে নিয়েছিলাম। মুঠোবন্দি করার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতের ওম ফিরে এসেছিল। ভেতরে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। চোখ তুলতেই দেখি চলে যাচ্ছেন তিনি।
বাড়ি ফিরে লাইটের আলোয় আবিষ্কার করেছিলাম কাচপাথরটি গোলাপি নয়, হালকা বেগুনি। অন্য রকম। অদ্রিশ এলেই তাকে দেখাই। সেও অবাক হয়! নাইটস্ট্যান্ডের ওপর ছোট পোর্সেলিনের বাটিটার ভেতরে রেখেছিলাম। অনেক দিন পর ওই রাতে শিশুর মতো ঘুমিয়েছিলাম। সকালে বেশ দেরি করেই ঘুম ভাঙে। চোখ খুলেই পাথরটার কথা মনে হয়। অদ্রিশ ততোক্ষণে চলে গেছে কাজে। কিন্তু পাথরটা গেল কোথায়! টেবিলের নিচে, আশপাশে তন্ন তন্ন খুঁজি। কোত্থাও নেই। হালকা সন্দেহ ছুঁয়ে যায়। ছবিটি ফেলে দিয়েছিল, কাচটাও কি?
মন খারাপ করে বসে ছিলাম। হঠাৎ মনে পড়লো, তিনি বলেছিলেন- ‘বাবল নেই, তুমি চাইলে রাখতে পারো।’ বাবল দেয়া কাচ মানে কী? আমি ল্যাপটপ নিয়ে বসি। এরপরই খুলে যায় এক অদ্ভুত দুনিয়া। কখন যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো তা জানতেই পারিনি। অদ্রিশ এসে আলো জ্বালে। ঘরের কাজ কিছুই হয়নি। খাওয়া-দাওয়াও না। অদ্ভুত চোখে সে দেখছিল আমাকে। কাচটির কথা আমার মনেই নেই আর। উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারি না- ‘জানো, বাবল দেয়া কাচগুলোর অনেক দাম এখন। এগুলো হাতে তৈরি কাচ। গ্লাস ব্লো করে কাচের বোতল বানানো হতো তখন। গোলাপি কাচটি কেমন বেগুনে লাগছিল না? ওটা অনেক আগের। ১৯১৫ সালের পর এখানে এমন কাচ আর বানানো হয় না। এতে ম্যাঙ্গানিজ মেশানো। সাদা ছিল এক সময়। সূর্যের আলোয় এমন বেগুনি হয়ে গেছে।’ আমাকে কথায় পায়। অদ্রিশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ! তারপর আমার ড্রেসিংটেবিলের ওপর গয়নার বাক্স থেকে কাচের টুকরোটি বের করে হাতে দেয়। ওই অদ্ভুত প্রশান্তি ফিরে আসে।
সেদিন রাতে আমার চোখের পাতা লাগতেই স্বপ্নে দেখি গোধূলিবেলা। চিক চিক বালির ভেতর সবুজ, হলুদ, লাল- আরো কত রঙ! এরপর থেকেই আমার জলকাচের নেশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি জলের ধারে, সৈকতে। কাচ পাওয়ার সম্ভাব্য সময়গুলো জেনেছি। জেনেছি পূর্ণিমায় যখন চারপাশ ভেসে যায় তখন ঢেউ বয়ে আনে জলকাচ। ভাটার দু’ঘণ্টা আগে বা পরে বেড়ে যায় ওইসব গুপ্তধন পাওয়ার সম্ভাবনা। ভিড় ছাপিয়ে আমার মতো কাচপ্রেমীদের ক্রমেই আলাদা চিনতে শিখেছি। জেনে গিয়েছি কাচ সংগ্রাহকদের অদৃশ্য কঠোর নিয়ম। ঢেউয়ের ওই দান সবটুকু নেয়া যায় না, কিছু রেখে আসতে হয়। মাঝে মধ্যে অদ্রিশও সঙ্গী হয় আমার।
মেয়েটি ফোন দিয়েছিল দু’তিন দিন পর। তার নাম লরা। জানিয়েছিল, তার দাদু তথা রন আলঝেইমারের রোগী। প্রায় ২০ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় ওই সাগরেই ডুবে মৃত্যু হয়েছিল তার মেয়ের। তিনি লরার মা। জলকাচের গয়না গড়তেন তিনি। দূর-দূরান্ত থেকে মেয়ের জন্য কাচ কুড়িয়ে আনতেন তিনি। কাচ নিয়ে তার অগাধ পড়াশোনা। চোখের দেখায় নির্ভুল বলে দিতে পারতেন সময় বা কাচের মূল্যমান। আলঝেইমার ধরা পড়েছিল বেশ আগে। ক্রমেই গুটিয়ে নিচ্ছিলেন নিজেকে। গত এক বছর লোকজনের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। স্টেইজ ফাইভ। এমনই হওয়ার কথা। স্মৃতি চলে গেছে এরও আগে। লরা অবাক হয়েছিল সেদিন! কেননা এক বছর পর তার দাদু পুরো অর্থপূর্ণ বাক্য বলেছেন। সে বললো, ‘কাল তোমরা আমার দাদুকেও নতুন জীবন দিলে। ধন্যবাদ তোমাদের।’ লরার ধারণা, রন তার মেয়ের ছাপ দেখেছিলেন আমার মধ্যে। তাই জেনে-বুঝেই অসাধারণ কাচটি আমাকে দিয়েছিলেন তিনি। ফোন রেখে দেয়ার পর লকেটটা হাতে নিয়ে দেখছিলাম। কেমন গাঢ় বেগুনি লাগছে যেন! হয়তো মনের ভুল।
আমার শরীরের ভেতর বাড়ছে আমার কঙ্কাবতী। ‘মাম্মা’- আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমি জানি, সে থাকবে এবার।

মুক্তিযুদ্ধের সার্থকতার জন্য

যতীন সরকার

 

‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়, মুক্তিযুদ্ধ
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’
- শামসুর রাহমান

 

কবির এই খেদোক্তি মিথ্যা নয় নিশ্চয়ই। মুক্ত স্বদেশকে উদ্ভট উটের পিঠে চলতে আমরা সবাই তো দেখেছি ও দেখছি, এখনো সে চলার বিরাম হয়নি। সেই চলাকে আমরা কখনোই যে মেনে নিয়েছি, তাও নয়। উদ্ভট উটের পিঠ থেকে আমার স্বদেশকে নামিয়ে আনার চেষ্টাও আমরা করেছি। আমাদেরই মধ্যে এ রকম চেষ্টা করতে গিয়ে যার বুক-পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল তার নাম নূর হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নূর হোসেনের আত্মত্যাগের কথা আমরা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি। কবি শামসুর রাহমানও তাই করেছেন। কিন্তু নূর হোসেনের হত্যাকারী ধর্মান্ধের দল এখনো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিধর এবং সেই শক্তির প্রকাশ তারা প্রতিনিয়তই ঘটিয়ে যাচ্ছে। শামসুর রাহমানের মতো কবিকেও তাদের শক্তির লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এ সম্পর্কে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার লিখেছেন- 

“বুকেপিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন নূর হোসেন। তাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান- ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। ওই বুক শামসুর রাহমানের নিজেরও ছিল। সেখানে সেক্যুলার মানবতার পদ্ম ফুটতো। ওই পদ্ম অসহ্য বলে ধর্মান্ধরা তাকে খুন করতে চেয়েছিল। ছেলে ফায়াজের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন সে যাত্রায়। আরো একটি ওই রকম বুকের মানুষ ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সে বুকও রক্তাক্ত করেছিল ধর্মান্ধরা।”
শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদ- দু’জনই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাদেরই মতো যাদের বুকে ‘সেক্যুলার মানবতার পদ্ম’ ফোটে তারা আজও অসহায়। ধর্মান্ধদের কাছে ওই ‘পদ্ম’টি আজও অসহ্য। অথচ ওই সেক্যুলার মানবতার পদ্মটিকে অধিগত করাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পাকিস্তানি শাসনে ওই পদ্মটি ছিল আমাদের নাগালের বাইরে। তাই ওই পদ্মটিকে পাওয়ার জন্য পাকিস্তানকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, আমরা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছিলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ওই সংগ্রামের সমাপ্তি
ঘটিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি, বরং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সে সংগ্রামের প্রকৃত সূচনা ঘটেছিল। সেই সূচনাতেই আমরা একটি পাকা দলিল তৈরি করে রাষ্ট্রের ওপর আমাদের (অর্থাৎ জনগণের) মালিকানা পাকা করে

নিয়েছিলাম। সেই দলিলটির নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। অভিজ্ঞজনরা বলেন, এমন সংবিধান নাকি পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রেরই আছে। আমাদের সংবিধানটি তো আসলে লেখা হয়েছে লাখ লাখ শহীদের রক্তের অক্ষরে। এর প্রতিটি বাক্য সেই রক্তের ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকারের ধারক। অবিরাম মুক্তি সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েই সেই অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। দেশের প্রতি মানুষকে ক্ষুধা, নগ্নতা, অশিক্ষা, কর্মহীনতা ও অনিরাপত্তা থেকে মুক্তি দেয়াই অবিরাম এবং অনিঃশেষ মুক্তি সংগ্রামের লক্ষ্য। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা স্বাধীন দেশে পথচলা শুরু করেছিলাম। স্বাধীনতাকে সার্থক করে তোলার প্রত্যয়ই ধারণ করেছিল আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুই হয়েছিলেন মুক্তি সংগ্রামেরও সেনাপতি।
কিন্তু হায়, আমাদের সেনাপতিকেই সপরিবারে নিহত করে অট্টহাস্য করে উঠলো স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের ঘৃণ্য দুশমনরা। তাদের অট্টহাস্যকে স্তব্ধ করে দিতে পারলাম না আমরা। কেবল নিষ্ফল ক্ষোভে আঙুল কামড়ানো ছাড়া কিছুই যেন করার রইলো না আমাদের। আমাদের সংবেদনশীল কবিদের কণ্ঠেও হাহাকার ধ্বনিত হয়ে উঠলো। এমনই এক কবি অকাল প্রয়াত রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ অসহ্য হয়ে ওঠায় রুদ্ররোষে তিনি বলে উঠলেন-
‘স্বাধীনতা- এ কি তবে নষ্ট জন্ম?
এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল!
জাতির পতাকা আজ খামচে ধরছে পুরনো শকুন।
বাতাসে লাশের গন্ধ-
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান।’

বাতাসে লাশের গন্ধ এখনো মিলিয়ে তো যায়ইনি, প্রতিনিয়ত সে গন্ধ বরং বাতাসকে কেবলই দূষিত করে চলছে। সেই গন্ধের হাত থেকে কি মুক্তি মিলবে না আমাদের?
মিলবে অবশ্যই। তবে সে মুক্তি আপনাআপনিই আমাদের হাতে এসে ধরা দেবে, আমাদের কিছুই করতে হবে না- এমন ভেবে আত্মপ্রসন্ন হয়ে বসে থাকলে সেটি হবে মূর্খের স্বর্গবাস। ওরকম মেকি স্বর্গ থেকে মাটিতে নেমে আসতেই হবে। আত্মপ্রসাদের সামান্যতম অবকাশও নেই। জাতির পতাকাকে যারা খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুনগুলোর নোংরা হাতগুলো ভেঙে না দেয়া পর্যন্ত আমাদের পরিত্রাণ নেই। শুধু পুরনো শকুন নয়, তাদের নতুন চেলাগুলোও রেয়াত দেয়া চলবে না। মিত্রের বেশ ধরে আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়া শত্রুদের যথাসময়ে চিনতে পারিনি বলেই অনেক বিপত্তি এতকাল ধরে পোহাতে হয়েছে। এখনো যদি শত্রু-মিত্র চিনে নিতে না পারি তাহলে সেসব বিপত্তি আরো বহু গুণিত হয়ে দেখা দেবে।
সমস্ত বিপত্তি থেকে পরিত্রাণ লাভের একমাত্র উপায়ই হলো মুক্তি সংগ্রামের মূল্যবোধের আলোয় পথচলা। আমাদের শত্রুদের লক্ষ্যই হলো সেই আলোটি নিভিয়ে ফেলা, অন্তত জনগণের দৃষ্টিসীমা থেকে আলোটিকে দূরে নিয়ে যাওয়া। সেই আলোকবর্তিকাটি আড়াল করে খোঁপ খোঁপ অন্ধকার তারা এখানে-সেখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ রকম অন্ধকারের মূল উপাদানই হলো ধর্মান্ধতা। স্পষ্ট করে বলি- ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতা। আমাদের মানুষের ধর্মপ্রাণতা হচ্ছে ‘ধর্ম’ শব্দটির মূল মর্মের ধারক আর ধর্মান্ধতা ধর্মের মূল মর্মেরই সংহারক। ধর্মপ্রাণদের চিত্ত শুভবুদ্ধি ও মুক্তবুদ্ধিতে ভরপুর বলেই সাম্প্রদায়িকতা তাদের কাছে একান্তই ঘৃণ্য। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতাই ধর্মান্ধদের আশ্রয়। জনগণের ইহলৌকিক মঙ্গলবিধায়ক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকেও তারা ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার আওতায় নিয়ে আসার কোশেশ করে। দেশের ধর্মপ্রাণ লোকসাধারণের কাছে ধর্ম হচ্ছে তাদের অন্তরের গভীরে সুরক্ষিত অমূল্য সম্পদ। আর ‘হৃদয়ের অন্তস্তলে যে মানিক গোপনে জ্বলে সে মানিক কভু কি কেউ বাজারে বিকায়?’ অথচ ধর্মান্ধরা তো ধর্মকে বাজারের পণ্যেই পরিণত করে ফেলে।
ধর্মের এ রকম বাজারি পণ্য হওয়া রোধ করতেই আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে আমরা সেক্যুলার মানবতার পদ্ম দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কারণ ওরকম রাষ্ট্রেই তো ‘গণতন্ত্র’ তার সহস্র দল মেলে সবার জন্য সুবাস ছড়ায় এবং সেই গণতন্ত্রই রাষ্ট্রের সব অধিবাসীর জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-বাসস্থান-কর্মসংস্থান-নিরাপত্তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করে। কিন্তু একান্ত দুঃখ এই- সেই একান্ত বাঞ্ছিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছি।
হ্যাঁ, গণতন্ত্রের একটা কাঠামো আমরা বজায় রেখেছি বটে কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই কাঠামোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অন্তঃসারের দেখা মিলবে না। জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে বা অন্যত্র পাঠায়। উদ্দেশ্য- প্রতিনিধিরাই গণতন্ত্রকে সার্থক করে তুলবে। আসলে সেটি হয় কী!
হয় না যে, সে কথা বোঝানোর জন্য একটুও বাকবিস্তারের প্রয়োজন পড়ে না। এটি সর্বজনজ্ঞাত সত্য। সংসদকে ফালতু বানিয়ে তোলার ক্ষেত্রে, মাসের পর মাস সংসদে না গিয়ে সংসদ সদস্যের সব সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে, সংসদে গিয়েও জনগণের সমস্যা-সংকটের সমাধান খোঁজার বদলে নোংরা খিস্তিখেউড়ের আসর জমিয়ে তোলার ক্ষেত্রে- ‘ক’ দল আর ‘খ’ দলের মধ্যে কোনোই তফাত দেখতে পাওয়া যায় না। ভোটের আগেকার ও পরেরকার জনপ্রতিনিধিদের আচার-আচরণ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভোটার জনগণকে বলতে হয়- ‘যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ।’
এ অবস্থারও অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানার যথাযথ প্রতিষ্ঠা করা যায় অবশ্যই। এরই সুলুক সন্ধান আমাদের সংবিধানেই পাওয়া যায়। আমাদের সংবিধানে যে ‘বিকেন্দ্রীকরণ’-এর কথা বলা হয়েছে এর তাৎপর্য একান্তই গভীর। শাসক ব্যবস্থার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের ওপর জনগণ তার মালিকানার প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে পারে। কিন্তু সংবিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বদলে কেন্দ্রীকরণকেই শক্তপোক্ত করে যাচ্ছে তারাও আমাদের অচেনা নয়।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনের কথা এখন আমাদের স্মৃতিতেই আছে কেবল। এখনকার মূলধারার ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান অমুক বা তমুক রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায়। এসব ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছাত্রের চেয়ে অছাত্রেরই সংখ্যাধিক্য। তাদের মূল কাজ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং আরো নানান ধরনের ‘বাজি’। এসব ‘বাজিকর’দের কবলে পড়ে পরিত্রাহি চিৎকার করতে হচ্ছে নিরীহ জনগণকেই। কিন্তু বাজিকররা বাজি দেখায় যাদের সুতার টানে তারা আমাদের অতিচেনা হলেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতাও আমাদের কারোরই নেই।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তার একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রের এসব অনর্থের জন্য আমাদের সরকারগুলোর ‘সামর্থ্যরে অভাব’কে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন-
“সামর্থ্যরে অভাব যে রয়েছে তার প্রমাণ হ’ল সংসদীয় নির্বাচনে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, একটি জরিপে তাদের সবার জন্য একটি প্রশ্ন ছিল, নির্বাচিত হলে আপনি কী করবেন? জবাব প্রায় এক রকমেই ছিল- এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা-স্বাস্থ্য কোনো একটা বিষয়ে কিছু করা। ৩০০ জনের মধ্যে একজনও বলেননি, তিনি নতুন কোনো আইন চান বা প্রচলিত কোনো আইনের সংস্কার চান। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাদের চাওয়ার কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক ভিত্তি নেই এবং আইন প্রণেতা হিসেবে তাদের কোনো প্রকৃত প্রস্তুতি নেই বা প্রকৃত যোগ্যতা নেই। অন্য কথায় আমাদের সংসদ গঠিত হয়েছে একদল আইনের প্রশ্নে অজ্ঞ ব্যক্তির সমন্বয়ে। স্বাভাবিক নিয়মে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগুরু অংশ আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন। আমাদের জাতীয় সংসদে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। ফলে যা হওয়ার তাই-ই হয়েছে।”
এ রকম অবাঞ্ছিত অবস্থার অবসানের জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিকদের সার্থক কর্মপন্থা গ্রহণ। এ রকম কর্মপন্থা গ্রহণের মানে হলো একটি তীব্র তীক্ষè সামাজিক আন্দোলনের সৃষ্টি করা। মুক্তিযুদ্ধকে সার্থক করে তোলার জন্য এ রকম সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। এ রকম সামাজিক আন্দোলনের সাফল্যের মধ্য দিয়েই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের সৃষ্টি হতে পারে। সে রকমটি হলেই কোনো কবিকে আর সখেদে বলতে হবে না, ‘মুক্তিযুদ্ধ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’

 


লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক

 

এলো বৈশাখ

 

বয়ে যাওয়া সময়ের স্রোতে বসন্ত চলে গেল নীরবে অনেক ঘটনার সাক্ষি হয়ে। আর এই ‘চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়’, ফিরে আসার নতুন প্রস্তুতি। বসন্ত যে অপার রূপসুধা রেখে গেল প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে তাকে ভিন্নমাত্রা দিতে এসেছে বৈশাখ।
ষড়ঋতুর প্রতিটি মাস স্বতন্ত্র। তবে কোথায় যেন মিশ্রিত অদ্ভুত রসায়নে। বৈশিষ্ট্যে আলাদা হলেও রূপ-বৈচিত্র্য প্রকাশে কারো কমতি নেই।

বাংলার বারোটি মাস বাজার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান নগর জীবনে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে বাংলা সন এখনো সচল। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এবং কৃষকের ফসল বোনা ও তোলা কর্মকা-ে বাংলা সন-তারিখ এখনো কার্যকর। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণ, উপবাস, শ্রাদ্ধ-শান্তি- সব অনুষ্ঠানই বাংলা সন-তারিখের হিসাবে হয়ে থাকে।
মোগল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন বলে কথিত থাকলেও এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও বঙ্গাব্দের গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো। অথচ এটি শকাব্দের সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দ বা বিক্রমাব্দের মাস ও দিনের নামের অনুরূপ বাংলা সনের মাস ও দিনের নাম। তবে শকাব্দের প্রথম মাস চৈত্র আর বিক্রমাব্দের শুরুর মাস কার্তিক। অথচ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে শকাব্দের দ্বিতীয় এবং বিক্রমাব্দের সপ্তম মাস বৈশাখকে। পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বঙ্গদেশের ফসলি সনের প্রথম মাস অগ্রহায়ণের অবস্থান বাংলা সনে অষ্টম। স্মরণাতীতকাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম ধরে বর্ষ গণনার রীতি প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। কৃষির দিক বিবেচনায় আনলে ফসল কাটার মাস অগ্রহায়ণ হওয়ার কথা বছরের শুরুর মাস। আবার আনন্দ-উৎসবের জন্যও গ্রীষ্মকাল শীত বা বসন্তের মতো মনোরম নয়। তাহলে নববর্ষ কেন শুরু হলো গ্রীষ্মের বৈশাখে তা এখনো রহস্যময়। তবে যিনিই বাংলা সনের প্রবর্তন করে থাকেন না কেন, তিনি যে হালখাতা ও পুণ্যাহর মাধ্যমে বাঙালির উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন চমৎকার সমন্বয়ে অচ্ছেদ্যভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন এতে সন্দেহ নেই। তবে এটিও ঠিক সময়ে সব বাঁধনই শিথিল হয়ে যায়। অনেক ঐতিহ্য বাঙালির জীবন থেকে বিস্মৃত না হলেও ঠাঁই নিয়েছে কাগজ, গল্প ও কবিতায়।

বছরের শুরুটি উৎসবমুখর করে তুলেছেন বাঙালি সাধ্যমতো। শুরুর দিনটি অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধনের রঙিন স্মারক করে রাখতে চায় বাঙালি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালন হলো কতোটুকু বাঙালিয়ানায়? কতোটা সরে আসতে হয়েছে আবহমান ঐতিহ্য থেকে? কতোটা নিতে গিয়ে কতোটুকু হারালো বাংলা সংস্কৃতি নিজের স্বকীয়তা? এর জবাব আমরা পেয়ে যাবো ষড়ঋতুর বারো মাসে বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনে। তবে নতুন বাংলা বছরটি জাতীয় জীবনে বাঙালি খুঁজে পাক আপন ছন্দ, দ্বন্দ্ব ভুলে। সকল পঙ্কিলতা ধুয়ে দেশ এগিয়ে যাক এই হোক প্রর্থনা।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : আইরিন
পোশাক : নিপুন
ছবি : ফারহান ফয়সাল

জলেশ্বরীর ট্রেনের বাঁশি

সৈয়দ শামসুল হক

 

 

গল্পের ঘন নীল পথের ওপর সবুজ সোনালি রঙে একটা বাঁশি এসে পড়ে। আহা, বাঁশি! ওই বাঁশি, বুকে যার সাতটি ছিদ্র। এই ছিদ্র গরম লোহার শিকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে তৈরি।
পোড়া ছিদ্রের ভেতর থেকে আগুনের দগ্ধতা ফুলের বাগান করে স্বর্গ থেকে সুর টেনে আনে। কৃষ্ণ বাজায়, রাধা ঘর ছেড়ে যমুনার তীরে বাইরে যায়। আমাদের পল্লী গায়ক টুংসু মামুদের কণ্ঠে গান ফোটে ভাওয়াইয়া অভ্যাসের বিপরীতেÑ

‘ও লো সই, আমি কার কাছে যাই
আমি কার কাছে বা যাই।’

বাঁশির শব্দে প্রাণ করে আইঢাই। কিন্তু আমাদের গল্পপটে ওই বাঁশির ছবি এখন নয়। আমরা কানে শুনতে পাই জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি।
রাজারহাট, নবগ্রাম আর জলেশ্বরীতে পাট ও সুপারির চালান অধিক হয়ে গেলে রাতদুপুরে জলেশ্বরীতে মালগাড়ি আসে। গভীর রাতে স্তব্ধতার ভেতরে আকাশের নক্ষত্র পোড়া অগ্নির নিচে মালগাড়ি এসে রাজারহাটে থামে। ফেরার পথে এখান থেকে মালের চালান তুলবে। নবগ্রামেও তুলবে না। একেবারে জলেশ্বরী এসে থামবে। তারপর মারোয়াড়িদের পাটের গাঁইট আর ব্যাপারীর বস্তা ঘুমজাগা চোখে কুলিরা মালগাড়িতে তুলতে থাকবে। বাঁশি দিয়ে গাড়ি ছেড়ে যাবে।
অসময়ের গাড়ি, মধ্যরাতের গাড়ি নবগ্রাম থেকেই তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়Ñ অ্যা, অ্যা, অ্যা বলে সে ডাকতে থাকে, আমি আসছি। আমি আসছি।
বাঁশির তো এই কাজ। আসার খবর দেয়া। শ্যামের বাঁশি তার ভেতরেও খবর দিয়ে আধকোষার পাড়েÑ না না, যমুনার পাড়ে তমাল তলে ডেকে এনেছিল। বাঁশি দিতে দিতে গাড়ি ফিরে যায়। ক্রমেই তার বাঁশির শব্দ অন্ধকারের নক্ষত্রের ছোট্ট একটি বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়।
খুব ছোটবেলা থেকেই এই বাঁশির সঙ্গে আমরা পরিচিত। সকাল ১০টায় ব্রিটিশ আমলের কাঁটায় কাঁটায় গাড়ি আসে। ১১টায় ফিরে যায় গাড়ি। আমরা মাগরিবের নামাজের পর সন্ধ্যাকালে ডিস্ট্যান্ট সিগনালের কাছে জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি শুনি। তখন আমাদের পড়তে বসার সময় হয়নি। আমরা দুঃসাহসী বালকেরা কেউ কেউ মা-বাবার চোখ এড়িয়ে স্টেশনে ছুটে যাই গাড়ি দেখতে, মানুষ দেখতে। মানুষের ওঠানামা দেখতে।
ওই বালক বয়সে যাত্রীদের এই আসা-যাওয়া নিয়ে আমাদের মনে একটা ভাবের উদয় হয়। ওই ভাবের সঙ্গে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটি এখনই ছেড়ে যাবে। গাড়িটির বাঁশি বেজে ওঠে। সাত ছিদ্রের বাঁশি তো নয়, ইঞ্জিনের খোলের ভেতরে তামার নলের ভেতরে জমে থাকা বাষ্প। ড্রাইভারের হাতে সুতা ঝুলছে। ওই সুতো ধরে টান দিলেই নানান সুরে বেজে ওঠে ইঞ্জিনের বাঁশি। সবার হাতে ইঞ্জিনের ওই কলের বাঁশির সুর ফোটে না। সুতায় টান দিলে মনে হয়, তাদের হাতে পাগলা ঘোড়া হিঃ হিঃ করে ডেকে ওঠে। সামনে বড় চাকার নিচে সাদা বাষ্পের মেঘ তুলে নবগ্রামের দিকে রওনা হয়ে যায়।
আর ওই যে ভাবের কথা আমরা বলেছি, আমরা জানি না এর কী অর্থ। আমরা দুই চোখভরে যাত্রীদের দেখি। এ জন্যই ট্রেনের বাঁশি শুনে জলেশ্বরীর ছোট্ট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াই। আমরা ওই তল্লাটের বালক বলে টিকিট মাস্টার আমাদের চ্যালেঞ্জ করেন না। যাত্রী বের হওয়ার গেইট দিয়ে আমাদের বের করে দেয় পিঠে থাবড়া মেরে হাসতে হাসতে বলেন, ‘দুই বেলা ইস্টিশানে আসিয়াও টেরেন দেখিবার হাউস না মিটিল?’
আমাদের ভেতরে দুষ্টু মোফাজ্জল বলে, ‘হাউস কি আপনার মিটিছে?’
‘তুই তো বড় নঙ্গর হইছিস রে?’
মোফাজ্জল দৌড়ে বেরিয়ে যায় টিকিট মাস্টারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
ইঞ্জিনের বাঁশি বেজে ওঠে। গাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
এর চেয়ে কতো হাসকাব্য হয়। একবার নবগ্রাম থেকে এক পোয়াতি বৌকে জলেশ্বরী হাসপাতালে আনা হচ্ছিল রাতের গাড়িতে। ব্যথা উঠেছে আর জলেশ্বরী ঘনিয়ে আসছে। ইঞ্জিনটাও বুঝি টের পেয়েছে তার গাড়িতে পোয়াতি বৌ। তীব্রস্বরে ড্রাইভার বাঁশি বাজাচ্ছে। স্টেশন মাস্টার অবাক হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন প্ল্যাটফর্মের কাছে এতো ঘন ঘন বাঁশি? তবে কি কেউ কাটা পড়েছে? আত্মহত্যা করলো কেউ? কিন্তু বাঁশি থেমে যায়। ড্রাইভার লাফ দিয়ে নামে। এদিকে গার্ড তার সাদা গাড়ি থেকেও লাফ দিয়ে নামে। আমরা দেখি স্বপ্নে, কী বাস্তবে, এই বয়সে এখন আর তা মনে নেইÑ দু’জনের হাতে দুই নবজাতক। যমজ শিশু। ইঞ্জিনের বাঁশির শব্দে ভীত ওই নারীর গর্ভ থেকে দুই সন্তান বেরিয়ে এসেছে। তাদের নাম রাখা হয় খুব গোপনে, খুব কানে কানে যেন কেউ শুনতে না পায়। ছেলেটির নাম জয়, মেয়েটির বাংলা। ১৯৭১ সাল।
এটা তো হাসকাব্য নয়। তবু যে বালকবেলায় আমাদের মনে হয়েছিল, কারণ বুঝি, জগতের আমরা তখন বুঝি কিছুই জানি না। সবখানে উজ্জ্বল অকারণ হাসির একটা লাফিয়ে ওঠা চোখেই দেখতে পাই। আমাদের ভেতরে বড় প-িতের প-িত নফলচন্দ্র দাস। সে বলে, ‘আরও শুনিয়া রাখো, টকি সিনেমা যে দেখিতে যাস, ছবির আওয়াজ তো শুনিস, কথা কয়, কাঁই কথা কয়? সিনেমার সাদা পর্দার পেছনে পিতলের থরে থরে গেলাস আর সেই গেলাসের ভেতর হতে আওয়াজ ফুটি ওঠে।’
আমাদের বিশ্বাস হয় বা হয় না। আবার মনে পড়ে, স্টেশন রোডে মিষ্টির দোকানের মালিক হানিফ ভাই বলেন, ‘বাঁশি এমন চিজ। স্তব্ধ মারি পড়ি থাকার নয়। নিশীথ রাইতে একা বাঁশি বাজি ওঠে। আগুনপোড়া বাঁশি সাত ছিদ্র হতে বুড়িয়া আঙুলের ডগার মতো সাত পরি বিরায় আর বিলাপ করে আর বাঁশি বাজায়।’
আমাদের মন বিষণœ হয়ে যায়। আমাদের ভেতরে অতি বড় হাসিওয়ালা বালকও গম্ভীর হয়ে যায়।
হানিফ ভাই রাতের শেষে গাড়িটির ছেড়ে যাওয়ার বাঁশি শুনে হাতঘড়িতে টাইম মেলানÑ ‘রাইতের এখন ১১টা। ব্রিটিশ আমল বলিয়া কথা, টাইম ধরিয়া গাড়ি আসে, গাড়ি যায়। সেই দূর নবগ্রাম হতে তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়।’

একদিন বাঁশির আওয়াজ আর আসে না। ইঞ্জিনের বাঁশি আর বাজে না। কিন্তু গাড়ি আসার ঘড় ঘড় খড় খড় শব্দ পাওয়া যেতে থাকে। এতো সংকেতময় ওই শব্দ যেন সে স্তব্ধ হয়ে এগোতে পারলেই আরাম পেতো। আমরা কান পেতে থাকি। ট্রেনের বাঁশি বিকল হয়ে গেছে, নাকি এটা ভূতের গাড়ি? রাতদুপুরে আপনমনে জংশন থেকে জলেশ্বরীর দিকে আসছে?
জলেশ্বরীতে ট্রেন লাইন বসার হুকুম যখন হয় তখন পয়সার বরাদ্দে টান পড়ে। তাই রেললাইনের জন্য পুরনো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের আঁকাবাঁকা নরম রাস্তার ওপর লাইন পাতা হয়। তাই রাজারহাট থেকে জলেশ্বরী পর্যন্ত গাড়ি সাত-আট মাইলের বেশি বেগে চলতে পারে না।
আমরা আতঙ্কে বিছানায় বসে থাকি। ঘরে ঘরে মানুষ জেগে ওঠে। তারাও জেগে বসে থাকে। যুবকরা লাঠি নিয়ে পথে নামে। তারা কী করে যেন টের পায় রংপুর থেকে মিলিটারির গাড়ি নিঃশব্দে জলেশ্বরীর দিকে আসছে শত শত খুনি পাঞ্জাবি সৈন্য নিয়ে।
গাড়ির গতি ধীর এগিয়ে আসছে। থামা নেই। এগিয়ে আসছেই। রাতের শেষ অন্ধকারেও ট্রেনের জানালা দিয়ে তাদের উঁচিয়ে ধরা রাইফেলগুলোর নল চোখে পড়ছে। যুবকরা চৌরাস্তায় বেরিয়ে এসে পুরনো দিনের কলের গানের চোঙ খুলে চিৎকার করে ডাকছেÑ ‘মা-বোনেরা, মাও-জননীরা ঘর হতে বির হয়া আসেন, পাঞ্জাবিরা আসিচ্ছে। কাউকে না ছাড়ান দিবে। যার যা আছে ঘরে থুইয়া বির হয়া আসেন।’
তারপর জলেশ্বরীর নারী-যুবতীরা দীর্ঘ সারি বেঁধে আধকোষা নদীর ওপারে ভোগডাঙায় চলে যায়। এদিকে ভোর হয়ে আসে। ভোরের আলো পাপী-পুণ্যবান সাধু বা শয়তান বিচার করে না। সবার ওপর আলো পড়ে। জলেশ্বরীর প্ল¬্যাটফর্মে খুনি ট্রেন এসে থামে। জানালায় জানালায় রাইফেলের ফলায় সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করে ওঠে যেন আলো নয়, রক্তেই ওদের পিপাসা। ঠিক তখন একাত্তরে শেষবারের মতো জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনটিতে বাঁশি বেজে ওঠে। তীব্র-তীক্ষè ওই স্বর। সঙ্গীতের স্বর নয় যেন একটি চিৎকারÑ ‘আদমি নেহি, মিট্টি চাহিয়ে, মিট্টি চাহিয়ে, আদমি নেহি। সব মুক্তিকো তালাশ কর, তালাশ কর।’ তারা সারা শহরে ছড়িয়ে যায়। তারপর থেকে জলেশ্বরীতে আসা-যাওয়া আর কোনো ট্রেনেরই বাঁশি বাজে না। নীরবে, নিস্তব্ধে জলেশ্বরী লাশ হয়ে যেতে থাকে। গানের গলা ছিল আমাদের খোকা ভাইয়ের। সে গাইতোÑ ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে...।’ তার গলাচেরা লাশ জলেশ্বরীর রাস্তায় পড়ে থাকে। কিন্তু তার গান আকাশ-বাতাসে মানুষের মধ্যে ভাসে।
চাঁদ বিবির পুকুরে চাঁদ বিবির লাশ পড়ে থাকে উপুড় হয়ে। হাই স্কুলের কমনরুমে মুমূর্ষু বাঙালিদের হাতের রক্তাক্ত ছাপ। কেউ একজন খুব বড় করে ‘বর্গীয় জ’ লিখেছিল। তারপর আর লিখতে পারেনি। সম্ভবত তার রক্ত ফুরিয়ে গিয়েছিল। এরপর পাশেই কে একজন শক্ত হাতে খুব বড় করে ‘অন্তস্ত অ’ লেখে। দেয়ালে ফুটে ওঠে বিশাল অক্ষরে জয়। রক্তের রঙ লাল। ওই লাল দিনে দিনে শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। যেন পৃথিবীর সব রঙ শোষণ করে যে সাদা এর বিপরীতে এই কালো রঙ দুষ্ট-নষ্ট রঙ হয়ে পৃথিবীকে এখনো শাসন করতে চায়। পারে না।
হঠাৎ চারদিক থেকে বাঁশির শব্দ শোনা যায়। ট্রেনের বাঁশি যেন শত শত গাড়ি এখন জলেশ্বরীর দিকে। এই ট্রেনেরও জানালায় জানালায় বাংলার যুবকরা, সঙ্গে তাদের সাইকেল, সাইকেলের ডগায় নতুন সূর্যের আলো। তারা চুপ চুপ করে জলেশ্বরীতে নামে আর চিৎকার করে বলে, ‘জয় বাংলা’। এরই সঙ্গে সুর মিলিয়ে ট্রেনের শত শত বাঁশি বেজে ওঠে। পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বাঁশির ওই শব্দে ট্রেনের বাঁশি নয় যেন উত্তাল একপাল ঘোড়া আকাশের দিকে মুখ তুলে হ্রেষা নয়, বাঁশির শব্দ করছে আর একটি বাঁশি তার বুকে সাত ছিদ্র থেকে বাংলার চোখের অশ্রু আধকোষা নদীর ঢলের মতো সরছে, ঝরে পড়ছে।

(২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে লেখক রোগশয্যায় গল্পটি রচনা করেছেন।)
অনুলিখন : লেখকের স্ত্রী কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক

নববর্ষের ঘনঘটা নিছক বিনোদনেই শেষ 

আহমদ রফিক

 

 

সময়ের সুনির্দিষ্ট সীমারেখায় বলা যায়, সালতামামিতে নতুন দিন, নতুন বছরের বরণ তাকে প্রিয়মুখ ভেবে নিয়ে, তার সাংবাৎসরিক আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত না জেনে। এটাই দেশ-বিদেশ নির্বিশেষে সর্বত্র ‘শুভ নববর্ষ’ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। যে আসছে সে কতোটা শুভ, কতোটা নয় তেমন বিচার উহ্য রেখেই বর্ষবরণের আবেগমথিত উৎসব-অনুষ্ঠানে আমরা মিলিত হই। ওই আবেগের টানে প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্ন উচ্চারণ ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...।’
নতুন বছরের উর্দি পরা সময় খ-টি আমরা এভাবেই অভিনন্দন জানাই, বরণ করে প্রাত্যহিক জীবনের ঘরে তুলে নিই। তারপর চলি, ভিন্ন চেহারার এক বর্ষ মাসের হাত ধরে। সে খ্রিস্টীয় বর্ষ মাস শীত থেকে শীতে শুরু ও শেষ। সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, ভাষিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গর্ব ও অহঙ্কারের জায়গাটি স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত এবং তা আমাদের জীবন আচরণে মূলত শাসনযন্ত্রের সিদ্ধান্তে।
এসব তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বক্তব্য নিয়ে বছরের পর বছর লিখে যাচ্ছি। এতে কি সমাজ নামক বৃক্ষটির একটি পাতাও নড়ছে? মনে হয় না। তাহলে এসব লেখার কি কোনো প্রয়োজন আছে? বিবেচক ব্যক্তিদের বিধান ‘তবু লিখতে হবে, হয়তো একদিন এর সুফল মিলবে।’ কিন্তু সুফল যে মিলছে না বা মিলবে না, অন্তত মেলার সম্ভাবনা যে নেই তা আগে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার পূর্বাভাস বার বার জানিয়ে দিচ্ছে।


যদি গত দুই-তিন দশকের বর্ষ ভাবনার লেখা নিয়ে হিসাব মেলাতে যাই তাহলে এর নেতিবাচক দিকটাই প্রবল হয়ে প্রকাশ পায়। আজ থেকে দুই দশকেরও বেশি আগের এক বৈশাখী নববর্ষেও অঘটন উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছিলাম, ‘এরপর গোটা বছর ধরেই দেখেছি, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কাগজ খুলতেই চোখে পড়ে খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, নারী নির্যাতন সামাজিক অস্থিরতার এক চরম ভাষ্য। সারাটা বছর তাই বিষণœতার হাত থেকে রেহাই মেলেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চিত্তবিকার ঘটেছে বলে মনে হয় না। ... আমি কি তাই বুক ঠুকে বলতে পারি, আমি ভালো আছি? কিংবা চলতি বছরের দিনগুলোতে ভালো থাকবো? এমন নিশ্চয়তা কোথায়?’
সময়ের ব্যবধানে এমন আরো দু’একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতো। এতে একই বক্তব্যের ভরাবৃদ্ধি ঘটতো। এর বদলে গতায়ু বছরটির সালতামামি করতে গেলে গেল ঘটনাদির বিচারে ওই একই চিত্র। রঙটা বরং আরো গাঢ়। বিশেষ করে গুম, খুন, নারী নির্যাতন এতোটাই যে, বুকে হাত রেখে বলা যাবে না সামাজিক দূষণ কমেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতারও কমতি নেই। বরং এমন সত্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামাজিক ব্যাধির বিস্তার ঘটছে। সামাজিক দূষণের মাত্রা বেড়েছে। সুস্থ সামাজিক শক্তি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ব্যক্তিক নিরাপত্তা সুতার ওপর ঝুলছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের নেশায় বুঁদ রাষ্ট্রযন্ত্রের হৃদয়ে ব্যক্তিবিশেষের (নারী বা পুরুষ কিংবা শিশু) কান্না প্রতিক্রিয়ার ঢেউ তুলছে না। আমরা যে যার অর্জনের পেছন ছুটছি। অন্যদিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই।

 

 

বৈশাখী নববর্ষেও উৎসব-অনুষ্ঠান তাই বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে। বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন
গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল।

 


‘আপ্না ভাল্/আজ না কাল্’ এটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন যাপনের আদর্শ। এ ধারা যেমন ব্যক্তিগত তেমনি দলগত। ঘরে বসে ড্রয়িংরুম সংলাপে সমালোচনার ঝড় তুলছি। কিন্তু মাঠ-ময়দান-রাজপথে তেমন ভাবনার ঐক্যবদ্ধ প্রকাশ ঘটাই না। সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী মানুষের মতো নিজের ভালো-মন্দ বুঝে নেয়ার বাইরে কিছু ভাবতে বা করতে চাই না। এমনটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বৃহত্তর নাগরিক সমাজের ধাত।
সত্যিই আমরা চোখ বন্ধ করে সামাজিক দায় এড়ানোর চেষ্টা করছি। অবশ্য সাহিত্য পাঠক বুদ্ধিজীবীর মাথায় কবির এমন পঙ্ক্তিও হানা দেয়, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ কিন্তু এতো অনাচারের মধ্যেও বাংলাদেশে তেমন ‘প্রলয়’ ঘটতে দেখা যাচ্ছে না বলেই বোধহয় দুর্বৃত্তের উৎসাহে ভাটা পড়ছে না। তাদের কর্মতৎপরতা যথানিয়মে চলছে। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে চরম সামাজিক হতাশা।
ওই হতাশার স্রোত এক ধরনের পিছুটান বলা চলে, জনচেতনার পিছুটান। ওই নিস্তরঙ্গ নদীতে রাজনীতির তরী সহজে তর তর করে চলতে পারে। তবু আগাছাসদৃশ ধানশীল মানুষের মন ভোলায়। ভোলায় শিক্ষিত শ্রেণির বিচারবুদ্ধি। সেখানে পার্থক্য নেই কবি, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ পেশাজীবীদের মধ্যে। সমাজ পরিবর্তন দূরে থাক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ইতিবাচক সুফল তৈরি করছে না সুস্থ মূল্যবোদের পক্ষে।

 

ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে, এমন উদাহরণ এদেশে বিরল নয়।

 

দুই.
এমন এক নেতিবাচক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে আমাদের বৈশাখী নববর্ষ পালনে কোনো পিছুটান নেই। আছে প্রবল আবেগ আর উত্তেজনা, বিনোদনের প্রবল তৃষ্ণা মিটানোর তাগিদ। অশ্বত্থবটের নিবিড় ছায়া থেকে বৈশাখী নববর্ষেও রাজধানীর রাজপথে এসে ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ শক্তিমান করে তুলেছে সন্দেহ নেই।
ওই ‘একদিন্কা সুলতান’-এর পক্ষে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার ইতিবাচক প্রকাশ ঘটানোর সম্ভাবনা বা চেষ্টা কোনোটাই দৃশ্যমান নয়। ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে এমন উদাহরণ এ দেশে বিরল নয়। এক্ষেত্রে তেমন সম্ভাবনা দূর বিষয়ই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বড় কারণ নববর্ষের সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা যতো প্রবলই হোক, সর্বজনীন চরিত্রের হোক, যতোটা জাতীয় চেতনার ধারক হোক তা একদিনের আবেগ উৎসারে ফুরিয়ে যায়। এর কোনো সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা থাকে না। স্বভাবতই এর ভবিষ্যৎ কোনো সামাজিক তাৎপর্য বহন করে না। বহন করে না সমাজ ও মূল্যবোধ পরিবর্তনের দিক থেকে। এখানে জাতীয় উৎসবের চরিত্র সম্পন্ন বৈশাখী নববর্ষের আড়ম্বর-সমারোহ বা জনসমাগম সত্ত্বেও এক ধরনের সীমাবদ্ধতায় বন্দি। তাই বৈশাখী নববর্ষের অনুষ্ঠান বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে।
বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষিত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল। মুক্ত যে নয় নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জসহ একাধিক ঘটনায় সামাজিক শান্তি বিপর্যস্ত হওয়া তেমন প্রমাণ বহন করে। এসব ঘটনার তালিকা বেশি দীর্ঘ।
নির্মোহ বিচারে মানতে হয় একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি মুসলমান সমাজে আকাক্সিক্ষত মাত্রায় সদর্থক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। আমাদের সঠিক সংস্কৃতি চর্চায় এমন পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল। ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী

আলী যাকের

 

 


চৈত্র শেষ হয়ে এলো। রৌদ্র চড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিদাঘের প্রচ-তায় আঁইঢাঁই প্রাণ। শুষ্ক চারিদিক। এই সময় ঘরে কিংবা বাইরে যদি তাপানুকূল পরিবেশ না থাকে তাহলে গ্রীষ্মের দাপট বেশ ভালো বোঝা যায়। একমাত্র বৃক্ষের ছায়ায় কিছুটা শান্তি মেলে বুঝি। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য গ্রীষ্ম মোটেই কারো প্রিয় ঋতু হতে পারে না। তবুও কী যেন আছে এ ঋতুটির মধ্যে যা আমাকে উদাস করে দেয়। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের ওই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে যায়, ‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী... জাগায় বিদ্যুৎ ছন্দে আসন্ন বৈখাশী/হে রাখাল বেণু তব বাজাও একাকী।’
একবার আমাদের দেশের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বছরের কখন শান্তিনিকেতনে যাওয়ার প্রকৃষ্ট সময়। উত্তরে বন্যা বলেছিল, ‘গুনলে বিশ্বাস করবেন না হয়তো। রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে গ্রীষ্মকালকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তার অনেক কবিতা, গান ভরা গ্রীষ্মে রচিত।’ এই রহস্য উদঘাটনের জন্য একবার ভরা গ্রীষ্মে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে গ্রীষ্মকালে সত্যিই প্রচ- দাবদাহ বয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে বেশির ভাগ মানুষ সাইকেলে চলাচল করে। ওই সময় দেখেছি, তাপ প্রতিহত করার জন্য তারা মুখের ওপর কাপর জড়িয়ে নেয়। সূর্যের উত্তাপ এতোটাই হয় তখন যে, শরীর চামড়া পুড়ে যায়। কিন্তু অবাক কা-! শান্তিনিকেতনে যে বিশাল বৃক্ষরাজি এর নিচে গেলে গ্রীষ্মকে আর ততো অত্যাচারী বলে মনে হয় না। ওই গ্রীষ্মে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সর্বত্র গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি আর মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি শ্মশ্রƒম-িত রবীন্দ্রনাথ, পেছনে দুই হাত, গাছের ছায়ায় ছায়ায় তার সৃষ্টি শান্তিনিকেতনের সর্বত্র মৃদুমন্দ গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


আমাদের বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুরই আগমন ও প্রস্থান মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে গ্রীষ্মে কথাটি মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি। আমার বাল্যকাল কেটেছে বাংলাদেশের ছোট ছোট শহরে বাবার চাকরি সূত্রে। ওইসব জায়গায় পাকা বাড়িঘর তখন ছিল অতি নগণ্য সংখ্যায়। বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে থাকতো বিশাল বৃক্ষরাজির বন। আম, কাঁঠাল, জারুল, সেগুন, মেহগনি, কড়ইসহ কতো বিচিত্র বৃক্ষ। স্কুল না থাকলে এসব বৃক্ষের নিচেই আমাদের সময় কাটতো বেশির ভাগ। লুকোচুরি, ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলা নিয়ে মাতামাতি। কিসব দিন গেছে শৈশব! মাঝে মধ্যে বাড়ির কাছের পুকুর কিংবা অল্প দূরের নদীতে সুশীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তিতে ভরে গেছে দেহ-মন। আরেকটু বড় হওয়ার পর আমরা তখন ঢাকায় এসে থিতু হয়েছি, গ্রীষ্মে ওই একইভাবে গাছের ছায়ায় ছায়ায় কেটেছে দিন। চৈত্র দিনের শেষে কোকিলের আহাজারি মনকে সিক্ত করে দিয়েছে। পহেলা বৈশাখে কুটির শিল্পের মেলায় বিভিন্ন খাদ্য-অখ্যাদ্যকে অমৃত বলে মনে হয়েছে। বাঙালির এই শর্তবর্ষের ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে আমরা আজীবন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে। আমাদের বাল্যকাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিলাম। কী এক বিচিত্র দেশ ছিল সেই পাকিস্তান! এক উদ্ভট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দেশ। যে ভদ্রলোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তিনি বলেছিলেনÑ মুসলমানরা একটি জাতিগোষ্ঠী। তাই অন্য ধর্মালম্বীদের সঙ্গে তাদের থাকা চলবে না। তাদের জন্য চাই ভিন্ন এক দেশ। অথচ তিনিও সর্ম্পূণ মুসলমান ছিলেন না। এটা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি নিয়মিত মদপান করতেন। বরাহ মাংস ভক্ষণ করতেন। জীবনে কোনোদিন নামাজ পড়েছেন বলে কেউ বলতে পারবে না। এমন এক ব্যক্তি কেবল ক্ষমতার লোভে একটি দেশের প্রধান হয়ে গেলেন। তার এই দ্বিজাতি তত্ত্ব যে সর্ম্পূণ ভ্রান্ত ছিল তা বুঝতে সময় নেয়নি জনগণ। সেই ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। ক্রমেই আমরা পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিশ্চিয়ানÑ সবাই মিলে একটি পৃথক রাষ্ট্র জন্ম দেয়ার কথা ভাবতে শুরু করি। ১৯৭০ সালের র্নিবাচনের মাধ্যমে এ দেশবাসী স্পষ্ট মতো দেয় বাংলাদেশের পক্ষে। এরপর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এই যুদ্ধ ওই র্ধম, নীতি ও বিবেক ভ্রষ্ট পাকিস্তানের পক্ষে কতিপয় বাঙালি কুলাঙ্গার এ দেশের মানুষের ওপর চরম অত্যাচার করে। তাদের শাস্তির বিধান করা হয় যুদ্ধের পর। আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই, হিটলার ও তার স্যাঙ্গাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয় নুরেমবার্গে এবং জীবত ও মৃত অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয়। কম্বোডিয়ায়ও একই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কিন্তু এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশের মুক্তির পেছনে সব আদর্শ ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে ওই
পাকিস্তানিদের দোসররা আবার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে যাতে করে এই দেশ নব্য পাকিস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে দেশের মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তারা সহজে এই চক্রান্তের কাছে পরাজয় বরণ করতে রাজি নয়। সর্বশেষ আজকে বাংলাদেশে অধিষ্ঠিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিধৃত যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে আবার। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর পরই আবারও সেই পাকিস্তানপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের লাখ লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রতিবাদমুখর হয় ওই চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু চক্রান্ত থেমে থাকে না।


গণমানুষের যে কোনো দাবি উচ্চারিত হলেই ‘ইসলাম খাতরে মে হ্যায়’Ñ ‘ইসলাম বিপন্ন’ এই একটি ভ-ামির আশ্রয় পাকিস্তানিরা সব সময় নিয়ে এসেছে। আজও আমরা দেখতে পাই, তাদের বাংলাদেশি দোসররা ওই একই সেøাগান দিয়ে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেবল বিভ্রন্ত নয়, তারা সত্যনিষ্ঠ যুব সম্প্রদায়কে আঘাত করার চেষ্টা করছে এই অভিযোগ দিয়ে যেন তারা নাস্তিক। এ অতি হাস্যকর একটি অভিযোগ এবং আমরা সবাই জানি, এই ধরনের সুবিধাবাদী কথাবার্তা ধোপে কখনোই টেকে না। একদিন বাংলাদেশের মানুষ রুখে দাঁড়াবেই এ ষড়যন্ত্রকে। শাস্তি হবেই যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব মুক্তবুদ্ধির দেশ হিসেবে।
এই বৈশাখের খরতাপে যখন পারিপার্শ্বিকতা বড় উষ্ণ হয়ে উঠেছে, নাগিনীরা চারদিকে ফেলেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস তখন আমাদের যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ হবে বলে আশা করা বোধ হয় ভুল হবে। ভরসা আমাদের একটি। আমাদের নেতৃত্বে রয়েছে একঝাঁক নিঃস্বার্থ মুক্তিকামী তরুণ যারা অবিরাম লড়ে যাচ্ছে আমাদের চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ এ লড়াই অস্ত্র নিয়ে নয়, এ লড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ প্রত্যয়ী মনোবলের লড়াই। তাই জয় তাদের অনিবার্য। বৈশাখের খরতাপে বিশাল মুক্তি-বৃক্ষের ছায়ায় আমাদের তরুণরা সমবেত আজ। বৃক্ষ তাদের দিচ্ছে আশীর্বাণী। দখিনা হাওয়ায় বয়ে আসছে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। পথ যতোই কণ্টকাকীর্ণ হোক, এগিয়ে তারা যাবেই হাতে হাত ধরে। এগিয়ে যাবে এই বৈশাখ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা সমবেতভাবে অভীষ্ট লক্ষ্যে।

এবং

প্রমিত হোসেন 

 

 

মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের।
বিশ্বাস বলল, আসবে।
অবিশ্বাস বলল, আসবে না।
বিশ্বাসের দিকে অবিশ্বাস তাকাল করুণার দৃষ্টিতে।
বিশ্বাস বলল, তুমি বোকা।
অবিশ্বাস বলল, তুমি অন্ধ।
যাকে নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সে বলেছিল বিকেল চারটের মধ্যে আসবে। বিশ্বাস বড় আশায় তার কথায় বুক বেঁধেছিল। বিশ্বাস প্রথম দিকে অবিশ্বাসকে পাত্তা দেয়নি। তখন বিশ্বাসের কাছ ঘেঁষতে পারেনি অবিশ্বাস। দূরেই ঘোরাঘুরি করছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, যে আশায় বুক বেঁধেছিল বিশ্বাস তা ক্রমশ ততই আলগা হয়ে যাচ্ছিল। যখন প্রায় চারটে বাজে আর তখনও সে আসেনি, আশার বাঁধন ঢিলে হয়ে খুলে পড়ল। এ সময় বিশ্বাসকে পেয়ে বসল অবিশ্বাস। যখন চারটে বাজল এবং সে এল না, অবিশ্বাস দেঁতো হাসি হেসে বলল, বলেছিলাম সে আসবে না?
বিশ্বাস কোনও রকমে বলল, হয়ত কোনও কারণে দেরি হচ্ছে, এসে পড়বে।
অবিশ্বাস তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, তাই নাকি! বেশ, দেখা যাক।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। দুই ঘণ্টা। তিন। এবং চার।
অবিশ্বাস অবজ্ঞার সুরে বলল, জানতাম আসবে না।
বিশ্বাস ঢোক গিলল। মুখটা শুকনো। কোনও কথা বলতে পারল না।
বিজয়ী অবিশ্বাসের দেঁতো হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল।


[প্রথম প্রহর/জন্মদিন-২০১৫]

অলৌকিক লোকালয়ে

ঋভু অনিকেত

 


ফাল্গুন শেষ হতে চললো অথচ এই বিকেলবেলা কেমন যেন হালকা ঠা-ার আমেজ। পশ্চিম দিকের জানালাটা খোলা। শেষ বিকেলের এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে চেয়ারের পাশে। মৃদু শীতল এই বিকেলে রোদের হালকা উত্তাপ ভালোই লাগছিল। অন্যান্য বছর এ সময়টাতে অফিসের এই রুমে গরমে টেকা দায় হয়ে পড়ে। ঘরে একটা মাত্র ফ্যান, ফুল স্পিডে চললে মনে হয় খুলে পড়বে। উপ-পরিচালকদের রুমে কেন যে এসি দেয়া হয় না, ভেবে পায় না মামুন। এসবের মাঝেই ভাবলো আজ অফিস শেষে হাঁটতে হাঁটতে যাবে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। সেখানে মাঝে মাঝেই যায় সে, কবি-লেখকদের আড্ডাটা বেশ উপভোগ করে মামুন। যদিও লেখালেখির কাজটা চেষ্টা করেও শুরু করতে পারেনি সে। ভাব কেমন করে আসে জানে না সে, ভাবগুলোকে কথায় রূপান্তরিত করে কবিতা বা গদ্য লেখা তো দূরের কথা। তবে কবি-লেখকদের আড্ডায় বসে সাহিত্যের অনেক না জানা তথ্য জানা হয় ওর। আড্ডায় বোকার মতো বসে থেকে মাথা নাড়ানো আর হাঁ-হু করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না সে। বন্ধুরা প্রথম প্রথম ওকে কথা বলাতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতো। এখন তার এই চুপ মেরে থাকাটা বা আড্ডায় সক্রিয় অংশগ্রহণ না করাটা এক রকম মেনেই নিয়েছে ওরা। সাহিত্যে তার জ্ঞান-অভিজ্ঞতা সীমিত থাকার কথা বলে আড্ডায় কথা বলা মামুন এড়িয়ে গেছে সব সময়। এখন আর কেউ ওকে ঘাঁটায় না। আসলে আড্ডার জন্যও যে পড়াশোনার দরকার, এই আড্ডায় এসে উপলব্ধি করলো মামুন। আড্ডার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইদানীং দু’চার লাইন কবিতা লিখতে চেষ্টা করে মামুন। বন্ধুদের দেখাতে সাহস হয় না। কেননা আড্ডার আসরে দেখা যায় ওরা ভালো ভালো কবিরও তুলোধুনো করে ছাড়ে।
‘ডাইরেক্টর স্যার আপনারে সালাম দিছে।’ পরিচালকের পিয়ন সোলায়মানের ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠের বিরক্তিকর শব্দ।

’ওয়ালাইকুম সালাম।’ ভাবনার মুডটা নষ্ট করে দেয়ার জন্য একটু রাগতস্বরেই বললো মামুন। সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললো, ‘যাচ্ছি।’ সাইড টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢাকা গ্লাসটা থেকে পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। সামনের দেয়ালে ঝোলা ঘড়িতে দেখলো ৫টা বাজে। অফিস ছুটির সময়ে বসের ডাকাডাকি কার ভালো লাগে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো।
‘কবির, তুমি জানালা-দরজা বন্ধ করে চলে যাও। আমি ডাইরেক্টর সাহেবের রুম থেকে সরাসরি বেরিয়ে যাবো।’ নিজের পিয়ন কবিরকে নির্দেশ দিয়ে পরিচালকের রুমের দিয়ে এগোলো। সালাম দিয়ে পরিচালকের রুমে ঢুকলো মামুন।
‘আরে মামুন, বসো বসো। সোলায়মান, স্যারকে চা দাও।’ পরিচালকের গদগদ ভাব। কেন জানি এই বদখত লোকটা মামুনকে পছন্দ করে। তাই কখনোই কোনো কঠিন কথা বলে না তাকে। মামুনও মুগ্ধ শ্রোতার মতো পরিচালকের কথা শুনতে চেষ্টা করে। অসময়ে ডাকার জন্য বিরক্ত মামুন হ্যাঁ-না কিছু না বলে একটা চেয়ার টেনে বসলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পরিচালক কামরুল সাহেব বললেন, ‘তোমার মধ্যে কবি কবি ভাব আছে অথচ তুমি লেখো নাÑ এটা ঠিক নয়, লিখতে বসে যাও ভায়া।’ ‘কবিতা আমার দ্বারা হবে না স্যার।’ বললো মামুন। কী জন্য যেন ডেকেছিলেন? এমন সময় সোলায়মান দু’কাপ চা সামনে রেখে গেল। কণ্ঠস্বর বিরক্তিকর হলেও চা-টা ভালোই বানায় সোলায়মান, দুধ-চিনি একেবারে পারফেক্ট পরিমাণে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা ফাইল মামুনের দিকে এগিয়ে দিল কামরুল সাহেব। ফাইল খুলে একটা কাগজ সামনে তুলে ধরলো। ডিজি ম্যাডামের হাতের লেখা। কিছু বুঝতে না পেরে মামুন বললো, এটা তো আপনিই দিয়ে ফাইল পুটআপ করতে বলেছিলেন। সমস্যাটা কী এখন? মুখে কিছু না বলে কামরুল সাহেব পাতাটা উল্টালেন। হায় হায়! এটা তো আমারই লেখা! ক’দিন ধরে কী যেন হয়েছে খালি কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে। তাই হঠাৎ আজ দুপুরে একটা ভাব আসায় কয়েক লাইন একটা কাগজে লিখে রেখেছিল। এখন দেখছি এটা ডিজি ম্যাডামের হাতে লেখা সিøপ। বিস্মিত হয়ে মনে মনে ভাবলো। মুখে বললো, ‘সরি স্যার’।

‘আমাকে সরি বললে তো হবে না, ডিজি ম্যাডাম যদি কোনোভাবে তার ইনস্ট্রাকশনে এ রকম হিজিবিজি লেখা দেখতে পান তাহলে কী হবে, ভেবে দেখো। এমনিতেই ম্যাডাম রগচটা মানুষ।’ কী আর করবো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ফাইলটা ম্যাডামের কাছে পাঠিয়ে দিন। ম্যাডামের চোখে এটা নাও পড়তে পারে। আপনার ভয় নেই স্যার। যদি জিজ্ঞাসা করে আমার নাম বলে দেবেন।‘ এ জন্যই তো বলি, তুমি কবিতা ছাড়লেও কবিতা তোমাকে ছাড়ছে না। বলেই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন কামরুল সাহেব।
অফিসের দক্ষিণ দিকের গেইটটা দিয়ে বের হলো মামুন। এডি মাহবুবকে বলে এসেছে একা চলে যেতে। সে আজ আর অফিসের গাড়িতে বাড়ি ফিরছে না। মাহবুব আর মামুন একই জিপে বাড়ি ফেরে। ফুটপাথ ধরে কিছুদূর হেঁটে রাস্তা পার হয়ে হাইকোর্টের মাজারের গেইটের সামনে আসতেই জটাজুটধারী এক ফকির এসে হাত পাতলো। মামুন এসব লোককে কখনো পছন্দ করে না, ভিক্ষা দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কিছু পাওয়ার অপেক্ষা না করে সেই ফকির মামুনের চোখে চেয়ে হঠাৎ বা হাতটার কব্জি ধরে বসলো। এরপর কী যে হলো, বুুঝতে পারলো না! কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। ফকিরটা ওর হাত ধরে মাজারের দিকে টেনে নিয়ে চললো। মোহগ্রস্তের মতো হাঁটতে থাকলো ফকিরের সাথে সাথে। গেইটে ঢোকার পর একই রকম আরেকজন ফকির এসে মামুনের ডান হাতটার কব্জিতে ধরলো। দু’জনেই এমন শক্ত করে হাত ধরেছে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। দু’জনে ওকে টানতে টানতে মাজারের সামনের বট গাছটার দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। মামুনের বোধ-বুদ্ধি সবই যেন লোপ পেয়ে গেছে। অনেকটা সম্মোহিতের মতো চলছে সে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সবাই বাসায় ফেরার তাড়ায় ব্যস্ত। আশপাশে অনেক লোক চলাফেরা করছে। কারোরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না এই ঘটনা। মনে হচ্ছে, কেউ দেখছেই না যে, একজন ভদ্রলোককে দু’জন ফকির টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বট গাছের নিচে একই রকম বেশ ক’জন ফকির বসা। গাঁজার ছিলিম হাত ঘুরে ঘুরে চলেছে এক হাত থেকে আরেক হাতে। বট গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে ওই দু’জন তাকে গাছের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। গাঁজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আধো অন্ধকারে গাছের ভেতর হঠাৎ যেন একটা দরজা খুলে গেল। তাকে নিয়ে ওরা দু’জন নিñিদ্র অন্ধকার এক ঘরে ঢুকলো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধের মতো সামনের দিকে যেতে থাকলো। কিছুক্ষণ পর টের পেল দু’হাতের চাপটা আর এখন নেই। ওরা ওর হাত ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদূর চলার পর হঠাৎ করে এক আলোক উজ্জ্বল জায়গায় এসে পড়লো যেন। একটা নদীর পাড়। সকালের সূর্যটা তীব্র আলো ছড়িয়ে দিগন্তরেখার গাছপালার ওপরে উঠে পড়েছে। নদীটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। মনে হলো, এ নদীর ধারে এর আগেও এসেছে। মনে পড়লো, দু’বছর আগে দোল পূর্ণিমায় লালনের আখড়ায় এসেছিল। এ তো গড়াই নদী। কিন্তু পরিবেশটা কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। অনেক ঝোপঝাড়, অনেক গাছপালা। নদীর ধারের বট গাছটার পাশেই মামুন দাঁড়িয়ে। বট গাছের নিচে গেরুয়া পোশাক পরা জটাজুটধারী কিছু সাধু বসে আছেন। হঠাৎ দূর থেকে একটা গানের আওয়াজ ভেসে এলো। সুরটা বড় চেনা। দেখলো, দূরে নদীর পাড় দিয়ে দোতারা হাতে হেঁটে যেতে যেতে এক লোক গান গাইছে। কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করলো। সুরটা জাতীয় সংগীতের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু কথাগুলো...! তবে কী এ মানুষটি গগন হরকরা!
‘আমি কোথায় পাবো তারে
আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
আমি বেড়াই ঘুরে দেশে দেশে...’
বট গাছ ছাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটলো মামুন। অনেকটা জঙ্গলের মতো এলাকাটা। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সামনে কিছুদূর এগিয়ে দেখলো জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা খড়ে ছাওয়া ঘর। ঘরগুলোর সামনে ছাউনি দেয়া একটা উন্মুক্ত জায়গা। সেখানে একদিকে একটা আসনে সাদা পোশাক পরা একজন বসে আছেন। তার চারপাশ থেকে যেন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। একজন সাধু পুরুষ। তাকে ঘিরে সামনে আরো কয়েকজন বসা। এর মধ্যে দু’একজনকে চেনা চেনা লাগছে। তাদের ছবি কোথাও দেখেছে সে। তাদেরই একজন গেয়ে উঠলোÑ
‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে
তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা তাই ডাকি তোমারে...’

আরে, এ তো কাঙাল হরিনাথ। তার মানে, পাশের দাড়িওয়ালা মানুষটি মীর মশাররফ হোসেন! আর ওই সাধু পুরুষ ‘লালন’! একরাশ বিস্ময় মামুনের চোখে। এ কোথায় এলো! একশ’ বছর আগের সব মহান মানুষ তার চোখের সামনে! কে যেন সাধু পুরুষ লালনকে প্রশ্ন করলো, মনে হয় মীর মশাররফ। গুরু আপনার ধর্ম নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে...। কথাটা শেষ হলো না। লালন গেয়ে উঠলেনÑ
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন ভাবে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে...’
গান শেষ করে লালন বললেন, ‘ধর্ম তো মানুষের অন্তরে থাকে। মানুষটা মানুষ কি না সেটিই বড় কথা। মানব ধর্মই বড় ধর্ম।’ লালন আরো বললেন, ‘আত্মাকে ভালোবেসে অনুসন্ধান করলেই পরম আত্মাকে পাওয়া যায়।’ পেছন থেকে নারী কণ্ঠে কে যেন গেয়ে উঠলোÑ
‘মানুষ ছেড়ে মন রে আমার
দেখবি তুই সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার ভজলে ত্বরাবি
... ... ...
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’
‘কী হে জ্যোতি, তুমি যে পদ্মায় বোটে বসিয়ে আমার ছবি বানাইলা, ছবিটা তো আমারে দেখাইলা না?’ সামনে বসা একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন লালন। জ্যোতি মানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা! ভালো করে দেখলো। তাই তো ছবিতে দেখা মানুষটাকে আজ বাস্তবে দেখছে মামুন। লালন বলে চললেন, ‘তোমার ভাই রবি বিলাতে যেয়ে নাকি ইংরেজদের সাথে আমারে পরিচয় করানোর চেষ্টা করছে। আমার গান ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ শুনাইছে ইংরেজদের? ইংরেজরা কী বুইঝবে ওইসব?’ এমন সময় দূরে গাছের আড়ালে একজনকে আবছা মতন দেখতে পেল মামুন। এই লোকটাকে কোথাও দেখেছে মামুন। চশমার কাচটা শার্টে মুছে চিনতে চেষ্টা করলো। মুখটা অস্পষ্ট হলেও চিনতে ভুল হলো না। এ তো গিনসবার্গ, মানে এলেন গিনসবার্গ। কিন্তু তিনি এখানে এলেন কী করে? লালনের মৃত্যুর অনেক পর তার জন্ম! তবে কী গিনসবার্গও মামুনের মতো দর্শক একজন যিনি লিখেছেন অভঃবৎ খধষড়হ নামে কবিতা।

Sleepless, Stay up and

think about Death

- Certainly it's nearer

than when I as ten years old

and wondered how big the 

Universe was


এমন সময় দূর থেকে অনেক মানুষের চিৎকার ভেসে এলো। হা রে রে রে করে দু’দিক থেকে দু’দল মানুষ ছুটে আসছে। সবারই আক্রমণাত্মক রূপ। তাদের হাতে লাঠি, সড়কি নানান রকম অস্ত্র। একদল ধুতি-পৈতা পরা, আরেক দলের মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি। লালনের আখড়ার দিকে ধেয়ে আসছে ওরা। মামুন মুহূর্তেই বুঝে নিল এখানে থাকা আর ঠিক হবে না। যেদিক থেকে সে এসেছিল, সেই নদী তীরের বট গাছের দিকেই ছুটে চললো। প্রাণভয়ে খুব জোরে দৌড়ালো সে। বট গাছের গুঁড়িতে পা বেঁধে পড়ে গেল। সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখলো, শিক্ষা ভবনের সামনের ব্যস্ত সকালের রাস্তা। অফিসের উত্তর গেইটের সামনের ফুটপাথে পড়ে আছে মামুন। তাড়াহুড়া করে রাস্তা পার হতে গিয়ে ফুটপাথে হোঁচট খেয়ে পড়েছে সে। পায়ের একটা নখ বুঝি উপড়ে গেল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটায় প্রচ- যন্ত্রণা। উঠে দাঁড়াতে যাবেÑ এমন সময় একজন এগিয়ে এলো, ‘স্যার কি বেশি ব্যথা পেয়েছেন? এ রকম অসাবধানে তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হওয়াটা ঠিক হয়নি স্যার। একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারতো।’ মাথা উঁচু করে দেখলো, ওরই অফিসের নিম্নমান সহকারী কুদ্দুছ। মামুনের হাত ধরে ওঠাতে চেষ্টা করছে। ‘চলেন স্যার, আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিই।’ মামুন হাত নেড়ে জানালো, দরকার নেই। সকালবেলায় গেইট দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ঢুকছে। বিধ্বস্ত মামুনও পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। এই সকালবেলায় অফিসের সামনে এলো কেমন করে? রাতে বাসায় ছিল, না বাইরে ছিল? কিছুই মনে করতে পারছে না মামুন। শুধু দেখতে পাচ্ছে, কবিতার পঙ্্ক্তিরা সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, এখন থেকে সে কবিতা লিখতে পারবে।

 

 

ব্যক্তিসত্তা স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 


সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের।

সভ্যতার প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক। গৌতম বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভের আগেই অনুভব করেছিলেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের পথে রাষ্ট্র একটি দূরতিক্রম্য বাধা, একটি জটিল বন্ধন ও একটি অনাসৃষ্টি। একটি সূত্রে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে ক্রমে তাকে এর আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত করা। গৌতম বুদ্ধ আরও উপলব্ধি করেন, মুক্ত মানুষকে অধীন করতে গিয়ে রাজা নিজেও অবশেষে পরিণত হন আরেক ধরনের অধীন সত্তায়। রাষ্ট্রসত্তার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই গৌতম এক রাতে রাজ্য, স্ত্রী ও সন্তান পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির সন্ধানে, সত্যের সন্ধানে। মুক্তজীবন ও সাধনার মাধ্যমে তিনি লাভ করেন মহাজ্ঞান।
আমাদের উদ্দেশ্য এখানে বুদ্ধের মহাজ্ঞানের সন্ধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে কিছু উপাত্ত-উপমা তুলে ধরে যুক্তি প্রদান করা যে, ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রসত্তার বিরোধ চিরকালের। সব ব্যক্তি মিলে স্বেচ্ছায় রাষ্ট্র তৈরি করেছে- এটা তত্ত্বের কথা, ইতিহাসে আদৌ ছিল কি না তা বলা শক্ত। তবে ব্যক্তি সামষ্টিকভাবে সতর্ক না হলে রাষ্ট্রের অধীনে সবাই যে এক সত্তাহীন খড়কুটোয় পরিণত হতে পারে তা উপলব্ধি একাধিক মহাজ্ঞানী করেছেন। নিজের ব্যক্তিসত্তার স্বার্থে রাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখা বুদ্ধির কাজ বলে মনে করেছিলেন চিনা দার্শনিক কনফুসিয়াস।

তার মতে, রাষ্ট্র হচ্ছে ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা এমন একটি অস্তিত্ব যার প্রধান কাজ রাজ্যের মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি থেকে বের করে এনে তার আজ্ঞাবহ ক্রীতদাস বানানো। তাই তিনি উপদেশ দেন যে, আপন স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য বুদ্ধিমানদের উচিত রাষ্ট্র থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সত্তা তৈরি করা। জেরেমি বেনথাম, স্টুয়ার্ট মিল, হেনরি মেইন প্রমুখ রাজনৈতিক দার্শনিকের চিন্তার মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে বৌদ্ধ ও কনফুসিয়াসের রাজনৈতিক দর্শন। জাঁ পল সার্তের অস্তিত্ববাদ বুদ্ধ ও কনফুসিয়াসের চিন্তাধারাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সার্তের মতে, ব্যক্তি একটি আদি ও স্বাধীনসত্তা যা রাষ্ট্র বিনষ্ট করতে সব সময়ই তৎপর। তার মতে, ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান বিরোধ এখানেই যে, রাষ্ট্রসত্তার প্রবণতা হচ্ছে ব্যক্তিসত্তাকে করায়ত্ত করা, ব্যক্তির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এবং মিথ্যা দেশপ্রেম সৃষ্টি করে মানুষের অধিকার হরণ করা। তার মতে, রাষ্ট্র যত বড়, ব্যক্তি তত ছোট।
প্রাচীন যুগে জনপদের মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই অর্থাৎ আপন নিরাপত্তাবোধ থেকেই সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সমাজ আগে, না রাষ্ট্র আগে- এ প্রশ্ন বাতুলতা মাত্র, কেননা সমাজেরই ভিন্ন রূপ হচ্ছে রাষ্ট্র। সমাজের আদি কাঠামো অর্থাৎ আদিম স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র সৃষ্টির ব্যাপারে সমাজ উদ্যোগ নিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ ইতিহাসে মেলে না। বরঞ্চ প্রমাণ আছে, রাষ্ট্র গঠনে সমাজসত্তা কোথাও কোথাও প্রতিরোধ রচনা করেছে, যদিও সে প্রতিরোধ কখনোই ফলপ্রসূ হয়নি। রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যর্থ হওয়ার একটি প্রধান কারণ হয়তো ধর্ম। বিশ্বাস করার কারণ আছে, সমাজ রাষ্ট্রের আগে ধর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়। যেহেতু ধর্ম এবং রাষ্ট্র উভয় সত্তাই সমাজের উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু প্রাথমিক পর্বে রাষ্ট্রের উত্থানকে ধর্ম একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছে। অনুরূপভাবে রাজাও রাজধর্মের বাইরে অন্য ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করেছে।
প্রজাতন্ত্র পতনের পর অধিকাংশ মানুষ রাষ্ট্র ও রাজন্যশ্রেণির দাসে পরিণত হয়। আগেরকার সামাজিক সাম্যের বদলে সমাজ তখন বিভক্ত হলো রাষ্ট্রীয় আমলা-পুরোহিতশ্রেণি এবং দাসে। ব্যক্তি ও সমাজসত্তাকে পদদলিত করে কীভাবে স্বৈরতন্ত্রী রাজ্য তৈরি হলো তা নিয়ে তত্ত্ব আলোচনা প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায়। ভারতীয় বৈদিক তত্ত্বে যেমন আছে, আলো ও অন্ধকারে মানুষকে চক্রাকারে ঘূর্ণি খেতে হবে, এটাই বিধি বা প্রকৃতির নিয়ম। বৈদিক তত্ত্বমতে প্রাকৃতিক মহাসময়ে মানুষ চারটি যুগের মধ্যে চির ঘূর্ণায়মান- সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ ও কলিযুগ। সত্যযুগ হলো মানুষের জন্য সুন্দর ও স্বাধীন যুগ। তার পরপরই পতনের পালা। সত্যযুগ থেকে ত্রেতা, দ্বাপর হয়ে কলিযুগে এসে মানুষ হারায় সব ধরনের ন্যায়বিচার ও শান্তি। এ সময় ব্রহ্মা সব ধ্বংস করে আবার নতুন করে সৃষ্টি করেন সত্যযুগ। মিসরীয় ও গ্রিক মিথলজিতেও অনুরূপ সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব রয়েছে। এটা ধর্মীয় তত্ত্ব এবং এমন তত্ত্ব সব ধর্মেই রয়েছে। ভালো ও মন্দ সময়ের জন্য ঐশী শক্তি ক্রিয়াশীল- এমন তত্ত্ব ব্যক্তি ও সমাজ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী অস্ত্র বটে।
মানব ইতিহাসের এটা একটা করুণ দিক যে, সময়ের ব্যবধানে ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক স্বাধীনতা হারিয়ে পরিশেষে মানুষ তার নিজ দেহের ওপরও অধিকার হারায়। ফলে সে শাসকশ্রেণির দাসে পরিণত হয় এবং দাস ও তার স্ত্রী-সন্তানাদি মালিকের হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তিতে পরিণত হয়। কীভাবে মানুষ তার আপন সত্তা হারিয়ে বিজয়ী শক্তির দাসে পরিণত হলো সে ইতিহাসের জের টেনে মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের তাত্ত্বিক টমাস পেইন রাষ্ট্রের পক্ষে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতার ইতিহাস তুলে ধরেন তার ঐঁসধহ জরমযঃং আলোচনায়। তিনি যুক্তি দেখান, ‘রাষ্ট্রকে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে বাধ্য না রাখতে পারলে রাষ্ট্র উল্টো কাজটি করবে। রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে পদদলিত করে সবাইকে দাসে পরিণত করবে।’ পেইনের এ উক্তিই অন্যভাবে ব্যক্ত করেন লর্ড একটন। তার বিখ্যাত ঐরংঃড়ৎু ড়ভ খরনবৎঃু প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন, চড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধহফ ধনংড়ষঁঃব ঢ়ড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধনংড়ষঁঃবষু.
উনিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই আইনগতভাবে দাসপ্রথা বিলোপ করার উদ্যোগ আসে ইউরোপ থেকেই। এর কারণ হিসেবে ইউরোপে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানববাদী ও উদারনৈতিক আন্দোলনগুলোকে অনেকে কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে দার্শনিক তত্ত্ব আমরা প্রাচীনকাল থেকেই পাই। কিন্তু এতে শাসকশ্রেণি ব্যক্তিকে অধীন করার প্রচেষ্টায় বিরত থেকেছে এমন প্রমাণ নেই। কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেয়নি; যদিও কোনো ধর্মই দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধও করেনি। শাসক কর্তৃক মানুষকে অধীনে করে প্রভু হওয়ার স্পৃহা যে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়, সে সম্পর্কে প্রাচীনকালের হামুরাবি, উকারুগিনা, কনফুসিয়াস, কৌটিল্য থেকে আধুনিককালের টমাস পেইন, বেনথাম, মিল, কার্ল মার্কস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি মনীষী তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তারপরও দাসপ্রথা বরং বেড়েছে, কমেনি। উনিশ শতক থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর্ব শুরু হওয়ার প্রধান কারণ প্রযৌক্তিক পরিবর্তন। শিল্পবিপ্লবোত্তর যুগে প্রযুক্তি এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হলো, যখন দেখা গেল যে, দাসশ্রমিকের চেয়ে মুক্তশ্রমিক অনেক বেশি উৎপাদনশীল। এ সত্য অনুধাবন করার পরই কম উৎপাদনশীল দাসত্বপ্রথা বিলোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে।

 

সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত সুলতানি সরকার অমুসলমানদের জিম্মি হিসেবে ঘোষণা করলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। জিম্মিরা জিজিয়া কর প্রদান করে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। মুঘল সরকার অমুসলমানদের ওপর জিজিয়া কর আরোপের ব্যাপারে বেশ নমনীয়তা দেখালেও দাসপ্রথা আরও জোরদার করে তোলে। এর প্রধান কারণ দাসশ্রমিক। মুঘল সৃষ্ট জমিদার ও ফৌজদার শ্রেণির কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে মূলত দাসশ্রেণিকে কেন্দ্র করে। এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত

 

এ সময় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো উপকূল অঞ্চলে হানা দিয়ে যুবক-যুবতীদের ধরে নিয়ে বিদেশে বিক্রি করত এবং জাহাজের লস্কর-খালাসি হিসেবে ব্যবহার করত। মুঘল রাষ্ট্র এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করেনি। সরকারের সামরিক দুর্বলতা এর প্রধান কারণ নয়, আসল কারণ হচ্ছে, দাসপ্রথার অনুকূলে মুঘল রাষ্ট্রের চলমান নীতি।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তি-মানুষের অধিকার সর্বনিম্নে পৌঁছায়। সুলতানি-মুঘল রাষ্ট্রে দাসত্বপ্রথা থাকলেও সমাজের উচ্চবর্গের লোকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখত। দক্ষতা ও মর্যাদাবলে তাদের অনেকের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আমির-উমারাহ পদে পর্যন্ত আসীন হতে পারত। নবাবি আমলের আমির-উমারাহদের একটি বড় অংশ ছিল দেশীয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে রাষ্ট্রীয় কাজে দায়িত্ব লাভ করেছে দেশীয় অভিজাত শ্রেণির লোক। কিন্তু কোম্পানি আমলে এবং কোম্পানি শাসনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশীয়দের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। উনিশ শতকের প্রথম সিকি পর্যন্ত দেশীয়দের জন্য খোলা ছিল একমাত্র নিম্ন পদের কেরানি, পাইক, পেয়াদা, বরকন্দাজ, সিপাহির পদ। রাষ্ট্রের সব কর্মকা- পরিচালনা করেছে শ্বেতাঙ্গরা। শ্বেতাঙ্গ আমলাদের ওপর ন্যস্ত ছিল লাগামহীন ক্ষমতা এবং পুরো দেশ শাসিত হতো তাদের দ্বারা। ভারতবর্ষে কয়েকশ শ্বেতাঙ্গ আমলা দ্বারা কোটি কোটি মানুষের শাসনভার সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে শুধু এ জন্য যে, কোম্পানি আমলে ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের সত্তা এবং অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছে সব মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি ও ত্রাস সঞ্চারের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে সাহায্য নেওয়া হয়েছে সাত খুনের মাফ পাওয়া অনুগত জমিদারশ্রেণির।
প্রথাগতভাবে ভূমির মালিক রায়তশ্রেণিকে বঞ্চিত করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে দেশের প্রায় পাঁচ হাজার জমিদারকে করা হয় ভূমির একচ্ছত্র মালিক। রায়তকে পরিণত করার হয় জমিদারের ইচ্ছাধীন প্রজায়। ভূমি একটি সম্পত্তি, একটি অধিকার; যে অধিকার রায়তশ্রেণি চিরকাল ভোগ করে এসেছে। এ ঐতিহাসিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রায়ত হলো সম্পত্তিহারা, অধিকারহারা। অপরদিকে ইউরোপের আদলে এ দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি অনুগত জমিদারশ্রেণি ও জমিদারশ্রেণির অধীনে একটি অধিকারহীন প্রজাশ্রেণি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রাধীনে কোনো স্বাধীন ব্যক্তি ছিল না, ছিল শুধু সত্তাহীন অধীনে প্রজা। সে অধীনতাও ছিল আবার ওপর থেকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত- সরকার, জমিদার, তালুকদার, পত্তনিদার, হাওলাদার, জোতদার, কুৎকিনদার। সবাই একে অপরের মনিব এবং সব মনিবই প্রজার উৎপাদনের অংশীদার, যদিও কৃষি উৎপাদনে তাদের কোনোই ভূমিকা ছিল না।
ঔপনিবেশিক সরকার জমিদারকে প্রজার ওপর সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় জমিদারকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ও দৈনন্দিন প্রশাসন ক্ষেত্রে শাসিতশ্রেণিকে সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। নানা সংস্কারের মাধ্যমে এ অযোগ্যতা ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে অবশেষে ইংরেজের বিদায় ঘটল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ইংরেজ প্রণীত শোষণ ও বঞ্চনাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা টিকে থাকল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির পর মনিব হিসেবে জমিদারের বিদায় ঘটল বটে, কিন্তু অন্যান্য মনিব ভিন্ন অবয়বে টিকে থাকে, যা কি না বর্তমানেও বিদ্যমান। পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভূমিহীন যা কি না ঔপনিবেশিক যুগের রাষ্ট্রচরিত্রকেও অতিক্রম করে গেছে। একই চিত্র বিদ্যমান নগরজীবনেও। নগরের অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন, আশ্রয়হীন, স্বাস্থ্যহীন। খোদ রাষ্ট্র দেশি-বিদেশি নানা স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। শাসনতন্ত্রে যদিও তাত্ত্বিকভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। এক কথায়, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাহীনতার ব্যাপারে বর্তমান বাংলাদেশ অতীতকে অতিক্রম করেছে, সামাজিক অগ্রযাত্রা সূচনা করা তো দূরের কথা।

হেলাল হাফিজ - কবিতার আশ্চর্য ফেরীঅলা

এহসান মাহমুদ 

 

 

কতোটা পথ পাড়ি দিলে পথিক হওয়া যায় ? ক-ত টুকু বাঁধা পেরোলে স্বাধীনতা ধরা দেয়, কিংবা কতোটা সময় ফেরী করে বেড়ালে একজন ফেরীঅলা হয়ে ওঠেন ? আর একজন ফেরীঅলা এক জীবনে ক’ঘরে ফেরী করতে পারেন বা তাঁর মালামাল ফুরিয়ে না গিয়ে অনবরত ফেরী করে বেড়াতে পারেন ! খুব কম সংখ্যক ফেরীঅলাই তা পারেন। আর যারা পারেন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন আশ্চর্য ফেরীঅলা। বাংলা কবিতার ইতিহাসে হেলাল হাফিজ এমন আশ্চর্য এক ফেরীঅলা।
কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর, নেত্রকোনা জেলার বড়তলী গ্রামে। শৈশবে মাকে হারিয়েছেন। স্কুল শিক্ষক বাবার কড়া শাসনে কেটেছে শৈশবের দুরন্ত সময়। ছিলেন স্কুলের সেরা খেলোয়ার। নেত্রকোনাতেই কেটেছে স্কুল এবং কলেজ জীবন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হন বাংলা বিভাগে। তারপরেই কবিতা নামক পোঁকার আক্রমনে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। নেত্রকোনার আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং কবি রফিক আজাদের সাথে জানাশোনা ছিল আগেই। নির্মলেন্দু গুণের সাথে পরিচয় বাবার কবিতা লেখার উছিলায়। স্কুল শিক্ষক বাবা খোরশেদ আলী তালুকদারও কবিতা লিখতেন। নির্মলন্দু গুণ এবং রফিক আজাদের সাথে বাবা কবিতা লিখতেন খালেকদাদ চৌধুরী সম্পাদিত ‘উত্তর আকাশ’ নামের পত্রিকায়। সেই সুবাদে ঢাকায় এসে নির্মলেন্দু গুন এবং রফিক আজাদের সাথে সম্পর্কটা আরও পাকাপোক্ত হয়। তারপর থেকেই কবিতায় যাপন শুরু।
১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থানের সময়। ঢাকা শহর যেন মিছিলের নগরী। হেলাল হাফিজ লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা। কবিতা নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য গেলেন দৈনিক পাকিস্তান’র সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের কাছে। আহসান হাবীব কবিতা পড়ে ফিরিয়ে দিলেন, আর বললেন, তোমার এ কবিতা ছাপাতে পারলাম না বলে আমার আজীবন দুঃখ থাকবে। তবে আমি বলছি- এই কবিতা লেখার পরে তোমার আর কবিতা না লিখলেও চলবে।
হেলাল হাফিজ কবিতা নিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু না, তিনি অগ্রজ কবির কথা ভুলে গিয়ে আবার কলম হাতে নেন। একে একে লিখে ফেলেন- ‘নিরাশ্রয়ী পাঁচটি আঙুল’ এবং ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’। ততদিনে দেশে শুরু হয়ে গেছে উত্তাল একাত্তর। সারা দেশ মিছিলে মিছিলে মুখর। আর দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতে থাকলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার প্রথম দু’টি চরণ -এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।
লেখালেখি শুরু করার ১৭ বছর পরে প্রকাশ করেন প্রথম এবং একমাত্র কবিতার বই যে জলে আগুন জ্বলে। ১৯৮৬ সালের বই মেলায় কবিতার বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই নিজেকে আড়াল করে নেন তিনি। সুদীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছানির্বাসন অবস্থা থেকে বের হয়ে ২০১২ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর ২য় গ্রন্থ কবিতা একাত্তর। দীর্ঘ ২৫ বছরে তিনি যাপন করেছেন ভিন্ন এক জীবন। ফেরী করেছেন আশ্চর্য এক কষ্ট। প্রায় চার বছর যাবৎ বাসা বেঁধেছেন হোটেলে। পরিজনবিহীন রাজধানী ঢাকার তোপাখানা রোডের হোটেল কর্নফুলিতে এখন তাঁর নিবাস। এখন তাঁর জীবন অনেকটা হোটেল বন্দি অবস্থায় কাটে। দুই কিস্তিতে তাঁর মুখোমুখি বসি প্রেসক্লাবের গেষ্টরুমে আর তাঁর হোটেল কর্নফুলির রুমে। কবি শোনান তাঁর ‘এক জীবন’ ফেরী করার গল্প !

-কয়েকমাস পরেই আপনি পৌঁছবেন ৬৭তম জন্মদিনে। পেছনে কাটিয়ে এসেছেন জীবনের এতোটা বছর। তাই শুরুতেই জানতে চাইছি, ৬৭ বছরের জীবনে ২৫টি বছর কাটিয়ে দিলেন অন্তরালে থেকে, আজ এখন এই সময়টাতে আপনার উপলব্ধি কি ?
- জন্মদিনতো আসলে আনন্দের কোনো বিষয় নয়। বরং এটি একধরনের মন্দ লাগার কারণ। ৬৬ বছর পেছনে ফেলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। ৬৬ বছর হয়তো অংকের হিসেবে বেশ দীর্ঘ একটা সময়ই বটে। কিন্তু, আমি পুরো সময়টাকে কাজে লাগাতে পারিনি। আর এই জীবন যাপন করতে গিয়ে হয়তো নতুন কোনো কষ্ট আবার বুকে জমেছে। সেগুলো আবার মাথা চারা দিয়ে উঠতে চায়। যে বেদনাবোধ, নিজের স্বপ্ন এবং প্রেম থেকে লেখা হয়েছে আমার যে জলে আগুন জ্বলে। আমার অব্যক্ত কথাগুলোই প্রকাশিত হয়েছে কবিতার বইয়ে। আবার হয়তো কিছু বেদনা জমেছে। সেগুলোকে প্রকাশ করতে হবে। আর জীবনের ২৫ বছরেরও বেশি সময় যে স্বেচ্ছা নির্বাসিত ছিলাম তার জন্য আমার কোনো অনুশোচনা নেই। ৬৬ বছর থেকে ২৫টি বছর তো এক ধরনের ঝরে যাওয়াই বলা যেতে পারে। তবে তা নিয়ে কোনো দুঃখবোধ নেই।

-এবার আমরা একটু গোড়ার দিকে যেতে চাই। কখন থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন যে কেবল কবিতাই লিখবেন ?
-সোজাসুজি বলতে গেলে কলেজ জীবন থেকে। স্কুল জীবনে আমি খুব ভালো খেলোয়ার ছিলাম। স্কুলের হয়ে বাইরের বিভিন্ন দলের বিপক্ষে বেশ ভালো ফুটবল খেলতাম। এছাড়া লং জাম্প ছাড়াও ভলিবলটাও খুব ভালো খেলতে পারতাম। বলতে পারো যে, ভালো খেলোয়ার ছিলাম। কিন্তু সবকিছুর পরেও মাতৃহীনতার একটা শূণ্যতা আমাকে তাড়া করতো। খেলা-ধুলা আমাকে সেই হাহাকারময় অবস্থা থেকে পরিত্রান দিতে পারতো না। তখনই আমি আশ্রয় নিই কবিতার। আকড়ে ধরি কবিতাকে। কবিতাও অমাকে আশ্রয় দেয়। তারপরে ইন্টারমিডিয়েট পাশের পরে ’৬৭ এর দিকে যখন ঢাকায় চলে আসি, তখন সবকিছু যেন বদলে গেল। আর একটি ব্যাপার যেটি আমার মনে হয়, আমাদের যৌবনের সময়ে এই ভূখন্ডে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের সময়ের অনেককেই প্রভাবিত করেছে। কিছু ঘটনা যেমন- ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এইসব ঘটনাগুলো আমাদেরক প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে, আলোড়িত করেছে। যা আমাদেরকে কবিতা লিখতে একধরনের সহায়তা করেছে বলেই আমার মনে হয়।
-আপনার কাব্যগ্রন্থ যে জলে আগুন জ্বলে’র কবিতা বিন্যাসের দিকে তাকালে দেখি যে ’৬৯ থেকে ’৮৫ সাল পর্যন্ত বিভিন সময়ে লেখা কবিতা স্থান পেয়েছে। কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৫৬ টি কবিতা রয়েছে। এই সুদীর্ঘ ১৬ বছরে কি আপনি ৫৬টি কবিতাই লিখেছিলেন?
-না ... না। কবিতা জমেছিল প্রায় একশো’ কুড়িটির মতো। সেখান থেকে বাছাই করে ৫৬ টি কবিতা নেয়া হয়েছে। আর কবিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমি চেয়েছি যেন প্রেম, দ্রোহ, সংগ্রাম, দেশ, সমাজ, ব্যাক্তিগত প্রেম বা জীবন সবকিছু যেন এক মলাটে বন্দি করা যায়। আর যে জলে আগুন জ্বলে বইটি করার জন্য কবিতা বাছাইয়ে আমি সময় নিয়েছিলাম ৬ মাসের মতো। প্রতিদিন কবিতা বাছাই করতাম। আবার রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম এই কবিতাটি বাদ দিয়ে অমুক কবিতাটি নিতে হবে। আবার পরেরদিন দেখা যেত আগের রাতের বাছাই করা কবিতাটি বাতিল করে দিতাম। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, কবিতা বাছাই করতে গিয়ে মনে পড়তো আচ্ছা, ঐযে সদরঘাটের বা গুলিস্তানের মিছিল থেকে আসার পরে যে কবিতাটি লিখেছিলাম সেটি বাদ দিবো কেন? নিয়ে নিই না কেন সেটি? আবার দেখা যেত কোনো এক নারীর কথা স্মরণ করে লেখা কোনো একটি কবিতা নেয়ার জন্য আবার নতুন করে কবিতা বাছাই করেছি। তাই কবিতা নির্বাচন করাটা আমার কাছে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল।

-যে জলে আগুন জ্বলে কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র প্রথম দু’টি লাইন আপনাকে রাতারাতি তারকা কবির পরিচিতি এনে দেয়। তখন ’৬৯ এবং ’৭১ এ আপনার এই কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আপনার কবিতা লেখা থাকতো দেয়ালে, দেয়ালে। তারপরে দেশ স্বাধীনেরও অনেককাল পরে ৫৬ টি কবিতা একত্রিত করে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হলো -যে জলে আগুন জ্বলে। আর এদিকে আমাদের দেশটিও ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের। দেশের ভূখন্ডের সাথে মিলিয়েই কি ৫৬টি কবিতা রেখেছিলেন ?
-না। এটা কাকতালীয়। আমি এমনটা করে ভাবিনি। তুমিই প্রথম যে এই বিষয়টি নিয়ে এভাবে মিলিয়ে দেখলে। আসলে ৫৬টি কবিতা রাখা হয়েছিল বইয়ের ফর্মা অনুযায়ী। এর চেয়ে বেশি কবিতা রাখা যেত না। তাই ৫৬টিই নির্বাচিত করা হয়েছে।

-কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরেই কেন নিজেকে আড়ালে নিয়ে গেলেন বা আড়াল করলেন ?
-নানা কারনে। তবে কিছু মান-অভিমান তো ছিলই। কিন্তু আমি কবিতা নিয়ে কখনোই ব্যবসা করতে চাইনি। কবিতাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বলেও কখনো ভাবিনি।

-এই যে একটি কাব্যগ্রন্থ দিয়ে প্রায় দুই প্রজন্মকে সমানভাবে সম্মোহিত করে রাখলেন, আপনার কবিতার কোন বিশেষ দিকটির জন্য আপনার কবিতা এখনও শুরু থেকে সমান পঠিত বলে মনে করেন ?
-আমার কবিতায় মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে হয়তো প্রকাশ করতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে মানুষকে স্পর্শ করেছে বলেই এটা হয়েছে বলে মনে হয়। যেমন- এবার এই যে শাহবাগে আন্দোলন হলো, সেখানেও রোজ কেউ না কেউ আমার কোনো না কোনো কবিতা পাঠ করেছে আবৃত্তি করেছে। মানুষ প্রেমে পড়তে গিয়েও আমার কবিতা পড়েছে। প্রেমে মজেও পড়েছে। আবার প্রেমে প্রত্যাখাত হয়েও পড়েছে। আমার কবিতার মাঝে যেন একক আমি সকলের কথাই বলেছি। তাই হয়তো এমনটা হতে পারে।
-আপনার সমকালের অন্যান্য কবিগণ যেমন- আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, আবদুল মান্নান সৈয়দ এঁদের মধ্যে কেবল আবুল হাসানের (অকাল প্রয়াত বলে) ৩টি কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু আপনার কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ। তারপরেও আপনি আমাদের বাংলা কবিতার ষাটের দশকের আলোচনায় বেশ আলোচিত। কিন্তু সেটি কেন ? আপনার কেবল একটি গ্রন্থ এক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি কেন ?
-কেন অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি তা আমি বলতে পারবো না। আর আমার তো মনে হয় আমার নামটি অন্যসবার আগেই উচ্চারিত হয় (হা..হা..হা)। (হাসি থামিয়ে খানিক ভেবে) আমাদের ষাটের দশকের প্রথম দিকের কবি হলেন আসাদ চৌধুরী। তুমি যাদের নাম বলেছো এঁদের বাইরে প্রশান্ত ঘোষালের নামটিও উল্লেখ করার মতো।
-আপনার সময়কার অন্যান্য কবিগণ কবিতা লিখে খ্যাতির পাশাপাশি নানা পুরষ্কার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন। এক্ষেত্রে আপনার অবস্থানটি যদি বলেন...
-আমি কখনোই ভাবিনি যে কবিতা লিখে পুরষ্কার পেতে হবে। আর আমি এক জীবনে এতো এতো মানুষের এতো প্রেম আর ভালোবাসা পেয়েছি যে অন্য কিছু পাওয়ার কথা স্মরণে আসেনি। আর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে নানা সময়ে সম্মাননা দিয়েছে আমাকে। তবে যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে ভালোবাসা। আর আমার যা কিছু অর্জন সব তো কবিতার জন্যই। আর রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার বলতে তো বাংলা একাডেমি পুরষ্কারকে বুঝায়। সেটি এখনও পাইনি। তার জন্য কোনো দুঃখ বোধও নেই।

 

’৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও আমাদের নেত্রকোনার সিনেমা হলে সূচিত্রা সেনের ছবি দেখানো হতো। যে সপ্তাহে সূচিত্রা সেনের ছবি থাকতো সেই সপ্তাহে পালিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। এমনও হয়েছে অনেকদিন আমি এবং আব্বা একইসাথে হলে বসে সিনেমা দেখেছি। কিন্তু আব্বা জানতো না যে আমিও হলের ভেতরে রয়েছি। ছবি শেষ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে অন্য রাস্তা আব্বার আগে বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। তখন থেকেই সূচিত্রা সেনের প্রতি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সেই সূচিত্রা সেনকে দেখলাম নিজেকে আড়াল করে গৃহবন্দী করে রেখেছেন

 

-আপনি প্রায় দীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসন জীবন কাটালেন। এই নির্বাসিত জীবনে কি কবিতা থেকেও নির্বাসনে ছিলেন?
-আমি প্রায় নির্বাসিত জীবন কাটালেও কবিতাকে কখনো ছাড়তে পারিনি আর কবিতাও আমাকে ছেড়ে যায় নি। আর এই ২৫টি বছর আমি এই বইটির প্রতি (টেবিলে থাকা যে জলে আগুন জ্বলে দেখিয়ে) মানুষের ভালোলাগা আর ভালোবাসা অবলোকন করেছি। আমার নির্বাসিত জীবন কম্পর্কে লোকজন সঠিক কিছু জানতো না। অধিকাংশ লোকজন জানতো আমি দেশের বাইরে আছি। আবার অনেকে ভাবতো আমি মারা গেছি। তাই ২৫ বছর পরে আবার এসে আমি নতুন একটা জগতের মুখোমুখি হলাম যেন।
-আপনার এই নিজেকে আড়াল করা বা নির্বাসিত জীবন যাপনের পেছনের কথাটি যদি বলতেন....
-(খানিক ভেবে) নির্বাসনে থাকার প্রধান কারন হচ্ছে -আলস্য। এটি এখন আমার রোগে পরিণত হয়েছে। আর তাছাড়া ব্যাক্তিজীবনের নানা পরাজয়ও রয়েছে। এছাড়া আরেকটি বিষয়, যিনি আমাকে নির্বাসিত থাকতে উৎসাহী বলবো, না-কি প্রলুব্ধ করেছেন বলবো ? তিনি হচ্ছেন সূচিত্রা সেন। আমি সূচিত্রা সেনের খুব অনুরাগী। সূচিত্রা সেনের বিষয়টা বলতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। ’৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও আমাদের নেত্রকোনার সিনেমা হলে সূচিত্রা সেনের ছবি দেখানো হতো। যে সপ্তাহে সূচিত্রা সেনের ছবি থাকতো সেই সপ্তাহে পালিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। এমনও হয়েছে অনেকদিন আমি এবং আব্বা একইসাথে হলে বসে সিনেমা দেখেছি। কিন্তু আব্বা জানতো না যে আমিও হলের ভেতরে রয়েছি। ছবি শেষ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে অন্য রাস্তা আব্বার আগে বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। তখন থেকেই সূচিত্রা সেনের প্রতি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সেই সূচিত্রা সেনকে দেখলাম নিজেকে আড়াল করে গৃহবন্দী করে রেখেছেন। কারো সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখছেন না। এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা নিজেকে আড়ালে নিয়ে নিলেন। আড়াল করে ফেললেন নিজেকে। সূচিত্রা সেনের মতো আমিও নিজেকে আড়ালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা ২৫ বছর ধরে রাখতে পারলেও আর পারলাম না। পারছি না বলেই এখন তোমার সাথে বসে গল্প করছি (হা...হা...হা)।

-জ্বী। তাই আপনার নির্বাসন ভঙ্গের জন্য আপনাকে আরেকবার স্বাগত। (তিনি খানিক বিরতি নিলেন)। এবার আমরা আবার শুরু করি তবে ?
(তিনি মুখ বুজেই একবার হাসলেন যেন। তারপরে বললেন, ও হ্যাঁ আলোচনাটা শেষ করা দরকার।)
-কবিতায় সমকালীন রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব পড়ে। আপনার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু আবার অনেক রাজনৈতিক কবিতাই শেষ পর্যন্ত কবিতা না হয়ে শ্লোগান সর্বস্ব হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে কিছু বলুন...
-আমার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নিয়ে এখন রীতিমত তর্ক-বিতর্ক চলছে। এ নিয়ে অনেকে বলেন, এটি শ্লোগান। আবার অনেকে বলছেন, কবিতাই ছিল এখন স্লোগান হয়ে গেছে। তবে আমি বলবো- এটাকে আমি কবিতা হিসেবেই লিখেছি। তুমুল জনপ্রিয়তার কারনে হয়তো অনেকে ‘শ্লোগান’ বলার পক্ষে মত দিয়েছেন।

-আপনি যে সময়টাতে কবিতা লেখা শুরু করলেন- অর্থাৎ ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ঐ সময়টিকে নিয়ে আপনার সময়কার প্রায় সকলেই কবিতা লিখেছেন। বিশেষকরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার কোনো কবিতা রয়েছে কিনা ?
-দেখো আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী কখনোই ছিলাম না। আর নীতিগতভাবে আমি বাম রাজনীতিকে সমর্থন করি। যদিও সারাবিশ্বে মার্কস

ইজমের পতন হয়েছে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি- রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্ঠন করতে মার্কস ইজমের কোনো বিকল্প নেই। যাই হোক, বর্তমানে অমাদের বাংলাদেশে দুটি জিনিস পড়েছে ভল্লুকের হাতে। একটি হচ্ছে ধর্ম, অপরটি রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখাটা ছিল ভয়াবহ, তখন আমি এই ভূখ-ের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছি। আমার কবিতাটির নাম ‘নাম ভূমিকায়’।

-এবার আপনার ব্যাক্তিগত বিষয়ে জানতে চাইবো।
-তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো এহ্্সান। যেটি বলার মতো বলবো। সংকোচের কিছু নেই।
-আপনার জীবন-যাপন নিয়ে বিভিন্ন কথা প্রচলিত আছে। জীবন ধারনের জন্য, জীবিকা উপার্জনের জন্য আপনি নানা বিচিত্র মাধ্যম বেছে নিয়েছিলেন। সেসব বিষয়ে যদি বলেন...
-সারাজীবনে পেশা বলতে যা বলতে বুঝায় সেটি বললে সাংবাদিকতার কথাই বলতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এই পেশাটি এখনও ইন্ড্রাষ্টিরূপে দাড়ায় নি। তাই বেকার হবার একটি ঝুঁকি থেকেই যায়। আমিও আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় অর্ধৈকটা সময়ই চাকরিহীন অবস্থায় কাটিয়েছি। ১৯৭৪ এ যখন আমার চাকরি চলে গেল তখন আমি জুয়া খেলে জীবিকা চালাতাম। আমার জুয়া খেলার ভাগ্য খুবই ভালো ছিল। বেশিরভাগ সময়ই আমি জিততাম। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আমি জুয়া খেলে জীবন-যাপন করেছি।
এছাড়া আরেকটি বিষয় আছে যেটিকে ইংরেজিতে বলে ‘জিগোলো’। ‘জিগোলো’ হচ্ছে সেই পুরুষ যে কিনা বিত্তশালী নারীদের এক্সট্রা ম্যারিটাল ফ্রে- হিসেবে কাজ করে। আমি সেটিও করেছি অনেকদিন। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে নারীদেরকে সঙ্গ দিতাম। নারীরা আমার সঙ্গ পছন্দ করতো।
তবে এগুলো অনুসরনীয় হতে পারে না। আমি চাইনা আমার মতো করে কেউ জীবন-যাপন করুক। তবে আমার জীবন যাপনের পুরো প্রক্রিয়ায় আমি চারটি মূল বিষয়ের উপর বিশ্বাস রেখে চলেছি। এগুলোই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এগুলো হচ্ছে- অক্সিজেন, শস্যদানা, প্রেম এবং কবিতা। এ চারটির একটির কমতি হলে আমার বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠবে।

-আপনার ‘প্রস্থান’ কবিতায় আছে “একজীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,/ এক মানবী কতোটাই বা কষ্ট দেবে !” কবিতার এই মানবী কে ?
-কবিতার সবটাই বলাটি ঠিক হবে না। বনলতা সেন কে ছিল তুমি জানো নাকি এহ্্সান ? জীবনানন্দ কী তা বলে গেছেন (হা...হা...হা) ?

-আপনার কবিতায় কয়েকটি চরিত্র এসেছে যেমন- হিরনবালা, সবিতা সেন, হেলেন, রানা। এরা কি কাল্পনিক নাকি আপনার জীবন থেকে নেয়া নাম ?
-অনেকটাই বাস্তব চরিত্র। আর বেশি বলতে চাই না। তাহলে গবেষকদের কাজ এগিয়ে দিয়ে যাওয়া হবে।

-২০১২ বইমেলায় প্রকাশিত হলো আপনার ‘কবিতা একাত্তর’ নামের গ্রন্থটি। এটির বিষয়ে কিছু বলেন...
-‘কবিতা একাত্তর’ আসলে মৌলিক কোনো বই নয়। এতে যে জলে আগুন জ্বলে বইয়ের ৫৬টি কবিতা এবং নতুন ১৫টি মোট ৭১টি কবিতার বাংলা এবং ইংরেজি একত্রে মলাটবদ্ধরূপ। আমি দীর্ঘদিন ধরেই চেয়েছিলাম আমার কবিতা ইংরেজিতে রূপান্তর করা হোক। মূলত এটি করা হয়েছে ইংরেজি সংস্করণের জন্যই।

-নতুন কবিতা লিখছেন কিনা ?
-আমি আসলে শম্ভুক গতিতে লিখি। আর হয়তো আমি ওতো প্রতিভাবান নই। তাই আমাকে ভাবতে হয় বেশি। আর নতুন কবিতা লিখতে বসার আগে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। এই ২৬ বছরেও আমি আমার ভীতিটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভীতিটা হচ্ছে যে জলে আগুন জ্বলে নিয়ে। প্রথম গ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার পরে এতো এতো প্রতিক্রিয়া পেয়েছি যে নতুন লেখায় হাত দেয়ার আগেই ভাবতে হয়- এটি কি যে জলে আগুন জ্বলে কে অতিক্রম করতে পারবে ? কিংবা কাছাকাছি থাকতে পারবে ? যদি তা না হয়, তবে লিখে কি লাভ ? এমন করতে করতেও কিছু কবিতা আবার জমেছে। দেখি কি করা যায়...

-আর কোনো বই করার ইচ্ছে আছে কি না ?
-একটি বই করবো ইচ্ছে আছে। নামও ঠিক করে ফেলেছি -‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’। দেখি কবে নাগাদ বের করতে পারি ! তবে আমি আরও সময় নিতে চাই। হতে পারে এক বছর বা দুই বছর।

-এই যে পরিবার পরিজনহীন হয়ে হোটেলবাস করছেন, শেষ বয়স নিয়ে বা মৃত্যু নিয়ে কিছু ভাবেন না ?
-শৈশবে মা মারা যাবার পর থেকেই আমি নিঃসঙ্গ। অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন করেছি ছোটবেলা থেকেই। তাই এখন নতুন করে আর কোনো সমস্যা হচেছ না। এই কর্নফুলি হোটেলে ওঠার কয়েকদিন পরে একটি কবিতা লিখেছিলাম ‘সতীন’ নামে। কবিতাটি হচ্ছে- “তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছো !”
আর মৃত্যু চিন্তা নিয়ে চিন্তা না করে মৃত্যুকে ভালোবাসলেই হয়। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলা যায়- “মরনরে তুহু মম শ্যাম সম।”

-আমরা একটি শব্দ ‘অমরতা’ ব্যবহার করি। এই সম্পর্কে আপনার চিন্তা কি ?
-দেখো এহ্্সান, জীবনানন্দ কিন্তু বেঁচে থাকতে জেনে যেতে পারেন নি যে তিনি কবি। আজকে তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। আমি কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখেই বলছি। কেবল কবিতার বিচারে জীবনানন্দ বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কবি। আর রবীন্দ্রনাথ সবকিছু মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ। তাই ‘অমরতা’ বিষয়টি এখানে তুমি কিভাবে ব্যাখ্যা করবে ? আর আমি আমার কথা বলতে পারি- আমি তো এক ধরনের অমরতা পেয়েই গেছি। দীর্ঘ ২৫ বছর পরে ফিরে এসেও দেখছি লোকজন আমার কবিতা পড়ছেন। আমাকে মনে রেখেছেন।

সাক্ষাতকার গ্রহনের সময় : ১ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
ঢাকা।

জন্মের রহস্য

ইকবাল আজিজ

 

 

কার জীবনে কখন ঝড় আসবে তা কেউ জানে না। আরিফ ভেবেছিল, তার জীবনটা সুখ-দুঃখে কেটে যাবে। উচ্চকাক্সক্ষা তার তেমন নেই। তাই জীবন নিয়ে জুয়াও কোনোদিন খেলেনি। সহজ-সরল জীবনই ছিল তার সার, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু জীবন এক আশ্চর্য রহস্যের নাম। কারো পক্ষেই উপলদ্ধি করা সম্ভব নয় মাত্র এক মিনিট পর তার জীবন কিংবা সংসারে কী ঘটতে চলছে। সে ভাববাদী বা ভাগ্যবাদী নয়, বরং পুরোপুরি মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও নিতান্তবই কর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ। যা কখনোই ভাবেনি, ওই অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয়টি শেষ পর্যন্ত তার জীবনে এসে ভর করলো। এটা তেমন অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে যার জীবনে ঘটে সেই শুধু টের পায়।
১৪ বছর সংসার করার পর আরিফের ঘর ভেঙে গেছে। আরিফ ও তাদের ১৩ বছরের পুত্র তুষার এবং স্ত্রী লায়লাÑ এই নিয়ে একটি সংসার হঠাৎ ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। তিন মাস আগে সহসাই আরিফের যৌথ জীবন ভেঙে গেছে।
বিবাহীত জীবনে আরিফ ছিল স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল। সংসারের সব দিকই সামলাতো লায়লা। আরিফ একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক। তার স্ত্রী লায়লা গৃহবধূ। তবে মাঝে মধ্যে এনজিও-তে কনসালটেন্সি করে। ১৪ বছর ধরে তাদের সংসারে সুখ-দুঃখ সবই ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত কোনো সংঘাত হয়নি। ঘটনাপ্রবাহে আরিফ ও লায়লার জীবন দুটি দিকে চলে গেল। মাঝখানে তুষার দাঁড়িয়েছিল দুটি জীবনের স্বপ্নময় প্রত্যাশা হয়ে। তার জীবনের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হয়ে গেছে, সে বাবার সঙ্গে থাকবে।
বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনার জন্য তিন মাস আগে এক বিকেলে ঘনিষ্ঠ কয়েক আত্মীয় এক সঙ্গে বসেছিল আরিফ, লায়লা ও তুষারকে নিয়ে। এ কারণে ওই বিচ্ছেদের ঘনঘটায় আবদুল মালেক সেদিন ছিল অনুপস্থিত। ওই ঘরোয়া আসরে লায়লা বললো, আরিফের বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। সে বিয়ে বিচ্ছেদ চায়। তার ভরণ-পোষণ দরকার নেই। তুষারের বিষয়ে তার কোনো আলাদা দাবি নেই। সে ইচ্ছা করলে তার বাবার সঙ্গে অথবা তার কাছে থাকতে পারে লায়লার নতুন সংসারে। কিন্তু পারিবারিক বৈঠকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৩ বছর বয়স্ক তুষার বললো, ‘আমি ॥

আব্বুর সঙ্গে থাকবো। জীবনে আর কোনোদিন তার আম্মু এবং ওই কুত্তা মালেক মামাকে দেখতে চাই না।’
লায়লার বড় বোন বললো, ‘বাবা, বড়দের ওইভাবে গালি দিতে নেই। মানুষ খারাপ বলবে।’ তারপর সবাইকে চা-নাশতা দেয়ার জন্য বাড়ির কাজের মেয়েকে সে নির্দেশ দিল।
তুষার বাবার পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তার বড় খালাই ওই পারিবারিক অলোচনার আয়োজন করেছে। সেদিনই বিচ্ছেদের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক হয়েছিল বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত লায়লা শান্তিনগর তার পৈতৃক বাড়িতে থাকবে। অন্যদিকে তুষারকে নিয়ে আরিফ থাকবে সেন্ট্রাল রোডে তার ফ্ল্যাটে। যেহেতু মুসলমানের বিয়ে বিচ্ছেদ এবং মিয়া-বিবি রাজি সেহেতু আইনত তালাক কার্যকর হতে তেমন ঝামেলা হয়নি।
তিন মাস ধরে তুষার আছে তার বাবার সঙ্গে। আরিফ নিজের মানসিক বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। বাবা ও পুত্রের সংসার এক নতুন এবং ব্যতিক্রমী নিয়মের আবর্তে ক্রমেই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ। জগতে এই এক নিয়মÑ মানুষ সব পরিবর্তনেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলানোর জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বুয়া রাখা হয়েছে। সামান্য লেখাপড়া জানা এই নারীকে ঠিক কাজের মেয়ে না বলে বরং কেয়ারটেকার বলা যায়। ওই কেয়ারটেকার তসলিমার অধীন এক ঠিকা ঝি কাজ করে সকাল-সন্ধ্যা।

আরিফ সকালে ধানম-ির টিউলিপ ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তুষারকে রেখে চলে যায় বনানীতে তার অ্যাড. ফার্মে। মাঝারি আকারের ‘মোনালিসা অ্যাড. ফার্ম’-এ ২৫-৩০ কর্মচারীর ভাগ্যবিধাতা সে। অফিসে পৌঁছেই ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিল তুষারের স্কুলে। ড্রাইভার দু’তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকে তুষারের। আগে এ দায়িত্বটা পালন করতো লায়লা। স্কুলের সামনের আঙিনায় অনেক নারীকে নিয়ে বসে থাকতো। ড্রাইভারও থাকতো গাড়ি নিয়ে।
ওই স্কুলে মালেক আসতো তার ভাগ্নিকে নিয়ে। লায়লার বয়সি মালেক প্রথম থেকেই অ্যাগ্রেসিভ ও অশালীন ধরনের। তার এ স্বভাবের কারণে মেয়েরা তাকে খুব সহজেই পছন্দ করে ফেলে। লায়লার সঙ্গে এখানেই আলাপ হয়েছিল মালেকের। তুষার ও মালেকের ভাগ্নি তিশা যখন স্কুলে ক্লাস করতো তখন লায়লা এবং তার ‘মালেক ভাই’ ৮ নম্বর রোডের ভারতীয় রেস্টুরেন্ট ‘খানা খাজানা’য় বসে দইবড়া ও চটপতি খেতো। এভাবে সম্পর্কটি গভীর হতে দেরি হয়নি।
লায়লা বাস্তবিকই প্রেমে পড়েছিল। ওই সঙ্গে অনুভব করেছিল, আরিফকে সে কোনোদিনই ভালোবাসেনি।
আচরণে রাফ অ্যান্ড টাফ স্বভাবের ব্যবসায়ী মালেকও যেন তার এক উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছিল লায়লার মধ্য দিয়ে। ওই নারী যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও কামনিপোনা। মাঝে মধ্যে তারা ধানমন্ডি মালেকের বাসায়ও যেতো। নিভৃতে দু’এক ঘণ্টা সময় কাটাতো। ব্যাপারটি এভাবে চলতে পারতো বেশ কিছুকাল। কিন্তু জীবনের গতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউ জানে না।
ইতোমধ্যে তুষারকে লায়লা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মালেকের সঙ্গে ‘মালেক মামা’ বলে ডাকতে। তারা তিনজন ধানমন্ডি লেকে ডিঙায় চড়ে ভেসে বেড়াতো। তুষার মজাই পেতো। তবে মাঝে মধ্যে তার খারাপ লাগতো যখন দেখতো ওই গু-ার মতো লম্ভা-চওড়া মানুষ মায়ের হাত ধরে বসে আছে। সে তখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো। ব্যপারটি আরো এগিয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রেম-ভালোবাসা মানুষকে অনেক সাহসী করে তোলে।
শরীরের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে লায়লা বুঝেছিল, এতোকাল সে বড় বেশি বঞ্চিত হয়েছে। আরিফের অল্প ভুঁড়িওয়ালা আয়েশি শরীরটি জীবনের অনেক ছন্দময় রহস্যে অভ্যস্ত নয়। লায়লা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আরিফ যদি মালেক বিষয়ে তার অপরিহার্যতা মেনে নিয়ে চুপ থাকে তাহবে আরিফের সংসারে থাকবে। তা না হলে মালেকের সঙ্গে সে নতুন করে ঘর বাঁধবে। এর মাঝামাঝি অন্য কোনো পথ নেই।
আরিফের সঙ্গে মালেকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল লায়লা। মালেক প্রায়ই হোটেল থেকে খাবার-দাবার নিয়ে আসতো। কথনো কখনো খাবারের সঙ্গে বিদেশি হুইস্কি কিংবা রেড ওয়াইনের বোতল আনতো।
বাবা সারা দিন অফিসে, তুষার দেখতো তাদের ফ্ল্যাটে মা ও মালেক মামা বোতলের পানি খেয়ে কিছুটা অসংলগ্ন কথা বলছে। তুষার তখন তাদের কাছে গেলে দু’জনই হাসতো। মা বলতো, ‘তুষার আমার লক্ষ্মী ছেলে।’ মালেক মামা মদের ঘোরে বলতো, ‘তুষার রে আমি কাইলই আমেরিকায় পাঠাইয়া দিমু। আমার সব টাকা, ধন-সম্পদও ওরে দিয়া যামু।’ গোটা ব্যাপারটা তুষারের খারাপ লাগতো। কারণ তার বাবাকে কখনোই মদ খেতে দেখেনি সে। মাও আগে কোনোদিন খায়নি। বাবা সিগারেট পর্যন্ত খায় না। তিনি সব সময় বলেন, ‘সিগারেট, মদ খুব খারাপ জিনিস।’
আরিফ বাসায় ফিরে মালেকের সঙ্গে বসে থাকতে দেখেছে। খাবার ও পানীয়ও খেতে দেখেছে। কিন্তু নিরীহ ও নির্বিরোধী স্বভাবের আরিফ কিছু বলতে সাহস পায়নি।
লায়লা এমনিই কিছুটা তেজি ও ডোমেনেটিং স্বাভাবের। এর উপর ইদানীং সঙ্গী হয়ে জুটেছে মালেক নামে এক মাতাল ও গু-া। একদিন সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টের বেডরুমের তারা দরজা লাগিয়ে ছিল। তুষারকে বলেছিল, টিভিতে তারা একটি বিশেষ ফিল্ম দেখবে।
তুষার নিজের ঘরে মন খারাপ করে বসেছিল। একটি বই পড়ার চেষ্টা করছিল।
আরিফ হঠাৎ বাসায় ফিরে ব্যাপারটি বুঝতে পারলো। বাইরে থেকে বেডরুমের দরজায় কড়া নেড়ে লায়লাকে ডাকলো।
কিছুক্ষণ পরে দু’জন বেরিয়ে এলো। মালেক ও লায়লা দু’জনেরই চুল অবিন্যস্ত। মালেকের শার্টের দুটি বোতাম খোলা।
লায়লা কিশুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, ‘এভাবে অসভ্যের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছিলে কেন? জীবনেও ভভ্রতা শিখলে না?’
আরিফ কিছুটা সাহস করে বললো, ‘তোমরা দরজা লাগিয়ে কী করছিলে?’
এবার মালেক কেমন অদ্ভুদভাবে ভিলেইনের মতো হাসলো। তারপর সোজা আরিফের কাছে এসে তার ঘাড়ে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বললো, ‘এসব কথা যদি কাউকে বলো তাহলে দেন আই উইল কিল ইউ।’
আরিফ ভাবতেই পারেনি তার বাসায় এসে বাইরের কেউ তাকে এভাবে হুমকি দিতে পারে! আরিফ সরে গিয়ে একটি চেয়ারে বসলো।
তুষার বুঝতে পারলো না। শুধু দেখতে পেল বাবা খুব গভীর ও বেদর্নাত হয়ে বসে আছে।
এবার মালেকের দিকে তাকিয়ে লায়লা বললো, ‘তুমি ওই গাধাটার সঙ্গে কেন কথা বলতে গেছ।’
তুষার তাকিয়ে থেকে মায়ের কথা বলার ভঙ্গিটা দেখলো। গত কয়েক মাসে

মা কতো বদলে গেছে। একটা বাইরের মানুষের সামনে আব্বুকে গাধা বলছে!
সেদিন মালেক চলে যাওয়ার পর লায়লাকে আরিফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি আসলে কী চাও?’
লায়লা বললো, ‘আপাতত তোমকে ছাড়তে চাই। কাল শান্তিনগরে চলে যাবে। এরপর ভেবে দেখো, কী করবে?’
লায়লা তার বাপের বাড়ি শান্তিনগরে চলে যাওয়ার ক’দিন পর তুষারের বড় খালার বাসায় ঘরোয়া আলোচনার মধ্য দিয়ে সব চূড়ান্ত হয়ে গেল নির্বিবাদে।
এরপর ছ’মাস কেটে গেছে। সেন্ট্রাল রোডের অ্যাপার্টমেন্টে আরিফ ও তুষারের জীবনে স্বাভাবিক ছন্দ অনেকটাই ফিরে এসেছে। আরিফ ভাবে, বাবা ও ছেলের এ সংসার নিয়ে যদি দেশের কোনো নারীবাদী লেখিকা একটি গল্প লিখতেন তাহলে হয়তো ভালোই হতো। আরিফের মনে হয়, কোনো জীবনেরই শেষ কেউ বলতে পারে না।
তুষারও হয়তো বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছে। তবে মাঝে মধ্যে সে একা কাঁদে। এই ছ’মাস সে একবারও মাকে দেখতে চায়নি। বরং তুষারকে লায়লা দু’বার দেখতে আসার জন্য ফোন করেছিল। তুষার বলে দিয়েছে, ‘কোনো দরকার নেই। তুমি কুত্তার বাচ্চা মালেক মামার সঙ্গেই থাকো। আর কখনো আমাকে ফোন করবে না।’
লায়লা ওপার থেকে চুপ হয়ে গেছে।
ওই বিচ্ছেদের ঘটনাটি তুষারের মানসিক বয়স অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সে জানে, তাদের ক্লাসের দু’তিনজন বন্ধুর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মা-বাবা দু’জনই আবার বিয়ে করেছে। কিন্তু তার বাবা কতো ভালো! তাকে ছেড়ে মা অন্য পরুষের কাছে চলে গেছে। কিন্তু বাবা চিরকাল একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুষার একদিন বলেছিলো, ‘বাবা, তুমি একটি বিয়ে করো। সারা জীবন এভাবে একা থাকবে?’
আরিফ বলেছে, আমি তো একা নই। তুই আছিস আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে সারা জীবন থাকবো। লেখাপড়া শেষ হলে খুব লক্ষ্মী এক মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেবো।’
ততোক্ষণে বাবার হাত ধরে কাঁদতে শুরু করেছে তুষার। সে বুঝেছে, এ জীবনে এতো বড় আশ্রয় আর কেউ নেই। তবে রাতে বাবা ও ছেলের ঘুমানোর ঘর আলাদা। তুষারের ১০ বছর হওয়ার পর লায়লাই ছেলের আলাদা ঘুমানোর ব্যবস্থ্যা করেছিল। নিয়মটা এখনো চালু আছে। ঘুমানোর আগে বাবা ও ছেলে একে অপরকে ‘গুডনাইট’ বলে চলে যায় যার যার ঘরে। তুষার ঘুমানোর সময় অনুভব করে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন ‘আব্বু’ পাশের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।
আরিফও ঘুমের মধ্যে উপলদ্ধি করে, তার পুত্র একমাত্র বংশধর ঘুমের মধ্যে মেঘের রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুষার তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়, বড় আদরের সন্তান। তার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা।
তুষার এখন অনেক দায়িত্বশীল। কাজের বুয়াকে যথাযথ নির্দেশনা দেয়ার দায়িত্বটা অনেকখানি পালন করে সে। অবশ্য এ নিয়ে বাবার সঙ্গে পরামর্শর করে। এরপর স্বাভাবিকভাবে বুয়াকে নির্দেশ দেয়, কোন বেলায় কী রাঁধতে হবে। এছাড়া এ সাপ্তাহের বিভিন্ন কাজের আগাম নির্দেশ দিয়ে রাখে।
আরিফ একটু উদাসীন প্রকৃতির মানুষ। বিয়ের পর কোনোদিনই এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি। সবই লায়লা সামলেছে। আরিফ বুঝতে পারে, লায়লার গোছানো স্বভাব ও সাংসারিক বুদ্ধি অনেকটাই অবিকল তুষারের মধ্যে আছে। আরিফ মাঝে মধ্যে অভাক হয়ে ভাবে, এমন গোছানো স্বাভাবের বৌটা হঠাৎ সংসার ফেলে চলে গেল কেন? শরীরই কি সব? কে জানে, আর কিছু আছে কি না জীবনের অদেখা জটিল অধ্যায়?
দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আসে তুষার।
সাধারণত সন্ধ্যার পর নিজের অ্যাড. ফার্ম থেকে ফিরে আসে আরিফ। ছেলের কথা ভেবে ইদানীং একটু আগে ফেরে। মনে হয়, ঘরে ফিরে ছেলের সঙ্গে কথা বলে যে শান্তি তা আর পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায় না। আগে সাধারণত পেশাগত কারণে সে যেতো আলী জাকের, নূর ভাই কিংবা রামেন্দুদার কাছে। ব্যবসায়ী জগতের এসব শুভাকাক্সক্ষীদের সন্নিধ্যে তার ভালো লাগতো। এখন অফিসের বাইরে অন্যসব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আজও সন্ধ্যার আগে আরিফ বাসায় ফিরে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে চা-নাশতা খাওয়ার সময় বাপ-বেটার আলাপ শুরু হলো। টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির অনুষ্ঠান। আরিফ-তুষার দু’জনই উৎসাহ নিয়ে দেখছে। টিভির পর্দায় ডায়নোসর মা-বাবা ও শিশু ডায়নোসর। তৃণভোজী ডায়নোসর বিশাল প্রান্তরে চরে বেড়াচ্ছে।
তুষার বললো, ‘কোটি কোটি বছর আগে এগুলো এভাবে চড়ে বেড়াতো।
আরিফ বললো, ‘বিজ্ঞানীরা তা-ই মনে করেন। তাদেরও সন্তান হতো। ডায়নোসর মা-বাবা যতœ নিতো তার সন্তানের। প্রায় ২১ কোটি বছর আগে এগুলো পৃথিবীতে এসেছিলো। এরপর কোটি কোটি বছর পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে। প্রায় ৭ কোটি বছর আগে এগুলো পৃখিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর অনেক পর পৃথিবীতে মানুষ এসেছে।’

এমন সময় টিভির পর্দায় দেখা গেল সবুজ প্রান্তরে বৃষ্টি হচ্ছে। শিশু ডায়নোসর তার মা-বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। তুষার কেমন যেন করুণ মুখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। এরপর এক সময় উঠে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর সে নিচের পড়ার ঘরে চলে গেল।
আরিফের কেমন যেস অস্বস্তি লাগছিল।
তুষার পড়ার ঘরে এসে বই সামনে নিয়ে ভাবছিলো অন্য কথা। সে ভাবছিল মানুষের জন্মের রহস্য কী? অনেক দিন আগে মাকে সে প্রশ্ন করেছিল, ‘মানুষের জন্ম হয় কেন? আমি কীভাবে এলাম?’
মা একটু অপ্রস্তুত হয়েছিল। তারপর বলেছিল, ‘আমরা মনের গভীরে আন্তরিকভাবে চেয়েছি। তাই তোকে পেয়েছি।’
তুষার জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি আর কে আমাকে চেয়েছিলে মা?
মা সেদিন বলেছিল, ‘আমি ও তোর বাবা।’ তিন বছর আগে সেদিন বাবাও মায়ের পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন অবশ্য তুষার অসুস্থভাবে মানুষের জন্মের রহস্য বুঝতে পারে। তবে সবটুকু নয়। সে উপলদ্ধি করেছে, ছোট্ট একটা ভ্রƒণ থেকে মায়ের জরায়ুর গভীরে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় মানব সন্তান। এরপর তা একদিন নবজাতকের নরম শরীর হয়ে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীতে জন্ম হয় এক নতুন মানুষের। অবশ্য তুষার অনুভব করে, তার এ শরীর ও মনের সবকিছুজুড়ে আছে ওই মানবী যে এখন চলে গেছে গু-া-মাতাল ‘মালেক মামার’ কাছে।
আরিফ আবার আগের মতো স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে তার ব্যবসা নিয়ে। দৈনন্দিন রুটিন আগের মতোই পুত্রকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বনানীতে চলে যায় নিজের অ্যাড. ফার্মে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বাবা ও ছেলের আবার দেখা হয়। শুক্রবার ছুটির দিন দু’জন কোথাও বেড়াতে যায় অথবা তুষারের বন্ধুরা আসে। সারা দিন বাসায় খুব মজা হয়।
আরিফ অনেকদিন লক্ষ্য করেছে অথবা হঠাৎ তুষারের ঘরে গিয়ে দেখতে পেয়েছে, কী যেন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে তার পুত্র। বাবাকে দেখে লুকিয়ে ফেলেছে বালিশের নিচে। এ নিয়ে আর আগ্রহ প্রকাশ করেনি আরিফ। পুত্রের ব্যক্তিস্বাধীনতায় সে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।
আরিফ কখনো হঠাৎ ভাবে লায়লার কথা। এতো মাস চলে গেল, একবারও জানা হয়নি কেমন আছে তার এক সময়ের স্ত্রী এবং বর্তমান স্বামী আবদুল মালেক! আরিফের মধ্য দিয়ে পুত্রের সব অপ্রাপ্তি ও পূর্ণতা যেন ঘুচে গেছে। তবে আরিফ জানে না, তুষারে কাছে আছে একটা স্মৃতিচিহ্ন পুরনো পারিবারিক ছবি। ওই ছবিতে তিন বছরের তুষারকে কোলে নিয়ে মা বসে আছে। ওই ছবিটিই তুষার সবার অজ্ঞাতে একা দেখে। সে মায়ের কোলো বসে থাকা শিশু বয়সটি উপলদ্ধি করে। অনুভব করে, একদিন মায়ের শরীরে মায়ের ইচ্ছায় সে অঙ্কুরিত হয়েছিল। এরপর একদিন পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু মা কেন চলে গেছে ওই গু-া ও মাতাল মালেক মামার কাছে?
একদিন মাঝরাতে চারদিকে মুষলধারে বৃষ্টি। তুষার নিজ ঘরে আলো জ্বেলে ওই পুরনো ছবিটি দেখছিল। ভাবছিল জন্মের রহস্যের কথা। ওই মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। এরপর হঠাৎ মুক্তি ও বিকাশ। সেই মা কোথায় চলে গেল? পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর আগে ডায়নোসর এসেছিল। তারপর তারা বিলুপ্ত হয়েছে। মায়ের শরীর থেকে তার জন্ম। মা চালে গেছে তাকে ছেড়ে। কিন্তু নিচের শিকড়ের টান গভীরভাবে অনুভব করে তুষার। মাঝরাতে মায়ের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে মা ও মায়ের কোলে বসে থাকা তিন বছর বয়স্ক নিজের আধা নিষ্পাপ চেহারার দিকে। তুষার ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বললো, ‘মা, আমার জন্মের রহস্য তুমি আবার নতুন করে বলো। আমাকে তুমি কোথায় রেখে গেলে মা? এই সাজানো সংসার, সরল-নিরীহ বাবা, অন্তহীন পুরনো স্মৃতিÑ সব আমাকে দিয়ে তুমি কোথায় গেলে মা? কেন গেলে ওই নিষ্ঠুর মালেক মামার কাছে? ওই গু-া-বদমাশটা কি আমার চেয়েও তোমার কাছে বেশি প্রিয়, মা?’
তুষার যখন মাঝরাতে বিড়বিড় করে এসব কথা বলছিল ছবিটির দিকে তাকিয়ে তখন পাশের ঘরে আরিফ ঘুমিয়ে আছে পরম শান্তিতে। বাইরে বৃষ্টির রাত। আরিফের মনে আর্শ্চয প্রশান্তি। তার একমাত্র পুত্র ও বংশধর তার কাছে পরম নির্ভর হয়ে আছে।

 

আমরা যেন না ভুলে যাই

সোহরাব হাসান



কশাইয়ের এ উৎসবেরে সাজানোর অলঙ্কার পাই কোথায়,
কী দিয়ে সাজাই এ গণহত্যা?
শোক বিলাপের রক্ত আমার চোখে পড়বে কার?
হাড্ডি যার শরীরে আমার রক্ত তো প্রায় নাই
যাও বা আছে বাকি
ক্ষমতা নাই তার প্রদীপের প্রাণ হওয়ার
পূর্ণ করতে পারবে না মদের কোনো গ্লাস
এ কোনো আগুনের ইন্ধন হতে পারে না
জš§ দিতে পারে না কোনো তৃষ্ণা।


(বাংলাদেশ : ফয়েজ আহমদ ফয়েজ)

 



১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ ভূখ-ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা উপমহাদেশ, মহাদেশ, সারা পৃথিবীতে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ৯ মাস একটি বর্বর ও দুর্ধর্ষ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন বহু যোদ্ধা, সম্ভ্রম হারিয়েছেন মা-বোনরা, বহু জনপদ ধ্বংস হয়েছে, মানুষের রক্তে ভেসে গেছে সবুজ প্রান্তর, আকাশ নীলিমা হারিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমার ধোঁয়ার কু-লীতে, শিশুরা কাঁদতে ভুলে গেছে, কিশোরীর হাসি মিলিয়ে গেছে শত্রু সেনার রূঢ় চাহনিতে, জায়নামাজে দাঁড়ানো অশীতিপর বৃদ্ধকেও গুলি করে হত্যা করেছে দখলদার

বাহিনী। তখন একাকার হয়ে গিয়েছিল মানুষের চোখের জল, শরীরের ঘাম ও শোণিত ধারা। এ লড়াই ছিল মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর। সেদিন বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে বাঙালি তো ছিলেনই, তাদের সঙ্গে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছিলেন প্রতিবেশী বাঙালি, ভারতবাসী ও বিশ্ববাসী। আমরা বাংলাদেশের বাঙালি, আদিবাসী, বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চিয়ান সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। স্বাধীনতা আমাদের আকাক্সক্ষা ছিল, গণতন্ত্র আমাদের আরাধ্য ছিল এবং সাম্য ছিল দূরবর্তী লক্ষ্য। কতিপয় গাদ্দার আলবদর, রাজাকার মুসলিম লীগের জামায়াতি ছাড়া দেশের আপামর মানুষ এ লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল সীমান্ত পার হয়ে। কেউ সীমান্তের ভেতর থেকেই লড়াই করেছেন। ওই সময় সবার লক্ষ্য ছিল, যতো দ্রুত সম্ভব দেশটি মুক্ত করা। এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতো ভাগ হচ্ছে, দলীয়করণ হচ্ছে ওই সময় তা ছিল না। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের একটিই স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। একজনই নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর  রহমান। তার নেতৃত্ব মেনেই সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানুষের আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। পৃথিবীর খুব কম জাতিকেই এতো প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাইরে তথা বহির্বিশ্বের মানুষের ভূমিকাকেও খাটো করে দেখা যায় না।

বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিকরা সর্বতোভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা স্বাধীনতাকামী বাঙালির প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতাও জুগিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, পার্লামেন্টের সদস্য, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী। তাদের সমর্থন ও সহায়তা ছিল মানবতার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা এ প্রবন্ধে স্বাধীনতার ওই সহযাত্রীদের কথা আকাক্সক্ষা ও ত্যাগের কথা বলবো। কৃতজ্ঞতা জানাবো আমাদের ওই দুঃসময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের বীরত্ব ও সাহসের কথা বিস্মৃত হওয়ার নয়।
আমরা কী করে ভুলতে পারি ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে মালরো’র কথা! তিনি ৭০ বছর বয়সেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন। জার্মানির প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি ফরাসিদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন,

স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, সময়-সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামেও অংশ নেবেন, তার সহযোদ্ধাদের আহ্বান জানাবেন। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত রেহমান সোবহান প্যারিসে আঁদ্রে মালরোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে আশ্বস্ত করেছিলেন, ফরাসি  সরকার যাতে পাকিস্তানের অস্ত্র সাহায্য না করে এ ব্যাপারে তিনি ফ্রাঞ্চ সরকারকে বলবেন। ... আমরা কী করে ভুলতে পারি আর্থার কে ব্ল্যাডের কথা। তিনি ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের পদে অধিষ্ঠিত থেকেও নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি পাকিস্তানে আমেরিকার অস্ত্র পাঠানোর বিরোধিতা করেছিলেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস পদগোর্নি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রতি গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। জন কেলি জাতিসংঘের কর্মকর্তা হয়েও বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় বিচলিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা ও পার্লামেন্টের সদস্য পিটার শোর পাকিস্তানে সব ব্রিটিশ সাহায্য বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে ছুটে এসেছিলেন শরণার্থী শিবিরে।
আমরা কী মনে রাখবো না ওই মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ডকে! তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং বীরপ্রতীক খেতাব পান। তিনি দেশে ফিরে গিয়েও বাংলাদেশকে মনে রেখেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীকে আখ্যায়িত করেছিলেন নিষ্ঠুর ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে। পাঠান যোদ্ধা মমতাজ খান বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ ও সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেলেন। ভারতীয় সেনাধিপতি জগজিৎ সিং অরোরা সেনাবাহিনীর পক্ষে পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্থন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। আমেরিকান দ্রোহি কবি অ্যালেন গিনসবার্গ পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা দেখে লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। আমরা কী মনে রাখবো না প-িত রবিশংকর কিংবা ব্রিটিশ শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে! তারা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। বেতার শিল্পী দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় উদাত্ত কণ্ঠে ৯ মাস বাঙালিকে উজ্জীবিত রেখেছেন। সব্যসাচী লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় কলকাতায় বাংলাদেশের সমর্থনে আয়োজিত লেখক-শিল্পী সমাবেশে যোগদান শেষে লিখেছিলেন কালজয়ী পঙ্ক্তিÑ ‘যতোকাল রবে  পদ্মা, মেঘনা, গৌরী, যমুনা বহমান/ততোকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ ভারতের সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ বাংলাদেশের সমর্থনে সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। আমরা কী ভুলে যাবো ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস কিংবা সাইমন ড্রিংকে। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর ব্রিটিশ পত্রিকায় ছেপে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিলেন।

ওস্তাদ আলী আকবর খান বাংলাদেশের সমর্থনে সেতার বাজিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন মার্কিন দর্শক-শ্রোতাকে। আমরা কী ভুলে যাব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথা! তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বহু দেশ ঘুরেছেন।
তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোভিয়েত নেতা লিওনেদ ব্রেজনেভ আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের হুমকি মোকাবেলা করেছিলেন অষ্টম নৌবহর পাঠিয়ে, নিরাপত্তা পরিষদে তিনবার ভিটো প্রয়োগ করে চায়নিজ-মার্কিন দূরভিসন্ধি নস্যাৎ করেছিলেন। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে লিখেছিলেন মর্মস্পর্শী কবিতা। ওই কবিতা খুনির প্রতি ঘৃণা জানায় এবং স্পন্দন জাগায় অত্যাচারিতের রক্তে। আমরা কী ভুলে যাবো পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মেঘালয়সহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর লাখো-কোটি মানুষকে! তারা বাংলাদেশের আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং নিজেদের বসতবাটি, স্কুল, অফিস, কমিউনিটি সেন্টার ছেড়ে দিয়েছেন। যুদ্ধের ঝুঁকি আপন কাঁধে তুলে নিয়েছেন তারা।  আমরা কি ভুলে যাবো ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেসব কর্মকর্তা ও জওয়ানকে যারা বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন? বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোথাও কোথাও তাদের কবর ও শ্মশান এখনো স্মারকচিহ্ন হয়ে আছে। আমরা কেন ওই শহীদদের নামে একটি শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধ গড়তে পারলাম না?
আমরা কী ভুলে যাবো ভারতের বন্দরনগর মুম্বাইয়ের জুতা পলিশওয়ালাদের! তারা বাংলাদেশ সহায়তা তহবিলে নিজেদের অর্জিত আয়ের একাংশ দান করেছিলেন। কলকাতা বা আগরতলার সাধারণ মানুষ জয় বাংলার মানুষ বলে বাসের আসনটি ছেড়ে দিতেন। আমরা কি ভুলে যাবো সেসব মা-বোনের কথা যারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে রওশন আরা ব্রিগেড গঠন করেছিলেন? আমেরিকার বন্দর শ্রমিকরা পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র ওঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি নাগরিক আহমদ সেলিম পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে কবিতা লিখে জেল খেটেছিলেন। ব্রিটিশ তরুণী মারিয়েটা বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়তে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি সংগঠন অ্যাকশন বাংলাদেশ এবং তার বাড়িটি ছেড়ে দিয়েছিলেন ওই সংগঠনের অফিস হিসেবে।




আমরা কী ভুলে যাবো বিশ্বের লাখো-কোটি সাধারণ মানুষের কথা! তারা কায়মনোবাক্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছেন এবং ধিক্কার জানিয়েছেন পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতাকে। বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি এ দেশের যে কোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। আবদুল লতিফ খতিব মহারাষ্ট্রে জš§গ্রহণ করেও বাংলাদেশকে মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে এক সাহসী কলমযোদ্ধা। মার্কিন প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোয় ঘুরে ‘জয় বাংলা’ ছবি তৈরি করেছিলেন। পরে ওই ছবি অবলম্বনে তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদ নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’। মার্কিন লেখক রবার্ট পেইন বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামকে অবলম্বন করে একাধিক বই লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের নেতা জ্যোতি বসু বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘একটি জাতিকে মিলিটারি দিয়ে পিষে মারা যায়। কিন্তু তাদের উত্থান ঠেকানো যায় না।’ ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচিন চন্দ্র সিংহ ষাটের দশকেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সুহƒদ ও সহযোদ্ধা।
আমরা কী স্মরণ করবো না নাম না জানা অসংখ্য সুহƒদকে! তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা কি মনে রাখবো না ওই দুঃসময়ের বন্ধুদের? যদি আমরা মনে না রাখি তাহলে সেটি হবে চরম অকৃতজ্ঞতা।
আজ নতুন প্রজš§কে জানাতে হবে ১৯৭১ সালের মরণজয়ী যুদ্ধে কারা আমাদের পক্ষে ছিলেন, কারা বিপক্ষে ছিলেন। জানাতে হবে বাঙালি হয়েও কারা বাঙালিদের মুক্তি-সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল, কারা সেদিন পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধ একটি দিন, ঘোষণা বা সামরিক ফরমানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে থাকে পুরো জাতির অস্তিত্ব এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরে।

জীবিকার আশ্চর্য গণিত

মৃণাল বসুচৌধুরী

 


‘র্নিবাসন’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শান্তির বিধান। আমার ক্ষেত্রে হয়তো তেমন ছিল না। ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’ নিয়ে নিজেই নিজেকে দ- দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল খুব। বিষাদ বা অভিমান নয়, উদাসীন এক ভালোবাসার হাত ধরে আমি হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম এই চেনা পৃথিবী থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করিনি তা নয়। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছিল, আলোর পেছনে ছায়া কিংবা প্রতিছায়া, জলের ভেতরে মাটি ও শ্যাওলার কাজ থেকে শুরু করে পুরো জীবন ধরে যে বঞ্চনার ইতিহাস বা ধারাবাহিক অবহেলা মলিন করে তুলেছে চরাচর তা নিয়ে প্রশ্ন করে লাভ নেই। খুঁজে লাভ নেই সোনালি অতীত কিংবা অমরাবতী, অলৌকিক সৎ উচ্চারণ, স্পষ্ট অঙ্গীকার, পারস্পরিক বিশ্বাসের সুখ। জীবন যেভাবে আসে সেভাবেই তাকে বরণ করে নেওয়ার মধ্যেই বেঁচে থাকার স্বকীয় আনন্দ।
জন্মমুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত যা শিখেছি তা শিখিয়েছে জীবনই। শিখিয়েছে বেঁচে থাকার আমল কৌশল। আনন্দ-উল্লাস, সাফল্য ও সুখের পাশাপাশি দুঃখ, বিষাদ, হতাশা কিংবা ব্যর্থতার সহাবস্থানের নির্মম সত্য। তা সত্ত্বেও কখনো কখনো ওই চেনা জীবনই যেন অচেনা হয়ে সামনে দাঁড়ায়।
১৯৮৭ সালে ধারাবাহিক অবহেলা প্রকাশিত হওয়ার পর খুব দ্রুততার মধ্যেই আমায় চলে যেতে হয় বিদেশে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দরজায়। এমনিতেই ‘শব্দভ্রমের সন্ধান’-এর নিঃসঙ্গ একাকী পথচলা আমাকে ক্লান্ত করেছিল তখন। এর উপর দেশ ছাড়ার দুঃখ আমাকে উপহার দিয়েছিল ভুবনজোড়া অভিমান। কবিতাকে র্নিবাসন দিলাম আমার জগৎ থেকে সজ্ঞানে।
শৈশব আমার নতমুখ জীবন যাপনে অভ্যস্ত করেছিল অস্পষ্ট ব্যবধান ও স্পষ্ট আড়াল নিয়ে বুকের মধ্যে উন্মাদ আগুন পুষে রেখে মানুষের উপেক্ষা-অবহেলা সব পেরিয়ে। আলোর ভেতরে পৌঁছানোর সব রাস্তা দেখিয়েছিল। মিডিয়া বা খ্যাতি নয়, এ এক রহস্যময় পবিত্র নীলিমার

আলো। তা বিষাদ অম্লান, মায়াময়ী এক নিশিকন্যার চোখের মতো অধরা ও লোভহীন। ওই শৈশবই আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে পরশ্রীকাতর সাপের ছোবল এড়িয়ে ছায়াহীন পরাবাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে হয় সঙ্গীহীন একা।
নিঃসঙ্গ নিজেকে মুখোমুখি বসিয়ে কথা বলা আমার পুরনো অভ্যাস। নিজের সঙ্গেই হেঁটেছি সারা জীবন। অনভ্যস্ত সুখের অসুখে, পরিশ্রমা অক্ষর বুননে এতো দিন কেটেছে সময়। এখন মুক্ত। এবার বিশ্রাম। স্মৃতির শিকড় ছিঁড়ে অক্ষরবিহীন মুগ্ধ বেঁচে থাকা। অথৈ জলের চাঁদ ও মোমের পুতুল নিয়ে মায়াবী ভ্রমণ।
পূর্ণেন্দুদা বলতেন, ‘বিছানা-বালিশে মানুষ একা। আর একা হলেই নিজের কাছে নতজানু মানুষ।’ কিন্তু আমি একা থাকলেই বিছানা, বৃষ্টি ও কুয়াশা ঠেলে ফেলে আমার দিনগুলো সামনে দাঁড়ায়। ফিরে আসতো প্রিয় মানুষের মিছিল।
দেওঘরে পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে তুমুল আড্ডায় কেটেছিল কয়েকটি রাত। ‘খরা’ ছবির শুটিং উপলক্ষে সেখানে যাওয়া। ওম পুরি কুলভূষণ, খারাবান্দা, অরবিন্দ খোশী, ধৃতিমান চট্টোপধ্যায়, ভাস্কর চৌধুরী, শ্রীলা মজুমদার, স্নিগ্ধা বন্দ্যেপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন ওই ছবিতে। প্রেম ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় ছিলাম আমি। মনে আছে, যেখানে থাকতাম আমরা সেখানে ঢোকার মুখে একটা গোলচত্বরে টেবিল সাজিয়ে আড্ডা হতো আমাদের। সারা দিন শুটিং করার পর প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত অড্ডা চলতো কোনো কোনোদিন। কতো রকম কথাই যে বলতেন পূর্ণেন্দুদা! কখনো বুনুয়েলের প্রথম ছবি ‘আন চেন আন্দালু’ যেখানে খোলা চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধারালো ক্ষরের ফলা, কখনো বাগম্যানের ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ, কখনো কখনো সত্যজিৎ, ঋত্বিক আবার কখনো বা নিজের ছবি ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, ‘স্ত্রী পত্র’। একেকদিন শুধু গান ও কবিতা। এর মধ্যে কখনো কখনো একদম চুপ করে বসে থাকতেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, কী কী করতে চাই, করা বাকি এর একটি তালিকা তৈরি করছিলাম মনে মনে।
মনে আছে, একদিন অন্যরা ঘুমাতে গেলেও পূর্ণেন্দুদা বসে থাকলেন। আমাকেও বসিয়ে রাখলেন। কবিতা শোনালেন। এভাবে সারা রাত কবিতা শুনিয়েছিলেন সেদিন। শুরু করেছিলেন ‘কথোপকথন’-এর একটি কবিতা দিয়ে। বলেছিলেন, নন্দিনীকে পাওয়ার জন্য সারা জীবন শুভঙ্কর হয়ে থেকে গেলাম। নন্দিনীকে তো পেলামই না, পূর্ণেন্দু হয়ে ওঠা হলো না আমার। যাই হোক, শোন।
নন্দিনী আমার কী দোষ? ডেকেছি বহুবার
কিন্তু তোমার এমন টেলিফোন
ঘাটের মড়া নেই কো কোন সার।
শুভঙ্কর বাতাস ছিল, বাতাসে ছিল পাখি
আকাশ ছিল, আকাশে ছিল চাঁদ
তাদের বললে খবর দিত নাকি?
কবিতাটি শেষ করে আমার দিকে একবার তাকিয়ে হেসেছিলেন একটু। তারপর অদ্ভুদ ঘোরের মধ্যে পড়েছিলেন একের পর এক কবিতা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে দেখেছিলাম সজু অথচ বিষন্ন উচ্চারণে কীভাবে শুভঙ্কর ও নন্দিনীকে মূর্ত করে তুললেন তিনি।

কাব্যনাটকে অভিনয় করার সময় থেকেই মনে মনে ভাবতাম একদিন, কোনো একদিন আমাকেও লিখতে হবে কাব্যনাটক। পূর্ণেন্দুদার শুভঙ্কর ও নন্দিনী প্রতিদিন যেন মনে করিয়ে দিতো আমার ওই ঘুমন্ত ইচ্ছাটাকে। পারিনি। অনেক চেষ্টা করে ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’ নামে একটি সংলাপ কাব্য লিখেছিলাম। পছন্দ হয়নি নিজের। কিন্তু কেন জানি না বিশিষ্ট আবৃত্তিকার পার্থ ঘোষ ও গোরী ঘোষ খুব ভালোবেসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়তেন ওই লেখাটি। পরে তাদের একটি সিডিতেও এই পাঠ রেখেছিলেন। স্তর চাইান। সিডির নামই দিয়েছিলেন ‘স্বর্গ থেকে নীলপাখি’।
ছিন্নভিন্ন শিকড় বেয়েও কখনো কখনো উঠে আসে স্মৃতিমাখা হলুদ পোকাগুলো। একটার অনুষঙ্গে আরেকটি এসে দাঁড়ায়। পার্থদা গৌরীদির কথায় প্রদীপদা, প্রদীপ ঘোষের কথা আসে। আমি গত জন্মে হয়তো কিছু পুন্য করেছিলাম। তাই এ জন্মে এই তিন দিকপালের কণ্ঠে পরিবেশিত হয়েছে আমার কবিতা। এই তিনজন ও রমা সিমলাইয়ের মিলিত পরিবেশনায় ‘কুয়াশার রোদে’ নামে একটি সিডি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সেসব অনেক পরের কথা। এই লেখায় গৌরিদি এলেন পূর্ণেন্দুদার হাত ধরেই। ‘স্তহাচিত্র’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন একটি বিশেষ চরিত্রে। মনে আছে, দক্ষিণ কলকাতার একটি নার্সিংহোমে শুটিং হয়েছিল আমাদের। পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে কাজ মানেই ভয় ও আনন্দ। ভীষণ পারফেকসনিস্ট ছিলেন বলেই কোনো অভিনেতাকেই ছেড়ে দিতেন না তিনি। এর পাশাপাশি ঠিকঠাক কাজ শেষ করতে পাললে মেতে উঠতেন গানে। শুরু হতো অনাবিল আনন্দ সভা হাসি-ঠাট্টার।
অফিসের পেছন দিকে রাস্তার ওপারে যে ফ্ল্যাটে থাকতাম এর নম্বর ছিল ৪০২। আশ্চর্যজনকভাবে এরপর যেখানেই বদলি হয়েছি সর্বত্রই ৪০২ নম্বর ফ্ল্যাটই বরাদ্দ করা হয়েছে আমাকে। এমনকি মুম্বাইয়ে ১৩ তলার ওপর আমার ফ্ল্যাটটি ছিল ১৩০২। এটিকে প্রকারান্তে ৪০২-ই বলা যায়। কাকতালীয় হয়তো। কিন্তু প্রতিবারই বেশ অবাক হয়ে যেতাম। মনে আছে, প্রথম দিন ফ্ল্যাটে এসে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল খুব। সুন্দর আসবাবপত্রে ভরা বিশাল ফ্ল্যাটে একা থাকতে হবে ভাবতেই বিষণœ হয়ে যাচ্ছিলাম। বছরে দু’বার স্কুল ছুটির সময় তপতা ও অরুন্ধতা যেতো সেখানে। আর আমি সত্যি সত্যিই দিন গুনতাম।

অফিসে আমার সেক্রেটারি ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় নারী। দুবাই বিমানবন্দরে চাকরি নিয়ে তার স্বামী এসেছিলেন কেরেলা থেকে। ওই সূত্রে তার এ দেশে আসা। ম্যাডাম আনাম্মাই আমাকে প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। চিনিয়ে দিয়েছিলেন ভিডিও লাইব্রেরি, কেনটিকির দোকান, কিছু রেস্তোরাঁ এবং ওষুধেরে দোকান। আর এক সহযোগী অরজিত গারদে আমাকে সঙ্গ দিতেন অফিসের পর। শারজাহে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যাবেলা কিছুই করার থাকতো না। তাই অরজিতের সঙ্গে গিয়ে দু’একদিনের মধ্যেই কিনে এনেছিলাম টিভি, ভিসিআর ও ক্যাসেট প্লেয়ার। বাড়িতে রান্না তখনো শুরু করেনি। কেননা যত অল্প টাকারই খাবার হোক, ফোন করলে বাড়িতে দিয়ে যেতো প্রায় সব রেস্তোরাঁ। টিভি আনার পর নিঃশব্দ-নির্জন ফ্ল্যাটে যেন প্রাণ এসেছিল।
কলকাতা থেকে আসার সময় রবীন্দ্রসঙ্গীতের কয়েকটি ক্যাসেট নিয়ে গিয়েছিলাম। ঘর অন্ধকার করে মাঝে-মধ্যেই শুনতাম আমার প্রিয় গানগুলো। কোনো কোনোদিন একই গান শুনতাম বারবার।


‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়
কনটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রায় করে হায় হায়’


দুপুর ও রাতে সময় পেলেই শুনতাম এ গানটি। কেন জানি শিল্প-সংস্কৃতি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবকিছু ছেড়ে এতো দূরে একা পড়ে থাকতে ভালো লাগতো না একেভারেই। চাকরিতে উন্নতির থেকে আমার কাছে বেশি মূল্য ছিল কবিতার শব্দ-সাধনায়। এর পাশাপাশি কিছু না পেতে পেতে অর্জনরে আনন্দটাও হারাতে চাইতাম না। বিদেশে চাকরি করার সুযোগ ক’জনই বা পান।
‘ইমোশনাল স্ট্রেস’ কোনোদিনই সহ্য করতে পারি না। অথচ আমার দিনযাপনের অধিকাংশ দিনই বঞ্চনার ইতিহাস। কোনো নিঃস্ব-রিক্ত মানুষের ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার কাহিনী। ডিপ্রেশনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস অনেক পুরনো। শারজাহে গিয়ে ঠিক করেছিলাম, যেহেতু একা থাকি সেহেতু অধিকাংশ সময় এ অভ্যাসটা ছাড়তে হবেই। কলকাতা ছাড়ার আগে আরব দেশের অনেক গল্প শুনেছিলাম। এখানে নাকি রাতে হাঁটা যায় না, মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, রাস্তাঘাটে মাতাল ভর্তি, অপরাধ করলে কঠিন সব শাস্তি এমন ভয় দেখানো কথাবার্তা শুনে বলা বাহুল্য, একটু ভয়ে ভয়ে থাকতাম

 

প্রথম কিছুদিন। এরপর অবাক হয়ে দেখলাম, নারীরা এখানে খুব নিরাপদ। মাঝরাতে কোনো নারী ঘোরাফেরা করলেও তার বিপদ নেই। কেননা যে কোনো নারী অভিযোগ করলেই পুলিশ অভিযুক্তকে ধরে নিয়ে আসে থানায়। মনে পড়ছে, মাঝে-মধ্যে গভীর রাতে টেলিফোন আসতো বেশির ভাগ সময়ই কোনো না কোনো নারী। বুঝতে পারতাম, র‌্যান্ডম ডায়ালিং করে যাকে পায় তার সঙ্গে কথা বলা তাদের অভ্যাস। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দু’একটা কথা বলার পরই রেখে দিতো। পাছে কোনো সমস্যা তৈরি হয় এ ভয়ে কখনোই এসব ফোন এলে কথা বলতাম না। এই নীরবতার জন্য তাদের মুখ থেকে কটূক্তি শুনতে হয়েছে মাঝে-মধ্যে।
একদিনের কথা খুব মনে আছে। দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম একটু। ওই সময়ই বেজে উঠেছিল টেলিফোন। রিসিভারটা তুলতেই ছোট একটি ছেলের গলা ভেসে এসেছিল। বলেছিল, ‘, তোমার সময় আছে? একটু কথা বলবে আমার সঙ্গে? বাড়িতে কেউ নেই। কাজের মালিও বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে কোথায় যেন গেছে। ভয় করছে খুব..., একটু কথা বলেন না আংকল...। না বলে পারিনি। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে জানতে পেরেছিলাম, তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আবার বিয়ে করেছেন। নতুন মা তাকে মারধর করে। কিন্তু বাবাকে সে কিছুই বলে না। কেননা তার বাবা খুব ভালোবাসেন তাকে। নামে ওই নিঃসঙ্গ শিশু অরুণের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। ফোনের বন্ধু। মাঝে-মধ্যই ফোন আসতো তার। সঙ্গীহীন ওই শিশুটির আর্তি আমাকে মনে করিয়ে দিতো আমার শৈশব। একাকিত্ব কখন যে কাকে, কীভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয় তা কে জানে।
রাস্তাঘাটে মাতালরা ঝামেলা করে শুনেছিলাম। শোনা কথায় না জেনে কতো কী যে বলে মানুষ! লাইসেন্স না থাকলে মদ্যপান নিষিদ্ধ ছিল শারজাহে, এমনকি বাড়িতে বসে মদ্যপান করার জন্য লাইসেন্স লাগতো। ওই ছাড়পত্র ছাড়া ওয়াইন স্টোর থেকে কিছু কেনাই যায় না। ওই দোকান ছিল শহরের বাইরে। দোকান থেকে কিনে সোজা বাড়িতে যেতে হতো ক্রেপারে। দুবাইয়ে অবশ্য শিথিল হয়েছে নিয়ম-কানুন। ড্রিংকস করে গাড়ি চালালে পুলিশ ধরতো। তারা চালিয়ে গাড়িটা নিয়ে যেতো থানায়। বসিয়ে রাখতো সারা রাত। সকালে নেশা ছুটলে ছেড়ে দিতো।
স্বর্ণের বাজার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই দেখতাম দোকান খোলা। কিন্তু ভেতরে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ নেই। নামাজের সময় সবাই নামাজ পড়তে গেছেন। চুরির ভয় নেই এমন একটি প্রশ্নের উত্তরে সহকর্মী বলেছিলেন, না, চোর ধরা পড়লে হাত কাটা যায়। অবাক হয়ে হেসেছিলাম। একজন বলেছিলেন, “একজন দু’বারের বেশি চুরি করতে পারবে না।” সহকর্মী যোগ দিয়েছিলেন হাসিতে ‘হ্যাঁ, দুটোর বেশি আর হাত যে নেই।’
পশ্চিম ও উত্তর দু’দিকে দুটি বারান্দা ছিল আমার ফ্ল্যাটে। পশ্চিম বারান্দায় বের হওয়া যেতো না। পুরনো আসবাপত্র, ওয়াশিং মেশিং জড়ো করা ছিল সেখানে। তাছাড়া ওই বারান্দা ছিল গোটা পনেরো পায়রার দখলে। এখানে পায়রাগুলোর রাজত্ব, ঘর-সংসার। পুরনো আসবাবপত্র বা কোনো কিছুর পুনরায় বিক্রয় মূল্য নেই ওই দেশে। সরকারি জিনিসপত্র ফেলার বিভিন্ন অসুবিধার কথা ভেবেই বোধহয় আগে যারা থাকতেন তারা আর কোনো ঝামেলায় যাননি। সুন্দর পায়রাগুলোর জন্যই রেখে গেছেন ওইসব। উত্তরের বারান্দাটি আমার খুব প্রিয় ছিল। মাঝরাতে যখন ঘুম আসতো না তখন প্রায়ই গিয়ে দাঁড়াতাম সেখানে। কখনো কখনো একটি চেয়ার টেনে বসে থাকতাম সারা রাত। শেষরাতে দু’এক ঘণ্টা কেমন জানি মায়াবী হয়ে যেতো রাস্তাঘাট। সুন্দর, উজ্জ্বল, স্বপ্নময় মনে হতো। এটিই বোধহয় স্বপ্ন নগরীর মাঠে থাকা রাস্তা। যেখানে ছড়িয়ে আছে সুখ সেখানে ছোটাছুটি করে নিষ্পাপ শিশুরা, রামধনু রঙ মেখে বেড়াতে আসে পরীদের রানী। শুধু পূর্ণিমায় নয়, সেখানে প্রতিটি রাতে জ্যোৎস্না খোলা করে। ওই জ্যোৎস্নার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সাদার্ন মার্কেটের সামনের ট্রামলাইনে। সেখানে মধ্যনিশিথে শেষ স্ট্রাম চলে গেলে আড্ডা মারতাম আমি ও সুপ্রিয়দা।
আমি তখন কবির রোডে থাকি। পাশের বাড়িতেই থাকতো রতেœশ্বর। কবি রতেœশ্বর হাজরা। তারই সহায়তায় আমার আস্তানা খুঁজে পাওয়া। আমার সৌভাগ্য, রতেœশ্বরের অনেক কবিতারই প্রথম পাঠক ছিলাম আমি সে সময়। সুপ্রিয়দা খুব মুক্তমনের মানুষ। আমার মধ্যে যে গ্রাম্য মানসিতকা ছিল তা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছিলাম সুপ্রিয়দার মতো মানুষের সন্নিধ্যে এসে।
কখনো কখনো একটু অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ধন্যবাদ জানাতাম অদৃশ্য ঈশ্বরকে। পিতৃহীন হওয়ার পর যেভাবে আমার জীবন কেটেছিল এতে কখনো ভাবিনি নিজের ক্ষমতায় বিদেশে এসে চাকরি করবো। মনে আছে, এই চাকরিতে যখন জয়েন করি তখন মাইনে ছিল ২২০ টাকা। ব্রাবোর্ন রোডে ছিল আমার প্রথম অফিস। আমার বস ছিলেন মোহিত সেন। আমাকে কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, স্পষ্ট মনে আছে ‘ইয়াংম্যান, জীবনে কোনো সমস্যা হলে আমার কাছে এসো, সাফল্যের দিনে নয়। সেগুলো সব তোমার।’ ওই অসাধারন একটি বাক্যের জন্য আজীবন নতজানু হয়ে থেকেছি তার কাছে।
পূর্ণেন্দুদার কথোপকথন ছাড়া আমার দুটি কবিতার বই ‘এই নাও মেঘ’ ও ‘ধারাবাহিক অবহেলা’ নিয়ে গিয়েছিলাম প্রথমবার। খুব মন খারাপ হয়ে গেলেও তখন কোনো কবিতার বই ছুঁয়ে দেখতাম না। কিন্তু মন কী সব সময় এসব বাধা-নিষেধ মানে! তাই দীর্ঘ একটি সোফায় শুয়ে কখনো কখনো চলে যেতাম কফি হাউসে, কলিকাতায়। আমার বস মোহিত সেনের ওই অসাধারণ কথাটির মতো আরেকজনের একটি উপদেশ এই বৃদ্ধ বয়সেও মাথায় রেখেছি। একদিন কথা প্রসঙ্গে প্রনম্য সাহিত্যিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘যারা তোমার প্রশংসা করবে তাদের নয়, যারা সমালোচনার সাহস দেখাবে তাদের শ্রদ্ধা করো। অবশ্যই ওই সমালোচনা যদি নিরপেক্ষ হয়...।’ ভাবতে ভালো লাগে ওই সময় আমাদের যৌবনে আমরা শিক্ষকপ্রতিম কতো মানুষকে কাছে পেয়েছিলাম।
কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের গানে। যখনই একা থাকতাম তখনই শুনতাম তার গান। একই ক্যাসেট বারবার। কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথ তার গানের ডালি নিয়ে কবে এলেন আমার কাছে? ঠিক কোথায় পেলাম তাকে? কবেই বা তিনি হয়ে উঠলেন আমার রবীন্দ্রনাথ? ... ভাবতে ভাবতে চলে যেতাম শৈশবে যখন মায়ের গলায় ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ শুনেছিলাম।
প্রথম যেদিন স্কুলে যাই সেদিন প্রার্থনা গানের জন্য সারি সারি লাইনে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের পেছনে দাঁড়াতে হয়েছিল। গানটি ছিল ‘সংকোচের বৃক্ষলতা নিজের অপমান/সংকটেরও কল্পনায় হয়ো না ম্রিয়মাণ/... মুক্ত করো ভয়...।’ সুরটি ঠিকমতো জানতাম না। মনে আছে, রতে মায়ের কাছে শিখে পরদিন গলা মিলিয়েছিলাম। মায়ের কাছেই শুনেছিলাম গানটি রবীন্দ্রনাথের। কিছুদিন পর স্কুলের একটি অনুষ্ঠানের জন্য শিখেছিলাম, ‘বরবায় বয় বেগে।’ খুব মুগ্ধ হয়ে গাওয়ার চেষ্টা করতাম

‘শৃঙ্খলে বারবার ঝন ঝন ঝঙ্কার নয়, এ তো তরুণীর ক্রন্দন শঙ্কার
বন্ধন দু’বার সহ্য না হয় আর টলেমেনও করে আজ তাই ও
হাই করে মারো মারো জিন হাঁইয়ো।’


ওই গানটি সম্পর্কে আমার মুগ্ধতার কথা জেনে আমাদের ক্লাসের দীপিকা বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ, তাসের দেশ।’ এরপর ময়ল স্যার। তিনি আমাদের ভূগোল পড়াতেন। তিনি শিখিয়েছিলেন দু’একটি অসম্ভব রবীন্দ্রসঙ্গীত। মাঝে-মধ্যে পাশের বাড়ির রিতুদিকে গাইতে শুনতাম, ‘যা তা আগলে বসে রইক কত আর?’ কোনো কোনোদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন, ‘চোখের আলোয় চেয়েছিলাম, চোখের বাহিরে/অঙ্করে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে...।’
এভাবেই হয়তো ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এসেছিল আমার দিকে অথবা আমি তার দিকে। তখন বোধহয় ক্লাস টেনে পড়ি। রবীন্দ্রজয়ন্তী হচ্ছে স্কুলে। বিশেষ একটা বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই কানে এলো, ‘কাল রাতের বেলা গান এলো মোর মনে/তখন তুমি ছিলে না মোর সনে...।’ ক্লাস নাইনের আত্রেয়ী গাইছিলাম। এতো দিন চেনা বন্ধু আত্রেয়ীকে অন্য গ্রহের বাসিন্দা মনে হয়েছিল। গান শেষে এগিয়ে গিয়ে কিছু না বলে একটু হেসেছিলাম। সেদিন চোখ দুটো নিশ্চয়ই জানিয়েছিল আমার দিব্য মুগ্ধতা।
এসবের মধ্যেই হঠাৎ করে যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল স্কুল জীবন। এরপর কলেজ, কলকাতা টিউশনি, মেসবাড়ির আবর্তে, যান্ত্রিক টানাপড়েনে কাটছিল দিন। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ বেজে উঠতেন বুকের মধ্যে ‘তোমার যে বলা দিবস রজনী, ভালোবাসা, সখী ভালোবাসা কারে কয়! সে কী কেবলই যাওনাময়।’ আরেকদিন ঘোর বর্ষায় মোর বাড়ির পাশের একটা জানালা থেকে ভেসে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘উতলধারা বাদল ঝরে/সকালবেলা একা ঘরে।’ এ রকমই টুকরো টুকরো গানের বলি নিয়ে কাটছিল আমার মন খারাপ করা দিনগুলো।

ওই সময়ই সদ্য আলাপ হওয়া বিকাশ লাবণ্য, কেটি মিত্তিরের বেশ কাটতে না কাটতেই হাতে পই ‘গোরা’। এরপর ‘চতুরঙ্গ’ চার অধ্যায়। এভাবেই আমার রবীন্দ্রনাথ শুরু। মহামানবকে আপন করে নেয়ার সামান্য প্রয়াস।
এরপরই নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার জীবনে আসে তপতী। গীতবিজ্ঞানের সব গান তার কণ্ঠস্থ। তার হাত ধরেই নতুন করে আবিষ্কার করা রবীন্দ্রনাথকে। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত তার গানের মধ্যেই মূলত তাকে পাওয়া।শারজাহে অনেক নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, অজমান, উম্মল কোয়েন, রাস-আল- কোইমা ও ফুজিয়ারা এ সাতটি আমিরশাহীকে নিয়েই সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। আবুধাবির রাজা বা আমির ওই সংযুক্ত আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট। প্রথম মাসখানেক কাজের চাপ, ফ্ল্যাট পাওয়া, গোছানো এসব কেড়েছে কিছুদিন। নতুন কাজকর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার পর অন্য শাখার সহকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়লো। বৃহস্পতিবার আধবেলা অফিস করার পর কারো না কারোর বাড়িতে আসর বসতো আমাদের। আঞ্চলিক অধিকর্তার অফিস ছাড়াও দেশে আমাদের ৬টি শাখা ছিল। ভারত থেকে যাওয়া অফিসারের সংখ্যা ছিল ১৬। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেলা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আসর বসতো আমাদের। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ সব ব্রাঞ্চের বন্ধুরা মিলে খুব আনন্দ করে কাটাতাম ওই দিনগুলো।
দুবাই শহরের মাঝখান দিয়ে একটা খাঁড়ি আছে। এই ‘আব্রা’র দু’পাশে শহর। একাধিক দুবাই। অপর পাড়ে ডেরা। মোটরবোটেই পার হয় মানুষ। গাড়ি যাওয়ার রাস্তা জলের মধ্যে দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ আছে। প্রথম দিন যাওয়ার সময় এক বন্ধু জানিয়েছিল, ‘জানো তো, এই টানেলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জল...।’ বিশ্বাস হয়নি প্রথমে। ওই অসম্ভবকে সম্ভব করা হলো কীভাবে তা বুঝতেও সময় লেগেছিল কয়েকদিন।
ছুটির দিনগুলোর নিঃসঙ্গতা এড়াতে বেরিয়ে পড়তাম শারজাহে সমুদ্র কিনারে, কখনো বা দুবাইয়ের জুমেইরা বিচে। তখন জাবেলালি শিল্প কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল আস্তে আস্তে। আবুধাবির দূরত্ব ছিল ২০০ কিলোমিটারের মতো। সারা দিন ঘোরাঘুরি করে ফিরে আসতাম রাতে। সেখানকার অ্যামিসমেন্ট পার্কটি ছিল খুব সুন্দর। তখন ওই দেশে কোনো ট্রেন ছিল না। এ জন্যই বোধহয় টয়ট্রেনে ভিড় হতো খুব। বন্ধুরা সবাই রোলার কোস্টার ও উঁচু নাগরদোলায় মজা করতাম খুব।
আরো একটি জায়গা ছিল আমার প্রিয় খরফোকান। ফুজিয়ারা আমিরশাহীর একটা শহর। গলফ অফ ওমানের তীরে ওই শহরে যাওয়ার পথে ছোট ছোট পাহাড় ছিল কয়েকটা। হিমালয়ের দেশের মানুষ আমি। তবু ওই পাহাড়গুলো আমাকে চিনতো ভীষণ। মানুষ যখন একা সঙ্গীহীন হয়ে যায় তখন বোধহয় সবকিছুই ভালো লাগে তার। আমার অন্তত তা-ই হতো। তবে শুনেছি, নিঃসঙ্গতার বোমা বইতে বইতে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন আর কিছুই ভালো লাগে না তাদের। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির মধ্যে বেড়াতে বেড়াতে খুব ইচ্ছা হতো হারিয়ে যাওয়ার। আদি-অন্ত ছাড়িয়ে থাকা বালির মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকার মতো আনন্দ আর কিছু নেই বলেই মনে হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হয়ে ওঠেনি।

আবদুল মান্নান সৈয়দের
স্মৃতির নোটবুক ও অন্যান্য

মনজু রহমান

 


আবদুল মান্নান সৈয়দকে নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়েছে বলা যাবে না। তার সাহিত্যকর্মের দিক নিয়ে অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে টুকটাক লিখেছেন। কিন্তু পুরো মান্নান সৈয়দকে কোনো আলোচকই টেনে আনার চেষ্টা করেননি। কারণ মান্নান সৈয়দ প্রচারমুখী লেখক ছিলেন না। অথচ তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো মাধ্যম নেইÑ যেখানে সহজ ও সাবলীল কৃতিত্ব রেখে যাননি। এই বহুমাত্রিক লেখককে এক সময় বলা হতো সব্যসাচী লেখক। ষাটের লেখকদের মধ্যে তাকে বলা হতো সবচেয়ে উচ্চারণ সমৃদ্ধ লেখক, লেখকদের আইডল। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, গবেষণা, নাটক, কবিতা, সম্পাদনাÑ সাহিত্যের সব মাধ্যমে অনায়াসে বিচরণ করেছেন। যখন গল্প লিখেছেন তখন তিনি পুরোপুরি গল্পকার, উপন্যাস লিখেছেন উপন্যাসিকের চরিত্র নিয়েই, নিবিষ্ট গবেষক হিসেবে লিখেছেন বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ, নাটকের ক্ষেত্রে তার স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রেখেই নাটকে হাত দিয়েছেন, কবিতার ক্ষেত্রেও কাব্যিক ব্যঞ্জনা সানন্দে ব্যবহার করে হয়ে উঠেছেন সব্যসাচী কবি। কবিতায় তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম করেননি। উত্তর-আধুনিকতা এবং পরাবাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কবিতার নতুন দর্শন। তিনি লিখেছেন অনেক, অনুবাদেও সিদ্ধ ছিলেন। করেছেন অজস্র লিটলম্যাগ সম্পাদনা। লিটলম্যাগ তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল। তিনি বলতেন, কোনো দৈনিক বা দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় লেখা না দিয়ে আমি সে লেখাটি দিতাম কোনো লিটল ম্যাগাজিনে।


দুই.
আবদুল মান্নান সৈয়দ বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করলেও প্রথম যৌবনে নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সারা দিনের ঘটনাপঞ্জি টুকে রাখতেন নোটবুকে। তার জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই সাহিত্যের বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের একটি মাত্র গ্রন্থ ‘স্মৃতির নোটবুক’ পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিল্পতরুর কর্ণধার কবি আবিদ আজাদ। ওই নোটবুক তিনি শুরু করেছেন তার আঁতুড়ঘর থেকে। তার গ্রিন রোডের অনুঘণ্টক উঠে এসেছে ‘কুলিরোড’ শিরোনামে। তিনি বলেছেন, ‘বায়ান্ন বাজার আর তেপ্পান্ন গলির এই ঢাকা শহরের কুলিরোড খুঁজে পাবেন কেউ? পাবেন না। কারণ রাস্তার নামটাই আজ বদলে গেছে, হয়েছে গ্রিন রোড।’ এখানে চলত গরুর গাড়ি, চারপাশে কাঁচারাস্তা, সবুজে ঢাকা ধানক্ষেত, বিশাল বিশাল আম-কাঁঠালসহ বিভিন্ন গাছ, রাস্তাটি অবহেলায় নেমে গেছে দৃষ্টির বাইরে।
দশ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ একাদশ শ্রেণিতেই কলকাতার পঞ্চপা-বের মতো পাঁচ বন্ধুর সান্নিধ্যে চলে আসেন। শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। সিকান্দার দারা শিকোহ, মফিদুল আলম, আমিনুল ইসলাম বেদু, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। ওই পঞ্চপা-বের হাতেই ছিল ঢাকা কলেজের তথা ঢাকার লিটল ম্যাগাজিনের সর্বস্ব শরীর। পরে অবশ্য এই গোষ্ঠীর বাইরে অন্য জগতের প্রান্তরে তিনি হাঁটতে থাকেন। তিনি অনেক বন্ধুর নাম তার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছেনÑ যারা ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পুরধা ছিলেন।
মান্নান সৈয়দ প্রথম গল্প ‘আকাশটা কালো’ দিয়ে গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ঢাকা কলেজে ‘কলেজবার্ষিকী’তে। কলেজের বাইরে পাঠকের সামনে আসেন সাম্প্রতিক পত্রিকায় প্রবন্ধ, মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় বিদেশি গল্পের নাট্যরূপ, সমকাল পত্রিকায় গ্রন্থালোচনা, উপন্যাস ও কাব্যনাট্য, পূবালী পত্রিকায় নাটক, দৈনিক ইত্তেফাকে কবিতাÑ এসবই তার প্রথম প্রকাশ।
এবার মান্নান সৈয়দের মুখে শুনিÑ ‘তারপর তো দরজা খুলে যায়। যৌন পত্রিকা থেকে গবেষণা পত্রিকাÑ কোথায় না লিখেছি, এমনকি রেডিও-টিভিতেও। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ন কবির, আবুল হাসান, আখতারুজ্জামান ইালয়াস, হায়াৎ মামুদ, সেবাব্রত চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মামুন, মোমতাজ উদ্দীন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মোহাম্মাদ রফিকসহ কত প্রিয় বন্ধু তার জীবনে এসেছেন। যারা তার বন্ধু হিসেবে এসেছিলেন সবাই ষাটের লিটলম্যাগ আন্দোলনের মানুষ, নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের ভা-ারে। পঞ্চাশের কবিদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে লিটলম্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছেন।

তিন.
আবদুল মান্নান সৈয়দ শুধু লিখে গেছেন তা নয়, সমসায়িক অনেক অপরিচিতজনকে লেখক তৈরি করেছেন। তিনি সম্পাদনা করেছেন বহুমুখী সাহিত্যের কাগজ। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ছিলেন যে, তাও নয়। তিনি ঢাকার একমাত্র কবিÑ যিনি ঢাকার বাইরে ‘মফস্বল’ জেলাগুলোর লিটলম্যাগের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন ও লেখালেখি করতেন। ওই সুবাদে বিভিন্ন মফস্বল জেলায় তার অনেক কবি বন্ধু হয়ে যায়।
মান্নান সৈয়দ অন্যান্য জেলার মতো উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়ায়ও আসতেন। প্রয়াত কবি ও ‘বিপ্রতীক’ সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী, প্রয়াত কাজী রব, প্রয়াত মনোজ দাশগুপ্ত, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অর্কেস্ট্রা সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী, বজলুল করিম বাহারদের নিয়মিত খোঁজ রাখতেন তিনি। বগুড়ায় এলেই আড্ডা দিতেন ফারুক সিদ্দিকীর ডেরায়। তিনি বলতেন, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে উচ্চকিত কবিতার কাগজ বিপ্রতীক। অবশ্য বিপ্রতীকে ঢাকার প্রায় ষাটের কবিরা লিখতেন। কাজী রব সম্পর্কে তার মূল্যায়ণÑ ‘এদের মধ্যে কাজী রব ছিল সবচেয়ে কলকণ্ঠ, সবচেয়ে খোলামেলা। ওর কবিতা-গল্পেও ছিল জং না ধরা এক নতুনত্ব, এক অপরিমেয় আশা। বগুড়ার ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম পুরোধার বহুধা শিল্পমুখিতা সবার নজর কাড়ে।’

চার.
লিটল ম্যাগাজিন পাগল আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন মূলত লিটল ম্যাগাজিনেরই লেখক। তার সংগ্রহে লিটল ম্যাগাজিনের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কতটা লিটল ম্যাগপ্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকের সারা দেশ থেকে যে লিটল ম্যাগাজিন-পঞ্জি তিনি ‘স্মৃতির নোটবুক’-এ রেখে গেছেন, সেসবের বিস্তারিত তালিকা (কোন ম্যাগাজিন কত সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে এবং কোন সংখ্যার সম্পাদক কে ছিলেন) দেখলেই অনুমান করা যায়, লিটল ম্যাগাজিনে কতটা দরদ, উদার, নিবেদিত ও যতœবান ছিলেন। সম্পাদনা করেছেন ‘শিল্পতরু’ ও ‘চারিত্র’ কাগজ দুটি। সবচেয়ে বড় দিক হলো, ষাটের দশকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে যেসব লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে এর অধিকাংশের সঙ্গেই তিনি জড়িত ছিলেন কোনো না কোনোভাবে।
অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহঙ্কার ও তুখোর আড্ডাবাজ ওই সব্যসাচী লেখক সহজেই যে কোনো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হতে পারতেন। স্মৃতির নোটবুক খুব স্বাস্থ্যবান না হলেও তার সাহিত্য জীবনের যে তথ্য-উপাত্ত এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে দিয়ে গেছেন তা ষাটের দশকের লিটলম্যাগ আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারি এবং তা নির্র্দ্বিধায়।

বিদায়ের শেষ সুর

খায়রুন নাহার রুবী

 

 

প্রতিদিন ভোরে ছোট ছেলেটাকে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগাতে হয়। নতুবা উঠতে পারে না, আর না উঠতে পারলে সকালের পড়াটা নষ্ট হয়। আজও তেমন করে ফোন দিয়ে জাগিয়েছি বাবুকে। ও ফোন ধরে বললো, মা উঠেছি, এখনই পড়তে বসবো, তুমি ভেবো না। আমি আমার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। প্রতিদিনকার জীবনযুদ্ধ ঘর-বাইরের যুদ্ধ, চাকুরি ক্ষেত্রের যুদ্ধ এমনি নানা যুদ্ধ শরীর মনে বহন করতে হয়। আজ ছুটির দিন বলে যুদ্ধের ধরণ আলাদা তারপরও যেন যুদ্ধের শেষ নেই।
গত ক’দিন থেকে শরীর, মনে এত পরিশ্রম গেছে যা বলার নয়। প্রতি বছরই এই সময়টা আমাকে অনেক বেশি প্রেশারে থাকতে হয়। এই দু’চারদিন হলো সব কাজগুলো গুছিয়ে উঠেছি এখন একটু স্বস্তি। কিন্তু তারপরও যেন কাজের শেষ নেই! চাইলেও স্বস্তিতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। কী মনে করে ছুটির দিন বলে,কাজের ফাকে কøান্তিতে বিছানায় নয় শোফায় শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখলাম ছোটছেলের ফোন। ধরতেই ‘ও’ ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমি বুঝলাম না কেন ও অমন করে কাঁদছে?
বললাম , কী হয়েছে বাবা, কাঁদছো কেন?
ও বললো, মা! আমার বন্ধু সুদ্বীপ মারা গেছে।
আমি মুহূর্তেই হতবাক হলাম,অবাক বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছিল, কী করে মারা গেল?
ও বললো, আমি ঠিক জানি না মা! তবে যে আমাকে জানিয়েছে সে বলেছে সুইসাইড করেছে।
কষ্টে মনটা বিষিয়ে উঠলো। ভাবলাম কী এমন হয়েছে যে সুইসাইড করতে হবে? এই বয়সী ছেলেমেয়েদের সমস্যা একটাই- অতি আবেগ। অতি আবেগে ওরা কী করে , কী করতে চায় নিজেরাই জানে না। খুবই আহত হলাম এ সংবাদ শুনে। ভাবলাম, এখনই ওদের বাসায় যেতে হবে। সুদ্বীপের মার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। আমার খুব পছন্দের একটা মানুষ ওর মা। ওর মার মুখে লেগে থাকা মিষ্টি হাসিটা মুহূর্তেই ভেসে উঠলো আমার চোখে। আর বাচ্চা বাচ্চা মিষ্টি কণ্ঠস্বরটাও কানে ভেসে এলো। অস্থির হয়ে ছুটলাম ওদের বাসার দিকে।


যেতে যেতে মনটা এতই বিষণœ হলো যেন বৃষ্টি জলের মত স্যাঁত স্যাঁতে হয়ে উঠলো বুকের ভেতরটা! আমি জানি একটু পর এটা সমুদ্র জলের ধাক্কায় রূপ নেবে, নিতেই হবে। এ যে বড় কষ্টের অনুভূতি! হঠাৎ করেই বাতিঘর নিভে যাওয়া।
রিক্সা এসে থামলো ওদের বাসার সামনে। নিচতলায় তেমন লোকজন নেই, হয়ত এখনও সেভাবে জানাজানি হয়নি। শুধু দ’ুটি ছেলে একজন সুদ্বীপের আত্মীয় হবে অন্যজনকে আমি চিনি না, ওরা দু’জন হাউমাউ করে কাঁদছে। ওদের এই কান্না যে কত কষ্টের তা শুধু ওরাই বলতে পারে। কারণ যারা কাঁদে শুধু তারাই জানে কী এবং কতটা বেদনাভরা এই কান্না! অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়লে বৃষ্টির চোখ ফুলে লাল হয় কিনা আমার জানা নেই তবে এই ছেলে দু’টোর চোখ ফুলে রক্তের মত লাল হয়ে আছে।
আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠলাম। বেশ কয়েকজন পরিচিত মানুষ বিরস মুখে বসে আছে। সাথে আমার ছোট্টবেলার বন্ধু! তাদের কারো মুখে কোন কথা নেই। সবারই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা! লোকজন ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়লো, সুদ্বীপের লাশের পাশে ওর বাবা বসে আছে। দেখে চেনা যায় না, একেবারে পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে। সুদ্বীপ ওর পছন্দের, প্রিয় খাটেই শুয়ে আছে , শুধু সাদা একটা চাদর দিয়ে ওর সমস্ত শরীর ঢেকে দেয়া হয়েছে।
বাবার জন্য কত কষ্টের সন্তানের লাশ ধরে বসে থাকা। পৃথিবীতে এত কষ্ট বোধহয় আর কিছুতে নেই। মুখটা দেখবো বলে ওর খাটের পাশেই দাঁড়ালাম। কে একজন এসে চাদরটা সরিয়ে দিলে মুখটা দেখলাম।সহজ, সরল একটা মুখ, মনে হয়, যেন কোন পাপ আজও ওকে স্পর্শ করেনি।‘ও’ যেন স্বভাবতই ঘুমিয়ে আছে! গলায় হালকা একটা লালচে দাগ, আর সবই ঠিক আছে। তখনই মনে হলো,সুদ্বীপ নেই। পৃথিবীর সবটুকু মায়া ছেড়ে ও চলে গেছে, আর আসবে না। কেন যেন মনে হলো, ও কি সত্যিই চলে যেতে চেয়েছে? নাকি সবার ওপর অভিমান করে শুধু নিজের কষ্টটাকে দেখাতে চেয়েছে, মরার জন্য একাজ করেনি। পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে, সুদ্বীপ নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে।
পৃথিবীর সব মানুষেরইতো কিছু না কিছু কষ্ট থাকে, সে কষ্ট এক সময় হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়ে লেগে থাকে আকাশের বুকে! তার জন্য মরতে হবে কেন? মৃত্যুর মধ্যে কী আছে? কেন আমাদের সন্তানরা এই পথটি বেছে নেয়? কেন আমরা তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি না? কেন ব্যর্থতার শতভাগ বোঝা নিয়ে আমাদের পড়ে থাকতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আর কেউ দিতে পারবে না। যেটুকু বুঝি তা হচ্ছে, সময়টা এখন খুব খারাপ! এক এক সময় মনে হয়, অন্ধকার যুগে, বর্বর যুগে, কৃষ্ণযুগে বাস করছি। কোথাও কোন নিয়ম শৃঙ্খলার বালাই নেই। ব্যক্তি, দেশ, রাষ্ট্্র, সমাজ কোথাও যেন কোন বন্ধন নেই। যে যার মত করে চলছে। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টাও এখন আর আগের মত জাগ্রত নয়। পাপ পুন্যের বিচারবোধও মানুষ এখন হারিয়ে ফেলেছে। তাই নিজের প্রতি ,পরিবারের প্রতি ক্ষোভ নিয়ে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যায়।


ওর মার রুমে ঢুকে বুকটা ব্যথায় ভরে উঠলো। হায়রে মা! সন্তানের মঙ্গল বার্তা যতটা বুকে লেগে থাকে , অমঙ্গলের তীর কাটা হাজার গুন বুকটাকে বিদ্ধ করে। এ যন্ত্রনা থেকে আর কারো মুক্তি ঘটলেও মা’র মুক্তি নেই। যেন হাজার বছর খুচিয়ে খুচিয়ে রক্তাক্ত করে মা’র অন্তর! সুদ্বীপের মা বিলাপ করে কাঁদছিল! সবার চোখের পাতা ভিজে উঠছিল, কেউ কেউ হু হু করে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। কখন যে নিজের অজান্তে আমার চোখের পাতা অশ্রুসিক্ত হলো বুঝলাম না।
অনেকটা সময় সুদ্বীপের মার পাশে বসেছিলাম। উনি হয়ত আমাকে দেখতে পাননি। এক এক সময় ওর মার কষ্টের হাহাকার এত তীব্র যে উনি মানতে চান না ওনার সন্তান পৃথিবীতে নেই। কত কথার গাথুনিতে সদ্য মৃত সন্তানকে জীবিত করে তোলেন, ছেলের আচার ,আচরণ , কথাকে জলের মাঝে কাগজের নৌকোর মত করে ভাসিয়ে রাখেন। আবার চিৎকার করে কাঁদেন ছেলের পৃথিবী থেকে চলে যাবার কথা ভেবে। আমি বাড়ির পথে পা বাড়ালাম। আমার ফোনটি বেজে উঠলো। দেখলাম, ছোট ছেলেটা আবার ফোন করেছে। ফোন ধরলাম , ও বললো, মা আমি আসছি, আমাকে নিষেধ করো না।
আমি বললাম, তোমার এ চলে আসাটাকে তোমার বাবা ভালো চোখে দেখবে না।


ও বললো, না দেখলেও যে আমার কিছু করার নেই মা! আমাকে যে আসতেই হবে। আমি ওর জানাজায় শরীক হবো। আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না।
সময় গড়িয়ে চলছে। আমি অপেক্ষা করে আছি ছেলে আসবে। ‘ও’ ওর বন্ধুর লাশ দাফন করার জন্য খুব ঝুকির পথে আসছে। বন্ধুর জন্য হৃদয়ে এটুকু রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং তার জন্য ছুটে আসছে, একথা ভেবে মনে মনে সম্মান জানালাম ওকে। আমরা চাইলেও কারো জন্য তেমন কিছু করতে পারি না, তেমন কিছু করা হয়ে ওঠে না। ওর ছোট্ট মনের কোমল জায়গা থেকে এটুকু করার জন্য ছুটে আসছে এওবা কম কিসে?
ওদের আসতে আসতে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেল। আসরের পরপরই জানাজা হলো। তারপরও লাশ রাখা হলো, ঈদগাহ মাঠে। যেখানে জানাজা হয়েছে ঠিক সেই জায়গাটায়। এটা ওদের প্রিয় জায়গা! ছোটবেলা থেকে এ মাঠে খেলে ওরা বড় হয়েছে। এর আশেপাশে ব্যস্ত সময় পাড় করেছে। সেই স্বপ্নের জায়গা প্রিয় মাঠ, ঈদগাহ ! কত বকা খেয়েছে, আমি নিজেও কত বকা দিয়েছি আমার সন্তানকে শুধু ওখানটায় যাবার জন্য তারও যেন কোন হিসাব নেই। এই সেই মাঠ যেখানে সুদ্বীপ শুয়ে আছে। আর হাজারো মানুষের পদচারণায় কেমন ভারি হয়ে উঠছে ‘ঈদগাহ’! সামনের ঈদে সুদ্বীপ আর এখানে হাঁটবেনা, বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠবে না হৈ হুল্লুরে!
সুদ্বীপের দূরের আত্মীয় স্বজনদের আসতে দেরি হওয়ায় আসরের পর দাফন হলো না। আমি ছেলের কারণে ব্যস্ত হয়ে আবার ছুটলাম সুদ্বীপদের বাসায়।
সন্ধ্যে তখন ছুঁই ছুঁই। চারদিক অন্ধকার-কেমন ঘুটঘুটে, অদ্ভুত বিষাদে ভারি হয়ে আছে বাড়িটা! ওর মা আত্মীয় স্বজন সব নিচে নেমে এসেছে, ডুকরে কাঁদছে মা! বাবা নিচে নামেনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সুদ্বীপের দ্বিতীয়বার জানাজা শেষে কবরস্থানে নেয়ার জন্য ট্রাকে তোলা হলে মুহূর্তে ট্রাক ভরে গেল বন্ধুদের জন¯্রােতে। তারপরও অনেক বন্ধু যে যার মত করে ছুটছে কবরস্থানের দিকে। বিষাদের কালো মেঘটা কেমন নিশিকালো অন্ধকার করে রাখা বাড়িটাকে ছেড়ে হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে চললো কবরস্থানের পথে। বিদায় সুদ্বীপ! এই পরিবারের একটি অধ্যায়ের শেষ হলো যেন আজ!
তৃতীয় দিনে মিলাদ শেষে ছোট ছেলে ঢাকা চলে যাবে রাতের গাড়িতে। আমি বার বার ফোন দিচ্ছি, কোথায়?
বাবু বললো, মা আমরা বন্ধুরা কবরস্থানে।


ভাবলাম , যাবার আগে বন্ধুকে দেখতে গেছে। বাবু কবরস্থান থেকে ফিরে এলে খুব তাড়াহুড়ো করে ওকে গাড়িতে তুলে দিতে গিয়ে দেখি- সব বন্ধুরা এসেছে বাবুকে এগিয়ে দিতে। ওদের মন খুব খারাপ! বাবুকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বাসায় আসি। অনেক রাতে ওর রুমটা গোছাতে গিয়ে দেখি, বালিশের নিচে একটা খোলা ডায়রী। কী যেন সব লেখা। যেটা নিতে ‘ও’ হয়ত ভুলে গেছে। লেখাটা নজরে পড়লো, আমি কেমন চমকে উঠলাম! লেখাটা ঠিক এমনই ছিল ...
“আজ আকাশে চাঁদটা দেখেছিস সুদ্বীপ? আজ যখন তোকে নিয়ে ঐ ভয়ানক নির্জন জায়গাটায় গেলাম, তখন গন্ধরাজ ফুলগাছের পাতার মধ্য দিয়ে বিশাল থালার মত চাঁদটাকে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করছিলো। তোর কি মনে পড়ে এমনি কত রাত আমরা এক সাথে হেঁটেছি? সেদিনওতো আকাশে এমন সুন্দর চাঁদ-ই ছিলো? ভূতের গলি, ঈদ-গাহ মাঠে হয়তো আমাদের পায়ের চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। আর আজ কিনা তুই একা একাই চাঁদ দেখবি?
জানিস, দোস্ত ছোটবেলা থেকেই আমি লাশ দেখলে খুব ভয় পেতাম কারণ যদি রাতে স্বপ্নে ওটাকে দেখি। কিন্তু বিশ্বাস কর,আজ যদি আমি স্বপ্নে তোকে দেখি তাহলে আমি হয়তো তোকে একটা থাপ্পর দিয়ে বলবো, কোথায় গেছিলি, একবারও কারো কথা ভাবলি না?
তোকে অনেক মিস করবো রে...! তোর জায়গা কেউ কোনদিনও নিতে পারবে না। কারণ সেই জায়গা পূরণ করার ক্ষমতা নিয়ে কেউ হয়তো আর আসবে না। আল্লাহ তোকে বেহেশত নসিব করুক! আমাদের যেন জান্নাতে আবার দেখা হয়... সেদিন তুই আর আমি আবার এক সাথে চাঁদ দেখবো”...!
লেখাটা পড়ে কেমন যেন হয়ে গেলাম, কেমন একটা অনুভূতি মুহূর্তে হৃদয় ছুঁয়ে গেল, হায় কী হলো, এটাতো না হলেও পারতো!
এর এক সপ্তাহ পর আমি যাচ্ছিলাম সুদ্বীপের বাসার সামনে দিয়ে। হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠলো, বাড়িটা কেমন প্রাণহীন হয়ে আছে। মনে হলো, যেন আজ আর এ বাড়িতে কোন মানুষ নেই। কাঁচের জানালাগুলো খোলা, সাদা পর্দাগুলো দিশাহীনভাবে উড়ছে মুক্তির আনন্দে! ছাদের দিকে তাকালাম- পুর্তগালের একটি পতাকা উড়ছে...! আর বাটিক করা কতগুলো নীল কাপড় বাতাসে উড়ে উড়ে দড়ির গায়ে আটকে আছে। অথচ এই পরিবারের আদরের ছোট্ট সন্তানটি ভালোবাসার বন্ধনে আটকে থাকতে পারেনি...!

 

ধনবানে কেনে বই জ্ঞানবানে পড়ে

যতীন সরকার

 

এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ-গল্পের ভাবসত্যটিকে না-মেনে পারা যায় না। একালের নব্যধনিক এবং লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে সে-সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে- ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই বুদ্ধিমানে পড়ে

 

কন্ট্রাক্টরি করে অনেক কাঁচা পয়সার মালিক হয়েছেন এমন এক ব্যক্তি নিজের জন্য একটি আলিশান বাড়ি তৈরি করলেন। খুবই আধুনিক ধাঁচের বাড়ি। দামি আসবাব দিয়ে পুরো বাড়িটি সাজানো। এক সমঝদার বন্ধুকে বাড়িটি দেখাতে নিয়ে এলেন এবং বাড়িটি সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলেন। বন্ধু বললেন, ‘হ্যাঁ, খুবই চমৎকার বাড়ি তুমি তৈরি করেছ। আর বাড়ির আসবাবপত্রগুলোও খুবই চমৎকার ও রুচিশীল বটে। কিন্তু এ রকম একটা বাড়িতে ভালো একটা লাইব্রেরি না থাকলে ঠিক মানায় না। বাড়িতে বই থাকাটা খুবই জরুরি।‘
বাড়ির মালিক কন্ট্রাক্টর ‘কুচ পরোয়া নেই’ ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজই আমি আহম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিতে ৭০০ টন বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।’
চুন-বালি-সুড়কি নিয়ে যার কারবার তিনি তো সবকিছুকেই টনের মাপে বিচার করবেন। তাই বইয়ের কথায়ও তার টনের হিসাবই মনে এলো, বইয়ের সম্পর্কেও অন্য রকম কিছু তিনি ভাবতে পারেন না।
এটি হয়তো নিছক একটি গল্প। তবু এ গল্পের ভাবসত্যটিকে না মেনে পারা যায় না। একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরা যে বই নিয়ে মাথা ঘামায় না, গল্পটিতে ওই সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছেÑ ‘আনাড়ির ঘোড়া নিয়ে বুদ্ধিমান চড়ে/ধনবানে কেনে বই, বুদ্ধিমানে পড়ে।’ একালের ধনবানদের ব্যাপারে এ প্রবাদটি বোধহয় এর সত্যতা ও কার্যকারিতা একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে।
প্রবাদটি তাহলে কখন সত্য ছিল? কখনো সত্য ছিল কি?


বিপুল ধনে ধনবান হওয়ার যেসব পথ অর্ধশতাব্দী ধরে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেÑ এখন খুলে গেছে, সেসব পথ এর আগে তৈরি হয়নি। সে সময় এখানে ধনবান হওয়ার ভিত্তি ছিল ভুমির স্বত্ব-স্বামিত্ব। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পথ ধরে ছোট-বড়-মাঝারি যে ভুস্বামীগোষ্ঠীর পত্তন ঘটেছিল, ধনবান বলতে মূলত ওই গোষ্ঠীর মানুষকেই বোঝাতো। সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা ওকালতি, ডাক্তারি, মাস্টারি ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিরাও ওই গোষ্ঠী থেকেই বেরিয়ে আসতেন। অর্থে-বিত্তে তারা সম্পন্নতা ও স্বচ্ছলতা অর্জন করতেন অবশ্যই। তবে একেবারে লাগাম ছাড়া ধনবান হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের সামনে খুলে যায়নি।
এরও অনেক আগে, আঠারো শতকের শেষে সদ্য ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এ দেশে একটি মুৎসুদ্ধি ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। তাদের বলা হতো ‘হঠাৎ নবাব’। সেকালের ওই ‘হঠাৎ নবাব’দের সংস্কৃতিহীনতা ও রুচিহীনতার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে একালের নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকদের সঙ্গে। তাদের মতোই বই সংস্পর্শহীন ছিলেন সেকালের হঠাৎ নবাবরা।
হঠাৎ নবাবদের গোষ্ঠীটি সমাজমঞ্চ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে থাকে। এ গোষ্ঠীর অনেকেই পরে ভূস্বামীতে রূপান্তরিত হন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে উপজাত ওই গোষ্ঠীটি সম্পর্কে আমাদের বিরূপতা অবশ্যই সঠিক ও সঙ্গত। তাদের যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের খোজা প্রহরীরূপে গড়ে তোলা হয়েছিল সে কথা মোটেই মিথ্যা নয়। পরজীবী ওই নয়া সামন্ততন্ত্রীরাই যে সমাজ প্রগতির পথে দুস্তর বাধার সৃষ্টি করে রেখেছিল এ কথাও নিশ্চয়ই সত্য। তবু না মেনে পারি না যে, এর ভেতরেই সত্যের একটি উল্টো ধারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। ওই গোষ্ঠীর ব্যক্তিরাই বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন, বইপ্রেমিক হয়েছিলেন, বই লিখেছিলেন। অর্থাৎ আগেকার ‘হঠাৎ নবাব’দের বিপরীতে তারা হয়ে উঠেছিলেন সংস্কৃতিবান ও রুচিমান। তাই তারা যেমন বই পড়তেন তেমনই অন্যদেরও পড়তে উৎসাহ জোগাতেন।


তাদের ভেতর বই পড়ায় যারা মোটেই উৎসাহী ছিলেন না তারাও কখনো কখনো নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও উৎসাহী পড়ুয়াদের জন্য বইয়ের জোগান দিতেন। সে সময়কার পুস্তক প্রকাশকদের কাছে দেশের সব ছোট-বড় জমিদারের তালিকা থাকতো। নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই তালিকা দেখে প্রকাশকরা জমিদারদের নামে ভিপিযোগে বই পাঠিয়ে দিতেন। জমিদারের বাড়ি থেকে ভিপি ফেরত যাওয়াটাকে একান্তই অসম্মানজনক মনে করা হতো। এ রকম অসম্মানের বোঝা বইতে কোনো জমিদারই রাজি ছিলেন না। তাই অন্তত ময়মনসিংহ জেলার এমন কয়েক জমিদারের কথা শুনেছি, তারা প্রকাশকদের পাঠানো বইগুলোর তালিকা তৈরি করে সেসবের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। এ রকম বইয়ের সংগ্রহ নিয়েই প্রতিটি জমিদার বাড়িতে একেকটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। সেসব লাইব্রেরিতে কোনো জমিদার বা জমিদার নন্দন প্রবেশ করুন আর না-ই করুন, জ্ঞানপিপাসু প্রজাদের অনেকেই সেগুলোয় ভিড় জমাতেন। এভাবেই এবং এ সময় থেকেই বোধহয় ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির প্রচলন ঘটেছে।
অনিচ্ছায় নয় শুধু। জ্ঞানবান সৃষ্টিতে অথবা জ্ঞানবানদের পৃষ্ঠপোষকতাদানে স্বেচ্ছায় যারা এগিয়ে এসেছেনÑ তেমন ধনবানের সংখ্যাও একেবারে কম ছিল না। এ রকম অনেক জমিদারই নিজেদের বাড়িতে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। ধনবাড়ী, মুক্তাগাছা ও শেরপুরের জমিদারদের লাইব্রেরির কথা তো সর্বজনবিদিত। বাড়ির বাইরে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায়ও অনেক জমিদার আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ ও এর সমৃদ্ধ পাঠাগারটি তো এ রকম বিদ্যোৎসাহী জমিদারের দানেই প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ শাসন আমলেই স্বদেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বই পড়াটি স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করে ফেলেছিলেন। তাদের উদ্যোগেই গ্রামে গ্রামে বা মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনেও তখনকার ধনবানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।


দুই.
দুঃখ এই, ব্রিটিশ শাসন আমলের ধনবানদের পথে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত দেশের ধনবানরা পা বাড়ালেন না। পাকিস্তান জমানায় নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও নয়। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর জিগির তুলে ওই অদ্ভুত রাষ্ট্রটি কায়েম করে যারা সেখানে রাতারাতি ধনবান হয়ে উঠেছিল তাদের ধন অর্জনের পেছনে বইয়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং বই ছিল তাদের মতলব হাসিলের পথের প্রতিবন্ধক। তাই তারা বইবিরোধী না হয়ে পারেনি। বই নয়, নির্বিবেক বিষয়-বুদ্ধিই হয়ে উঠেছিল তাদের চালিকাশক্তি। বিষয়-বুদ্ধিই তাদের ভেতর সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধিটিকে উসকে দিয়েছিল। ওই ভেদ-বুদ্ধি থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘পাকিস্তান’ নামক যে সংস্কৃতিবিরোধী রাষ্ট্রটি এর পক্ষে বইভীতি হওয়াই ছিল একান্ত স্বাভাবিক।
পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর সমাজের সব মানুষই যে সংস্কৃতিহীন হয়ে গিয়েছিল তা তো নয়। অন্তত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সাংস্কৃতিক রুচিঋদ্ধ। এই সংস্কৃতিমান মানুষের বইপ্রীতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক ও কর্তৃত্ববানদের একান্ত স্বস্তিহীন করে তুলেছিল। এ ব্যাপারে নাৎসিবাদী হিটলার ও তার অনুচরদের সঙ্গে পাকিস্তানবাদীদের ভাবনা একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। নাৎসিবাদ ও পাকিস্তানবাদÑ এ দুয়েরই লক্ষ্য ছিল সভ্যতার চাকাটা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেয়া। আর এ কাজে বই-ই হচ্ছে প্রধান বাধা। কারণ বই তো সভ্যতার বাহক। সভ্যতার বাহকটিকে সভ্যতাবিরোধীরা সুনজরে দেখে কী করে? নাৎসিবাদীরা সভ্যতার বাহক বইয়ের বহ্নুৎসব করেছিল প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে। পাকিস্তানবাদীরা ঠিক তেমনটি করেনি। তারা মানুষকে বই বিমুখ করার অন্য রকম একটি ধারা চালু করতে চেয়েছিল। ওই ধারাটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের। পবিত্র ধর্মের অপবিত্র ব্যাখ্যা দিয়ে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধ-বুদ্ধি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের খাতে প্রবাহিত করে দেয়ার মতলব এঁটেছিল তারা। ধরেছিল বই নিষিদ্ধ করার পথ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমুক্ত উদার ও মুক্তবুদ্ধি সাধকদের তারা ভয় পেতো। সমাজ বদলের প্রবক্তাদের সম্পর্কে তো তাদের ভীতি ছিল সীমাহীন। তাই যে বইয়েই প্রকাশ আছে কিংবা আছে সমাজবদলের আর্তি ও পথনির্দেশ সেসব বই-ই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখের বালি। কিন্তু সংখ্যাধিক্য তো সে রকম বইয়েরই। কয়টা বই নিষিদ্ধ করতে পেরেছিল পাকিস্তানবাদের প্রবক্তারা? বইয়ের প্রতি পাকিস্তানবাদীদের নিষেধবিধিই বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকার বাঙালিদের বইপ্রেমটি আরো জোরদার করে তুলেছিল, নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি তাদের আকর্ষণ দুর্বার হয়ে উঠেছিল। বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির স্বাধিকার চেতনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণাটি তার বইপ্রেম থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। হায়! রক্ত ও ইজ্জত দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ রাষ্ট্র তথা এ জাতির হর্তাকর্তা, বিধাতা হয়ে বসলো যে গোষ্ঠীটি সে গোষ্ঠীর ভেতর বইপ্রেমিক সংস্কৃতিমান বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের এই নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী অষ্টাদশ শতকের কলকাতার ‘হঠাৎ নবাব’দেরই সগোত্র। হঠাৎ নবাবদের চেয়ে তারা বরং অনেক ধূর্ত ও ধড়িবাজ। আঠারো শতকের বাঙালি হঠাৎ নবাবদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না। কিন্তু বিশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতাটি এখানকার নব্য ধনিক ও লুটেরা ধনিকরাই দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের জনগণকেই বলা হয়েছে রাষ্ট্রের ‘মালিক’। ওই মালিকানা বেহাত হয়ে যেতে বেশিদিন লাগেনি। এখন তো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেরও নিয়ন্তা নব্য ধনিকরাই, রাজনীতিকদের বদলে তারা সে সংসদের অধিকাংশ আসনের দখলদার হয়ে বসেছে। এ কথা তো জানাই আছে, ক্ষমতা অধিকারীদের সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে পুরো সমাজের সংস্কৃতি। বর্তমানে এ দেশে ক্ষমতার মঞ্চে যারা অধিষ্ঠিত তাদের কি সত্যি সত্যিই কোনো সংস্কৃতি আছে? সংস্কৃতিহীন ক্ষমতাবানদের দেশটি তো সংস্কৃতিহীনই হবে। সে দেশে বইয়ের কদর করবে কে?


তিন.
ব্রিটিশ আমলে ধনবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে যেসব লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল এর অধিকাংশই পাকিস্তান জমানায়ও টিকে ছিল। কোনো কোনোটির শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও অনেক জমিদারের দেশত্যাগের ফলে জমিদারদের লাইব্রেরির অনেকটিই অবশ্য নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও যেসব পাবলিক লাইব্রেরি টিকে গিয়েছিল এরও অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায় একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। এ রকম অন্তত দুটি লাইব্রেরির কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছিÑ একটি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী ধর্মসভা লাইব্রেরি ও অন্যটি ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরি। প্রথমটি ছিল সনাতনী হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত ও দ্বিতীয়টি প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের। দুটি লাইব্রেরিরই প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ধর্ম আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু লাইব্রেরি দুটিতে ধর্মীয় বই যত ছিল এর চেয়ে বেশি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বই। এমন অনেক অমূল্য ও দুর্লভ বই এ দুটি লাইব্রেরিতে ছিল যেগুলোর আর কোনো কপি হয়তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ময়মনসিংহের ধর্মসভা লাইব্রেরিতে তো হাতে লেখা পুঁথিই ছিল কয়েকশ’। সবই লুণ্ঠিত হয়ে মুদি দোকানের ঠোঙ্গায় পরিণত হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এ রকম পাবলিক লাইব্রেরির পাশাপাশি কতজনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের যে একই পরিণতি ঘটেছে, আমরা কেউই সেসবের খোঁজ নিইনি। এভাবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত যে হারিয়ে গেছে এ সম্পর্কেও আমরা অবহিত ও সচেতন হইনি বললেই চলে। এ রকম শূন্যতার মধ্যে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না। অন্তত মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকা তো যায় না! সত্যিকার মননশীল মানুষরূপে বেঁচে থাকার নামই যেহেতু সংস্কৃতি এবং বই যেহেতু ওই সংস্কৃতির অপরিহার্য বাহন সেহেতু বই পড়ার আয়োজনের বিস্তৃতি ঘটাতেই হবে। কীভাবে তা সম্ভব? ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’Ñ বিদগ্ধ সংস্কৃতিমান প্রমথ চৌধুরী এমন একটি কথা বলে এক সময় আমাদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোয়Ñ বইপ্রেমিকদের মধ্যে এমন মানুষেরই তো সংখ্যাধিক্য। এ রকম যারা প্রায় জন্মসূত্রেই দেউলে হয়ে আছে, প্রমথ চৌধুরীর আশ্বাসবাণী তাদের কতটুকু কাজে লাগবে? বই কিনে বই পড়ার আগ্রহ চরিতার্থ করা তো তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কাজেই সবার বইপড়ার সুযোগ অবারিত করে দেওয়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আগেকার জমিদাররা যেভাবে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোগান দিতেন, এখনকার নব্য ধনিকরাও যাতে তেমনটি করে এ জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কায়দা-কানুন খুঁজে বের করতেই হবে। যতদিন সমাজে ধনবৈষম্য বজায় থাকবে ততদিন পর্যন্ত ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটির সত্যতাটি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে। যেভাবেই হোক বই কেনার জন্য ধনবানদের উদ্বুদ্ধ অথবা প্রলুব্ধ কিংবা বাধ্য করা খুবই প্রয়োজন। লাইব্রেরি আন্দোলন বা পাঠাগার আন্দোলনের কথা এক সময় খুবই শোনা যেত। এখনো মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বটে। কিন্তু এ আন্দোলনের আগের সেই রমরমা ভাব কিংবা উচ্ছ্বাস এখন আর অবশিষ্ট নেই। তবু লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় একালেও কোনো কোনো তরুণকে যখন উৎসাহিত হতে দেখি। তখন আমার উৎসাহের পালেও কিছুটা হাওয়া লাগে বৈকি। তবে সেই সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতাজাত কিছু হতাশাও মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দেখেছি, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যত কঠিন এর চেয়ে অনেক কঠিন তা টিকিয়ে রাখা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা উঁই আর ইঁদুরের মতো প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপদ্রবে আমাদের দেশে বইয়ের আয়ু ক্ষয় হয় খুবই দ্রুতবেগে। আবার বই পড়ি বা না পড়ি, বই অপহরণে আমরা সবাই কৃতবিদ্য। অপহরণের হাত থেকে লাইব্রেরির বই রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দেখা যায়, জন্মের স্বল্পকাল পরই অধিকাংশ লাইব্রেরির মৃত্যু ঘটে যায়। চুপি চুপি বলি, আমি কিছু ক্ষেত্রে এবং বিশেষ শর্তাধীনে বই চুরিরও সমর্থক। কতিপয় ধনবান যখন তার উন্নত রুচির প্রমাণ প্রদর্শনের জন্য শেলফে বই সাজিয়ে রাখে কিংবা নিতান্ত খেয়ালের বশে দু’চারটি বই কিনে ফেলে অথচ সেসব বই নিজেও পড়ে না এবং অন্যকেও পড়তে দেয় না তখন ধনহীন জ্ঞানবানদের দায়িত্বই হয়ে যায় জ্ঞানহীন ধনবানের কব্জা থেকে বইগুলোকে বের করে আনা। এ জন্য প্রয়োজনে চৌর্যের আশ্রয় নেয়াটা মোটেই অবৈধ বা অসঙ্গত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এভাবেই বরং আমরা ‘ধনবানে কেনে বই, জ্ঞানবানে পড়ে’ প্রবাদটিকে এ যুগেও সার্থক করে রাখতে পারি। লাইব্রেরিতেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহেই হোক, বই না পড়ে আসবাবরূপে সাজিয়ে রাখা অবশ্যই অবৈধ ও অসঙ্গত। সঠিকরূপে বই পড়ে বইয়ের ভেতর থেকে এর সঠিক মর্মবস্তু যারা আহরণ করতে পারবেন তারাই হবেন যথার্থ জ্ঞানবান। ওই যথার্থ জ্ঞানবানরাই মানুষকে সমাজবদলের পথ দেখাবেন এবং তৈরি হবে এমন সমাজ যেখানে সবাই হবেন জ্ঞানবান। অন্যায় ধনে ধনবান হওয়ার পথ সে সমাজে খোলা থাকবে না।

সুইসাইড

রফিকুর রশীদ 

 

অবশেষে নীপা মুখ খুলল।
আজ কদিনের মধ্যে সে মোবাইলেও কথা বলেনি কারও সঙ্গে। সত্যি বলতে কী এ পরিবারে অনভিপ্রেত অঘটনটি ঘটে যাবার পর প্রথমে তার কাছ থেকে নিজস্ব মোবাইল সেটটি কেড়ে নেওয়া হয়, তারপর ল্যাপটপটিও কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয় তার ঘর থেকে। এই উদ্যোগে প্রত্যাশিত কোনও ফল না পেয়ে কয়েকদিন পর সবই আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় নীপাকে। এসব ফেরত পাবার পর তার ভেতরে নতুন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে বাবা মা দুজনেই হতাশ হয়। নীপার মনের জগতে প্রবেশের আর কোনও পথই খোলা নেই বলে মনে হয়। তবু সকালে কোর্টে বেরোনোর আগে জামান উকিল এসে মেয়ের সামনে হাঁটু ভেঙে দাঁড়ান, মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,
নতুন একটা মোবাইল সেট নিবি মা?
নীপা নিরুত্তর। খেলনা পাবার সম্ভাবনায় খুশিতে নেচে উঠার বয়স অনেক আগেই সে পেরিয়ে এসেছে। বাবার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারে না, কথা বলবে কী করে! দুহাতের অঞ্জলিতে মেয়ের মুখ তুলে ধরে বাবা আবারও বলেন,
যাকে ইচ্ছে ফোন করিস, আপত্তি নেই। তুই কথা বল মা, একটা কিছু বল! নীপা কিছুই বলে না, যেন বা বাজপড়া কাঠপাথর। না

না, পাথর হলে চোখের পাপড়ি ভেঙ্গে অশ্র“ গড়িয়ে পড়বে কেন! সেই অশ্র“দাহ তার বাবাকেই বা নীরবে সংক্রমিত করবে কেন! পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়ের চোখ মুছিয়ে দিয়ে জামান উকিল অনুনয় করে ওঠেন,
আমার সঙ্গে না হোক তোর মায়ের সঙ্গেই কথা বল নীপুমনি।

নীপার নামের এই আদুরে আদল তার বাবারই দেওয়া। কলেজে ওঠার পর ওই মিষ্টি নামটি কীভাবে যেন আড়ালে চলে যায়। দীপ্তও একদিন আদর করে ডেকেছিল ওই নামে। ভালো লাগেনি নীপার। নিষেধ করেছিল দীপ্তকে। ওটা বাবার ডাকা নাম, অপেক্ষায় থেকেছে নীপা- আবার কোনো ইচ্ছে হলে বাবাই ডাকবে ওই নামে। তো সেই সময় কি এতদিন পর পারিবারিক সংকটের এই দুর্দিনে হলো! নীপার দুর্বল শরীর কেঁপে ওঠে কী এক শিহরণে। বড় বড় দুটি চোখ বিস্ফোরিত করে তাকায় বাবার মুখের দিকে। মেয়ের চোখে চোখ পড়তেই তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন- তুই কথা না বললে আমরা বাঁচব কী করে বল দেখি!
না, তবুও বাবার সঙ্গে কথা বলা হয় না নীপার। দিনের শেষে কথা বলে সে তার মায়ের সঙ্গে। কথা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। খুব ছোট্ট বাক্য। কিন্তু তার ওজন এবং শক্তি ইরাক বিধ্বংসী বোমার চেয়ে মোটেই কম ভয়াবহ নয়। অথচ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর কত অবলীলায় মায়ের

মুখের উপরে জানিয়ে দেয় নীপা,
আমি সুইসাইড করব মা।
আত্মহত্যা না বলে এই ইংরেজি শব্দটিই সে প্রয়োগ করে। তার মায়ের তখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট দশা। কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করে। মাথা ঘুরে ওঠে চক্কর দিয়ে। দুহাতে মেয়েকে জাপটে ধরে আর্তনাদে ফেটে পড়ে।
এ তুই কী বলছিস নীপা!
নীপা খুব সহজে খটখটে গলায় জানায়,

হ্যাঁ, আমি সুইসাইড করব।
যেনবা সুগভীর চিন্তাভাবনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত তার। অন্তর্গত সমস্ত দ্বিধার পাঁচিল অতিক্রম করে এসেছে সে। গত কয়েকদিন সে কথা বলেনি বটে কারও সঙ্গে, কিন্তু ভাবনার প্রবাহ তো রুদ্ধ হয়ে থাকেনি। যথেষ্ট বড় হয়েছে সে। বলা যায় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজে গ্রহণ করার মতো ঢের সময় সে পেয়েছে। তাই দ্বিধাহীন কণ্ঠে সে ঘোষণা করতে পারে, সে সুইসাইড করবে। আগাম ঘোষণা দিয়ে এ পথে কে কবে নেমেছে! আর এই প্রলয়ঙ্করী ঘোষণা শোনার জন্যই কি তার বাবা মা এতদিন কান পেতে বসে আছে?
নীপার মা সহসা যেন কোন যাদুমন্ত্রে নিজেকে সামলে নেন। মেয়ের পাশে বসে পরম সখ্যে এবং নির্ভরতায় হাত বাড়িয়ে দেন তার কাঁধে। নীপার চুলের অরণ্যে মমতার আঙুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন,
শোন মা, মানুষের তো একটাই জীবন। মেয়েদের সে জীবন আবার ভীষণ পলকা। সেই জীবন নিয়ে হেলাফেলা করলে চলে?
নীপার মুখে কথা নেই। সব কথার শেষ কথা যেন তার বলা হয়ে গেছে। নীপার মা এবার একটু ঘুরে মুখোমুখি বসেন। মেয়ের মুখটা তুলে ধরেন। চোখে চোখ পড়তেই মেয়েকে চেপে ধরেন,
আমাকে একটা সত্যিকথা বলবি নীপা?
নীপা তাকিয়ে থাকে উত্তরহীন অপলক।
দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? সাতকান্ড কেলেঙ্কারির কথা জানার পরও তো সে এ বিয়ে ভেঙ্গে দিতে চায়নি! বরং আমি তো শুনেছি তার বাপমাকে পর্যন্ত সে কনভিন্স করতে চেষ্টা করেছে, বুঝিয়েছে অঘটনের পেছনে তোর কোনও হাত ছিল না। সেটা স্রেফ দুর্ঘটনা। তোর জন্যে সে নিজের মা-বাপের উপরে চাপ সৃষ্টি করেছে। তারপরও তুই আর কী চাস বল দেখি!
কী আর বলবে নীপা। মায়ের চোখ থেকে নীরবে চোখটা নামিয়ে নেয়। মা- বাবার কষ্টের জায়গাটা সে উপলব্ধি করতে পারে।

দীপ্তর মতো সুপাত্র বেহাত হবার ধাক্কা সামলে ওঠা সোজা কথা! বেহাত মানে চূড়ান্ত অর্থে নীপাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, দুই পরিবারের স্বপ্নসাধ ভেঙে চুরমার করেছে, একেবারে শেষবেলায় বিয়েতে অসম্মতি জানিয়েছে; জামান উকিলের তো হিতাহিত জ্ঞান হারাবারই কথা। একমাত্র কন্যা আদরের নীপুমনির গায়ে তো আর অল্প দুঃখে হাত ওঠেনি তার। এমনিতেই তার সামাজিক মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে নোংরা খেলায় মেতেছে, তাতেই তিনি উ™£ান্ত বিপর্যস্ত। প্রতিকারের পথ না পেয়ে নিজের মাথার চুল ছেঁড়ার দশা। সেই দুঃসময়ে দীপ্ত এগিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে দেয়। একটু দূর সম্পর্কের চাচাতো বোনের ছেলে। ছেলেতে- মেয়েতে যেমন সম্পর্ক, বলা যায় দুই পরিবারের অনুচ্চারিত প্রশ্রয়ে তা পরিণয়ের দিকেই এগিয়েছে। এমন কি বিয়ের কথাবার্তাও পারিবারিকভাবে যখন চূড়ান্তপ্রায়, তখনই ঘটে অঘটন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফাঁদে আটকে পড়ে নীপা, অতপর একদিন নিরুদ্দিষ্ট রাত্রিবাস। সেই একটিমাত্র রাত্রিই সব ওলট-পালট করে দেয়। এই ঘটনা জানাজানি হলে দীপ্তর বাবা এ বিয়েতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন; স্বামী-স্ত্রী যুক্তি করে কৌশলে এড়িয়ে যেতে চান। বেঁকে বসে দীপ্ত। বাবামায়ের মুখের উপরে যুক্তি দেখায়- কিডন্যাপের শিকার হয়েছে বলে এর জন্যে তো নীপাকে দায়ী করা যায় না। তাহলে দুর্ভাগ্যের ভার সেই নীপাকেই কেন বইতে হবে!
সেই দীপ্তকে নীপাই কেন প্রত্যাখ্যান করেছে এ ব্যাখ্যা কিছুতেই খুঁজে পায়নি তার মা-বাবা। এ প্রশ্ন তারা আগেও করেছেন। এমন কী এই প্রশ্ন করতে গিয়েই তো প্রবল উত্তেজনায় অস্থির হয়ে জামান উকিল জীবনে প্রথমবারের মতো মেয়ের গালে চড় মারেন। সেই থেকে নীপা নিস্তব্ধ নির্বাক। এতদিন পর মুখ খুলতেই আবার সেই জেরা- দীপ্তকে তুই ফিরিয়ে দিলি কেন? নীপার মা বলেন ফেলেন;
তুই একবার ফোনে কথা বললেই দেখিস দীপ্ত আবার এগিয়ে আসবে।
আবার দয়া দ্যাখ্যাবে, তাই না মা?
নীপার মা চমকে ওঠেন,
দয়া! দয়ার কথা উঠছে কেন?
শুধু আমাকে নয় মা, ওরা তোমাদেরও দয়া করতে চায়। দয়া দিয়ে সংসার চলে, মা? তুমি বলো; চলে?
কী জানি বাপু কী যে বলছিস; তুই-ই জানিস। কেন একবার ফোন করেই দেখ না! মুখে দুবার চুকচুক শব্দ করে নীপা বলে,
তার মানে তোমরা দয়ার কাঙাল হয়ে বসে আছ তাই তো! তোমাদের কিডন্যাপড হওয়া মেয়েকে অনুগ্রহ করে কেউ বিয়ে করলেই তোমরা খুশি!
দয়া হবে কেন, দীপ্ত তোকে ভালোবাসে বলেই এগিয়ে এসেছিল।
ভালো তো আমিও বেসেছি তাকে। ভালোবেসেছি। বিশ্বাস করেছি। কিন্তু সে আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে মা। বিশ্বাস হারানোর পরও কি ভালোবাসা থাকে? সেই ভালোবাসা দিয়ে কি জীবন চলে, তুমিই বলো!

এতক্ষণে ধস নামে নীপার মায়ের কণ্ঠে। আগের সেই জোর খুঁজে পান না, কেমন যেন ফ্যাসফেসে গলায় বলেন,
চলে চলে। কতভাবে যে মেয়েমানুষের জীবন চলে যায়, তুই তার কী জানিস!
ওই যে তুমি বললে- মানুষের একটাই জীবন!
শুধু আমি বলব কেন, ওটাই সত্যি।
সেই জীবনে বিশ্বাসেরও খুব দরকার মা।
এসব কথা কেন বলছিস নীপা?
নীপা এবার বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। পায়ে পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরে দৃষ্টি ফেলে কী যেন খোঁজে। আবার ফিরে আসে ঘরে। বহুদিন পর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
এই যে তোমরা আমাকে ভালোবাসো, ভালোবাসো বলেই বিশ্বাস করো। তাই না?
হ্যাঁ, সন্তানকে তো বিশ্বাস করতেই হয়।
সন্তান বলে নয় মা, ভালোবাসলেই বিশ্বাস করতে হয়। তোমাদের দীপ্তবাবু খুব ভালো ছেলে, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়েছে।
তার মানে?
সে বার বার জানতে চেয়েছে গুণ্ডারা সেই রাতে আমাকে কতবার রেপ করেছে। একথা তোমরা কতবার জিগ্যেস করেছ মা?
মায়ের মুখে কথা নেই। চোখে বিস্ময়। নীপা একটু দম নিয়ে বলল, অবশ্য দীপ্ত বাবু অতিশয় দয়ালু ভদ্রজন। আমাকে সে আশ্বস্ত করেছে- তুমি সত্যি কথাটা স্বীকার করলেও এ বিয়ে হবেই। তুমি সত্যিটাই বলো- কতবার এবং কতজন....
নীপার মা এবার চিৎকার করে ওঠেন,
তুই থাম নীপা। থাম।
নীপার তখন কথায় পেয়ে বসেছে। কে থামায় তাকে! সে বলে,
থামব কেন মা? কেন থামব বলো! জীবন তো মোটে একটাই। এ জীবনে বিশ্বাসহীন ভালোবাসা আমি চাই না মা।
নীপার মায়ের কণ্ঠে ছলকে ওঠে আর্তনাদ,

 

নীপা!
সেদিন রাতে যা ঘটেছে তার সবই আমি তোমাদের বলেছি। তাকেও বলেছি। লুকাইনি কিছুই। বলতে পারো মা, তবু তার কেন মনে হলো- আমি সত্যি বলিনি?
নীপার মা কোথা থেকে আচনক এক যুক্তি খুঁজে বের করেন,
হয়ত তোকে নয়, সন্দেহ করে সে বাদলদের গ্র“পের সবাইকে। ওদের পক্ষে তো সবই সম্ভব!
কই সব সম্ভব! আমাকে নিয়ে গিয়ে রাতভর আটকে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু আর কী করতে পেরেছে? যুবতী মেয়েকে এক রাত আটকে রাখার খবর জানাজানি হবার পর তোর বাবার কি বেইজ্জত হতে আর কিছু বাকি আছে ভেবেছিস!
না না, ওরা তো ওইটুকুই চেয়েছে। বাদলের বাবা এবার নোমিনেশন পাচ্ছে না এটা প্রায় কনফার্ম। কাজেই আমার বাবাকে ডিসর্টাব করবেই।
তাই বলে তোকে নিয়ে টানাটানি .....
ওরা তো টের পেয়েছে আমার বাবার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোথায়। তো সেই দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করতে হবে, কেমন?
বর্তমানে রাজনীতি এতটাই নোংরা হয়ে গেছে।
সেই জন্যেই তো বাবাকে আমি রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বলি।
হ্যাঁ, তাহলেই হয়েছে। তার চোখে এখন এমপি হবার স্বপ্ন।
আচ্ছা মা, রাজনীতি করবে বাবা, আর তার জন্যে বলি হতে হবে আমাকে, এটা কেমন বিচার বলো দেখি!
নীপার মা এ প্রসঙ্গের যবনিকা টেনে বলেন,
সে কথা তোর বাপকে শুধাস। এখন চল দেখি...
না মা শোনো। এই জন্যেই ঠিক করেছি আমি সুইসাইড করব।
আবার চমকে উঠেন নীপার মা! দাঁড়িয়ে পড়েন থমকে। এতক্ষণের আলাপচারিতায় তাহলে সুইসাইডের ভূত নামেনি কাঁধ থেকে। ভেতরের আতঙ্ক লুকিয়ে রেখে বলেন, আচ্ছা সে দেখা যাবে।

এখন চল তোকে আমি নিজে হাতে কিছু খাওয়াই। মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে বলেন- কী খাবি বল তো মা, কী খেতে ইচ্ছে করছে?
অনেকদিন পর নীপা এক চিলতে হেসে ওঠে। দুহাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার হাতের কিল খেতে ইচ্ছে করছে মা।
কী খাবি!
কিল-কিল। বাবা তো সেদিন চড় দিয়েছিলেন, এবার তুমি একটা কিল দিয়ো।
নীপা এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। বহুদিন পর যেন পাহাড় থেকে ঝর্নাধারা নেমে আসে। নীপার মা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন ঝর্নার স্ফটিকস্বচ্ছ জলের আয়নায়। ভেতরে ভেতরে ভারি আশ্বস্ত বোধ করেন- মুখে যাই বলুক, এ মেয়ে নিশ্চয় সুইসাইড করবে না।
নীপার বাবা রাতে বাসায় ফেরেন বেশ হই হই করতে করতে।
হাতে এক গোছা রজনীগন্ধা। তিন পদের মিষ্টি। নিজে বাসুদেবের দোকানে গিয়ে মেয়ের পছন্দের মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। ও বেলাতেই নীপার মা মোবাইলে জানিয়েছে নীপা মুখ খুলেছে, কথা বলেছে, খাবার খেয়েছে; বুক থেকে পাষাণ পাথর নেমে যাবার স্বস্তি পেয়েছেন। মেয়ের গায়ে হাত তোলার পর থেকে যে আগুনে তিনি দগ্ধ হচ্ছিলেন, তাও যেন সহসা নিভে যায়। মেয়ের খবর পাবার পর সারাটা দিন তার শুভ হয়ে যায়। কোর্টে একাধিক মামলায় রায় আসে তার পক্ষে, মার্ডার কেসের আসামির পক্ষে দাঁড়াতেই জামিন হয়ে যায়। কোর্ট থেকে বেরোতে সহসা দীপ্তর বাবার সঙ্গে দেখা, এক গাল হেসে আশ্বস্ত করেছেন- ছেলেমেয়ের মান-অভিমান ফুরালেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আর এই তো কিছুক্ষণ আগে পার্টি অফিস থেকে বেরোবার মুহূর্তে ফোন এলো নোমিনেশন নিয়ে টেনশন করবেন না, রুট লেবেলে কাজ করে যান, মূল্যায়ন ঠিকই হবে। স্বয়ং কাশেম ভাইয়ের ফোন, সেন্ট্রাল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, তার কথার দাম আছে না? জামান উকিল তাই বাড়িতে ঢোকেন আনন্দের খই ফোটাতে ফোটাতে-
কই রে আমার নীপুমনি! মা মনি কই!
জামান উকিলের এই আনন্দ উচ্ছ্বাস কিন্তু দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। সামনের ইলেকশনে পার্টি নমিনেশন পাবার গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ শেষ করেই তিনি চলে আসেন দীপ্তর বাবার কথায়। নীপার মাকে তিনি বলেই ফেলেন, টানাপোড়েন একটু হয়েছে বটে তবু তার বিশ্বাস, এ বিয়ে হবেই। মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নীপার মা ঘোষণা করে দেয়- দীপ্তকে নীপা বিয়ে করবে না।
দীপ্তকে বিয়ে করবে না! মধ্যরাতে আকাশভাঙা মাথায় দপদপ করে জ্বলে ওঠে চাঁদি, চিৎকার করে ওঠেন নীপার বাবা- তাহলে কাকে বিয়ে করবি তুই? কে তোকে বিয়ে করবে?
নীপার ঠোঁটে বিষণœতার প্রলেপজড়ানো হাসি। সেই হাসির ভাঁজ খুলে সে ধীরে ধীরে বলে, আমি যেখানে বিয়ে করব তারা সবাই সদলবলে তোমার ইলেকশনে কাজ করবে। প্রতিপক্ষ গ্র“প স্বপক্ষে চলে এলে আর তোমার এমপি হওয়া ঠ্যাকায় কে!
এসব তুই কী বলছিস নীপা!
হ্যাঁ বাবা, আমি কথা বলে দেখি- বাদল যদি রাজি থাকে তো আমি তাকেই বিয়ে করব।
নীপার বাবা স্তম্ভিত। বাক্যহারা। নীপার মা চিৎকার করে ওঠেন,
এর চেয়ে তোর সুইসাইড করাই ভালো।
নীপার ঠোঁটের হাসি ক্রমশ প্রসৃত হয়। বিষণœতার আবরণও খসে পড়ে; অবলীলায় সে বলতে পারে-
হ্যাঁ, সুইসাইড তো করতেই চাই। বাদলকে বিয়ে করা আর সুইসাইড করার মধ্যে বিশেষ তফাৎ কী মা! দেখো আমি ঠিক সুইসাইড করব।
এরপর ঘরের ভেতরের বাতাস ভারি হয়ে আসে। প্রশস্ত ঘর। তবু তিনটি মানুষেরই যেন ভয়ানক শ্বাসকষ্ট হয়। তিনজনই ভীষণ হাফিয়ে ওঠে।

 

Page 1 of 2

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…