Page 1 of 2

মৃন্ময়ী 

সাহানা খানম শিমু

 

 

         কবিতার শেষ পংক্তিটা শেষ করে আপলোড দিতেই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে শোবার অভ্যাস করেছে কয়েক বছর হলো। টেবিল চেয়ারে বসে এখন আর লেখা হয় না,কষ্ট হয়,ব্যাক পেইনের কারনে। বয়স বাড়ছে,শরিরে এটা ওটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শোবার সময় সাইড টেবিলে পানি,জরুরী অসুধের ব্যাগ,চশমা,কলম,কাগজ,ছোট একটা টর্চ নিয়ে রাখে। মোবাইল থাকে আরও হাতের কাছে,বালিশের পাশে। ঘুমের  সমস্যার কারনে শোবার সময় ল্যাপটপে লেখালিখি করে,কখনও ফেসবুকে বসে,কখনওবা ইউ টিউবে গান শোনে টের পায় না,এভাবে এক সময় ঘুমািয়ে পরে। ঘুমের জন্য শুয়ে দেখেছে,এপাশ ওপাশ করতে করতে রাত প্রায় অর্ধেক পাড় করে দেয়,তবুও ঘুম ধারে কাছে আসে না। ছেলে মেয়ে দুটো বিদেশে চলে যাবার পর থেকে ঘুমের সমস্যা শুরু হয়েছে, সেই সাথে একাকিত্বটা খুব পেয়ে বসেছিল।  কিন্তু তমশা একাকিত্বের কাছে হার মানেনি,সঙ্গি করে নিয়েছে লেখালিখি। ধুলো জমেছিল কবির কল্পনায়,কবিতা তৈরির মালমশল্লায়। ভালোবাসার গভীর হাত দুটো দিয়ে প্রায় দু'যুগের ধুলো ময়লা,পোকা মাকরের ঘর বসতি সরিয়ে  নিজের ভেতরে আবার জায়গা করে দিয়েছে কবিতাকে। গড়ে তুলেছে কবিতার প্রিয় প্রাঙ্গন। 

 

     ইদানীং মাঝে মাঝে এমন হচ্ছে,গভীর মনোনিবেশ করে কোন কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াতে গেলে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। প্রেসার বাড়ল কি? নাকি অন্য কোন সমস্যা ! দেখি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তমাল,তানি প্রায় প্রতিদিনই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বলে। আজ যাই,কাল যাই করে যাওয়া হয়ে উঠছে না। কাল সকাল হোক,অবশ্য অবশ্যই যাব,পুরো শরিরটা চেক আপ করাব,আর আলসেমি নয়,আপন মনে বলছে তমশা। 

 

     কবিতাটি কম্পোজ করাই ছিল,সপ্তাহ খানেক আগে লিখেছিল,এখন কিছু ঘসামাজা করে ফাইনাল টাচ দিয়ে ফেসবুকে আপলোড করল। কবিতা লেখার সময় কবি রুশো রায়হানের কিছু কথা অনুসরণ করে চলে তমশা। যেমন - তিনি বলছিলেন কবিতা লিখেই ছাপতে দেবে না,রেখে দেবে,ছোঁবে না। কবিতাকে জাঁক দেবে। কয়েকদিন পর যখন বের করবে দেখবে কবিতাটি কেমন মাখনের মতো কোমল কোমনীয় হয়ে উঠেছে। তখন কাটতে,ছাটতে আরাম হবে,কবিতাকে তার পরিপূর্ন রূপ দিতে সহজ হবে। আরেকদিন বলছিলেন  -খেয়াল রাখবে,কবিতার গায়ে যেন বাড়তি মেদ না জমে। কবিতা হবে মেদহীন সৌন্দর্যের আধার। 

 

     মাথার পেছনটা শিরশির করছে,মাথাটা সোঁজা করে রাখতে কষ্ট হচ্ছে,হাত দুটো অবশ লাগছে। এরকম খারাপ তো আগে কখনও লাগেনি,মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এতদিন কি জানান দিচ্ছিল -তমশা সাবধান হও। কিন্তু তমশা গায়ে মাখেনি,ভেবেছে কিছু না। 

 

    সিনঙ্গেল মা তমশা,অনেক প্রতিকুলতা,ঘাত প্রতিঘাত সয়ে বাচ্চা দুটোকে বড করেছে। ছেলে মেয়েদেরকে মানুষ করেতে যেয়ে অনেক কঠিন হতে হয়েছে। ব্যক্তি তমশা এত কঠিন স্বভাবের ছিল না। বাস্তবতা ওঁকে কঠিন করেছে। রিপন যখন ছেড়ে গেলো তখন তমালের বয়স পাঁচ আর তানি মাত্র দুই। কঠিন না হলে সিনঙ্গেল মায়ের পক্ষে জীবন চালানো সম্ভব হতো না। রিপনের সাথে সংসারের শুরুটা মধুরই ছিল। বিয়ের বেশ 'বছর পর যখন তমশা চাকরির সোপান গুলো মসৃন ভাবে অতিক্রম করছিল তখন থেকে গোলযোগটা শুরু,তবে শুরু আর শেষের ব্যবধান খুব কম। দ্রুত অতি দ্রুত বদলে গেলো রিপন এবং রিপনের ভালোবাসার মন্ত্রমুগ্ধতা। মেয়েদের স্বাধীনতায় অবিশ্বাসী ছিল না প্রেমের সময়গুলোতে। পরে তমশার মনে হয়েছে প্রেমের সময়টাতে মেয়েদের স্বাধীনতার পক্ষে থাকার সুবিধা বেশি। রিপনের সুবিধাবাদীতার ভুরি ভুরি উদাহরণ দাড্ করাতে একটুও কষ্ট হবে না তমশার। তবুও উকিলের সামনে শুধু এটুকুই বলেছে - এক ছাদের নিচে বিছানা ভাগাভাগি করে চলা আর সম্ভব নয়। তমশার এগিয়ে যাওয়ার বিরোধিতাই ছিল সম্পর্কের চিঁড ধরানোর মূল কারন। যদিও কখনই রিপন স্বীকার করেনি তমশার চাকরিতে ওর সমস্যা। রিপনের কথা হলো চাকরির সুবাদে পুরুষের সাথে বেপরোয়া মেলামেশায়। আজ পর্যায় এসেও খুব হাসি পায় তমশার,যদি সমস্যা নাই থাকত তা হলে ছাডাছাডির ছয় মাসের মধ্যে একজন অল্প বয়সি মেয়েকে ঘরের বৌ করে তুলতে তোমার রুচিতে বাঁধল না ? সে মেয়ে সত্যিকার অর্থে শুধুই ঘরের বৌ। রিপন একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ তোমার বৌ হোক এটা তুমি কখনই চাইতে না। তোমার ইচ্ছে মতো চলবে,হাসবে,খেলবে। তোমার কথা শুনবে এরকম একটা মেয়ে মানুষকে তোমার বৌ রূপে তুমি চেয়েছিলে। তবে আমার সাথে সম্পর্কে কেন জড়ালে  ? আসলে তোমার মানষিক বৃদ্ধি কখনই গডপডতার উপরে ছিল না। 

 

     তমশা আর মাথা সোঁজা করে রাখতে পারছে না। সব কিছু ঝাপসা লাগছে। হাত পা অবস হয়ে আসছে,খুব দুর্বল লাগছে। সারা শরির জুড়ে কি যেন বয়ে যাচ্ছে। কি হল আমার ? অনেক কষ্টে সময় দেখল রাত দেড়টা। আমার যে খারাপ লাগছে কাউকে বলা দরকার,এতো রাতে কার ঘুম নষ্ট করব? মোবাইলটা হাতে নিল, বড আপা আর মেঝ ভাই ঢাকায় থাকেন,একজন উত্তরা অন্যজন মিরপুর। আর সব ভাই বোন তো বিদেশে পাডি জমিয়েছে। এতো রাতে উনাদের ঘুম ভাঙাবো? হয়তো তেমন কিছু না। কষ্ট করে এতো দুর কলাবাগান আসতে হবে। তাছাড়া ড্রাইভার ডাকাডাকি করে না পেলে শুধু শুধু টেনশন বাড়বে আর কিছু না। তার চাইতে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীকে ডাকব ? নাকি আর একটু দেখব। খাটের পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কতকটুকু পানি খেলো। একটু মনে হয় ভালো লাগছে ! দেখি আরেকটু। 

 

    রিপনের সাথে সম্পর্ক শেষ হবার পর ভয় ছিল মনে,যদি ছেলেমেয়ে দুটোকে তমশার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। পারবে বুকের মানিক দুটোকে ছেড়ে থাকতে? না,কখনই বাচ্চাদুটোকে ছাড়বে না,কিছুতেই ছাড়বে না। যত রকম আইনী লড়াই আছে করবে তবুও ছাড়বে না। না,লড়াই যুদ্ধ কিছুই করতে হয়নি,রিপন বাচ্চাদের দ্বায়িত নিতে চায়নি। শুধু কিছু অর্থ দিয়ে দায় মুক্ত হতে চেয়েছিল। ফিরিয়ে দিয়েছে তমশা একটা ফুটো কডিও নেয়নি। নিজে খেয়ে না খেয়ে বাচ্চাদের বড করেছে। বাচ্চাদের বড করতে করতে হঠাৎ ভয় ঘিরে ধরে,তবে এবার ভয়ের কারন রিপন নয়,নিজের আত্মজকে নিয়ে ভয়। তমশার পরিচিত একজন সিনঙ্গেল মায়ের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা  তমশাকে ভাবিয়ে তোলে। একা  মা অনেক কষ্ট করে তার  দুই ছেলেকে বড করে তুলছিল। ছেলে দুটোর কাছে আমেরিকা প্রবাসী বাবার ইমিগ্রেশনের টোপ,ত্যাগী মায়ের ভালোবাসার চাইতে বেশি দামি মনে হয়েছিল।  ছেলে দুটো এখন মায়ের সাথে সম্পর্ক শেষ করে আমেরিকায় বাবার কাছে চলে গেছে। মা তাকে ছেড়ে যেতে না করেছিল,এই তার অপরাধ। মা কেঁদে কেটে বুক ভাসায়,দেখার কেউ নেই। এদিক দিয়ে তমশা নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করে, তমাল, তানি মাকে ভালো বুঝতে পারে। মায়ের কষ্টের জায়গা গুলো ওদের অপরিচিত নয়। এটুকুতেই তমশার স্বস্তি। আরও খারাপ কিছুও তো হতে পারত। তমশার ছেলে মেয়েরা মায়ের খোঁজ খবর রাখে। প্রতিদিন ওরা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ঘুমানোর আগে মায়ের সাথে কথা বলে। তমশাও সকাল দশটার মধ্যে ছুটা বুয়া বিদায় করে ওদের ফোনের অপেক্ষার থাকে। কথা হয়,কখনও কখনও ভিডিও অন করে নাতি নাতনিদেরকে দেখায়। তমাল তানি ছুটি ছাটা পেলে দেশে আসে মাকে দেখতে,তাই বা কম কি। 

 

     তমশা তো ভালোই ছিল,হঠাৎ কি যে হল আজ বুকে কেমন চাপ অনুভব করছে,গ্যাস হলো কি ! পেটে গ্যাস হবার মতো আজ কি খেয়েছে ? কিছুতেই মনে করতে পারছে না, হ্যা মনে পড়েছে,দুপুরে ডাল ভাতের সাথে জলপাইয়ের আচার খেয়েছিল। একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখবে,ভাবছে তমশা। অসুধের ব্যাগটা কাছে নিল,একটা আ্যন্টাসিড খেয়ে দেখি,ভালো লাগতে পারে। 

 

    তমাল তানি কতবার বলেছে ওদের কাছে কানাডায় যেয়ে থাকতে। এমনকি তমাল কয়েকবার তমশাকে নিতেও এসেছিল,তমশা যেতে রাজি হয়নি,তমালকে একাই ফিরে যেতে হয়েছে। কেন যেন দেশ ছেড়ে যেতে একটুও ইচ্ছে করে না। ছেলে মেয়ে দুটো এতো চাইছে তবুও তমশার মন সায় দেয়নি। আসলে এই বয়সে এসে নিজের গন্ডি ছেড়ে নিজের পরিবেশ ছেড়ে যেতে পারেনি। তমশা জানে ওর মধ্যে  কিছু কিছু একগুয়েমি আছে,কিছুটা একরোখা ভাবও আছে। মেঝ চাচার কথাটা কানে বাজে এখনও 

     '  তমশা জিদ করিস না,এতো একরোখা মেয়ে আমি আর দেখিনি,ফিরে যা স্বামীর কাছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এমন হয়েই থাকে,রাগের মাথায় জামাই বাবাজী....' 

    বাবাহীন সংসারে মেঝ চাচার তত্বাবধানে থাকলেও তার কথা মতো আর ফিরে যায়নি রিপনের সংসারে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে নিজের ভেতর বাইরে গুছিয়ে নিয়ে আলাদা থাকা শুরু করেছে ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে। তমশার খুব জানতে ইচ্ছে করে,রিপন তুমি আমার নামে মিথ্যে অপবাদ কেন দিলে? তুমি ভালো করেই জানতে আমি কোন সম্পর্কে জড়াই নাই,জড়ালে তো তাকে নিয়েই সংসার করতাম। তুমি সত্য কথাটা কেন বলো নাই? তোমার চেয়ে আমার এগিয়ে যাওয়াটা তোমার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। রিপনের চেয়ে  তমশার চাকরিটা ভালো ছিল,এটা কিছুতেই মানতে পারছিল না রিপন। যদিও দুজনে সহপাঠী ছিল। নিজ যোগ্যতায় চাকরিটা পেয়েছিলো তমশা। প্রথম দিকে প্রতিদিন কথা কাটাকাটি,বিষয়টা ছিল তমশার চাকরি। কথা কাটাকাটি ঝগড়ায় রূপ নিতে বেশি সময় লাগেনি। তারই এক পর্যায় রিপনের হাত উঠে এলো তমশার গায়ে,এরপর আর এক মুহূর্ত্য দেরি করে নি। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চলে এসেছিল মায়ের কাছে। 

 

      আর মাথাটাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঘাড়ের পেছনে শির শির করছে। বুকের বা পাশের ব্যাথাটা বুক জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দম নিতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন? বাতাসে কি অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছে? আমি কেন অক্সিজেন টানতে পারছি না। আমার কি হল? তবে কি আমি মরে যাচ্ছি? আমার আয়ু শেষ হয়ে আসছে? শেষ নিশ্বাসটা শুধু বাকি? তমশার মাথাটা কাত হয়ে পরে গেলো বিছানায়,মুখটা খানিক বিস্ফারিত হয়ে আছে, বাতাসের অক্সিজেন টেনে নেবার ব্যাকুলতায়। একটা হাত বিছানা থেকে ঝুলে পড়েছে। অন্য হাতটা মুঠোবন্ধ। 

দেখে মনে হচ্ছে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। 

 

    জীবন আর  মৃত্যুর বসবাস,এতো কাছাকাছি! কয়েকটা মুহূর্ত্য মাত্র,একটা মানুষ ইহলৌকিক জগত থেকে অন্য আরেক জগতে প্রবেশ করল। যে জগত থেকে আর ফিরে আসা যায় না। তার সব,সব কাছের মানুষ গুলো,প্রিয় জিনিস গুলো যেমনিভাবে ছিল তেমনি পরে রইল। রাত কতো হবে! তিনটা সারে তিনটা। নিসার দেহ পড়ে আছে বিছানায়,পাসে ল্যাপটপ খোলা পড়ে রযেছে। ফেসবুকের পাতায় সদ্য ভুমিষ্ঠ কবিতাটা যেন খল বল করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাশে জন্মদাত্রী জন্ম দানের বেদনায় নীল হয়ে পড়ে আছে। 

 

    চারিদিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে,কয়েকটা মাছি তমশার মুখে এবং শরিরের খোলা অংশে এসে বসছে এবং উড়ছে। নিস্তব্ধ,নিঝুম,নিরব চারপাশ,খানিক পর পর  ব্লুপ ব্লুপ শব্দে ফেসবুকের  পাতায় কবিতাটিতে ক্রমাগত লাইক আর কমেন্টস পড়ছে। 

 

অদৃশ্য কাঠগড়ায়
দাঁড়ানো মানুষটি

জাকির তালুকদার

 

তার দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দিতে জমায়েত হওয়া মানুষের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। কিন্তু দেখছিল না কিছুই। সে দেখছিল কেবল নিজের ভেতরের মানুষকে। একনাগাড়ে কথা বলছিল নিজের সঙ্গেই- আমি তো কখনো প্রেমিকাদের ছাড়া অন্য কোনো নারীকে স্পর্শ করিনি! কোনো নারীকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার শরীর ও অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করিনি। যখন কাউকে আর ভালোবাসতে পারছিলাম না তখন তো ভালোবাসার অভিনয় চালিয়ে যাইনি। তাকে অপদস্থকারীর দল চিৎকার করে গালি দিচ্ছিল- তুমি নারী নির্যাতনকারী! তোমার বিচার হবে।  নারী নির্যাতনকারী! এমন অভিযোগ তার নামে কীভাবে উত্থাপন করে লোকে? সে কাউকে মানসিক নির্যাতনও করতে চায়নি কখনো- শারীরিক নির্যাতন তো দূরের কথা। কোনো মেয়ে যে মুহূর্তে খুব দুর্বলভাবে হলেও ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে সে ওই শব্দটিকে মর্যাদা দিয়েছে। সে একবার সামনের লোকজনকে উদ্দেশ করে বলতে চায়- তোমরা কি কোনো নারীর কাছে, কোনো যুবতীর কাছে আমার এই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে চাও? কোনো যুবতী যদি এমন ঘটনার পক্ষে আমার হয়ে সাক্ষ্য দিতে চায় তাহলে সেটি কি তোমরা বিশ্বাস করবে?


বলতে ইচ্ছা করলেও সে কিছুই বলে না। কারণ জানে যে, সামনের জমায়েতের কেউ কোনো যুবতীর মুখ থেকে অভিযুক্তের পক্ষে এমন বয়ান শুনলেও তা বিশ্বাস করবে না। কেননা তারা নিজেরা কোনোদিনও তার পরিস্থিতিতে মৃদু ‘না’ শব্দটিকে এতোটা গুরুত্ব দিতে পারবে না। তবে সে নিজে এই পরিস্থিতিতেও চার বছর আগেকার ঘটনাটি চোখের সামনে দেখতে পেতে থাকে।

মেয়েটির নাম তো সে কখনোই উচ্চারণ করবে না। নিজের কাছেও নয়। আগে থেকেই সময় ঠিক করা ছিল। সে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিল। মেয়েটাও ইউনিভার্সিটি থেকে। মেয়েটি বলেছিল, আজ আমি আমার দেবতাকে আমার পূজার নৈবেদ্য নিবেদন করবো! উত্তরে সে বলেছিল, আমি দেবতা নই অথবা ভুল দেবতা। নৈবেদ্য উৎসর্গের পর তোমার অনুশোচনা হতে পারে। মেয়েটি বলেছিল, মানুষ চিনতে ভুল হতে পারে। কিন্তু দেবতা চিনতে ভুল হয় না। তুমি আমাকে গ্রহণ করো! আমাকে ধন্য করো! আমাকে পূর্ণ করো! তারপর পাপড়ির মতো মেলে দিতে শুরু করেছিল নিজেকে। ওই সাদামাটা সাবলেট রুমটা তখন প্রতিমুহূর্তে পরিণত হয়ে হচ্ছিল প্রেমমন্দিরে। পূজারিণী একবার হচ্ছিল বনলতা সেন, একবার হচ্ছিল হেলেন। সে কাক্সিক্ষত পুরুষের সামনে একের পর এক উন্মোচন করে চলেছিল বাৎসায়নের শৃঙ্গার অধ্যায়।

মিলন অধ্যায়ে প্রবেশের আগে সে যুবতীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মিথুন মুদ্রা- কোনটি তোমার ভালো লাগবে? তোমার যা যা ভালো লাগবে, আমারও তা-ই চাই। সব চাই! সব রকম চাই! তুমি তো অভিজ্ঞ দেবতা। আমাকে বাজাও!
তাদের পৌরুষ আর নারীত্ব আবৃত করে তখন জলপাইয়ের পাতাও ছিল না। তাদের শরীরের ভেতরে ও বাইরে তখন লাভা স্রোত। তারা অপেক্ষমাণ শয্যায় চলে গিয়েছিল। মেয়েটি শৃঙ্গারে সিক্ত হতে হতে বার বার বলছিল, আরো! আরো!
সেও তখন চূড়ান্তযাত্রার জন্য প্রস্তুত। মেয়েটির হাতের মধ্যে তার উত্থিত পৌরুষ। নিচে আর ওপরে দুই শরীর এক হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময়ে মেয়েটি বলে উঠলো, না! প্রথমে সে এই ‘না’ শব্দটির তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারেনি। তাই জিজ্ঞাসা করেছিল, কী ‘না’? আর দেরি করা যাবে না? এখনই প্রবেশ করবো? মেয়েটি খুব মৃদুস্বরে বলেছিল, আমার খুব ভয় করছে। না করলে হয় না গো? আজ না করলে হয় না? এখন না করলে হয় না?
সে তৎক্ষণাৎ নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল মেয়েটির ওপর থেকে। বলেছিল, অবশ্যই।


তারপর পরম যতেœ মেয়েটিকে শয্যা থেকে উঠে বসতে সাহায্য করেছিল। মেঝেতে স্তূপাকার বস্ত্রখ-গুলো এগিয়ে দিয়ে বলেছিলম তোমার কাপড় পরে নাও। মেয়েটির তখন কাপড় পরতেও যেন দ্বিধা। কী করবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু তার তখন কোনো দ্বিধা ছিল না। কারণ ‘না’ শব্দটি সে পরিপূর্ণভাবে শুনতে পেয়েছিল।  মেয়েটি রিকশায় উঠে রওনা হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেলফোনে পাঠিয়েছিল আর্তধ্বনি- এতোটা ভালো হতে তোমাকে কে বলেছিল! ভালো! না তো! সে তো ভালো হওয়ার জন্য নিজেকে সংবরণ করেনি। কেন করেছে তা যুবতী বোধহয় বুঝতে পারবে না। অন্য ক’জনই বা বুঝবে! তার বিচার করতে আসা এই জমায়েতেরও কেউ বুঝবে না। কারণ তাদের আছে কেবল তার প্রতি জিঘাংসা। তাকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারলে তারা নিজেদের চোখে নিজেরাই ‘হিরো’ হয়ে উঠতে পারবে। সেটিই হবে তাদের কুয়ো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 
জমায়েত তাকে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি নারী নির্যাতনকারী! এ কথা স্বীকার করলে আমরা তোমার শাস্তির মাত্রা কমিয়ে দেবো। সে তাদের দিকে করুণার চোখে তাকায়। তারা তো আর জানে না যে, সে নিজেকে আত্মসমালোচনার জগতে সমর্পণ করে রেখেছে অনেক সময় আগে থেকে। জীবনের সব নারীসঙ্গ স্মৃতি আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে দেখছে নিজের অজান্তেও কোনো নারীকে কোনো ধরনের নির্যাতন করেছে কি না। জমায়েত দাবি করছে, এক যুবতী তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে। ৩০ বছর যার বয়স সে তো যুবতীই বটে। যুবতীকে তুমি চেনো? ব্যারিস্টারি ধরনের প্রশ্ন। চিনবো না কেন! খুব ভালো করে চিনি। তার ওপর তুমি নির্যাতন চালাচ্ছ!
এ যে দেখছি একেবারে রায় দিয়ে দিচ্ছে! অবশ্য রায় দেয়ার এখতিয়ার লোকটার আছে কি না তা নিয়েও ভাবে না সে। তার মন-মস্তিষ্ক দখল করে আছে ‘নারী নির্যাতন’ শব্দটি।  যে কি না কোনোদিন স্নেহ দেখানোর ছলেও কোনো মেয়েকে স্পর্শ করার সুযোগ নেয়নি সে করেছে নারী নির্যাতন! কোথাও কি একটা বড়সড় ভুল থেকে গেছে তার জীবনের কোনো বাঁকে?


শ্যালিকাদের সঙ্গে মানুষ ঠারে-ঠোরে ইঙ্গিতময় ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে। নাক টেপে, গাল টেপে, সুযোগমতো বেশি কিছুও। সমাজ ও পরিবারে সেগুলোকে সহাস্য বৈধতা দেয়া আছে। কিন্তু সে তো তেমন কিছুও কোনোদিন করেনি!
আবার সন্তও সে নয়। নিজেকে আসলে কোনোদিন ওইভাবে ভাবাই হয়নি।  তার বিচারের আয়োজন করা যুবতীর কথা ভাবে সে।  মেয়েটি তাকে বলেছিল, আমাদের পরিবার এই ছোট্ট শহরে খুব ঘৃণিত। আমাদের পুরুষরা সবাই মদ্যপ, লম্পট ও অকর্মণ্য। তাই আমাদের বাড়ির মেয়েদের বাধ্য হয়ে নিজের জন্য এবং পরিবারের জন্য অনেক কিছুই করতে হয়। নিজের গতি নিজেরই করতে হয়। তাদের সবারই জীবন প্রশ্নবিদ্ধ, কণ্টকিত এবং মহল্লায় মুখরোচক আলোচনার খোরাক। আমি ওই পথে যেতে চাই না। আমাকে সাহায্য করুন। সরাসরি এভাবে কথা বলাটা ভালো লেগেছিল তার। তবে কারো জন্য কিছু করার মতো ক্ষমতাশালী ও ধনাঢ্যও সে নয়। তবু করতে পেরেছিল। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার পদে নিয়োগ পেতেও লাখ লাখ টাকা লাগে। তবু সে বিনা পয়সায় সেটি করে দিতে পেরেছিল।  তারপর যুবতী এসেছিল ঋণ শোধ নয়, ঋণ স্বীকার করতে। তেমন লোভ জাগানিয়া শরীর-সৌন্দর্য নয়। তবু শরীর ছাড়া মেয়েটির দেয়ার যে আর কিছুই নেই! সে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, আমি বেশ্যাগমন করি না। করিনি কখনো।

মেয়েটির চোখে পানি- আমাকে বেশ্যা বললেন! না। তোমাকে বেশ্যা বলিনি। তবে নিজেকে বেশ্যাগামী বলার কথা বলেছি। কোনো কিছুর বিনিময়ে নারীর শরীর ভোগ করা মানেই তো আমার বেশ্যাগমন করা। যুবতী প্রথমে বুঝতে পারেনি এ কথার অর্থ। খুব কমজনেই পারে।  সে তখন খোলাসা করে বলেছিল, আমার কাছে টাকা-উপহারের বিনিময়ে কোনো নারীদেহ ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা।  অধীনস্থ কোনো নারীকে মুখে পদ-পদবি-প্রমোশন-অফিসে বাড়তি সুবিধার কথা না বলেও ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা।  সামাজিক নিরাপত্তা বা অন্য কোনো সুরক্ষাদানের বিনিময়ে কৃতজ্ঞতার শরীর গ্রহণ মানে বেশ্যাগমন করা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর দেয়ার কথা বলে কোনো ছাত্রীর সঙ্গে যৌনতা মানে বেশ্যাগমন করা।  কারো মুগ্ধতার সুযোগ নিয়ে তাকে ভোগ করা মানে বেশ্যাগমন করা। সোজা কথা প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া যে কোনো নারীর সঙ্গে শোয়া মানে বেশ্যাগমন করা। সে তো কোনোদিন এই ধরনের কিছু করেনি। অথচ তাকে তারা নারী নির্যাতক বলছে কেন? সে তখন চরম বিভ্রান্ত। জমায়েত তার দিকে আঙুল তুলেছে যে মেয়েটির করা অভিযোগে- সে তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, আমি কি তোমার ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন চালিয়েছি?  মেয়েটি চোখ নামিয়ে নেয়।  সে কণ্ঠস্বর তীব্র ও তীক্ষè করে মেয়েটিকে বলে, তুমি নিজে শুধু একবার বলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো। নইলে আমিই তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবো।
মেয়েটি কোনো কথা বলে না, বরং হঠাৎ করেই জমায়েত থেকে সরে যেতে থাকে। পেছন ফিরে হাঁটতে থাকে। জমায়েত তখন ভগ্ন উৎসাহ। তবু ব্যারিস্টার হাল ছাড়তে চায় না। বলে, আমি তোমাকে দেখে নেবো!  সে নির্বিকার।
 
জমায়েত ভেঙে যায়।  তার এখন নির্ভার লাগার কথা। কিন্তু তা ঘটে না। নিজেকে নির্দোষ জেনে আত্মপ্রসাদ লাভ করার কথা। কিন্তু কোনো স্বস্তির অনুভূতি আসে না।  সে বরং নিজের অতীত তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। কোথাও কি রয়ে গেছে তার দ্বারা নারী নির্যাতনের কোনো ঘটনা কিংবা গোপন কোনো ইচ্ছা? বাইরের কোলাহল থেমে গেছে। তাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে আসা লোকজন ফিরে গেছে বিফল মনোরথ হয়ে। কিন্তু সে নিজের কাছে নিজের উত্তর খুঁজতেই থাকবে।
তার সামনে অপেক্ষা করছে অনেক প্রহরের আত্মনিগ্রহ।

লেখকের স্বাধীনতাই
তার লেখকসত্তা

হাসান আজিজুল হক

 

১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয়ে যায় তখন আমার বয়স বেশ কম। অনেকের ধারণা, আমি ওই বাংলা থেকে এই বাংলা এসেছি নিশ্চয় কোনো চাপের মুখে। কথাটি একেবারেই ঠিক নয়। আমি কোনো চাপের সম্মুখীন হইনি।
গ্রাম থেকেই স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন দিয়েছি ১৯৫৪ সালে। তখন আর ম্যাট্রিকুলেশন বলা হতো না। ১৯৫৪ সাল থেকেই পরীক্ষার নাম হয়ে ছিল স্কুল ফাইনাল। সচ্ছল হলেও আমাদের গ্রামের একটা খ্যাতি ছিল। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কাশিমবাজারের মহরাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী। আমাদের গ্রাম ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। গরিব ঘরের মেয়ে কাশীশ্বরী দেবীকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ওই যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে পাস করেছি। চাপের মুখেই যদি দেশ ছাড়তাম তাহলে ১৯৪৭ সালেই ছাড়তাম। তা না করে আমি সাত বছর ওই পশ্চিমবঙ্গেই ছিলাম। এ থেকে একটা কথা স্পষ্ট, সাম্প্রদায়িকতা নগ্ন চেহারা আমার আশপাশে দেখিনি। সব জায়গাতেই সাম্প্রদায়িকতা শুরু করে চিহ্নিত কতিপয় সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। তারা কখনো স্বার্থ, কখনো হিং¯্রতা থেকে কাজটি করে। এটি এই বাংলাতে দেখেছি, ওপার বাংলাতেও দেখেছি।

১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একদিনেই কয়েক লাখ লোক মারা গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একেবারে পশ্চিম সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় আমরা ওই দাঙ্গার বিষয়টি তেমন টের পাইনি। নির্বিঘেœই ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করেছি। যাহোক, স্কুল ফাইনাল এক্সামিনেশন পাস করার পর হয়তো ওখানেই অর্থাৎ বর্ধমানে রাজ কলেজে ভর্তি হতাম। কিন্তু পাস করার পর বিশেষ কারণে এ দেশে এসেছিলাম। বিশেষ কারণ বলতে, আমার ভগ্নিপতি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজে এবং তারপর কিছুদিনের মধ্যেই দৌলতপুর বিএল

(ব্রজলাল) কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত হন। আমার একমাত্র বড় বোন ও ভগ্নিপতির ইচ্ছা হলো, আমি যেন বিএল কলেজেই ভর্তি হই। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। আমি খুলনার দৌলতপুর এসে বিএল কলেজে ভর্তি হয়ে যাই, থাকি বোনের বাড়িতে। কলেজ জীবনে বহু স্মৃতি আছে। কতো স্মৃতির কথা আর বলবো! তখন থেকেই আমার লেখালিখি শুরু। এক বন্ধু জোটানো গেল। ওই বন্ধুর চার আনা আর অনেক কষ্টে জোগাড় করা আমার চার আনাÑ এই আট আনা দিয়ে আমরা কাগজ-কালি কিনতাম। ওই সময়টা দেয়াল পত্রিকার খুব চল ছিল। দেয়ালের গায়ে হাতে লেখা পত্রিকা, গল্প, কবিতা বোর্ডের মতো করে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। সেখানে পাঠকরা পড়ে পাশে মন্তব্য লিখে যেতেন।
পত্রিকা এক সপ্তাহ পর পর পরিবর্তন করা হতো। আমি আর আমার বন্ধু বিমল মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। একটু একটু গল্প লিখতাম, কোথাও থেকে কবিতা জোগাড় করতাম। এই মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। ওই দেয়াল পত্রিকা থেকেই আমার সাহিত্যকর্ম শুরু। ওখানে দেখেছিলাম, আমাদের প্রিন্সিপাল এএফ ফজলুর রহমান লিখেছিলেন, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই ক্লাস টুডে’। তখন এক ছেলে এসে ক্লাসের ‘সি’টা মুছে দেয়। এর মানে দাঁড়ায় ‘ল্যাস’, মানে বালিকাদের। খুবই  খারাপ কথা।  যখন প্রিন্সিপাল এসে দেখলেন ছাত্ররা মজা করেছে তখন তিনি ‘এল’টাও মুছে দিলেন। তখন মানেটা দাঁড়ালো, ‘আই শ্যাল নট টেক মাই অ্যাস টুডে’। ফলে ছাত্ররা সব গাধা হয়ে গেল। এমন অনেক মজার মজার স্মৃতি রয়েছে। কলেজ ছাত্ররা রাজনীতি করতো দেশের প্রয়োজনেই। কোনো পিটাপিটি-মারামারি, ভাগ বসানোÑ এসবের ব্যাপার ছিল না। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কেউ রাজনীতি করতো না। সম্পূর্ণ আদর্শভিত্তিক রাজনীতি। আমিও এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের সম্ভবত

দ্বিতীয় কমিটিরই সক্রিয় সদস্য ছিলাম। এরপরই গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করা লাজুক ছেলেটি অল্প সময়ের মধ্যে যথেষ্ট রকমের কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। আমাদের কাছে তখন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রধান নেতা ছিলেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতাম, পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণভাবে শোষণ করার জন্যই ডিভিশনটি ওয়েলকাম করেছিল। তারা তখন মনে করেছিল, এটি হলে আর কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। কলকাতা আর পূর্ব বাংলা একসঙ্গে থাকলে সেখানে অনেক অসুবিধা। তখন আমাদের সাহিত্য তো তেমন হয়ে ওঠেনি। যে ক’জন বড় বড় লেখক ছিলেন তারা কলকাতাতেই চাকরি করতেন। আহসান হাবীব, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ও সরদার জয়েন উদ্দীন। তাদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ দেশ-বিদেশ  ঘুরে বেড়াতেন। সরদার জয়েন উদ্দীনও কলকাতাতেই চাকরি করতেন। তখন একমাত্র আবু ইসহাককেই আমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলতাম। তার ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ উপন্যাসটিই আমরা গৌরবের বলে মাথায় রাখতাম। আমার ওপার বাংলার সাহিত্য নিয়ে বেশি পড়াশোনার কারণ ছিল, সেখানেই আমার প্রথম শিক্ষা জীবন পার করেছি। স্কুলের লাইব্রেরি ছিল। সেখানেই প্রচুর পড়াশোনা হয়ে গেছে। শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র পড়া হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ প্রমুখ ওখানেই শেষ করি।
১৯৫৭ সালে একটি উপন্যাস ‘শামুক’ লিখেছিলাম। সেটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় দিয়েছিলাম। তা এতোকাল চাপা পড়ে ছিল। এখানে খুব বই সংগ্রাহক খোন্দকার সিরাজুল হক একদিন আমাকে দেখান, আমি যে উপন্যাসটি জমা দিয়েছিলাম সেটি তার কাছে আছে। ব্যস, ওই শুরু। তিনি আমার পেছনে লেগে গেলেন বই আকারে প্রকাশ করার জন্য। অবশেষে ২০১৫ সালের বই মেলায় তা প্রকাশ করা  হয়। বইটি বের করে কথা প্রকাশনী।
১৯৫৭ সালে লেখালেখিটা একটু করে চলছিল। ১৯৫৮ সালে যখন বাধ্যতামূলক টিসি নিয়ে আসি তখন আমার অসম্ভব দৈন্যদশা। বাবা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। আমার বড় ভাই খুব ছোট চাকরি করেও দশটি করে টাকা ও অনার্সের একটি করে বই পাঠাতেন। তখন অধ্যাপক আবদুল হাই আমাকে খুব ¯েœহ করে রাজশাহী কলেজের নিরিবিলি একটা সার্ভেন্ট কোয়ার্টার দিলেন। একই সঙ্গে সব সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন।


আত্মীয়স্বজন কেউ নেই, বড় ভাইও ঢাকায় থাকেন। তখন একা আমি। অনেক লড়াই করেছি। কিন্তু কখনো ভয়ে ভীত হইনি। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি।  যারা সবচেয়ে অগ্রসর তাদের সঙ্গেই থেকেছি। প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে ভয়ও পাইনি। আমার কাছে পঞ্চাশের দশকের স্মৃতিটা এক অর্থে বলতে হলে মানুষের পেশিশক্তি পাকিয়ে ওঠার মতো। আমার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনচিন্তার বিকাশ ঘটছে। এর প্রভাব আমার পরবর্তী সাহিত্য জীবনে এসে পড়েছে। তাই আমার সাহিত্যকর্মে যতো মর্মান্তিক বিষয়ই থাকুক না, কখনো কোনো ভেজা চোখ দেখা যাবে না, কখনো কোনো দুর্বলতার প্রশ্রয় পাওয়া যাবে না, রোমান্টিক ভাবালুতা মিলবে না।
১৯৬০ সালের মার্চে রাজশাহী শহরের মিয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে কাঠের তকতায় বুকে তুলার বালিশ দিয়ে ‘শকুন’ গল্পটি লেখা হয়েছিল। ১৯৬০ সালে ‘শকুন’ লেখার পরই মোটামুটি ঠিক করি, লেখালেখিটাই আমার মুখ্য। এখানেই থাকবো। এর পাশাপাশি অধ্যাপনা করবো। কারণ সেখানে আমার স্বাধীনতা কেউ হরণ করতে পারবে না। অন্য কোনো পেশায় তা সম্ভব নয়। তাই সিএসএস পরীক্ষা দেয়া বা অন্য কোনো বড় চাকরির ব্যাপারে চেষ্টাই করিনি, একদম করিনি। শিক্ষকতাই করবো বলে স্থির করি এবং তা-ই করেছি। লেখালেখির জীবনটা বেছে নিয়ে এর মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছি।

বর্ষা রানীর ঈদ

 

 



পৃথিবীজুড়ে সৃষ্টির উৎসব বৃষ্টিতেই। আর এই বৃষ্টি বর্ষার কন্যা। বর্ষা রানীর সব উপাদান দিয়েই সাজানো আমাদের এই জগৎ। কী জমিনে, কী অন্তরীক্ষে রানীর আগমনে বদলে যায় সব, নদী-খাল-বিল ফিরে পায় যৌবন। মেঘবতী আকাশ জলে টইটুম্বুর।

‘কেমন বৃষ্টি ঝরেÑ মধুর বৃষ্টি ঝরেÑ ঘাসে যে বৃষ্টি ঝরেÑ রোদে যে বৃষ্টি ঝরে আজ/কেমন সবুজ পাতাÑ জামীর সবুজ আরোÑ ঘাস যে হাসির মতোÑ রোদ যে সোনার মতো হাসে/Ñ কবি জীবনান্দ দাশের এই পঙ্ক্তিতে যথার্থই প্রকাশ পেয়েছে ঋতু রানী বর্ষা। মেঘ যেন সেজেই বসে থাকে, ইচ্ছা হলেই নামবে যখন-তখন।

গ্রীষ্মের তাপদাহে বিবর্ণ প্রকৃতির প্রাণ ভিজিয়ে দিতেই বর্ষার আয়োজন। ঝরে অবিরাম বর্ষাধারা। থেমে থেমে মেঘ কল্লোলে নেচে ওঠে প্রাণ। উঠানে জলের নৃত্য। বাতাসে বাতাসে দুলে ওঠে শাপলা-পদ্মের ছন্দমধুর কাব্য। তবে এমন প্রকৃতির দৃশ্যপট কোথায় মিলবে এই শহরে? দিনভর কদম আর রাতজুড়ে মল্লিকার মাতাল সুবাস কে এনে দেবে আমাদের এই প্রিয় ইট-পাথরের জঙ্গলে! বর্ষার রূপ দেখতে হলে যেতে হবে আমাদের শিকড়ে, আমাদের গ্রামে। অবারিত খোলাপ্রান্তর, ঘন-কালো মেঘ, আকাশ যেখানে সেজে আছে দীর্ঘ পরিসরেÑ এমন বিমুগ্ধঘোর, গম্ভীর আবেদন, অন্তর অলিন্দে প্রেমানন্দে গেয়ে ওঠেÑ

‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়!/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝর ঝর/তপনহীন ঘন তমসায়।’

বর্ষার রূপ, রস, সুন্দরে বিমোহিত এই জনপদের কবি-শিল্পী তথা সৃজনশীল মানুষ। বর্ষার অবারিত জল-হাওয়ায় প্রলুব্ধ বাংলার ভাটিয়ালি সুর ও স্বরে প্রকৃতি কাঁদে এবং কাঁদায় বিরহীমন। মেঘের ডাক শুনে বুকের ভেতর গুমরে ওঠে প্রিয়জনকে পাশে না পাওয়ার আকুলতা। রাধারূপী সব প্রেমিকা আভিসারে ছুটতে চায় যেন। বরষার ঝরা জলে আছে এমন আর্তি-কীর্তি, আছে ভাঙন ও ডুবে যাওয়া সমতল সংসার। বর্ষা মানেই কেমন কেমন! বর্ষা মানেই এই মেঘ এই বৃষ্টি, রৌদ্র-ছায়ার আপসহীন লীলা যা অবশ্যই লোকনন্দন বিষয়।

বর্ষা বাংলা বর্ষের দ্বিতীয় ঋতু এবং এর স্থিতি আষাঢ় ও শ্রাবণ (মধ্য জুন থেকে মধ্য আগস্ট)Ñ এই দুই মাস। বর্ষাকাল প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ুপ্রবাহের ফল। মূলত অবিরাম বৃষ্টিতে স্ফীত হয় বর্ষার জলধারা। সবুজ লাবণ্যময় হয়ে ওঠে রূপসী বাংলা। বসন্ত আর বর্ষাÑ এই রাজা-রানী বাংলা ঋতু পার্বণ ও রূপ-লাবণ্যে বিপরীত সুন্দর।

পার্বণপ্রিয় বাঙালিদের মধ্যে বর্ষা ধর্মীয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে নানান আঙ্গিকে। আষাঢ়ের পূর্ণিমাতিথি গৌতম বুদ্ধের গৃহী জীবন ও বুদ্ধত্ব লাভের পর তার জীবনের বহুমাত্রিক স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল। এদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রকৃতি পূজার অংশ হিসেবে সর্প দেবী মনসা পূজার প্রচলন বোধহয় প্রচীনকাল থেকেই।
এছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জগন্নাথ পূজা ও রথযাত্রার মতো ধর্মীয় কার্যকরণ পালন করে থাকেন এ বর্ষা ঋতুতেই।

গত কয়েক বছরের মতো এবারেও চন্দ্র মাস হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশেষ উপাসনার মাস রমজান শুরু হয়েছে জ্যৈষ্ঠে। তাই বহু কাক্সিক্ষত ঈদুল ফিতর পালিত হবে এ আষাঢ়েই...। ঘনঘোর আষাঢ়ে মেঘের ফাঁক গলে শাওয়াল মাসের বাঁকা-ক্ষীণ চাঁদ দেখা গেলেই শুরু হবে ঈদের আড়ম্বর। ঘরে ঘরে বাঙালি মুসলমানরা দীর্ঘ সিয়াম পালন শেষে আত্মিক আনন্দে নিজদের বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত আরাধনার ঈদে। এই ঈদ ধনী-গরিব সবার। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এই মেলবন্ধন জগতে বিরল। ঈদুল ফিতর মুসলিম অর্থনীতিতে বেশ তাৎপর্য বহন করে জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে। ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক হক সম্পর্কে সজাগ করে তোলে প্রতিটি মুসলমানের অন্তর। চন্দ্র মাস হিসেবে বাংলার প্রতিটি ঋতুতে ঘুরে ঘুরে আসে এই ঈদ...। এবারের বৃষ্টিমগ্ন ঈদ হয়তো ভেজাবে আনন্দের শীতলতায়... জলাধারের স্ফটিক স্বচ্ছ জলে শাওয়ালের চাঁদে রঙিন ছায়ার-মায়ায় বাঙালি জনপদ হয়ে উঠুক সব মানুষের আনন্দলোক।

 

_____________________________________
আয়োজনে : স্বাক্ষর জামান ছবি : কৌশিক ইকবাল
পোশাক : সোহান করিম
মেকওভার    : মানামি ইলাহী
মডেল : সাদিয়া রায়হান
লেখা : শাকিল সারোয়ার

মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে

আলী যাকের

 

 


বয়স যখন বাড়ে, মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে তখন স্বভাবতই তারা পেছনের দিকে তাকান। অনেকে মানুষের এই অতি স্বাভাবিক আচরণের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অথচ এটিই মানুষের ধর্ম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কেন স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে অনেকে অনেক রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি নিজের মতো করে বিষয়টি নিয়ে ভাবার চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে আমারও একটি ব্যাখ্যা আছে। আমি মনে করি, মানুষ যখন দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে, বয়সের ভারে ন্যুজ্ব দেহ তখন সে অতীতের স্মৃতি থেকে, তার যৌবন থেকে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। এতে অন্যায়ের কিছু দেখি না। আমি মনে করি, এটিই স্বাভাবিক। এই যে পেছনে ফিরে তাকানো, এই যে স্মৃতির মেলা ভিড় করে আসা আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, এতে এমন অনেক কিছুই খুঁজে পাই স্মরণে যা থেকে আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অনেক দিকনির্দেশনা পেতে পারি। আমার মনে পড়ে, বেশ কিছুকাল আগে এই বিষয়ের ওপর ইংরেজি একটি কলাম লিখেছিলাম। এর শিরোনাম ছিল ‘ণবংঃবৎফধু, ড়হপব সড়ৎব!’ এ শিরোনামটি অনেক বছর আগের একটি ইংরেজি গান থেকে নেয়া। এ গানটি আমাদের তারুণ্যে আমরা গুন গুন করে গাইতাম। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ‘নস্টালজিয়া’। এর কোনো জুতসই বাংলা খুঁজে পাইনি। ‘স্মৃতিনির্ভরতা’ বোধহয় এর সবচেয়ে কাছাকাছি শব্দ। তবে গোল বাধিয়েছে ‘নির্ভরতা’ শব্দটি। নস্টালজিয়া বলতে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয় সেটিকে একটি বাক্যে আমরা বর্ণনা করতে পারি এভাবেÑ ‘স্মৃতি সততই সুখের’। এই সুখস্মৃতি সব বয়সের সব মানুষের জন্যই সমান আবেদন সৃষ্টি করে বলে আমার মনে হয়। আমার মনে আছে, আমি অত্যন্ত অপরিণত বয়স থেকে স্মৃতিস্পর্শ। আমার প্রিয় একটি নীল তোয়ালে ছিল। একবার মায়ের সঙ্গে কলকাতায় নানাবাড়ি যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে জানালা গলে ওই তোয়ালেটি বাতাসে উড়ে যায়। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে তোয়ালেটি খুঁজে নিয়ে আসি। ওই কাজটি করা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করেন মা। যা ছিল, এখন নেই এর প্রতি মানুষের আকর্ষণ সর্বদাই সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই বোধহয় চিন্তাশীল মানুষের কাছে স্মৃতি বিষয়টি এতো হৃদয়ের কাছাকাছি এসে যায়। এ রকম বেশকিছু স্মৃতি আছে অতীতের যা কখনোই ভুলে যাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরা যাক। আমাদের প্রজন্মের যারা ওই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে কিংবা এতে অংশগ্রহণ করেছে তাদের পক্ষে ওই সময়কার স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। এ রকম অনেক বিষয় আছে।


ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় বাল্যকালের দিনগুলো। আমি নিশ্চিত, প্রত্যেকেরই বাল্যকাল নিয়ে মধুর সব স্মৃতি রয়েছে। অনেক দুঃখজনক স্মৃতিও থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ দুঃখের কথা ভাবতে চায় না। ওই সুখস্মৃতিগুলো ধরে রাখে হৃদয়ে। আমার বাল্যকালের অধিকাংশ সময় কেটেছে খুলনা ও কুষ্টিয়ায়। থাকার জন্য খুলনায় বাবা একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর বাড়ি পেয়েছিলেন খুলনা পুলিশ লাইনসের ঠিক উল্টোদিকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, ওই বাল্যকালের পর অনেকবারই যেতে হয়েছে খুলনায়। ওই শহরে গিয়ে যে ঠিকানাতেই থাকি না কেন, রিকশা করে কিংবা হেঁটে একাধিকবার ওই বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি এবং প্রতিবারই যেন ফিরে গিয়েছি ওই বাল্যকালে। অনেক খ- স্মৃতি মনে এসেছে যেন কোনো নিñিদ্র অন্ধকার থেকে লাফিয়ে উঠে এসে উপস্থিত হয়েছে একেবারে দুই চোখের সামনে। ওই বাড়ির সামনেই পুলিশ লাইনস সংলগ্ন একটি গলি চলে গিয়েছিল ভেতর দিকে। ওই গলির মুখে একটা ছোট্ট মুদির দোকান ছিল। ওই দোকানে এক আনা পয়সা দিলে এক টুকরো গুড় পাওয়া যেতো। কোনো সময় মা আমার কোনো কাজে খুশি হয়ে যদি এক আনা পয়সা আমাকে বখশিশ দিতেন তাহলে দৌড়ে চলে যেতাম ওই দোকানেÑ এক টুকরো গুড় কিনতাম, খেতে খেতে চোখ বুজে আসতো। স্বর্গসুখ কাকে বলে ওই স্বাদ যেন পেতাম গুড়ের টুকরোর মধ্যে। অমন মিষ্টি আর জীবনে কখনো খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে আমার মিষ্টির প্রতি দুর্বলতার কথা। ইংরেজিতে যাকে বলে ঝবিবঃ ঞড়ড়ঃয তা-ই আমার ছিল বাল্যকাল থেকে। আরো পরে আমাদের দল যখন নাটক করতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে গেছে সেখানকার নাট্যবন্ধুদের প্রথমেই জিজ্ঞাসা করতাম, আচ্ছা, তোমাদের শহরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মিষ্টি কী? তারপর হৈ-হুল্লোড় করতে করতে সবাই মিষ্টি খাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়তাম


রাস্তায়। এখন অবশ্য মিষ্টি খাওয়ার কথা ভাবাও প্রায় পাপ। আমার রক্তে মিষ্টির আধিক্যে আজ মিষ্টিহীন জীবন যাপন করছি।
যাকগে সে কথা। ফিরে যাই খুলনার গুড়ের টুকরোয়। ওই মিষ্টি ছিল আমার খাওয়া শ্রেষ্ঠ মিষ্টি। খুলনায় আমরা অর্থাৎ আমি, আমার ছোট বোন ও পাশের বাড়ির নাজমা সারা দিন নানান দুষ্টুমি করতাম। সেটি মোরব্বা চুরি থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির কিচেন গার্ডেন থেকে গাজর-মুলা চুরি, পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে সাত চাড়া খেলা নিয়ে ফাইট, কিং কং খেলায় সহখেলোয়াড়দের পিঠে ভীষণ জোরে টেনিস বল ছুড়ে দেয়াÑ এসব। খুলনায় পুরনো একটা সার্কিট হাউস বিল্ডিং ছিল যশোর রোডের ধারে বিশাল মাঠের একপাশে। ওই সার্কিট হাউসের সামনে একটা অ্যারোপ্লেনের কঙ্কাল পড়ে ছিল। ওই প্লেন নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত হয়েছিল কাছে-পিঠে কোথাও। ব্রিটিশরা ওইখানে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আমরা যখন ওই প্লেনের কঙ্কাল আবিষ্কার করি তখনো এর হাড়গোড় সব ক্ষয়ে যায়নি। গদিহীন সিটের খাঁচা ছিল তখনো। এরই ওপর বসে প্লেন চালানোয় মগ্ন হতাম কতো বিকালে। মনে হতো সারা বিশ্ব যেন ঘুরে বেড়াচ্ছি প্লেনে চড়ে। ওই প্লেনের ফাঁকফোকর দিয়ে নানান বুনো লতাগুল্ম মাথা উঁচিয়ে তাকাতো আকাশের দিকে। মনে পড়ে, ওই লতাগুল্মের মধ্যে একটি ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল ফুটেছিল। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় ইটের পাঁজার মধ্য দিয়ে মাথা উঁচিয়ে ওঠা রক্তকরবী ফুল আবিষ্কার করেছিলেন। এই আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা আমাদের এক অসাধারণ নাটক দিয়েছে ওই ফুলের নামেই। আমার ওই গাঢ় ঝকঝকে হলুদ কচু ফুল দেখলেই তা খেতে ইচ্ছা করতো। ওই প্লেনের কঙ্কালের ভেতরে বসে খেলায় আমার নিত্যসঙ্গী ছিল আমার বোন ঝুনু। তার অনুপ্রেরণা ও আমার লোভের বশবর্তী হয়ে কচরমচর করে ওই ফুল খেয়েছিলাম একবার। মনে আছে, গলা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। লেবু, তেঁতুল ইত্যাদির সঙ্গে মায়ের হাতে মারও খেতে হয়েছিল প্রচুর। এই মারের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল কচু ফুলের কণ্ঠরোধ করা ওই বেদনা। মনে পড়ে, মা-বাবার সঙ্গে সরকারি লঞ্চে সুন্দরবনে গিয়েছিলাম একবার। বাবা পাকা শিকারি ছিলেন। তার ছিল একটি অত্যন্ত নামজাদা বিলেতি কোম্পানির তৈরি দোনলা বন্দুক। বাবা অনেক হরিণ শিকার করেছিলেন ওই যাত্রায়। হরিণ শিকার বোধহয় বৈধ ছিল তখন। মনে পড়ে, দারুণ উল্লসিত হয়েছিলাম আমরা সবাই। আজ যখন জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি পড়ি, ‘ক্যাম্পে শুয়ে, শুয়ে কোনো এক হরিণীর ডাক শুনি, কাহারে সে ডাকে!’Ñ হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। হরিণের জন্য প্রাণ কাঁদে। হরিণীর জন্য প্রাণ কাঁদে। জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ পেরিয়ে এসে অনেক অতীত ভাবনা অথবা কাজ নিয়ে গ্লানিবোধ হয়। এটিই বোধহয় নিয়ম।


বাবা কুষ্টিয়ায় এলেন এরপর। কুষ্টিয়ায় আমার বোধবুদ্ধির উন্মেষ ঘটে বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এই একটি ব্যাপার আছে যা সবার বেলায় এক সময় বা একই পরিস্থিতিতে হয় কি না বলা মুশকিল। বুদ্ধির সঙ্গে হয়তো মানুষের বয়সের একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু বোধের সম্পর্ক? মনে হয় তা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গ যখন উঠলোই তখন বিষয়টি সম্পর্কে আরো দু’চারটি কথা বলতে চাই। সুকান্তের ওই বিখ্যাত লাইন নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। তাই তার কাছে পূর্ণিমার চাঁদটি মনে হয়েছিল ঝলসানো রুটি। বোধের সঙ্গে মনের যেমন একটি প্রগাঢ় সম্পর্ক আছে তেমনি দেহেরও একটি সম্পর্ক আছে অবশ্যই। খেয়াল করা সম্ভব হবে, চাঁদ যতোই ঝলসানো রুটি বলে তার কাছে মনে হোক না কেন, ঝলসানো রুটির কথা মনে করে কবিতা ‘ছুটি’ দেয়ার অন্ত্যমিল সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন ঠিকই। অর্থাৎ তার দারিদ্র্য বা ক্ষুধা তাকে কাব্যবিমুখ করতে পারেনি। তবুও বলবো, কুষ্টিয়ায় আমার ওই বাল্যকালে নিসর্গের সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এই তীব্রতা পেতো না যদি আমার উদর পূর্ণ না থাকতো। বয়সের তোয়াক্কা না করেই বোধের উন্মেষ হতে পারে। তবে বুদ্ধির স্ফুরন হয় কি না তা বলতে পারবো না। বাল্যকালের এসব স্মৃতি আমাকে আজকের এই জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে। অবশ্য আমি স্বীকার করি, আমার জীবনে যদি ভালো কোনো কাজ করে থাকি তাহলে সেটি যে যা-ই বলুক না কেন, অকিঞ্চিৎকর কাজ।


যাহোক, এই কলামে ব্যক্তিগত কথাগুলো বললাম এ কারণে যে, আমাদের অতীত আমাদের সবার জীবনে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করে যায়। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের সবারই জীবন কিছু মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ওই মূল্যবোধগুলো নিয়ে কথাবার্তা হয় প্রায়ই এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বুঝতে পারি, আমাদের জীবনে মূল্যবোধের অবক্ষয় এতো সর্বগ্রাসী হয়েছে যে, আমরা একটি বিপজ্জনক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি। সেদিন কোনো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে একটি আলোচনাচক্রে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সংঘাতের পেছনে যে পথভ্রষ্ট তরুণ সমাজ আজ ব্যাপৃত আছে এর কারণটি কী এবং এখান থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়? বলেছিলাম, এই পথ হারানো তরুণদের পথ দেখানোর দায়িত্ব যাদের ছিল অর্থাৎ আমাদের প্রজন্মÑ তারা তাদের কাজটি ঠিকভাবে সম্পন্ন করেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমাদের প্রজন্ম কেবল অর্থ উপার্জনে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। পরবর্তী প্রজন্মকে কখনোই তারা সঠিক পথ দেখায়নি। এই অপরাধের মাসুল আজ দেশ ও জাতিকে দিতে হচ্ছে। এখনো যদি আমরা আমাদের কর্তব্যের প্রতি উদাসীন থাকি তাহলে দুই প্রজন্ম পর এ দেশে ভালো মানুষ আর থাকবে না। অথচ আমাদের প্রজন্মের সবাই নিজের গুরুজনদের তত্ত্বাবধানে সব মূল্যবোধ সম্পৃক্ত একটি সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে শুনে এসেছেন, প্রত্যক্ষও করেছেন। আমরা কেন এখনো ওই মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সৎ চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে ওই কাজে ব্রতী হই না?


লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

চিহ্ন

শহীদুল হক খান

 

 


ডিভোর্সের কথা চলছিল কয়েক মাস ধরেই। পলিনা ও পরশকে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছে। তবে তাদের মতের পরিবর্তন হয়নি। পরশ বলেছে, আমরা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। কিন্তু বিয়ের তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই দেখেছি আমাদের মতের অনেক অমিল, চিন্তার অমিল, পরিকল্পনার অমিল।
বন্ধুবান্ধবরা বলেছে, তোমাদের হাসিমুখ দেখে তো তা মনে হয় না। কী চমৎকার হেলে-দুলে হানিমুন করে এলে! পরশ জবাব দিয়েছে, হানিমুন করা মানেই সুখী সংসার নয়। এক বিছানায় ঘুমানো মানেই সুখী দম্পতি নয়।
এরপর সবার অনুরোধ রাখতে গিয়ে তারা হিসাব করে করে তিনটি বছর পার করলো। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। সেদিন ছিল তাদের বিয়েবার্ষিকী। সকালে পলিনা নিজ হাতে পরশের জন্য রান্নাবান্না করে এক সঙ্গে খাবার টেবিলে বসলো।  আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, তারা আলাদা হয়ে যাবে। কোন কোর্ট-কাচারি নয়, উকিল-ব্যারিস্টার নয়। নিজেরাই নিজেদের ডির্ভোস নিয়ে নেবে। যেহেতু কেউ কারো কাছে কোনো চাহিদা তুলবে না, পাওনা-দেনার কোনো হিসাব-নিকাশ হবে না সেহেতু ভদ্রলোকের মতো দু’জন দু’জনার সঙ্গে সর্ম্পক শেষ করে দিন শেষে দুই পথে চলে যাবে।

খাবার টেবিলে খেতে খেতে প্রথম কথা তুললো পলিনা। বললো, আমার দু’একটি জিনিস নেয়ার ছিল।
নির্দিধায় নিয়ে যেতে পারো। পরশ উত্তর দিলো।
- তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হয় তখন তোমার চোখে এই চশমাটা ছিল। আর চশমাটা ছিল বলেই তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। অনেক ব্যক্তিত্ববান মনে হয়েছিল। তাই এ চশমাটা আমি নিয়ে যেতে চাই।
পরশ চোখ থেকে চশমাটা খুলে রাখলো।
পলিনা বললো, পরে দিলেই হতো, যাওয়ার সময়।
পলিনার চোখের দিকে তাকিয়ে পরশ বললো, যেটা দেয়ার তা আগে দিয়ে দেয়াই ভালো।  
দু’জন ধীরগতিতে খাবার খাচ্ছে। নীরবতা বলে দেয়, এই মুহূর্তে কারো মুখে কথা নেই। আবারও নীরবতা ভাঙলো পরশ। বললো, তোমার পরবর্তী চাওয়া?
পলিনা বললো, গত বছর বই মেলায় তোমাকে একটা হলুদ পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলাম হিমু সাজার জন্য। ওই পাঞ্জাবিটা আমাকে দাও।
- ওই পাঞ্জাবি দিয়ে তুমি কী করবে? মেয়ে হিমুরা তো হলুদ শাড়ি পরে। আর মেয়েরা তো হিমু হয় না।
আমি কী করবো সেটি তো আমার ব্যাপার, তুমি দিবে কি না বলো?
- আলোচনার শুরুতেই তো বলেছি, যা খুশি তুমি নিতে পারো, আমার আপত্তি নেই।
হ্যাঁ, এ জন্যই আমি তসলিমা নাসরিনের তিনটা বই নিয়ে যাবো।
- কোন তিনটা বই?
আমার ছেলেবেলা, ক আর ফরাসি প্রেমিক।
- এই বই দিয়ে তুমি কী করবে? এগুলো তো অনেক অশ্লীল, নোংরা বই।
না, মোটেও অশ্লীল আর নোংরা বই নয়। এই বইয়ে যা লেখা আছে, সব সত্য।
- তোমার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না।
সেটি সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে মোটেও তা মনে হয় না।
- তুমি যেহেতু তসলিমাকে পছন্দ করো, তাই এ কথা বলছ।
না, পছন্দ নয়। আমি তাকে সমর্থন করি। আমার মেয়েবেলা বইয়ে তিনি তার ছোটবেলা মামা, চাচা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে কথা অবলিলায় লিখে পাঠককে জানিয়েছেন। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার এক মামাতো ভাইও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কলেজ থেকে ফেরার পথে গাউছিয়ায় এক দুষ্ট ছেলে আমার বুকে হাত দিয়েছিল- কথাগুলো কাউকে বলতে পারিনি।
- এখন যে বলছ?
যেহেতু সর্ম্পক শেষ হয়ে যাবে সেহেতু দু’একটা কথা প্রকাশ করে দিলাম। তাসলিমা ‘ক’ বইয়ে কয়েক কবি

লেখকের সঙ্গে তার আন্তরিকতার কথা বলেছেন। বই ছাপা হওয়ার পর কতো হই চই, কতো মামলা-মোকদ্দমা! পরে দেখা গেল সব চুপচাপ।
- আর কী চাই?
বিশেষ কিছু নয়, একটা ছোট স্মৃতি।
- কী সেই স্মৃতি।
চলো কফি খেতে খেতে বলি।
কফির কাপ হাতে নিয়ে দু’জন গিয়ে বসলো বারান্দায়। কিছুক্ষণ আগে পলিনা গোসল করেছে। তার ভেজা চুলের মিষ্টি গন্ধ এবং বাগান থেকে ভেসে আসা ফুলের গন্ধ একাকার হয়ে গেছে। গাছে গাছে কেমন যেন নেশা লাগানো ভাব।
অনেকক্ষণ পর পলিনার দিকে তাকিয়ে পরশের মনে হলো, পলিনা আসলেই খুব সুন্দর। কিন্তু তার খুব বাজে ধরনের একটা মেজাজ, কোনো কিছুতে আপস না করার জেদ কোনোভাবেই স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। ২৪ ঘণ্টার দিনকে মনে হয় যন্ত্রণার ৪৮ ঘণ্টা। অথচ তার সঙ্গে যেদিন পরিচয় হয় সেদিন পরশের এক বন্ধু বলে, তার বোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বাংলা বিভাগে। প্রথম দিনের আলাপে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছে পলিনা অনেক বোঝে। শস্তা বিষয় শস্তা জনপ্রিয়তা নয়, অনেক গভীরে যেতে পারে।
পরের সাক্ষাতে আলোচনার বিষয় ছিল খেলাধুলা। এ বিষয়েও তার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা অনেক। তবে খেলা নিয়ে বেশি মাতামাতিটা পছন্দ করে না। যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে, দেশের খেলোয়াড়দের বিজয়ী হিসেবে যতো অতিরিক্ত মাথায় তুলেছে ততোই তারা পচা তালের মতো পড়ে গলে গেছে। পলিনার পরামর্শ- আমাদের সব খেলোয়াড় ভালো, অসম্ভব ভালো। তাদের মাথা নষ্ট না করে ঠিকমতো খেলতে দেয়া দরকার। রাজনীতি, দুর্নীতি নিয়ে সে কোনো মন্তব্য করতে চায়নি। দেশ সম্পর্কে তার ধারণা- এমন দেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কথা উঠতেই বলেছিল, কোনো এক সময় হয়তো প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু ছিল। এখন ওসব নেই। যা আছে তা হলো সেক্স। পয়সার বিনিময়ে, কথার বিনিময়ে, প্রেমের নামে, ভালোবাসার নামে, বিয়ের নামে টিকে আছে শুধু ওই সেক্স।
পরশকে দীর্ঘক্ষণ ভাবতে দেখে পলিনা জানতে চাইলো- কী এতো ভাবছ? সিদ্ধান্ত পাল্টাবে নাকি?
পরশ অত্যন্ত জোড় দিয়ে বললো, প্রশ্নই ওঠে না। সিদ্ধান্ত যেটা নেয়া হয়েছে, দ্যাট ইজ ফাইনাল।
- গুড, আমারও তা-ই মত। শুধু একবার তো নয়, এই তিন বছরে আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের এক সঙ্গে থাকা হবে না।
আমাদের দু’জনের চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনার এতো পার্থক্য, কোনো অবস্থাতেই দু’জনার এক সঙ্গে থাকা চলে না। এবার তোমার শেষ চাওয়াটা কী বলো। সময় যতো কম নষ্ট হবে ততোই ভালো।
- হ্যাঁ বলছি। তবে এর আগে বলে নিই, এতে যেন আবার সিদ্ধান্ত না বদলাও।
প্রশ্নই ওঠে না।
- তুমি তো ঘুম থেকে দেরিতে ওঠো। আমি আগামীকাল সকালে উঠেই চলে যাবো।
আগামীকাল সকালে কেন? কথা তো ছিল আজই চলে যাবে।
- হ্যাঁ, কথা ছিল। তবে একটা চিহ্ন নিয়ে যাবো।
চিহ্ন?
- হ্যাঁ, বিয়ের পর আমাকে তুমি অনেকবার সন্তান নিতে বলেছ। নিইনি।

ভেবেছি যেখানে সম্পর্কই থাকবে না সেখানে ওইসব আবেগ-অনুভূতি প্রশ্রয় দিয়ে লাভ কী?
তাহলে আজ?
- আজ মনে হলো। দোষ সব তো আমার। মেজাজ বলো, মর্জি বলো, অভিমান বলো- সব তো আমার জন্য। তাই তোমার মতো ভালো মানুষের একটা চিহ্ন যদি আমার কাছে থাকে- সে ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবো, অহঙ্কার করতে পারবো।

রাত নেমেছে অনেকক্ষণ। রাতের খাওয়া শেষ করে পরশ বিছানায় চলে গেছে। পলিনা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিছানায় যাওয়ার। ঘর বাঁধার পর থেকে বিশেষ রাতে বিশেষ সময়ের জন্য বিশেষ কিছু প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। আজও ওই প্রস্তুতি নিতে সে ভুল করলো না। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। একের পর এক শরীর থেকে পোশাক সব সরিয়ে ফেললো। সবচেয়ে পছন্দের পারফিউমটা এখানে, সেখানে, সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্প্রে করলো। হালকা করে রেকর্ড প্লেয়ারে একটা গান বাজালো। গানটা হেমন্ত মুখপধ্যায়ের ‘এই রাত তোমার আমার’। গানের শব্দটা একটু বাড়িয়ে, একটু কমিয়ে এমনভাবে ব্যালান্স করলো যাতে বিছানায় শুয়ে  শুনতে পারে এবং এই শোনার মধ্যে যেন শুধু গান শোনা নয়, একটা গানের আমেজ থাকে, মাদকতা থাকে। পরশের পাশে পলিনা গিয়ে তার গায়ে হাত রাখলো।
পরশ বললো, এসেছ?
পলিনা বললো,  হ্যাঁ, এসেছি।
- এটাই তো শেষ আসা, তাই না?
হয়তো বা। আবার নাও হতে পারে।
- তোমাকে যখন কাছে পাই তখন মনে হয় স্বর্গটা আমার খুব কাছে।
আর যখন দূরে থাকি।
দূরে থাকা নয়, যখন তুমি আমার সঙ্গে মেজাজ করো, বাজে ব্যবহার করো, জিদ দেখাও, পাজিপনা করো তখন মনে হয় আমি যন্ত্রণার মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি।
- থাক ওসব কথা। এখন এ রাতটাকে, রাতের এ সময়টাকে তুমি শুধু সুখ দিয়ে ভরে দাও।
সুখ চাইলে কথা বন্ধ করতে হবে।
- কথা বন্ধ করলাম। আর কথা বন্ধ করবো কী? তুমি নিজেই তো ঠোঁটে আটকে দিয়ে আমার কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছ।
দু’জনার কথা থেমে গেল। বাইরে মনে হচ্ছে ঝড়োহাওয়া বার বার আছড়ে পড়ছে। এক সময় গানটা থেমে গেল। তারা দু’জন ক্লান্ত হয়ে যার যার বালিশে মাথা রাখলো। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

রাত শেষে ভোর হলো। ভোর বলতে অনেক বেলা হলো। পরশ ঘরময় খুঁজে দেখলো, পলিনা চলে গেছে। টেবিলে তার জন্য নাশতা বানিয়ে রেখে গেছে। ডিভোর্সের দলিলে নিজের দস্তখতটাও করে দিয়ে গেছে। একটা ছোট্ট কাগজে এনগেজমেন্ট রিংটা রেখে লিখে গেছে, ‘তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে স্মৃতিচিহ্ন। ভালো থেকো। সন্তান ছেলে হোক অথবা মেয়ে তার নামটা তুমি রাখবে।’

দুই ভূত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 



লালু আর ভুলুর কোনা কাজ নেই। তারা সারা দিন গল্প করে কাটায়। সবই নিজেদের জীবনের নানান সুখ-দুঃখের কথা বলে। কথা বলতে বলতে যখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না তখন দু’জনে খানিক কুস্তি লড়ে। তাদের কুস্তিও খুব একঘেয়ে। কেউ হারে না। কেউ জেতে না। কুস্তি করে তাদের ক্লান্তি আসে না, ঘামও ঝরে না। এর কারণ হলো, লালু আর ভুলু দু’জনই ভূত। প্রায় ১৪ বছর আগে দুই বন্ধু মনুষ্য জন্ম শেষ করে ভূত হয়ে লালগঞ্জের লাগোয়া বৈরাগী দীঘির ধারে আশ-শ্যাওড়ার জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়ে আছে। মামলা-মোকদ্দমা থেকেই বাক্য আলাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয়, বুড়ো বয়সে মাত্র সাত দিনের তফাতে লালু আর ভুলু পটল তোলে। ভূত হয়ে যখন দু’জনের দেখা হলো তখন দু’জনের মনে হলো পুরনো ঝগড়া জিইয়ে রাখার আর কোনো মানেই হয় না। তাই দু’জনের বেশ ভালো ভাব হয়ে গেল। সময় কাটানোর জন্য তারা মাঝে মধ্যে ইচ্ছা করে ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেও দেখেছে। কিন্তু দেখা গেল, ঝগড়াটা তেমন জমে না। আরো একটা আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা ভূত হয়ে আজ পর্যন্ত এ তল্লাটে কোথাও কখনো আর কোনো ভূতের দেখা পায়নি।
ভুলু বলে, হ্যাঁ রে লালু, গাঁয়ে গত ১৪ বছরে তো বিস্তর লোক মরেছে। তাদের ভূতগুলো সব গেল কোথায় বল তো?


সেটি তো আমিও ভাবছি, আমরা ছাড়া আর কাউকে তো কখনো দেখিনি! আরো কয়েকজন থাকলে সময়টা একটু কাটতো ভালো।
ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে।


আমারও ভালো ঠেকছে না! বেশিদিন এ রকম চললে আমাদের এ গাঁ ছাড়তে হবে। সেটি কী সোজা! আমি গাঁ ছাড়ার চেষ্টা করে দেখেছি, ভারী সূক্ষ্ম একটা বেড়া আছে। চোখে দেখা যায় না। এতোই মিহি যে, ওই বেড়া ভেদ করা অসম্ভব।
বটে, এ তো ভারী অন্যায় কথা! আমরা কি সব জেলখানার কয়েদি নাকি রে?
মনে হয় এক জায়গার ভূত অন্য জায়গায় গেলে হিসাবের গোলমাল হবে বলেই যমরাজা বেড়া দিয়ে রেখেছে।
তা আটপেয়ে যমরাজাটাই বা কোথায়? আজ পর্যন্ত তো তার দেখাটি পেলাম না।
হবে রে হবে। এই একঘেয়ে বসে থাকাটা আমার আর ভালো লাগছে না। বরং গাঁয়ের ভূতগুলো কোথায় গায়েব হচ্ছে সেটি জানা দরকার। আরো গোটা কয়েক হলে দিব্যি গল্প-টল্প করা যেতো। দল বেঁধে থাকতাম।
তাহলে খুঁজেই দেখা যাক।
তাই চলো।


দুই বন্ধু মিলে অতঃপর ভূত খুঁজতে বের হলো। কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে হয়রানিই সার হলো। একটা ভূতের গায়ের আঁশও দেখা গেল না।
বড় চিন্তার কথা হলো রে লালু!
বটেই তো! এ রকম তো হওয়ার কথা নয়।
একটা কথা বলি, যতীন মুৎসুদ্দির বয়স হয়েছে। অবস্থাও ক’দিন ধরে খারাপ যাচ্ছে। এখন-তখন অবস্থা। চল তো গিয়ে তার শিয়রে বসে থাকি। আত্মাটা বের হলেই খপ করে ধরবোক্ষণ।
কথাটা মন্দ বলোনি। তাহলে চলো যাই।
দু’জনেই গিয়ে যতীন মুৎসুদ্দির শিয়রে আস্তানা গাড়লো। খুব সতর্ক চোখে চেয়ে রইলো যতীনের দিকে। যতীন বুড়ো মানুষ, শরীর জীর্ণ, শক্তিও নেই।
দু’দিন ঠায় বসে থাকার পর তিন দিনের দিন যখন গভীর রাত তখন লালু আর ভুলু দেখলো যতীনের আত্মাটা নাকের ফুটোর কাছে বসে সাবধানে বাইরে উঁকি-ঝুঁকি মারছে।
লালু চেঁচিয়ে উঠলো- ‘ওই বেরোচ্ছে। সাবধান রে ভুলু, ঘ্যাঁচ করে ধরতে হবে কিন্তু।’
হ্যাঁ, একবার বেরোক বাছাধন।


তা আত্মাটা বের হলো বটে কিন্তু ধরা গেল না। শরীর ছেড়ে হঠাৎ এমন চোঁ করে এরোপ্লেনের মতোই উড়ে গেল নাকের ফুটো দিয়ে যে, লালু-ভুলু হাঁ করে চেয়ে রইলো। তারপর ‘ধর ধর’ করে ছুটলো পেছনে।
যতীন মুৎসুদ্দির আত্মা সোজা গিয়ে গণেশ গায়েনের বাড়িতে ঢুকে পড়লো। পিছু পিছু লালু আর ভুলু।
যতীনের আত্মা দেখেই গণেশ গায়েন একগাল হেসে বললো, এসেছিস? তোকে নিয়ে ‘সাত হাজার সাতশ’ পনেরোটা হলো। দাঁড়া যতেন, দাঁড়া, তোর শিশিটা বের করি। মলম-টলম ভরে একদম রেডি করে রেখেছি। এই বলে একটা দু’ইঞ্চি সাইজের শিশি বের করে যতীনকে তার ভেতরে পুরে কয়েকটা নাড়া দিয়ে ছিপি বন্ধ করে তাকে রেখে দিল। তারপর আপন মনেই বললো, আর দুটো হলেই কেল্লা ফতে। পরশু ঝুনঝুনওয়ালা লাখখানেক টাকা নিয়ে আসবে। ‘সাত হাজার সাতশ’ সতেরোটা হলেই লাখ টাকা হাতে এসে যেতো। টাইফয়েড হয়ে ১৪ বছর আগে শয্যা নিতে হলো বলে লালু আর ভুলুর ভূত দুটো হাতছাড়া হলো। না হলে আমাকে আজ পায় কে! সে দুটোকে পেলে হতো।
লালু-ভুলু দরজার আড়ালে থেকে কথাটা শুনে ভয়ে সিটিয়ে রইলো।
গণেশ গায়েন ঘুমালে তারা ঘরের তাকে জমিয়ে রাখা সাত হাজার সাতশ’ পরেরোটা শিশি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলো। প্রতিটিতে একটা করে ভূত মলম মেখে ঘুমিয়ে আছে।
লালু, দেখেছিস!


দেখেছি রে ভুলু, কী করবি?
আয়, শিশিগুলোকে তাক থেকে ফেলে আগে ভাঙি।
তাই হলো। দু’জন মিলে নিশুত রাতে ঝন ঝন করে শিশিগুলো ঠেলে ফেলে দিল মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমন্ত ভূতগুলো জেগে মহাকোলাহল শুরু করে দিল।
ভুলু তাদের সম্বোধন করে বললো, ‘ভাই-বোনেরা, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমরা তোমাদের উদ্ধার করতেই এসেছি।’
সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো।
গণেশ গায়েনও ঘুম ভেঙে উঠে ধমকাতে লাগলো- ‘চুপ, চুপ বেয়াদব কোথাকার! তোদের তো মন্তর দিয়ে বেঁধে রেখেছি।’
কে শোনে কার কথা! ভূতগুলো মহানন্দে চিৎকার করতে করতে লালু-ভুলুর সঙ্গে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল।
গণেশ দুঃখ করে বললো, ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় রে। কতো ভালো কাজ হতো তোদের দিয়ে! ঝুনঝুনওয়ালা তোদের নিয়ে গিয়ে তার আয়ুর্বেদ ওষুধের কারখানায় চোলাই করে কর্কট রোগের ওষুধ বানাতো। তা তোদের কপালে নেই। তা আমি আর কী করবো?’

মানুষের ভাগ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

 

মানুষের ভাগ্যটি আজ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। তা হলো এই, বাংলাদেশের দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি এখন আরো অসহ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি আসলে একদলীয়ই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্র ওই দলেরই হয়ে যায়। অপর দল আগের দলের মতোই আচরণ করে। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, পরের সরকার আগের সরকারের চেয়ে ভালো তো নয়ই, বরং আরো খারাপ হয়ে থাকে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি একদলীয় আরো এক অর্থে। সেটি হলো, উভয়দলই হচ্ছে বিত্তবানদের দল। সামাজিকভাবে তারা পরস্পরের পরিচিত, ক্ষেত্র বিশেষে আত্মীয়ও, অধিকাংশ সময়ই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ, ওঠাবসা একই রকমের, আচার-আচরণও তা-ই। দুটি দল হলেও তারা উভয়ই বড়লোকদেরই দল। এ জন্য তাদের এক দলই বলা যায়। লোকে বিকল্প খোঁজে। ভাবে, এ দুই দলের বাইরে যাবে। কিন্তু যাওয়া সম্ভব হয় না।


মাঝে মধ্যে সামরিক শাসন দেখতে পাওয়া যায়- কখনো প্রকাশ্যে, কখনো ছদ্মবেশে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া যায়, ভেতরে ভেতরে তারা ওই একই দলের। তারাও বিত্তবানদেরই স্বার্থ দেখে। স্বার্থ দেখার ওই কাজে যুক্ত হয় আরেক অপশক্তি। সেটি হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। এটি আরো ভয়ানক। ওই ভয়ানক শক্তিও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এর ফল সবচেয়ে ভয়াবহ।


আমরা ব্রিটিশ আমলে ছিলাম। অবশ্যই ভালো ছিলাম না। পাকিস্তান আমলও আমাদের জন্য দুঃসহ। এখন বাংলাদেশে আছি। কিন্তু ভালো আছি- এমনটি বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ আছেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগেই ভালো ছিলাম! কখন, কীভাবে ভালো ছিলেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। তারা আদর্শায়িত করেন পেছনের দিনগুলোর। কারণ বর্তমান অসহ্য, ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। অতীতে আমরা মোটেই ভালো ছিলাম না, অসন্তুষ্ট ছিলাম। এ জন্য আন্দোলন করেছি, মুক্তি চেয়েছি। শাসক বদল হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রও ভেঙেছে। পরে দেখা গেছে, মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের ভাগ্য বদলায়নি। কেবল শাসকই বদলেছে। নতুন যারা শাসক হয়েছেন তাদের কেউ কেউ অতীতে যে খারাপ অবস্থায় ছিলেন তা নয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ধনবান মানুষ এবং তারা একই দলের। একইভাবে শাসন অর্থাৎ শোষণ করছে। এটি আমরা বুঝি, কথাটি আমরা বলিও। তবে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু করতে পারি না।
দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে। তাকে উন্নতির লক্ষণ বলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? ওই প্রশ্নটি তো থাকেই। এটি শুধু গুণগত উৎকর্ষের বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, নাকি অসামাজিক হয়ে উঠছে? অসামাজিক হওয়ার অর্থ, এখানে শুধু যে অপরাধপ্রবণ হওয়া তা নয়, বিচ্ছিন্ন হওয়া। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হচ্ছে এবং ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি আগেও ছিল। এখন উন্নতির আলোক উদ্ভাসের আড়ালে এটি আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত মানুষ এখন কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, অন্যের স্বার্থ দেখতে চায় না। তার মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পায় না। সে অসামাজিক হয়ে ওঠে। শিক্ষাকে আমরা জাতির ভবিষ্যৎ বলে বিবেচনা করি। কোন ধরনের মানুষ এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে? স্বার্থপর, নাকি সামাজিক- এ প্রশ্নটি প্রাথমিক হওয়া উচিত, হয় না। এই অবস্থা কেমন করে বদল করা যাবে? ছোট ছোট সংস্কার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব সংস্কার প্রযুক্ত করতে হবে পুরো ব্যবস্থাটির পরিবর্তনের সঙ্গে। না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেমনটি হচ্ছে তেমনটি অন্যত্রও ঘটতে থাকবে এবং ঘটছেও।


বলা হয়, মানুষের চরিত্র ঠিক নেই। অভিযোগ, মানুষের মধ্যে সহনশীলতার বড় অভাব। দুটিই সত্য। কিন্তু মানুষ তার চরিত্র কীভাবে ঠিক রাখবে যেখানে সমাজ চরিত্রহীন! চরিত্রহীনরাই তো এখন সমাজের শীর্ষে রয়েছে। তাদের আদর্শেই সাধারণ মানুষ দীক্ষিত হচ্ছে। সহনশীলতা অবশ্যই নেই। কেননা সমাজে লুণ্ঠনই হচ্ছে প্রধান সত্য। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির লালসায় এমন কাজ নেই যা করতে লোকে পিছপা হয়। মানবিক সম্পর্কগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি সেটি নিশ্চয়ই এ সমাজ এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এ সমাজ ভেঙে সেখানে নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এই নতুন সমাজের জন্য যথোপযুক্ত মতাদর্শ প্রয়োজন। ওই মতাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই বিকল্প সমাজ গড়া সম্ভব। মতাদর্শের ব্যাপারটি দার্শনিক।


এ প্রসঙ্গ উঠলেই বলা হয়, এটি হচ্ছে বড় বড় কথা। এ রকম ধারণার পেছনে যে যুক্তি নেই তা নয়। মতাদর্শ অনেক সময়ই বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে চায় না। সাধারণ মানুষ ছোট ছোট সমস্যার কারণে মতাদর্শের কথা ভাবার সুযোগ পায় না। আর মতাদর্শে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এর পথ খুঁজে পান না।
মূল ব্যাপারটি সোজা। তা হলো ব্যক্তির মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটি অর্জন করতে হলে সমষ্টিগত ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। যে কিশোর একদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষে তিনি পেশা নিয়েছেন শিক্ষকতা। কিন্তু দেখলেন, মুক্তি আসেনি। কারণ শাসক বদল হয়েছে ঠিকই, ব্যবস্থার বদল হয়নি। ওই শিক্ষককে আবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। এবার তার আন্দোলনটি পেশাগত। তিনি যে আন্দোলনরত অবস্থায় প্রাণ দিলেন এতে এটিই প্রমাণ হলো, ব্যক্তিগত মুক্তি তো বটেই, পেশাগত মুক্তিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়।


আমাদের এই বদ্বীপে মাটি শক্ত নয়। তাই খুঁটি গাড়তে হয় এবং খুঁটিই অবলম্বন করা চাই। এ খুঁটি হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। সমাজে এখন সবাই ওই খুঁটি গাড়তে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়েছে। এমন ব্যাপক নিষ্ঠুরতা সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি কেমন করে সৎ থাকবে! সৎ থাকতে গেলে হয় তিনি বিপদে পড়বেন, না হলে পিছিয়ে পড়বেন। আর যদি ব্যক্তি সৎ থাকতে পারে তাহলেও কি সমাজ বদল হবে? মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করার জন্য এ অসুস্থ সমাজ বদল করা চাই। এ জন্যই দরকার বিকল্প রাজনীতি। সংগঠিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজ বদলাবে। লক্ষ্যটি থাকবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এটিকে সমাজতান্ত্রিক বললেও অন্যায় করা হবে না। কেননা এ সমাজে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমাদের গণমাধ্যম, টেলিভিশন, আলাপ-আলোচনায় অনেক কথাই বলা হয়। সেগুলো ফুলঝুরির মতো। কিন্তু মূল সমস্যাটি যে এ অসুস্থ সমাজ বদল করা সেটি উঠে আসে না।


এখন এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত যে, প্রাইভেট মানেই ভালো আর পাবলিক মানেই খারাপ। এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন- সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। অথচ আমরা যে মুক্তির জন্য লড়েছি তা সব সময়ই ছিল পাবলিকের কাজ, প্রাইভেটের নয়। কিন্তু এখন পাবলিক হেরে গেছে প্রাইভেটের কাছে। এ জন্যই আমাদের এমন দুর্দশা। শেয়ার মার্কেটের কথা ধরা যাক। সেখানে যে কেবল মতলববাজ ও ধড়িবাজরাই যায় তা নয়। নিরুপায় সাধারণ মানুষও ভিড় করে। এর কারণ হলো, পাবলিক বিনিয়োগের স্থান অত্যন্ত সংকুচিত। ওই ক্ষেত্রটি প্রসারিত হলে মানুষ সেখানেই যেতো। এখানে না যেতে পেরে মানুষ প্রাইভেটের কাছে যায় এবং বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে যা দরকার তা হলো পাবলিককে বড় করা প্রাইভেটের তুলনায়। তাহলেই প্রাইভেট নিরাপদ হবে। আসলে ব্যক্তিও তো বিবেচনার চূড়ান্ত বিন্দু। তাকেই সমৃদ্ধ ও সুখী করা চাই। কিন্তু ব্যক্তি জড়িত সমষ্টির সঙ্গে। এ জন্য সমষ্টির ভাগ্য না বদলালে ব্যক্তির ভাগ্যও বদলাবে না এবং যতোটুকু বদলাবে তা সুরক্ষিত থাকবে। বদলটি এখানেই দরকার। দেশের মানুষ এ বদলের জন্যই সংগ্রাম করেছে। বার বার তারা দেখেছেন প্রাইভেট পদদলিত করছে পাবলিককে। তাই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ মোটেই শেষ হয়নি। এ যুদ্ধটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাই সমাজ বদলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।


সমাজ বদলের প্রশ্নে দু’দলই অনড়। কেননা ওই ঘটনাটি ঘটলে তাদের সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই জনগণকে এগোতে হবে মুক্তির দিকে। মুক্তির ওই যাত্রায় কারা নেতৃত্ব দেবেন? তারাই নেতৃত্ব দেবেন যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। কতো দ্রুত তারা এগিয়ে আসছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন এর ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ‘বিকল্প চাই’- এ উপলব্ধিটি এখন প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু ওই আওয়াজ যেন এর আসল প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের বিভ্রান্ত না করে। এ প্রয়োজনটি হলো সমাজ রূপান্তরের অর্থাৎ সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন জরুরি। তবেই মানুষের সত্যটি একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের অবস্থানটি নিশ্চিত হবে সবার উপরে।

জলকাচ

রঞ্জনা ব্যানার্জী

 

এক ঝলকেই চিনে ফেলেছিলাম। অল্পক্ষণের দেখা। তাও ভুলিনি। মাথার ভেতর খোদাই হয়ে আছে ওই শেষ বিকেলের সূর্যের পিছলানো আলো, কনকনে ঠান্ডা জলে পাথরের খাঁজ থেকে খুঁচিয়ে বের করা গোলাপি অথবা বেগুনি ওই কাচ!
আমাদের খাবার আসতে দেরি হচ্ছিল। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ। আমার জন্মদিন। অনেক দিন পর আমরা বাইরে খেতে এসেছি। বিয়ের পর পর বাইরেই খেতাম বিশেষ দিনগুলোয়। এক সময় বিশেষ দিনগুলো আর বিশেষ রইলো না। কাজের চাপে অদ্রিশ তারিখ নয়, বারের হিসাব রাখতো। আর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ঢুকে গিয়েছিল প্ল্যানারে- গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের নিকাশে। ওইসব অতি বিশেষ দিনের ক্রমাংকে আমার বিশেষ দিনগুলো বিশেষত্ব হারিয়েছিল।
সেদিন অদ্রিশ মেনু কার্ডে চোখ বোলাচ্ছিল। আমি মেনু দেখছিলাম না। দেখার দরকার নেই। আমি জানি কী খাবো। ফিশ অ্যান্ড চিপস। এবার কন্সিভ করার পর থেকে ওই খাবারটাই আমার পছন্দের চূড়ায়।
কাচটা আসলে বেগুনি, গোলাপি নয়। এই সেদিন লকেটে বাঁধাই করে দিয়েছে অদ্রিশ। এখন আমার গলায় থাকে বুকের মধ্যিখানে গা ছুঁয়ে। ওয়েট্রেস মেনু বুঝে নেয়ার সময়ই চোখ চলে গেল অদূরে। আমার কোণাকুণি বসেছিলেন তারা। কোনো সিনিয়র ক্লাবের ক্রিস্টমাস পার্টি হবে হয়তো। কেউ কেউ মাথায় সান্টা টুপি পরেছে, কেউ রেইন ডিয়ার অ্যান্টলার। আমাদের খাবার চলে এসেছিল মিনিটেই। অদ্রিশের শর্মা আর করোনা বিয়ার। আমার হেডক ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’, সঙ্গে টারটার সস’ আর লেবু দেয়া জল। আমি যেখানে বসেছি সেখান থেকে তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। দুটি টেবিল লাগিয়ে বসেছেন তারা। দশজনের মতো। তাদের মধ্যে বেমানান এক সুকেশী তরুণীও আছে। কেবল তার মাথাতেই উৎসবমুখর কোনো টুপি নেই। পরিপাটি চুল। হঠাৎ চেহারাটা মনে পড়ে গেল। এ তো তিনি! শির শির শীত লাগছিল আমার। বিশ্বাস হচ্ছিল না!
আমার চমকানো অদ্রিশের নজর এড়ায়নি- ‘কী ব্যাপার?’ মাছের ফিলেতে সবে ছুরি কাটা গেঁথেছিলাম। জমে রইলো হাত। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল অদ্রিশ। পেটের ভেতর ঠিক তখনই আমার রাজকন্যা আলতো নড়ে উঠেছিল। আমি কোনোমতে বলি, ‘সেই ভদ্রলোক!’ অদ্রিশ জিজ্ঞাসু চেয়ে থাকে।
তরুণীকে দেখি জায়গা ছেড়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছে। খাওয়া শেষ তাদের? আমার তর সয় না। হারানো যাবে না তাকে। অদ্রিশের অবাক দৃষ্টি উপেক্ষা করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াই। চলে যাই সটান তাদের টেবিলে। তরুণী তখনো কাউন্টারে। ভণিতা না করেই জিজ্ঞাসা করি, ‘কেমন আছেন?’ তার চোখে বিভ্রান্তি। তড়বড় করে বলি, ‘জলকাচটা আমিই খুঁচিয়ে বের করেছিলাম।’ আমার দিকে তিনি ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকেন। ‘আপনার মনে নেই?’ ঠিক তখনই অনুভব করি আমার পিঠে অদ্রিশের হাত। টেবিলের অন্যরা অবাক তাকিয়ে! তার সামনে ছোট একটা চকোলেট কেক। ‘হ্যাপি বার্থডে টু রন’। মাঝখানের মোমবাতিটা জ্বালানো হয়নি। ম্যানেজার ছুটে আসে। তার সঙ্গে তরুণী- ‘এনিথিং রং?’ লকেটটা তুলে ধরি- ‘মনে পড়ে? এ কাচটা বিরল। কেবল সময়ের হিসাবে নয়, এটিই আমাকে অন্ধকার খাদ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। আমার এই দ্বিতীয় জীবন আপনার দান।’ তিনি অপলক তাকিয়ে থাকেন লকেটটার দিকে। গলা থেকে খুলে লকেট তার চোখের সামনে ধরি। তিনি হাতে নেন, দেখেন। বিড় বিড় করে বলেন, “একশ’ বছরের কাছাকাছি হবে, ভেরি রেয়ার।” আমি অবাক! তিনি জানতেন। ‘আপনি বুঝেছিলেন সেই দিন?’ তিনি মৃদু হাসেন এবং লকেটটা আমাকে ফিরিয়ে দেন। আমার মাথা কাজ করছিল না। চেনা নেই, জানা নেই আমাকে কেন দিয়েছিলেন? তরুণী ও অন্যরা অবাক তাকিয়ে! অদ্রিশ বুঝে গেছে ততক্ষণে। সেই বলে ঘটনাটা- এক কিউরেটর ওই এত্তটুকু পাথরটার জন্য তিন হাজার ডলার চেয়েছিল। ওই থেকে আমরা খুঁজছি তাকে। ‘এটা আপনার কাছে রেখে দিন’- অদ্রিশ অনুরোধ করে। আমার দিকে তিনি তাকিয়েছিলেন। অথচ আমাকে দেখছেন বলে মনে হচ্ছিল না- ‘ওটা তোমার গলাতেই মানাচ্ছে।’ স্থান-কাল ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরি। আমার মাথায় আলতো হাত বোলান- ‘গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড।’ তরুণী জানায়, তিনি তার দাদু। বাকিরা তার দাদুর বন্ধু এবং আজ তার জন্মদিন। আমার বুক ধক করে ওঠে। মনে হতে থাকে, সবকিছু অন্য কারো ছকে ঘটছে! তরুণীকে আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর দেয় অদ্রিশ। যদি তিনি মত পাল্টান তাহলে যেন নিঃসংকোচে জানান আমাদের। ফিরে আসি নিজের জায়গায়। পেছনে তখন সবাই গাইছে- ‘হ্যাপি বার্থ ডে টুু রন।’ আমিও মনে মনে গাই, ‘হ্যাপি বার্থডে টু আস।’
তারা বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমরাও উঠে পড়ি। ওই রাতে অনেকক্ষণ বার্কলি বিচে বসে ছিলাম দু’জন। আকাশজুড়ে হাজার তারার বুটি। ঠিক মাঝখানে গোল কাঁসার থালার মতো চাঁদটা জেগে ছিল আমাদের চোখের জলের সাক্ষী হয়ে। ওই সৈকতেই সেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অথবা আমার দ্বিতীয় জীবনপ্রাপ্তি হয়েছিল।
‘তুমি চাইলে রাখতে পারো। আমি বাবল দেয়া কাচ খুঁজছি’- তিনি বলেছিলেন। কথা বলার সময় সেদিনও আমাকে দেখেছিলেন। অথচ দেখছিলেন না। ভারী কাচের ভেতর দিয়ে তার চোখ আমার চোখ ছুঁতে পারেনি। দৃষ্টিহীনদের মতো আমাকে ছাড়িয়ে অন্য কোথাও ভেসে গিয়েছিল ওই দৃষ্টি। বাবল দেয়া কাচ মানে কী বুঝতে পারিনি, জানতেও চাইনি। হাত বাড়িয়ে চুপচাপ নিয়েছিলাম। গোলাপি মসৃণ ছোট ত্রিভুজ আাকৃতির স্বচ্ছ পাথর। কখনো গোলাপি কাচের পাথর দেখিনি আগে। মাঝে মধ্যে দুধসাদা বা সবুজ চোখে পড়েছে বালিতে অথবা জলের নিচে। ভদ্রলোক পাথরটি আমার হাতে গুঁজেই পা চালিয়েছিলেন উল্টোদিকে। খাকি শটস আর ক্রিম টি-শার্ট ও মাথায় হ্যাট। সূর্য ঢলার আগের তীব্র কমলা আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়েছিল। আমি চোখের ওপর হাত ঢেকে আলো ছেনে তার চলে যাওয়া দেখেছিলাম।
আমি একাই এসেছিলাম সেদিন। আমার কাজ ঠিক বেলা ৩টায় শেষ হয়েছিল। লাইব্রেরিতে তেমন লোকজন ছিল না। বইগুলোর কল নম্বর মিলিয়ে তাকে তুলে রাখার পর তাকে সাহায্য করেছিলাম বই বাছাইয়ে। ছেঁড়া-খোঁড়া, অতি ব্যবহারে বাঁধাই ঢিলে হয়ে যাওয়া বইগুলো ‘ফ্রেন্ডস অফ লাইব্রেরি’র চ্যারিটিতে যাবে। বেলা ১১টার দিকে দুই শিশু এসেছিল তাদের মায়েদের সঙ্গে। হল্লা হয়েছিল খানিকটা। একই পাজল নিয়ে দু’জনেই টানাটানি।
আমি অনিয়মিত। কেবল কেউ ছুটিতে গেলেই ডাক পড়ে। সাধারণত শনি-রবিবারের শিফটেই আমাকে ডাকে। ওই দু’দিন ভিড় থাকে অনেক। সেদিন বুধবার। হঠাৎ করেই আমার ডাক পড়েছিল। কেবল দু’ঘণ্টা। যার শিফট তিনি হঠাৎ অসুস্থ। অনেক দিন পর উইক ডে-তে কাজ। রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। বাড়িতে দম বন্ধ লাগছিল।

ব্রাউন আর গার্থ এসেছিলেন লাঞ্চের পর। তারা রোজ আসেন। দু’জনই রিটায়ার্ড। শনি বা রবিবারে তারা আসেন না। তাই আমার সঙ্গে খুব একটা দেখাও হয় না। গার্থ বেশ আলাপী। লাইব্রেরিতে বই পড়ার চেয়ে কথা বলাতেই তার আগ্রহ বেশি। সেদিন আমাকে দেখে নামটা বলার চেষ্টা করলেন বেশ ক’বার। আমার নাম স্নিগ্ধা। ছোট করার কোনো উপায়ই নেই। আমার সুপারভাইজর শুরুতে নামটি ছাঁটাই করে ‘সু’ বলে ডাকার চেষ্টা করেছিলেন। আমি সাড়া দিইনি। আমার নাম নিয়ে কেউ কারিকুরি করুক তা আমার পছন্দ নয়। ‘স্নিগ্ধা’ শেষমেশ তাদের কাছে হয়ে গেছে ‘স্নিডা’। তাও সই। তবে সু কিছুতেই নয়।
গার্থ বিপত্নীক । ছেলেমেয়ে নেই। সেদিন বলেছিলেন সরকারি হোমে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কাজের বাইরে আমাদের কথা বলা নিষেধ। সুপারভাইজর সব খেয়াল করেন। তাই গার্থের সঙ্গে কথা এগোয়নি। আসলে সেদিন তার সঙ্গে দেখা না হলে সৈকতে যাওয়া হতো না আর নিকষ কালো বিষন্নগন্ডি থেকে আমিও বের হতে পারতাম না। তিনি যাওয়ার সময় পেয়ারাগন্ধি এক ধরনের লজেন্স দিয়েছিলেন হাতে গুঁজে। তা ছোট ছোট ও দারুণ স্বাদের। আমার চোখে জল জমেছিল। ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কোনো অনর্থ না হয়ে যায়! কাজে ইমোশন দেখানো নিষেধ। সবাইকে ছেড়ে আমাকে কেন? কেন যেন মনে হয়েছিল, তিনি জেনেছেন কোনোভাবে। আমার অগোচরে আমার মিসক্যারেজ আর মেল্ট ডাউন নিয়ে কথা হয় আমি জানি। পৃথু বৌদি সুপারভাইজরের পড়শি। পৃথু বৌদির সূত্রেই আমার এ কাজটি পাওয়া।
সে ১৩ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই চলে গিয়েছিল। তাল তাল রক্ত। হাসপাতালে পুরোদিন রাখেনি, পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাড়িতে ঢুকতেই সাপের মতো পাক খেয়ে খেয়ে ঠা-া গ্রোথ তলপেট বেয়ে উঠছিল। দরজা খুলে বাঁক নিলেই ওই ছবি। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, গাঢ় নীল ঘেঁষা কালো চোখ। আমি তাকাইনি। আমাকে হাতে ধরে বিছানায় দিয়ে এসেছিল অদ্রিশ। ছবিটি চুম্বকের মতো টানছিল। পায়ে পায়ে চলে গিয়েছিলাম আবার প্যাসেজে। ‘মাম্মা’- আমার কানের কাছে কেউ ফিসফিসিয়ে ডেকেছিল। আহা বাবুটা আমার! মায়ের কাছে রইলি না। আমি হাঁটু ভেঙে পড়ে গিয়েছিলাম ছবিটার সামনে। রাতে পৃথু বৌদি আর তপনদা এসেছিলেন। পৃথু বৌদি অনেক বুঝিয়েছিলেন- ‘১৩ সপ্তাহে কিছুই তৈরি হয় না। অযথাই মন খারাপ করছ।’ আমার এসব কথা একদম ভালো লাগছিল না। অদ্রিশকেই ভস্ম করছিলাম মনে মনে। কী দরকার ছিল রাজ্যের লোককে ডাকার!
স্বপ্নটি দেখতে শুরু করি আরো পরে। ফেনা ফেনা ঢেউয়ের চূড়ায় সে বসে আছে। মাথা ঘিরে দেবশিশুর মতো সবুজ শ্যাওলার মালা। মাম্মা!- দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে। এতো কাছে। তাও কিছুতেই তাকে ছুঁতে পারছিলাম না। ‘মাম্মা’!- ধড়মড় করে উঠে বসেছিলাম। বিছানা থেকে নেমে চলে গিয়েছিলাম ছবিটির কাছে। চুলের ডগায় জলের ফেনা লেগে আছে যেন। অদ্রিশ এসেছিল পিছু পিছু। কিছু বলেনি। লিভিংরুমে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসেছিলাম শোয়ারঘরে একা। সারা রাত এপাশ-ওপাশ করেছি। সকালের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি অদ্রিশ নেই। ছবিটি যে নেই তা বুঝেছি অনেক পর। কিন্তু ফাঁকা দেয়ালজুড়ে এক মাথা ঝাঁকড়া চুলে জলের বিন্দু নিয়ে সে জেগেই রইলো। অদ্রিশকে কখনো জিজ্ঞাসা করিনি ছবিটির কথা।
আমার ঘুম হতো না রাতে। কেবল কানভরে ঢেউয়ের গর্জন আর মাম্মা ডাক। মাঝে মধ্যে নোনা জলের গন্ধ ঝাপটা দিতো নাকে। সে কী বলতে চায় আমাকে? ওই শুরু। সময় পেলেই জলের ধারে। বার্কলি বিচ আমার বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের ড্রাইভ। পুরো সামার প্রায় প্রতিদিন গিয়েছি। কোনো কোনোদিন দু’বার। মনে হতো হেঁটে চলে যাই ঢেউয়ের চূড়ায় তার খোঁজে।
সেদিন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়েও এসেছিলাম গোধূলিবেলায়। দিন ছোট হচ্ছে। গাড়ি পার্ক করে পাথরের সিঁড়ি ভেঙে জলের কাছে যেই এলাম সেই সূর্য ডোবার আনজাম করছে। ভদ্রলোককে শুরুতে খেয়াল করিনি। বালিটা পেরিয়ে হাঁটুজলে দাঁড়িয়েছিলাম। মাংস কেটে হিম ঢোকাচ্ছিল ঠান্ডা কনকনে জল। সূর্যটা বাম কোণায় লাল চোখে শেষ জরিপ করছে। কেউ নেই আশপাশে। মনে হলো আজই ওইদিন! এই অস্থিরতার শেষ হোক আজ। হঠাৎ দেখি তাকে। আমার ডানপাশে। একটু দূরে যেন জল ফুঁড়ে বের হলেন! উবু হয়ে জলের নুড়ির খাঁজ থেকে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করছিলেন। আচমকা মাথা তুললেন এবং আমাকে বললেন, ‘সাহায্য করবে একটু?’ আমাকে ঝট করে কেউ যেন টেনে ফেরালো তীরে। এগিয়ে গেলাম। তিনি দেখালেন ছোট, প্রায় দেখা যায় না এমন গোলাপি আভার কাচের টুকরোটি। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা! এতো ছোট টুকরো নজরে এলো কীভাবে? তার বাঁকানো লোহার শলাটা দিয়ে টেনে বের করতে পারছিলেন না। হাত ডুবিয়ে নখের খোঁচায় দু’তিনবারের চেষ্টায় বেরিয়ে এলো বাইরে। কী সুন্দর! আমার হাত জমে গিয়েছিল ঠান্ডায়। তিনি উঁচু করে সূর্যের দিকে মেলে ধরলেন টুকরোটি। এরপরই জানালেন, বাবল নেই এতে। চাইলে আমি রাখতে পারি। হাত পেতে নিয়েছিলাম। মুঠোবন্দি করার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতের ওম ফিরে এসেছিল। ভেতরে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। চোখ তুলতেই দেখি চলে যাচ্ছেন তিনি।
বাড়ি ফিরে লাইটের আলোয় আবিষ্কার করেছিলাম কাচপাথরটি গোলাপি নয়, হালকা বেগুনি। অন্য রকম। অদ্রিশ এলেই তাকে দেখাই। সেও অবাক হয়! নাইটস্ট্যান্ডের ওপর ছোট পোর্সেলিনের বাটিটার ভেতরে রেখেছিলাম। অনেক দিন পর ওই রাতে শিশুর মতো ঘুমিয়েছিলাম। সকালে বেশ দেরি করেই ঘুম ভাঙে। চোখ খুলেই পাথরটার কথা মনে হয়। অদ্রিশ ততোক্ষণে চলে গেছে কাজে। কিন্তু পাথরটা গেল কোথায়! টেবিলের নিচে, আশপাশে তন্ন তন্ন খুঁজি। কোত্থাও নেই। হালকা সন্দেহ ছুঁয়ে যায়। ছবিটি ফেলে দিয়েছিল, কাচটাও কি?
মন খারাপ করে বসে ছিলাম। হঠাৎ মনে পড়লো, তিনি বলেছিলেন- ‘বাবল নেই, তুমি চাইলে রাখতে পারো।’ বাবল দেয়া কাচ মানে কী? আমি ল্যাপটপ নিয়ে বসি। এরপরই খুলে যায় এক অদ্ভুত দুনিয়া। কখন যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো তা জানতেই পারিনি। অদ্রিশ এসে আলো জ্বালে। ঘরের কাজ কিছুই হয়নি। খাওয়া-দাওয়াও না। অদ্ভুত চোখে সে দেখছিল আমাকে। কাচটির কথা আমার মনেই নেই আর। উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারি না- ‘জানো, বাবল দেয়া কাচগুলোর অনেক দাম এখন। এগুলো হাতে তৈরি কাচ। গ্লাস ব্লো করে কাচের বোতল বানানো হতো তখন। গোলাপি কাচটি কেমন বেগুনে লাগছিল না? ওটা অনেক আগের। ১৯১৫ সালের পর এখানে এমন কাচ আর বানানো হয় না। এতে ম্যাঙ্গানিজ মেশানো। সাদা ছিল এক সময়। সূর্যের আলোয় এমন বেগুনি হয়ে গেছে।’ আমাকে কথায় পায়। অদ্রিশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ! তারপর আমার ড্রেসিংটেবিলের ওপর গয়নার বাক্স থেকে কাচের টুকরোটি বের করে হাতে দেয়। ওই অদ্ভুত প্রশান্তি ফিরে আসে।
সেদিন রাতে আমার চোখের পাতা লাগতেই স্বপ্নে দেখি গোধূলিবেলা। চিক চিক বালির ভেতর সবুজ, হলুদ, লাল- আরো কত রঙ! এরপর থেকেই আমার জলকাচের নেশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি জলের ধারে, সৈকতে। কাচ পাওয়ার সম্ভাব্য সময়গুলো জেনেছি। জেনেছি পূর্ণিমায় যখন চারপাশ ভেসে যায় তখন ঢেউ বয়ে আনে জলকাচ। ভাটার দু’ঘণ্টা আগে বা পরে বেড়ে যায় ওইসব গুপ্তধন পাওয়ার সম্ভাবনা। ভিড় ছাপিয়ে আমার মতো কাচপ্রেমীদের ক্রমেই আলাদা চিনতে শিখেছি। জেনে গিয়েছি কাচ সংগ্রাহকদের অদৃশ্য কঠোর নিয়ম। ঢেউয়ের ওই দান সবটুকু নেয়া যায় না, কিছু রেখে আসতে হয়। মাঝে মধ্যে অদ্রিশও সঙ্গী হয় আমার।
মেয়েটি ফোন দিয়েছিল দু’তিন দিন পর। তার নাম লরা। জানিয়েছিল, তার দাদু তথা রন আলঝেইমারের রোগী। প্রায় ২০ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় ওই সাগরেই ডুবে মৃত্যু হয়েছিল তার মেয়ের। তিনি লরার মা। জলকাচের গয়না গড়তেন তিনি। দূর-দূরান্ত থেকে মেয়ের জন্য কাচ কুড়িয়ে আনতেন তিনি। কাচ নিয়ে তার অগাধ পড়াশোনা। চোখের দেখায় নির্ভুল বলে দিতে পারতেন সময় বা কাচের মূল্যমান। আলঝেইমার ধরা পড়েছিল বেশ আগে। ক্রমেই গুটিয়ে নিচ্ছিলেন নিজেকে। গত এক বছর লোকজনের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। স্টেইজ ফাইভ। এমনই হওয়ার কথা। স্মৃতি চলে গেছে এরও আগে। লরা অবাক হয়েছিল সেদিন! কেননা এক বছর পর তার দাদু পুরো অর্থপূর্ণ বাক্য বলেছেন। সে বললো, ‘কাল তোমরা আমার দাদুকেও নতুন জীবন দিলে। ধন্যবাদ তোমাদের।’ লরার ধারণা, রন তার মেয়ের ছাপ দেখেছিলেন আমার মধ্যে। তাই জেনে-বুঝেই অসাধারণ কাচটি আমাকে দিয়েছিলেন তিনি। ফোন রেখে দেয়ার পর লকেটটা হাতে নিয়ে দেখছিলাম। কেমন গাঢ় বেগুনি লাগছে যেন! হয়তো মনের ভুল।
আমার শরীরের ভেতর বাড়ছে আমার কঙ্কাবতী। ‘মাম্মা’- আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমি জানি, সে থাকবে এবার।

মুক্তিযুদ্ধের সার্থকতার জন্য

যতীন সরকার

 

‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়, মুক্তিযুদ্ধ
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’
- শামসুর রাহমান

 

কবির এই খেদোক্তি মিথ্যা নয় নিশ্চয়ই। মুক্ত স্বদেশকে উদ্ভট উটের পিঠে চলতে আমরা সবাই তো দেখেছি ও দেখছি, এখনো সে চলার বিরাম হয়নি। সেই চলাকে আমরা কখনোই যে মেনে নিয়েছি, তাও নয়। উদ্ভট উটের পিঠ থেকে আমার স্বদেশকে নামিয়ে আনার চেষ্টাও আমরা করেছি। আমাদেরই মধ্যে এ রকম চেষ্টা করতে গিয়ে যার বুক-পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল তার নাম নূর হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নূর হোসেনের আত্মত্যাগের কথা আমরা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি। কবি শামসুর রাহমানও তাই করেছেন। কিন্তু নূর হোসেনের হত্যাকারী ধর্মান্ধের দল এখনো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিধর এবং সেই শক্তির প্রকাশ তারা প্রতিনিয়তই ঘটিয়ে যাচ্ছে। শামসুর রাহমানের মতো কবিকেও তাদের শক্তির লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এ সম্পর্কে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার লিখেছেন- 

“বুকেপিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন নূর হোসেন। তাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান- ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। ওই বুক শামসুর রাহমানের নিজেরও ছিল। সেখানে সেক্যুলার মানবতার পদ্ম ফুটতো। ওই পদ্ম অসহ্য বলে ধর্মান্ধরা তাকে খুন করতে চেয়েছিল। ছেলে ফায়াজের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন সে যাত্রায়। আরো একটি ওই রকম বুকের মানুষ ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সে বুকও রক্তাক্ত করেছিল ধর্মান্ধরা।”
শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদ- দু’জনই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাদেরই মতো যাদের বুকে ‘সেক্যুলার মানবতার পদ্ম’ ফোটে তারা আজও অসহায়। ধর্মান্ধদের কাছে ওই ‘পদ্ম’টি আজও অসহ্য। অথচ ওই সেক্যুলার মানবতার পদ্মটিকে অধিগত করাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পাকিস্তানি শাসনে ওই পদ্মটি ছিল আমাদের নাগালের বাইরে। তাই ওই পদ্মটিকে পাওয়ার জন্য পাকিস্তানকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, আমরা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছিলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ওই সংগ্রামের সমাপ্তি
ঘটিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি, বরং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সে সংগ্রামের প্রকৃত সূচনা ঘটেছিল। সেই সূচনাতেই আমরা একটি পাকা দলিল তৈরি করে রাষ্ট্রের ওপর আমাদের (অর্থাৎ জনগণের) মালিকানা পাকা করে

নিয়েছিলাম। সেই দলিলটির নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। অভিজ্ঞজনরা বলেন, এমন সংবিধান নাকি পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রেরই আছে। আমাদের সংবিধানটি তো আসলে লেখা হয়েছে লাখ লাখ শহীদের রক্তের অক্ষরে। এর প্রতিটি বাক্য সেই রক্তের ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকারের ধারক। অবিরাম মুক্তি সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েই সেই অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। দেশের প্রতি মানুষকে ক্ষুধা, নগ্নতা, অশিক্ষা, কর্মহীনতা ও অনিরাপত্তা থেকে মুক্তি দেয়াই অবিরাম এবং অনিঃশেষ মুক্তি সংগ্রামের লক্ষ্য। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা স্বাধীন দেশে পথচলা শুরু করেছিলাম। স্বাধীনতাকে সার্থক করে তোলার প্রত্যয়ই ধারণ করেছিল আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুই হয়েছিলেন মুক্তি সংগ্রামেরও সেনাপতি।
কিন্তু হায়, আমাদের সেনাপতিকেই সপরিবারে নিহত করে অট্টহাস্য করে উঠলো স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের ঘৃণ্য দুশমনরা। তাদের অট্টহাস্যকে স্তব্ধ করে দিতে পারলাম না আমরা। কেবল নিষ্ফল ক্ষোভে আঙুল কামড়ানো ছাড়া কিছুই যেন করার রইলো না আমাদের। আমাদের সংবেদনশীল কবিদের কণ্ঠেও হাহাকার ধ্বনিত হয়ে উঠলো। এমনই এক কবি অকাল প্রয়াত রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ অসহ্য হয়ে ওঠায় রুদ্ররোষে তিনি বলে উঠলেন-
‘স্বাধীনতা- এ কি তবে নষ্ট জন্ম?
এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল!
জাতির পতাকা আজ খামচে ধরছে পুরনো শকুন।
বাতাসে লাশের গন্ধ-
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান।’

বাতাসে লাশের গন্ধ এখনো মিলিয়ে তো যায়ইনি, প্রতিনিয়ত সে গন্ধ বরং বাতাসকে কেবলই দূষিত করে চলছে। সেই গন্ধের হাত থেকে কি মুক্তি মিলবে না আমাদের?
মিলবে অবশ্যই। তবে সে মুক্তি আপনাআপনিই আমাদের হাতে এসে ধরা দেবে, আমাদের কিছুই করতে হবে না- এমন ভেবে আত্মপ্রসন্ন হয়ে বসে থাকলে সেটি হবে মূর্খের স্বর্গবাস। ওরকম মেকি স্বর্গ থেকে মাটিতে নেমে আসতেই হবে। আত্মপ্রসাদের সামান্যতম অবকাশও নেই। জাতির পতাকাকে যারা খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুনগুলোর নোংরা হাতগুলো ভেঙে না দেয়া পর্যন্ত আমাদের পরিত্রাণ নেই। শুধু পুরনো শকুন নয়, তাদের নতুন চেলাগুলোও রেয়াত দেয়া চলবে না। মিত্রের বেশ ধরে আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়া শত্রুদের যথাসময়ে চিনতে পারিনি বলেই অনেক বিপত্তি এতকাল ধরে পোহাতে হয়েছে। এখনো যদি শত্রু-মিত্র চিনে নিতে না পারি তাহলে সেসব বিপত্তি আরো বহু গুণিত হয়ে দেখা দেবে।
সমস্ত বিপত্তি থেকে পরিত্রাণ লাভের একমাত্র উপায়ই হলো মুক্তি সংগ্রামের মূল্যবোধের আলোয় পথচলা। আমাদের শত্রুদের লক্ষ্যই হলো সেই আলোটি নিভিয়ে ফেলা, অন্তত জনগণের দৃষ্টিসীমা থেকে আলোটিকে দূরে নিয়ে যাওয়া। সেই আলোকবর্তিকাটি আড়াল করে খোঁপ খোঁপ অন্ধকার তারা এখানে-সেখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ রকম অন্ধকারের মূল উপাদানই হলো ধর্মান্ধতা। স্পষ্ট করে বলি- ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতা। আমাদের মানুষের ধর্মপ্রাণতা হচ্ছে ‘ধর্ম’ শব্দটির মূল মর্মের ধারক আর ধর্মান্ধতা ধর্মের মূল মর্মেরই সংহারক। ধর্মপ্রাণদের চিত্ত শুভবুদ্ধি ও মুক্তবুদ্ধিতে ভরপুর বলেই সাম্প্রদায়িকতা তাদের কাছে একান্তই ঘৃণ্য। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতাই ধর্মান্ধদের আশ্রয়। জনগণের ইহলৌকিক মঙ্গলবিধায়ক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকেও তারা ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার আওতায় নিয়ে আসার কোশেশ করে। দেশের ধর্মপ্রাণ লোকসাধারণের কাছে ধর্ম হচ্ছে তাদের অন্তরের গভীরে সুরক্ষিত অমূল্য সম্পদ। আর ‘হৃদয়ের অন্তস্তলে যে মানিক গোপনে জ্বলে সে মানিক কভু কি কেউ বাজারে বিকায়?’ অথচ ধর্মান্ধরা তো ধর্মকে বাজারের পণ্যেই পরিণত করে ফেলে।
ধর্মের এ রকম বাজারি পণ্য হওয়া রোধ করতেই আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে আমরা সেক্যুলার মানবতার পদ্ম দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কারণ ওরকম রাষ্ট্রেই তো ‘গণতন্ত্র’ তার সহস্র দল মেলে সবার জন্য সুবাস ছড়ায় এবং সেই গণতন্ত্রই রাষ্ট্রের সব অধিবাসীর জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-বাসস্থান-কর্মসংস্থান-নিরাপত্তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করে। কিন্তু একান্ত দুঃখ এই- সেই একান্ত বাঞ্ছিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছি।
হ্যাঁ, গণতন্ত্রের একটা কাঠামো আমরা বজায় রেখেছি বটে কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই কাঠামোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অন্তঃসারের দেখা মিলবে না। জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে বা অন্যত্র পাঠায়। উদ্দেশ্য- প্রতিনিধিরাই গণতন্ত্রকে সার্থক করে তুলবে। আসলে সেটি হয় কী!
হয় না যে, সে কথা বোঝানোর জন্য একটুও বাকবিস্তারের প্রয়োজন পড়ে না। এটি সর্বজনজ্ঞাত সত্য। সংসদকে ফালতু বানিয়ে তোলার ক্ষেত্রে, মাসের পর মাস সংসদে না গিয়ে সংসদ সদস্যের সব সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে, সংসদে গিয়েও জনগণের সমস্যা-সংকটের সমাধান খোঁজার বদলে নোংরা খিস্তিখেউড়ের আসর জমিয়ে তোলার ক্ষেত্রে- ‘ক’ দল আর ‘খ’ দলের মধ্যে কোনোই তফাত দেখতে পাওয়া যায় না। ভোটের আগেকার ও পরেরকার জনপ্রতিনিধিদের আচার-আচরণ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভোটার জনগণকে বলতে হয়- ‘যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ।’
এ অবস্থারও অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানার যথাযথ প্রতিষ্ঠা করা যায় অবশ্যই। এরই সুলুক সন্ধান আমাদের সংবিধানেই পাওয়া যায়। আমাদের সংবিধানে যে ‘বিকেন্দ্রীকরণ’-এর কথা বলা হয়েছে এর তাৎপর্য একান্তই গভীর। শাসক ব্যবস্থার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের ওপর জনগণ তার মালিকানার প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে পারে। কিন্তু সংবিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বদলে কেন্দ্রীকরণকেই শক্তপোক্ত করে যাচ্ছে তারাও আমাদের অচেনা নয়।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনের কথা এখন আমাদের স্মৃতিতেই আছে কেবল। এখনকার মূলধারার ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান অমুক বা তমুক রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায়। এসব ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছাত্রের চেয়ে অছাত্রেরই সংখ্যাধিক্য। তাদের মূল কাজ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং আরো নানান ধরনের ‘বাজি’। এসব ‘বাজিকর’দের কবলে পড়ে পরিত্রাহি চিৎকার করতে হচ্ছে নিরীহ জনগণকেই। কিন্তু বাজিকররা বাজি দেখায় যাদের সুতার টানে তারা আমাদের অতিচেনা হলেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতাও আমাদের কারোরই নেই।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তার একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রের এসব অনর্থের জন্য আমাদের সরকারগুলোর ‘সামর্থ্যরে অভাব’কে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন-
“সামর্থ্যরে অভাব যে রয়েছে তার প্রমাণ হ’ল সংসদীয় নির্বাচনে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, একটি জরিপে তাদের সবার জন্য একটি প্রশ্ন ছিল, নির্বাচিত হলে আপনি কী করবেন? জবাব প্রায় এক রকমেই ছিল- এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা-স্বাস্থ্য কোনো একটা বিষয়ে কিছু করা। ৩০০ জনের মধ্যে একজনও বলেননি, তিনি নতুন কোনো আইন চান বা প্রচলিত কোনো আইনের সংস্কার চান। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাদের চাওয়ার কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক ভিত্তি নেই এবং আইন প্রণেতা হিসেবে তাদের কোনো প্রকৃত প্রস্তুতি নেই বা প্রকৃত যোগ্যতা নেই। অন্য কথায় আমাদের সংসদ গঠিত হয়েছে একদল আইনের প্রশ্নে অজ্ঞ ব্যক্তির সমন্বয়ে। স্বাভাবিক নিয়মে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগুরু অংশ আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন। আমাদের জাতীয় সংসদে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। ফলে যা হওয়ার তাই-ই হয়েছে।”
এ রকম অবাঞ্ছিত অবস্থার অবসানের জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিকদের সার্থক কর্মপন্থা গ্রহণ। এ রকম কর্মপন্থা গ্রহণের মানে হলো একটি তীব্র তীক্ষè সামাজিক আন্দোলনের সৃষ্টি করা। মুক্তিযুদ্ধকে সার্থক করে তোলার জন্য এ রকম সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। এ রকম সামাজিক আন্দোলনের সাফল্যের মধ্য দিয়েই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের সৃষ্টি হতে পারে। সে রকমটি হলেই কোনো কবিকে আর সখেদে বলতে হবে না, ‘মুক্তিযুদ্ধ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’

 


লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক

 

এলো বৈশাখ

 

বয়ে যাওয়া সময়ের স্রোতে বসন্ত চলে গেল নীরবে অনেক ঘটনার সাক্ষি হয়ে। আর এই ‘চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়’, ফিরে আসার নতুন প্রস্তুতি। বসন্ত যে অপার রূপসুধা রেখে গেল প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে তাকে ভিন্নমাত্রা দিতে এসেছে বৈশাখ।
ষড়ঋতুর প্রতিটি মাস স্বতন্ত্র। তবে কোথায় যেন মিশ্রিত অদ্ভুত রসায়নে। বৈশিষ্ট্যে আলাদা হলেও রূপ-বৈচিত্র্য প্রকাশে কারো কমতি নেই।

বাংলার বারোটি মাস বাজার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান নগর জীবনে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে বাংলা সন এখনো সচল। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এবং কৃষকের ফসল বোনা ও তোলা কর্মকা-ে বাংলা সন-তারিখ এখনো কার্যকর। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণ, উপবাস, শ্রাদ্ধ-শান্তি- সব অনুষ্ঠানই বাংলা সন-তারিখের হিসাবে হয়ে থাকে।
মোগল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন বলে কথিত থাকলেও এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও বঙ্গাব্দের গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো। অথচ এটি শকাব্দের সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দ বা বিক্রমাব্দের মাস ও দিনের নামের অনুরূপ বাংলা সনের মাস ও দিনের নাম। তবে শকাব্দের প্রথম মাস চৈত্র আর বিক্রমাব্দের শুরুর মাস কার্তিক। অথচ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে শকাব্দের দ্বিতীয় এবং বিক্রমাব্দের সপ্তম মাস বৈশাখকে। পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বঙ্গদেশের ফসলি সনের প্রথম মাস অগ্রহায়ণের অবস্থান বাংলা সনে অষ্টম। স্মরণাতীতকাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম ধরে বর্ষ গণনার রীতি প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। কৃষির দিক বিবেচনায় আনলে ফসল কাটার মাস অগ্রহায়ণ হওয়ার কথা বছরের শুরুর মাস। আবার আনন্দ-উৎসবের জন্যও গ্রীষ্মকাল শীত বা বসন্তের মতো মনোরম নয়। তাহলে নববর্ষ কেন শুরু হলো গ্রীষ্মের বৈশাখে তা এখনো রহস্যময়। তবে যিনিই বাংলা সনের প্রবর্তন করে থাকেন না কেন, তিনি যে হালখাতা ও পুণ্যাহর মাধ্যমে বাঙালির উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন চমৎকার সমন্বয়ে অচ্ছেদ্যভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন এতে সন্দেহ নেই। তবে এটিও ঠিক সময়ে সব বাঁধনই শিথিল হয়ে যায়। অনেক ঐতিহ্য বাঙালির জীবন থেকে বিস্মৃত না হলেও ঠাঁই নিয়েছে কাগজ, গল্প ও কবিতায়।

বছরের শুরুটি উৎসবমুখর করে তুলেছেন বাঙালি সাধ্যমতো। শুরুর দিনটি অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধনের রঙিন স্মারক করে রাখতে চায় বাঙালি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালন হলো কতোটুকু বাঙালিয়ানায়? কতোটা সরে আসতে হয়েছে আবহমান ঐতিহ্য থেকে? কতোটা নিতে গিয়ে কতোটুকু হারালো বাংলা সংস্কৃতি নিজের স্বকীয়তা? এর জবাব আমরা পেয়ে যাবো ষড়ঋতুর বারো মাসে বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনে। তবে নতুন বাংলা বছরটি জাতীয় জীবনে বাঙালি খুঁজে পাক আপন ছন্দ, দ্বন্দ্ব ভুলে। সকল পঙ্কিলতা ধুয়ে দেশ এগিয়ে যাক এই হোক প্রর্থনা।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : আইরিন
পোশাক : নিপুন
ছবি : ফারহান ফয়সাল

জলেশ্বরীর ট্রেনের বাঁশি

সৈয়দ শামসুল হক

 

 

গল্পের ঘন নীল পথের ওপর সবুজ সোনালি রঙে একটা বাঁশি এসে পড়ে। আহা, বাঁশি! ওই বাঁশি, বুকে যার সাতটি ছিদ্র। এই ছিদ্র গরম লোহার শিকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে তৈরি।
পোড়া ছিদ্রের ভেতর থেকে আগুনের দগ্ধতা ফুলের বাগান করে স্বর্গ থেকে সুর টেনে আনে। কৃষ্ণ বাজায়, রাধা ঘর ছেড়ে যমুনার তীরে বাইরে যায়। আমাদের পল্লী গায়ক টুংসু মামুদের কণ্ঠে গান ফোটে ভাওয়াইয়া অভ্যাসের বিপরীতেÑ

‘ও লো সই, আমি কার কাছে যাই
আমি কার কাছে বা যাই।’

বাঁশির শব্দে প্রাণ করে আইঢাই। কিন্তু আমাদের গল্পপটে ওই বাঁশির ছবি এখন নয়। আমরা কানে শুনতে পাই জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি।
রাজারহাট, নবগ্রাম আর জলেশ্বরীতে পাট ও সুপারির চালান অধিক হয়ে গেলে রাতদুপুরে জলেশ্বরীতে মালগাড়ি আসে। গভীর রাতে স্তব্ধতার ভেতরে আকাশের নক্ষত্র পোড়া অগ্নির নিচে মালগাড়ি এসে রাজারহাটে থামে। ফেরার পথে এখান থেকে মালের চালান তুলবে। নবগ্রামেও তুলবে না। একেবারে জলেশ্বরী এসে থামবে। তারপর মারোয়াড়িদের পাটের গাঁইট আর ব্যাপারীর বস্তা ঘুমজাগা চোখে কুলিরা মালগাড়িতে তুলতে থাকবে। বাঁশি দিয়ে গাড়ি ছেড়ে যাবে।
অসময়ের গাড়ি, মধ্যরাতের গাড়ি নবগ্রাম থেকেই তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়Ñ অ্যা, অ্যা, অ্যা বলে সে ডাকতে থাকে, আমি আসছি। আমি আসছি।
বাঁশির তো এই কাজ। আসার খবর দেয়া। শ্যামের বাঁশি তার ভেতরেও খবর দিয়ে আধকোষার পাড়েÑ না না, যমুনার পাড়ে তমাল তলে ডেকে এনেছিল। বাঁশি দিতে দিতে গাড়ি ফিরে যায়। ক্রমেই তার বাঁশির শব্দ অন্ধকারের নক্ষত্রের ছোট্ট একটি বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়।
খুব ছোটবেলা থেকেই এই বাঁশির সঙ্গে আমরা পরিচিত। সকাল ১০টায় ব্রিটিশ আমলের কাঁটায় কাঁটায় গাড়ি আসে। ১১টায় ফিরে যায় গাড়ি। আমরা মাগরিবের নামাজের পর সন্ধ্যাকালে ডিস্ট্যান্ট সিগনালের কাছে জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনের বাঁশি শুনি। তখন আমাদের পড়তে বসার সময় হয়নি। আমরা দুঃসাহসী বালকেরা কেউ কেউ মা-বাবার চোখ এড়িয়ে স্টেশনে ছুটে যাই গাড়ি দেখতে, মানুষ দেখতে। মানুষের ওঠানামা দেখতে।
ওই বালক বয়সে যাত্রীদের এই আসা-যাওয়া নিয়ে আমাদের মনে একটা ভাবের উদয় হয়। ওই ভাবের সঙ্গে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটি এখনই ছেড়ে যাবে। গাড়িটির বাঁশি বেজে ওঠে। সাত ছিদ্রের বাঁশি তো নয়, ইঞ্জিনের খোলের ভেতরে তামার নলের ভেতরে জমে থাকা বাষ্প। ড্রাইভারের হাতে সুতা ঝুলছে। ওই সুতো ধরে টান দিলেই নানান সুরে বেজে ওঠে ইঞ্জিনের বাঁশি। সবার হাতে ইঞ্জিনের ওই কলের বাঁশির সুর ফোটে না। সুতায় টান দিলে মনে হয়, তাদের হাতে পাগলা ঘোড়া হিঃ হিঃ করে ডেকে ওঠে। সামনে বড় চাকার নিচে সাদা বাষ্পের মেঘ তুলে নবগ্রামের দিকে রওনা হয়ে যায়।
আর ওই যে ভাবের কথা আমরা বলেছি, আমরা জানি না এর কী অর্থ। আমরা দুই চোখভরে যাত্রীদের দেখি। এ জন্যই ট্রেনের বাঁশি শুনে জলেশ্বরীর ছোট্ট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াই। আমরা ওই তল্লাটের বালক বলে টিকিট মাস্টার আমাদের চ্যালেঞ্জ করেন না। যাত্রী বের হওয়ার গেইট দিয়ে আমাদের বের করে দেয় পিঠে থাবড়া মেরে হাসতে হাসতে বলেন, ‘দুই বেলা ইস্টিশানে আসিয়াও টেরেন দেখিবার হাউস না মিটিল?’
আমাদের ভেতরে দুষ্টু মোফাজ্জল বলে, ‘হাউস কি আপনার মিটিছে?’
‘তুই তো বড় নঙ্গর হইছিস রে?’
মোফাজ্জল দৌড়ে বেরিয়ে যায় টিকিট মাস্টারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
ইঞ্জিনের বাঁশি বেজে ওঠে। গাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
এর চেয়ে কতো হাসকাব্য হয়। একবার নবগ্রাম থেকে এক পোয়াতি বৌকে জলেশ্বরী হাসপাতালে আনা হচ্ছিল রাতের গাড়িতে। ব্যথা উঠেছে আর জলেশ্বরী ঘনিয়ে আসছে। ইঞ্জিনটাও বুঝি টের পেয়েছে তার গাড়িতে পোয়াতি বৌ। তীব্রস্বরে ড্রাইভার বাঁশি বাজাচ্ছে। স্টেশন মাস্টার অবাক হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন প্ল্যাটফর্মের কাছে এতো ঘন ঘন বাঁশি? তবে কি কেউ কাটা পড়েছে? আত্মহত্যা করলো কেউ? কিন্তু বাঁশি থেমে যায়। ড্রাইভার লাফ দিয়ে নামে। এদিকে গার্ড তার সাদা গাড়ি থেকেও লাফ দিয়ে নামে। আমরা দেখি স্বপ্নে, কী বাস্তবে, এই বয়সে এখন আর তা মনে নেইÑ দু’জনের হাতে দুই নবজাতক। যমজ শিশু। ইঞ্জিনের বাঁশির শব্দে ভীত ওই নারীর গর্ভ থেকে দুই সন্তান বেরিয়ে এসেছে। তাদের নাম রাখা হয় খুব গোপনে, খুব কানে কানে যেন কেউ শুনতে না পায়। ছেলেটির নাম জয়, মেয়েটির বাংলা। ১৯৭১ সাল।
এটা তো হাসকাব্য নয়। তবু যে বালকবেলায় আমাদের মনে হয়েছিল, কারণ বুঝি, জগতের আমরা তখন বুঝি কিছুই জানি না। সবখানে উজ্জ্বল অকারণ হাসির একটা লাফিয়ে ওঠা চোখেই দেখতে পাই। আমাদের ভেতরে বড় প-িতের প-িত নফলচন্দ্র দাস। সে বলে, ‘আরও শুনিয়া রাখো, টকি সিনেমা যে দেখিতে যাস, ছবির আওয়াজ তো শুনিস, কথা কয়, কাঁই কথা কয়? সিনেমার সাদা পর্দার পেছনে পিতলের থরে থরে গেলাস আর সেই গেলাসের ভেতর হতে আওয়াজ ফুটি ওঠে।’
আমাদের বিশ্বাস হয় বা হয় না। আবার মনে পড়ে, স্টেশন রোডে মিষ্টির দোকানের মালিক হানিফ ভাই বলেন, ‘বাঁশি এমন চিজ। স্তব্ধ মারি পড়ি থাকার নয়। নিশীথ রাইতে একা বাঁশি বাজি ওঠে। আগুনপোড়া বাঁশি সাত ছিদ্র হতে বুড়িয়া আঙুলের ডগার মতো সাত পরি বিরায় আর বিলাপ করে আর বাঁশি বাজায়।’
আমাদের মন বিষণœ হয়ে যায়। আমাদের ভেতরে অতি বড় হাসিওয়ালা বালকও গম্ভীর হয়ে যায়।
হানিফ ভাই রাতের শেষে গাড়িটির ছেড়ে যাওয়ার বাঁশি শুনে হাতঘড়িতে টাইম মেলানÑ ‘রাইতের এখন ১১টা। ব্রিটিশ আমল বলিয়া কথা, টাইম ধরিয়া গাড়ি আসে, গাড়ি যায়। সেই দূর নবগ্রাম হতে তার বাঁশির আওয়াজ পাওয়া যায়।’

একদিন বাঁশির আওয়াজ আর আসে না। ইঞ্জিনের বাঁশি আর বাজে না। কিন্তু গাড়ি আসার ঘড় ঘড় খড় খড় শব্দ পাওয়া যেতে থাকে। এতো সংকেতময় ওই শব্দ যেন সে স্তব্ধ হয়ে এগোতে পারলেই আরাম পেতো। আমরা কান পেতে থাকি। ট্রেনের বাঁশি বিকল হয়ে গেছে, নাকি এটা ভূতের গাড়ি? রাতদুপুরে আপনমনে জংশন থেকে জলেশ্বরীর দিকে আসছে?
জলেশ্বরীতে ট্রেন লাইন বসার হুকুম যখন হয় তখন পয়সার বরাদ্দে টান পড়ে। তাই রেললাইনের জন্য পুরনো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের আঁকাবাঁকা নরম রাস্তার ওপর লাইন পাতা হয়। তাই রাজারহাট থেকে জলেশ্বরী পর্যন্ত গাড়ি সাত-আট মাইলের বেশি বেগে চলতে পারে না।
আমরা আতঙ্কে বিছানায় বসে থাকি। ঘরে ঘরে মানুষ জেগে ওঠে। তারাও জেগে বসে থাকে। যুবকরা লাঠি নিয়ে পথে নামে। তারা কী করে যেন টের পায় রংপুর থেকে মিলিটারির গাড়ি নিঃশব্দে জলেশ্বরীর দিকে আসছে শত শত খুনি পাঞ্জাবি সৈন্য নিয়ে।
গাড়ির গতি ধীর এগিয়ে আসছে। থামা নেই। এগিয়ে আসছেই। রাতের শেষ অন্ধকারেও ট্রেনের জানালা দিয়ে তাদের উঁচিয়ে ধরা রাইফেলগুলোর নল চোখে পড়ছে। যুবকরা চৌরাস্তায় বেরিয়ে এসে পুরনো দিনের কলের গানের চোঙ খুলে চিৎকার করে ডাকছেÑ ‘মা-বোনেরা, মাও-জননীরা ঘর হতে বির হয়া আসেন, পাঞ্জাবিরা আসিচ্ছে। কাউকে না ছাড়ান দিবে। যার যা আছে ঘরে থুইয়া বির হয়া আসেন।’
তারপর জলেশ্বরীর নারী-যুবতীরা দীর্ঘ সারি বেঁধে আধকোষা নদীর ওপারে ভোগডাঙায় চলে যায়। এদিকে ভোর হয়ে আসে। ভোরের আলো পাপী-পুণ্যবান সাধু বা শয়তান বিচার করে না। সবার ওপর আলো পড়ে। জলেশ্বরীর প্ল¬্যাটফর্মে খুনি ট্রেন এসে থামে। জানালায় জানালায় রাইফেলের ফলায় সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করে ওঠে যেন আলো নয়, রক্তেই ওদের পিপাসা। ঠিক তখন একাত্তরে শেষবারের মতো জলেশ্বরীর দিকে আসা ট্রেনটিতে বাঁশি বেজে ওঠে। তীব্র-তীক্ষè ওই স্বর। সঙ্গীতের স্বর নয় যেন একটি চিৎকারÑ ‘আদমি নেহি, মিট্টি চাহিয়ে, মিট্টি চাহিয়ে, আদমি নেহি। সব মুক্তিকো তালাশ কর, তালাশ কর।’ তারা সারা শহরে ছড়িয়ে যায়। তারপর থেকে জলেশ্বরীতে আসা-যাওয়া আর কোনো ট্রেনেরই বাঁশি বাজে না। নীরবে, নিস্তব্ধে জলেশ্বরী লাশ হয়ে যেতে থাকে। গানের গলা ছিল আমাদের খোকা ভাইয়ের। সে গাইতোÑ ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে...।’ তার গলাচেরা লাশ জলেশ্বরীর রাস্তায় পড়ে থাকে। কিন্তু তার গান আকাশ-বাতাসে মানুষের মধ্যে ভাসে।
চাঁদ বিবির পুকুরে চাঁদ বিবির লাশ পড়ে থাকে উপুড় হয়ে। হাই স্কুলের কমনরুমে মুমূর্ষু বাঙালিদের হাতের রক্তাক্ত ছাপ। কেউ একজন খুব বড় করে ‘বর্গীয় জ’ লিখেছিল। তারপর আর লিখতে পারেনি। সম্ভবত তার রক্ত ফুরিয়ে গিয়েছিল। এরপর পাশেই কে একজন শক্ত হাতে খুব বড় করে ‘অন্তস্ত অ’ লেখে। দেয়ালে ফুটে ওঠে বিশাল অক্ষরে জয়। রক্তের রঙ লাল। ওই লাল দিনে দিনে শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। যেন পৃথিবীর সব রঙ শোষণ করে যে সাদা এর বিপরীতে এই কালো রঙ দুষ্ট-নষ্ট রঙ হয়ে পৃথিবীকে এখনো শাসন করতে চায়। পারে না।
হঠাৎ চারদিক থেকে বাঁশির শব্দ শোনা যায়। ট্রেনের বাঁশি যেন শত শত গাড়ি এখন জলেশ্বরীর দিকে। এই ট্রেনেরও জানালায় জানালায় বাংলার যুবকরা, সঙ্গে তাদের সাইকেল, সাইকেলের ডগায় নতুন সূর্যের আলো। তারা চুপ চুপ করে জলেশ্বরীতে নামে আর চিৎকার করে বলে, ‘জয় বাংলা’। এরই সঙ্গে সুর মিলিয়ে ট্রেনের শত শত বাঁশি বেজে ওঠে। পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বাঁশির ওই শব্দে ট্রেনের বাঁশি নয় যেন উত্তাল একপাল ঘোড়া আকাশের দিকে মুখ তুলে হ্রেষা নয়, বাঁশির শব্দ করছে আর একটি বাঁশি তার বুকে সাত ছিদ্র থেকে বাংলার চোখের অশ্রু আধকোষা নদীর ঢলের মতো সরছে, ঝরে পড়ছে।

(২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে লেখক রোগশয্যায় গল্পটি রচনা করেছেন।)
অনুলিখন : লেখকের স্ত্রী কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক

নববর্ষের ঘনঘটা নিছক বিনোদনেই শেষ 

আহমদ রফিক

 

 

সময়ের সুনির্দিষ্ট সীমারেখায় বলা যায়, সালতামামিতে নতুন দিন, নতুন বছরের বরণ তাকে প্রিয়মুখ ভেবে নিয়ে, তার সাংবাৎসরিক আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত না জেনে। এটাই দেশ-বিদেশ নির্বিশেষে সর্বত্র ‘শুভ নববর্ষ’ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। যে আসছে সে কতোটা শুভ, কতোটা নয় তেমন বিচার উহ্য রেখেই বর্ষবরণের আবেগমথিত উৎসব-অনুষ্ঠানে আমরা মিলিত হই। ওই আবেগের টানে প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্ন উচ্চারণ ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...।’
নতুন বছরের উর্দি পরা সময় খ-টি আমরা এভাবেই অভিনন্দন জানাই, বরণ করে প্রাত্যহিক জীবনের ঘরে তুলে নিই। তারপর চলি, ভিন্ন চেহারার এক বর্ষ মাসের হাত ধরে। সে খ্রিস্টীয় বর্ষ মাস শীত থেকে শীতে শুরু ও শেষ। সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, ভাষিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গর্ব ও অহঙ্কারের জায়গাটি স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত এবং তা আমাদের জীবন আচরণে মূলত শাসনযন্ত্রের সিদ্ধান্তে।
এসব তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বক্তব্য নিয়ে বছরের পর বছর লিখে যাচ্ছি। এতে কি সমাজ নামক বৃক্ষটির একটি পাতাও নড়ছে? মনে হয় না। তাহলে এসব লেখার কি কোনো প্রয়োজন আছে? বিবেচক ব্যক্তিদের বিধান ‘তবু লিখতে হবে, হয়তো একদিন এর সুফল মিলবে।’ কিন্তু সুফল যে মিলছে না বা মিলবে না, অন্তত মেলার সম্ভাবনা যে নেই তা আগে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার পূর্বাভাস বার বার জানিয়ে দিচ্ছে।


যদি গত দুই-তিন দশকের বর্ষ ভাবনার লেখা নিয়ে হিসাব মেলাতে যাই তাহলে এর নেতিবাচক দিকটাই প্রবল হয়ে প্রকাশ পায়। আজ থেকে দুই দশকেরও বেশি আগের এক বৈশাখী নববর্ষেও অঘটন উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছিলাম, ‘এরপর গোটা বছর ধরেই দেখেছি, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কাগজ খুলতেই চোখে পড়ে খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, নারী নির্যাতন সামাজিক অস্থিরতার এক চরম ভাষ্য। সারাটা বছর তাই বিষণœতার হাত থেকে রেহাই মেলেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চিত্তবিকার ঘটেছে বলে মনে হয় না। ... আমি কি তাই বুক ঠুকে বলতে পারি, আমি ভালো আছি? কিংবা চলতি বছরের দিনগুলোতে ভালো থাকবো? এমন নিশ্চয়তা কোথায়?’
সময়ের ব্যবধানে এমন আরো দু’একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতো। এতে একই বক্তব্যের ভরাবৃদ্ধি ঘটতো। এর বদলে গতায়ু বছরটির সালতামামি করতে গেলে গেল ঘটনাদির বিচারে ওই একই চিত্র। রঙটা বরং আরো গাঢ়। বিশেষ করে গুম, খুন, নারী নির্যাতন এতোটাই যে, বুকে হাত রেখে বলা যাবে না সামাজিক দূষণ কমেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতারও কমতি নেই। বরং এমন সত্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামাজিক ব্যাধির বিস্তার ঘটছে। সামাজিক দূষণের মাত্রা বেড়েছে। সুস্থ সামাজিক শক্তি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ব্যক্তিক নিরাপত্তা সুতার ওপর ঝুলছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের নেশায় বুঁদ রাষ্ট্রযন্ত্রের হৃদয়ে ব্যক্তিবিশেষের (নারী বা পুরুষ কিংবা শিশু) কান্না প্রতিক্রিয়ার ঢেউ তুলছে না। আমরা যে যার অর্জনের পেছন ছুটছি। অন্যদিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই।

 

 

বৈশাখী নববর্ষেও উৎসব-অনুষ্ঠান তাই বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে। বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন
গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল।

 


‘আপ্না ভাল্/আজ না কাল্’ এটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন যাপনের আদর্শ। এ ধারা যেমন ব্যক্তিগত তেমনি দলগত। ঘরে বসে ড্রয়িংরুম সংলাপে সমালোচনার ঝড় তুলছি। কিন্তু মাঠ-ময়দান-রাজপথে তেমন ভাবনার ঐক্যবদ্ধ প্রকাশ ঘটাই না। সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী মানুষের মতো নিজের ভালো-মন্দ বুঝে নেয়ার বাইরে কিছু ভাবতে বা করতে চাই না। এমনটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বৃহত্তর নাগরিক সমাজের ধাত।
সত্যিই আমরা চোখ বন্ধ করে সামাজিক দায় এড়ানোর চেষ্টা করছি। অবশ্য সাহিত্য পাঠক বুদ্ধিজীবীর মাথায় কবির এমন পঙ্ক্তিও হানা দেয়, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ কিন্তু এতো অনাচারের মধ্যেও বাংলাদেশে তেমন ‘প্রলয়’ ঘটতে দেখা যাচ্ছে না বলেই বোধহয় দুর্বৃত্তের উৎসাহে ভাটা পড়ছে না। তাদের কর্মতৎপরতা যথানিয়মে চলছে। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে চরম সামাজিক হতাশা।
ওই হতাশার স্রোত এক ধরনের পিছুটান বলা চলে, জনচেতনার পিছুটান। ওই নিস্তরঙ্গ নদীতে রাজনীতির তরী সহজে তর তর করে চলতে পারে। তবু আগাছাসদৃশ ধানশীল মানুষের মন ভোলায়। ভোলায় শিক্ষিত শ্রেণির বিচারবুদ্ধি। সেখানে পার্থক্য নেই কবি, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ পেশাজীবীদের মধ্যে। সমাজ পরিবর্তন দূরে থাক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ইতিবাচক সুফল তৈরি করছে না সুস্থ মূল্যবোদের পক্ষে।

 

ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে, এমন উদাহরণ এদেশে বিরল নয়।

 

দুই.
এমন এক নেতিবাচক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে আমাদের বৈশাখী নববর্ষ পালনে কোনো পিছুটান নেই। আছে প্রবল আবেগ আর উত্তেজনা, বিনোদনের প্রবল তৃষ্ণা মিটানোর তাগিদ। অশ্বত্থবটের নিবিড় ছায়া থেকে বৈশাখী নববর্ষেও রাজধানীর রাজপথে এসে ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ শক্তিমান করে তুলেছে সন্দেহ নেই।
ওই ‘একদিন্কা সুলতান’-এর পক্ষে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার ইতিবাচক প্রকাশ ঘটানোর সম্ভাবনা বা চেষ্টা কোনোটাই দৃশ্যমান নয়। ইতিবাচক সংস্কৃতির জোয়ার আমাদের রাজনীতিকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে এমন উদাহরণ এ দেশে বিরল নয়। এক্ষেত্রে তেমন সম্ভাবনা দূর বিষয়ই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বড় কারণ নববর্ষের সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা যতো প্রবলই হোক, সর্বজনীন চরিত্রের হোক, যতোটা জাতীয় চেতনার ধারক হোক তা একদিনের আবেগ উৎসারে ফুরিয়ে যায়। এর কোনো সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা থাকে না। স্বভাবতই এর ভবিষ্যৎ কোনো সামাজিক তাৎপর্য বহন করে না। বহন করে না সমাজ ও মূল্যবোধ পরিবর্তনের দিক থেকে। এখানে জাতীয় উৎসবের চরিত্র সম্পন্ন বৈশাখী নববর্ষের আড়ম্বর-সমারোহ বা জনসমাগম সত্ত্বেও এক ধরনের সীমাবদ্ধতায় বন্দি। তাই বৈশাখী নববর্ষের অনুষ্ঠান বিনোদনের উৎসব হয়েই থাকছে।
বিনোদনের অন্তর্নিহিত এর সেক্যুলার, সর্বজনীন গণচরিত্রটি সমাজে এর নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে মনে হয় না। পারলে বাঙালিয়ানা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের শিক্ষিত শ্রেণি মানসিক সম্প্রদায়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত থাকারই কথা ছিল। মুক্ত যে নয় নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জসহ একাধিক ঘটনায় সামাজিক শান্তি বিপর্যস্ত হওয়া তেমন প্রমাণ বহন করে। এসব ঘটনার তালিকা বেশি দীর্ঘ।
নির্মোহ বিচারে মানতে হয় একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি মুসলমান সমাজে আকাক্সিক্ষত মাত্রায় সদর্থক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। আমাদের সঠিক সংস্কৃতি চর্চায় এমন পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল। ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী

আলী যাকের

 

 


চৈত্র শেষ হয়ে এলো। রৌদ্র চড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিদাঘের প্রচ-তায় আঁইঢাঁই প্রাণ। শুষ্ক চারিদিক। এই সময় ঘরে কিংবা বাইরে যদি তাপানুকূল পরিবেশ না থাকে তাহলে গ্রীষ্মের দাপট বেশ ভালো বোঝা যায়। একমাত্র বৃক্ষের ছায়ায় কিছুটা শান্তি মেলে বুঝি। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য গ্রীষ্ম মোটেই কারো প্রিয় ঋতু হতে পারে না। তবুও কী যেন আছে এ ঋতুটির মধ্যে যা আমাকে উদাস করে দেয়। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের ওই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে যায়, ‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী... জাগায় বিদ্যুৎ ছন্দে আসন্ন বৈখাশী/হে রাখাল বেণু তব বাজাও একাকী।’
একবার আমাদের দেশের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বছরের কখন শান্তিনিকেতনে যাওয়ার প্রকৃষ্ট সময়। উত্তরে বন্যা বলেছিল, ‘গুনলে বিশ্বাস করবেন না হয়তো। রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে গ্রীষ্মকালকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তার অনেক কবিতা, গান ভরা গ্রীষ্মে রচিত।’ এই রহস্য উদঘাটনের জন্য একবার ভরা গ্রীষ্মে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে গ্রীষ্মকালে সত্যিই প্রচ- দাবদাহ বয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে বেশির ভাগ মানুষ সাইকেলে চলাচল করে। ওই সময় দেখেছি, তাপ প্রতিহত করার জন্য তারা মুখের ওপর কাপর জড়িয়ে নেয়। সূর্যের উত্তাপ এতোটাই হয় তখন যে, শরীর চামড়া পুড়ে যায়। কিন্তু অবাক কা-! শান্তিনিকেতনে যে বিশাল বৃক্ষরাজি এর নিচে গেলে গ্রীষ্মকে আর ততো অত্যাচারী বলে মনে হয় না। ওই গ্রীষ্মে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সর্বত্র গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি আর মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি শ্মশ্রƒম-িত রবীন্দ্রনাথ, পেছনে দুই হাত, গাছের ছায়ায় ছায়ায় তার সৃষ্টি শান্তিনিকেতনের সর্বত্র মৃদুমন্দ গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


আমাদের বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুরই আগমন ও প্রস্থান মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে গ্রীষ্মে কথাটি মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি। আমার বাল্যকাল কেটেছে বাংলাদেশের ছোট ছোট শহরে বাবার চাকরি সূত্রে। ওইসব জায়গায় পাকা বাড়িঘর তখন ছিল অতি নগণ্য সংখ্যায়। বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে থাকতো বিশাল বৃক্ষরাজির বন। আম, কাঁঠাল, জারুল, সেগুন, মেহগনি, কড়ইসহ কতো বিচিত্র বৃক্ষ। স্কুল না থাকলে এসব বৃক্ষের নিচেই আমাদের সময় কাটতো বেশির ভাগ। লুকোচুরি, ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলা নিয়ে মাতামাতি। কিসব দিন গেছে শৈশব! মাঝে মধ্যে বাড়ির কাছের পুকুর কিংবা অল্প দূরের নদীতে সুশীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তিতে ভরে গেছে দেহ-মন। আরেকটু বড় হওয়ার পর আমরা তখন ঢাকায় এসে থিতু হয়েছি, গ্রীষ্মে ওই একইভাবে গাছের ছায়ায় ছায়ায় কেটেছে দিন। চৈত্র দিনের শেষে কোকিলের আহাজারি মনকে সিক্ত করে দিয়েছে। পহেলা বৈশাখে কুটির শিল্পের মেলায় বিভিন্ন খাদ্য-অখ্যাদ্যকে অমৃত বলে মনে হয়েছে। বাঙালির এই শর্তবর্ষের ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে আমরা আজীবন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে। আমাদের বাল্যকাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিলাম। কী এক বিচিত্র দেশ ছিল সেই পাকিস্তান! এক উদ্ভট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দেশ। যে ভদ্রলোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তিনি বলেছিলেনÑ মুসলমানরা একটি জাতিগোষ্ঠী। তাই অন্য ধর্মালম্বীদের সঙ্গে তাদের থাকা চলবে না। তাদের জন্য চাই ভিন্ন এক দেশ। অথচ তিনিও সর্ম্পূণ মুসলমান ছিলেন না। এটা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি নিয়মিত মদপান করতেন। বরাহ মাংস ভক্ষণ করতেন। জীবনে কোনোদিন নামাজ পড়েছেন বলে কেউ বলতে পারবে না। এমন এক ব্যক্তি কেবল ক্ষমতার লোভে একটি দেশের প্রধান হয়ে গেলেন। তার এই দ্বিজাতি তত্ত্ব যে সর্ম্পূণ ভ্রান্ত ছিল তা বুঝতে সময় নেয়নি জনগণ। সেই ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। ক্রমেই আমরা পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিশ্চিয়ানÑ সবাই মিলে একটি পৃথক রাষ্ট্র জন্ম দেয়ার কথা ভাবতে শুরু করি। ১৯৭০ সালের র্নিবাচনের মাধ্যমে এ দেশবাসী স্পষ্ট মতো দেয় বাংলাদেশের পক্ষে। এরপর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এই যুদ্ধ ওই র্ধম, নীতি ও বিবেক ভ্রষ্ট পাকিস্তানের পক্ষে কতিপয় বাঙালি কুলাঙ্গার এ দেশের মানুষের ওপর চরম অত্যাচার করে। তাদের শাস্তির বিধান করা হয় যুদ্ধের পর। আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই, হিটলার ও তার স্যাঙ্গাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয় নুরেমবার্গে এবং জীবত ও মৃত অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয়। কম্বোডিয়ায়ও একই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কিন্তু এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশের মুক্তির পেছনে সব আদর্শ ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে ওই
পাকিস্তানিদের দোসররা আবার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে যাতে করে এই দেশ নব্য পাকিস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে দেশের মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তারা সহজে এই চক্রান্তের কাছে পরাজয় বরণ করতে রাজি নয়। সর্বশেষ আজকে বাংলাদেশে অধিষ্ঠিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিধৃত যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে আবার। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর পরই আবারও সেই পাকিস্তানপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের লাখ লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রতিবাদমুখর হয় ওই চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু চক্রান্ত থেমে থাকে না।


গণমানুষের যে কোনো দাবি উচ্চারিত হলেই ‘ইসলাম খাতরে মে হ্যায়’Ñ ‘ইসলাম বিপন্ন’ এই একটি ভ-ামির আশ্রয় পাকিস্তানিরা সব সময় নিয়ে এসেছে। আজও আমরা দেখতে পাই, তাদের বাংলাদেশি দোসররা ওই একই সেøাগান দিয়ে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেবল বিভ্রন্ত নয়, তারা সত্যনিষ্ঠ যুব সম্প্রদায়কে আঘাত করার চেষ্টা করছে এই অভিযোগ দিয়ে যেন তারা নাস্তিক। এ অতি হাস্যকর একটি অভিযোগ এবং আমরা সবাই জানি, এই ধরনের সুবিধাবাদী কথাবার্তা ধোপে কখনোই টেকে না। একদিন বাংলাদেশের মানুষ রুখে দাঁড়াবেই এ ষড়যন্ত্রকে। শাস্তি হবেই যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব মুক্তবুদ্ধির দেশ হিসেবে।
এই বৈশাখের খরতাপে যখন পারিপার্শ্বিকতা বড় উষ্ণ হয়ে উঠেছে, নাগিনীরা চারদিকে ফেলেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস তখন আমাদের যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ হবে বলে আশা করা বোধ হয় ভুল হবে। ভরসা আমাদের একটি। আমাদের নেতৃত্বে রয়েছে একঝাঁক নিঃস্বার্থ মুক্তিকামী তরুণ যারা অবিরাম লড়ে যাচ্ছে আমাদের চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ এ লড়াই অস্ত্র নিয়ে নয়, এ লড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ প্রত্যয়ী মনোবলের লড়াই। তাই জয় তাদের অনিবার্য। বৈশাখের খরতাপে বিশাল মুক্তি-বৃক্ষের ছায়ায় আমাদের তরুণরা সমবেত আজ। বৃক্ষ তাদের দিচ্ছে আশীর্বাণী। দখিনা হাওয়ায় বয়ে আসছে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। পথ যতোই কণ্টকাকীর্ণ হোক, এগিয়ে তারা যাবেই হাতে হাত ধরে। এগিয়ে যাবে এই বৈশাখ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা সমবেতভাবে অভীষ্ট লক্ষ্যে।

এবং

প্রমিত হোসেন 

 

 

মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের।
বিশ্বাস বলল, আসবে।
অবিশ্বাস বলল, আসবে না।
বিশ্বাসের দিকে অবিশ্বাস তাকাল করুণার দৃষ্টিতে।
বিশ্বাস বলল, তুমি বোকা।
অবিশ্বাস বলল, তুমি অন্ধ।
যাকে নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সে বলেছিল বিকেল চারটের মধ্যে আসবে। বিশ্বাস বড় আশায় তার কথায় বুক বেঁধেছিল। বিশ্বাস প্রথম দিকে অবিশ্বাসকে পাত্তা দেয়নি। তখন বিশ্বাসের কাছ ঘেঁষতে পারেনি অবিশ্বাস। দূরেই ঘোরাঘুরি করছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, যে আশায় বুক বেঁধেছিল বিশ্বাস তা ক্রমশ ততই আলগা হয়ে যাচ্ছিল। যখন প্রায় চারটে বাজে আর তখনও সে আসেনি, আশার বাঁধন ঢিলে হয়ে খুলে পড়ল। এ সময় বিশ্বাসকে পেয়ে বসল অবিশ্বাস। যখন চারটে বাজল এবং সে এল না, অবিশ্বাস দেঁতো হাসি হেসে বলল, বলেছিলাম সে আসবে না?
বিশ্বাস কোনও রকমে বলল, হয়ত কোনও কারণে দেরি হচ্ছে, এসে পড়বে।
অবিশ্বাস তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, তাই নাকি! বেশ, দেখা যাক।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। দুই ঘণ্টা। তিন। এবং চার।
অবিশ্বাস অবজ্ঞার সুরে বলল, জানতাম আসবে না।
বিশ্বাস ঢোক গিলল। মুখটা শুকনো। কোনও কথা বলতে পারল না।
বিজয়ী অবিশ্বাসের দেঁতো হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল।


[প্রথম প্রহর/জন্মদিন-২০১৫]

অলৌকিক লোকালয়ে

ঋভু অনিকেত

 


ফাল্গুন শেষ হতে চললো অথচ এই বিকেলবেলা কেমন যেন হালকা ঠা-ার আমেজ। পশ্চিম দিকের জানালাটা খোলা। শেষ বিকেলের এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে চেয়ারের পাশে। মৃদু শীতল এই বিকেলে রোদের হালকা উত্তাপ ভালোই লাগছিল। অন্যান্য বছর এ সময়টাতে অফিসের এই রুমে গরমে টেকা দায় হয়ে পড়ে। ঘরে একটা মাত্র ফ্যান, ফুল স্পিডে চললে মনে হয় খুলে পড়বে। উপ-পরিচালকদের রুমে কেন যে এসি দেয়া হয় না, ভেবে পায় না মামুন। এসবের মাঝেই ভাবলো আজ অফিস শেষে হাঁটতে হাঁটতে যাবে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। সেখানে মাঝে মাঝেই যায় সে, কবি-লেখকদের আড্ডাটা বেশ উপভোগ করে মামুন। যদিও লেখালেখির কাজটা চেষ্টা করেও শুরু করতে পারেনি সে। ভাব কেমন করে আসে জানে না সে, ভাবগুলোকে কথায় রূপান্তরিত করে কবিতা বা গদ্য লেখা তো দূরের কথা। তবে কবি-লেখকদের আড্ডায় বসে সাহিত্যের অনেক না জানা তথ্য জানা হয় ওর। আড্ডায় বোকার মতো বসে থেকে মাথা নাড়ানো আর হাঁ-হু করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না সে। বন্ধুরা প্রথম প্রথম ওকে কথা বলাতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতো। এখন তার এই চুপ মেরে থাকাটা বা আড্ডায় সক্রিয় অংশগ্রহণ না করাটা এক রকম মেনেই নিয়েছে ওরা। সাহিত্যে তার জ্ঞান-অভিজ্ঞতা সীমিত থাকার কথা বলে আড্ডায় কথা বলা মামুন এড়িয়ে গেছে সব সময়। এখন আর কেউ ওকে ঘাঁটায় না। আসলে আড্ডার জন্যও যে পড়াশোনার দরকার, এই আড্ডায় এসে উপলব্ধি করলো মামুন। আড্ডার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইদানীং দু’চার লাইন কবিতা লিখতে চেষ্টা করে মামুন। বন্ধুদের দেখাতে সাহস হয় না। কেননা আড্ডার আসরে দেখা যায় ওরা ভালো ভালো কবিরও তুলোধুনো করে ছাড়ে।
‘ডাইরেক্টর স্যার আপনারে সালাম দিছে।’ পরিচালকের পিয়ন সোলায়মানের ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠের বিরক্তিকর শব্দ।

’ওয়ালাইকুম সালাম।’ ভাবনার মুডটা নষ্ট করে দেয়ার জন্য একটু রাগতস্বরেই বললো মামুন। সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললো, ‘যাচ্ছি।’ সাইড টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢাকা গ্লাসটা থেকে পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। সামনের দেয়ালে ঝোলা ঘড়িতে দেখলো ৫টা বাজে। অফিস ছুটির সময়ে বসের ডাকাডাকি কার ভালো লাগে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো।
‘কবির, তুমি জানালা-দরজা বন্ধ করে চলে যাও। আমি ডাইরেক্টর সাহেবের রুম থেকে সরাসরি বেরিয়ে যাবো।’ নিজের পিয়ন কবিরকে নির্দেশ দিয়ে পরিচালকের রুমের দিয়ে এগোলো। সালাম দিয়ে পরিচালকের রুমে ঢুকলো মামুন।
‘আরে মামুন, বসো বসো। সোলায়মান, স্যারকে চা দাও।’ পরিচালকের গদগদ ভাব। কেন জানি এই বদখত লোকটা মামুনকে পছন্দ করে। তাই কখনোই কোনো কঠিন কথা বলে না তাকে। মামুনও মুগ্ধ শ্রোতার মতো পরিচালকের কথা শুনতে চেষ্টা করে। অসময়ে ডাকার জন্য বিরক্ত মামুন হ্যাঁ-না কিছু না বলে একটা চেয়ার টেনে বসলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পরিচালক কামরুল সাহেব বললেন, ‘তোমার মধ্যে কবি কবি ভাব আছে অথচ তুমি লেখো নাÑ এটা ঠিক নয়, লিখতে বসে যাও ভায়া।’ ‘কবিতা আমার দ্বারা হবে না স্যার।’ বললো মামুন। কী জন্য যেন ডেকেছিলেন? এমন সময় সোলায়মান দু’কাপ চা সামনে রেখে গেল। কণ্ঠস্বর বিরক্তিকর হলেও চা-টা ভালোই বানায় সোলায়মান, দুধ-চিনি একেবারে পারফেক্ট পরিমাণে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা ফাইল মামুনের দিকে এগিয়ে দিল কামরুল সাহেব। ফাইল খুলে একটা কাগজ সামনে তুলে ধরলো। ডিজি ম্যাডামের হাতের লেখা। কিছু বুঝতে না পেরে মামুন বললো, এটা তো আপনিই দিয়ে ফাইল পুটআপ করতে বলেছিলেন। সমস্যাটা কী এখন? মুখে কিছু না বলে কামরুল সাহেব পাতাটা উল্টালেন। হায় হায়! এটা তো আমারই লেখা! ক’দিন ধরে কী যেন হয়েছে খালি কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে। তাই হঠাৎ আজ দুপুরে একটা ভাব আসায় কয়েক লাইন একটা কাগজে লিখে রেখেছিল। এখন দেখছি এটা ডিজি ম্যাডামের হাতে লেখা সিøপ। বিস্মিত হয়ে মনে মনে ভাবলো। মুখে বললো, ‘সরি স্যার’।

‘আমাকে সরি বললে তো হবে না, ডিজি ম্যাডাম যদি কোনোভাবে তার ইনস্ট্রাকশনে এ রকম হিজিবিজি লেখা দেখতে পান তাহলে কী হবে, ভেবে দেখো। এমনিতেই ম্যাডাম রগচটা মানুষ।’ কী আর করবো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ফাইলটা ম্যাডামের কাছে পাঠিয়ে দিন। ম্যাডামের চোখে এটা নাও পড়তে পারে। আপনার ভয় নেই স্যার। যদি জিজ্ঞাসা করে আমার নাম বলে দেবেন।‘ এ জন্যই তো বলি, তুমি কবিতা ছাড়লেও কবিতা তোমাকে ছাড়ছে না। বলেই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন কামরুল সাহেব।
অফিসের দক্ষিণ দিকের গেইটটা দিয়ে বের হলো মামুন। এডি মাহবুবকে বলে এসেছে একা চলে যেতে। সে আজ আর অফিসের গাড়িতে বাড়ি ফিরছে না। মাহবুব আর মামুন একই জিপে বাড়ি ফেরে। ফুটপাথ ধরে কিছুদূর হেঁটে রাস্তা পার হয়ে হাইকোর্টের মাজারের গেইটের সামনে আসতেই জটাজুটধারী এক ফকির এসে হাত পাতলো। মামুন এসব লোককে কখনো পছন্দ করে না, ভিক্ষা দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কিছু পাওয়ার অপেক্ষা না করে সেই ফকির মামুনের চোখে চেয়ে হঠাৎ বা হাতটার কব্জি ধরে বসলো। এরপর কী যে হলো, বুুঝতে পারলো না! কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। ফকিরটা ওর হাত ধরে মাজারের দিকে টেনে নিয়ে চললো। মোহগ্রস্তের মতো হাঁটতে থাকলো ফকিরের সাথে সাথে। গেইটে ঢোকার পর একই রকম আরেকজন ফকির এসে মামুনের ডান হাতটার কব্জিতে ধরলো। দু’জনেই এমন শক্ত করে হাত ধরেছে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। দু’জনে ওকে টানতে টানতে মাজারের সামনের বট গাছটার দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। মামুনের বোধ-বুদ্ধি সবই যেন লোপ পেয়ে গেছে। অনেকটা সম্মোহিতের মতো চলছে সে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সবাই বাসায় ফেরার তাড়ায় ব্যস্ত। আশপাশে অনেক লোক চলাফেরা করছে। কারোরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না এই ঘটনা। মনে হচ্ছে, কেউ দেখছেই না যে, একজন ভদ্রলোককে দু’জন ফকির টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বট গাছের নিচে একই রকম বেশ ক’জন ফকির বসা। গাঁজার ছিলিম হাত ঘুরে ঘুরে চলেছে এক হাত থেকে আরেক হাতে। বট গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে ওই দু’জন তাকে গাছের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। গাঁজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আধো অন্ধকারে গাছের ভেতর হঠাৎ যেন একটা দরজা খুলে গেল। তাকে নিয়ে ওরা দু’জন নিñিদ্র অন্ধকার এক ঘরে ঢুকলো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধের মতো সামনের দিকে যেতে থাকলো। কিছুক্ষণ পর টের পেল দু’হাতের চাপটা আর এখন নেই। ওরা ওর হাত ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদূর চলার পর হঠাৎ করে এক আলোক উজ্জ্বল জায়গায় এসে পড়লো যেন। একটা নদীর পাড়। সকালের সূর্যটা তীব্র আলো ছড়িয়ে দিগন্তরেখার গাছপালার ওপরে উঠে পড়েছে। নদীটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। মনে হলো, এ নদীর ধারে এর আগেও এসেছে। মনে পড়লো, দু’বছর আগে দোল পূর্ণিমায় লালনের আখড়ায় এসেছিল। এ তো গড়াই নদী। কিন্তু পরিবেশটা কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। অনেক ঝোপঝাড়, অনেক গাছপালা। নদীর ধারের বট গাছটার পাশেই মামুন দাঁড়িয়ে। বট গাছের নিচে গেরুয়া পোশাক পরা জটাজুটধারী কিছু সাধু বসে আছেন। হঠাৎ দূর থেকে একটা গানের আওয়াজ ভেসে এলো। সুরটা বড় চেনা। দেখলো, দূরে নদীর পাড় দিয়ে দোতারা হাতে হেঁটে যেতে যেতে এক লোক গান গাইছে। কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করলো। সুরটা জাতীয় সংগীতের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু কথাগুলো...! তবে কী এ মানুষটি গগন হরকরা!
‘আমি কোথায় পাবো তারে
আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
আমি বেড়াই ঘুরে দেশে দেশে...’
বট গাছ ছাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটলো মামুন। অনেকটা জঙ্গলের মতো এলাকাটা। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সামনে কিছুদূর এগিয়ে দেখলো জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা খড়ে ছাওয়া ঘর। ঘরগুলোর সামনে ছাউনি দেয়া একটা উন্মুক্ত জায়গা। সেখানে একদিকে একটা আসনে সাদা পোশাক পরা একজন বসে আছেন। তার চারপাশ থেকে যেন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। একজন সাধু পুরুষ। তাকে ঘিরে সামনে আরো কয়েকজন বসা। এর মধ্যে দু’একজনকে চেনা চেনা লাগছে। তাদের ছবি কোথাও দেখেছে সে। তাদেরই একজন গেয়ে উঠলোÑ
‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে
তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা তাই ডাকি তোমারে...’

আরে, এ তো কাঙাল হরিনাথ। তার মানে, পাশের দাড়িওয়ালা মানুষটি মীর মশাররফ হোসেন! আর ওই সাধু পুরুষ ‘লালন’! একরাশ বিস্ময় মামুনের চোখে। এ কোথায় এলো! একশ’ বছর আগের সব মহান মানুষ তার চোখের সামনে! কে যেন সাধু পুরুষ লালনকে প্রশ্ন করলো, মনে হয় মীর মশাররফ। গুরু আপনার ধর্ম নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে...। কথাটা শেষ হলো না। লালন গেয়ে উঠলেনÑ
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন ভাবে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে...’
গান শেষ করে লালন বললেন, ‘ধর্ম তো মানুষের অন্তরে থাকে। মানুষটা মানুষ কি না সেটিই বড় কথা। মানব ধর্মই বড় ধর্ম।’ লালন আরো বললেন, ‘আত্মাকে ভালোবেসে অনুসন্ধান করলেই পরম আত্মাকে পাওয়া যায়।’ পেছন থেকে নারী কণ্ঠে কে যেন গেয়ে উঠলোÑ
‘মানুষ ছেড়ে মন রে আমার
দেখবি তুই সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার ভজলে ত্বরাবি
... ... ...
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’
‘কী হে জ্যোতি, তুমি যে পদ্মায় বোটে বসিয়ে আমার ছবি বানাইলা, ছবিটা তো আমারে দেখাইলা না?’ সামনে বসা একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন লালন। জ্যোতি মানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা! ভালো করে দেখলো। তাই তো ছবিতে দেখা মানুষটাকে আজ বাস্তবে দেখছে মামুন। লালন বলে চললেন, ‘তোমার ভাই রবি বিলাতে যেয়ে নাকি ইংরেজদের সাথে আমারে পরিচয় করানোর চেষ্টা করছে। আমার গান ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ শুনাইছে ইংরেজদের? ইংরেজরা কী বুইঝবে ওইসব?’ এমন সময় দূরে গাছের আড়ালে একজনকে আবছা মতন দেখতে পেল মামুন। এই লোকটাকে কোথাও দেখেছে মামুন। চশমার কাচটা শার্টে মুছে চিনতে চেষ্টা করলো। মুখটা অস্পষ্ট হলেও চিনতে ভুল হলো না। এ তো গিনসবার্গ, মানে এলেন গিনসবার্গ। কিন্তু তিনি এখানে এলেন কী করে? লালনের মৃত্যুর অনেক পর তার জন্ম! তবে কী গিনসবার্গও মামুনের মতো দর্শক একজন যিনি লিখেছেন অভঃবৎ খধষড়হ নামে কবিতা।

Sleepless, Stay up and

think about Death

- Certainly it's nearer

than when I as ten years old

and wondered how big the 

Universe was


এমন সময় দূর থেকে অনেক মানুষের চিৎকার ভেসে এলো। হা রে রে রে করে দু’দিক থেকে দু’দল মানুষ ছুটে আসছে। সবারই আক্রমণাত্মক রূপ। তাদের হাতে লাঠি, সড়কি নানান রকম অস্ত্র। একদল ধুতি-পৈতা পরা, আরেক দলের মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি। লালনের আখড়ার দিকে ধেয়ে আসছে ওরা। মামুন মুহূর্তেই বুঝে নিল এখানে থাকা আর ঠিক হবে না। যেদিক থেকে সে এসেছিল, সেই নদী তীরের বট গাছের দিকেই ছুটে চললো। প্রাণভয়ে খুব জোরে দৌড়ালো সে। বট গাছের গুঁড়িতে পা বেঁধে পড়ে গেল। সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখলো, শিক্ষা ভবনের সামনের ব্যস্ত সকালের রাস্তা। অফিসের উত্তর গেইটের সামনের ফুটপাথে পড়ে আছে মামুন। তাড়াহুড়া করে রাস্তা পার হতে গিয়ে ফুটপাথে হোঁচট খেয়ে পড়েছে সে। পায়ের একটা নখ বুঝি উপড়ে গেল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটায় প্রচ- যন্ত্রণা। উঠে দাঁড়াতে যাবেÑ এমন সময় একজন এগিয়ে এলো, ‘স্যার কি বেশি ব্যথা পেয়েছেন? এ রকম অসাবধানে তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হওয়াটা ঠিক হয়নি স্যার। একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারতো।’ মাথা উঁচু করে দেখলো, ওরই অফিসের নিম্নমান সহকারী কুদ্দুছ। মামুনের হাত ধরে ওঠাতে চেষ্টা করছে। ‘চলেন স্যার, আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিই।’ মামুন হাত নেড়ে জানালো, দরকার নেই। সকালবেলায় গেইট দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ঢুকছে। বিধ্বস্ত মামুনও পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। এই সকালবেলায় অফিসের সামনে এলো কেমন করে? রাতে বাসায় ছিল, না বাইরে ছিল? কিছুই মনে করতে পারছে না মামুন। শুধু দেখতে পাচ্ছে, কবিতার পঙ্্ক্তিরা সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, এখন থেকে সে কবিতা লিখতে পারবে।

 

 

Page 1 of 2

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…