নবান্নের দেশে

নবান্নের দেশে

 

 

“জমি উপড়ায় ফেলে গেছে চাষা
নতুন লাঙ্গল তার পড়ে আছে পুরানো পিপাসা
জেগে আছে মাঠের উপরে;
সময় হাঁকিয়া যায় পেঁচা ওই আমাদের তরে
হেমন্তের ধান ওঠে ফ’লে
দুই পা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃখিবীর কোলে ”


‘রূপসী বাংলা’র কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার পঙ্তিতে এঁকেছেন বাংলার শাশ্বত রূপের রঙিন অবয়ব যা গ্রাম-বাংলার প্রতিটি জনপদের পরিচিত যাপিত জীবন। সময়ের নাগরদোলায় বৈচিত্র্যে অনিন্দ্য বাংলার মাসগুলো বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি প্রাকৃতিক জীবনকে রেখেছে সচল। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে ছয়টি ঋতুর মোড়কে বারোটি মাস জলে-স্থলে অন্তরীক্ষের ক্যানভাসে আঁকে স্বকীয় রূপ। ষড়ঋতুর এই বঙ্গে হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। ইংরেজী মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তের খামে বাঙালির ঘরে-বাইরে হাটে-মাঠে-ঘাটে আচার ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে অভাব ও সমৃদ্ধির দ্বৈত উপহার। কার্তিক মূলত কৃষিগৃহস্থ জীবনে অভাব-অনটনের মাস হিসেবে পরিচিত। কৃষি প্রধান গ্রাম-বাংলায় এই সময় অকাল বন্যাসহ নানারকম প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে কৃষকের কাজ থাকে না। গোলাঘর থাকে শূন্য। বহুমুখি ফসল উৎপাদন উপযোগী জমিও প্রস্তুত না থাকায় প্রতিটি জনপদে একরকম হাহাকার লক্ষ্য করা যেত কিছুদিন আগেও। বর্তমানে এই পরিস্থিতির খুব যে ব্যত্যয় ঘটেছে তা বলা যাবে না। শরতের শুভ্র শরীর বর্ণিল হতে থাকে হেমন্তের শুরুতে তবে অগ্রহায়ণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয় প্রকৃতির দৃশ্যপট। মসৃণ ও স্পষ্টতার অনুভব নিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুরানীর পরে হাজির হয় ঋতুকন্যা হেমন্ত। মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখী হওয়া এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

উৎসব মানেই আমরা বুঝি হেমন্তকে। এর নেপথ্যে যথার্থ কারণও রয়েছে, সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রধান ফসল ধান। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথমে তাতে পাক ধরে। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকের শেষ দিকে পাড়াগাঁয়ের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে। পাকা ধানের গন্ধে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ম-ম গন্ধ। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর কবিতায় সেই ফসল তোলার চিত্রটি এঁকেছেন দারুণভাবে “রিক্তের অঞ্চল ভরি, হাসি ভরি, ক্ষুধার্তের মুখে/ভবিষ্যৎ সুখের আশা ভরি দিল কৃষকের বুকে”। মাঠে মাঠে হেমন্তের ধানক্ষেতের রূপ নিয়ে কবি জসীমউদ্দীন লিখেছেন “সবুজে হলুদে সোহাগ ঢুলায়ে ধানক্ষেত,/পথের কিনারে পাতা দোলাইয়া করে সাদা সঙ্কেত। কৃষাণ কনের বিয়ে হবে, হবে তার হলদি কোটার শাড়ি/হলুদে ছোপায় হেমন্ত রোজ কচি রোদ রেখা-নাড়ি।” এছাড়াও অসংখ্য কবিতা এবং শিল্পীর রকমারি সুর অবিরত গেয়ে চলে উৎসবমুখর হেমন্তের বৈচিত্র্যময় জয়গান। শীতের আগমনী বার্তা ও তেজোদীপ্ত রৌদ্রকিরণের বিদায় নিয়ে আসে হেমন্ত। এসময় দিক পরিবর্তনে বাতাস উত্তর থেকে দক্ষিণে বইতে থাকে, নাতিশীতোষ্ণ। কার্তিকের পরের মাস চিরায়ত বাংলার আমন প্রধান অঞ্চলে অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে আশির্বাদ। ধান কাটার ভরা মৌসুম এ অগ্রহায়ণ। ফসলি মাঠের ঢেউ উপচে পড়ে কৃষকের গোলায়, আঙিনায়, চাতালে। এই সময়ে নতুন ধানে কিষাণ-কিষানীদের আনন্দ আর ব্যস্ততার সীমা থাকে না। পুরুষরা সারাদিন মাঠে ধান কাটে। নারীরাই সেই ধান সারাদিন মাড়াই করে সেগুলোকে সেদ্ধ করে ও রোদে শুকায় আর গোলায় ভরে।


যদিও বর্তমান সময়ে কৃষিকাজের সকল ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হেমন্তের এই শেষ মাসটি সারাবছরের পরিশ্রমের ঘামে ফলানো ফসল কৃষকের মরমে সোনালি প্রলেপ মেখে দেয়। তাই যুগযুগ ধরে এই মাসটি ‘নব অন্ন’ নতুন ভাত বা ‘নবান্ন’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এই সময় সকল কৃষকের ঘরে থাকে নতুন ধান। সেই ধানের চাল দিয়ে কৃষকপরিবার পিঠা-পুলির ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণ তখন রূপ নেয় উৎবের আমেজে। এই উৎসবে হরেক রকম পিঠা তৈরি হয়। নামের মতই বৈচিত্র্যময় পিঠাগুলো স্বাদে অনন্য, যেমন- চিতই, পাকানো, পাকোয়ান বা পাক্কন, পাটিশাপটা, কুশলি, ভাপা, পাতা, ভাত, কাটা, নকশি, পুলি, দুধ বা ভিজানো, ছিটা, লবঙ্গ, গোকুল, ম্যারা, মুঁঠা, সিদ্ধ, পুতুল, লরি, চাছি, সাগুদানা, ঝুড়িসীতা, তারাজোড়া, জামাই, জামদানি, হাদি, পাটা, তেজপাতা পিঠাসহ আরও অসংখ্য বাহারি নামের পিঠা বাড়িতে বাড়িতে তৈরি করা হয়। এই সময় আতœীয় স্বজনরা বেড়াতে আসে। তাদের নতুন চালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। এভাবেই গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নবান্নের আমেজ। স্মরনাতীত কাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরে বর্ষ গণনার রীতির প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। তাই অগ্রহায়ণের স্থলে গ্রীষ্মের বৈশাখ কী করে বাংলাবর্ষের প্রথম মাস হলো তা এখনো রহস্য। নতুন ধানে, নতুন অন্নে ধীমান প্রকৃতির মেজাজ বাঙালির ফসল কাটার উৎসবকে উসকে দেয় বহুগুণে। হেমন্তের শেষ মাসটিতে রোদের আঁচ কম থাকায় না শীত, না গরম এমন আরামপ্রদ তাপমাত্রায় সময়ের টানে ছোট হতে থাকে দিন। সকালে সবুজ ঘাঁস ও আমন ধানের পাতায় শিশির বিন্দু মুক্ত দানার মতো চিক চিক করে। বৃন্তচ্যুত শিউলী ফুল এসময় সৌরভ ছড়ায়। বেলি, সন্ধ্যা মালতি, দোপাটি, বক, জুঁই, কামিনী, গোলাপসহ অসংখ্য ফুল হেমন্তে ফুটে প্রকৃতিকে সুরভীত করে তুলে। বর্তমান অর্থনীতিতে বিশেষত আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে যদিও উৎপাদন বেড়েছে তবে পরিবহণের বেহাল দশা ও বাজারে মধ্যসত্ত্বভোগীদের স্বেচ্ছাচারীতার কারনে কৃষক ফসলের নায্য মূল্য থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়। যার ফলে নবান্নের আনন্দ সর্বজনীন হয়ে ওঠে না। কেবল কৃষি নির্ভর গ্রাম নয়, বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত। নগরের ইট-কাঠ কংক্রিটের জঞ্জালে বেঁচে থাকা জীবনও সমান তাড়িত হয় কার্তিকের কৃপণতা আর অগ্রহায়ণের সুদিন সন্দেশের পরশে। অগ্রহায়ণের শুরু থেকেই শহরের রাস্তায় মৌসুমী পিঠার দোকান বসে। ভাপা, পটিশাপটা ইত্যাদি পিঠার বেচা বিক্রি নেহাত কম নয়।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে জ্বর, খুশখুশে কাশিসহ নানারকম রোগ-
বালাইয়ের কমবেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় শহর ও গ্রামে। সনাতন ধর্মালম্বী বাড়িগুলোতে হেমন্তকালে কলেরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আকাশবাতি জ্বালানোর প্রচলন ছিল। সময় বদলেছে। বর্তমানে মোটামুটি দৃঢ়তার সাথে বলা যায় খাদ্যাকালের মতো দূর্যোগ আর কলেরার মতো মহামারি বাংলাদেশের জীবন বাস্তবতায় অতীত।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : মুনমুন
পোশাক ও স্টাইলিং : মোঃ রাকিব খান
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি সেলুন 
ছবি : তানভীর মাহামুদ শোভন
সহযোগিতায় : আলী ইমাদ সরকার

Read 1813 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…